প্রচ্ছদ / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / ইসলামের ইতিহাস পাঠ [পর্ব-১২] কুফাবাসীর চিঠি এবং হুসাইন রাঃ এর কুফার পথে যাত্রা

ইসলামের ইতিহাস পাঠ [পর্ব-১২] কুফাবাসীর চিঠি এবং হুসাইন রাঃ এর কুফার পথে যাত্রা

আবূ মুয়াবিয়া লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

আগের লেখাটি পড়ে নিন: নেতৃস্থানীয় সাহাবা ও  তাবেয়ীগণের ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত

হযরত হুসাইন রাঃ এর নামে কুফার শিয়াদের পত্র

কুফাবাসী শিয়ারা অসংখ্য চিঠি হযরত হুসাইন রাঃ এর কাছে প্রেরণ করে।

শিয়াদের প্রকাশিত শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস এর মাঝে আসছেঃ-

“আর কুফার জনগণের বিষয়ে, যখন তারা মুয়াবিয়ার মৃত্যু সংবাদ পেলো তারা ইয়াযিদ সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করতে শুরু করল। এছাড়া তারা জানতে পেরেছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) ইয়াযীদের প্রতি আনুগত্যের শপথ করতে অস্বিকার করেছেন এবং মক্কায় চলে গিয়েছেন। আর আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরও মক্কায় পালিয়ে গেছে তার সাথে এবং তার সাথে এবং তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

ইমামের শিয়ারা (অনুসারীরা) সুলাইমান বিন সুরাদ খুযাইর বাড়িতে জড়ো হয় মুয়াবিয়ার মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করতে এবং আল্লাহর প্রশংসা এবং তাসবীহ করতে। সুলাইমান উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘মুয়াবিয়ার মৃত্যু হয়েছে এবং ইমাম হুসাইন (আ.) ইয়াযীদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে অস্বীকার করেছেন ও মক্কায় চলে গিয়েছেন। তোমরা তার ও তার বাবার শিয়া (অনুসারী)। তাই যদি তোমরা তাকে সাহায্য কতে চাও ও তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে চাও তাকে চিঠি লিখো এবং তাকে এ বিষয়ে জানাও। কিন্তু যদি তোমরা ভয় পাও যে তোমরা ঢিলেমী করবে এবং পিছু হটবে তাহলে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না (তাকে এখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে)।’ প্রত্যেকেই ঐক্যবদ্ধভাবে শপথ করলো যে, তারা তাকে সাহায্য করবে এবং তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তার আদেশে এবং তাদের জীবনকে এগিয়ে দিবে কুরবান করতে। যখন সুলাইমান তা শুনলেন, তিনি তাদেরকে আহবান জানালেন ইমামকে চিঠি লেখার জন্য এবং তারা লিখলো। [কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ঢাকা এর সহযোগিতায় প্রকাশিত শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস-১/৬১, লেখক আব্বাস বিন মুহাম্মদ রেযা আলকুম্মী, অনুবাদ, মুহাম্মদ ইরফানুল হক]

এরপর তারা অসংখ্য চিঠি হযরত হুসাইন রাঃ এর কাছে প্রেরণ করে। যার মূল বক্তব্য ছিল-পুরো ইরাক ইয়াযিদের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত। শুধু কুফার মাঝেই এক লাখ অস্ত্রধারী লোক হুসাইন রাঃ এর সহযোগিতায় প্রস্তুত। [তারীখে তাবারী-৫/৩৯১]

শুধু তা’ই নয়, স্থানীয়রা ইয়াযিদ নির্ধারিত কুফার গভর্ণর নু’মান বিন বশীর রাঃ এ পিছনে জুমআর নামায পড়াও ছেড়ে দিয়েছে। লোকেরা হুসাইন রাঃ এর অনুরক্ত এবং তাকে ছাড়া কারো উপর ভরসা করছে না। [তারীখে তাবারী-৫/৩৪৭]

এরকম অসংখ্য পত্র লিখে হযরত হুসাইন রাঃ কে কুফায় আসার জন্য প্রলুব্ধ করছিল শিয়ারা।

শুধুমাত্র চিঠি পাঠিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি কুফাবাসী। পরপর চিঠির সাথে সাথে প্রতিনিধিদলও প্রেরণ করছিল হযরত হুসাইন রাঃ কে কুফায় আগমনের প্রতি উদ্ধুব্ধ করার জন্য। যেমন শিয়াদের লিখিত বইয়ের মাঝে এসেছে-

“তারা এ চিঠি দিলো উবায়দুল্লাহ বিন মুসমে হামাদানী এবং আব্দুল্লাহ বিন ওয়াল তাইমিকে এবং তাদেরকে দ্রুত যেতে বলল। তারা দ্রুত গেলো যতক্ষণ না তারা দশই রমযান মক্কাতে পৌঁছালো। এরপর কুফার লোকেরা দুদিন অপেক্ষা করলো এবং কায়েস বিন মুসাহহার সাইদাউই এবং আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ আরহাবি এবং আম্মারাহ বিন আব্দুল্লাহ সালুলিকে আবার পাঠালো একশত পঞ্চাশটি চিঠি দিয়ে যা এক, দুই, তিন অথবা চারজন লিখেছিলো।

এরপর আবার দু’দিন পর তারা হানি বিন হানি সাবেঈ এবং সাঈদ বিন আব্দুব্দুল্লাহ হানাফিকে দিয়ে একটি চিঠি পাঠালো যার বিষয়বস্তু ছিল এরকম: ‘আল্লাহর নামে যিনি সর্ব দয়ালু, সর্ব করুণাময়। হোসেইন বিন আলী (আ.) এর প্রতি তার অনুসারীদের, বিশ্বাসীদের এবং মুসলমানদের পক্ষ থেকে। আম্মা বা’আদ, লোকজন আপনার জন্য অপেক্ষা করছে এবং আর কোন মত পোষণ করবেন না, তাই দ্রুত আসুন, দ্রুত আসুন। আপনার উপর শাস্তি বর্ষিত হোক’।

আরেকটি চিঠি লিখেছিলো শাবাস বিন রাবঈ, হাজ্জার বিন আবজার আজালি, ইয়াযিদ বিন হুরেইস বিন রুয়েইম শাইবানি, উরওয়া বিন কায়েস আহমাসি, আমর বিন হাজ্জার যুবাইদি এবং মুহাম্মদ বিন আমর তামিমি, যার বিষয় ছিলো এরকম: ’ আম্মা বাআদ, বাগানগুলো সবুজ রং ধারণ করেছে এবং ফলগুলো পেকেছে। যদি আপনি চান, এখানে আসতে পারেন, সেনাদল আপনাকে রক্ষায় প্রস্তুত’।” [শিয়াদের লিখিত ‘শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস-১ম, পৃষ্ঠা-৬২]

উপরোক্ত পত্রাবালীর বিবরণ এবং প্রতিনিধিদলের বক্তব্য জানাচ্ছিল যে, হুসাইন রাঃ দ্রুত ইরাক এসে পরিস্থিতি শামাল না দিলে পুরো ইরাকে ব্যাপক হত্যাকা- শুরু হয়ে যাবে। কারণ, এখানকার অপরিপক্ক বুদ্ধির অধিকারীরা অধৈর্য হয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসবে। ফলে রক্তের বন্যা বইবে পুরো ইরাক জোরে।

হযরত হুসাইন রাঃ স্বীয় পিতার মত চিন্তা করলেন যে, গোঁয়ার টাইপের মুর্খ লোকদের দূরে ঠেলে না দিয়ে তাদের কাছে টেনে বুঝিয়ে সমঝিয়ে হক পথে রাখাটাই অধিক উপযোগী। যারা পাগলপাড়া হয়ে তাকে কাছে ডাকছে। তাদের নেতৃত্ব দেবার জন্য উদাত্ব আহবান করছে।

যদি তাদেরকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে নিজের কম বুদ্ধির কারণে অনর্থক রক্তক্ষয়ী কোন সংঘর্ষের জন্ম দিতে পারে।

তাই তাদের নেতৃত্ব দিয়ে তাদেরকে একতাবদ্ধ করে কম ক্ষতির মাধ্যমে উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভপর হবে বলে আশা করা যায়।
এ কারণেই তিনি বিপদকে মাথায় তুলে নিয়ে ইরাকে যাওয়াই উপযোগী মনে করলেন। তিনি আশাবাদী ছিলেন যে, ইরাকে আসলে, সেখানকার জনগণকে নিয়ে তার নেতৃত্বে একটি নতুন শক্তির উত্থান হবে। একদিকে ইরাকের বিশাল জনগোষ্ঠি অপরদিকে হেযাজে আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রাঃ এর নেতৃত্বে জনসাধারণের বিরাট জামাত। দুইদিক থেকেই বিশাল জনতার একতবদ্ধ অবস্থান দেখে ঘাবরে গিয়ে ইয়াযিদ প্রশাসন হয়তো তাদের রাষ্ট্রনীতির পদ্ধতি পরিবর্তন করে খোলাফায়ে রাশেদীনের তরীকায় রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতিতে ফিরে যেতে বাধ্য হবে। তাহলে কোন প্রকার রক্তপাত ছাড়াই আমাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যাবে।

আর যদি ইয়াযিদ প্রশাসন তা না মানে, তবুও এ সম্মিলিত শক্তি কম ক্ষতির সম্মুখিন হয়েই ইয়াযিদ বাহিনীর উপর বিজয় লাভ করে ফেলবে। ফলে অল্প ক্ষতির মাধ্যমে বড় উপকার অর্জিত হবে বলে দৃঢ় আশা করা যায়।

মুসলিম বিন আকীল কুফায়

কুফাবাসীর এতো পত্র, এতো আহবানের পরও হযরত হুসাইন রাঃ তাড়াহুড়া করেননি। ইরাকী লোকদের পত্র ও প্রতিনিধিদলের বক্তব্য পুরাপুরি বিশ্বাস করেননি। বরং সত্যাসত্যি যাচাই করার জন্য তিনি তার চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীলকে প্রেরণ করে পরিস্থিতি সম্পর্কে সরেজমিন জানতে চান।

তাই কুফীদের কথার উপর ভরসা করে নিজে প্রথমে না গিয়ে মুসলিম বিন আকীলকে পাঠানোকে নিরাপদ মনে করলেন।
শিয়া রাবী আবূ মিখনাফ এর বর্ণনা হল, হুসাইন মুসলিম বিন আকীলের মাধ্যমে কুফাবাসীর কাছে এ পয়গাম পাঠান যে, ‘হুসাইন বিন আলীর পক্ষ থেকে আহলে ঈমান ও মুসলমানদের প্রতি! হানী এবং সাঈদ আপনাদের পত্র আমার কাছে এনেছে। আপনাদের দূতদের মাঝে এ দুইজন সবার শেষে আসছে। যা কিছু হযরতরা লিখছেন যে, “আমাদের নেতৃত্ব দেবার কেউ নাই। আপনি আসুন। হয়তো আপনার মাধ্যমে হক ও হিদায়াতের আল্লাহ তাআলা আমাদের একত্র করে দিবেন”।
এসব জেনে আমি আমার চাচাতো ভাই। যার উপর আমার আস্থা আছে। আর তিনি আমার পরিবারেরও অন্তর্ভূক্ত। তাকে আপনাদের কাছে পাঠালাম। আমি তাকে বলেছি যে, তিনি যেন আপনাদের অবস্থা এবং সবার রায় আমাকে পত্র লিখে পাঠায়। যদি তার পত্র দ্বারা একথা প্রমাণিত হয়ে যায় যে, আপনাদের দলের সংখ্যা এবং আপনাদের জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিরা একথার উপর একমত, যে বিষয়ে আপনারা আমার কাছে পত্র লিখছেন এবং আমার কাছে দূত পাঠিয়েছেন। তাহলে খুব দ্রুতই আমি আপনাদের কাছে আসবো ইনশাআল্লাহ। [তারীখে তাবারী-৫/৩৫৩]

এ আখেরী পত্র দ্বারাও বুঝা যায় যে, হযরত হুসাইন রাঃ কোন যুদ্ধ করতে চাননি। কেবল কুফাবাসীর একতা ও সমর্থন চেয়েছেন।

হযরত মুসলিম বিন আকীল কুফায় আসলেন। কুফীরা বিশাল শো ডাউনের মাধ্যমে তাকে বরণ করেন। মুসলিম বিন আকীলের হাতে অল্প কয়েক দিনে প্রায় আঠারো হাজার লোক হুসাইন রাঃ এর নামে বাইয়াত হয়।

যাতে করে মুসলিম বিন আকীল বুঝেন যে, কুফীরা পত্রে যা লিখেছে এবং লোক পাঠিয়ে যা কিছু বলছে, এ সব কিছুই সত্য। তারা হযরত হুসাইন রাঃ এর জন্য জান দিতে প্রস্তুত। আর কুফায় এখানো ইয়াযিদের খেলাফত পূর্ণতা পায়নি। অধিকাংশ লোক ইয়াযিদের খেলাফতের বিরোধী।

কিন্তু আসলে এসবই ছিল তাদের প্রতারণা। তাদের মূল মাকসাদ ছিল যেন হযরতে হুসাইন রাঃ কুফায় আসেন। আর তারা তাদের মাকসাদ যা করতে পারে।

কুফায় তখন ইয়াযিদের খেলাফত মজবুত হয়ে গিয়েছিল। কুফায় তখন ইয়াযিদের গভর্নর ছিল হযরত নুমান বিন বশীর রাঃ। তিনি মুসলিম বিন আকীলের আগমণ এবং বাইয়াত সম্পর্কিত বিষয় জানার পরও কোন এ্যাকশনে যাননি।
এতে কেউ কেউ আপত্তি তুললে নুমান বিন বাশীর রাঃ বলেন, আল্লাহর আনুগত্যে থেকে দুর্বল থাকা আমার পছন্দ, আল্লাহর নাফরমানীতে শক্তিশালী হবার চেয়ে। [তারীখে তাবারী-৫/৩৪৮]

তিনি মুসলিম বিন আকীলের সাথীদের বলেন, ‘আমি সন্দেহের বশে তোমাদের গ্রেফতার করবো না। তবে যদি একথা জানতে পারি যে, তোমরা খলীফার বাইয়াত ভেঙ্গেছো, এবং রাষ্ট্রদ্রোহ করছো, তাহলে আল্লাহর কসম! আমি তলোয়ার ব্যবহার কতে কুণ্ঠিত হবো না’। [তারীখে তাবারী-৫/৩৪৮]

একজন গভর্নর হিসেবে নুমান বিন বশীর রাঃ নিশ্চয় মুসলিম বিন আকীলের যাবতীয় কার্যক্রম নজরে রাখছিলেন ।
কিন্তু তারপরও মুসলিম বিন আকীলকে গ্রেফতার না করা একথাই প্রমাণ করে যে, হযরত নুমান বিন বশীর রাঃ এর কাছে মুসলিম বিন আকীলের কার্যক্রমকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলে মনে হয়নি।
যদি এমন কিছু হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই এ্যাকশনে যেতেন।

মুসলিম বিন আকীলের আশ্বাসমূলক পত্র প্রেরণ

মুসলিম বিন আকীল কুফাবাসীর প্রতারণা বুঝতে না পেরে তাদের বাহ্যিক উচ্ছাস-উদ্দীপনা ও সহযোগিতা দেখে খুশি খুশি পত্র প্রেরণ করেন হযরত হুসাইন রাঃ এর কাছে। যাতে তিনি জানান যে, বার হাজার লোক আমার হাতে বাইয়াত হয়ে গেছে। প্রচুর লোক বাইয়াত হতে আসছে। আপনি দ্রুত কুফায় চলে আসুন। [তারীখে তাবারী-৫/৩৪৮]

এক বর্ণনায় আসছে যে, তিনি লিখেন: সমস্ত কুফাবাসী আপনার সাথে আছে। আপনি আমার চিঠি পেতেই চলে আসুন। [আনছাবুল আশরাফ বালাজুরীকৃত-৩/১৬৭]

এ পত্র ৬০ হিজরীর জিলক্বদ মাসের এগার তারিখে পাঠানো হয়। [তারীখে তাবারী-৫/৩৮১, ৫/৩৯৫]

হযরত হুসাইন রাঃ এর কুফায় যাবার প্রস্তুতি

হযরত হুসাইন রাঃ এর কাছে মুসলিম বিন আকীলের পত্র আসতেই তিনি কুফায় রওনার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। এ সফরে তাঁর পরিবারের অল্প কিছু ব্যক্তি ছাড়া আর কোন মুসলমান এটিকে সমর্থন করেননি। বরঞ্চ বরং বড় সাহাবাগণ এবং তাঁর নিকটাত্মীয়গণ যথাসম্ভব কুফায় যেতে বারণ করতে থাকেন।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রাঃ, হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ খুব বুঝালেন যে, মক্কার বাইরে যাবেন না। কুফায় যাবার ইচ্ছে পরিত্যাগ করুন। এটাকে একটা ষড়যন্ত্র মনে হয়। যেভাবে আপনার পিতা আলী রাঃ কে ওরা হত্যা করেছে কুফাবাসী। ওরা আপনার বাবা ও ভাই হাসান রাঃ এর সাথে গাদ্দারী করেছে ওরা। এমনিভাবে আপনার সাথেও এরা গাদ্দারী করবে।
তারা উভয়ে খুব বুঝালেন। যেভাবে তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান গনী রাঃ কে তার পরিবারের সামনে হত্যা করা হয়েছে। না জানি ওরাও আপনাকে আপনার পরিবারের সামনেই হত্যা করে। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/৩০৩]

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ একথা বলতে থাকেন যে, যদি আমি বুঝতাম যে, আমি বাঁধা দিলে তুমি যাবে না, তাহলে আমি তোমার মাথা ও দাড়ি ধরে বাঁধা দিতাম।

তারপর হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ দৌড়াতে দৌড়াতে হযরত হুসাইন রাঃ এর ঘোড়ার লাগাম ধরে বললেন, যদি আপনি যেতেই চান, তাহলে অন্তত সন্তান সন্তুতি এবং পরিবারের সদস্যদের রেখে যান। তাদের এ বিপদের মুখে নিয়ে যাবেন না। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৬৪-১৬৫, এরাবিক, ৮/৩০১-২, বাংলা, তারীখে তাবারী-৩৮৩-৩৮৪]

হুসাইন রাঃ এর ভাই মুহাম্মদ বিন আলী হানফিয়্যাহ ও সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন ভাইকে সফরে বাঁধা দিতে। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৬৫, আরবী, ৮/৩১১-৩১২, বাংলা]

হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাঃ হযরত হুসাইন রাঃ কে বুঝাতে বলেন,

اتق الله فى نفسك، وألزم بيتك، ولا تخرج على امامك

আল্লাহকে ভয় কর। নিজের ঘরে বসে থাকো। নিজের ইমাম ইয়াযিদের বিরুদ্ধে যেও না। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৬৩]

হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ বলেন,

كلمت حسينا، فقلت له: اتق الله، ولا تضرب الناس بعضهم ببعض

আমি হুসাইন রাঃ কে এ বিষয়ে কথা বলে বললাম, তুমি আল্লাহকে ভয় কর। লোকদের পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত করিও না। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৬৩]

হুসাইন রাঃ এর চাচাতো ভাই এবং বোন জামাতা হযরত আব্দুল্লাহ বিন জাফর রাঃ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন হযরত হুসাইন রাঃ কে কুফায় যেতে বাঁধা দিতে। কিন্তু তার কথাও তিনি মানলেন না। [তারীখে তাবারী- ৫/৩৮৭-৩৮৮]

আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রাঃ এর বাঁধা প্রদান

قَالَ قَالَ ابْنُ الزُّبَيْرِ لِلْحُسَيْنِ: أَيْنَ تَذْهَبُ؟ إِلَى قَوْمٍ قَتَلُوا أَبَاكَ وَطَعَنُوا أَخَاكَ؟ فَقَالَ: لِأَنْ أُقْتَلَ بِمَكَانِ كَذَا وَكَذَا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ تُسْتَحَلَّ بِي- يَعْنِي مَكَّةَ

আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রাঃ হুসাইন রাঃ কে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথায় যাচ্ছো. তুমি কি এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছো, যারা তোমার পিতাকে হত্যা করেছে আর তোমার ভাইকে অপবাদ দিয়েছে। তখন তিনি বললেন, অমুক কিংবা তমুক স্থানে নিহত হওয়া আমার কাছে আমার কারণে মক্কা হালাল (হত্যা বৈধস্থান) হওয়া থেকে উত্তম। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৬১, আরবী, ৮/৩০৪ ইফাবা]

এই সকল আত্মীয় স্বজন, কিবারে সাহাবাগণ সকলেই হযরতে হুসাইন রাঃ কে কখনো কোমল সুরে, কেঁদে কেঁদে, কখনো কঠোরতার সাথে বাঁধা দেবার চেষ্টা করেন। কুফার লোকেরা ধোঁকাবাজ। এরা প্রতারক। ওদের চিঠির বক্তব্য আর বাস্তবতা এক নয়। তাই সেখানে যাওয়া নিজেকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দেয়া। তাছাড় ইয়াযিদের খেলাফত পূর্ণতা পেয়েছে। সুতরাং এখন ভিন্ন কিছু চিন্তা করা মানে রাষ্ট্রদ্রোহীতা হবে। তাই সেখানে যাওয়া কিছুতেই উচিত হবে না।

কিন্তু হুসাইন বিন আলী রাঃ নিচের সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। পরিবারসহ তিনি প্রসিদ্ধ কওল অনুপাতে জিলহজ্জ্ব মাসের ৮ তারিখ মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তবে রাজেহ কওল হল, হযরত হুসাইন রাঃ এর আগেই রওনা হন। [তারীখে উম্মতে মুসলিমাহ, ইসমাঈল রেহানকৃত-২/৪৭৬]

সঙ্গী ছিলেন পরিবারের ৮২ সদস্য এবং কুফার ৬০ জন শিয়া।

তিনি যাবার সময় সাথে কুফাবাসী শিয়াদের লিখিত পত্রও নিয়ে নেন। [তারীখে দামেশক-৪/২০২]

মক্কা থেকে কারবালার দূরত্ব ত্রিশ মনজিল। সেই জমানায় মনজিল ছাড়া এদিক সেদিক বিরতি দেয়া হতো না। সেই হিসেবে কাফেলা প্রতিদিন এক মনজিল সফর করতো। এভাবে সফর করে দশে মুহাররমে কারবালা প্রান্তরে পৌঁছে যান।

হযরত হুসাইন রাঃ এতো বাঁধার পরও কেন থামলেন না?

এতো বড় বড় ব্যক্তিত্ব, মুখলিস স্বজন ও প্রিয়জনদের এতো বাঁধার পরও কেন হযরতে হুসাইন রাঃ নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন? তিনি কি ক্ষমতার লোভী ছিলেন? নাউজুবিল্লাহ!

অবশ্যই নয়। তিনি একথা বুঝতে পারছিলেন যে, কুফা যাওয়া ছাড়া এ সমস্যার সমাধান হবে না।

দ্বিতীয়ত মক্কার গভর্ণরের পক্ষ থেকে এ শংকা ছিল যে, সুযোগ পেলেই জোরপূর্বক বাইয়াত গ্রহণ করাতে চাইবে ইয়াযিদের নামে।

বাইয়াত নিতে চাইলে যে মতানৈক্য তৈরী হবে এতে করে পবিত্র শহরে রক্তপাতের সম্ভাবনা আছে।

তবে অন্যান্য সাথীদের কথামত বাইয়াত নিয়ে ঘরে থাকলে অবশ্যই নিরাপত্তা পাওয়া যেতো। শরীয়তে এর সুযোগও ছিল।
কিন্তু তার মত ব্যক্তিত্বের জন্য হাত গুটিয়ে বসে থাকা শোভা পায়নি। তাই তার কাছে ইজতিহাদ অনুপাতে দৃঢ়তার উপর অটল থাকাকে যথার্থ বলে মনে হয়েছে। যাতে করে ইসলামী হুকুমতের উপর এক খান্দানের প্রতিপত্তির রেওয়াজ বন্ধ হয়। এ কারণেই তিনি শত বাঁধা বিপত্তির পরও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে কুফা যাবার পক্ষেই অনড় থাকেন।

পরের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

আরও জানুন

ফাযায়েলে হজ্জে বর্ণিত মুখ কালো হয়ে যাওয়া মহিলার সুস্থ্যতা সংক্রান্ত ঘটনা কি শিরকী ঘটনা?

প্রশ্ন From: মোঃ রেজওয়ানুর রহমান বিষয়ঃ ফাযায়েলে হজ্বের একটি ঘটনার উপর আপত্তি!(কথিত যীনার অপবাদ) প্রশ্নঃ …

One comment

  1. Shahadat Hossain

    খুবই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস