হোম / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / ইসলামের ইতিহাস পাঠ (পর্ব- ৬) খারেজীদের ষড়যন্ত্র
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

ইসলামের ইতিহাস পাঠ (পর্ব- ৬) খারেজীদের ষড়যন্ত্র

আবূ মুয়াবিয়া লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

আগের লেখাটি পড়ে নিনএকটি ভুল বুঝাবুঝি এবং অবশেষে সন্ধিচুক্তি

হযরত আলী রাঃ মদীনা তাইয়্যিবাহ ছেড়ে পুরোপুরিভাবে কুফায় চলে এলেন। ইসলামী সালতানাতের রাজধানী বানালেন কুফাকে। তার সাথে আব্দুল্লাহ বিন সাবার অনুসারী এবং উসমান রাঃ এর হত্যাকারী বিদ্রোহী দলও কুফায় চলে আসে।
হযরত আলী রাঃ কুফাকে রাজধানী বানানোর প্রধান কারণ ছিল, কুফার লোকেরা নিজেদের শিয়ানে আলী বা আলীর দল বলে নিজেদের পরিচয় দিতো। আহলে বাইতের মোহাব্বতের কথা মুখ ভরে বলতো। কিন্তু এসব শিয়া নামধারীরা ছিল এক নাম্বার মিথ্যুক, চালবাজ এবং ধুরন্ধর ও স্বার্থপর লোক।
কুফার লোকেরা সব শিয়া ছিল একথা নির্দ্ধিধায় শিয়াদের গ্রহণযোগ্য বই ‘মাজালিসুল মু’মিমীন’ এর মাঝে নি¤েœাক্ত শব্দে এসেছেঃ

ومجمل القول: لا حاجة بإقامة دليل على تشيع الكوفة، والسنى الكوفى خلاف الأصل ويحتاج لإقامة الدليل، وإن كان أبو حنيفة كوفيا (مجاليس المؤمنين، المجلس الأول فى ذكر بعض الأماكن المختصة بالأئمة وشيعتهم-125

و بالجمله تشيع اهل كوفه حاجت باقامه دليل ندارد و سنى بودن كوفى الاصل خلاف اصل محتاج بدليل است و اگرچه ابو حنيفه كوفى باشد

মোটকথা হল, পুরো কুফার শিয়া হওয়া এতোটাই পরিস্কার যে, এর উপর দলীল পেশ করারই কোন দরকার নেই। বরং কুফীদের সুন্নী হবার দলীল পেশ করা প্রয়োজন। যদিও ইমাম আবূ হানীফা কুফী ছিলেন। [মাজালিসুল মু’মিনীন, আরবী সংস্করণ-১২৫, ফার্সি সংস্করণ-৫৬]

এরই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়, শিয়াদের লিখিত বাংলা অনূদিত বই ‘বেলায়েতের দ্যুতি’ এর ৪৪৬ পৃষ্ঠায়। সেখানে লেখা হয়েছেঃ
‘যদিও ইমাম (আঃ) মদীনার বিরাট সংখ্যক লোকজন নিয়ে রওয়ানা হন এবং মাঝপথেও কিছু লোক তাঁর সঙ্গে যোগ দেয়, কিন্তু ইমামের অধিকাংশ সৈন্য এবং তাঁর জন্য প্রাণোৎসর্গকারীরা ছিলো কূফা ও তার পার্শবর্তী এলাকার লোক। [বেলায়েতের দ্যুতি-৪৪৬]

কুফার এ সমস্ত শিয়ারা বাহ্যিকভাবে যদিও হযরত আলী রাঃ এর ভক্ত হবার কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলতো, কিন্তু আসলে ছিল এক নাম্বার ধোঁকাবাজ ও প্রতারক। সেই সাথে চরম স্বার্থপর। হযরত আলী রাঃ তাদের প্রতারণা ও ধোঁকাবাজীতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। শিয়াদের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মোল্লা বাকের মাজলিসী লিখেনঃ

وقد ورد فى جملة من الأخبار المعتبرة أنه عليه السلام لما ضاق صدره من عدم نصرة قومه، وكفرهم ونفاقهم، وأتى عسكر معاوية إلى الأنبار وأطراف مملكته، فأغاروا عليها ولم يخرج إليهم أحد من أصحابه، قال عليه السلام فى خطبة طويلة: أما والله لوددت أن ربى قد أخرجنى من بين أظهركم إلى رضوانه، ……… وقد خاب من افترى، ونجا من اتقى وصدق بالحسنى (جلاء العيون، الفصل الثانى فى بيان إخبار الله ورسوله-203

গ্রহণযোগ্য বর্ণনায় এসেছে যে, যখন হযরত আলী রাঃ তার সাথীদের নাফরমানী, মুনাফিকী, কুফরী এবং বিরোধিতায় অতিষ্ঠ হয়ে গেলেন, অপরদিকে হযরত মুয়াবিয়া রাঃ এর বাহিনী তার রাষ্ট্রের দিকে ধেয়ে আসছে, কিন্তু তার সাথী কেউ তাকে সহযোগিতা করছিল না, তখন আলী রাঃ তার এক লম্বা খুতবায় ইরশাদ করেন, আল্লাহর কসম উঠিয়ে দুআ করি যে, আল্লাহ আমাকে তোমাদের থেকে উঠিয়ে নেন এবং জান্নাতের বাগানে স্থান দেন। ……….তারপর বলেন, হে আল্লাহ! তুমি জানো যে, আমি তাদের উপর বিরক্ত, আর তারাও আমার উপর বিরক্ত, হে আল্লাহ তুমি আমাকে মৃত্যু দিয়ে তাদের থেকে মুক্তি দাও, আর তাদের উপর এমন ব্যক্তিকে চাপিয়ে দাও, যাতে আমাকে স্মরণ করে। [জালাউল উয়ূন, মোল্লা বাকের মাজলিসীকৃত, আরবী সংস্করণ-২০৩, উর্দু সংস্করণ-১/২৮৪]

শিয়াদের সবচে’ বিশুদ্ধ গ্রন্থ ‘নাহজুল বালাগাহ’ এর বক্তব্যটি আরো স্পষ্টঃ

যখন আমিরুল মোমেনিন উত্তরোত্তর সংবাদ পেতে লাগলেন যে, মুয়াবিয়ার জনগণ একের পর এক শহর দখল করে নিচ্ছে এবং ইয়ামেন থেকে তার অফিসার উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও সাঈদ ইবনে নিমরান মুয়াবিয়ার লোক বুসর ইবনে আরতাঁতের নিকট পরাজিত হয়ে পিছু হটে এসেছে, তখন আমিরুল মোমেনিন। তাঁর লোকদের জিহাদে বিমুখতা ও তার সাথে মতদ্বৈধতার কারণে বিচলিত হলেন । তিনি মিম্বারে উঠে। এ খোৎবা প্রদান করেন। কুফা ব্যতীত আমার জন্য আর কিছুই রইল না। যা আমি সংকীর্ণ ও প্রশস্ত করতে পারি। (হে কুফা) তোর দশা যদি এ রকমই হয় যে, তোর ওপর দিয়ে ঘূর্ণিঝড় বইতেই থাকবে তবে আল্লাহ তোকে ধ্বংস করুক। তারপর তিনি একটা কবিতার দুটি পংক্তি আবৃত্তি করলেনঃ হে আমার ! তোমার পরম পিতার দোহাই, এ পাত্র থেকে আমি সামান্য একটুখানি চর্বি পেয়েছি, যা পাত্র খালি করার পর পাত্রের গায়ে লেগেছিল।
আমি জানতে পারলাম যে, বুসর ইয়ামেন দখল করে নিয়েছে। আল্লাহর কসম, এসব লোক সম্পর্কে আমি চিন্তা করে দেখেছি। এরা সহসাই সারা দেশ কেড়ে নিয়ে যাবে। কারণ তারা বাতিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকেও একতাবদ্ধ। অথচ তোমরা সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকেও ঐক্যবদ্ধ নও, তোমরা দ্বিধাবিভক্ত। ন্যায়ের পথে থাকা সত্ত্বেও তোমরা তোমাদের ইমামকে অমান্য কর। আর বাতিল পথে থাকা সত্ত্বেও তারা তাদের নেতাকে মান্য করে। তারা তাদের নেতার প্রতি সম্পূর্ণরূপে আস্থাবান; আর তোমরা তোমাদের ইমামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কর। তাদের শহরে তারা কল্যাণকর কাজ করে; আর তোমরা তোমাদের শহরে অকল্যাণকর কাজ কর। যদি আমি তোমাদের একটা কাঠের গামলার দায়িত্বও দেই, আমার মনে হয়, তোমরা তার হাতল নিয়ে পালিয়ে যাবে। হে আমার আল্লাহ, তারা আমার প্রতি নিদারুণভাবে বিরক্ত; আমিও তাদের প্রতি বিরক্ত। তারা আমাকে নিয়ে ক্লান্ত; আমিও তাদের নিয়ে ক্লান্ত। তাদের চেয়ে ভালো কোন জনগোষ্ঠী আমাকে দিন এবং আমার চেয়ে মন্দ কোন নেতা তাদেরকে দিন। [বাংলা নাহজ আল বালাগা-৪৭-৪৮]

শিয়া মতবাদের সবচে’ গ্রহণযোগ্য হাদীসের কিতাব ‘আলকাফী’ তে আসছেঃ-

موسى بن بكر الواسطي ، قال : قال لي أبو الحسن (ع) : لو ميزت شيعتي لم أجدهم الا واصفة ، ولو امتحنتهم لما وجدتهم الا مرتدين ،

মুসা বিন বকর ওয়াসিতী বলেন, আমাকে হযরত আলী রাঃ বলেছেন, যদি আমি আমার শিয়াদের যাচাই করে দেখি, তাহলে তাদেরকে শুধুমাত্র বাগাড়ম্বরই পাবো। আর যদি আমি তাদের পরীক্ষা করে দেখি, তাহলে দেখা যাবে এরা সবাই মুরতাদ। [আলকাফী, মুহাম্মদ বিন ইয়াকূব কিলানীকৃত-৮/১২৪]

নাহজুল বালাগায় এক স্থানে শিরোনাম এমন ‘নিজের অনুচরদের ভর্ৎসনা’। যার অধীনে হযরত আলী রাঃ এর একটি খুতবা আনা হয়। যাতে হযরত আলী রাঃ তার কুফার অনুচরদের প্রতি তার কষ্ট, বিতৃষ্ণা ও বিরক্তি পরিস্কারভাবে বিবৃত করেন। তিনি বলেন, “মানুষ শাসকের অত্যাচারের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত থাকে; আর আমি আমার প্রজাদের অত্যাচারকে ভয় করি।”। একটু পর বলেনঃ “আমি সকাল বেলা তোমাদেরকে সোজা করি কিন্তু বিকাল বেলায় তোমরা ধনুকের পিঠের মত বাঁকা হয়ে আমার কাছে আস। আমি তোমাদেরকে সোজা করতে গিয়ে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছি আর তোমরাও অশোধনীয় হয়ে পড়েছো।” একটু পর আরো বলেনঃ “আল্লাহর কসম! দিনারের সাথে দিরহাম বিনিময়ের মত মুয়াবিয়া যদি তোমাদের দশজনকে নিয়ে তদ্বিনিময়ে তার একজন আমাকে দিত আমি তাতেই সন্তুষ্ট হতাম। হে কুফাবাসীগণ! তোমাদের নিকট হতে আমি পাঁচটি জিনিসের অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। এ গুলো হল, কান থাকা সত্ত্বেও তোমরা বধির, কথা বলার শক্তি থাকা সত্ত্বেও তোমরা বোবা, চোখ থাকা সত্ত্বেও তোমরা অন্ধ, যুদ্ধে তোমরা খাঁটি সমর্থক নও এবং বিপদে তোমরা নির্ভরযোগ্য ভ্রাতা নও। তোমাদের হাত মাটি দ্বারা ময়লাযুক্ত হোক (অর্থাৎ তোমরা অপমানিত ও লজ্জিত হও)। ওহে তোমাদের উদাহরণ হলো চালকবিহীন উটের পালের মত যাদের একাদিক হতে জড়ো করলে অন্যদিকে ছড়িয়ে যায়। আল্লাহর কসম, আমি দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি যে, যদি পুরোদমে যুদ্ধ বাঁধে তবে তোমরা আবি তালিবের পুত্রকে ছেড়ে এমনভাবে দৌঁড়ে পালাবে যেভাবে সম্মুখভাগ উলঙ্গ হওয়া মেয়েলোক পালায়। [নাহজ আলবালাগা, বাংলা অনুবাদ- ১১৯-১২০]

এ সমস্ত ধুরন্ধর শিয়াদেরই একদল অবশেষে খারেজী মতাদর্শ গ্রহণ করে। যারা হযরত মুয়াবিয়া রাঃ কে হত্যা না করে তার সাথে সন্ধি চুক্তি করায় হযরত আলী রাঃ কে কাফির বলতে শুরু করে। খুব দ্রুত তাদের কিছু সাথীও জুটে যায়। কারণ কুফার লোকেরা শিয়া হলেও এরা প্রথমসারীর গাদ্দার ও প্রতারক।

অবশেষে হযরত আলী রাঃ নাহরাওয়ানের যুদ্ধে এসব খারেজীদের কোমড় ভেঙ্গে দেন। পরাজিত এসব খারেজীরা এবার যুদ্ধের পথ ছেড়ে ভিন্নভাবে প্রতিশোধ গ্রহণের মনস্ত করে।

পরের পর্বটি পড়ুন- হযরত আলী রাঃ এর শাহাদত

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

ইসলামের ইতিহাস পাঠ (পর্ব-৭] হযরত আলী রাঃ এর শাহাদত

আবূ মুয়াবিয়া লুৎফুর রহমান ফরায়েজী আগের লেখাটি পড়ে নিন- খারেজীদের ষড়যন্ত্র হযরত মুয়াবিয়া রাঃ এর …