প্রচ্ছদ / আধুনিক মাসায়েল / করোনা মহামারীর কারণে লকডাউন অবস্থায় জুমআ ও যোহর আদায় সম্পর্কে যা জানা জরুরী

করোনা মহামারীর কারণে লকডাউন অবস্থায় জুমআ ও যোহর আদায় সম্পর্কে যা জানা জরুরী

প্রশ্ন

মুফতী সাহেবের কাছে আমার প্রশ্ন দু’টি।

এক হল, যে এলাকায় জুমআ পড়া আবশ্যক নয়, এমন এলাকায় যোহরের নামায জামাতের সাথে আদায় করা যাবে কি?

দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, যে এলাকায় জুমআ পড়া আবশ্যক। কিন্তু কোন কারণে জুমআ আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। যেমন এখন বাংলাদেশে করোনা মহামারীর কারণে জামে মসজিদে দশজনের বেশি জুমআ জামাতে অংশগ্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে যারা জুমআ আদায় করতে পারছেন না, তাদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ করছি।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

যে ব্যক্তি এমন এলাকায় বসবাস করে, যেখানে জুমআ পড়া আবশ্যক নয়, এমন স্থানে আজান ও ইকামতসহ জামাআতের সাথে জোহর আদায় করবে।

من لا تجب عليهم الجمعة لبعد الموضع صلوا الظهر بجماعة (رد المحتار-3\33

أما فى حق أهل السواد فغير مكروه، لأنه لا جمعة عليهم (حاشية الطحطاوى على الدر-1\346

ومن لا تجب عليهم الجمعة من أهل القرى والبوادى لهم أي يصلوا الظهر بجماعة يوم الجمعة بأذان وإقامة (الفتاوى الخانية على هامش الهندية-1\177

কিন্তু যাদের উপর জুমআ পড়া আবশ্যক। আবার উক্ত এলাকায় জুমআ আদায়ের যাবতীয় শর্ত পাওয়া যায় এবং উক্ত এলাকায় জুমআ আদায়ও করা হয়। কিন্তু কতিপয় লোক কোন উজরের কারণে জুমআয় অংশগ্রহণ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাদের জন্য জামাতের সাথে যোহর আদায় করা মাকরূহ হবে। তাই জামাত ছাড়া আলাদা আলাদাভাবে যোহরের নামায আদায় করে নিবে।

যেমন বাংলাদেশে জুমআর নামায পড়া জায়েজ হলেও লকডাউনের কারণে মসজিদে জুমআর জামাতে অনেকে শরীক হতে পারছেন না। এমতাবস্থায় যারা জুমআ নামাযে শরীক হতে পারছেন না,বা অন্যত্র জুমআ আদায় করতে পারছেন না, তাদের জন্য যোহরের নামায জামাতে পড়া মাকরূহে তাহরীমী হবে। তা’ই যোহরের নামায জামাত ব্যতীত একাকী আদায় করাই বাঞ্ছনীয়।

সেই সাথে যোহরের নামায জুমআ হবার পর আদায় করাই উত্তম। তবে সময় হতেই আদায় করে ফেললেও আদায় হয়ে যাবে।

قال محمد رحمه الله: ويكره أن يصلي الظهر يوم الجمعة في المصر بجماعة في سجن وغير سجن، هكذا روي عن علي رضي الله عنه، والمعنى فيه: أن المأمور به

في حق من يسكن المصر في هذا الوقت شيآن، ترك الجماعة وشهود الجمعة، فأصحاب السجون قدروا على أحدها وهو ترك الجماعة، فيأتون بذلك ولو جوزنا للمعذور إقامة الظهر بالجماعة ربما يقتدي بهم غير المعذور، وفيه تقليل الناس في الجامع.

بخلاف القرى حيث يصلي أهلها الظهر بالجماعة؛ لأنه ليس على من يسكنها شهود الجمعة، فكان هذا اليوم في حقهم كسائر الأيام، والمسافرون إذا حضروا يوم الجمعة في مصر يصلون فرادى، وكذلك أهل المصر إذا فاتتهم الجمعة، (المحيط البرهانى فى فقه النعمانى، كتاب الصلاة، الفصل الخامس والعشرون فى صلاة الجمعة-2\92)

وَمَنْ لَا تَجِبُ عَلَيْهِمْ الْجُمُعَةُ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى وَالْبَوَادِي لَهُمْ أَنْ يُصَلُّوا الظُّهْرَ بِجَمَاعَةٍ يَوْمَ الْجُمُعَةِ بِأَذَانٍ وَإِقَامَةٍ وَالْمُسَافِرُونَ إذَا حَضَرُوا يَوْمَ الْجُمُعَةِ فِي مِصْرٍ يُصَلُّونَ فُرَادَى وَكَذَلِكَ أَهْلُ الْمِصْرِ إذَا فَاتَتْهُمْ الْجُمُعَةُ وَأَهْلُ السِّجْنِ وَالْمَرَضِ وَيُكْرَهُ لَهُمْ الْجَمَاعَةُ، كَذَا فِي فَتَاوَى قَاضِي خَانْ (الفتاوى الهندية-1\145)

(وَكُرِهَ يَوْمَهَا) أَيْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ (بِمِصْرٍ) احْتِرَازٌ عَنْ السَّوَادِ (ظُهْرُ مَعْذُورٍ وَمَسْجُونٍ وَمُسَافِرٍ وَأَهْلِ مِصْرٍ فَاتَتْهُمْ الْجُمُعَةُ بِجَمَاعَةٍ) مُتَعَلِّقٌ بِقَوْلِهِ ظُهْرُ مَعْذُورٍ، وَإِنَّمَا كُرِهَ لِمَا فِيهِ مِنْ الْإِخْلَالِ بِالْجُمُعَةِ؛ لِأَنَّهَا جَامِعَةٌ لِلْجَمَاعَاتِ بِخِلَافِ أَهْلِ السَّوَادِ إذْ لَا جُمُعَةَ عَلَيْهِمْ، وَلَوْ صَلَّوْا أَجْزَأَهُمْ لِاسْتِجْمَاعِ شَرَائِطِهِ وَمِنْهُ يُعْلَمُ كَرَاهَةُ ظُهْرِ غَيْرِ الْمَعْذُورِ بِطَرِيقِ الْأَوْلَى.

(وَ) كُرِهَ (ظُهْرُ غَيْرِهِمْ) أَيْ غَيْرِ الْمَعْذُورِ وَالْمَسْجُونِ وَالْمُسَافِرِ (قَبْلَهَا) أَيْ الْجُمُعَةِ لِمَا مَرَّ مِنْ الْإِخْلَالِ (درر الحكام شرح غرر الأحكام، كتاب الصلاة، شروط الجمعة-1\139)

فَإِنَّ أَدَاءَ الظُّهْرِ بِجَمَاعَةٍ مَكْرُوهٌ يَوْمَ الْجُمُعَةِ مُطْلَقًا قَالَ فِي الظَّهِيرِيَّةِ جَمَاعَةٌ فَاتَتْهُمْ الْجُمُعَةُ فِي الْمِصْرِ فَإِنَّهُمْ يُصَلُّونَ الظُّهْرَ بِغَيْرِ أَذَانٍ، وَلَا إقَامَةٍ، وَلَا جَمَاعَةٍ اهـ.

وَذَكَرَ الْوَلْوَالِجِيُّ، وَلَا يُصَلِّي يَوْمَ الْجُمُعَةِ جَمَاعَةٌ فِي مِصْرٍ، وَلَا يُؤَذِّنُ، وَلَا يُقِيمُ فِي سِجْنٍ وَغَيْرِهِ لِصَلَاةٍ، وَلَوْ زَادَ أَوْ أَدَاؤُهُ مُنْفَرِدًا قَبْلَ صَلَاةِ الْإِمَامِ لَكَانَ أَوْلَى لِمَا فِي الْخُلَاصَةِ وَيُسْتَحَبُّ لِلْمَرِيضِ أَنْ يُؤَخِّرَ الصَّلَاةَ إلَى أَنْ يَفْرُغَ الْإِمَامُ مِنْ صَلَاةِ الْجُمُعَةِ وَإِنْ لَمْ يُؤَخِّرْهُ يُكْرَهُ هُوَ الصَّحِيحُ اهـ. (البحر الرائق شرح كنز الدقائق، كتاب الصلاة، شروط وجوب الجمعة-2\166)

وفى مراقى الفلاح: “ويكرهان” أي الأذان والإقامة “لظهر يوم الجمعة في المصر” لمن فاتتهم الجمعة كجماعتهم مثل المسجونين “

وفى حاشيته: قوله: “لمن فاتتهم الجمعة” سواء كان لعذر أم لا قبل صلاة الجمعة أو بعدها بجماعة أم لا (حاشية الطحطاوى على مراقى الفلاح-200)

وفى الدر المختار: (وَكُرِهَ) تَحْرِيمًا (لِمَعْذُورٍ وَمَسْجُونٍ) وَمُسَافِرٍ (أَدَاءُ ظُهْرٍ بِجَمَاعَةٍ فِي مِصْرٍ) قَبْلَ الْجُمُعَةِ وَبَعْدَهَا لِتَقْلِيلِ الْجَمَاعَةِ وَصُورَةِ الْمُعَارَضَةِ وَأَفَادَ أَنَّ الْمَسَاجِدَ تُغْلَقُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إلَّا الْجَامِعَ

(وَكَذَا أَهْلُ مِصْرٍ فَاتَتْهُمْ الْجُمُعَةُ) فَإِنَّهُمْ يُصَلُّونَ الظُّهْرَ بِغَيْرِ أَذَانٍ وَلَا إقَامَةٍ وَلَا جَمَاعَةٍ. وَيُسْتَحَبُّ لِلْمَرِيضِ تَأْخِيرُهَا إلَى فَرَاغِ الْإِمَامِ وَكُرِهَ إنْ لَمْ يُؤَخِّرْ هُوَ الصَّحِيحُ

وفى رد المحتار: (قَوْلُهُ وَصُورَةِ الْمُعَارَضَةِ) لِأَنَّ شِعَارَ الْمُسْلِمِينَ فِي هَذَا الْيَوْمِ صَلَاةُ الْجُمُعَةِ وَقَصْدُ الْمُعَارَضَةِ لَهُمْ يُؤَدِّي إلَى أَمْرٍ عَظِيمٍ فَكَانَ فِي صُورَتِهَا كَرَاهَةُ التَّحْرِيمِ رَحْمَتِيٌّ (الدر المختار مع رد المحتار، كتاب الصلاة، باب الجمعة-3\33)

তবে শহরের অধিবাসী যারা মা’জূর নয়, কিন্তু তারা অলসতাবশতঃ জুমআ আদায় করেনি। তাদের জন্য জুমআর নামায আদায় হয়ে যাবার পর যোহরের জামাত করাও মাকরূহ। তবে তা মাকরূহে তাহরীমী নয়, বরং মাকরূহে তানযীহী।

তাই এক্ষেত্রেও একাকী যোহর পড়াই উচিত।

(قَوْلُهُ وَكَذَا أَهْلُ مِصْرَ إلَخْ) الظَّاهِرُ أَنَّ الْكَرَاهَةَ هُنَا تَنْزِيهِيَّةٌ لِعَدَمِ التَّقْلِيلِ وَالْمُعَارَضَةِ الْمَذْكُورَيْنِ وَيُؤَيِّدُهُ مَا فِي الْقُهُسْتَانِيِّ عَنْ الْمُضْمَرَاتِ يُصَلُّونَ وُحْدَانًا اسْتِحْبَابًا (قَوْلُهُ بِغَيْرِ أَذَانٍ وَلَا إقَامَةٍ) قَالَ فِي الْوَلْوَالِجيَّةِ وَلَا يُصَلِّي يَوْمَ الْجُمُعَةِ جَمَاعَةً بِمِصْرٍ وَلَا يُؤَذِّنُ وَلَا يُقِيمُ فِي سِجْنٍ وَغَيْرِهِ لِصَلَاةِ الظُّهْرِ اهـ (الدر المختار مع رد المحتار، كتاب الصلاة، باب الجمعة-3\33)

আমাদের পরামর্শ

যেহেতু জামে মসজিদগুলোত সরকারী নির্দেশনা মোতাবিক দশজনের বেশি মুসল্লি অংশগ্রহণ করতে পারছে না। তা’ই যেসব এলাকায় জুমআ আদায় করা জায়েজ, সেই সকল এলাকার পাঞ্জেগানা মসজিদ বা বাড়ি ঘরের আঙ্গিনা, উঠুন, ছাদ বা মাঠে সুস্থ্য ব্যক্তিদের নিয়ে জুমআ আদায়ের ব্যবস্থা করা উচিত।

এর জন্য শর্ত হল, আগেই সকলকে জানাতে হব যে, এখানে জুমআ হবে অর্থাৎ ইজনে আমের শর্তটি পাওয়া যেতে হবে। সেই সাথে আজান ইকামত, খুতবা এবং ইমাম ব্যতীত তিনজন মুসল্লী থাকা আবশ্যক।

তবে এক্ষেত্রেও

সরকারী নির্দেশনা ফলো করে অসুস্থ্য ও বয়স্কদের এবং করোনায় আক্রান্ত হবার শংকা আছে এমন ব্যক্তিদের জুমআ অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

সেই সাথে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা এবং সামাজিক দূরত্ব যথাসম্ভব রক্ষা করতে হবে।

যাদের ঠান্ডা কাশি রয়েছে তারাও জুমআয় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকবেন।

নামাযের আদায়ের স্থানটি সম্ভব হলে স্যানিটারাইজ করতে হবে।

খুতবা ও নামায সংক্ষেপে শেষ করতে হবে।

নামাযের আগের দীর্ঘ বাংলা বয়ান পরিহার করতে হবে।

গা ঘেঁষে না দাঁড়িয়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে কাতারে দাঁড়াতে হবে।

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক ও প্রধান মুফতী – তা’লীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল-ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

করোনা পরিস্থিতির কারণে এক মসজিদে একাধিক ঈদের জামাত করার হুকুম কী?

প্রশ্ন আসসালামু আলাইকুম হুযুর, আল্লাহ আপনাদের দ্বীনি খেদমতকে কবুল করুক। আমিন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার মসজিদে একাধিক জামাতে ঈদের নামাজ পড়ার জন্য আদেশ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *