প্রচ্ছদ / আহলে হাদীস / তাকলীদের হাকীকতঃ একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা [শেষ পর্ব]

তাকলীদের হাকীকতঃ একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা [শেষ পর্ব]

 লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

২য় পর্বটি পড়ে নিন

৩- মাসায়েলে মানসূসাহ মুজমালা

মাসআলা কুরআন বা হাদীসে বিদ্যমান আছে। কিন্তু বিস্তারিত নয় সংক্ষিপ্ত হওয়া।

কুরআন থেকে উদাহরণ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ ۚ وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا ۚ وَإِن كُنتُم مَّرْضَىٰ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِّنكُم مِّنَ الْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُم مِّنْهُ ۚ مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَٰكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ [٥:٦]

হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাযের জন্যে উঠ, তখন স্বীয় মুখমন্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং পদযুগল গিটসহ। যদি তোমরা অপবিত্র হও তবে সারা দেহ পবিত্র করে নাও এবং যদি তোমরা রুগ্ন হও, অথবা প্রবাসে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রসাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-অর্থাৎ, স্বীয় মুখ-মন্ডল ও হস্তদ্বয় মাটি দ্বারা মুছে ফেল। আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান-যাতে তোমরা কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ কর। {সূরা মায়িদা-৬}

এ আয়াতে অজহুন তথা চেহারা ধৌত করার নির্দেষ এসেছে। কিন্তু অজহুন কাকে বলে? এটি কুরআনে বর্ণিত নয়। কতটুকুকে অজহুন বলে? কুরআন এ বিষয়ে নিশ্চুপ।

এর সমাধান দিয়েছেন মুজতাহিদগণ। মাথার চুল উঠার স্থান থেকে থুতনির নিচ পর্যন্ত, আর এক কান থেকে থেকে আরেক কান পর্যন্তের অংশের নাম চেহারা বলা হয়। কিন্তু একথা কুরআনে নেই। যা বলে দিয়েছেন মুজতাহিদগণ।

হাদীস থেকে প্রমাণ

عن ابنِ مسعودٍ أن النبيّ صلى الله عليه وسلم قال: “إذا رَكعَ أحدُكُم فقَالَ في ركوعِه: سبحانَ رَبّيَ العظيم ثلاث مراتٍ فقد تمّ ركُوعُهُ، وذلك أدناهُ. وإذا سجدَ فقالَ في سجودهِ: سبحانَ رَبّيَ الأعْلَى ثلاثَ مرّاتٍ، فقد تمّ سجودُهُ، وذلك أدناه”

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ থেকে বর্ণিত। [সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-২৬০}

এ হাদীসে রুকু সেজদায় সর্বনি¤œ তিনবার তাসবীহ পড়ার কথা বলা হয়েছে। আর এটাকে বলা হয়েছে সর্বনি¤œ। অথচ তাসবীহ একবার পড়লেও নামায হয়ে যায়, এমন কি তাসবীহ না পড়লেও নামায হয়, এ বিষয়ে হাদীস নিশ্চুপ। এর সমাধান কে দিবে? মুজতাহিদ।

৪- মাসায়েলে মানসূসাহ মুহতামিলাতুল মায়ানী

তথা মাসআলা কুরআন বা হাদীসে বিদ্যমান। কিন্তু উক্ত নসে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। মুজতাহিদ তা নির্ধারণ না করলে তা বুঝা দুস্কর হয়ে যায়।

কুরআন থেকে উপমা

সূরা বাকারা ২২৮ নং আয়াত وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ এ আয়াতে কুরু অর্থ স্পষ্ট নয়। কুরু অর্থ হায়েজ ও হয়। আর আবার কুরু মানে তুহুরও হয়।

কোন অর্থ এখানে কাম্য, তা নির্ধারণ করে দেন মুজতাহিদ।

হাদীস থেকে উপমা

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- وَأَبِى بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ طَلاَقُ الثَّلاَثِ وَاحِدَةً فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ إِنَّ النَّاسَ قَدِ اسْتَعْجَلُوا فِى أَمْرٍ قَدْ كَانَتْ لَهُمْ فِيهِ أَنَاةٌ فَلَوْ أَمْضَيْنَاهُ عَلَيْهِمْ. فَأَمْضَاهُ عَلَيْهِمْ.

{সহীহ মুসলিম। হাদীস নং-৩৭৪৬}

আরবীতে দু’টি শব্দ আছে। এক হল, তাকীদ।  আরেক হল ইস্তিনাফ। ইস্তিনাফ হল যেমন এক ছাত্র এলে বললাম, টুপি নিয়ে আস। আমার কথা শুনে টুপি নিয়ে আসল। তারপর আরেক ছাত্রকে বললাম, টুপি নিয়ে আস। তখন সে আরেক টুপি নিয়ে আসল। এভাবে প্রত্যেকবার টুপি চাওয়ার দ্বারা নতুন টুপি উদ্দেশ্য হওয়ার নাম ইস্তিনাফ।

আর তাকীদ হল, একাধিকবার বলার দ্বারা একই অর্থ উদ্দেশ্য নেয়া। যেমন মেহমান এলে আমরা খুশি হয়ে বলে থাকি যে, মেহমান এসেছে, মেহমান এসেছে, মেহমান এসেছে। এখানে তিনবার বলা হলেও মেহমান তিনবার আসেনি। এসেছে একবারই। বাকি দুইবার তাকীদান বলা হয়েছে।

কোন স্বামী যদি তার স্ত্রীকে বলে যে, انت طالق، انت طالق، انت طالق তথা তুমি তালাক, তুমি তালাক, তুমি তালাক। তাহলে এখানে দুই অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। তাকীদ হিসেবে একটি। আর ইস্তিনাফ হলে তিনটি। এখানে কোনটি উদ্দেশ্য হবে?

ইমাম নববী রহঃ রাসূল  সাঃ, হযরত আবু বকর রাঃ এবং হযরত উমর রাঃ এর শুরুর জমানায় মানুষের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে, তাকীদ। কিন্তু পরবর্তীতে দ্বীনদারী কমতে থাকায় ইস্তিনাফ। তাই হযরত উমর রাঃ দুই অর্থের মাঝে একটি অর্থকে নির্দিষ্ট করে দিলেন। নতুন কিছু করেন নি। দুই অর্থের মাঝে একটিকে নির্দিষ্ট করেছেন।

أنه كان في أول الأمر إذا قال لها أنت طالق أنت طالق أنت طالق ولم ينو تأكيدا ولا استئنافا يحكم بوقوع طلقة لقلة ارادتهم الاستئناف بذلك فحمل على الغالب الذي هو ارادة التأكيد فلما كان في زمن عمر رضي الله عنه وكثر استعمال الناس بهذه الصيغة وغلب منهم ارادة الاستئناف بها حملت عند الاطلاق على الثلاث عملا بالغالب السابق الى الفهم منها في ذلك العصر

৫- মাসায়েলে মানসূসাহ গায়র মুতাআইয়্যিনাতিল আহকাম

 তথা মাসআলা নসে রয়েছে। কিন্তু মাসআলার হুকুম নসে বিদ্যমান নেই। সূরা মায়িদার দুই নং আয়াত وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا

এখানে হজ্ব থেকে ফারিগ হওয়ার পর শিকার করার আদেশ এসেছে। ঠিক তেমনি আদেশ সূচক শব্দ এসেছে সূরা মায়িদার ছয় নং আয়াতে-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا

এ সকল স্থানের চেহারা ধুয়ার হুকুম কি? শিকার করার আদেশ হলেও এর হুকুম কি? জাওয়াজ। তো মাসআলা নসে বিদ্যমান। কিন্তু হুকুম নসে নেই। হুকুম বলে দিবে কে? মুজতাহিদ।

গায়রে মুজতাহিদ

তাকলীদ করবে গায়রে মুজতাহিদ। আর মুজতাহিদ করবে ইজতিহাদ। এ কারণে গায়রে মুকাল্লিদদের অভিযোগ যে, আমাদের ইমাম গায়রে মুকাল্লিদ। আমরা বলি যে, ইমাম গায়রে মুকাল্লিদ মানে হল, তিনি মুজতাহিদ। তাই তার মুকাল্লিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। আর তোমরা গায়রে মুকাল্লিদ মানে হল, তোমরা মুজতাহিদও নয়, আবার তাকলীদও করো না, এর নাম গায়রে মুকাল্লিদ।

এক ব্যক্তি হয়তো ইমাম হবে, নতুবা মুক্তাদী। একজন এমন যে ইমাম ও নয়, মুক্তাদী নয়। ফাসাদকারী। হয়তো ব্যক্তি রাজা হবে, নয়তো প্রজা। উভয়ের কোনটি না হলে হয় বিদ্রোহী। তেমনি গায়রে মুকাল্লিদ। আর ইমাম আবু হানীফা রহঃ হলেন রাজাওয়ালা, আর ইমামওয়ালা। গায়রে মুকাল্লিদরা হল, ফাসাদকারী আর বিদ্রোহী।

মুসলমান হওয়ার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নবীর কালিমা পড়া জরুরী। নবীজী সাঃ নিজেও মুসলমান। কিন্তু তিনি কার কালিমা পড়েছেন? কারো নয়। তারপরও তিনি সাচ্চা মুসলমান। কারণ তিনি নিজেই নবী। তার জন্য অন্য কারো কালিমা পড়ার প্রয়োজনই নেই।

তেমনি ইমাম আবু হানীফা রহঃ মুজতাহিদ। তাই তার কারো তাকলীদ করার প্রয়োজনই নেই।

যেমন মুক্তাদী ইমামের ইত্তেবা করে বা জামাআত নামায পড়ে। আর ইমামও বা জামাআত নামায পড়ছে যদিও তিনি কারো ইত্তেবা করছে না। কেননা, তিনি নিজেই ইমাম। এমনিভাবে ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর অনুসারীরা তার তাকলীদ করে থাকে, কিন্তু তিনি কারো তাকলীদ করেন না। কারণ তিনি নিজেই ইমাম।

মুফতাবিহী মাসায়েল

আমরা তাকলীদ করি মুফতাবিহী মাসায়েলের উপর গায়রে মুফতাবিহী মাসায়েলের নয়। যেমন কোথাও কোন এক মাসআলায় সহীহ হাদীসও রয়েছে, আবার জঈফ হাদীসও রয়েছে। তাহলে এক্ষেত্রে আমরা সহীহ হাদীস গ্রহণ করে থাকি। আর জঈফ হাদীস ছেড়ে দেই। এ জঈফ হাদীস ছেড়ে দেয়া মানে এই নয় যে, আমরা হাদীস অস্বিকারকারী। বা হাদীসকে মানি না। বরং যেহেতু এখানে বিশুদ্ধত হাদীস রয়েছে, তাই সে সময় গায়রে সহীহ হাদীসটি যেন বলাই হয়নি। তাই সহীহ হাদীসটি মানা মানেই মূলত হাদীস মানা। আর জঈফ হাদীস মানা মানে হাদীস ছেড়ে দেয়া।

ঠিক তেমনি আমরা হানাফী মাযহাবের মুকাল্লিদ। যেখানে হানাফী মাযহাবে এক মাসআলায় একাধিক বক্তব্য থাকবে, সেক্ষেত্রে আমাদের পালনীয় হল, মুফতাবিহী মাসায়েল। গায়রে মুফতাবিহী মাসায়েল নয়। এক্ষেত্রে মুফতাবিহী মাসায়েল মানাই হল, হানাফী মাযহাবের অনুসরণ। তেমনি গায়রে মুফতাবিহী মাসায়েল ছেড়ে দেয়া মানে হানাফী মাযহাব ছেড়ে দেয়া নয়। বরং গায়রে মুফতাবিহী মাসায়েল মানা মানে মাযহাবে হানাফী ছেড়ে দেয়া।

দলীল চাওয়া ছাড়া মেনে নেয়া

এক হল, কোন বক্তব্যে দলীল না থাকা। আরেক হল দলীল জানতে না চাওয়া।

কুরআনের প্রতি আয়াতের সনদ আছে কি?

মুকাল্লিদঃ- কুরআনে কারীমের প্রতিটি আয়াতের কি সনদ আছে রাসূল সাঃ পর্যন্ত?

গায়রে মুকাল্লিদঃ- নেই।

মুকাল্লিদঃ- তাহলে কি নাউজুবিল্লাহ কুরআন রাসূল সাঃ এর উপর নাজিলকৃত কুরআন নয়?

গায়রে মুকাল্লিদঃ- অবশ্যই রাসূল সাঃ এর উপর নাজিলকৃত কুরআন।

মুকাল্লিদঃ- তাহলে সনদ কোথায়? সনদ ছাড়া কথা কি করে মানা যায় যে এটি রাসূল সাঃ এর উপরই নাজিল হয়েছিল?

গায়রে মুকাল্লিদঃ-  আসলে বর্তমানে বিদ্যমান কুরআন যে রাসূল সাঃ এর উপর নাজিলকৃত কুরআনই তা মুতাওয়াতিসূত্রে বর্ণিত। তথা উম্মতের নিরবচ্ছিন্ন মতৈক্যে এটি প্রমাণিত। এ ব্যাপারে কেউ কোন দিন প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। কিছু বিভ্রান্ত শিয়া এবং নাস্তিক ইসলাম বিদ্বেষী ছাড়া। যে বিষয় মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়, সে বিষয়ের সনদের তাকানোর কোন প্রয়োজন নেই। সনদ ছাড়াই উক্ত বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। যেমন পবিত্র কুরআন যে রাসূল সাঃ এর উপর নাজিলকৃত কুরআন। তা মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমানিত। তাই এ ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপিত করা বা এর সনদ চাওয়া আহমকী ছাড়া কিছু নয়।

মুকাল্লিদঃ- আচ্ছা তাই নাকি? তাহলে আমি আরেকটু সংযোজন করি। বিখ্যাত হাদীস বিশারদ হযরত ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ তার সুবিখ্যাত উসূলে হাদীসের হাদীসের কিতাব “শরহু নুখবাতিল ফিকার” এ উল্লেখ করেছেনঃ-

والمتواتر لا يبحث عن رجاله، بل يجب العمل به من غير بحث

মুতাওয়াতির এর রিজাল তথা রাবী নিয়ে আলোচনা হয় না। বরং আলোচনা ও সমালোচনা ছাড়াই এর উপর আমল করা আবশ্যক। {শরহু নুখবাতিল ফিকার}

সুতরাং কুরআন যেহেতু মুতাওয়াতির। তাই এর সনদ খোঁজা সত্যিই আহমকী। বরং সনদ তালাশ করা ছাড়াই এটি রাসূল সাঃ এর উপর নাজিলকৃত ঐশী কুরআন বিশ্বাস করা আবশ্যক।

ঠিক তেমনি হেদায়া, কুদরী, শরহে বেকায়া, কানযুদ দাকায়েক, তুহফাতুল ফুক্বাহা, আদদরুরুল মুখতার, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, আলকাফীসহ যেসব গ্রন্থ ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর দিকে নিসবত করা গ্রন্থাদী যা মুতাওয়াতির হিসেবে চলে আসছে। সেগুলোরও ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর পর্যন্ত সনদ তালাশ করা আহমকী বৈ কিছু নয়। কারণ মুতাওয়াতির বিষয়ের সনদ তালাশ করার প্রয়োজন নেই। বরং তা মুতাওয়াতির হওয়াই এটির নিসবত সঠিক হওয়ার দলীল।

উপরোক্ত কিতাবাদী যে, ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর ফিক্বহের আলোকে লেখা তা সর্বজন বিদিত। হাজার বছর ধরে ফক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুসলিম উম্মাহের কাছে স্বীকৃত উলামা-মাশায়েখ, আইয়িম্মায়ে দ্বীন, ও বিদগ্ধ পন্ডিতগণ নিঃসংকোচে স্বীকার করে আসছেন। শুধু তাই নয়, হাজার বছর ধরে অধিকাংশ উম্মতে মুসলিমা ফিক্বহে হানাফী বিশ্বাস করেই এর উপর নিরবচ্ছিন্ন আমল জারি রেখেছেন। সেখানে অধুনা কিছু অর্বাচিন ব্যক্তিদের সন্দেহ প্রকাশ এ মুতাওয়াতির বিষয়ের ক্ষেত্রে সনদ তালাশ করার মানসিকতা ফিতনা সৃষ্টি বৈ কিছু নয়। সেই সাথে মুতাওয়াতিরের হুকুমের ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়।

মুজতাহিদ হওয়া দলীলে শরয়ী দ্বারা প্রমাণিত

এটি তাকলীদের একটি শক্তিশালী শর্ত। যে কেউ  নিজেকে মুজতাহিদ দাবি করলেই সে মুজতাহিদ হয়ে যাবে না। সেই সাথে তার তাকলীদ করার বৈধতা চলে আসবে না। বরং মুজতাহিদ হতে হবে এমন, যার মুজতাহিদ হওয়া শরীয়তের দলীল চতুষ্টয় তথা কুরআন, হাদীস বা ইজমা বা কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে।

চার ইমামের যেকোন একজনের তাকলীদ করা জরুরী বলি আমরা কারণ, চার ইমামের মুজতাহিদ হওয়া শরয়ী দলীল “ইজমা” দ্বারা প্রমাণিত। ৪র্থ শতাব্দীর উলামাগণের ইজমা হয়ে গেছে যে, চার মুজতাহিদ ইমামের যে কোন একজনের তাকলীদ করা জরুরী। {আলইনসাফ-৫২, ৫৭-৫৯, মাদারে হক-৩৪১, ইন্তিসারুল হক বজওয়াবে মিয়ারে হক-১৫৩, আলমুআফাকাত-৪/১৪৬, আলমাজমূহ শরহুল মুহাজ্জাব-১/৯১}

উসূল ও ফুরূ সংকলিত মাযহাব

তাকলীদের জন্য উল্লেখিত সংজ্ঞায় আরেকটি শর্তারোপ করা হয়েছে, সেটি হল, মুজতাহিদের মাযহাবটি উসূল তথা মূলনীতি এবং ফুরূ তথা শাখাগত মাসায়েলসহ সংকলিত হতে হবে।

যদি উসূল ও ফুরূসহ সংকলিত না হয়, তাহলে সেই মাযহাব মানা সম্ভব নয়। কারণ তখন মাযহাবটি আসলে কি? কিসের ভিত্তিতে হয়েছে? তা স্পষ্ট জানা যাচ্ছে না, তাই তা মানাও সম্ভব হবে না।

উল্লেখিত শর্তটি দ্বারা আরেকটি প্রশ্নের জবাব হয়ে যাচ্ছে, সেটি হল, চার খলীফা রেখে চার ইমামের মাযহাব মানা হয় কেন?

মূল কারণ হল, আমরা যদি বলি যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ এর তাকলীদ করা হোক। তাহলে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ এর তাকলীদ করলে তাঁর কাছে ছিল কুরআন, রাসূল সাঃ এর হাদীস এবং তার নিজস্ব ফাতওয়া। কিন্তু হযরত উমর, হযরত উসমান ও হযরত আলী রাঃ এর ফাতওয়া কিন্তু হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ এর কাছে ছিল না? তাই তাঁর তাকলীদ করলে আমরা বাকি তিন খলীফায়ে রাশেদের ফাতওয়া থেকে বঞ্চিত থাকছি।

একইভাবে আমরা যদি উমর রাঃ এর তাকলীদের কথা বলি, তাহলে হযরত উমর রাঃ এর কাছে কুরআন, হাদীস, হযরত আবু বকর রাঃ এর ফাতওয়া এবং তাঁর নিজের ফাতওয়া রয়েছে। বাকি উসমান রাঃ এবং হযরত আলী রাঃ এর ফাতওয়া থাকছে না।

একই অবস্থা হযরত উসমান রাঃ এর তাকলীদের কথা বললে। হযরত আলী রাঃ এর তাকলীদের কথা বললে তাঁর কাছে কুরআন, হাদীস, হযরত আবু বকর রাঃ, হযরত উমর রাঃ, হযরত উসমান রাঃ এর ফাতওয়া এবং হযরত আলী রাঃ এর নিজস্ব ফাতওয়া পাওয়া যাবে। কিন্তু তৎকালীন জিবীত থাকা ও মৃত্যুবরণ করা বাকি সাহাবীদের ফাতওয়া পাচ্ছি না।

এ কারণে সাহাবীদের পরবর্তীতে তাবেয়ী ইমাম আবু হানীফা এবং তাবে তাবেয়ী ইমাম শাফেয়ী, মালিক ও আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ এর তাকলীদের মাধ্যমে কুরআন, হাদীস এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের ফাতওয়াও পাওয়া যায়। আর আমাদের কাছে কুরআন হাদীসের সাথে সাহাবাগণও অনুসরণীয়।

وعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين من بعدي عضوا عليها بالنواجذ

হযরত ইরবাজ বিন সারিয়া রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেনঃ তোমরা আমার সুন্নতকে আঁকড়ে ধর। এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতকে আঁকড়ে ধর আমার পরে। এগুলোকে মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধর। {আলমুজামুল কাবীর লিততাবরানী, হাদীস নং-৬১৮, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৪২, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-২০১২৫, সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১৫০, সুনানে দারেমী, হাদীস নং-৯৫, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-১৭৯, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-৯২২, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং-৩২৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৭১৪২, মুসনাদুল বাজ্জার, হাদীস নং-৪২০১, মুসনাদুশ শামীন, হাদীস নং-৪৩৭, মাশকিলুল আসার, হাদীস নং-৯৯৮}

তাই চার ইমামের তাকলীদ করার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের মাসায়েল পাওয়া যাচ্ছে। যা শুধু চার খলীফার তাকলীদ করলে পাওয়া যেতো না।

আর আমরা বিশেষ করে ইমাম আজম আবু হানীফা রহঃ এর অনুসরণ এ জন্য করে থাকি যে, যেহেতু হযরত আলী রাঃ সম্পর্কে রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন যে,

عن ابن عباس رضي الله عنهما قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : أنا مدينة العلم و علي بابها فمن أراد المدينة فليأت الباب

হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেনঃ আমি হলাম ইলমের শহর। আর আলী হল এর দরজা। সুতরাং যে ব্যক্তি শহরে প্রবেশ করতে চায়, সে যেন দরজা দিয়ে আসে। {মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং-৪৬৩৭, আলমুজামুল কাবীর লিততাবারী, হাদীস নং-১১০৬১, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-৩২৮৯০, জামেউল আহাদীস, হাদীস নং-৫৭৪২}

যেহেতু আমরা ইলমের শহর রাসূল সাঃ এর ইলম পর্যন্ত পৌঁছতে চাই দরজা দিয়ে। আর ইলমের দরজা হযরত আলী রাঃ কুরআন, হাদীস, হযরত আবু বকর রাঃ, হযরত উমর রাঃ এবং হযরত উসমান রাঃ এর ফাতওয়াসহ কুফায় এসে শুয়ে আছেন। তাই সেই কুফায় জন্ম নেয়া ইমামে আজম রহঃ এর তাকলীদ করার মাধ্যমে এই সকল ইলমের দরজা দিয়ে রাসূল সাঃ এর ইলমের শহরে প্রবেশ করে থাকি।

এ কারণে আমরা ইমাম আজম আবু হানীফা রহঃ এর তাকলীদ করে থাকি। যেহেতু তার কাছে সকল ইলমের ভান্ডার এসে পৌঁছেছে হযরত আলী রাঃ সহ অন্যান্য সাহাবীগণের পদচারণায় ধন্য কুফায়।

আল্লাহ তাআলা এ ফিতনাবাজ গোষ্টি থেকে মুসলিম জাতিকে হিফাযত করুন।

আরও জানুন

কিয়ামতের আলামতসমূহ (পর্ব-৬)

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী ৫ম পর্বটি পড়ে নিন অধিক হারে মিথ্যা বলা হবে عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস