হোম / আহলে হাদীস / মুজতাহিদ মুকাল্লিদ ও গায়রে মুকাল্লিদ বিষয়ে জরুরী জ্ঞাতব্যঃ [শেষাংশ]
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

মুজতাহিদ মুকাল্লিদ ও গায়রে মুকাল্লিদ বিষয়ে জরুরী জ্ঞাতব্যঃ [শেষাংশ]

লেখক– মুনাজিরে ইসলাম মাওলানা মুহাম্মদ আমীন সফদর ওকাড়বী রহঃ

অনুবাদঃ লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

প্রথমাংশটি পড়ে নিন
প্রশ্ন নং-৮
সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এর মাঝে কি এমন কোন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি রুকুর সময় কখনো রফয়ে ইয়াদাইন করতেন না? যে সকল সাহাবায়ে কেরাম রুকুর সময় রফয়ে ইয়াদাইন করতেন, তারা কি যারা রফয়ে ইয়াদাইন করতেন না তাদের গোমরাহ মনে করতেন? কিংবা সওয়াব থেকে বঞ্চিত মনে করতেন? নাকি তারা রফয়ে ইয়াদাইন ছেড়ে দেয়াকে আমলের প্রশস্ততা বলে মনে করতেন? সত্য যেটাই হোক উদ্ধৃতি পেশ করে প্রশ্নকর্তার মনে প্রশান্তি দেয়া অনুরোধ রইল।

উত্তর

সমস্ত আকাবীরে সাহাবাগণদের মুহাজির ও আনসার রাঃ দের মাঝে কারো থেকেই প্রথম তাকবীরের পর কোন স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন প্রমানিত নয়। মক্কা মুকাররমার মাঝেও দুই সাহাবী রাঃ এবং তাবেয়ীন রহঃ এর মাঝে রফয়ে ইয়াদাইন না করার আমল মুতাওয়াতির ছিল। যেমন মাইমুন মক্কী তাবেয়ী রহঃ এর বক্তব্য দ্বারা প্রমানিত। {আবু দাউদ] মদীনা মুনাওয়ারার মাঝেও খাইরুল কুরূনের মাঝে আমলী তাওয়াতুর তথা নিরবচ্ছিন্ন আমল তরকে রফয়ে ইয়াদাইন তথা রফয়ে ইয়াদাইন ছেড়ে দেয়াই ছিল। যা ইমাম মালিক রহঃ এর বক্তব্য দ্বারা সুষ্পষ্টভাবে প্রমানিত। [আলমুদাওয়ানাতুল কুবরা] কুফার মাঝে সাহাবাগণ রাঃ এবং তাবেয়ীগণ রহঃ দের মাঝে সনদসূত্রে এবং আমলসূত্রে তরকে রফয়ে ইয়াদাইনই মুতাওয়াতির ছিল।
যেমন ইমাম ইবরাহীম নাখয়ী রহঃ এর বক্তব্য দ্বারা বিষয়টি পরিষ্ফুটিত হয়। {মুসনাদে ইমামে আজম, মুয়াত্তা মুহাম্মদ}
তবে বসরাতে কতিপয় লোক রুকু ও সেজদার সময় রফয়ে ইয়াদাইন করতেন। যেমন ইমাম হাসান বসরী রহঃ বলেছেন। {আবু দাউদ}
কিন্তু কোন সাহাবী রাঃ বা তাবেয়ী রহঃ রফয়ে ইয়াদাইন ছেড়ে দেয়াকে গোমরাহী বা সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ বলে উল্লেখ করেন নি। তবে রফয়ে ইয়াদাইন করাকে অপরিচিত আমল মনে করা হতো। যেমনটি মাইমুন মক্কী রহঃ আব্দুল্লাহ বিন জুবায়ের রাঃ এর ব্যাপারে এবং ওহাইব বিন খালেদ আব্দুল্লাহ বিন তাউস তামীমী এর ব্যাপারে বলেছেন। {আবু দাউদ}আর কাজী মাহারিব বিন দাসার আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ থেকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছিলেন।

প্রশ্ন নং-৯

যেসব সাহাবাগণ ইমামের পিছনে ফাতিহা পড়তেন সে সকল সাহাবাগণ রাঃ কি যে সকল ব্যক্তিরা ইমামের পিছনে ফাতিহা পড়াকে ফরজ মনে করতো না তাদের গোমরাহ মনে করতেন? নাকি তারা এটাকে একটি ইজতিহাদী মাসআলা মনে করে চুপ থাকতেন।

উত্তর

وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ [٧:٢٠٤

আর যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তাকে কান লাগিয়ে রাখ এবং নিশ্চুপ থাক, যাতে তোমাদের উপর রহমত হয়। {সূরা আরাফ-২০৪}
উক্ত আয়াত নাজিল হওয়ার পর জমহুর তথা অধিকাংশ সাহাবাগণ ইমামের পিছনে কিরাত পড়তেন না। আর একথাতো কোন একজন সাহাবী থেকেও সনদসহ প্রমাণিত নয় যিনি বলেছেন যে, ইমামের পিছনে কিরাত না পড়লে নামায বাতিল ও বেকার। খোদ রাসূল সাঃ থেকেও একটি সহীহ সরীহ হাদীস প্রমাণিত নয়, যাতে তিনি এমন কথা বলেছেন। একারণে ইমামের পিছনে কিরাত যারা পড়েননি, তাদের না কেউ গোমরাহ বলেছেন, না তাদের বেনামাযী বলেছেন। কতিপয় সাহাবাগণ যে, ইমামের পিছনে কিরাত পড়তেন, সেটি তাদের ইজতিহাদ ছিল। যেটার উপর ইমাম ইবরাহীম নাখয়ী রহঃ কঠোরভাবে রদ করেছেন।

প্রশ্ন নং ১০

যে সকল মাসআলায় সাহাবাগণ রাঃ দের মাঝে আমলী মতভেদ ছিল, তাদের কোন একদলকে কি আমরা গোমরাহ বলতে পারি? নাকি সবাইকে ইজতিহাদের কারণে হক মানতে হবে? ইজতিহাদের উভয় দিক তথা ভুল ও সঠিকতাকে হক মানা যাবে কি না? যাদের কোন দলই শাস্তির উপযোক্ত সাব্যস্ত হবেন না?

উত্তর

সাহাবায়ে কেরাম রাঃ দের মাঝে যে মতভেদ ছিল, সেটি ছিল ইজতিহাদী মতভেদ। তাদের মাঝে যারা সঠিকতার উপর ছিলেন, তাদের সওয়াব দুটি। আর যারা ভুলের উপর ছিলেন তারা সওয়াব পেয়েছেন একটি। উভয় দলের আমলই সুনিশ্চিতভাবে মকবুল ছিল। তাই গোমরাহীর প্রশ্নই উত্থাপিত হয় না। এর উদাহরণ এমন যে, চারজন ব্যক্তি এমন স্থানে যেখানে কিবলা কোন দিকে তা জানা নেই। তখন সবাই তাহাররী তথা মনের প্রবল ধারণা অনুপাতে চার দিকে কিবলা নির্ধারণ করে নামায পড়ে নিয়েছেন। যদিও তাদের মাঝে সুনিশ্চিতভাবে একজনই কেবল কিবলার দিকে ফিরে নামায পড়েছেন। আর বাকি তিন জন সুনিশ্চিতভাবে গায়রে কিবলার দিকে ফিরে নামায পড়েছেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার রহমাতের প্রশস্ততার দ্বারা তাদের সবার নামায কবুল করে থাকেন। তাদের মাঝের কাউকেই গোমরাহ বলা যাবে না। সাহাবাগণ রাঃ এর পর চার ইমাম রহঃ এর মাঝে মতভেদও এ প্রকারের মাঝে শামিল। যে স্থানে যে ইমামের মাযহাব আমল হিসেবে মুতাওয়াতির তথা নিরবচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় আমল হিসেবে স্বীকৃত হবে, সেটার উপরই আমল করা ওয়াজিব। মুতাওয়াতি আমলের বিপরীত ফিতনাবাজী করা কিছুতেই আল্লাহ ও রাসূল সাঃ এর পছন্দনীয় নয়।

প্রশ্ন নং-১১

সাহাবা রাঃ দের যদি কোন মাসআলার উপর ইজমা তথা ঐক্যমত্ব হয়ে যায়, যেমন হযরত ওমর রাঃ এর শাসনামলে তিন তালাকের উপর হয়েছিল। তাহলে উক্ত ইজমাকে মানা উম্মতের জন্য জরুরী কি না? যদি না হয়, তাহলে সাহাবাগণের বিপরীত যে পথ অবলম্বন করা হবে, সেটি ويتبع غير سبيل المؤمنين তথা মুমিনদের থেকে ভিন্ন পথ অবলম্বন করা হবে কি না? যদি সমস্ত সাহাবাগণের একথার উপর ইজমা না হয়ে থাকে, তাহলে যে সাহাবী এ মতের বিরোধীতা করেছেন, তার নাম উদ্ধৃতিসহ দয়া করে বলুন।

উত্তর

তিন তালাক যখন স্ত্রীকে দেয়া হয়। তখন তিন তালাকই পতিত হয়। চাই বলুক “তোমাকে তিন তালাক” বা বলুক “তোমাকে প্রথম তালাক, দ্বিতীয় তালাক, তৃতীয় তালাক”।
এ মতের উপর হযরত ওমর রাঃ এর আমলে সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এর ইজমা হয়েছে। এরপর চার ইমাম রহঃ গণের মাঝেও এ ব্যাপারে ইজমা হয়েছে। যে ব্যক্তি এর বিপরীত ফাতওয়া দিয়ে থাকে, সে সুনিশ্চিতভাবে মুমিনদের পথ বিচ্যুত হয়ে গেছে। কোন একজন সাহাবী থেকেও এর বিপরীত কোন বক্তব্য প্রমানিত নয়।

প্রশ্ন নং-১২

সৌদী আরবের যেসব মাশায়েখ কুরআন ও হাদীসে অনুল্লেখিত তথা গায়রে মানসূসা মাসআলা বিষয়ে চার ইমামের মাঝে কোন একজনের অনুসরণকে ওয়াজিব বলে থাকে, তারা তাদের এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে হকের উপর আছে, না গোমরাহীতে আছে? যদি হকের উপর না থেকে থাকে, তাহলে পাকিস্তান ও ভারতের জামাআতে আহলে হাদীসরা তাদেরকে গোমরা বলে প্রচারণা কখনো করেছে কি? যদি না করে থাকে, তাহলে এ বিরত থাকা শুধু অর্থ সাহায্য বন্ধ হয়ে যাবার ভয়ে নয়কি?

উত্তর

আল্লামা সুলাইমান বিন সাহমান নজদী এর লেখা “আলহাদইয়াতুস সুন্নিয়াহ” এর উর্দু অনুবাদ “তোহফায়ে ওহাবিয়া” নামে মাওলানা ইসমাঈল গজনবী আহলে হাদীস সাহেব উমরতাসরী থেকে প্রকাশ করেছিল। এ বইয়ের ৬১ নং পৃষ্ঠায় একটি শিরোনাম হল- “আমাদের মাসলাক-হযরত ইমাম আব্দুল্লাহ বিন শায়খুল ইসলাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব রহঃ বলেন” আমরা শাখাগত মাসায়েলে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ এর মতের অনুসারী। যেহেতু চার ইমাম তথা আবু হানীফা, মালিক, শাফেয়ী ও আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ এর মাযহাব সুবিন্যস্ত। এ কারণে আমরা তাদের কোন মুকাল্লিদকে মন্দ বলি না। তাদের ব্যতীত যেমন রাফেজী, জায়দিয়া, ইমামিয়া ইত্যাদি মাযহাব যেহেতু সুবিন্যস্ত নয়, এ কারণে আমরা তাদের স্বীকৃতি দেই না। আমরা লোকদের বাধ্য করি, যেন তারা চার ইমামের মাঝে কোন এক ইমামের তাকলীদ করে। {তোহফায়ে ওহাবিয়া-৬১}
অথচ এর উল্টো গায়রে মুকাল্লিদদের নিকট চার ইমামের তাকলীদ শুধু বেদআত নয়, বরং শিরকও। কিন্তু তাদের এ ফাতওয়া শুধু পাকিস্তান, ভারতও বাংলাদেশে। সৌদি আরবের মাশায়েখরা তাদের অর্থ সাহায্য করে থাকে। এ কারণে তাদের উপর এ ফাতওয়া প্রয়োগ করে না। অথচ মৌলিকতা হিসেবে তাদের বাঁধা দেয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করা বেশি জরুরী ছিল। এক ব্যক্তি গালি-গালাজ করে বাজারে, সেও গোনাহগার। তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর ঘর কাবাগৃতে গালি-গালাজ করে, সে সুনিশ্চিতভাবে মারাত্মক গোনাহগার। এমনিভাবে যদিও শিরক ও বিদআত সাধারণ সাথেও মারাত্মক গোনাহ, সেখানে হারামাইন শরিফাইনে শিরক ও বিদআত করাতো জঘন্য গোনাহের শামিল। এটাকেতো প্রথমে বাঁধা দেয়া উচিত। কিন্তু দুনিয়াবী ফায়দার জন্য এ ধোঁকাবাজী ও সত্য-গোপনের মানসিকতা বড়ই জঘন্য ও মারাত্মক গোনাহ।

প্রশ্ন-১৩

কাবাগৃহে এবং মসজিদে নববীতে রমজান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহের জামাত কখন থেকে চালু হয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে সনটি বলে দিন। এছাড়া বলুন যে, হারামাইন শরিফাইনের ইমামদের এ আমল সঠিক না ভুল? ইসলামের চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে এ দুই মসজিদে কোন দিন কি আট রাকাতের তারাবীহ হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, তাহলে উক্ত সনটি সুনির্দিষ্টভাবে বলে দিন। সেই সাথে এ বক্তব্যের পক্ষে সহীহ উদ্ধৃতি পেশ করুন।

উত্তর

খলীফায়ে রাশেদ হযরত ফারূকে আজম রাঃ ১৪ হিজরীতে লোকদের তারাবীহ নামাযে জামাতের সাথে একত্র করে দিয়েছেন। {ইবনে আসীর-২/১২৪}
সমস্ত মুহাদ্দিসীন এবং ফুক্বাহায়ে কেরাম এ ব্যাপারে ঐক্যমত্ব যে, বিশ রাকাত তারাবীহ জামাতের সাথে পড়ার উপরই স্থীর হয়ে যায়। এরপর ১২৯০ হিজরী পর্যন্ত সমস্ত দুনিয়াতে একটি মসজিদও ছিল না, যাতে বিশ রাকাত তারাবীহ থেকে কমের জামাত হতো। ১২৯০ হিজরীতে এসে ভারতের একজন গায়রে মুকাল্লিদ আলেম মাওলানা মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবী আট রাকাত তারাবীহের ফাতাওয়া দেয়। পুরো জাতির মাঝে একটি নতুন মতভেদের উদ্ভব ঘটায়। আর এ মতভেদের লালন ভারতের মাঝে ইংরেজ শাসকদের সহযোগিতায় চলে। ইসলামের মার্কাজ হারামাইন শরিফাইনে আজ পর্যন্ত বিশ রাকাত তারাবীহ জামাতের সাথে পড়ানো হয়ে থাকে। খেলাফাতে রাশেদা থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত বাইতুল্লাহ ও মসজিদে নববীতে এটাই আমলী সূত্র পরম্পরায় চলে আসছে। এ কারণে তাদের এ আমল ভুল কিভাবে হতে পারে? খেলাফে রাশেদা থেকে নিয়ে আজ ১৪৩৪ হিজরী পর্যন্ত বাইতুল্লাহ ও মসজিদে নববীতে এক রাতের জন্য হলেও আট রাকাত তারাবীহ জামাতের সাথে অনুষ্ঠিত হয়নি।

প্রশ্ন নং-১৪

সহীহ বুখারী এবং জামে তিরমিজীর মাঝে কি শুধু রাসূল সাঃ এর হাদীসই আছে, নাকি সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এবং তাবেয়ীগণের আসার তথা বক্তব্য ও আমলও বিদ্যমান আছে?
এখন যদি কোন আহলে হাদীস নামধারী বলে যে, শুধু আল্লাহ ও রাসূলের কথাই মানো, আর কারো কোন কথা মানবে না। তাহলে এটি কি সেসব মুহাদ্দিসীনদের বিরোধী হচ্ছে না, যারা সাহাবাদের বক্তব্যকে হাদীসের সাথে বর্ণনা করেছেন?

উত্তর

আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত পর্যায়ক্রমে চারটি দলীল মেনে থাকে। যথা, কিতাবুল্লাহ, সুন্নতে রাসূল সাঃ, ইজমায়ে উম্মত ও কিয়াস। মুহাদ্দিসীন আহলে সুন্নতরা যেমনিভাবে সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ এর হাদীস একত্র করেছেন, তেমনি সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এর ইজমায়ী ফায়সালা এবং ফিক্বহী ফাতাওয়াকেও একত্র করেছেন। ইমাম বুখারী রহঃ উস্তাদ আবু বকর বিন শাইবা রহঃও আব্দুর রাজ্জাক রহঃ সাহবায়ে কেরাম তাবেয়ীগণের হাজারো ফিক্বহী ফাতাওয়া তাদের কিতাবে একত্র করেছেন। আর ইমাম তিরমিজী রহঃ তো প্রতিটি অধ্যায়ে ফিক্বহী মাযহাব বর্ণনা করেছেন। গায়রে মুকাল্লিদদের পদ্ধতি সাহাবায়ে কেরাম রাঃ, তাবেয়ীগণ রহঃ, তাবে তাবেয়ীগণ, মুজতাহিদ ইমামগণ এবং সমস্ত মুহাদ্দিসীনদের বিপরীত। এ বিরল ফিরক্বাটির আমলও কার্যক্রমও বিরল ও সম্পূর্ণ আলাদা।

প্রশ্ন নং-১৫

সিহাহ সিত্তার মাঝে কোন এমন কিতাব আছে কি, যা শুধুমাত্র রাসূল সাঃ এর হাদীস সমৃদ্ধ। তাতে আর কোন কথাই সন্নিবিষ্ট করা হয়নি? সিহাহ সিত্তার ছাড়া প্রথম চার শতাব্দীতে লিখিত কোন হাদীসের কিতাব রয়েছে, যাতে শুধুমাত্র রাসূল সাঃ এর হাদীসই আছে। অন্য কারো কোন বক্তব্য নেই। যদি থাকে তাহলে এর নাম বলে দিন।

উত্তর

চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের যত মুহাদ্দিসীন অতিক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মাঝে কেউই সাহাবায়ে কেরামের হাদীস এবং তাবেয়ীগণের ফাতওয়াকে অস্বিকার করেনি। একটি হাদীসের কিতাবও পাওয়া যায় না, যাতে ইজমা ও কিয়াসকে অস্বিকার করা হয়েছে। বরং সব ক’টিতে কিয়াসী বক্তব্য কম বেশি রয়েছেই। একটি কিতাবের নামও উল্লেখ করা যাবে না, যার অধ্যায় বা পরিচ্ছেদে কিয়াসের কোন দখল নেই।

প্রশ্ন নং-১৬

জঈফ ও মাউজু হাদীসের মাঝে পার্থক্য কী? জঈফ হাদীস যদি কোন স্তরেই গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলে সিহাহ সিত্তার সংকলকগণ জঈফ হাদীস কেন তাদের কিতাবে এনেছেন? বর্তমানে যদি কোন ফিরক্বা বা ব্যক্তি এসব হাদীসকে নতুন পদ্ধতিতে সংকলন করে, আর তিরমিজীকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয় সহীহ তিরমিজী আর জঈফ তিরমিজী নামে তাহলে সে কি মুহাদ্দিসীনদের “সহীহ ও জঈফ এক স্থানে থাকা উচিত, যেন জঈফ হাদীস স্পষ্টতা আর অন্য ইশারার ভিত্তিতে গ্রহণীয় হতে পারে” মাসলাকের বিরোধীতা করেনি?

উত্তর

মুহাদ্দিসীনে কেরাম রাঃ হাদীসের অনেক প্রকার বানিয়েছেন। তার মাঝে সহীহ ও মাউজুকে দুই প্রান্তে অবস্থান করছে। সবচে’ উত্তম হল সহীহ। আর সব চেয়ে নিকৃষ্ট হল মাউজু। মাঝখানে রয়েছে অনেক প্রকার। যেমন সহীহ লিগাইরিহী, হাসান লিজাতিহী, হাসান লিগাইরিহী, জঈফ।
জু’ফে করীব তথা যার যার শব্দ প্রমানিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি সর্বশেষ প্রকার। যেমন রাবীর ইখতিলাত তথা সংমিশ্রণ। মুখস্ত শক্তি দুর্বল হওয়া। ইত্যাদি কারণ বিদ্যমান হাদীস। এক্ষেত্রে তাদলীসে মুতাবাআত এবং শাওয়াহেদ হিসেবে উক্ত হাদীস দলীল হিসেবে উপস্থাপিত হয়ে থাকে। তাছাড়া অন্য হাদীস দ্বারা শক্তিশালী হয়ে এসব হাদীস কখনো হাসান লিগাইরিহী, এমন কি সহীহ লিগাইরিহী পর্যন্ত হয়ে যায়। তখনতো বিধি-বিধানের জন্যও তা দলীল হয়ে থাকে। যদি এমন নাও হয়, তবু তা তারগীব ও তারহীব তথা আমলে উৎসাহ প্রদান ও গোনাহ করতে ধমকী প্রদান বিষয়েতো জঈফ হাদীস স্বতন্ত্রভাবেই গ্রহণযোগ্য ও যথেষ্ট।

৬ষ্ঠ প্রকার হল, যে সব হাদীস মারাত্মক পর্যায়ের জঈফ। যেমন বর্ণনাকারীর ফাসেক হওয়া সর্বজন বিদিত। কিংবা মিথ্যুক হয়ে থাকে। তাহলে এমন জঈফ হাদীস বিধানের ক্ষেত্রে অগ্রহণীয়। আর ফাযায়েলের ক্ষেত্রে কতিপয়ে নিকট অগ্রহণীয়। আর কতিপয়ের নিকট যদি একাধিক সুত্রে বর্ণিত হয়, তাহলে ফাযায়েলের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে। নতুবা নয়।
সপ্তম প্রকার হল, “মুত্তাহাম বিলকিজব” তথা যা মিথ্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন হাদীস। এটি জঈফের সববে’ মারাত্মক প্রকার। কিন্তু তাকেও মওজু বলা হয় না। কেননা, এটির প্রমাণিত হওয়া সন্দেহযুক্ত। তেমনি মিথ্যা হওয়াও সুনিশ্চিত নয়।
অষ্টম প্রকার হল, মওজু। যেটি মিথ্যা হওয়া প্রমাণিত।
বর্তমানে যে কিতাবের উক্ত হাদীসগুলোকে পৃথক করে দিয়ে আলাদা কিতাব রচনা করা হয়েছে, এটি শুধু মুহাদ্দিসীনদের উদ্দেশ্যকে বিনষ্ট করাই নয়, বরং সুন্নতের সাথে দুশমনীর একটি চূড়ান্ত নজীর।

প্রশ্ন নং-১৭

ইসলামের ইতিহাসে ইলমে ফিক্বহ তথা ফিক্বহী ইলম সর্বপ্রথম সন্নিবেশিত হয়েছে না ইলমে হাদীস তথা হাদীসের ইলম? চার ইমাম প্রথমে হয়েছে না সিহাহ সিত্তার সংকলক প্রথমে হয়েছে?
উম্মতের সর্ব প্রথম ফিক্বহের প্রয়োজন হয়েছে? না হাদীসের? যেভাবে দ্বীনের আমলী নকশা ফিক্বহের কিতাবে পাওয়া যায়, এমনিভাবে কি নামাযের আমলী নকশা হাদীসের কিতাবে পাওয়া যায়?

উত্তর

ইসলামের ইতিহাসে ফিক্বহের চার ইমাম প্রথমে এসেছেন। আর সিহাহ সিত্তার সংকলক পরে এসেছেন। তাদের মৃত্যুর বছরগুলোর দিকে দেখলেই তা প্রতিভাত হয়ে উঠবে। যথা- ইমামে আজম আবু হানীফা রহঃ এর মৃত্যু ১৫ হিজরী। ইমাম মালিক রহঃ এর মৃত্যু ১৭৯ হিজরী। ইমাম শাফেয়ী রহঃ এর মৃত্যু ২০৪ হিজরী। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহঃ এর মৃত্যু ২৪১ হিজরী।
আর ইমাম বুখারী রহঃ এর মৃত্যু ২৫৬ হিজরী। ইমাম মুসলিম রহঃ এর মৃত্যু ২৬১ হিজরী। ইমাম ইবনে মাজাহ রহঃ এর মৃত্যু ২৭৩ হিজরী। ইমাম আবু দাউদ রহঃ এর মৃত্যু ২৭৫ হিজরী। ইমাম তিরমিজী রহঃ এর মৃত্যু ২৭৯ হিজরী। ইমাম নাসায়ী রহঃ এর মৃত্যু ৩০২ হিজরী।

যেমনিভাবে হযরত আলী রাঃ তিনজন খলীফায়ে রাশেদের পর এসে পূর্বের তিন খলীফায়ে রাশেদকে ভুল সাব্যস্ত করেননি। বরং তাদের সমর্থন করেছেন। ঠিক তেমনি সিহাহ সিত্তার সংকলকগণ ফিক্বহের চার ইমামের পরে এসেছেন। তাদের কোন কিতাবে একটি অধ্যায়ও স্থাপন করেন নি। যার শিরোনাম হল, রদ্দে হানাফিয়্যাত, রদ্দে মালিকিয়্যাত, রদ্দে শাফিয়িয়্যাত কিংবা রদ্দে হাম্বলিয়্যাত নামে। বরং তারা ফিক্বহকে সমর্থন করেছেন। ইজমা ও কিয়াসকে সমর্থন করে ফিক্বহী মাযহাবকে আরো শক্তিশালী করেছেন। সিহাহ সিত্তার সংকলকগণের মাঝে একজনও দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ আমলী নকশা পেশ করেননি। কেননা, এ কাজ চার ইমামগণ প্রথমেই করে ফেলেছেন। আর উম্মত এর উপর আগে থেকেই আমল করে যাচ্ছে। বুঝা গেল যে, দ্বীনের উপর আমল করার জন্য প্রথম ও পূর্ণ জরুরত হল ফিক্বহের। এ কারণে এটি প্রথমে সংকলিত করা হয়েছে। আর মুহাদ্দিসীনগণও এটাকে চারই রেখেছেন। তাদের বিরোধীতা করেননি।

প্রশ্ন নং-১৮

সিহাহ সিত্তার রাবীদের অবস্থা যা হাফেজ জাহাবী রহঃ ও হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ এর কিতাব থেকে পাওয়া যায়। এসব বক্তব্য ইবনে হাজার থেকে নিয়ে হাদীসের রাবীদের পযন্ত নিরবচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় পৌঁছে? নাকি শুধু এসব মুহাদ্দিসীনদের নির্ভরতার উপর গ্রহণ করা হয়ে থাকে? এখানে সনদের প্রয়োজনীতাকে জরুরী মনে না করা, আর নির্ভরতার উপর আমল করা কোন হাদীসের ভিত্তিতে জায়েজ সাব্যস্ত করা হল? এর উদ্ধৃতি উল্লেখ করুন।

উত্তর

পুর্বের জবাবে আপনি নিশ্চয় জেনেছেন যে, সিহাহ সিত্তার সংকলকগনের মাঝে সর্বশেষ হলেন ইমাম নাসায়ী রহঃ। তিনি ৩০৩ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন। যার দ্বারা বুঝা গেল, সিহাহ সিত্তার রাবীগণ প্রথম তিন শতাব্দীর সাথে সম্পৃক্ত। অথচ আল্লামা জাহাবী রহঃ ৮৪৮ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন। আর হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ ৮৫২ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তাহলে কি দাঁড়াল? তাদের মাঝে এবং উক্ত রাবীদের মাঝে ছয় থেকে সাত বছরের দূরত্ব। যার কোন সনদ তাদের কিতাবে বিদ্যমান নেই। তারা সনদ ছাড়া শুধু মাত্র মুহাদ্দিসীনদের বক্তব্য অনুসারে তাদের উপর নির্ভর করে কিতাব সংকলিত করেছেন। এ কথা কোন হাদীসের কিতাবে নেই যে, যদি কোন তাবেয়ী রাসূল সাঃ এর ইন্তেকালের দ্বিতীয় দিনও ঈমান এনে থাকে, তবু তার হাদীসকে মুরসাল বলে বাতিল করে দেয়া হবে, আর আল্লামা জাহাবী রহঃ ও হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ সাত বছর পরের সনদহীন বক্তব্যের দ্বারা রাবীদের সিক্বা বা জঈফ বললে তার উপর ঈমান আনতে হবে।

প্রশ্ন নং-১৯

শাখাগত মাসায়েলে দলাদলি করা জায়েজ আছে কি নেই? সাহাবায়ে কেরামদের মাঝে আমীন জোরে বলা আর আস্তে বলা, রফয়ে ইয়াদাইন করা না করা ইত্যাদি বিষয়ে কোন দলাদলি ছিল? যদি না থেকে থাকে, তাহলে এসব মাসআলা নিয়ে দল বানানো, সংগঠন বানানো কি বেদআত নয়?

উত্তর

সাহাবায়ে কেরাম রাঃ গণ শাখাগত মাসায়েলে কোন দলাদলি ছিল না। তাই এসব বেদআত হওয়ার মাঝে কোন সন্দেহ নেই।

প্রশ্ন নং-২০

দুনিয়াতে কোথাও হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী বা হাম্বলীদের মধ্যকার ফিক্বহী মতভেদের উপর কি কোন সংগঠন আছে? যদি না থাকে, তাহলে গায়রে মুকাল্লিদদের এ “আহলে হাদীস” নামি এ সংগঠন কেন প্রতিষ্ঠা করা হল? এটি তখনি হতে পারে, যখন এসব সংগঠন এসব শাখাগত মাসায়েলকে মৌলিক মাসায়েল মনে করছে। আর শাখাগত মাসায়েলেও দলাদলি করাকে জায়েজ মনে করে থাকে।

উত্তর

চার মাযহাবের মুকাল্লিদদের এমন কোন সংগঠন নেই। এ বেদআতি কর্ম কেবলমাত্র নামধারী আহলে হাদীসরাই শুরু করেছে। আর এর কারণ হল এই যে, এ লোকেরা শুধুমাত্র মুর্খতা আর জিদের বশবর্তী হয়ে শাখাগত মাসায়েলকে উসূলী তথা মৌলিক মাসআলা মনে করে থাকে।

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

প্রসঙ্গ মুয়াবিয়া রাজিআল্লাহু আনহুঃ সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কিত ইতিহাস পাঠের মূলনীতি

আবূ মুয়াবিয়া লুৎফুর রহমান ফরায়েজী ইতিহাস রচয়িতাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা ঐতিহাসিক ঘটনা লিপিবদ্ধকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন …