প্রচ্ছদ / জুমআ ও ঈদের নামায / জুমআর খুতবা কখন ও কিভাবে দেয়া সুন্নাহ সম্মত?

জুমআর খুতবা কখন ও কিভাবে দেয়া সুন্নাহ সম্মত?

প্রশ্ন

From: মুহাঃ মাহমুদুল হাসান ফয়সাল
বিষয়ঃ জুম’আর নামাযে খুৎবার সময় ও সংখ্যা

প্রশ্নঃ
আচ্ছালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ ।
শ্রদ্ধেয় আহলে হক্ক মিডিয়ার পরিচালক, মুফতী সাহেব সমীপেষু
আমাদের সমাজে প্রচলিত জুম’আর নামাযে ছানী আযানের পূর্বে মাতৃভাষাতে আলোচনা ও ছানী আযানের পর আরবীতে একটি আউয়াল ও একটি ছানী খুৎবা প্রদান করা হয় । কিন্তু একদল কথিত আলিম বলছেন, জুম’আর নামাযে খুৎবা হবে শুধু একটি আরবীতে, কেহ বলছেন শুধু মাতৃভাষায় । এদেরই কতিপয় বলছেন খুৎবা হবে জুম’আর ফরজ নামাযের পরে, ফরজ নামাযের আগে খুৎবা নেই । জুম’আর নামাযে খুৎবার সময় ও মাতৃভাষায় আলোচনাসহ ভাষা ও সংখ্যা উল্লেখপূর্বক হানাফী আলিমদের মতামতের আলোকে দলিলসহ সমাধান পেশ করলে কৃতজ্ঞ হব ।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

জুমআর খুতবা কখন ও কিভাবে?

জুমআর নামাযের পূর্বে খুতবা প্রদান করা জরুরী। জুমআর নামাযের পর খুতবা পড়ার কোন প্রমাণ নবীজী বা সাহাবাগণ থেকে প্রমাণিত নয়। যারা এটা বলেন, তারা ভুল বলে থাকেন।

জুমআর নামাযের আগে দ্বিতীয় আজান ইমামের সামনে দেবার পর প্রথমে একটি খুতবা দিবে। তারপর অল্প সময়ের জন্য ইমাম বসবে। তারপর আবার দাঁড়িয়ে আরেকটি খুতবা প্রদান করবে। তারপর জুমআর নামায আদায় করবে।

عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ: بَلَغَنَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ، صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، «كَانَ يَبْدَأُ فَيَجْلِسُ عَلَى الْمِنْبَرِ، فَإِذَا سَكَتَ الْمُؤَذِّنُ قَامَ فَخَطَبَ الْخُطْبَةَ الْأُولَى، ثُمَّ جَلَسَ شَيْئًا يَسِيرًا، ثُمَّ قَامَ فَخَطَبَ الْخُطْبَةَ الثَّانِيَةَ حَتَّى إِذَا قَضَاهَا اسْتَغْفَرْ ثُمَّ نَزَلَ فَصَلَّى»

ইবনে শিহাব জুহরী রহঃ বলেন, আমার কাছে সূত্রপরম্পরায় পৌঁছেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে মিম্বরের উপর বসতেন। যখন মুয়াজ্জিন আজান শেষ করতো তখন তিনি দাঁড়িয়ে প্রথম খুতবা প্রদান করতেন। তারপর অল্প সময়ের জন্য বসতেন। তারপর দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় খুতবা দিতেন। খুতবা শেষে ইস্তিগফার করতেন। তার মিম্বর থেকে নেমে জুমআর নামায পড়াতেন। [মারাসীলে আবু দাউদ, হাদীস নং-৫৫]

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ:كَانَ النَّبِيُّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – يَخْطُبُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ خُطْبَتَيْنِ يَجْلِسُ بَيْنَهُمَا.

হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, জুমআর দিন দু’টি খুতবা প্রদান করতেন, দুই খুতবার মাঝখানে বসতেন। [সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীস নং-১৭৮১, সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৯২৮]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَبِي بَكْرٍ، وَعُمَرَ «أَنَّهُمْ كَانُوا يَخْطُبُونَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ خُطْبَتَيْنِ عَلَى الْمِنْبَرِ قِيَامًا، يَفْصِلُونَ بَيْنَهُمَا بِجُلُوسٍ»

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত আবূ বকর রাঃ, হযরত উমর রাঃ, তারা সবাই জুমআর দিন মিম্বরে দাঁড়িয়ে দু’টি খুতবা প্রদান করতেন। দুই খুতবার মাঝে একটু সময়ের জন্য বসতেন। [মা’রিফাতুস সুনান ওয়াল আছার, হাদীস নং-৬৪২৮, মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-৫২৫৯]

স্থানীয় ভাষায় খুতবা

উভয় খুতবা আরবীতেই পড়বে। অন্য ভাষায় পড়লে তা খুতবা হিসেবে গণ্য হবে না।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এভাবেই প্রমাণিত। এক খুতবা, কিংবা জুমআর নামাযের পরে খুতবা পড়া, কিংবা ভিন্ন ভাষায় খুতবা পাঠ কোনটাই নবীজী থেকে প্রমাণিত নয়।

তাই ভিন্ন ভাষায় খুতবা প্রদান করা সম্পূর্ণরূপে বিদআতি কাজ। এহেন বিদআত থেকে বিরত থাকা জরুরী।

সাহাবায়ে কেরাম  ও তাবেয়ীগণের জমানায় ইসলাম পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পরার পর কোন রাষ্ট্রে সাহাবাগণ গমণ করে স্থানীয় ভাষায় খুতবা প্রদান করেছেন, বা আরবী খুতবাকে স্থানীয়  ভাষায় অনুবাদ করিয়েছেন এর কোন নজীর ইসলামের ইতিহাসে নেই। তাই আরবী ছাড়া স্থানীয় ভাষায় খুতবা প্রদান করা বিদআত।

وكل ما حرم فى الصلاة حرم فيها، أى فى الخطبة (الدر المختار مع رد المحتار-3\35)

الخطبة يوم الجمعة، وفى العيد بغير اللسان العربى، أو ترجمتها بالعجمى احدثوا ذلك بعد قرون الخير بلا إثارة من علم (مجموعة الفتاوى-2\247)

فإنه لا شك فى أن الخطبة بغير العربية خلاف السنة المتاوارثة من النبى صلى الله عليه وسلم والصحابة، فيكون مكروها تحريما (عمدة الرعاية على هامش شرح الوقاية، باب أحكام صلاة الجمعة-1\200)

ولا ينبغى للإمام أن يتكلم فى خطبته بشيئ من حديث الناس، لأنه ذكر منظوم (مبسوط سرخسى، كتاب الصلاة، باب صلاة الجمعة، دار الكتب العليمة-2\27)

الكراهة إنما هى لمخالفة السنة، لأن النبى صلى الله عليه وسلم، وأصحابه قد خطبوا دائما بالعربية…… إلى قوله:  الخطبة بالفارسية وغيرها من اللغات الغير العربية بدعة، وكل بدعة ضلالة، والضلالة أدنى درجتها الكراهة، فلا يخلوا الخطبة بغير العربية عن الكراهة، ووجه كونه بدعة أنه لم يكن فى القرون الثلاثة، ( مجموعة رسائل اللكنوى،-4\376 رسالة أكام النفائس-44)

الخطبة الفارسية التى أحدثوها واعتقدوا أحسنها ليس الباعث إليها إلا عدم فهم العجم اللغة العربية، وهذا الباعث قد كان موجودا فى عصر خير البرية، وإن كانت فى اشتباه، فلا اشتباه فى عصر الصحابة والتابعين ومن تبعهم من الأئمة المجتهدين، حيث فتحت الأمصار الشاسعة، والديار الواسعة، وأسلم أكثر الحبش والروم والعجم وغيرهم من الأعجام، وحضروا مجالس الجمع والأعياد وغيرها من شعائر الاسلام، وقد كان أكثرهم لا يعرفون اللغة العربية، ومع ذلك لم يخطب لهم أحد منهم بغير العربية، ولما ثبت وجود الباعث فى تلك الأزمنة، وفقدان المانع والتكاسل ونحوه معلوم بالقواعد المبرهنة لم يبق إلا الكراهة التى هى أدنى درجات الضلالة (مجموع رسائل عبد الحى اللكنوى-4\378-379، رسالة أكام النفائس-46-47)

জুমআর খুতবার আগে বাংলা বয়ান

যেহেতু মুসল্লিগণ নামাযের নির্ধারিত সময়ের আগেই মসজিদে আসেন। মুসল্লিগণ নামাযের অপেক্ষায় বসে থাকেন। তখন মানুষকে দ্বীনের প্রতি উৎসামূলক স্থানীয় ভাষায় কিছু বক্তৃতা দেয়া জায়েজ আছে। জরুরী নয়। কিন্তু জায়েজ। যেমনটি সাহাবায়ে কেরাম রাঃ ও তাবেয়ীগণ এর আমল দ্বারা প্রমাণিত।

عَاصِمُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ زَيْدٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: كَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يَقُومُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلَى جَانِبِ الْمِنْبَرِ فَيَطْرَحُ أَعْقَابَ نَعْلَيْهِ فِي ذِرَاعَيْهِ ثُمَّ يَقْبِضُ عَلَى رُمَّانَةِ الْمِنْبَرِ، يَقُولُ: قَالَ أَبُو الْقَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ الصَّادِقُ الْمَصْدُوقُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ يَقُولُ فِي بَعْضِ ذَلِكَ: وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرٍّ قَدِ اقْتَرَبَ فَإِذَا سَمِعَ حَرَكَةَ بَابِ الْمَقْصُورَةِ بِخُرُوجِ الْإِمَامِ جَلَسَ. هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ عَلَى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ

আসেম (রহ.) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, জুমু’আর দিন হযরত আবু হুরায়রা (রা.) জুতা খুলে মিম্বরের পাশে দাঁড়িয়ে মিম্বর ধরে বলতেন, আবুল কাসেম (সা.) বলেন, মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেন, সাদেক মাসদুক (সা.) বলেন, ধ্বংস আরবদের জন্য, ওই ফিতনার কারণে, যা নিকটবর্তী…। এরপর যখন ইমাম সাহেবের বের হবার আওয়াজ শুনতেন, তখন তিনি বসে যেতেন। (মুসতাদরাকে হাকেম, ১/১৯০, হাদীস-৩৩৮)

عَنْ أَبِي الزَّاهِرِيَّةِ، قَالَ: كُنْتُ جَالِسًا مَعَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ بُسْرٍ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَمَا زَالَ يُحَدِّثُنَا حَتَّى خَرَجَ الْإِمَامُ

হযরত আবদুল্লাহ বিন বুছর (রা.) জুমু’আর দিন প্রথমে ওয়াজ করতেন। যখন খতীব খুতবার জন্য আগমন করতেন, তখন তিনি ওয়াজ বন্ধ করতেন। (মুসতাদরাকে হাকেম, ১/২৮৮, হাদীস-১০১২)

হযরত তামীম দারী (রা.) হযরত উমর (রা.) ও হযরত উসমান (রা.)-এর যুগে খুতবার পূর্বে ওয়াজ করতেন। (মুসনাদে আহমাদ, ৩১/৩৩১, হাদীস-১৫১৫৭)

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক ও প্রধান মুফতী-তা’লীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

ফজরের নামাযে কুনুতে নাজেলা কি হযরত উমর রাঃ সারা বছর পড়তেন?

প্রশ্ন From: মাহমুদ বিষয়ঃ কুনূতে নাযেলা প্রশ্নঃ উমার রাঃ এর আমল হিসেবে আমাদের মসজিদে ফজর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস