প্রচ্ছদ / ইসলামী আইন/শরয়ী শাস্তিবিধান / ইসলামী শারিয়া বিষয়ে কবি হাসান মাহমুদের অজ্ঞতা ও ধৃষ্টতা (পর্ব-৫) প্রসঙ্গ মুরতাদের শাস্তি

ইসলামী শারিয়া বিষয়ে কবি হাসান মাহমুদের অজ্ঞতা ও ধৃষ্টতা (পর্ব-৫) প্রসঙ্গ মুরতাদের শাস্তি

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

৪র্থ পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন

মুরতাদের মৃত্যুদণ্ড আল্লাহর আইন নয়?

হাসান মাহমুদ লিখেন:

সম্প্রতি প্রচণ্ড আন্তর্জাতিক চাপে আফগানিস্তানের মুরতাদ আবদুর রহমানকে ছেড়ে দেয়া হল। এর আগে শারিয়ায় শাস্তি-প্রাপ্ত নাইজেরিয়ার আমিনা লাওয়াল ও সাফিয়া, পাকিস্তানের ডঃ ইউনুস ও জাফরান বিবিকেও ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ-রকমভাবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বারবার শারিয়া পরাজিত হচ্ছে। এই পরাজিত হওয়াটাই প্রমাণ করে ওগুলো আল্লাহর আইন নয়। আল্লাহর আইন হলে এ-ভাবে পরাজিত হত না। [শারিয়া কি বলে-২৩]

উত্তর

ইসলাম বিরোধীদের চাপের মুখে ইসলামের কোন বিধান পালন করতে না পারার মানে হল, সেটি আল্লাহর আইন নয়। এমন আহমকী যুক্তি হাসান সাহেবের মাথায় আসল কিভাবে?

নামায পড়ার কথা কুরআনে আসছে। এখন শত্রুদের অস্ত্রের মুখে যদি আপনি তা পড়তে না পারেন, এর মানে এটা আল্লাহর আইন নয়?

হজ্জ করা ফরজ। গতবার আন্তর্জাতিক চাপের কারণে পৃথিবীর কোন দেশ থেকেই হাজীদের হজ্জ করতে দেয়া হয়নি। এর মানে হজ্জ করার বিধান পরাজিত হয়েছে? হজ্জ করা আল্লাহর আইন নয়?

এমন গোবর মাথা নিয়ে আপনাকে ইসলামের আইনের মত জটিল বিষয়ে কথা বলতে কে বলেছে?

 

কুরআনে মুরতাদের কোন প্রার্থিব দণ্ড নেই?

হাসান মাহমুদ লেখেন:

মুরতাদের ওপরে কোরাণে কোথাও কোন পার্থিব দণ্ড নেই বরং এর ভেতরে মানুষের নাক গলানো নিষেধ করা আছে। আল্লাহ বলেছেন তিনি নিজেই তাকে শাস্তি দেবেন। [শারিয়া কি বলে-২৩]

উত্তর

فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ ۗ وَنُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ [٩:١١]وَإِنْ نَكَثُوا أَيْمَانَهُمْ مِنْ بَعْدِ عَهْدِهِمْ وَطَعَنُوا فِي دِينِكُمْ فَقَاتِلُوا أَئِمَّةَ الْكُفْرِ ۙ إِنَّهُمْ لَا أَيْمَانَ لَهُمْ لَعَلَّهُمْ يَنْتَهُونَ [٩:١٢]أَلَا تُقَاتِلُونَ قَوْمًا نَكَثُوا أَيْمَانَهُمْ وَهَمُّوا بِإِخْرَاجِ الرَّسُولِ وَهُمْ بَدَءُوكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ ۚ أَتَخْشَوْنَهُمْ ۚ فَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَوْهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ [٩:١٣]

“তবে তারা যদি তওবা করে, নামায কায়েম করে আর যাকাত আদায় করে, তখন তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। আর আমি বিধানসমূহে জ্ঞানী লোকদের জন্যে সর্বস্তরে র্বণনা করে থাকি। আর যদি তারা ভঙ্গ করে তাদের শপথ প্রতিশ্রুতির পর এবং বিদ্রুপ করে তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে, তাহলে সেই কুফর নেতৃত্বের সাথে লড়াই কর। কারণ, এদের কোন শপথ নেই যাতে তারা ফিরে আসে। তোমরা কি সেই দলের সাথে লড়াই করবে না যারা ভঙ্গ করেছে নিজেদের শপথ এবং সঙ্কল্প নিয়েছে রাসূলকে বহিষ্কারের? আর এরাই প্রথম তোমাদের সাথে বিবাদের সূত্রপাত করেছে। তোমরা কি তাদেরকে ভয় কর? অথচ তোমাদের ভয়ের অধিকতর যোগ্য হলেন আল্লাহ যদি তোমরা মুমিন হও।” (সূরাহ তাওবা, আয়াত নং ১১Ñ১৩)

 

এই আয়াতের পরিস্কার আসছে যে, ঈমান আনার পর যদি তারা তাদের শপথ ভঙ্গ করে, মানে ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদেশ আসছে।

মুরতাদের সাথে যুদ্ধ করে কি তাদের আদর করা হবে? নাকি হত্যা করা হবে?

সুতরাং মুরতাদ বিষয়ে কুরআনে কোন প্রার্থিক দণ্ড নেই বলা অজ্ঞতা ছাড়া আর কী?

আর যেসব লোক আল্লাহ ও রাসূলকে কষ্ট দেয়, তাদের বিষয়েও স্পষ্ট হত্যার নির্দেশ সম্বলিত আয়াত এসেছে:

إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُهِينًا [٣٣:٥٧]

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি।” (সূরাহ আহযাব, আয়াত নং ৫৭)

তারপর তাদেরকে হত্যা করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

مَلْعُونِينَ ۖ أَيْنَمَا ثُقِفُوا أُخِذُوا وَقُتِّلُوا تَقْتِيلًا [٣٣:٦١] سُنَّةَ اللَّهِ فِي الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُ ۖ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا [٣٣:٦٢]

“অভিশপ্ত অবস্থায় তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে, তাদেরকে ধরা হবে এবং প্রাণবধ করা হবে। যারা পূর্বে চলে গিয়েছে, তাদের ব্যাপারে এটাই ছিল আল্লাহর রীতি। আপনি আল্লাহর রীতিতে কখনও পরিবর্তন পাবেন না।” (সূরাহ আহযাব, আয়াত নং ৬১-৬২)

 

হাসান সাহেব এমন পরিস্কার নির্দেশনার পরও তা অস্বিকার করার জন্য খোড়া যুক্তি পেশ করে লিখেন:

“সুরা তওবা’র উল্লেখ্য চুক্তি ও চুক্তিভঙ্গে মুরতাদের কোন কথাই নেই। এর পটভূমি হল মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে যুদ্ধবিরতি, যুদ্ধ-চুক্তিভঙ্গ ও যুদ্ধ-চুক্তি বাতিল। এ পটভূমি ধরা আছে ইসলামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দুই সূত্র ইবনে হিশাম/ইশাক আর তারিখ আল্ তাবারিতে এবং বহু ইসলামি ওয়েবসাইটেও। তবে উদ্ধৃতি দিচ্ছি মওলানা মুহিউদ্দিনের অনুবাদ করা বাংলা কোরাণ থেকে যেন সবার পক্ষে মিলিয়ে নিতে সুবিধে হয়। ৫৫৩ ও ৫৫৬ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃতি ঃ

“সুরা তওবার সর্বত্র কতিপয় যুদ্ধ, যুদ্ধ-সংক্রান্ত ঘটনাবলী এবং এ-প্রসঙ্গে অনেকগুলো হুকুম-আহাকাম ও মাসায়েলের বর্ণনা রয়েছে। যেমন আরবের সকল গোত্রের সাথে কৃত সকল চুক্তি বাতিলকরণ, মক্কা বিজয়, হোনাইন ও তাবুক যুদ্ধ প্রভৃতি…ষষ্ঠ হিজরী সালে …তাদের সাথে হোদায়বিয়ায় সন্ধি হয়…এরপর পাঁচ-ছয় মাস অতিবাহিত হলে এক রাতে বনু বকর গোত্র বনু খোজা’র উপর অতর্কিত হামলা চালায়…অর্থাৎ হোদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল হয়ে যায়, যাতে ছিল দশবছরকাল যুদ্ধ স্থগিত রাখার চুক্তি…এখানে (১১নং আয়াতে) বলা হয় যে, কাফেররা যত শত্রুতা করুক, যত নিপীড়ন চালাক, যখন সে মুসলমান হয় তখন আল্লাহ (যেমন) তাদের কৃত অপরাধগুলো ক্ষমা করেন…আলোচ্য দ্বাদশ আয়াতে বলা হচ্ছে যে, এরা যদি চুক্তি সম্পাদনের পর শপথ ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং ইসলামও গ্রহণ না করে, অধিকন্তু ইসলামকে নিয়ে বিদ্রুপ করে, তবে সেই কুফর-প্রধানদের সাথে যুদ্ধ কর।” উদ্ধৃতি শেষ।

এত চমৎকার আয়াতের বিকৃত ব্যাখ্যা করেছেন মওদুদি।

দুনিয়াবি শাস্তিদানের ব্যাপারে কোরাণের একটা বৈশিষ্ট্য আছে। আল্লাহ কখনও মুসলমানকে সরাসরি বলেছেন বিপক্ষকে আঘাত করতে বা হত্যা করতে (সুরা মুহম্মদ ৪ ইত্যাদি)। আবার কখনও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বিপক্ষকে আল্লাহ মুসলিমদের হাতে শাস্তি দেবেন (সুরা তওবা আয়াত ১৪, ইত্যাদি)। মুরতাদকে হত্যা করার বিধান থাকলে সেটা এ-রকম সুস্পষ্ট শব্দে কোরাণে অবশ্যই থাকত,”। [শারিয়া কি বলে-২৪]

উত্তর

কথার মারপ্যাঁচে হাসান সাহেব মুরতাদকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে স্পষ্ট আয়াতেরও অপব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন।

এ আয়াত দ্বারা মুরতাদকে হত্যা করার দলীল। এটা তিনি মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সাহেবের যে পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি পেশ করেছেন সেখানেই বিদ্যমান আছে। সেটি কেন তিনি লিখলেন না?

তাফসীরে মাআরেফুল কুরআনের ৫৫৬ নং পৃষ্ঠায় আসছে যে, “হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাঃ যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে এ আয়াত থেকে অস্ত্রধারণের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে সাহাবায়ে কেরামের সন্দেহ নিরসন করেছিলেন। (ইবনে কাসীর)

এর মানে শরীয়তের বিধান অস্বিকার করে মুরতাদ হলে তাকে হত্যা করতে হবে এ দলীল আবু বকর সিদ্দীক রাঃ বুঝেছেন। তারপর সকল সাহাবাগণও মেনে নিলেন।

আর হাসান সাহেবরা আবু বকর সিদ্দীক রাঃ এর চেয়েও কুরআন বেশি বুঝার ভাব ধরছেন।

দ্বিতীয় বিষয় হল, এ আয়াতে চুক্তি ভঙ্গ করলে তাদের সাথে যুদ্ধ করার কথা আসছে। যেমনটি হাসান সাহেব বললেন।

আমরা এটা মানি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, এটি মুরতাদ হত্যার ক্ষেত্রের বিধান হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না।

এমন অনেক বিধানই আছে, যা বিভিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে নাজিল হয়েছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, শুধুমাত্র সেই পর্যন্তই হুকুমটি সীমাবদ্ধ থাকবে। বরং এতে যে বিধান আরোপ করা হয়েছে, তা এমন প্রতিটি পরিস্থিতির সাথেই প্রযোজ্য হবে।

যেমন সূরা বাকারা ১৯৫ নং আয়াত নাজিল হয়েছে, সাহাবাগণের জিহাদ থেকে অবসর নেবার প্রতি ধমকি হিসেবে। এর মানে কি এই যে, অন্য কোন ক্ষেত্রে যদি কেউ নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তাহলে উক্ত আয়াতকে দলীল হিসেবে পেশ করা যাবে না?

একথা ভুল। যেখানে উক্ত আয়াতে কারীমায় স্পষ্টভাবেই ঈমান আনার পর কুফরী করলে তাদের সাথে যুদ্ধ করার কথা উদ্ধৃত হয়েছে, সেখানে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা কুরআনের অপব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছু নয়।

 

কুরআন মুরতাদকে ইসলামে আসার সুযোগ দিয়েছে

হাসান মাহমুদ লেখেন:

কোরাণ মুরতাদকে ইসলামে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছে। তাকে খুন

করলে ‘আবার মুসলমান’ হবার সুযোগ সে পাবে না, সেই খুন সরাসরি কোরাণ লঙ্ঘন হয়ে যাবে। [শারিয়া কি বলে-২৩]

উত্তর

বারবার একই কথা বলতে হচ্ছে। কোন বিধানের পূর্বাপর বিধান না জেনে বোকার মত সমালোচনা করা কতোটা হাস্যকর। তা হাসান সাহেবের অজ্ঞতার ফিরিস্তিই প্রমাণ করে।

একথা আসলে লেখার কিছু নেই যে, মুরতাদকে কুরআন ও হাদীস ইসলামে ফিরে আসার সুযোগ দেয়। কিন্তু যদি সে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইসলামে ফিরে না আসে, তাহলে তাকে হত্যা করা হয়।

সুতরাং ফিরে আসার সুযোগ সম্বলিত আয়াত পেশ করে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করার কথা বলা মূর্খতা হবে।

মুরতাদ হত্যার শর্তাবলী

এবার মুরতাদের মৃত্যুদণ্ড বিষয়ক শরয়ী শর্তগুলো আগে জেনে নিন:

প্রথমে জানতে হবে যে, মুরতাদ হয়ে যাবার সাথে সাথেই শাস্তি দেয়া হবে বিষয়টি এমন নয়।

ক)

বরং তার কাছে ইসলাম পেশ করা হবে।

খ)

তাকে বুঝানো হবে।

গ)

প্রয়োজনে তাকে বন্দী করে রাখা হবে।

ঘ)

তারপর না ফিরে আসলে তাকে হত্যা করা হবে।

ঙ)

আর যদি সে পালিয়ে অমুসলিম দেশে  চলে যায়, তাহলে তাকে হত্যা করা হয় না।

عَنْ عَائِشَةَ , قَالَتِ: ارْتَدَّتِ امْرَأَةٌ يَوْمَ أُحُدٍ فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «أَنْ تُسْتَتَابَ , فَإِنْ تَابَتْ , وَإِلَّا قُتِلَتْ»

 হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। ওহুদ যুদ্ধে এক মহিলা মুরতাদ হয়ে যায়, তখন রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন, তাকে তওবা করানো হোক, আর যদি তওবা না করে, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। {সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-১২১, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-১৬৬৪৫, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-১৮৭২৫, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-২৯৬০৭}

عَنْ جَابِرٍ , أَنَّ امْرَأَةً يُقَالُ لَهَا أُمُّ مَرْوَانَ ارْتَدَّتْ عَنِ الْإِسْلَامِ , فَأَمَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «أَنْ يَعْرَضَ عَلَيْهَا الْإِسْلَامُ , فَإِنْ رَجَعَتْ وَإِلَّا قُتِلَتْ»

হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ থেকে বর্ণিত। উম্মে মারওয়ান নামের এক মহিলা মুরতাদ হয়ে গেলে রাসূল সাঃ আদেশ দেন যে, তার কাছে ইসলাম পেশ করতে, যদি সে ফিরে আসে তাহলে ভাল, নতুবা তাকে হত্যা করা হবে। {সুনানুল কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-১৬৬৪৩, সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-১২২}

এ কথাগুলো মনে রাখলে  সামনে হাসান মাহমুদের অজ্ঞতা ও হাস্যকর কথাগুলো আপনাদের চোখের সামনে দিনের আলোর মতই পরিস্কার হয়ে যাবে।

মুরতাদকে মৃত্যুদণ্ড নবী দেননি?

হাসান মাহমুদ লেখেন:

নবীজীর ওহি-লেখক আবদুল্লাহ বিন সা’আদ-ও মুরতাদ হয়ে মদিনা থেকে মক্কায় পালিয়ে গিয়েছিল। এ হেন মহা-মুরতাদকেও নবীজী মৃত্যুদণ্ড দেননি (ইবনে হিশাম-ইশাক পৃঃ ৫৫০) বরং হজরত ওসমান পরে তাকে মিশরের গভর্নর করেছিলেন।

উত্তর

শুধু একটি হাদীস উল্লেখ করলেই এখানে হাসান সাহেবের জাহালাত অথবা ইচ্ছেকৃত ধূর্ততা পরিস্কার হয়ে যাবে।

عَنْ سَعْدٍ، قَالَ: لَمَّا كَانَ يَوْمُ فَتْحِ مَكَّةَ، اخْتَبَأَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَعْدِ بْنِ أَبِي سَرْحٍ عِنْدَ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ، فَجَاءَ بِهِ حَتَّى أَوْقَفَهُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، بَايِعْ عَبْدَ اللَّهِ، فَرَفَعَ رَأْسَهُ، فَنَظَرَ إِلَيْهِ ثَلَاثًا، كُلُّ ذَلِكَ يَأْبَى، فَبَايَعَهُ بَعْدَ ثَلَاثٍ، ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَى أَصْحَابِهِ، فَقَالَ: أَمَا كَانَ فِيكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ يَقُومُ إِلَى هَذَا حَيْثُ رَآنِي كَفَفْتُ يَدِي عَنْ بَيْعَتِهِ، فَيَقْتُلُهُ؟ فَقَالُوا: مَا نَدْرِي يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا فِي نَفْسِكَ، أَلَّا أَوْمَأْتَ إِلَيْنَا بِعَيْنِكَ؟ قَالَ: إِنَّهُ لَا يَنْبَغِي لِنَبِيٍّ أَنْ تَكُونَ لَهُ خَائِنَةُ الْأَعْيُنِ صحيح

সা‘দ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন আব্দুল্লাহ ইবনু সা‘দ ইবনু আবূ সারহ উসমান ইবনু আফফান (রাঃ)-এর নিকট আত্মগোপন করে। তিনি তাকে নিয়ে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে দাঁড় করিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আব্দুল্লাহকে বাই‘আত করুন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাথা উঠিয়ে তিনবার তার দিকে তাকান এবং প্রতিবারই বাই‘আত করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনবারের পর তাকে বাই‘আত করেন। অতঃপর তিনি সাহাবীদের দিকে ফিরে বলেনঃ তোমাদের মধ্যে কি সঠিক নির্দেশ উপলদ্ধি করার মতো কেউ ছিলো না, যে এর সমানে গিয়ে দাঁড়াতো; আর যখন দেখতো আমি তার বাই‘আত গ্রহণ না করার জন্য হাত গুটিয়ে নিচ্ছি, তখন সে তাকে হত্যা করতো? সাহাবীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার মনের ইচ্ছা উপলদ্ধি করতে পারিনি। আপনি কেন আমাদের চোখ দিয়ে ইশারা করলেন না? তিনি বললেনঃ কোনো নবীর পক্ষে চোখের খেয়ানতকারী হওয়া শোভা পায় না। [সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং-৪৩৫৯]

যেহেতু পালিয়ে যায়, তাই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায়নি। সে মুসলমান হয়ে আসে, তারপরও নবীজী তাকে হত্যা করা হোক চাচ্ছিলেন।

সুতরাং মুরতাদ হবার পরও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি এ দাবীর পক্ষে এটি দলীল দেয়া অজ্ঞতা।

আর হযরত উসমান কেন হত্যা করেননি? কারণ, লোকটি উসমান রাঃ এর কাছে আগেই মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। [কিতাবুল মাগাজী লিলওয়াকিদী-২/৮৫৫]

في ” المغازي ” (2/ 855) للواقدي قوله : ” وخرج هاربا من المدينة إلى مكة مرتدا ، فأهدر رسول الله صلى الله عليه وسلم دمه يوم الفتح ، فلما كان يومئذ جاء ابن أبي سرح إلى عثمان بن عفان رضي الله عنه ، وكان أخاه من الرضاعة ، فقال : يا أخي ، إني والله اخترتك فاحتبِسني هاهنا ، واذهب إلى محمد فكلِّمه في ، فإن محمدا إن رآني ضرب الذي فيه عيناي ، إن جرمي أعظم الجرم ، وقد جئت تائبا

কুরআনের আয়াত মুরতাদ হত্যার বিরোধী?

হাসান মাহমুদ লিখেন:

আরও বহু আয়াত মুরতাদ-হত্যার বিপক্ষে, যেমন ঃ ইউনুস ৯৯ − “তুমি কি মানুষের উপর জবরদস্তি করিবে ইমান আনিবার জন্য?”

কাহ্ফ ২৯ − “যার ইচ্ছে বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক।”

নিসা ৮০ − “আর যে লোক বিমুখ হইল, আমি আপনাকে (হে মুহম্মদ!) তাহাদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করি নাই।”

নিসা ৯৪ − “যে তোমাদেরকে সালাম করে তাহাকে বলিও না যে তুমি মুসলমান নও।”

বাকারা ২৫৬ − “ধর্মে জোর-জবরদস্তি নাই।” ইত্যাদি।

উত্তর

কেমন হাস্যকর দলীল। বাংলাদেশে আইন আছে যে, এ দেশে কাউকে প্রবেশ করতে জোর জবরদস্তী করা হয় না। ইচ্ছে হলে কেউ আসতে পারে, ইচ্ছে হলে কেউ নাও আসতে পারে।

কিন্তু এ দেশে আসার পর যদি কেউ অপরাধ করে, রাষ্ট্রের আইনের খেলাফ করে, তাহলে তাকে বন্দী করা হবে। তাকে প্রয়োজনবোধে হত্যাও করা হবে।

এখন আগন্তুককে রাষ্ট্রবিরোধী কারণে হত্যার জন্য নেবার সময় যদি কেউ আইন দেখায় যে, এদেশের আইনে আছে যে, এ দেশে প্রবেশে কোন জোরজবরদস্তী নেই। যে ইচ্ছে আসতে পারে, যে ইচ্ছে নাও আসতে পারে। সুতরাং এ বিদেশীকে বন্দী করা যাবে না, তাকে ফাসি দেয়া যাবে না।

তাহলে এমন আহম্মককে আমরা কী বলবো?

আমরা বলবো যে, আমাদের দেশে আসতে আমরা কাউকে বাধ্য করি না। কিন্তু এসে গেলে এদেশের আইন মানতে হবে। এদেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে তোমাকে শাস্তি পেতেই হবে। এর সাথে আসার বিষয়ের নম্রতার আইন প্রয়োগ করার কোন সম্পর্কই নেই।

সুতরাং উপরোক্ত আয়াতগুলো পরিস্কারই ইসলামে প্রবেশ বিষয়ে। ইসলামে প্রবেশ করে বিদ্রোহ করে মুরতাদ হয়ে যাবার অপরাধ বিষয়ে নয়।

সুতরাং প্রবেশের নম্রতার সাথে বিদ্রোহের শাস্তির তুলনা করা বোকামী ছাড়া আর কী? এসব কোন আয়াতেরই মুরতাদের সাথে কোন সম্পর্কই নেই। এটা হাস্যকর দলীল ছাড়া কিছু নয়।

মুরতাদ হত্যার বিরোধী কুরআনের আয়াত?

হাসান সাহেব লিখেন:

তবে মুরতাদ-হত্যার বিরুদ্ধে কোরাণের সবচেয়ে স্পষ্ট নির্দেশ আছে সুরা ইমরানএর ৮৬ নম্বর আয়াতে। হারিথ নামে এক মুসলমান মুরতাদ হলে তার ওপরে নাজিল হয়েছিল এ আয়াত:

“কেমন করে আল্লাহ এমন জাতিকে হেদায়েত দেবেন যারা ইমান আনার পর ও রসুলকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেবার পর ও তাদের কাছে প্রমাণ আসার পর কাফের হয়েছে ?”

নবীজী তাকে মৃত্যুদণ্ড কেন,কোন শাস্তিই দেননি (ইবনে হিশাম-ইশাক পৃঃ ৩৮৪)।

উত্তর

নামটাও সঠিকভাবে লিখেননি হাসান সাহেব। নাম হবে হারিছ বি সুআইদ।

আমরা আগেই জেনেছি যে, একটি আইন প্রয়োগের পূর্বাপর বুঝতে হয়। জানতে হয়, তারপর মন্তব্য করতে হয়। এতো সরলীকরণ করাটা নিজেকে হাস্যস্পদ বানায়।

মুরতাদকে শাস্তি দেবার আগে তাতে দাওয়াত দেয়া হয়। তারপর না মানলে হত্যার কথা আসে।

আর যদি মুরতাদ হয়ে সে ইসলামী রাষ্ট্র থেকে পালিয়ে যায়, তাহলে তাকে বাহির থেকে ধরে এনে হত্যা করা হয় না।

হারিছও মুরতাদ হয়ে ইসলামী রাষ্ট্র মদীনা থেকে তখন পালিয়ে তার গোত্রে চলে যায়। তারপর আবার মুসলমান হয়ে ফিরে আসে। এ কারণে তাকে হত্যা করা হয়নি।

যদি সে মদীনায় থাকতো মুরতাদ হবার পর, তারপর তাকে হত্যা না করা হতো, তাহলে হাসান সাহেব দলীল দিতে পারতেন।

সুতরাং দাবী ও দলীলের মাঝে কোন সম্পর্কই নেই।

عَنْ مُجَاهِدٍ , قَالَ: جَاءَ الْحَارِثُ بْنُ سُوَيْدٍ , فَأَسْلَمَ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , ثُمَّ كَفَرَ الْحَارِثُ , فَرَجَعَ إِلَى قَوْمِهِ , فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى فِيهِ الْقُرْآنَ: {كَيْفَ يَهْدِي اللَّهُ قَوْمًا كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ} [آل عمران: 86] إِلَى: {إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ} [آل عمران: 89] فَحَمَلَهَا إِلَيْهِ رَجُلٌ مِنْ قَوْمِهِ , فَقَرَأَهَا عَلَيْهِ , قَالَ: فَقَالَ الْحَارِثُ: «وَاللَّهِ إِنَّكَ مَا عَلِمْتُ لَصَدُوقٌ , وَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَأَصْدَقُ مِنْكَ , وَإِنَّ اللَّهَ لَأَصْدَقُ الثَّلَاثَةِ» قَالَ: «فَرَجَعَ الْحَارِثُ فَأَسْلَمَ , فَحَسُنَ إِسْلَامُهُ»

[তাফসীরে আব্দুর রাজ্জাক-১/৪০১, বর্ণনা নং-৪২৬, আলে ইমরান, আয়াত নং-৮৬]

 

মুরতাদকে নবীজী শাস্তি দেননি?

হাসান সাহেব লিখেন:

উবায়রাক ছাড়াও আমরা নবীজীর সময়ে তিনজন মুরতাদের দলিল পাই। তারা হল হারিথ, নবীজীর ওহি লেখক ইবনে সা’দ, এবং উবায়দুলাহ ” − পৃষ্ঠা ৩৮৪, ৫২৭ ও ৫৫০।

এ তিনজনের কাউকে মৃত্যুদণ্ড কেন, কোনো শাস্তিই দেননি রসুল। তিনি মনে কষ্ট পেয়েছেন, তবু সর্বদা মেনে চলেছেন লা-ইকরাহা ফিদ্দিন, − ধর্মে জবরদস্তি নাই − বাকারা ২৫৬।

দলিলে এ-সব ঘটনা আছে নামধাম, তারিখ, ঘটনার বিবরণ সহ।

দেখুন সহি বুখারি ৯ম খণ্ড হাদিস ৩১৮ ঃ জাবির বিন আবদুল্লাহ বলেন, এক বেদুইন আল্লাহ’র রসুলের কাছে বায়াত গ্রহণ করিল। পরে মদিনায় তাহার জ্বর হইলে সে আল্লাহ’র রসুলের নিকট আসিয়া বলিল ‘হে আল্লাহ’র রসুল, আমার বায়াত ফিরাইয়া দিন।’ রসুল সম্মত হইলেন না। তারপর সে আবার আসিয়া বলিল ‘হে আলাহ’র রসুল, আমার বায়াত ফিরাইয়া দিন।’ রসুল সম্মত হইলেন না। তারপর সে ” আবার আসিয়া বলিল ‘হে আল্লাহ’র রসুল, আমার বায়াত ফিরাইয়া দিন।’ রসুল সম্মত হইলেন না। তারপর সে মদিনা ছাড়িয়া চলিয়া গেল। ইহাতে আল্লাহ’র রসুল বলিলেন− “মদিনা একটি উনুনের মতো, − ইহা ভেজালকে বাহির করিয়া দেয় এবং ভালোকে পরিষ্কার ও উজ্জ্বল করে।”

এই যে স্বয়ং নবীজীর সামনে প্রকাশ্যে ইসলাম ত্যাগ − মৃত্যুদণ্ড তো দূরের কথা, কোথায় হুঙ্কার বা কোথায় শাস্তি ? আমাদের শারিয়াপন্থীরা কি ভেবে দেখেছেন কার বানানো শারিয়া আর কার বানানো ‘ইসলাম’-এর শিকার হয়েছেন তাঁরা ?” [শারিয়া কি বলে-২৪]

উত্তর

এসবের জবাব আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। মুরতাদের শাস্তি বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ বিধিবিধান জানলে এসব দলীল দেবার প্রয়োজনই বোধ করতেন না হাসান সাহেব।

কারণ, মুরতাদ হবার সাথে সাথেই কাউকে হত্যার বিধান দেয়া হয় না। বরং তাকে বুঝার সুযোগ দেয়া হয়। তারপর সে যদি ইসলামী রাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে তাকে সেখান থেকে ধরে এনে হত্যা করা হয় না।

উপরোক্ত চারজন ব্যক্তিই মদীনা থেকে বেরিয়ে গেছে। কেউ কেউ পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে আবার ফিরে আসছে।

যেমন উবায়দুল্লাহ বসরায় গিয়ে মুরতাদ হয়েছে।

আর বাকি এক বেদুইন, হারিছ বিন সুআইদ, আব্দুল্লাহ বিন সা’দ। এর সবাই মুরতাদ হয়ে মদীনা ত্যাগ করেছে। এর মাঝে হারিছ ও আব্দুল্লাহ বিন সা’দ পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে ফিরে এসেছে।

সুতরাং এসব ব্যক্তিদের উপমা পেশ করে মুরতাদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করার সুযোগ নেই।

হাদীসে মুরতাদ হত্যার কোন প্রমাণ নেই?

হাসান মাহমুদ লিখেন:

হাদিসে নামধাম সহ কোন ঘটনারই উল্লেখ নেই, শুধু “নবীজী বলিয়াছেন মুরতাদকে খুন কর” এইধরনের বায়বীয় কথা আছে। [শারিয়া কি বলে-২৪]

উত্তর

একাধিক প্রমাণ হাদীসের কিতাবে রয়েছে। যেমন

ইবনে খাতাল মুসলমান হয়েছিল মদীনায় এসে। তারপর মুরতাদ হয়ে মক্কা চলে যায়। [শরহে যুরকানী আলা মাওয়াহিবুল লাদিনিয়্যাহ-৩/৪৩৮]

মুরতাদ এ ইবনে খাতালকে মক্কা বিজয়ের দিন নবীজী কী বলেন? হাদীসেই দেখুন:

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، دَخَلَ عَامَ الفَتْحِ، وَعَلَى رَأْسِهِ المِغْفَرُ، فَلَمَّا نَزَعَهُ جَاءَ رَجُلٌ فَقَالَ: إِنَّ ابْنَ خَطَلٍ مُتَعَلِّقٌ بِأَسْتَارِ الكَعْبَةِ فَقَالَ «اقْتُلُوهُ»

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের বছর মক্কায় প্রবেশ করার সময় তাঁর মাথায় শিরস্ত্রাণ ছিলো। যখন তিনি মাথা থেকে তা খুললেন, সেসময় এক ব্যক্তি এসে বললেন, ইবনে খাতাল কা‘বার গিলাফের সাথে লেপ্টে আছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাকে হত্যা করো।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৮৪৬)

عَنْ أَبِي مُوسَى، قَالَ: أَقْبَلْتُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَمَعِي رَجُلاَنِ مِنَ الأَشْعَرِيِّينَ، أَحَدُهُمَا عَنْ يَمِينِي وَالآخَرُ عَنْ يَسَارِي، وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْتَاكُ، فَكِلاَهُمَا سَأَلَ، فَقَالَ: ” يَا أَبَا مُوسَى، أَوْ: يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ قَيْسٍ ” قَالَ: قُلْتُ: وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالحَقِّ مَا أَطْلَعَانِي عَلَى مَا فِي أَنْفُسِهِمَا، وَمَا شَعَرْتُ أَنَّهُمَا يَطْلُبَانِ العَمَلَ، فَكَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى سِوَاكِهِ تَحْتَ شَفَتِهِ قَلَصَتْ، فَقَالَ: ” لَنْ، أَوْ: لاَ نَسْتَعْمِلُ عَلَى عَمَلِنَا مَنْ أَرَادَهُ، وَلَكِنِ اذْهَبْ أَنْتَ يَا أَبَا مُوسَى، أَوْ يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ قَيْسٍ، إِلَى اليَمَنِ ” ثُمَّ اتَّبَعَهُ مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ، فَلَمَّا قَدِمَ عَلَيْهِ أَلْقَى لَهُ وِسَادَةً، قَالَ: انْزِلْ، وَإِذَا رَجُلٌ عِنْدَهُ مُوثَقٌ، قَالَ: مَا هَذَا؟ قَالَ: كَانَ يَهُودِيًّا فَأَسْلَمَ ثُمَّ تَهَوَّدَ، قَالَ: اجْلِسْ، قَالَ: لاَ أَجْلِسُ حَتَّى يُقْتَلَ، قَضَاءُ اللَّهِ وَرَسُولِهِ، ثَلاَثَ مَرَّاتٍ. فَأَمَرَ بِهِ فَقُتِلَ،

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। আমার সঙ্গে আশ‘আরী গোত্রের দু’জন লোক ছিল। একজন আমার ডানদিকে, অপরজন আমার বামদিকে। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মিস্ওয়াক করছিলেন। উভয়েই তাঁর কাছে আবদার জানাল। তখন তিনি বললেনঃ হে আবূ মূসা! অথবা বললেন, হে ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু কায়স! রাবী বলেন, আমি বললামঃ ঐ সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, তারা তাদের অন্তরে কী আছে তা আমাকে জানায়নি এবং তারা যে চাকরি প্রার্থনা করবে তা আমি বুঝতে পারিনি। আমি যেন তখন তাঁর ঠোঁটের নিচে মিস্ওয়াকের প্রতি লক্ষ্য করছিলাম যে তা এক কোণে সরে গেছে। তখন তিনি বললেন, আমরা আমাদের কাজে এমন কাউকে নিযুক্ত করব না বা করি না যে নিজেই তা চায়। বরং হে আবূ মূসা! অথবা বললেন, হে ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু কায়স! তুমি ইয়ামনে যাও। এরপর তিনি তার পেছনে মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে পাঠালেন।

যখন তিনি সেখানে পৌঁছলেন, তখন আবূ মূসা (রাঃ) তার জন্য একটি গদি বিছালেন আর বললেন, নেমে আসুন। ঘটনাক্রমে তার কাছে একজন লোক শেকলে বাঁধা ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ঐ লোকটি কে? আবূ মূসা (রাঃ) বললেন, সে প্রথমে ইয়াহূদী ছিল এবং মুসলিম হয়েছিল। কিন্তু আবার সে ইয়াহূদী হয়ে গেছে। আবূ মূসা (রাঃ) বললেন, বসুন। মু‘আয (রাঃ) বললেন, না, বসব না, যতক্ষণ না তাকে হত্যা করা হবে। এটাই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের ফায়সালা। কথাটি তিনি তিনবার বললেন। এরপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হল এবং তাকে হত্যা করা হল। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৯২৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৭৩৩]

মুরতাদ হত্যার পরিস্কার প্রমাণ আবু দাউদে আছে:

حَدَّثَنَا ابْنُ عَبَّاسٍ، أَنَّ أَعْمَى كَانَتْ لَهُ أُمُّ وَلَدٍ تَشْتُمُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَتَقَعُ فِيهِ، فَيَنْهَاهَا، فَلَا تَنْتَهِي، وَيَزْجُرُهَا فَلَا تَنْزَجِرُ، قَالَ: فَلَمَّا كَانَتْ ذَاتَ لَيْلَةٍ، جَعَلَتْ تَقَعُ فِي النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَتَشْتُمُهُ، فَأَخَذَ الْمِغْوَلَ فَوَضَعَهُ فِي بَطْنِهَا، وَاتَّكَأَ عَلَيْهَا فَقَتَلَهَا، فَوَقَعَ بَيْنَ رِجْلَيْهَا طِفْلٌ، فَلَطَّخَتْ مَا هُنَاكَ بِالدَّمِ، فَلَمَّا أَصْبَحَ ذُكِرَ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَجَمَعَ النَّاسَ فَقَالَ: «أَنْشُدُ اللَّهَ رَجُلًا فَعَلَ مَا فَعَلَ لِي عَلَيْهِ حَقٌّ إِلَّا قَامَ»، فَقَامَ الْأَعْمَى يَتَخَطَّى النَّاسَ وَهُوَ يَتَزَلْزَلُ حَتَّى قَعَدَ بَيْنَ يَدَيِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَنَا صَاحِبُهَا، كَانَتْ تَشْتُمُكَ، وَتَقَعُ فِيكَ، فَأَنْهَاهَا فَلَا تَنْتَهِي، وَأَزْجُرُهَا، فَلَا تَنْزَجِرُ، وَلِي مِنْهَا ابْنَانِ مِثْلُ اللُّؤْلُؤَتَيْنِ، وَكَانَتْ بِي رَفِيقَةً، فَلَمَّا كَانَ الْبَارِحَةَ جَعَلَتْ تَشْتُمُكَ، وَتَقَعُ فِيكَ، فَأَخَذْتُ الْمِغْوَلَ فَوَضَعْتُهُ فِي بَطْنِهَا، وَاتَّكَأْتُ عَلَيْهَا حَتَّى قَتَلْتُهَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا اشْهَدُوا أَنَّ دَمَهَا هَدَرٌ»

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক অন্ধ সাহাবীর একজন উম্মে ওয়ালাদ বাঁদী ছিল। সে রাসূলুল্লাহ (সা.) কে গালাগাল ও সমালোচনা করতো। অন্ধ সাহাবী তাকে নিষেধ করেন, কিন্তু সে নিষেধ অমান্য করে এবং তিনি তাকে হুমকি দেন, তাতেও সে বিরত থাকে না। বর্ণনাকারী বলেন, একদা রাতে বাঁদীটি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে সমালোচনা ও গালাগাল শুরু করে, তখন অন্ধ সাহাবী খঞ্জর নিয়ে তার পেটে ধরেন এবং তার উপর ভর দেন। ফলে বাঁদীটি মারা যায়। এমনকি তার দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে পেটের বাচ্চা বের হয়ে যায়। আর সেখানে যা কিছু ছিল সে রক্তে রঞ্জিত করে ফেলে। যখন সকাল হয়, বাঁদীটির এ অবস্থার কথা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বর্ণনা করা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) সবাইকে একত্র করেন এবং বলেন, যে এ কাজ করেছে, তাকে আল্লাহর কসম ও আমার উপর থাকা তার হকের কসম দিচ্ছি, সে যেন দাঁড়িয়ে যায়। তখন সেই অন্ধ সাহাবী উঠলেন। অতঃপর তিনি লোকদের ভীড় ঠেলে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে বসলেন। অতঃপর বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি সেই বাঁদীর সম্পর্কিত লোক। সে আপনাকে গালাগাল করতো, আপনার কুৎসা গাইতো। আমি তাকে এসব করতে বাধা দিতাম। কিন্তু সে বিরত হতো না এবং তাকে হুমকি-ধমকি দিতাম, তবু সে থামতো না। আর আমার হীরার টুকরোর মত দু’টি সন্তান তার গর্ভ থেকে আছে। আমি তাকে খুব ভালবাসতাম। এমনি করে যখন গতরাত এলো, সে আপনাকে গালাগাল শুরু করলো এবং আপনার কুৎসা গাইতে লাগলো। তখন আমি একটি খঞ্জর নিই এবং তাকে তার পেটে রাখি। তারপর তার উপর ভর  দিয়ে তাকে হত্যা করি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন “লোকেরা! তোমরা সাক্ষী থাকোÑতার প্রাণবধ দায়মুক্ত।”

(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৩৬৩, সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং ১০৩, আল-মুজামুল কাবীর, হাদীস নং ১১৯৮৪, বুলুগুল মারাম, হাদীস নং ১২০৪)

 

মুরতাদ হত্যা করতে নবীজীর আদেশ:

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” لاَ يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ، يَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ، إِلَّا بِإِحْدَى ثَلاَثٍ: النَّفْسُ بِالنَّفْسِ، وَالثَّيِّبُ الزَّانِي، وَالمَارِقُ مِنَ الدِّينِ التَّارِكُ لِلْجَمَاعَةِ “

‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন ইলাহ্ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল, তিন-তিনটি কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করা বৈধ নয়। (যথা) জানের বদলে জান, বিবাহিত ব্যভিচারী, আর নিজের দ্বীন ত্যাগকারী মুসলিম জামাআত থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া ব্যক্তি। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৮৭৮]

عَنْ عِكْرِمَةَ، أَنَّ عَلِيًّا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، حَرَّقَ قَوْمًا، فَبَلَغَ ابْنَ عَبَّاسٍ فَقَالَ: لَوْ كُنْتُ أَنَا لَمْ أُحَرِّقْهُمْ لِأَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لاَ تُعَذِّبُوا بِعَذَابِ اللَّهِ» [ص:62]، وَلَقَتَلْتُهُمْ كَمَا قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ»

ইকরামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। ‘আলী (রাঃ) এক সম্প্রদায়কে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। এ সংবাদ ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘আববাস (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, ‘যদি আমি হতাম, তবে আমি তাদেরকে জ্বালিয়ে ফেলতাম না। কেননা, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আল্লাহর আযাব দ্বারা কাউকে আযাব দিবে না। বরং আমি তাদেরকে হত্যা করতাম। যেমন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে লোক তার দ্বীন বদলে ফেলে, তাকে হত্যা করে ফেল।’ [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩০১৭]

عَنْ أَبِي أُمَامَةَ بْنِ سَهْلٍ، قَالَ: كُنَّا مَعَ عُثْمَانَ وَهُوَ مَحْصُورٌ فِي الدَّارِ، وَكَانَ فِي الدَّارِ مَدْخَلٌ، مَنْ دَخَلَهُ سَمِعَ كَلَامَ مَنْ عَلَى الْبَلَاطِ، فَدَخَلَهُ عُثْمَانُ، فَخَرَجَ إِلَيْنَا وَهُوَ مُتَغَيِّرٌ لَوْنُهُ، فَقَالَ: إِنَّهُمْ لَيَتَوَاعَدُونَنِي بِالْقَتْلِ آنِفًا، قَالَ: قُلْنَا: يَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، قَالَ: وَلِمَ يَقْتُلُونَنِي؟ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: ” لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ: كُفْرٌ بَعْدَ إِسْلَامٍ، أَوْ زِنًا بَعْدَ إِحْصَانٍ، أَوْ قَتْلُ نَفْسٍ بِغَيْرِ نَفْسٍ “، فَوَاللَّهِ مَا زَنَيْتُ فِي جَاهِلِيَّةٍ، وَلَا فِي إِسْلَامٍ قَطُّ، وَلَا أَحْبَبْتُ أَنَّ لِي بِدِينِي بَدَلًا مُنْذُ هَدَانِي اللَّهُ، وَلَا قَتَلْتُ نَفْسًا، فَبِمَ يَقْتُلُونَنِي؟ قَالَ أَبُو دَاوُدَ: «عُثْمَانُ وَأَبُو بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا تَرَكَا الْخَمْرَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ»

আবূ উমামা ইবনু সাহল (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা উসমান (রাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম, যখন তিনি (বিদ্রোহীদের দ্বারা) একটি ঘরে আটক ছিলেন। ঐ ঘরের একটি প্রবেশদ্বার ছিলো। কেউ ঐ প্রবেশদ্বারে প্রবেশ করলে আল-বালাত নামক স্থানে লোকের কথাবার্তা শুনতে পেতো। উসমান (রাঃ) তাতে প্রবেশ করলেন এবং বিবর্ণ অবস্থায় আমাদের নিকট এসে বললেন, তারা এই মাত্র আমাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বললাম, হে আমীরুল মু‘মিনীন! আল্লাহই তাদের বিরুদ্ধে আপনার জন্য যথেষ্ট। তিনি প্রশ্ন করলেন, তারা আমাকে হত্যা করবে কেন? আমি তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তিনটি অপরাধের কোনো একটি ব্যতীত মুসলিম ব্যক্তির রক্তপাত করা হালাল নয়ঃ (১) ইসলাম গ্রহণের পর পুনরায় কুফরীতে ফিরে যাওয়া, (২) বিবাহিত ব্যক্তির যেনায় লিপ্ত হওয়া এবং (৩) হত্যার অপরাধী না হওয়া সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করলে। আল্লাহর কসম! আমি জাহিলী যুগে এবং ইসলামী যুগেও কখনো যেনা করিনি। আল্লাহ আমাকে হিদায়াত দান করার পর থেকে আমি মোটেই অন্য ধর্ম গ্রহণ পছন্দ করি না এবং আমি কোনো মানুষকে হত্যা করিনি। অতএব তারা কেন আমাকে হত্যা করবে? [সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং-৪৫০২]

সাহাবা কর্তৃক মুরতাদ হত্যা

রাসূল সাঃ এর ওফাতের পর ইয়ামেন ও নজদে মুরতাদ হওয়ার ফিতনা প্রবল আকার ধারণ করে। অনেক লোক মুসায়লামা কাজ্জাব ও সাজ্জাহের নবুওয়ত মেনে মুরতাদ হয়ে যায়। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ ইরতিদাদের এ ফিতনারোধে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়ালেন। হযরত ইকরিমা বিন আবী জাহাল রাঃ কে সেখানে পাঠানোর সময় নসীহত করলেন যে, وَمَنْ لَقِيتَهُ مِنَ الْمُرْتَدَّةِ بَيْنَ عُمَانَ إِلَى حَضْرَمَوْتَ وَالْيَمَنِ فَنَكِّلْ بِهِ، তথা “আম্মান থেকে হাজরামাওত এবং ইয়ামান পর্যন্ত যত মুরতাদ পাবে সবক’টিকে হত্যা করবে”। {আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৫/৩৬৩}

২–

عن سعيد بن عبد العزيز : أن أبا بكر قتل أم قرفة الفزارية في ردتها

হযরত সাঈদ বিন আব্দুল আজীজ থেকে বর্ণিত। হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ উম্মে কিরফাকে মুরতাদ হওয়ার অপরাধে হত্যা করেন। {সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-১১০, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-১৬৬৪৯}

৩–

كتب عمرو بن العاص إلى عمر يسأله عن رجل أسلم ثم كفر ثم أسلم ثم كفر حتى فعل ذلك مرارا أيقبل منه الإسلام فكتب إليه عمر أن اقبل منه الإسلام ما قبل الله منهم اعرض عليه الإسلام فإن قبل فاتركه وإلا فاضرب عنقه”

হযরত আমর বিন আস রাঃ হযরত ওমরের কাছে লিখলেন যে, এক লোক ইসলাম গ্রহণ করে আবার কাফের হয়, তারপর আবার ইসলাম গ্রহণ করে, তারপর আবার কাফের হয়, এভাবে সে কয়েকবার করে, তার ইসলাম কি কবুল করা হবে? তখন হযরত ওমর রাঃ লিখলেন যে, যতক্ষণ আল্লাহ তাআলা তার ইসলাম গ্রহণ করেন, তুমিও তার ইসলামকে গ্রহণযোগ্য মান, তাই তুমি তার সামনে ইসলাম পেশ কর, যদি গ্রহণ করে তাহলে ছেড়ে দাও, নতুবা হত্যা কর। {কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফআল, হাদীস নং-১৪৬৭}

৪–

أن عثمان بن عفان كان يقول: “من كفر بعد إيمانه طائعا فإنه يقتل”

হযরত উসমান বলেন যে, যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর ইচ্ছেকৃত কুফরী করে, তাকে হত্যা করা হবে। {কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-১৪৭০}

৫-

عن علي قال “يستتاب المرتد ثلاثا فإن عاد قتل”

হযরত আলী রাঃ বলেন, মুরতাদকে তাওবা করতে তিনবার বলা হবে, তওবা না করলে, তাকে হত্যা করা হবে। {কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-১৪৭৫}

أَخَذَ ابْنُ مَسْعُودٍ قَوْمًا ارْتَدُّوا عَنِ الْإِسْلَامِ مِنْ أَهْلِ الْعِرَاقِ فَكَتَبَ فِيهِمْ إِلَى عُمَرَ فَكَتَبَ إِلَيْهِ: «أَنْ اعْرِضْ عَلَيْهِمْ دِينَ الْحَقِّ , وَشَهَادَةَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ , فَإِنْ قَبِلُوهَا , فَخَلِّ عَنْهُمْ , وَإِنْ لَمْ يَقْبَلُوهَا , فَاقْتُلْهُمْ , فَقَبِلَهَا بَعْضُهُمْ , فَتَرَكَهُ , وَلَمْ يَقْبَلْهَا بَعْضُهُمْ , فَقَتَلَهُ»

ইবনে মাসঊদ রাঃ ইরাকের একদল লোককে পাকড়াও করলেন, যারা ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়ে গেছে। তখন তিনি এ বিষয়ে উমর রাঃ এর কাছে পত্র পাঠালেন। উমর রাঃ জবাব দিলেন, তাদের কাছে ইসলাম পেশ কর, কালিমায়ে শাহাদত পেশ কর। যদি গ্রহণ করে তাহলে ছেড়ে দাও। আর যদি গ্রহণ না করে, তাহলে তাদের হত্যা কর। তারপর তাদের কতিপয় গ্রহণ করলে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়, আর কতিপয় লোক অগ্রাহ্য করে, তাদের হত্যা করা হয়। [মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক-১০/১৬৮, হাদীস নং-১৮৭০৭]

উম্মতের ইজমা

واتفق الأئمة الأربعة عليهم رحمة الله تعالى على أن من ثبت ارتداه عن الاسلام، والعياذ بالله، وجب قتله، واهدر دمه (الفقه على مذاهب الأربعة-5/372، 5/423)

চার ইমাম এ বিষয়ে একমত যে, যার ব্যাপারে ইসলাম থেকে ইরতিদাদ প্রমাণিত হবে, তাকে হত্যা করা আবশ্যক। তার রক্ত হালাল হয়ে যায়। [আলফিক্বহু আলা মাযাহিবিল আরবাআ-৫/৩৭২]

আরো দেখুন: আলফিক্বহুল ইসলামী ওয়াআদিল্লাতুহু-৬/১৮৬, মাওসূআতুল ইজমা-১/৪৩৬]

 

যুক্তির নিরিখে মুরতাদের শাস্তি

মুরতাদের শাস্তির বিষয়টি ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত। যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র নেই, সেখানে এ অন্যান্য শরয়ী শাস্তি বিধানের মতই মুরতাদের শাস্তিও প্রয়োগ করা হবে না।

কিন্তু যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে। সেখানে ইসলামের অন্যান্য হুদুদের সাথে মুরতাদের শাস্তি বিধানও প্রয়োগ হবে।

কোন রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণে কাউকে বাধ্য করা হয় না। কিন্তু নাগরিকত্ব গ্রহণ করে, সেই রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সেখানে বসবাস করার অধিকার তাকে দেয়া হয় না। এটা উক্ত রাষ্ট্রকে অপমান করা।

তেমনি ইসলামে প্রবেশে কাউকে বাধ্য করা হয় না। কিন্তু প্রবেশ করে তাকে অপমান করে বের হয়ে গেলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

সেনাবাহিনীতে ঢুকতে কাউকে বাধ্য করা হয় না। কিন্তু প্রবেশ করে হঠাৎ করে কেউ বের হতে পারে না। বের হলে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

ইসলাম একটি কমপ্লিট জীবন ব্যবস্থা। এখানে প্রবেশে কাউকে বাধ্য করা হয় না, কিন্তু প্রবেশ করে বেরিয়ে গেলে তাকে মার্শাল লয়ের আওতাধীন হত্যা করা হয়।

কোন রাষ্ট্রে বসবাস করে সেই রাষ্ট্রের আইন অমান্য করার দুঃসাহস করলে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। যদি দেশত্যাগ করে তাহলে রক্ষা পায়।

তেমনি ইসলাম ত্যাগ করে যদি কেউ অন্য রাষ্ট্রে চলে যায়, তাহলে সেও হত্যা থেকে বেঁচে যায়।

কোন বাহিনীতে প্রবেশের পর তাকে অবজ্ঞা করে বের হয়ে গেলে তাকে নিয়ে নিরাপত্তা সংশয় তৈরী হয়, তাই তাকে হত্যা বা বন্দী করে রাখা হয় গোয়েন্দাগিরীর সন্দেহে।

তেমনি ইসলামে প্রবেশের পর বের হয়ে গেলে সে ইসলামের অপপ্রচারে লিপ্ত হবার সংশয় তৈরী হয়, তাই তাকে হত্যা করার বিধান আরোপ করা হয়েছে।

ইসলাম আলাদা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা আলাদা এমন নয়। তাই মুরতাদের শাস্তিটা শুধু ইসলাম ত্যাগ মুখ্য নয়, বরং ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবার শংকাও প্রধানতম কারণ।

 

বিশ্বের অমুসলিমকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হচ্ছে?

হাসান মাহমুদ সাহেব মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্ত দিয়ে লেখেন:

“কোরানের অপব্যাখ্যা করে বিশ্ব মুসলিমকে কি ভয়ানকভাবে পৃথিবীর সমস্ত অমুসলিমদের বিপক্ষে যুদ্ধাংদেহী করে দাঁড় করানো হয়েছে দেখলে আতঙ্কিত হতে হয়। [শারিয়া কি বলে-২৬]

উত্তর

মুরতাদকে মৃত্যুদণ্ড দেবার সাথে বিশ্বের সকল অমুসলিমকে কিভাবে প্রতিপক্ষ বানানো হচ্ছে এটাতো বুঝে আসলো না। তিনি কি পাগল নাকি অপ্রকৃতিস্থ?

ইসলাম অমুসলিমদের অহেতুক হত্যা করার কথা বলে না কখনোই। বরং তাদের যথার্থ অধিকার দেবার কথা বলে। এর সাথে ধর্মদ্রোহী মুরতাদকে শাস্তি দেয়ার কি সম্পর্ক?

তাহলে কোন রাষ্ট্র যদি তার বিদ্রোহীকে হত্যা করার বিধান রাখে, এর মানে সে কি পুরো বিশ্বকে তার প্রতিপক্ষ বানালো? এটা কেমন আহমকী কথা?

 

হাসান মাহমুদের পাগলামী!

হাসান মাহমুদ লিখেন:

কোরাণ সুরা আরাফ-এর আয়াত ১৭২-কে অপব্যাখ্যা করে বলা হয়, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ মুসলমান হয়ে জন্মায় (বহু সূত্র, এবং দৈনিক ইনকিলাব, ১৫ই মে, ২০০৬)।

যাঁরা এ অপব্যাখ্যা করেন তাঁরা কি খেয়াল করেছেন, এ-ব্যাখ্যায় পৃথিবীর প্রতিটি অমুসলিম ‘মুরতাদ’ হিসেবে শারিয়া মোতাবেক হত্যার যোগ্য ?

উত্তর

মুসলমান হয়ে জন্মায় একথা অপব্যাখ্যা হবে কে না? এটাতো হাদীসের কথা।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ، أَوْ يُنَصِّرَانِهِ، أَوْ يُمَجِّسَانِهِ

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহুদী বা খৃষ্টান অথবা অগ্নি উপাসকরূপে রূপান্তরিত করে। [বুখারী, হাদীস নং-১৩৮৫]

সুতরাং একথাকে কুরআনের অপব্যাখ্যা বলাটা গোয়ার্তুমী ছাড়া আর কী?

আর পরের কথাটা সরাসরি মূর্খতা। কারণ, মুরতাদ হবার প্রশ্ন আসে, ইসলাম মেনে নেবার পর ইসলাম ত্যাগ করা। আর শিশুর উপর কোন বিধানই আরোপ হয় না। প্রাপ্ত বয়স্ক হবার পর তার সাথে ইসলাম ও কুফরের সম্পর্ক যুক্ত হয়।

আর প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হতে সেতো বিধর্মীই হয়ে যায়, তার পরিবার ও তার পারিপার্শিকতার কারণে। সুতরাং অমুসলিম পরিবারের সন্তানের ক্ষেত্রে মুরতাদ হবার বিষয়ইতো প্রমাণিত হয় না।

সুতরাং এমন হাস্যকর কথা বলার মানে কি?

আজ যাঁরা মুরতাদ ঘোষণার হুঙ্কার দেন তাঁদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই নবীজীর বড় বেদনা বড় কষ্টের সেই উচ্চারণ ঃ ‘তুমি কি তাহার বক্ষ চিরিয়া দেখিয়াছ ?’ কলমার দায় হইতে কে তোমাকে রক্ষা করিবে, হে মুরতাদ-ঘোষণাকারী ? [শারিয়া কি বলে-২৬]

উত্তর

না, আমরা দেখি নাই। এ কারণেই যারা আপনার মত মুখে কালিমা মানার কথা বলে, তাদের মুরতাদ সরাসরি বলি না। কিন্তু কুরআন ও হাদীসের অপব্যাখ্যার কারণে যিন্দীক বলি।

পর্ব-৬ পড়তে ক্লিক করুন

আরও জানুন

আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে নেমে আসেন একথার অর্থ কী?

প্রশ্ন Md Samsuddoha Sharif আমার জানার বিষয় হলো ঃ হযরত, আল্লাহ তাআলা শেষ রাতে ১ম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস