প্রচ্ছদ / তালাক/ডিভোর্স/হুরমত / ক্ষতিপূরণ দেবার শর্তে তালাক প্রদান করার হুকুম কী?

ক্ষতিপূরণ দেবার শর্তে তালাক প্রদান করার হুকুম কী?

প্রশ্ন

মুহতারাম মুফতি সাহেব,

গত চার মাস আগে আমি বিবাহ করেছিলাম। আমার বিবাহ পারিবারিকভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল। মেয়ের বাবা-মা খুব ভালো মানুষ। কিন্তু বিবাহের পর  প্রথম দিন থেকেই আমি দেখতে পেলাম, আমার স্ত্রী আমার প্রতি আগ্রহী না। এই পর্যন্ত সে আমার সাথে  কখনো মহব্বতপূর্ণ আচরণ করেনি। মন খুলে কখনো কথাও বলেনি। এমনকি অসুস্থতা ইত্যাদির বাহানা দেখিয়ে এ পর্যন্ত সে আমাকে তার সাথে  সহবাস করার সুযোগও দেয়নি ।  ভাবতাম, হয়তো সে বিয়েতে রাজি ছিল না,,, তাই…….। তারপরও আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া করেছি এবং তাকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি। অবশেষে সবকিছু দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেল। কিছুদিন আগে জানতে পারলাম যে, বিয়ের আগ থেকেই তার এক ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিল। বাবা মার কথার কারণে বাধ্য হয়েই আমার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। বিয়ের পরেও সে ঐ ছেলের সাথে যোগাযোগ রাখে। এখন সে তার সাথে পালিয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ দুই সপ্তাহ সেই ছেলের সাথে ছিল। এরপর প্রশাসনের মাধ্যমে তাদেরকে ধরে আনা হয় এবং ছেলেকে মামলা দিয়ে কোটে চালান দিয়ে দেওয়া হয় (মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে)। এখন মেয়ের পরিবার আবার তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছে। কিন্তু আমার পরিবারের কেউ কোনভাবেই তা মেনে নিতে পারছেন না। আমিও ব্যক্তিগতভাবে তাকে রাখতে চাচ্ছি না। তাই এখন তালাক দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।
উল্লেখ্য,
১. সে যেহেতো তাদের বাড়ির পাশেই এক মাদ্রাসায় পড়তো তাই এতদিন পর্যন্ত সে তাদের বাড়িতেই ছিল। আমাদের বাড়িতে  কয়েকবার  বেড়াতে এসেছিল।
২. তার সাথে খলওয়াতে সহীহা তথা নির্জনে অবস্থান হয়েছে কিন্তু এ পর্যন্ত সহবাস হয়নি। (রাতের বেলা সে অন্যদিকে ফিরে শুয়ে থাকতো। তার সাথে স্ত্রী সুলভ কোনো আচরণ করতে গেলে সে বিরক্তিভাব প্রকাশ করতো এবং কখনো ধমক দিত)।
৩. এত কিছুর পরও কোনদিন আমি তাকে ধমক দেইনি।  উচ্চ আওয়াজে তার সাথে কোন কথা বলিনি বরং আমি তাকে বারবার বুঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। এমনকি এই ঘটনার আগ পর্যন্ত পরিবারের কাউকে বিষয়টি আমি জানাইনি। ভেবেছিলাম হয়তো আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু…। জানতে পেরেছি,আমাদের পরিবারের কারো কারো সাথে তার আচরণ ও সুখকর ছিল না।
৪. বিবাহের আগেই আমি অর্ধেকের বেশি মোহর প্রদান করেছি। মোহর ও অন্যান্য খরচ সহ প্রায় দুই লক্ষ টাকা এই বিয়েতে আমাদের খরচ হয়েছে। ( বিয়ের অলিমা অনুষ্ঠান করা ছাড়াই )
বিয়ের পর থেকে এ পর্যন্ত সে যেহেতু কোন ধরনের হকই আদায় করেনি বরং খারাপ আচরণ করেছে তাই আমরা চাচ্ছি তাকে তালাক দিয়ে দেওয়া হবে এই শর্তে যে, বিবাহের মধ্যে আমাদের যাবতীয় খরচ হয়েছে তা আমাদেরকে ফেরত দিতে হবে। (এ বিষয়ে এখনো তাদের সাথে আমাদের কোন কথা হয়নি) কেননা আমরা তার প্রতি কোন ধরনের জুলুম করিনি এবং খারাপ আচরণও করিনি। একথা শপথ করে বললেও শপথ ভঙ্গকারী হবনা। ইনশাআল্লাহ।
জানার বিষয় হল, উল্লিখিত সকল অবস্থার প্রেক্ষিতে তার পরিবারের নিকট উক্ত দাবি করা শরীয়ত অনুযায়ী জায়েজ হবে কিনা। আর না হয় এক্ষেত্রে শরীয়তসম্মত সুন্দর সমাধান কি হতে পারে? বিষয়টির সঠিক সমাধান জানিয়ে কৃতার্থ করবেন।

নিবেদক
[নাম উহ্য রাখা হলো] বরুড়া, কুমিল্লা।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

যেহেতু আপনার বক্তব্য অনুপাতে স্ত্রীর উপর কোন প্রকার জুলুম করেননি। তাই আপনার জন্য ক্ষতিপুরণের বিনিময়ে স্ত্রীকে খোলা তালাক দেয়া শরীয়তসম্মত।

যদি স্ত্রীর পক্ষ উক্ত পরিমাণ টাকা খোলা তালাকের ভিত্তিতে প্রদানে দিতে রাজি হয়, তাহলেই কেবল উক্ত খোলা তালাক গ্রহণযোগ্য পতিত হবে এবং উক্ত পরিমাণ টাকা আপনার জন্য গ্রহণ করা জায়েজ হবে।

فإن طلقها على مال فقبلت وقع الطلاق ولزمها المال، تحته فى الفتح: وقوله فقبلت وقع الطلاق أى غير متوقف على الأداء ولزمها المال فيطالبها به الخ (فتح القدير، كتاب الطلاق، باب الخلع، دار الفكر بيورت-4/218، زكريا-4/196، كويته-4/64)

إذا علمت ذلك، فنقول: إذا قال لها: على أن تعطينى كذا فهو تعليق على فعل مستقبل صالح للمعاوضة فيشترط قبولها ليلزمها المال، فصار كأنه علقه على القبول إذ به يحصل غرضه من الطلاق بعوض فتطلق بالقبول وإن لم تعطه فى الحال (رد المحتار، كتاب الطلاق، باب الخلع، مطلب فى الفرق بين المصدر الصريح، زكريا-5/119، كرتاشى-3/462)

قال محمد فى الأصل، إذا قال الرجل لامرأته: أنت طالق بألف درهم، فقبلت طلقت وعليها ألف درهم (تاتارخانية-4/600، رقم-1037)

 

আমাদের পরামর্শ হলো, যদি স্ত্রী লোকটি ভবিষ্যতে এমন না করার দৃঢ় সংকল্প করে থাকে, অতীত অপরাধের জন্য তওবা করে, তাহলে তাকে স্ত্রী হিসেবে রাখাটাই উত্তম হবে।

বাকি তাকে তালাক দেয়াও আপনার জন্য নাজায়েজ হবে না।


عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: إِنَّ امْرَأَتِي لَا تَمْنَعُ يَدَ لَامِسٍ قَالَ: «غَرِّبْهَا» قَالَ: أَخَافُ أَنْ تَتْبَعَهَا نَفْسِي، قَالَ: فَاسْتَمْتِعْ بِهَا

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে অভিযোগ করলো, আমার স্ত্রী কোনো স্পর্শকারীর হাতকে নিষেধ করে না। তিনি বললেনঃ তুমি তাকে ত্যাগ করো। সে বললো, আমার আশংকা আমার মন তার পিছনে ছুটবে। তিনি বললেনঃ (যেহেতু ব্যভিচারের প্রমাণ নেই) তাহলে তুমি তার থেকে ফায়দা হাসিল করো। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২০৪৯, সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং-৩২২৯]

لا يجب على الزوج تطلق الفاجرة، ولا عليها تسريح الفاجر إلا إذا خان أن لا يقيما حدود الله، فلا بأس أن يتفرقا (الدر المختار مع الشامى-4\144

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

পরিচালক: শুকুন্দী ঝালখালী তা’লীমুস সুন্নাহ দারুল উলুম মাদরাসা, মনোহরদী নরসিংদী।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

“জিকিরের দ্বারা জিহবা তরোতাজা থাকলে হাসতে হাসতে জান্নাত” এটা কি হাদীস?

প্রশ্ন আসসালামু আলাইকুম প্রিয় মুফতী সাহেব, মহান  আল্লাহর জন্যই  আপনাকে  অনেক  ভালবাসি। আপনার লেখা পড়ি ও প্রচার করি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, হাসতে হাসতে জান্নাত যাওয়ার হাদিস আমি এতদিন মানুষকে বলতে না করেছি আপনার লেখা পড়ে, এখন একটা দলিল পেয়েছি। দয়া করে জানাবেন দলিল ঠিক আছে কিনা, তাহলে এই হাদিস আমিও প্রচার করব ইনশাআল্লাহ। উত্তর وعليكم السلام ورحمة الله …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস