প্রচ্ছদ / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / ইসলামের ইতিহাস পাঠ [পর্ব-১৩] ইবনে যিয়াদের নিয়োগ ও মুসলিম বিন আকীলের শাহাদত

ইসলামের ইতিহাস পাঠ [পর্ব-১৩] ইবনে যিয়াদের নিয়োগ ও মুসলিম বিন আকীলের শাহাদত

আবূ মুয়াবিয়া লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

আগের লেখাটি পড়ে নিন- কুফাবাসীর চিঠি ও হুসাইন রাঃ এর কুফার পথে যাত্রা

কুফায় অবস্থার পরিবর্তন ও আব্দুল্লাহ বিন যিয়াদের নিয়োগ

মুসলিম বিন আকীলের পত্র পৌঁছতে তিন চার সপ্তাহ লেগেছে। এর মাঝে কুফার অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। যে ব্যাপারে হযরত হুসাইন রাঃ কিছুই জানতেন না।

ঘটনা হল, কুফার কঠোরমনস্ক লোকেরা গভর্ণর মুসলিম বিন আকীল বিষয়ে নুমান বিন বশীর রাঃ এর কোমল আচরণ পছন্দ করছিল না। প্রথমে তাকে নানা কথা বলে ক্ষুব্ধ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু নুমান বিন বশীরের অবিচলতা থেকে তারা ইয়াযিদের কাছে এ বিষয়ে নালিশ দিয়ে চিঠি পাঠায়। আজগুবি ও বানোয়াট কথা মিশ্রিত পত্রে ইয়াযিদকে ক্ষিপ্ত করা। যাতে করে তিনি নুমানকে বরখাস্ত করেন।

প্রথম পত্রটি পাঠায় এক খৃষ্টান। যার ব্যাপারে ইয়াযিদ ছিল বেখবর।

ইয়াযিদ ওদের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে নুমান বিন বশীরের মত বয়োজেষ্ঠ এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বুযুর্গ ব্যক্তিকে বরখাস্ত করে দেয়। বসরার গভর্ণর উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে বসরার সাথে কুফার নতুন গভর্ণর হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করে।
উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ ছিল কঠোর হৃদয়ের অধিকারী এবং দায়িত্ব পালনে ছিল কট্টর।
উবায়দুল্লাহ দায়িত্ব পেতেই বসরা থেকে কুফায় চলে আসে। এ সময় মুসলিম বিন আকীল শহরের এক সরকারী আমীর হানী বিন উরওয়াহ এর ঘরে ছিলেন। উবায়দুল্লাহ গোয়েন্দা মারফত এ সংবাদ জানতেই হানী বিন উরওয়াহকে ডেকে পাঠান।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মুসলিম বিন আকীল কোথায় তা বলতে অস্বিকৃতি জানান। এতে উবায়দুল্লাহ ক্ষীপ্ত হয়ে তাকে জেলে বন্দী করেন।

মুসলিম বিন আকীলকে হত্যা

এ পরিস্থিতিতে মুসলিম বিন আকীলও একটি মারাত্মক ভুল করে বসেন। যার ফলে পুরো ঘটনাই পাল্টে যায়। তিনি তার মেজবান হানী বিন উরওয়াহকে জেল থেকে উদ্ধার করতে অস্ত্রসহ চার হাজার লোক নিয়ে ময়দানে নেমে আসেন। [তারীখে তাবারী-৫/৩৯১, ৫/৩৪৯-৩৫০, আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৫৪, ৮/২৯২ বাংলা]

যখন এ বিশাল বাহিনী নিয়ে গভর্ণরী ভবনের দিকে রওনা হন তখন শুরুতে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু দ্রুতই কুফার পুরানো প্রতারণার অভ্যাস প্রকাশ পেয়ে যায়।

মুসলিম বিন আকীল যখন আক্রমণ করতে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন একে একে তার সাথে শরীক কুফী শিয়ারা সটকে পড়তে শুরু করে।
মা তার ছেলের কাছে, বোন তার ভাইয়ের কাছে এসে বলতে লাগল, বাড়িতে ফিরে চল। লোকেরা তোমাদের বাঁধা দিবে। তদ্রুপ পিতা পুত্রকে এবং ভাই ভাইকে বলতে লাগল, কাল যখন শামের ফৌজ এসে পৌঁছবে তখন তুমি কিভাবে তাদের হাত থেকে নিস্তার পাবে? তখন লোকেরা মুসলিম বিন আকীলকে অসহায় অবস্থায় রেখে একে একে তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সরে পড়ল এবং দেখা গেল তাঁর সাথে পাঁচশ যোদ্ধা বাকি আছে।

এরপর তাদের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে তিনশ” তারপর ত্রিশে দাঁড়াল। তিনি তাদেরকে নিয়ে মাগরিব নামায পড়লেন এবং আবওয়াবে কিন্দা অভিমুখী হলেন। আর সেখান সেখান থেকে দশজন নিয়ে বের হলেন। তারপর এরাও সটকে পড়ল। তখন তিনি সম্পূর্ণ একাকী হয়ে পড়লেন। তাঁর সাথে না থাকলো পথ দেখানোর মত কেউ, কিংবা অন্তরঙ্গতা দান করার মত কেউ, কিংবা নিজ গৃহে আশ্রয় দান করার মত কেউ।

তখন তিনি অজানা গন্তব্যের পথে বেরিয়ে পড়লেন। আর এদিকে অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে আসছিল। আর তিনি উদ্দেশ্যহীনভাবে একাকী রাস্তায় পথ চলছিলেন।

এভাবে তিনি এক গৃহদ্বারে এসে উপস্থিত হলেন। করাঘাত করলে ত্বওয়া নামক এক স্ত্রীলোক বের হল, আর সে ছিল আল আশআছ বিন কায়েশের ঐরষে সন্তান জন্মদানকারিণী বাঁদী। তিনি পানি চাইলেন। পানি পান করে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর বান্দী! এই শহরে আমার কোন বাড়ি ঘর কিংবা স্বজন পরিজন কেউ নেই। তোমার কি আমার প্রতি একটু সদাচার ও অনুগ্রহ করার সুযোগ আছে? যার পুরস্কার আমি পরে তোমাকে দিবো। কুফার লোকেরা আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। আমার সাথে মিথ্যা বলেছে।
তখন উক্ত বাঁদী নিজ গৃহে মুসলিমকে আশ্রয় দেন। নিরাপদ ঘরে থাকতে দেন।

ত্বওয়ার ছেলে এসে যখন বিষয়টি জানল। তখন পরদিন সকালে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ পর্যন্ত এ খবর জানিয়ে দিল।

উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ মুসলিম বিন আকীলকে পাকরাও করে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ছাদ থেকে ফেলে দেয়। হানী বিন উরওয়াকেও হত্যা করে। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৫৫-১৫৭, আরবী, ৮/৩৯৩-৩৯৭, বাংলা, তারীখে তাবারী-৫/৩৯২, ৫/৩৫০]

ইয়াযিদের কাছে হুসাইন রাঃ এর রওনার সংবাদ ও মারওয়ানের পত্র

হেযাজের গভর্ণর আমর বিন সাঈদ হযরত হুসাইন রাঃ এর রওনা হতেই দারুল খিলাফাহ দামেশকে ও কুফায় সংবাদ দিয়ে লোক পাঠিয়ে দেন। তিনি উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে লেখেন যে, হুসাইন রাঃ তোমার দিকে আসছে। [তারীখে দামেশক-৪/২১২]

মারওয়ান বিন হাকামও উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে এ সংবাদ পাঠান। তবে সাথে সাথে পত্রযুগে লিখে পাঠান যে, হুসাইন রাঃ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে ফাতিমা রাঃ এর ছেলে। আল্লাহর কসম! আমাদের কাছে হুসাইন রাঃ এর চেয়ে প্রিয় কেউ নাই। খবরদার! জোশের বশে এমন কিছু করে বসো না, যে কাজের কোন ক্ষতিপূরণ করা না যায়। আর লোকদের তা ভুলানো না যায়। [তারীখে দামেশক-৪/২১২]

মারওয়ান বিন হাকামের উক্ত পত্র দ্বারা বুঝা যায় যে, বনু উমাইয়ার জ্ঞানী গুণী ও লোকেরা হযরত হুসাইন রাঃ কে সম্মান ও ইজ্জত করতো।

কিন্তু আফসোস হল, উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ এসব জ্ঞানী ও সমঝদার ব্যক্তিদের পরামর্শ কানে নেয়নি। বড়দের সম্মান করা তার আদতের মাঝেই ছিল না। সে ছিল সৈনিকের ছাঁচে গড়া এক যন্ত্রমানব। মারওয়ানের মত বয়োজেষ্ঠ্য উময়ী আমীরের কথার কোন গুরুত্বও তার কাছে ছিল না।

উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের প্রতি ইয়াযিদের পত্র

সে সময় ইয়াযিদ উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে ফরমান পাঠায়। তাতে লিখে যে, আমার কাছে সংবাদ এসেছে যে, হুসাইন রাঃ কুফার দিকে আসছেন। হুসাইন রাঃ এর বিষয়ে সব সময়ের মাঝে তোমার সময়টা, সকল শহরের মাঝে তোমার শহর, সকল গভর্ণরদের মাঝে তুমিই বড় পরীক্ষার সম্মুখীন। এমন পরীক্ষা পতিত হয়েই লোকেরা উন্নতী অর্জন করে অথবা গোলামদের মত লাঞ্ছিত হয়ে যায়। [আলমু’জামুল কাবীর-৩/১১৫]

মুসলিম বিন আকীলকে হত্যা করায় শাবাশী দিয়ে ইয়াযিদ লিখেন:

গোয়েন্দা এবং সশস্ত্র পাহারাদারদের সতর্ক রাখো। যাদেরই সন্দেহ হয় গ্রেফতার করো। যাদের উপর অভিযোগ আছে তাদের পাকড়াও করো। কিন্তু হত্যা কেবল তাকেই করবে, যে তোমার সাথে যুদ্ধ করে। আর আমাকে ঘটমান সকল কিছু জানাতে থাকবে। [তারীখে তাবারী-৫/৩৮১]

ইয়াযিদের উক্ত পত্র প্রমাণ করে যে, ইয়াযিদ হযরত হুসাইন রাঃ এর কাফেলায় স্বপ্রণোদিত হয়ে কোন প্রকার ধর-পাকড় করতে আদেশ দেননি। বরং যদি অভিযোগ পাওয়া যায়, বা সন্দেহযুক্ত কাজ করে তাহলেই কেবল পাকড়াও করবে। আর তারা যুদ্ধ না করলে তাদের সাথে হত্যার মত কাজ না করতেও নির্দেশ প্রদান করা হয়।
ইয়াযিদ হয়তো ইবনে যিয়াদকে এতটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করেছে। অথচ ইবনে যিয়াদের মত পাথর দিলের মানুষের জন্য এতটুকু বলা যথার্থ ছিল না।

ইয়াযিদের উচিত ছিল একথা জানানো যে, যদি খারাপ কিছুর সম্ভাবনা হয়, তাহলে যেন হযরত হুসাইন রাঃ কে নিরাপত্তার সাথে তার কাছে দামেশকে পাঠিয়ে দেয়।
কিন্তু এভাবে স্পষ্ট কিছু না বলা ইয়াযিদের অপূরণীয় ভুল বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।

ইয়াযিদের কার্যক্রম

মুসলিম বিন আকীলকে হত্যা করা পর উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের প্রথম প্রচেষ্টা এই ছিল যে, কুফার অবস্থা সম্পর্কে হযরত হুসাইন রাঃ কে সম্পূর্ণ বেখবর রাখা। এ লক্ষ্যে সে কুফা থেকে বসরা পর্যন্ত এবং শাম পর্যন্ত কড়া মূল রাস্তাগুলোতে এতোটাই কড়া পাহারা বসায় যে, প্রায় এক মাস জুড়ে হযরত হুসাইন রাঃ পর্যন্ত কুফার খবর জানাতে যেতে এ এলাকা অতিক্রম করতে পারেনি। আরব থেকে আসা কেউ যাচাই বাছাই ছাড়া এ এলাকায় ঢুকতে পারেনি।
মুসলিম বিন আকীলকে জিলহজ্জ্ব মাসের ৮ তারিখ শহীদ করা হয়। এর কয়েকদিন আগেই হযরত হুসাইন রাঃ কুফার উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বের হয়ে পড়েন। তার এটা জানা ছিল না যে, কুফার গভর্ণরের আসনে এখন কোমল হৃদয়ের অধিকারী নুমান বিন বশীর রাঃ নয়, বরং পাথর দিলের অধিকারী যন্ত্রমানব উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ বসে আছে।
যদি এতোটা কড়া পাহারা না হতো, তাহলে হয়তো মক্কার সীমানা পাড় হবার আগেই হুসাইন রাঃ এর কাছে কুফার প্রকৃত অবস্থা জানা হয়ে যেতো। কিন্তু কড়া চেকিং এর কারণে কেউ এ সংবাদ জান্নাতের সর্দারের কানে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে তিনি তার কাফেলা নিয়ে আগে বাড়তে লাগলেন। [তারীখে তাবারী-৫/৩৯২]

মুসলিম বিন আকীলের হত্যার সংবাদ

ইরাকের সীমান্তের কাছে এসে হুসাইন রাঃ সংবাদ পান যে, মুসলিম বিন আকীলকে হত্যা করা হয়েছে। [তারীখে তাবারী-৫/৩৮৯]

কুফায় এখন নতুন গভর্ণর উবাদুল্লাহ বিন যিয়াদ। সে কঠোরতার সাথে রাষ্ট্রের সাথে বিদ্রোহকারী ও সহযোগীদের দমন করছে।
সেই সাথে হুসাইন রাঃ জেনে গেলেন কুফার শিয়াদের প্রতারণা ও গাদ্দারী সম্পর্কেও। যারা চিঠি দিয়ে, দাওয়াত দিয়ে, বড় বড় ওয়াদা কুফায় দাওয়াত দিয়েছিল তাদের। কিন্তু মুসলিম বিন আকীলকে একা রেখে সবাই পালিয়েছে।
এমন কি তিনি এতোটাই অসহায় ও নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন যে, রাস্তা জিজ্ঞাসা করার মত কোন সাথী পর্যন্ত পাননি। অবশেষে কথিত শিয়ানে আলীদের সংবাদের ভিত্তিতেই গ্রেফতার হয়ে নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেন মুসলিম বিন আকীল।
হযরত মুসলিম বিন আকীল মুহাম্মদ বিন আশআছকে হুসাইন রাঃ এর কাছে তার পক্ষ থেকে এ সংবাদ জানাতে বলেন যে,

ارجع بأهل بيتك، وَلا يغرك أهل الْكُوفَة فإنهم أَصْحَاب أبيك الَّذِي كَانَ يتمنى فراقهم بالموت أو القتل، إن أهل الْكُوفَة قَدْ كذبوك وكذبوني،

তুমি পরিবার পরিজন নিয়ে ফিরে যাও। তুমি কুফাবাসীর ধোঁকায় পড়ো না। কেননা এরাই তারা যারা নিজেদের আপনার পিতার সাথী পরিচয় দিতো। যাদের থেকে মুক্তি পেতে আপনার পিতা মরে যেতে বা নিহত হওয়ার তামান্না করতেন। নিশ্চয় এ কুফাবাসী আপনার সাথে মিথ্যা বলেছে এবং আমার সাথেও মিথ্যা বলেছে। [তারীখে তাবারী-৫/৩৭৫, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া-৮/১৫৯]

হুসাইন রাঃ মুসলিম বিন আকীলের উক্ত সংবাদ শুনে কুফাবাসীর গাদ্দারী বুঝে যান। তাই তিনি ফিরে যেতে মনস্ত করলেন।
কিন্তু যখনি তিনি ফিরে যাবার প্রস্তুত নিচ্ছেন তখন মুসলিম বিন আকীলের যে স্বজনরা তার সফরসঙ্গী ছিলেন তারা জোশের সাথে বলতে লাগলেন:

“আল্লাহর কসম! আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম বিন আকীলের খুনের বদলা না নিবো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ফিরে যাবো না। যদিও সবাই শহীদ হয়ে যাই”। একথা শুনে হুসাইন রাঃ বললেন, তোমাদের ছাড়া আমার বেঁচে থেকে কী ফায়দা? [তারীখে তাবারী-৫/৩৮৯]

হুসাইন রাঃ মুসলিম বিন আকীলের শহীদ হবার খবর শুনে ফিরে যাবার বিষয়টি শিয়াদের লিখিত গ্রন্থাবলীতেও স্পষ্ট শব্দে উদ্ধৃত হয়েছে।
যেমন: জালাউল উয়ূন, মোল্লা বাকের মাজলিসীকৃত-১/২৬৩, নাসেখুল তাওয়ারীখ, লিসানুল মুলক মীর্যা মুহাম্মদ তক্বীকৃত-২/৩২১]

শিয়া ঐতিহাসিকরাও একথা স্বীকার করে যে, মুসলিম বিন আকীলের শাহাদাতের সংবাদ শুনে হযরতে হুসাইন রাঃ মক্কায় ফিরে যেতে চাইলেন। কারণ, তিনি বুঝে গেছেন যে, শিয়ারা ধোঁকা দিয়েছে। ভবিষ্যতেও এমন করবে। তাই ফিরে যাওয়াই অধিক উপযোগী। কিন্তু মুসলিম বিন আকীলের ভাই বেরাদারদের জন্য ফিরতে পারেননি।

এখানে ভাবনার বিষয় হল, যদি হুসাইন রাঃ এর কুফায় আগমণের উদ্দেশ্য মৃত ইসলামকে জিন্দা করা, দ্বীন রক্ষার জন্য হয়ে থাকে, তাহলে মুসলিম বিন আকীলের মৃত্যু সংবাদ শুনে ফিরে যেতে মনস্থ করলেন কেন?

বরং আরো জোশের সাথেই বলা উচিত ছিল যে, আমার ভাই শহীদ হয়েছে তো কী হয়েছে। আমি আমার অবস্থানে অনড়। যতক্ষণ না দ্বীন জিন্দা হবে, আমরা আমাদের অবস্থানে অনড় ও অবিচল থাকবো।

সুতরাং কারবালার ঘটনার মাধ্যমে ইসলাম জিন্দা করা মাকসাদ ছিল না। বরং পরিবারতন্ত্র যেন প্রতিষ্ঠা না পায়, তা থেকে বাঁধা দেয়াই কেবল মাকসাদ ছিল। ইয়াযিদের ফাসিক হওয়ার বিষয়টি তখন পর্যন্ত পরিস্কার ছিল না।

এ সময় কুফা থেকে আসা সফরসঙ্গী ৬০ শিয়ারা আশ্বাস দিয়ে বলে যে,
“আল্লাহর শপথ, নিশ্চয়ই আপনি মুসলিমের চাইতে বেশী মর্যাদা রাখেন। আপনি যদি কুফায় যান জনগণ আপনার ডাকে সাড়া দিবে”। [শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস-১৪৭]

কুফী শিয়ারা যে কোন মূল্যে হুসাইন রাঃ কে কুফায় নেবার জন্য মরিয়া ছিল।

হযরতে হুসাইন রাঃ অনিচ্ছা সত্ত্বেও কুফার দিকে আবার যাত্রা করলেন। আলমুগীছা অঞ্চল থেকে একটু সামনে কুফা জেলার সীমান্তে পৌঁছে গেলেন। যেখানে ইবনে যিয়াদের বাহিনী পাহারায় নিয়োজিত ছিল। এখানেই হযরত হুসাইন রাঃ এর সাথে ইবনে যিয়াদের সেনা কমান্ডার হুর বিন ইয়াযিদের সাথে সাক্ষাৎ হয়। [তারীখে তাবারী-৫/৩৮৯]

হুর বিন ইয়াযিদের পরামর্শ

হুর বিন ইয়াযিদ একজন ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি হযরত হুসাইন রাঃ এর কল্যাণকামী ছিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাচ্ছেন?
যখন কুফায় যাবার কথা শুনলেন, তখন খুব শক্তভাবে যেতে বারণ করলেন। বললেন, আপনি ফিরে চলে যান, সেখানে আপনার জন্য কল্যাণের আশা নেই।

এসব শুনে হযরত হুসাইন রাঃ কুফায় না গিয়ে দামেশকে গিয়ে ইয়াযিদের সাথে সাক্ষাৎ করার মনস্থ করলেন। তিনি এ সিদ্ধান্তে এতোটাই অটল ছিলেন যে, তিনি তৎক্ষণাৎ কুফার রাস্তা পাল্টে শামের দিকে রওনা করলেন। [তারীখে তাবারী-৫/৩৮৯] এর কারণ ছিল এই যে, হযরত হুসাইন রাঃ নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বুঝে গেলেন যে, ইয়াযিদের খেলাফত আসলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কুফার শিয়ারা তাকে ভুল তথ্য দিয়ে এখানে টেনে এনেছে। একটি প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের বিরোধীতা করাটা রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল।

সুতরাং তিনি শরয়ী সীমায় থেকে বিকল্প পন্থাকে বেছে নিলেন। চাইলেন যে, দামেশকে গিয়ে ইয়াযিদের সাথে মুলাকাত করতে। হতে পারে সরাসরি সাক্ষাতে ও আলাপচারিতায় উদ্দেশ্য অর্জিত হবে।

হুসাইন রাঃ এর সিদ্ধান্ত দ্বারা একথাও বুঝা যায় যে, ইয়াযিদের খেলাফতের মৌলিক কিছু ত্রুটি থাকার পরও শরীয়তে সুযোগ থাকার কারণে উম্মতের একতা ও ভ্রাতৃত্বের খাতিরে যেসব সাহাবাগণ ইয়াযিদকে খলীফা মেনে নিয়েছে তাদের মতামতটিকে তিনি সম্মান জানাতেন। যদিও তিনি নিজে আজীমতের উপর আমল করেছেন।

হুসাইন রাঃ এর কুফায় গমণটাও নেতৃত্ব দখল ছিল না। বরং সেই মৌলিক ভুলটিকে শোধরানো মাত্র। কুফায় গিয়ে তিনি লোকদের একত্র করে হয়তো একাজটিই করতে চাচ্ছিলেন।

কিন্তু পরিস্থিতি পরিবর্তিত দেখে তিনি সরাসরি ইয়াযিদের সাথেই এ বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনাকে জরুরী মনে করলেন।
এছাড়া আর কোন রাস্তাও অবশ্য ছিল না।

যদিও একথা স্পষ্ট ছিল যে, কুফা ও দামেশকের পলিসি একই হবে। উভয় স্থানেই হুসাইন রাঃ কে রাষ্ট্রদ্রোহী মনে করা হচ্ছে।

কিন্তু হুসাইন রাঃ ইবনে যিয়াদের কঠোর নীতি দেখে তিনি বুঝে গেছেন যে, ইয়াযিদ আমার সাথে ইবনে যিয়াদের মত এমন কঠোরতা করবে না। কোন সিদ্ধান্ত নেবার আগে অন্তত আমার মতামত জানতে চাইবে। যা ইবনে যিয়াদের ক্ষেত্রে ভাবা যায় না।
হযরতে হুসাইন রাঃ এর ইয়াযিদের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক ও যথার্থ ছিল। এ কারণেই হযরত হুসাইন রাঃ এর শাহাদতের পর ইয়াযিদ বলতেন যে, ‘আমার কি বিগড়ে যেতো যদি আমি কিছু কষ্ট সহ্য করে নিতাম। হুসাইন রাঃ কে নিজের ঘরে ডেকে নিতাম। তিনি যা চান তাই নিতে তাকে ক্ষমতা দিতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মীয় এর হক এর এটাইতো তাকাযা ছিল। যদিও তাতে আমার হুকুমতের শক্তি ও শওকত হ্রাসই পেতো’। [তারীখে তাবারী-৫/৫০৬]

হুসাইন রাঃ কুফার রাস্তা রেখে দামেশকের দিকে প্রায় ৪৫ মাইল সাড়ে ৭২ কিলোমিটার সফর করে কারবালা নামক স্থানে এসে পৌঁছে গেলেন। যা কুফা থেকে দামেশ যাবার মহাসড়কে অবস্থিত। ফুরাত নদীর পাড়ও ছিল নিকটে। [তারীখে তাবারী-৫/৩৯২]

পরের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

আরও জানুন

মাযহাব কখন গ্রহণীয় আর কখন বর্জনীয়?

প্রশ্ন ‘মাজহাব’ কি সর্ব অবস্থায় গ্রহণীয়? যদি গ্রহণীয় না হয়, তাহলে ঠিক কোন কোন অবস্থায় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস