হোম / আধুনিক মাসায়েল / মাল্টিলেভেল মার্কেটিংঃ পরিচয় ও শরয়ী বিধান [পর্ব-২]
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

মাল্টিলেভেল মার্কেটিংঃ পরিচয় ও শরয়ী বিধান [পর্ব-২]

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ

১ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন

শরীয়তের দৃষ্টিতে এমএলএম

যেহেতু এই মজলিসে উপস্থিত সকলেই কোনো না কোনো ফতোয়া বিভাগ বা তাখাসসুস-এর সাথে জড়িত তাই এমএলএম-এর শরয়ী হুকুম নিয়ে আলোচনার পূর্বে ফিকহুল মুআমালা তথা ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেন সংক্রান্ত কিছু মৌলিক কথা আরজ করছি। সীমিত সময়ে অনেক কিছুই হয়ত বলা সম্ভব হবে না। তাই মোটা মোটা কয়েকটা কথা বলব।

ফিকহুল মুআমালার মাসআলাগুলোর জবাব দেওয়ার পূর্বে করণীয়

নতুন কোনো বিষয় সামনে এলে প্রথমে তা ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তাড়াহুড়ো করা যাবে না। প্রশ্নের বিষয়টি বুঝে না এলে প্রশ্নকারীকে ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কারবার সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আছেন এমন ব্যক্তিদের থেকেও তথ্য ও ব্যাখ্যা নেওয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, লেনদেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ যে কোনো নতুন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত বিষয়টি যথাযথ উপলব্ধি করা সঠিক জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত।

বিষয়টা ভালোভাবে বোঝার পর এ ক্ষেত্রে শরীয়তের কী কী মৌলিক নীতি তথা উসূল ও যাওয়াবেত রয়েছে সেগুলো মাথায় হাযির করতে হবে।

নীতিমালা ও যাওয়াবেতের আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম যেসব সমাধান দিয়ে গেছেন তাতে যদি বিষয়টা পেয়ে যাই এবং উত্থাপিত মাসআলাটির বর্তমান বিবরণ ও প্রেক্ষাপট যদি পূর্বে বর্ণিত মাসআলার মতোই হয় তাহলে সেখান থেকেই তথা ফিকহি জুযইয়াত থেকেই সমাধান দেওয়া হবে।

আর যদি বিষয়টা একেবারেই নতুন হয় অথবা মাসআলা পুরাতন হলেও এর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হয় বা উদ্দেশ্য ও পারিপার্শ্বিক দিক থেকে নতুনত্ব থাকে তবে দুইটি কাজ একসাথে করতে হবে : ক) ফিকহি জুযইয়্যাত দেখতে হবে। খ) উসূল ও যাওয়াবিত দেখতে হবে।

এবং দেখতে হবে যে, উসূলের সাথে জুযইয়্যাত সাংঘর্ষিক তো নয়। সাংঘর্ষিক হলে ফিকির করতে হবে। কেননা
বাস্তবেই সাংঘর্ষিক হলে জুযইয়া গ্রহণযোগ্য হবে না।

ফিকহুল মুআমালা সংক্রান্ত কিছু নীতিমালা (উসূল)

শরীয়তের অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় মুআমালার ক্ষেত্রেও এমন কিছু না সূচক উসূল ও যাওয়াবিত রয়েছে, যেগুলো খুবই মজবুত এবং সুদূর ফলপ্রসু। এখনো যদি এসব উসূলের আলোকে অর্থ ও বাণিজ্যব্যবস্থা সাজানো হয় তাহলে তা অবশ্যই সফল হতে বাধ্য।

বর্তমানে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা পতনের দিকে চলেছে, ইসলামের ঐ উসূলগুলো মেনে নিয়ে নিষিদ্ধ বিষয়াবলি থেকে যদি বেঁচে থাকা হত তাহলে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখাপেক্ষী হওয়া লাগত না।

ফিকহুল মুআমালা তথা লেনদেন বিষয়ক শরীয়তের সেই মৌলিক নির্দেশনাগুলোর কয়েকটি এই :

১  الأكل بالباطل তথা অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা।

কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

ولا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل

তোমরা পরস্পরে একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না। (সূরা বাকারা : ১৮৮)

‘আকলবিল বাতিল’ বিষয়ে ফিকহের একটি বড় অধ্যায় রয়েছে।

২ ‘আলগারার’ বা প্রতারণা।

হাদীসে এসেছে-

نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن بيع الغرر

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘গারার’যুক্ত বেচাকেনা থেকে নিষেধ করেছেন।-সহীহ মুসলিম,
হাদীস : ৩৭৮১; মুসনাদে আহমদ ১/৩০২, হাদীস : ২৭৫২

এ বিষয়েও ফিকহুল মুআমালার একটি অধ্যায় রয়েছে।

৩ ‘বাই ওয়া শর্ত’।

হাদীস শরীফে আছে-

لا يحل سَلَفٌ وبيع ولا شرطان في بيع

-জামে তিরমিযী, হাদীস : ১২৩৪; মুসনাদে আহমদ ২/১৭৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৫০৪; জামিউল মাসানিদ ২/২২

এটিও ফিকহের একটি অধ্যায়।

৪ ‘আলগাবানুল ফাহিশ’। এটিও ফিকহের একটি অধ্যায়।

৫ ‘আলগাশশু ওয়ালখিদা’।

হাদীস শরীফে এসেছে-

من غشنا فليس منا

-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৬৪; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১৩১৫; মুসনাদে আহমদ ২/২৪২

৬ ‘তালাক্কিল জালাব’।

হাদীস শরীফে আছে-

نهى أن يتلقى الجلب

-জামে তিরমিযী, হাদীস : ১২২১; মুসনাদে আহমদ ২/২৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৩৭৯২

এটিও ফিকহের একটি অধ্যায়।

৭ ফিকহের আরেকটি অধ্যায় হল ‘আসসামাসিরা’ তথা দালালি।

৮ ফিকহের আরেকটি অধ্যায় হল ‘বাইয়ুল হাযিরি লিলবাদী’।

হাদীস শরীফে এসেছে-

نهى أن يبيع حاضر لباد

-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৩৭৯৭

৯ ফিকহের আরেকটি অধ্যায় হল ‘আননাজাশ’।

হাদীস শরীফে এসেছে-

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم نهى عن النجش

-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৩৭৯১

এতক্ষণ যে সকল বিষয়ের কথা বললাম সেগুলোর ব্যাখ্যা আপনাদের অনেকেরই জানা আছে। প্রসঙ্গের প্রয়োজনে কয়েকটির আলোচনা ও বিশ্লেষণ করব ইনশাআল্লাহ।

আমি এগুলোকে ফিকহের একেকটি অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করলাম।

এর অর্থ এই নয় যে, ফিকহের কিতাবে এসব শিরোনামে পৃথক পৃথক বাব রয়েছে।

তবে আপনি লক্ষ্য করবেন যে, লেনদেন বিষয়ক মাসআলাগুলোর আলোচনা ও হুকুম বর্ণনা করতে গিয়ে ফুকাহায়ে কেরাম উপরোক্ত নীতিগুলোর আশ্রয় নিয়ে থাকেন। আর বর্তমান সময়ের অনেক লেখক এসব বিষয়ে পৃথক পৃথক বই লিখেছেন।

যেমন এ কিতাবটি দেখুন-نظرية الشرط في الفقه الإسلامي। এ মোটা কিতাবটি শুধু ‘শর্ত’ সম্পর্কে লেখা হয়েছে।

এমনিভাবে ‘আলগারার’ সম্পর্কে শাইখ ছিদ্দীক আদদারীরের কিতাব الغرر وآثره في العقود দেখুন, এক বিষয়ে কত বড় কিতাব।

যারা বিভিন্ন দারুল ইফতায় দায়িত্বরত আছেন তাদেরকে বলছি, আপনারা এ কিতাবগুলো পড়ুন।

দেখবেন লেনদেনের মাসআলা ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে এই ৯-১০টি বিষয়ের কত বেশি প্রভাব রয়েছে।

শরয়ী হুকুম

এদেশের এমএলএম ব্যবসার শুরুতেই আমরা বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার মুফতী বোর্ডে বিষয়টি উত্থাপন করেছি। বেফাকের মুফতী বোর্ড দীর্ঘদিন আলোচনা-পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, এমএলএম পদ্ধতি নাজায়েয। এরপর প্রায় এক বছরজুড়ে পুরো বাংলাদেশের প্রায় সব বড় মাদরাসা ও দারুল ইফতা থেকে তাসদীক তথা সম্মতিসূচক স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।

আমাদের জানা মতে, এখনো ঐসব ফতোয়া বিভাগগুলোর মত আগের মতোই বহাল আছে। নির্ভরযোগ্য কারো থেকে এখন পর্যন্ত ভিন্ন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এটি ছিল বেফাকের বড় কাজ। উক্ত ফতোয়ায় দুটি বিষয় স্পষ্ট হয় :

১ এমএলএম সিস্টেমটাই নাজায়েয।

২ এ সিস্টেম অনুসরণ করে যেসব কোম্পানি চলে তার ব্যবসার ধরনের কারণে প্রথমে তা নাজায়েয। এরপর তাতে শরীয়ত নিষিদ্ধ অন্য কোনো কারণ থাকলে তো নাজায়েয হওয়ার বিষয়টি আরো দৃঢ় হবে। বস্ত্তত এমএলএম পদ্ধতির অনেক প্রতিষ্ঠানেই শরীয়তপরিপন্থী অনেক বিষয় থাকে।

এমএলএম নাজায়েয কেন?

এমএলএম নাজায়েয হওয়ার কারণগুলোকে দু ভাগে ভাগ করা যায়। যথা :

ক) মৌলিক কারণ

খ) শাখাগত কারণ।

সাধারণ শিক্ষিত লোকদের প্রশ্নের জবাবে আমরা সাধারণত মৌলিক বিষয়গুলো উল্লেখ করে থাকি। তাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিটা বুঝিয়ে সেগুলোর সাথে এমএলএম কীভাবে সাংঘর্ষিক তা বোঝানোর চেষ্টা করি। যেমন-

শরীয়তের একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হল, বেচাকেনা হবে সরাসরি। বিনা কারণে মধ্যস্বত্ত্বভোগী সৃষ্টি হবে না।

বিক্রেতা ও ভোক্তার মাঝে অযাচিতভাবে বিভিন্ন স্তর ও মাধ্যম সৃষ্টি করা শরীয়তের পছন্দ নয়।

এজন্যই হাদীসে ‘তালাক্কির রুকবান ও বাইয়িল হাযিরি লিলবাদী’ ইত্যাদির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

অর্থাৎ ক্রেতাবিক্রেতার মাঝে অযাচিত মধ্যসত্ত্বভোগী প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে।

বিক্রেতাকে সরাসরি বাজারে ঢোকার সুযোগ দিতে বলা হয়েছে। মাঝপথে থামিয়ে দিতে বারণ করা হয়েছে।

কিন্তু এখন বাজারে ঢোকা তো অনেক দূরের কথা, বিক্রেতার বাড়ি থেকেই পণ্য নিয়ে আসা হয়।

দাদন ব্যবসায়ীরা প্রথমে কৃষকদেরকে সুদের শর্তে ঋণ দেয়।

সাথে এ শর্তারোপও করে যে, উৎপাদিত ফসল তার কাছে বা তার লোকদের কাছেই বিক্রি করতে হবে।

পরিশেষে সুদে আসলে শোধ করতে গিয়ে কৃষকের তেমন কিছু আর বাকি থাকে না।

আপনারা জানেন এক্ষেত্রে শরীয়তের নির্দেশনা হল মুযারাআ করা।

তা করা হলে কৃষকগণ সুদের গুনাহ থেকেও বাঁচত এবং ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের সর্বনাশ হত না।

ভোক্তা বা বৃহত্তর সমাজের স্বার্থ ব্যবসায়ী বা ব্যক্তিস্বার্থের উপর প্রাধান্য পাবে।

এজন্য শরীয়ত ‘আননাজাশ’ বা দালালিকে অপছন্দ করে। কারণ এর দ্বারা দালাল উপকৃত হলেও ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আপনি শরীয়তের পুরো উসূল পড়লে দেখবেন, পুরোটা ভোক্তার পক্ষে, তবে বিক্রেতার বিপক্ষেও নয়। তাই বিক্রেতার ক্ষতি হোক শরীয়ত এটা চায় না। এজন্য সাধারণ অবস্থায় পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার বিধান নেই।

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, এক ব্যক্তি এসে বলল, আল্লাহর রাসূল! দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেছে। আপনি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না। আমি বরং দুআ করব যেন দম কমে যায়।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৪৫০

উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাম নির্ধারণ করে দেননি।

কারণ হতে পারে একটি পণ্যে বিক্রেতার খরচ পড়েছে ১০/-টাকা। এখন ৯/- টাকা নির্ধারণ করা হলে বিক্রেতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব বিক্রেতা ক্ষতিগ্রস্ত হোক শরীয়ত এটা চায় না।

কিন্তু সমাজের বৃহত্তর অংশ তথা ক্রেতা বা ভোক্তার ক্ষতি না হওয়ার বিষয়টি শরীয়তে অগ্রাধিকারযোগ্য।

এখন আমরা দেখব, শরীয়তের এ দুটি দৃষ্টিভঙ্গি এমএলএম-এর সাথে কিভাবে সাংঘর্ষিক।

প্রথম উসূলটি ছিল, বেচাকেনায় অযাচিত মধ্যস্বত্ত্বভোগী সৃষ্টি না হওয়া। কিন্তু এমএলএম এর মধ্যে একটি পণ্য বা সেবার উপকারভোগী হয় বহু স্তরের লোক। অসংখ্য মধ্যস্বত্ত্বভোগী তাতে বিদ্যমান।

তারা বলে, আমরা এ পদ্ধতি অনুসরণ করি ভোক্তাদের উপকারের জন্য। অন্যান্য কোম্পানি বিজ্ঞাপণের পিছনে যে অর্থ খরচ করে আমরা তা না করে ঐ পরিমাণ অর্থ ক্রেতাদেরকে কমিশন আকারে দেই। এবং তারা আরো বলে, আমরা মধ্যস্বত্ত্বভোগী উঠিয়ে দিয়ে ঐ মুনাফা ক্রেতাদেরকে কমিশন আকারে দেই।

আসলে এসব কথা সত্যের অপলাপমাত্র। কেননা তাদের ভাষায় তারা পণ্যের মূল্যের ৪৫% ভোক্তাদের দিয়ে দেয়। দেখুন, তারা বহু স্তর বানিয়ে প্রত্যেক স্তরকে যে কমিশন দেয় সেটা ভোক্তাদের অর্থ থেকেই দেয়। যেমন, ১০,০০০/- টাকা গাছের মূল্য হলে এর ৪৫% হল ৪,৫০০/- টাকা। এই ৪,৫০০/- টাকা তাদের ভাষায় মধ্যস্বত্ত্বভোগী নিয়ে নেয়। বাকি থাকে ৫,৫০০/- টাকা। এর ভিতরে কোম্পানির লভ্যাংশও ধরা আছে। তাহলে এখানে ভোক্তার লাভ হল না; বরং আরো বেশি ক্ষতি হল। ৫,৫০০/- টাকার পণ্য ১০,০০০/- টাকায় নিতে হচ্ছে।

একটি বহুল প্রচলিত এমএলএম কোম্পানি বলে থাকে, তারা পণ্যের লভ্যাংশের ৮৮% পরিবেশককে দিয়ে দেয়। অবশিষ্ট ১২% নিজেরা রাখে।

আমরা বলব, ১২% এর স্থানে ২০% যদি কোম্পানি লাভ করত তবুও ভোক্তা বেশি উপকৃত হত যদি কিনা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের উঠিয়ে দেওয়া হত। তারা বলে, ৮৮% লাভ পরিবেশকদেরকে দেয়।

কিন্তু চেইন যদি লম্বা হতে থাকে তাহলে তো ১০০%ও ছাড়িয়ে যাবে।

কিভাবে তারা এত বিপুল পরিমাণ কমিশন দেয়

তারা আরো বলে, ক্রেতাদেরকে লাভবান করার জন্য বিজ্ঞাপনের খরচ বাঁচিয়ে সেটা তাদেরকে ফেরত দেই।

প্রথম কথা হল, তারা বিজ্ঞাপন দেয় না-কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। দ্বিতীয়ত ক্রেতাদেরকে লাভবান করাই যদি উদ্দেশ্য হয় তাহলে প্রথমেই পণ্যের মূল্য ঐ পরিমাণ কমিয়ে দিন এবং সরাসরি ক্রেতাকে হ্রাসকৃত মূল্যে পণ্য বিক্রয় করুন। তাহলেই তো হল। তা না করে স্তর সৃষ্টি করে ঘুরিয়ে দেন কেন?

আমি তাদের অনেককে বলেছি, আপনাদের পণ্য বা সেবা যদি যথাযথ মূল্যেই বিক্রি করে থাকেন তবে যতটুকু আপনার লাভ দরকার তা রেখে দাম নির্ধারণ করে বাজারে ছাড়ুন। যেমন, ১০,০০০/- টাকায় যদি আপনার ৪,৫০০/-টাকা লাভ থাকে এবং তা থেকে পরিবেশকদেরকে ৪,০০০/- টাকা দিয়ে থাকেন তাহলে আপনি পণ্যটি সরাসরি ৬,০০০/- বা ৬,৫০০/- মূল্যে বাজারে ছাড়ুন দেখবেন কোনো বিজ্ঞাপন দরকার হবে না, পরিবেশকও লাগবে না, খুচরা বিক্রেতারা দলে দলে এসে আপনার কাছে ভিড় করবে কারণ আপনাদের ভাষ্যমতে এমনিতেই আপনাকে পণ্যের মূল্য বাজার দরের সমান বা কম।

এসব কথা শুনে তাদের অনেক কর্মকর্তা চুপ মেরে গেছে। দ্বিতীয় উসূলটির সাথেও যে এমএলএম সাংঘর্ষিক তা বলা হয়নি।

মোদ্দাকথা : বহু স্তরে বিপণনের এ পদ্ধতি শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি এবং উসূল যাওয়াবেতের সাথে সাংঘর্ষিক।

৩য় উসূল

আকলু মালিল গায়র বিলবাতিল (বাতিল পন্থায় অন্যের সম্পদ গ্রহণ)।

কুরআনুল কারীমের আয়াত-

لا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل

 এর ব্যাখ্যায় রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেছেন, أن يأكله بغير عوض (শর্তযুক্ত আকদে) বিনিময়হীন উপার্জনই হল বাতিল পন্থার উপার্জন। (আহকামুল কুরআন, জাসসাস ২/১৭২)

হযরত হাসান বসরীসহ অন্যান্য অনেক তাফসীরবিদও আয়াতটির একই ধরনের তাফসীর করেছেন (দ্রষ্টব্য: রূহুল মাআনী ২/৭০, ৫/১৫; তাফসীরুল মানার ৫/৪০)

এমএলএমএর মধ্যে ‘আকলু মালিল গায়র বিলবাতিল’-এর উপস্থিতি

এমএলএম কারবারগুলোতে ডাউনলেভেল থেকে আপ লেভেলে যে কমিশন আসে তা বিনিময়হীন হাসিল হয়। কারণ ১ম স্তরের সরাসরি জোগাড় করা ক্রেতারা ছাড়া ২য় স্তরের পরবর্তী স্তরগুলোতে যে সকল ব্যক্তি যুক্ত হয় তারা কোম্পানিতে যোগ হয়েছে অন্যান্য লোকজন কর্তৃক এবং তাদের স্বাক্ষরে।

সুতরাং যে কমিশন বা পারিশ্রমিক নিম্নস্তর থেকে আসছে তা বিনিময়হীন হওয়ার কারণে ‘আকলু মালিল গায়র বিলবাতিল’ তথা (অন্যের সম্পদ বাতিল পন্থায় আহরণ)-এর অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে একটু পরে আরো কিছু আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

৪র্থ উসূল

লেনদেনের ক্ষেত্রে শরীয়তের একটি উসূল হল, আকদ তথা চুক্তির সময় পণ্য সুনির্ধারিত হওয়া। যেন পরবর্তীতে এ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ না হয়।

দেখুন, কোনো কিছুর প্রতিকার করা থেকে তা প্রতিরোধ করা অর্থাৎ গোড়া থেকেই হতে না দেওয়া অনেক ভালো। অসুখ হওয়ার পর চিকিৎসা করে ভালো হওয়ার চেয়ে আগে থেকেই সতর্ক থাকা উচিত যেন অসুখ না হয়। তাই শরীয়ত পূর্ব থেকেই ঝগড়া বিবাদের ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দিতে চেয়েছে। ফেতনা-ফাসাদের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে।

এজন্য শরয়ী উসূল মোতাবেক কারবার করলে ঝামেলা হওয়ার সুযোগ থাকে না।

দেখুন সূরা বাকারার ২৮২ নং আয়াতে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেগুলো অনুসরণ করা হলে চুক্তি, ঋণ ইত্যাদি নিয়ে বর্তমানে যেসব ফেতনা হয় তা কখনো হত না।

আমি বলছিলাম, বেচাকেনার ক্ষেত্রে পণ্য ও মূল্য সুনির্ধারিত হওয়া আবশ্যক।

তদ্রূপ ইজারার ক্ষেত্রে প্রাপ্য সেবাও নির্দিষ্ট হতে হবে। অজানা বা অস্পষ্টতা থাকতে পারবে না। আকদের সময়ই সব পরিষ্কার করে নিতে হবে। এখন ক্রয়-বিক্রয় করে ফেলি পরে ঠিক করে নিব তা হবে না। কেনাবেচা যখন সংগঠিত হবে তখন স্বচ্ছতার সাথেই হতে হবে।

৫ম উসূল

বেচাকেনা ‘আলগারার’ বা প্রতারণামুক্ত হতে হবে। মাবসূতের ভাষ্য মতে ‘আলগারার’ হল-

ما يكون مستور العاقبة অর্থাৎ যার পরিণাম অজানা। -কিতাবুল মাবসূত ১২/১৯৪

এমএলএম পদ্ধতি যেভাবে উপরোক্ত দুটি উসূলের পরিপন্থী

একজন ডিস্ট্রিবিউটর যে চুক্তিতে কোম্পানির সাথে যুক্ত হয় তাতে লোকটি তার ডাউন লেভেল থেকে কমিশন লাভ করতে থাকবে।

অথচ তার ক্ষেত্রে ডাউন লেভেল সৃষ্টি হবে কি না, হলে তা কত দিন এবং কয়টি স্তর পর্যন্ত চলবে তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত, যা শরীয়তে নিষিদ্ধ আলগারারে বাস্তব দৃষ্টান্ত।

তদ্রূপ ৪র্থ উসূলেরও পরিপন্থী। কারণ এমএলএম এর একজন ক্রেতা পরিবেশক কোম্পানিকে তার নির্ধারিত টাকাগুলো দিচ্ছে দুটি জিনিসের বিনিময় হিসেবে :

ক) নির্ধারিত পণ্য বা সেবা খ)

পরিবেশক হিসেবে কমিশন প্রাপ্তি।

আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বিনিময়ের প্রথমটি জানা থাকলেও দ্বিতীয়টির পরিণাম অজানা।

এরকম আরেকটি দৃষ্টান্ত পাকিস্তানের বিজনেস ডটকম। তাদের পলিসি ছিল, টাকার বিনিময়ে একজনকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিবে। এরপর সে আরো কিছু লোককে ওখান থেকে প্রশিক্ষণ নিতে রাজি করবে এবং এর বিনিময়ে সে কমিশন পাবে।

এখানে পরবর্তী স্তরটা অজানা। কারণ লোক পাওয়া না পাওয়া অনিশ্চিত। তদ্রূপ ট্রি প্লান্টেশনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এখানে আপনি দুটি জিনিস কিনলেন : ক) পণ্য তথা গাছ। খ) সেবা তথা ৫০০ পয়েন্ট। এই সেবাটার প্রাপ্যতা ও পরিণাম অজানা।

সকালের অধিবেশনে এমএলএম নাজায়েয হওয়ার উসূলী কারণগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছিল। একটু পরে আমরা কোনো কোনো কারণের বিশ্লেষণও করতে চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

এমএলএম নাজায়েয হওয়ার শাখাগত কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করব।

এর আগে প্রথম অংশের (এমএলএম অবৈধ হওয়ার মৌলিক কারণ) সাথে সম্পৃক্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কথা আরয করতে চাই।

প্রথম কথাটি হল উসূলে শরীয়ত ও মাকাসিদে শরীয়ত অর্থাৎ শরীয়তের মৌলিক নীতিমালাগুলো ও শরীয়তের উদ্দেশ্যাবলি সকল মাযহাব, সকল ফকীহ ও মুফতীর অভিন্ন সম্পদ ও অভিন্ন পাথেয়।

আর দ্বিতীয় কথা যা আরয করতে চেয়েছি তা হচ্ছে প্রথমটির ফলাফল। অর্থাৎ একই কারণে পুরো পৃথিবীর সকল মাযহাব ও নির্ভরযোগ্য মুহাক্কিক আলেমগণ হালাল-হারাম সংক্রান্ত মৌলিক বিষয়গুলোতে প্রায় অভিন্ন মত পোষণ করে থাকেন। এমএলএম-এর ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। বিশ্বের মুহাক্কিক আলেমগণ এমএলএম পদ্ধতিকে নাজায়েয বলেছেন।

পাকিস্তান

পাকিস্তানে এমএলএম ভিত্তিক কোম্পানি ছিল বিজনেস ডটকম।

তাদের ব্যাপারে জামিআতুল উলূমিল ইসলামিয়া করাচি থেকে নাজায়েয় হওয়ার ফতোয়া এসেছে।

তদ্রূপ দারুল উলূম করাচি থেকেও একই রকম ফতোয়া দেওয়া হয়েছে।

দারুল উলূম থেকে প্রথমে জায়েয হওয়ার একটি ফতোয়া আসলেও পরবর্তীতে তারা সেটি প্রত্যাহার করেছেন। (এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা একটু পরে করা হবে)

তদ্রূপ লাহোর থেকেও নাজায়েযের ফতোয়া এসেছে।

বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ঢাকায় ১৪২৩ হিজরী মোতাবেক ২০০৩ সালে এ বিষয়ে মুফতী বোর্ড কর্তৃক তাফসীলী ফতোয়া তৈরি হয়।

উপমহাদেশের মধ্যে সম্ভবত এ বিষয়ে এটিই সর্বপ্রথম তাফসীলী এবং বোর্ডভিত্তিক ফতোয়া।

ভারত

২০০৭ সালে ভারতের ইসলামী ফিক্হ একাডেমী এ বিষয়ে পুরো দেশের মুফতীদের নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করে।

৩০ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত জামেয়া ইসলামিয়া মুহাযযাবপুর আযীমগড়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

এটি ছিল ইন্ডিয়া ফিকহ একাডেমীর ১৬ তম সেমিনার।

এতে দেশ-বিদেশের ২শ-এর অধিক ফকীহ, মুফতী ও মুহাক্কিক আলেম-উলামা এবং অর্থনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্যে অভিজ্ঞ জেনারেল শিক্ষিত বিজ্ঞ লোকেরা অংশগ্রহণ করেন।

তারা দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর এমএলএম নাজায়েযের ফতোয়া দিয়েছেন (বিস্তারিত দেখুন : নেটওয়ার্ক মার্কেটিং শরয়ী নুকতায়ে নযর)

দারুল উলূম দেওবন্দের প্রধান মুফতী খায়রাবাদী ছাহেব দামাত বারাকাতুহুমও নাজায়েয ফতোয়া দিয়েছেন।

আরববিশ

সৌদী আরবের সর্বোচ্চ ফতোয়া বোর্ডের মুফতীগণও এমএলএমকে হারাম বলেছেন। যদিও এমএলএম-এর প্রচলন আরববিশ্বে খুব বেশি নয়। ধন দৌলতের প্রাচুর্য থাকায় এবং আমাদের মতো হুজুগে না হওয়ায় তাদেরকে এমএলএম এ ভিড়ানো সহজ হয় না। এমএলএম দ্রুত বিস্তার লাভ করে দুই ধরনের জায়গায় :

পুঁজিবাদের দেশে।

পুঁজিবাদীদের একটি নীতি হল, নিজের টাকা না খাটিয়ে বা অল্প পুঁজি দিয়ে কৌশলে অন্যের অর্থ দিয়ে টাকা কামানো। এ ব্যাপারে তারা বেশ তৎপর। এজন্য দেখবেন, বীমা, লটারী, শেয়ারবাজার, কমোডিটি এক্সচেঞ্জ ইত্যাদি ব্যবসায়িক পলিসি ওদের দেশে খুব চালু। এগুলোর গোড়ার কথা একটাই। তা হল, নিজ থেকে পুঁজি না খাটিয়ে বা অল্প পুঁজি দিয়ে কৌশলে সাধারণ লোকদের টাকাগুলো কুক্ষিগত করা।

আমাদের দেশের মতো তৃতীয় বিশ্বে (তাদের ভাষায়) এটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর কারণ বেকারত্ব, স্বল্প আয় এবং পেশাগত জবাবদিহিতার অভাব।

আমাদের দেশে কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রকোপ বেশি। যারা অন্য পেশায় থেকে এমএলএম এ তৎপর হয় তাদের মূল পেশা যে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে কথা বলে বুঝানোর প্রয়োজন নেই। মূল পেশায় জবাবদিহীহতা ও দায়িত্বশীলতার মানসিকতা না থাকায় এমনটি হয়ে থাকে।

আরেকটি কারণ হুজুগে স্বভাব।

এটিও আমাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য! কারো থেকে শুনতে দেরি, বা কেউ বলতে দেরি ঐ কাজে নেমে পড়তে তেমন দেরি হয় না।

মোটকথা এমএলএম বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার মুফতীগণ স্ব স্ব স্থানে থেকে এক ধরনের ফতোয়াই প্রদান করেছেন।

এটি একটি কাকতালীয় ব্যাপার। আমাদের ফতোয়াটি তৈরি হয়েছে বাংলায়। ভারতের আলেমদের নিকট তা হয়ত পৌঁছেনি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, এমএলএম এর যে ফিকহী বিশ্লেষণ আমরা করেছি ৪ বছর পরে স্ব স্থানে থেকে ঠিক ঐভাবেই তারা তাতবীক দিয়েছেন। এখানে কারবারটিতে যে মৌলিক দোষগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে ওখানেও সেগুলোকে মৌলিক ত্রুটি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

একসময় একটি ফতোয়া দ্বারা বিভ্রান্তি ছড়ানো হত। এখন তা জানাজানি হওয়ার কারণে আর বেশি সুবিধা করতে পারে না। বিষয়টি হল, পাকিস্তানের এমএলএম ভিত্তিক কোম্পানি বিজনেস ডটকম। এটি মূলত ওমানী কোম্পানি ছিল। করাচিতে তারা এমএলএম পদ্ধতিতে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে।

দারুল উলূম করাচির ফতোয়া বিভাগে এ বিষয়ে ইস্তেফতা করা হয়। ওখানকার উস্তাদ, আমাদের আমীনুত তালীম মাওলানা আবদুল মালেক ছাহেবের সঙ্গী মাওলানা ইছমাতুল্লাহ ছাহেব ইস্তেফতার জওয়াব লিখেন। হয়ত তারা খুব তাড়া করেছিল তাই তিনি তাড়াহুড়ো করেই সংক্ষিপ্ত একটি উত্তর লিখে দেন এবং কোনো পর্যায়ে হযরত মাওলানা তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম-এর দস্তখতও নিয়ে নেন। এরপর এমএলএম ওয়ালারা ইন্টারনেটে তা ছেড়ে দেয়।

মাওলানা ইছমতুল্লাহ ভেবেছেন, সাদাসিধে আন্দাযে ওরা প্রশ্ন করেছে। তাই গভীরে না ঢুকেই তিনি এর জবাব লিখে দেন। এবং সাধারণ দৃষ্টিতে তা জায়েয হওয়ার মত প্রকাশ করেন। এটি ওদের হাতে পৌঁছার পর তারা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেল। ইন্টারনেটের কল্যাণে যত দেশে এমএলএম আছে সবখানেই তা ছড়িয়ে দিল। কপি করে লোকদের হাতে হাতে বিলি করা হল।

বেফাকে যখন নাজায়েযের ফতোয়া তৈরি হয় তখন আমরা ঐ ফতোয়া দেখে বিব্রত হই। আমরা তখন করাচিতে যোগাযোগ করি। পরে জানা গেল, মাওলানা ইছমতুল্লাহ ছাহেব খুব তাড়াহুড়ো করে এটি তৈরি করেছেন। এবং হযরত মাওলানা তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম সফর বা অন্য কোনো কারণে খুব তাড়ায় ছিলেন। এমতাবস্থায় ঐ ফতোয়ায় তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়। মাওলানা ইছমতুল্লাহ এর উপর যেহেতু তাঁর আস্থা ছিল তাই তিনি স্বাক্ষর করে দেন।

এরপর যখন তাদের নিকট এ বিষয়ের তাফসীল পৌঁছেছে, নিউ টাউন ও অন্যান্য জায়গা থেকে নাজায়েযের ফতোয়া দেওয়া  হয়েছে তখন তারা তাদের ফতোয়া নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করেন এবং পূর্বের ফতোয়া প্রত্যাহার করে নাজায়েযের ফতোয়া প্রদান করেন।

এই প্রত্যাহারকৃত ফতোয়ার মাধ্যমে একসময় এমএলএম ওয়ালারা বিভ্রান্তি ছড়াত। এখনও হয়ত কেউ ছড়াতে পারে। তাই আসল ঘটনা বলে দিলাম।

আমাদের নিকট কেউ পূর্বের ফতোয়া পেশ করলে আমরা বলি, ফতোয়াটি যেখান থেকে শুরু হয়েছিল সেখান থেকেই এর সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে।

এই একটি প্রত্যাহারকৃত ফতোয়া ছাড়া উপমহাদেশের নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এমএলএম জায়েয হওয়ার ফতোয়া আছে বলে আমাদের জানা নেই।

দারুল উলূমের পূর্বের ও পরের দু’টো ফতোয়াই আমাদের কাছে রয়েছে।

এখন বেফাকের পক্ষ থেকে দেওয়া ফতোয়াটি সামনে রেখে কিছু বিশ্লেষণ পেশ করতে চাই।

এতে আশা করি এমএলএম নাজায়েয হওয়ার শাখাগত কারণগুলো আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে।

বেফাকের তত্ত্বাবধানে মুফতী বোর্ড ঢাকার ফতোয়ায় কয়েকটি বিষয় আলোচিত হয়েছে :

১. صفقتين في صفقة ।

এমএলএম নাজায়েয হওয়ার বহু কারণের মধ্যে এটি অন্যতম। একে আরেক ভাষায় বলা হয় ‘বাই ওয়া শর্ত’ (একটি আকদের সাথে অন্য আরেকটি আকদ যুক্ত করা)। হাদীসে এটি নিষেধ করা হয়েছে।

উক্ত ফতোয়াতে স্পষ্টভাবে লেখা আছে, এমএলএম এর মধ্যে দুটি আকদ বিদ্যমান। তা হল, الإجارة المشروطة  بالبيع অথবা البيع المشروط بالإجارة

অর্থাৎ এমএলএম হল এমন একটি বেচাকেনা, যাতে ইজারা তথা পরিবেশক হওয়ার শর্ত যুক্ত রয়েছে অথবা এমন একটি ইজারা (পরিবেশক) চুক্তি, যাতে বেচাকেনার শর্ত যুক্ত রয়েছে।

আগে এমএলএম কোম্পানিগুলো এক ফরমেই উভয় কাজ অর্থাৎ দুটি চুক্তি সম্পন্ন করত। এখন কোনো কোনো কোম্পানি আলাদা আলাদা ফরমের ব্যবস্থা করেছে। একটি পণ্য কেনার ফরম, অপরটি ডিস্ট্রিবিউটরশীপের আবেদন ফরম। এভাবে হয়ত তারা বুঝাতে চায়, এখানে পৃথক পৃথক দুটি চুক্তি হচ্ছে। অথচ সকলেই জানে যে, কার্যক্ষেত্রে একটি চুক্তির জন্য অন্যটি শর্ত (দুটি ফরম করা সত্ত্বেও)। একথা সকলেই জানে যে, শুধু পণ্য কেনার জন্য এমএলএম কোম্পানিতে কেউ যায় না। আবার পণ্য না কিনলে কোম্পানি কখনো পরিবেশক বানাবে না। আর লেনদেন বা  মুআমালায় শরীয়ত মাআনি ও মাকাসিদ তথা উদ্দেশ্য ও বাস্তবতা বিবেচনা করে থাকে। শুধু শব্দ বা আলফায এক্ষেত্রে ধর্তব্য নয়। এখানে দুইটি ফরম করে শব্দের দিক থেকে দুইটি চুক্তিকে আলাদা করার চেষ্টা করা হলেও উদ্দেশ্য তথা মাকসাদ এর দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি অভিন্ন এবং একটির জন্য অপরটি শর্ত।

আমি এমন অনেক লোককে দেখেছি, যারা সদস্য তৈরি করতে পারে না। পরে বাধ্য হয়ে পণ্যের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও নিজের পকেটের টাকা দিয়ে পণ্য কিনে সদস্য বানায়, এরপর বলে, এবার আপনি অন্যকে তৈরি করুন। এবং নিজে লাভ করুন আর আমাকে লাভবান হওয়ার সুযোগ দিন। সুতরাং ফরম একটা করুক, দুইটা করুক, এক কথায় বলুক, দুই কথায় বলুক আকদ একটার সাথে আরেকটা শর্তযুক্ত হচ্ছেই।

আমি বলেছিলাম, উকূদের মধ্যে মাআনী ও মাকাসিদ তথা উদ্দেশ্য ধর্তব্য। যেমন, কেউ ৩,০০০/-টাকার জিনিস ৩০০/-টাকায় বিক্রি করতে চায়। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে এতে নাজায়েয কিছু নেই।

কেননা তার পণ্য সে যত দামে খুশি বিক্রি করতে পারে। এতে কারো কিছু বলার নেই।

কিন্তু যদি আপনি তার মাকসাদ জিজ্ঞাসা করেন এবং সে বলে, সে আমাকে ১০,০০০/- টাকা করয দিবে তাই আমার পণ্যটি কম মূল্যে বিক্রি করছি, তখন কেউ একে বৈধ বলবে না। কেননা এটা সুদের
অন্তর্ভুক্ত।

এরকম আরেকটি নজির দেখুন।

হানাফী মাযহাবের বিশিষ্ট ফকীহ আবুল কাসিম মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আসসামারকান্দি (মৃত্যু : ৫৫৬ হিজরী) তার অমূল্য গ্রন্থ ‘আলমুলতাকাত ফিলফাতাওয়াল হানাফিয়্যায়’ ‘‘আলবাইয়ু বিলওয়াফা’’-এর আলোচনায় বলেছেন-

وذكر عن شيخ الإسلام عن السيد الإمام أبي شجاع والقاضي الحسن الماتريدي : أن البيع الذي سموه بيع الوفاء احتيالاً للربا رهن في الحقيقة، والمشتري مرتهن لا يملكه ولا يطلق له الانتفاع إلا بإذن البائع … وللبائع استرداده إذا قضى دينه متى شاء، لأنهم يريدون به الرهن، والعبرة للمقاصد، لا للألفاظ. اهـ

এই উসূলের ব্যাপারে আরো জানার জন্য দেখুন : ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া ২৯/৩৩৬

মোটকথা এখানে উদ্দেশ্যের বিবেচনায় মাসআলার হুকুম বলা হয়েছে, শব্দের বিবেচনায় নয়।

বেফাকের মুফতী বোর্ড ঢাকার ফতোয়ায় আরেকটি বিষয় ছিল, ‘আলউজরাতু বিলা আমাল ওয়াল আমালু বিলা উজরা’। অর্থাৎ কর্মহীন পারিশ্রমিক ও পারিশ্রমিকহীন কর্ম। এ দুটিও শরীয়তে নিষিদ্ধ এবং ছোটখাটো নিষিদ্ধ বিষয় নয়; বরং বড় বড় নিষিদ্ধ বিষয়ের অন্তর্ভুুক্ত।

আমরা শুধু রিবা, কিমার তথা সুদ-জুয়া জাতীয় বিষয়গুলোকেই বড় করে দেখি। অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয়কে তেমন কিছু মনে করি না।

অথচ এসব নিষিদ্ধ বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে ঐ সকল বড় বড় নিষিদ্ধ বিষয় পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। এটি একটি তাত্ত্বিক ও গভীর বিষয়। এখন স্বল্প সময়ে বিস্তারিতভাবে বলার অবকাশ নেই। শুধু এতটুকু বলছি, মূলত প্রতিটি ফাসেদ বিষয় বড় বড় খারাবির দিকে টেনে নিয়ে যায় বলেই শরীয়ত এগুলোকে নিষেধ করেছে। গোড়া থেকেই নিষেধ করেছে।

আপনি রিবান্নাসিয়ার পাশাপাশি রিবাল ফাযল হারাম হওয়ার বিষয়টি চিন্তা করলেই কিছুটা অনুধাবন করতে পারবেন।

এমএলএমএর সাথে উপরোক্ত দুটি ফাসেদ বিষয়ের সম্পৃক্ততা

ফিকহের কিতাবে স্পষ্টভাবে বলা আছে-

جاء في تكملة رد المحتار : 7/60 : وتمامه في شرح الوهبانية : قال فيه : والأصح أنه الأجر بقدر المشقة … وفي العمادية، عن الملتقط إنما له أجر مثله بقدر مشقته وبقدر صنعته وعمله، وفي شرح التمرتاشي عن النصاب : يجب بقدر العناء والتعب، وهذا أشبه بأصول أصحابنا.

অর্থাৎ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যতটুকু কাজ করবে সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবে। সহীহ মতানুযায়ী এটি ‘আলআজীরুল মুশতারাক’ বা কমিশন এজেন্টদের ব্যাপারেও প্রযোজ্য।
বিস্তারিত জানার জন্য পড়তে পারেন, শরহুল মাজাল্লাহ, আল্লামা খালেদ আতাসী রাহ. ২/৪৮৪

উল্লেখ্য, কেউ কেউ ডিস্ট্রিবিউটরদেরকে ‘আলআজীরুল মুশতারাক’ গণ্য করে বলে থাকে, কোম্পানির নির্ধারিত টার্গেট (কমপক্ষে ১০০০ পয়েন্টের পণ্য বিক্রয় করা) পুরা না করলে কমিশন পাবে না।

একথাটা সহীহ নয়। কেননা, আজীরে মুশতারাক যতটুকু কাজ করবে ততটুকুর পারিশ্রমিক হিসাব করে তাকে দিতে হবে। সুতরাং পয়েন্ট ১০০০ এর কম হলেও কাজ যেহেতু আংশিক হলেও আছে তাই সে অনুপাতে তাকে পারিশ্রমিক দিতে হবে।

অন্যথায় তা ‘আলআমালু বিলা উজরা’ তথা পারিশ্রমিকবিহীন কর্মের আওতাভুক্ত হয়ে নাজায়েয হবে। অথচ এমএলএম কোম্পানিতে অনেক ক্ষেত্রে এমনটিই হয়ে থাকে।

নির্ধারিত ৪ জন বা ২জন ক্রেতা না এনে যদি ৩ জন বা ১জন আনা হয় তাহলে কোনো কমিশন দেওয়া হয় না। অথচ এর দ্বারা কোম্পানি ঠিকই উপকৃত হচ্ছে। এ হল বিনা পারিশ্রমিকে কর্ম।

আর কর্মবিহীন পারিশ্রমিক হল, নেট সিস্টেমে প্রথম ২ ব্যক্তি ছাড়া পরবর্তী লোকদেরকে কোম্পানির সাথে জড়িয়ে দেওয়ার কাজটি করে তাদের সরাসরি উপরের ব্যক্তিটি, যার রেফারেন্সে তারা সদস্য হয়েছে।

এটি কোনো ক্রমেই প্রথম ব্যক্তির কাজ হিসেবে ধর্তব্য হয় না। প্রথম ব্যক্তি এক্ষেত্রেও শ্রম দিলেও কোম্পানির হিসেবে তার নিজের কাজ হিসেবে গণ্য হয় না। কোম্পানি একে প্রথম ব্যক্তির কাজ হিসেবে ধরে না।

এর প্রমাণ হল, যদি এটি প্রথম ব্যক্তির কাজ হত তাহলে সে প্রথম ২জনকে সংগ্রহ করে কোম্পানি থেকে যে হারে কমিশন লাভ করেছে ২য়, ৩য় স্তর থেকেও ঐ হারে কমিশন পেত। অথচ তা পায় না। বরং তাদের সরাসরি উপরের ব্যক্তিটি সে হারে পেয়ে থাকে।

অতএব ডাউন লেভেল তথা নিম্ন স্তরের লোকদের জন্য আপ লেভেলের ব্যক্তিদের কমিশন গ্রহণটা বিনা কর্মে অর্থ গ্রহণ হিসাবে গণ্য।

এ সম্পর্কে ‘আলআকলু বিলবাতিল’-এর আলোচনায় কথা হয়েছে।

কেউ কেউ বলে থাকে, একজন যখন আরেকজনকে নামায শিখায়। এরপর সে আরেকজনকে শিখায়। তো এক্ষেত্রে প্রথম ব্যক্তি পরবর্তীদের আমলের কারণে ছওয়াব পেতে থাকে। তদ্রূপ ডাউন লেভেলের আমলের কারণে আপ লেভেল কমিশন পেয়ে থাকে।

এটা এমএলএম ওয়ালাদের পুরাতন কথা। টংচেং এর বিরুদ্ধে যখন মাসআলা দেওয়া হয়েছিল তখন তারা একথা বলা শুরু করে। এর জবাব হল দুনিয়ার ‘উকূদে মুআওযা’ আর আখিরাতের সদকায়ে জারিয়া এক কথা নয়।

সদকায়ে জারিয়া আল্লাহ তাআলা ও বান্দার সাথে সম্পৃক্ত। তিনি বান্দাকে শুধু বিনিময় দেন না; অতিরিক্তও দেন। একটি কাজের জন্য ন্যূনতম ১০ গুণ বিনিময় দেন। এরপর তা বৃদ্ধি করতে করতে কাউকে কাউকে বে হিসাব দিয়ে দেন।

কিন্তু আকদে মুআওয়াওয়াযা যেমন ক্রয়-বিক্রয় ও ইজারা ইত্যাদির মধ্যে অতিরিক্ত বলতে কিছু নেই। এখানে ‘এওয়াজ’ বা বিনিময় আসে পণ্য বা সেবার মোকাবেলায়। পণ্য বা সেবার সাথেই এটি সম্পৃক্ত হয়। পণ্য বা সেবার সাথে সম্পৃক্ত না হয়ে অতিরিক্ত কিছু হলে সেটি বাইয়ে ফাসিদ বা ইজারায়ে ফাসিদার মধ্যে পড়বে।

অতএব একজনের কাজের বিনিময়ে বহুজন পারিশ্রমিক পাওয়ার বৈধতা নেই।

মুফতী বোর্ড ঢাকার ফতোয়ায় আরেকটি বিষয় ছিল ‘আলগারার’।

ইমাম সারাখসী রাহ.-এর বরাতে এর একটি সংজ্ঞা সকালে উল্লেখ করেছি। ইবনুল আছীর জাযারী রাহ.-এর আরেকটি সংজ্ঞা দিয়েছেন। তা হল-

الغرر ما له ظاهر توثره، وباطن تكرهه، فظاهره يغر المشتري وباطنه مجهول

অর্থাৎ যার এমন একটি প্রকাশ্য রূপ রয়েছে, যা দ্বারা মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হয়, কিন্তু এর মধ্যে এমন অদৃশ্য কারণ রয়েছে, যে কারণে তা অস্পষ্ট। অতএব এর বাইরের রূপ ক্রেতাকে ধোঁকায় ফেলে। আর এর ভিতরের রূপ অজানা। (জামেউল উসূল ১/৫২৭)

এ সংজ্ঞাটি খুব সুন্দর। ফতোয়াটি তৈরির সময় সকলেই একে পছন্দ করেছিলেন। কেননা এটি এমএলএম-এর সাথে ভালোভাবে খাপ খায়। এমএলএম-

এর প্রকাশ্যরূপ ঠিকই ক্রেতাকে ধোঁকায় ফেলে দেয় আর এর ভিতরের দিকটা অজানা। অর্থাৎ কয়জনকে ক্রেতা বানাতে পারবে, আদৌ বানাতে পারবে কি না কিছুই জানা নেই। মোদ্দাকথা, এমএলএম-এর একজন পরিবেশক ভবিষ্যতে কী কী পাবে বা আদৌ পাবে কি না তা সম্পূর্ণ অজানা ও অনিশ্চিত, যা আলগারার-এর সমার্থক।

কেউ কেউ দাবি করে থাকে যে, এখানে আলগারার থাকলেও তা পরিমাণে কম, যা নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু এমএলএম চেনেন এম ব্যক্তিমাত্রই ববুঝবেন যে, এক্ষেত্রে যদি গারার কম হয় তবে আলগারার কাসীর বা বড় গারার পাওয়া হয়ত মুশকিলই হবে।

মুফতী বোর্ড ঢাকা তো এমএলএম-এ শুবহাতুর রিবা তথা রিবার সন্দেহ-এর কথা বলেছে। কিন্তু ভারতের ফিকহ একাডেমীর সেমিনারে কেউ কেউ একে সরাসরি রিবাও বলেছেন।

তারা বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে যে, ক্রেতা টাকা দিয়েছে তো পণ্য পেয়েই গেছে। এখন ভবিষ্যতে যে কমিশন পাবে তা সুদ হিসাবে গণ্য হবে। কেউ কেউ কিমার তথা জুয়াও বলেছেন। তা এভাবে যে, সে যে টাকা খাটিয়েছে এর এক অংশ লেগেছে পণ্যের কাজে। আরেক অংশ ভবিষ্যতে কমিশন পাওয়ার জন্য, যা অনিশ্চিত।

সুতরাং তা কিমারের মধ্যেও দাখেল হয়ে যায়। তবে আমরা একে সরাসরি রিবা বা কিমার না বললেও এতে যে রিবা বা কিমারের সন্দেহ তথা গন্ধ রয়েছে তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

এমএলএম-এর সপক্ষে ইদানীং কোনো কোনো মাওলানা সাহেবও বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ কেউ বইও লিখে ফেলেছেন।

তারা আজব আজব দলিলও পেশ করেছেন।

কিন্তু সব কথার বা সব ধরনের লোকের কথার জবাব দেওয়া জরুরি নয়।

কেননা, সবার কথার জবাব দিলে যে ফিকহ বুঝে না সে মনে করবে, আমার কথারও জবাব দেওয়া হয়। মনে হয় আমিও ফকীহ হয়ে গেছি। এরপরও মানুষ যেন বিভ্রান্তিতে না পড়ে সেজন্য কোনো কোনো কথার জবাব দেওয়া হল।

* একজন তার বইয়ে লিখেছেন, মুফতী বোর্ডের ফাতাওয়ায় আলইজারা ও আলবাইয়ের মাঝে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। আলগারার-এর সম্পর্ক বাইয়ের সঙ্গে, ইজারার সাথে নয়। القادر بقدرة الغير এ নীতি বাইয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ইজারার ক্ষেত্রে নয়। ইজারা ও বাই এক নয়। ভিন্ন ভিন্ন দুটি জিনিস।

ঐ ভদ্রলোকের জানা থাকার কথা যে, ফতোয়াটি একক কোনো মুফতীর নয়; বরং একটি বোর্ডের ফতোয়া। সারাদেশের নির্ভরযোগ্য বহু মুফতী এর সমর্থন করেছেন।

এক্ষেত্রে ‘তারা গুলিয়ে ফেলেছেন’ এ ধরনের কথা বলার অর্থ হল, মুফতীদের একটি বিশাল গোষ্ঠিকে জাহেল বা মূর্খ আখ্যা দেওয়া।

এটি কোন পর্যায়ের ধৃষ্ঠতা তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই।

আর তার দাবিটিও ভুল। মূলত বাই ও ইজারা দুটোই বিক্রি। একটি হল পণ্য বিক্রি, আরেকটি হচ্ছে সেবা বিক্রি।

এজন্য ইজারার সংজ্ঞা কেউ কেউ এভাবে দিয়েছেন-

الإجارة هي بيع منفعة معلومة بأجر معلوم

 ‘ইজারা হচ্ছে নির্ধারিত বিনিময়ে নির্ধারিত সেবা বিক্রয় করার নাম।

আলমুহীতুল বুরহানীতে সুস্পষ্টভাবে ইজারাকে বাই বলা হয়েছে।

(আরো দেখুন : আলআওসাত ১১/১৩১; আলমুগনী ৮/২২; আলফুরূক ৪/৩৪)

ফিকহের কিতাব খোঁজ করলে দেখবেন, ফাসেদ শর্তাবলি, আলগারার, অজানা থাকার দোষ শুধু বাই এর ক্ষেত্রে সমস্যা নয়; ইজারার ক্ষেত্রেও সমস্যা।

ফাতহুল কাদীরে (৬/৮১) কাযীখানের হাওয়ালায় বলা হয়েছে- فيه : وذكر الإمام قاضيخان : العقود التي يتعلق تمامها بالقبول أقسام ثلاثة قسم يبطل بالشرط الفاسد وجهالة البدل وهي مبادلة المال بالمال كالبيع والإجارة.

আলগারার যে ইজারার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য তার জন্য আরো পড়তে পারেন : আলগারার ওয়া আছারূহু ফিল উকূদ ৪৬৫; ফিকহুল মুআমালাতিল মালিয়াহ ১৩৯

* কেউ কেউ আলউজরাতু বিলা আমল তথা বিনা কর্মে পারিশ্রমিক বৈধ বানানোর জন্য ক্রিকেট টিমের পুরস্কারের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। অর্থাৎ যারা ক্রিকেট খেলে তারা নির্ধারিত একটা বেতন পায়। এরপর টিমের জয় হলে কখনো অতিরিক্ত পুরস্কার পায়। তাদের এই অতিরিক্ত পুরস্কার বৈধ হলে এমএলএম-এর অতিরিক্ত কমিশন বৈধ হবে না কেন?

এর জবাব কী দিব! খোদ পেশাদার ক্রিকেট খেলার প্রচলিত পদ্ধতিকে কে জায়েয বলেছে তাই তো আগে দেখা প্রয়োজন। এ ধরনের ফালতু কথা বলার মতলবটা হল, সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন। এদেশের অনেক মানুষ বুঝে বা না বুঝে খেলার ভক্ত। সুতরাং এ প্রসঙ্গে ক্রিকেটের কথা নিয়ে আসলে তা সহজেই মার্কেট পেয়ে যাবে। এ ধরনের সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চিন্তা থেকেই হয়ত এমএলএম-এর মাসআলায় খেলার প্রসঙ্গ নিয়ে আসা হয়েছে।

* এখন এমএলএম ওয়ালাদের শরীয়া কাউন্সিলও আছে। তাদের শরীয়া কাউন্সিলররা এর বৈধতার পক্ষে বইও লিখেছেন এবং এর পক্ষে বিভিন্ন ‘দলিল প্রমাণ’ পেশ করার চেষ্টা করেছেন। তাদের একটি দলিল শুনুন।

যে দলিলটি তাদের নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হল, ‘এমএলএম বৈধ। কারণ এটি একটি বেচাকেনা। আর কুরআন মজীদে আছে-

احل الله البيع وحرم الربا

 আল্লাহ কেনাবেচাকে হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম।’

এর জবাব দেওয়ার দরকার আছে বলে মনে করি না। ভেবে দেখুন, কেউ যদি বলে কুরআনে পানাহার করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা কি যে কোনো দ্রব্য ও পানীয় পানাহারের বৈধতা প্রমাণিত হয়? নিশ্চয়ই তারাও বলবে, হয় না। তারাও বলবে, শরীয়তে নিষিদ্ধ বস্ত্ত ছাড়া অন্যগুলো পানাহার করা যাবে। এক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ নয় এমন বেচা-কেনা হালাল।

আসলে আলবাই-এর ‘আলিফ-লাম’ হল عهد এর জন্য। অর্থাৎ সব বাই উদ্দেশ্য নয়; বরং البيع المعهود في الشرع শরীয়ত যেটাকে বৈধ বাই বলে মনে করে এখানে সেটাই উদ্দেশ্য। অন্যগুলো নয়।

এরকম দলিল আরবের মুশরিকরাও দিয়েছিল। তারা বলেছিল-انما البيع مثل الربا বেচা কেনা আর সুদ তো একই ধরনের কারবার। কুরআন তা খন্ডন করেছে।

* আরেকটি দলিল হল মুদারাবা।

অর্থাৎ এমএলএম ওয়ালারা বলতে চায়, ক্রেতা পরিবেশক থেকে যে টাকা নেওয়া হয় তা মুদারাবা হিসেবে নেওয়া হয়। এরপর যে কমিশন দেওয়া হয় সেটি এরই লভ্যাংশ।

আজকাল অনেকেই শুনে শুনে ফিকহের দু তিনটি পরিভাষা মুখস্থ করে যেখানে ইচ্ছা লাগিয়ে দেয়। সেটি বাস্তবতার সাথে মিলুক বা না মিলুক। এধরনেরই একটি শব্দ হল, মুদারাবা।

বাস্তবে এমএলএম-এর সাথে মুদারাবার ন্যূনতম সম্পর্কও নেই।

মুদারাবা হল, এক পক্ষের মূলধন আর অপর পক্ষের শ্রম বা ব্যবসা। এরপর পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী লভ্যাংশ বণ্টন হবে।

এটি শরীয়তের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কারবার হিসেবে চিহ্নিত। এতে হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে করতে হয়।

কোন খরচটা সরাসরি ব্যবসার জন্য হয়, আর কোনটা সরাসরি ব্যবসার জন্য নয় এসব হিসাব ভিন্ন ভিন্নভাবে করতে হয়। এবং মুলধন থাকে ব্যবসায়ীর হাতে ব্যবসার জন্য আমানতস্বরূপ। সরাসরি ব্যবসার ক্ষেত্র ছাড়া অন্য কোনো খাতে তা ব্যবহার করা যায় না। মূলধনের যথাযথ হেফাযত করতে হয়।

তাই এই কারবারে দাখেল হওয়ার আগে চিন্তা করা উচিত আমি তা পারব কি না। মূলধনের হেফাযত করতে পারব কি না।

এমএলএম-এর সাথে মুদারাবার কোনো মিল নেই। এখানে এক পক্ষের টাকা অন্য পক্ষের শ্রমের কোনো বিষয় নেই। লাভ-লোকসান অংশিদারিভিত্তিক কোনো চুক্তিও হয় না। অর্থদাতা কোম্পানির কোনো লোকসানের চুক্তিতেও আবদ্ধ হয় না।

এটি যদি মুদারাবাই হত তাহলে টাকাটা ব্যবসায় না খাটিয়ে কমিশন বাবদ দেওয়া হত না।

এছাড়া তাদের কথার মধ্যেই স্ব-বিরোধিতা রয়েছে। একবার বলেন, বাই। আরেকবার বলেন মুদরাবা। দুটি ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। মুদারাবায় বেচাকেনা হয় না; বিনিয়োগ করা হয়।

* আরেকজন বলেছেন যে, পরিচয় দানকারী তথা যার মাধ্যমে সদস্য হল সে হচ্ছে কাফীল।

এর জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেননা যদি একথা ধরা হয় তবে কাফালাহ এর পারিশ্রমিক নেওয়া তো জায়েয নেই। সুতরাং কমিশন নেওয়াও জায়েয হতে পারে না।

আসলে কখন কী বলে পরে আর খবর থাকে না। নিজের কথায় নিজেই আটকা পড়ে যায়। সুতরাং তাদের বই অনুযায়ীই কমিশন নেওয়া বৈধ হয় না।

আসলে এ ধরনের কথাবার্তার জবাব দিতে গেলে শুধু সময়ই নষ্ট হবে। কোনো ইলমী বা দ্বীনী ফায়েদা হবে না। তাই এখানেই শেষ করছি।

শেষ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেললে করণীয় কী?

প্রশ্ন: মুহতারাম মুফতি সাহেব। আমি আমার ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে ফেলেছি। এখন আমার কী …