প্রচ্ছদ / অপরাধ ও গোনাহ / ‘ক্ষমা’ আলোকিত মানুষের গুণ

‘ক্ষমা’ আলোকিত মানুষের গুণ

মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ

শান্তি ও সফলতার জীবনলাভে যেসকল গুণ ও বৈশিষ্ট্য গভীর প্রভাবক হয়ে থাকে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ক্ষমা ও সহনশীলতা। অন্যের অপরাধ ক্ষমা করতে পারা এবং অপ্রীতিকর বিষয়সমূহ উপেক্ষা করতে পারা। আরবী ভাষায় যাকে বলে- العفو والصفح

العفو অর্থ অন্যায়ের প্রতিশোধ না নেয়া আর ‘الصفح’ অর্থ অন্যায়কে উপেক্ষা করা। যেন দেখেও না দেখা, শুনেও না শোনা, বুঝেও না বোঝা। আরবী ভাষায় ‘الصفح’-এর সাথে যখন ‘الجميل’ বিশেষণটি যুক্ত হয় তখন এর মর্ম দাঁড়ায় ‘সুন্দর উপেক্ষা’। তত্ত্ববিদগণ এর ব্যাখ্যা করেছেন, কারো অন্যায়-অপ্রীতিকর আচরণ এমনভাবে উপেক্ষা করা যে, কষ্ট বা বিরক্তিরও প্রকাশ না ঘটে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এর জন্য অনেক শক্তির প্রয়োজন।

এখানে এই প্রশ্ন আসতে পারে যে, ‘জীবনের সকল ক্ষেত্রে তো অন্যায়-অপরাধ উপেক্ষা করতে থাকা উচিত নয়।’ ঠিক কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে যে উচিত তাতে তো সন্দেহ নেই। এখানে সেই ‘অনেক ক্ষেত্রে’র কথাই বলা হচ্ছে। ‘সব ক্ষেত্রের’ কথা বলা হচ্ছে না। কোনো গুণ বা বৈশিষ্ট্যের কাম্যতা নিয়ে যখন আলোচনা করা হয় তখন ‘প্রযোজ্য ক্ষেত্রে’র শর্তটি সাধারণভাবেই মালহূয থাকে। আলাদা করে তা উল্লেখ করার প্রয়োজন হয় না। যাইহোক, আমাদের জীবনের বহু ক্ষেত্র এমন আছে, যেখানে এই গুণ ও বৈশিষ্ট্যের চর্চা আমাদের করতে হয়।

কুরআন মাজীদে এই গুণ অর্জনে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

وَ لَمَنْ صَبَرَ وَ غَفَرَ اِنَّ ذٰلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْاُمُوْرِ.

আর যে সবর করে ও ক্ষমা করে নিশ্চয়ই তা অতি আবশ্যকীয় বিষয়। -সূরা শূরা (৪২) : ৪৩

অর্থাৎ ‘সবর’ ও ‘ক্ষমা’ এমন বিষয়, যা অতি কাম্য, যার পুরস্কার অনেক বড়, আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে উচ্চাভিলাষী মুমিনের জন্য তা অতি আবশ্যক।

মুমিনের বৈশিষ্ট্য এই হবে যে, মুমিন আখিরাতের বিষয়ে উচ্চাভিলাষী হবে। ব্যক্তিগত দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা এই উচ্চাভিলাষের পথে বাধা হবে না। কারণ, মুমিনের বিশ্বাস, কল্যাণের তাওফীক আল্লাহর পক্ষ হতে আসে। ব্যক্তি শুধু চেষ্টা করতে পারে। চেষ্টার পর ফলাফল আসে আল্লাহর হুকুমে। কাজেই সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করার সামর্থ্য তো  মানুষের আছে। সেই চেষ্টার উপর অচিন্তনীয় ফলাফল দান করা তো আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ। তাই উচ্চতম লক্ষ্য, জান্নাতের উচ্চতম স্থানের প্রত্যাশা ও আকাক্সক্ষায় মুমিন ব্যর্থ হয় না। এককথায়, মুমিনের উচ্চাভিলাষের উপাদান তার নিজস্ব সক্ষমতা নয়, আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহের ভরসা। ইসলামের আকীদাই তাকে আখিরাতের বিষয়ে উচ্চাভিলাষী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে।

তো উচ্চাভিলাষী মুমিনের কর্মও তো উচ্চমানসম্পন্ন হতে হবে। সাধারণ ক্ষেত্রে যা ঐচ্ছিক, উচ্চাভিলাষীর জন্যে তাও আবশ্যকীয়। কারণ তাকে  তো এক উন্নত লক্ষ্যে উপনীত হতেই হবে।

আমরা যে বৈশিষ্ট্যটি নিয়ে আলোচনা করছি, অর্থাৎ অন্যায়কে উপেক্ষা করা; সাধারণ অবস্থায় ও জীবনের অনেক ক্ষেত্রে এর অবস্থান এরকম। কাজেই এই বৈশিষ্ট্য অর্জনে চেষ্টা-চরিত্র করে যাওয়া আমাদের কর্তব্য।

অন্যায়কে উপেক্ষা করা ও ক্ষমা করার যে ফযীলত কুরআন মাজীদ থেকে পাওয়া যায় তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও মাগফিরাতের ঘোষণা। যে অন্যকে ক্ষমা করে, অন্যের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে আল্লাহ তাআলাও তাকে ক্ষমা করেন ও তার দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করেন। আরবী ভাষায় একটি কথা আছে-

“الجزاء من جنس العمل”

অর্থাৎ যে প্রকারের কর্ম ঐ প্রকারের পুরস্কার। বাংলা ভাষার প্রবাদ- ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’-এর চেয়েও বিষয়টি বিশেষ। নীতিটি এরকম যে, তুমি যদি ক্ষমা পেতে চাও তাহলে তুমিও অন্যকে ক্ষমা কর, দয়া পেতে চাইলে অন্যের উপর দয়া কর। কুরআন-সুন্নাহর অনেক বাণীতে এই নীতির অনুরণন পাওয়া যায়।

এক্ষেত্রে এক হৃদয়গ্রাহী ঘোষণা কুরআন মাজীদে আছে- সূরাতুন নূরে, নূরের আয়াতে। আয়াতের প্রেক্ষাপট উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর জীবনের এক মর্মান্তিক ও মহাসৌভাগ্যের ঘটনা, যা হাদীস-সীরাতের কিতাবে ইফ্কের ঘটনা নামে প্রসিদ্ধ। ‘ইফ্ক’ অর্থ অপবাদ আরোপ। সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ। মুনাফিকেরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই কষ্টটি দিতেও ছাড়েনি। তো উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা.-এর প্রতি মুনাফিকদের ঐ অপবাদ আরোপের ঘটনাটিকেই ‘মর্মান্তিক’ ও ‘মহাসৌভাগ্যের’ বলে উল্লেখ করেছি। মর্মান্তিক এজন্য যে, একজন পবিত্রাত্মা নারীর পক্ষে এর চেয়ে মর্মবিদারক বিষয় আর কী হতে পারে? শরীয়তও যে কয়টি গুনাহকে কবীরা গুনাহ বলে চিহ্নিত করেছে তন্মধ্যে একটি হচ্ছে সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা। তদ্রূপ যে কয়টি অপরাধের উপর শরীয়তে নির্ধারিত দ- রয়েছে তন্মধ্যে উপরোক্ত অপরাধটিও অন্যতম।

আর ‘মহাসৌভাগ্যের’ বলার কারণ হচ্ছে, মুনাফিকদের ঐ অপবাদের খ-ন আল্লাহ তাআলা সরাসরি কুরআন মাজীদের আয়াতের মাধ্যমে করেছেন। স্বয়ং উম্মুল মুমিনীন রা.-এর বক্তব্য ও ভাষ্য হচ্ছে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওহীর মাধ্যমে প্রকৃত বিষয়টি অবগত করবেন। কিন্তু আমার কল্পনাও ছিল না যে, সেটি সরাসরি কুরআন মাজীদের আয়াতের মাধ্যমে হবে, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনগণ তাদের শ্রেষ্ঠ ইবাদত নামাযে তিলাওয়াত করবেন। সুবহানাল্লাহ!

যাই হোক, প্রকৃত সত্য, আম্মাজান রা.-এর পবিত্রতা তো কুরআন মাজীদের আয়াতের মাধ্যমে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়েছে, কিন্তু এর আগ পর্যন্ত কী হৃদয়বিদারক যন্ত্রণাই না তাকে ভুগতে হয়েছে। শুধু কি তিনি, তাঁর বাবা-মায়ের উপর দিয়ে কী অবর্ণনীয় অবস্থা গিয়েছে তা তো যে কেউ অনুমান করতে পারবেন। এরই মধ্যে কাঁটাঘায়ে নুনের ছিটার মতো যে ব্যাপারটি ঘটেছিল তা হচ্ছে মুনাফিকদের ঐ অপবাদের তুফানে দু-তিন জন সরলমনা মুসলিমও প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। এদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর আত্মীয় হযরত মিসতাহ রা.। ইনি ছিলেন একজন খাঁটি মুমিন, বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবী, কিন্তু মুনাফিকদের অপপ্রচারে কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন খুবই দরিদ্র । হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. তার ভরণ-পোষণ করতেন। মিসতাহ রা. মুনাফিকদের অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে পড়ায় হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. খুব কষ্ট পেলেন। কুরআন মাজীদে আম্মাজান আয়েশা রা.-এর পবিত্রতা ঘোষিত হওয়ার পর তিনি কসম করলেন, ‘ভবিষ্যতে আর কখনো তাকে ভরণ-পোষণ দিবেন না।’ এই প্রেক্ষাপটেই সূরাতুন নূরের এই আয়াতটি নাযিল হল-

وَ لَا یَاْتَلِ اُولُوا الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَ السَّعَةِ اَنْ یُّؤْتُوْۤا اُولِی الْقُرْبٰی وَ الْمَسٰكِیْنَ وَ الْمُهٰجِرِیْنَ فِیْ سَبِیْلِ اللهِ ،  وَ لْیَعْفُوْا وَ لْیَصْفَحُوْا،  اَلَا تُحِبُّوْنَ اَنْ یَّغْفِرَ اللهُ لَكُمْ، وَ اللهُ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ.

আর তোমাদের মধ্যে যারা (ধর্ম-কর্মে) মহান এবং সঙ্গতিসম্পন্ন তারা যেন শপথ না করে যে, আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্রদেরকে এবং আল্লাহর রাস্তায় হিজরতকারীদেরকে দান করবে না। তাদের উচিত, ক্ষমা করা ও (ভুল-ভ্রান্তি) উপেক্ষা করা। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ত্রুটি ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বড় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা নূর (২৪) : ২২

আয়াত নাযিল হওয়ার পর আবু বকর সিদ্দীক রা. বলে উঠলেন-

بَلَى وَاللهِ إِنِّي أُحِبّ أَنْ يَغْفِرَ اللهُ لِي.

অবশ্যই, আমি পছন্দ করি যে, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।

এরপর তিনি মিসতাহ রা.-এর ভরণ-পোষণ আবার জারি করে দিলেন এবং বললেন-

وَاللهِ لاَ أَنْزِعُهَا مِنْهُ أَبَدًا.

আল্লাহর কসম! আর কখনো তা বন্ধ করব না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৭৫০

এটি একটি দৃষ্টান্ত যে, কুরআনে কারীম কীভাবে সাহাবায়ে কেরামের জীবন ও কর্মকে প্রভাবিত করেছে। কুরআন মাজীদের নির্দেশ ও নির্দেশনাই ছিল তাঁদের কাছে চূড়ান্ত। তাদের সকল আবেগ-অনুভূতি কুরআন মাজীদের নির্দেশ ও প্রতিশ্রুতির সামনে ছিল সমর্পিত। কুরআন মাজীদ যখন ভুল-ভ্রান্তি উপেক্ষা করে যাওয়ার আদেশ করেছে তখন তাঁরা তা শিরোধার্য করেছেন। যখন এর পুরস্কার স্বরূপ মাগফিরাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তখন তাঁরা বিগলিত হয়েছেন। তাঁদের মনে জমে থাকা সকল ক্ষোভ পানি হয়ে গিয়েছে।

কুরআন মাজীদের এই আয়াত কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুমিনের জন্য পথ-নির্দেশিকা। বিশেষ প্রেক্ষাপটে নাযিল হলেও এর শিক্ষা সবযুগের মুমিনের জন্য। ইমাম কুরতুবী রাহ. এই আয়াতের আলোচনায় লেখেন-

… غَيْرَ أَنّ الْآيَةَ تَتَنَاوَلُ الْأُمّةَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ بِأَلّا يَغْتَاظَ ذُو فَضْلٍ وَسَعَةٍ فَيَحْلِفَ أَلّا ينفع من هذه صفته غابر الدهر.

এ আয়াত কিয়ামত পর্যন্ত সকল মুমিনকে (তার নির্দেশনায়) শামিল করছে। ধর্মে-কর্মে মর্যাদাবান ও সঙ্গতিসম্পন্ন ব্যক্তিরা যেন এমন সকল মানুষের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে (সাহায্য-সহযোগিতা বন্ধের) কসম না করে যারা অতীতের উল্লেখিত গুণের মানুষগুলোর মতো। (অর্থাৎ দরিদ্র দ্বীনদার আত্মীয়) -তাফসীরে কুরতুবী ১২/২০৭

তো কুরআনে কারীমের এই আয়াত এবং আরো অন্যান্য আয়াত থেকে জানা যাচ্ছে যে, যারা অন্যকে ক্ষমা করে আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা করেন এবং তাঁর অপার দয়া ও করুণায় সিক্ত করেন।

ক্ষমাশীল মানুষ আল্লাহ তাআলার মহব্বত লাভ করে থাকেন। সূরা আলে ইমরানে মুত্তাকি মুমিনের, যাদের জন্য চিরশান্তির জান্নাত প্রস্তুত রয়েছে, বিশেষ কিছু গুণের উল্লেখ আছে। তার একটি হচ্ছে- وَ الْعَافِیْنَ عَنِ النَّاسِ (মানুষের ভুল-ত্রুটি ক্ষমাকারী)। এরপর ইরশাদ হয়েছে- وَ اللهُ یُحِبُّ الْمُحْسِنِیْن আল্লাহ মুহসিনদের ভালবাসেন। অর্থাৎ ক্ষমাকারী হচ্ছে মুহসিন আর মুহসিনেরা আল্লাহ তাআলার প্রিয়পাত্র।

‘মুহসিন’ মানে কী? মুহসিন মানে, যার কর্ম সুন্দর, জীবন সুন্দর। জীবন ও কর্মে যে মানুষটি সৌন্দর্যের অধিকারী তিনি আল্লাহর প্রিয়। দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্য অর্জনকারী।

ক্ষমার সৌন্দর্য সব ভাষায় স্বীকৃত। আমাদের ভাষায় আমরা বলি ‘ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টি’। এই সৌন্দর্য আল্লাহর কাছে প্রিয়। এই সৌন্দর্যের দ্বারা আমাদের পার্থিব জীবনও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়। প্রীতি ও সদ্ভাবের স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে।

কুরআন মাজীদ সুন্দর-অসুন্দরের মাঝে কী পরিষ্কার পার্থক্যরেখা টেনে দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-

وَ لَا تَسْتَوِی الْحَسَنَةُ وَ لَا السَّیِّئَةُ.

‘সুন্দর আর অসুন্দর তো এক সমান নয়।’

এর পরের বাক্যটি কী? এর পরের বাক্যটি হচ্ছে-

اِدْفَعْ بِالَّتِیْ هِیَ اَحْسَنُ.

‘তুমি প্রতিহত কর ঐ পন্থায়, যা বেশি সুন্দর।’

মানুষের ভুল-ত্রুটি, অন্যায় অপ্রীতিকর আচরণ-উচ্চারণ কোন্ উপায়ে প্রতিহত করবে? অপেক্ষাকৃত সুন্দর উপায়ে। অশোভন কথার জবাবে শোভন কথা, অপ্রীতিকর আচরণের জবাবে প্রীতিকর আচরণ; ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করে মৃদু হেসে মন জয় করার চেয়ে সুন্দর বস্তু আর কী হতে পারে? কুরআন আমাদের ঐ ইন্দ্রিয়কে সজাগ করে, যার মাধ্যমে সুন্দর আচার-ব্যবহারের সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায়।

কর্ম ও আচরণের এই সুন্দর নীতির ফল কী হবে? পরের বাক্যে কুরআনে কারীম বলছে-

فَاِذَا الَّذِیْ بَیْنَكَ وَ بَیْنَهٗ عَدَاوَةٌ كَاَنَّهٗ وَلِیٌّ حَمِیْمٌ.

অর্থাৎ ঐ নীতির অভাবিতপূর্ব যে ফল তুমি দেখতে পাবে তা হচ্ছে, যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল সে তোমার উষ্ণ বন্ধুতে পরিণত হবে।

এই বন্ধুত্ব আজ কোথায় না প্রয়োজন! স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রয়োজন, বাবা ও সন্তানের মধ্যে প্রয়োজন, ভাই-ভাইয়ের মধ্যে প্রয়োজন, কর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে প্রয়োজন, পাড়া-পড়শির মধ্যে প্রয়োজন। এককথায় সমস্ত মুসলিমের মধ্যে প্রয়োজন।

প্রীতি ও বন্ধুত্বের এই সর্বপ্লাবী প্রয়োজন পূরণের উপায় আর কিছু নয়, নিজ নিজ কর্ম ও স্বভাবকে দুরস্ত করা। ক্ষমা ও সহনশীলতার বৈশিষ্ট্য অর্জন করা। ছাড় দেয়ার, ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করার যোগ্যতা অর্জন করা।

এই বৈশিষ্ট্যের ধর্ম হচ্ছে, এটি অতি ‘সংক্রামক’। জনে জনে তা সংক্রমিত হয়। একের সহনশীলতা অন্যকেও সহনশীল হতে সাহায্য করে। একের ভদ্রতা অন্যকেও ভদ্র করে তোলে। ধীরে ধীরে এর ফল প্রকাশিত হতে থাকে।

আমাদের এক সীমাবদ্ধতা হচ্ছে ত্বরা প্রবণতা। কোনো কিছুর ফল তাৎক্ষণিক দেখতে চাওয়া। অনেকটা সেই গল্পের মতো, ঐ যে এক ‘বুদ্ধিমান’ কোথাও শুনতে পেয়েছেন, আটার রুটিতে পেশিবহুল দেহ গঠিত হয়! ব্যস, তিনি আটার রুটি খেতে আরম্ভ করলেন। একটি করে রুটি খান আর মাস্ল পরীক্ষা করেন, তা কতটুকু টান টান হল!  তো এভাবে চলতে থাকলে কয়দিন চালাতে পারবেন তা তো খুব সহজেই বোধগম্য।

দেহের মাস্ল গঠিত হওয়ার চেয়েও কি সহজ স্বভাব-চরিত্র গঠিত হওয়া? না সহজ নয়। কাজেই এইক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ফলাফল প্রত্যাশা যেমন যৌক্তিক নয় তেমনি সবক্ষেত্রে সুখকরও নয়। আর তাই পার্থিব ফলাফলের দিকে চোখ না রাখাই ভালো। আমার কাজ আমি করে যাই, ফলাফল আল্লাহ তাআলাই দান করবেন।

মুমিনের পক্ষে তো এই চেতনায় উজ্জীবিত হওয়া খুব সহজ। কারণ মুমিনের প্রথম দৃষ্টি থাকে নিজের দিকে, নিজের মুক্তি ও নাজাতের দিকে, আখিরাতের প্রাপ্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে। আর এইসব বিষয় নির্ভর করে আমরা আমাদের করণীয় কতটুকু পালন করলাম- তার উপর; অন্যের মধ্যে এর সুফল কতটুকু হল- এর উপর নয়। কাজেই অপরের প্রতিক্রিয়া থেকে চোখ সরিয়ে যদি নিজের আখিরাতের দিকে নজর দিতে পারি, আখিরাতের পাথেয় হিসেবে ক্ষমা ও ভুল-ত্রুটি উপেক্ষার বিষয়টি চর্চা করতে পারি তাহলে ইনশাআল্লাহ আখিরাতের সাফল্য তো আসবেই, দুনিয়ার জীবনেও শান্তি নেমে আসবে।

অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মুচকি হেসে মোকাবেলা করা

অপরের ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনে। দাম্পত্য জীবনে ও সামাজিক জীবনে, বন্ধুদের পক্ষ হতে ও শত্রুদের পক্ষ হতে কত অবাঞ্ছিত, অপ্রীতিকর বিষয়েরই না তিনি মুখোমুখী হয়েছেন। এই সব বিষয় তিনি মোকাবেলা করেছেন অপরিসীম প্রজ্ঞা ও সহনশীলতার দ্বারা।

হাদীসের কিতাবে বেদুঈন লোকদের রুক্ষতা অম্লান বদনে সহ্য করার অসাধারণ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। হযরত আনাস রা. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হাঁটছিলাম। তাঁর পরনে ছিল একটি নাজরানী (ইয়েমেনী) চাদর, মোটা পাড় বিশিষ্ট। এক বেদুঈন তার কাছে এসে সেই চাদর ধরে সজোরে টান দিল। আমি দেখলাম মোটা পাড়ের ঘষায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাঁধে দাগ বসে গেল। লোকটি কর্কশস্বরে তাঁকে বলল, ‘مُرْ لِي مِنْ مَالِ اللهِ الّذِي عِنْدَكَ’ ‘আল্লাহর যে মাল তোমার কাছে আছে তা থেকে আমাকে কিছু দিতে বল!’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটির দিকে ফিরে তাকালেন এবং মুচকি হাসলেন এরপর তাকে কিছু দেয়ার আদেশ করলেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৩১৪৯

সরাসরি কুরআন মাজীদের কত বিষয়ের দিকে ইশারা করা হয়েছে।

সূরা আলে ইমরানের বিখ্যাত আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ،  وَ لَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِیْظَ الْقَلْبِ لَا نْفَضُّوْا مِنْ حَوْلِكَ،  فَاعْفُ عَنْهُمْ وَ اسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَ شَاوِرْهُمْ فِی الْاَمْرِ،  فَاِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَی اللهِ،  اِنَّ اللهَ یُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِیْنَ.

আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি বিনম্র থেকেছেন। আপনি যদি কর্কশ ও কঠোর মনের  হতেন তাহলে এরা সকলে আপনার চারপাশ থেকে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ত। সুতরাং তাদের ক্ষমা করুন, তাদের মাগফিরাতের জন্য দুআ করুন এবং (বিশেষ বিশেষ ব্যাপারে) তাদের পরামর্শ নিতে থাকুন। এরপর যখন আপনি কৃতসংকল্প হন তখন আল্লাহর উপর ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন ভরসাকারীদের ভালবাসেন। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৫৯

এই আয়াতের প্রেক্ষাপট মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করলে বোঝা যাবে, কেমন সহনশীল ছিলেন আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

অনেকেরই জানা আছে যে, আয়াতটি উহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে। সেই যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় যখন সময়ের ব্যাপারমাত্র তখনই দেখা দিল মহাবিপর্যয়। যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছে মনে করে গিরিপথের প্রহরায় নিয়োজিত ব্যক্তিগণ তা ছেড়ে চলে আসায় মুসলমানদের এই বিরাট বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। অনেক সাহাবী শহীদ হয়ে গেলেন। অনেকে আহত হলেন। স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারাত্মকভাবে আহত হলেন। এই অবস্থাটা আমরা যখন হাদীস-সীরাতের কিতাবে পড়ি তখন আমাদেরই মনে কী আফসোস তৈরি হয়- ইস! আর কিছুক্ষণ তাঁরা যদি গিরিপথের পাহারায় থাকতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিষ্কার আদেশ যদি তাঁরা মনে রাখতেন! তাহলে চিন্তা করুন, যারা ঐ যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের আফসোস কেমন হয়েছিল! আর সেদিন যারা গিরিপথের প্রহরায় নিয়োজিত ছিলেন তাদের দুঃখ-বেদনা কী যে গগণচুম্বী হয়েছিল তা আমাদের মতো দুর্বল ঈমানের লোকদের পক্ষে কি অনুমান করাও সহজ?

তাঁদের বুক-চেরা ‘আহ’ ধ্বনিই হয়তো নামিয়ে এনেছিল আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের আসমানী পয়গাম, যা সূরা আলে ইমরানের উহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ আয়াতগুলোতে আমরা পাঠ করি ও নিজ নিজ সংবেদন অনুসারে কিছু কিছু উপলব্ধি করি।

উপরোক্ত আয়াতটিও ঐ আয়াতগুলোর অন্যতম। এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোমলতা ও সহনশীলতাকে আল্লাহ-প্রদত্ত রহমত বলে বিশেষিত করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামের ভুল-ত্রুটিকে উপেক্ষা করার ও তাঁদের জন্য ইস্তিগফার করার আদেশ করেছেন। সুবহানাল্লাহ! স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁদের পক্ষে ইস্তিগফারের আদেশ করছেন! কাকে আদেশ করছেন? পেয়ারা নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। চিন্তাশীল মুমিন এখান থেকেই বুঝে নিতে পারেন, সাহাবায়ে কেরামের মাকাম ও মর্যাদা।

সমষ্টিগত জীবনে পরস্পরের ভুল-ত্রুটি ন¤্রতা ও সহনশীলতার সাথে গ্রহণের সুফল সম্পর্কেও আয়াতে ইঙ্গিত আছে। বলা হয়েছে যে, ‘আপনি যদি কঠোর মনের হতেন তাহলে ওরা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ বোঝা যাচ্ছে যে, চারপাশের মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোমল মনের, ন¤্র আচরণের ও ভুল-ত্রুটি উপেক্ষার অনেক প্রভাব। আমাদের পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবনের নানা ক্ষেত্রে এই মূলনীতি মনে রাখা আবশ্যক। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা, বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক রক্ষা, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা, সহকর্মী ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে সম্পর্ক রক্ষা, পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক রক্ষা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই ন¤্রতা, কোমলতা ও ভুল-ত্রুটি উপেক্ষা করতে পারার অনেক প্রভাব।

ভুল-ত্রুটি উপেক্ষার দ্বারা মহা লজ্জা থেকেও বাঁচা যায়। অর্থাৎ এমন হতে পারে যে, কোনো কথা বা কাজ ভুল মনে হওয়ার পরও তা উপেক্ষা করার পর দেখা গেল যে, ঐ কথা-কাজটি ভুল ছিল না। সেটাকে ভুল মনে করাই ছিল ব্যক্তির নিজের ভুল। তাহলে ঐসময় তার সাথে কঠোরতা করা হলে এখন লজ্জা পেতে হত। ‘ভুল’ উপেক্ষা করার বদৌলতে ভুলের লজ্জা থেকে মুক্তি পাওয়া গেল।

সারকথা হচ্ছে, কুরআন-সুন্নাহয় যে গুণ ও  বৈশিষ্ট্য অবলম্বনের আদেশ আমাদের করা হয়েছে, আমরা যদি সমর্পিতচিত্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তা অবলম্বন করি তাহলে আমার আখিরাত যেমন সুন্দর হবে, দুনিয়ার জীবনও সুন্দর হবে। সচ্চরিত্রের বিভায় আমাদের চারপাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। আমরা হব ‘আলোকিত’ মানুষ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দান করুন- আমীন।

আরও জানুন

যিনাকারী তওবা করার পর যিনাকৃত মহিলার কাছে ক্ষমা চাওয়া কি জরুরী?

প্রশ্ন From: প্রকাশে অনিচ্ছুক বিষয়ঃ অপরাধ ও গোনাহ প্রশ্নঃ আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। হযরত, প্রথমেই …