প্রচ্ছদ / ভ্রান্ত মতবাদ / হেযবুত তাওহীদের ভ্রান্ত মতবাদ (১৭)

হেযবুত তাওহীদের ভ্রান্ত মতবাদ (১৭)

হজ্ব হচ্ছে মুসলিমদের আন্তর্জাতিক কনফারেন্স!

হেযবুত তাওহীদের বক্তব্যঃ

ইসলামের অন্য সব কাজের মতোই আজ হজ্ব সম্বন্ধেও এই জাতির আকীদা বিকৃত হয়ে গেছে। এই বিকৃত আকীদায় হজ্ব আজ সম্পূর্ণরূপে একটি আধ্যাত্মিক ব্যাপার, আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করার পথ। প্রথম প্রশ্ন হোচ্ছে- আল্লাহ সর্বত্র আছেন, সৃষ্টির প্রতি অনু-পরামাণুতে আছেন, তবে তাঁকে ডাকতে, তাঁর সান্নিধ্যের জন্য এত কষ্ট কোরে দূরে যেতে হবে কেন?
(হিযবুত তাওহীদের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত ‘মোসলেম উম্মাহর বার্ষিক মহাসম্মেলন’ প্রবন্ধ-১ম প্যারা)

বছরে একবার আরাফাতের মাঠে পৃথিবীর সমস্ত মোসলেমদের নেতৃস্থানীয়রা একত্র হোয়ে জাতির সর্বরকম সমস্যা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ইত্যাদি সর্বরকম সমস্যা, বিষয় নিয়ে আলোচনা কোরবে, পরামর্শ কোরবে, সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থাৎ স্থানীয় পর্য্যায় থেকে ক্রমশঃ বৃহত্তর পর্য্যায়ে বিকাশ কোরতে কোরতে জাতি পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু মক্কায় একত্রিত হবে। একটি মহাজাতিকে ঐক্যের সুদৃঢ় বন্ধনে বেঁধে রাখার কী সুন্দর প্রক্রিয়া।
(‘মোসলেম উম্মাহর বার্ষিক মহাসম্মেলন’ প্রবন্ধ-৫ম প্যারা)

লিংকঃ http://goo.gl/VrWu75

পর্যালোচনাঃ

হিযবুত তাওহীদের উক্ত লিখনীতে দুটি বিষয় ফুটে উঠেছেঃ

১.হজ্ব কে ইবাদাত মনে করা ভুল বরং এটি মুসলিমদের আন্তর্জাতিক কনফারেন্স।

২.হজ্বের সময় মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিগণ একত্রিত হয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করাই হল হজ্বের প্রকৃত উদ্দেশ্য ।

(নাউযুবিল্লাহ)

তাদের উপরোক্ত দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ।হজ্ব ইসলামের ৫ টি রোকনের অন্যতম একটি রোকন।হজ্ব একটি সতন্ত্র ইবাদাত ।এটি কোন নিছক কনফারেন্স নয়।

হজ্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদাতঃ

পবিত্র কুরআন মাজীদে আল্লহ ﷻ ইরশাদ করেনঃ

وَ لِلّٰهِ عَلَی النَّاسِ حِجُّ الْبَیْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ اِلَیْهِ سَبِیْلًا ؕ وَ مَنْ كَفَرَ فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِیٌّ عَنِ الْعٰلَمِیْنَ

মানুষের উপর আল্লাহর বিধান ঐ ঘরের হজ্ব করা, যার আছে সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য। আর কেউ কুফর করলে আল্লাহ তো বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন। (সূরা আলে ইমরান-৯৭)

এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় হজ্ব আল্লহ ﷻ এর বিধান, আল্লহ ﷻ এর হক্ব।

হাদীসের মধ্যে হজ্বের ব্যপক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে ।পাঠকদের খিদমতে কয়েকটি তুলে ধরা হলঃ

আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেনঃ

من حج فلم يرفث ولم يفسق غفر له ما تقدم من ذنبه.

যে ব্যক্তি হজ্ব করে আর তাতে কোনোরূপ অশ্লীল ও অন্যায় আচরণ করে না তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।(সুনানে তিরমিযী-৮১১)

আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম ﷺ বলতে শুনেছিঃ

من حج لله فلم يرفث ولم يفسق رجع كيوم ولدته أمه.

যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্ব করল এবং অশ্লীল কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল সে ঐ দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে হজ্ব থেকে ফিরে আসবে যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট হয়েছিল।(সহীহ বুখারী-১৫২১; সহীহ মুসলিম-১৩৫০)

আমর ইবনুল আস (রাঃ) বর্ণনা করেন, (দীর্ঘ এক হাদীসে) রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ

أما علمت يا عمرو! أن الإسلام يهدم ما كان قبله، وأن الهجرة تهدم ما كان قبلها، وأن الحج يهدم ما كان قبله.

হে আমর! তুমি কি জান না যে, ইসলাম (গ্রহণ) পূর্বেকার যাবতীয় পাপকে মুছে ফেলে। হিজরত তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দেয় এবং হজ্ব অতীতের পাপসমূহ মুছে দেয়।(সহীহ মুসলিম-১২১; সহীহ ইবনে খুযাইমা-২৫১৫; মুসনাদে আহমদ-১৭৭৭৭)

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেনঃ

العمرة إلى العمرة كفارة لما بينهما، والحج المبرور ليس له جزاء إلا الجنة.

এক উমরা আরেক উমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহর ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়,আর হজ্বে মাবরূরের প্রতিদান তো জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।

(সহীহ বুখারী-১৭৭৩;সহীহ মুসলিম-১৩৪৯;সুনানে তিরমিযী-৯৩৩;সুনানে ইবনে মাজাহ-২৮৮৮)

এরকম বহু ফজিলত ছড়িয়ে রয়েছে হাদীসের কিতাবের পাতায় পাতায়। এসব ফজিলত থেকে সহজেই অনুমিত হয় যে হজ্ব একটি ইবাদাত এবং আল্লহ ﷻ এর নৈকট্য অর্জনের বিশেষ সুযোগ ।

তাই হিযবুত তাওহীদ কর্তৃক হজ্বকে আল্লহ ﷻ এর সান্নিধ্য অর্জনের পথ মনে করাকে বিকৃত আক্বীদা ঘোষণা দেয়া সুষ্পষ্ট বিভ্রান্তিকর ।

হিযবুত তাওহীদের মতে মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিগণ একত্রিত হয়ে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে পরামর্শ করা ,সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে হজ্বের প্রকৃত উদ্দেশ্য।তাদের এ দাবি থেকে যদি তারা এরকম উদ্দেশ্য নেয় যে, হজ্ব কেবল মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিদের জন্য জরুরি তবে একথা সরাসরি কুরআন-হাদীস বিরোধী ।

পবিত্র কুরআন মাজীদে আল্লহ ﷻ ইরশাদ করেনঃ

وَ لِلّٰهِ عَلَی النَّاسِ حِجُّ الْبَیْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ اِلَیْهِ سَبِیْلًا ؕ وَ مَنْ كَفَرَ فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِیٌّ عَنِ الْعٰلَمِیْنَ

মানুষের উপর আল্লাহর বিধান ঐ ঘরের হজ্ব করা, যার আছে সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য। আর কেউ কুফর করলে আল্লাহ তো বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন। (সূরা আলে ইমরান-৯৭)

এ আয়াতে আল্লহ ﷻ স্পষ্ট বলে দিয়েছেন হজ্ব প্রত্যেক সামর্থবানের উপর ফরজ।সুতরাং হজ্ব শুধু প্রতিনিধিদের জন্য নয়,সাধারণ মানুষের(যদি সামর্থবান হয়) উপরও ফরজ।

প্রকৃতপক্ষে হজ্ব কি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স?

সম্মানিত পাঠক, চলুন এবার দেখে নেয়া যাক হজ্বের বিশেষ কিছু নিয়মকানুন যা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে হজ্ব কোন কনফারেন্স নয় বরং একটি সতন্ত্র ইবাদাত।

সেলাইকৃত কাপড় পরিধান করা নিষিদ্ধঃ

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাঃ বলেনঃ

أَنَّ رَجُلاً، سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ مَا يَلْبَسُ الْمُحْرِمُ مِنَ الثِّيَابِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ لاَ تَلْبَسُوا الْقُمُصَ وَلاَ الْعَمَائِمَ وَلاَ السَّرَاوِيلاَتِ وَلاَ الْبَرَانِسَ وَلاَ الْخِفَافَ

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞাসা করল, মুহরিম কী কী কাপড় পরতে পারবে? তখন তিনি ইরশাদ করলেন, জামা, পাগড়ি, পাজামা, টুপি ও মোজা পরবে না। (সহীহ মুসলিম- ১/৩৭২)

ইহরাম করার পর আতর বা সুগন্ধি লাগানো নিষেধঃ

ইয়া’লা ইবনু উমায়্যাহ (রাঃ) বলেনঃ

أَتَى النَّبِيَّ ﷺ رَجُلٌ وَهُوَ بِالْجِعْرَانَةِ وَأَنَا عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ وَعَلَيْهِ مُقَطَّعَاتٌ – يَعْنِي جُبَّةً – وَهُوَ مُتَضَمِّخٌ بِالْخَلُوقِ فَقَالَ إِنِّي أَحْرَمْتُ بِالْعُمْرَةِ وَعَلَىَّ هَذَا وَأَنَا مُتَضَمِّخٌ بِالْخَلُوقِ ‏.‏ فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ ﷺ “‏ مَا كُنْتَ صَانِعًا فِي حَجِّكَ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَنْزِعُ عَنِّي هَذِهِ الثِّيَابَ وَأَغْسِلُ عَنِّي هَذَا الْخَلُوقَ ‏.‏ فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ ﷺ ‏”‏ مَا كُنْتَ صَانِعًا فِي حَجِّكَ فَاصْنَعْهُ فِي عُمْرَتِكَ ‏”‏ ‏

এক ব্যক্তি নাবী ﷺ এর নিকট এলো। তখন তিনি জিরানাহ নামক স্থানে ছিলেন এবং আমি নাবী ﷺ এর কাছেই ছিলাম। লোকটি (খালূক্‌ জাতীয়) সুগন্ধিযুক্ত একটি জুব্বাহ পরিহিত ছিল। সে বলল, আমি উমরার ইহরাম বেঁধেছি এবং আমার পরিধানে এ জুব্বাহ রয়েছে এবং আমি খালূক্‌ জাতীয় সুগন্ধি ব্যবহার করেছি। নাবী ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি হজ্বের ইহরামে থাকলে কী করতে? সে বলল, আমি নিজের এ পরিধেয় খুলে এবং নিজের দেহ থেকে এ সুগন্ধি ধুয়ে ফেলতাম। নাবী ﷺ তাকে বললেন, তুমি হজ্বের ইহরামে থাকলে যা করতে, উমরার জন্য তাই কর।( সহীহ মুসলিম -১/৩৭৩)

কোনো বন্য পশু শিকার করা বা শিকারীকে সহযোগিতা করা নিষিদ্ধঃ

আল্লহ ﷻ ইরশাদ করেনঃ

وَ حُرِّمَ عَلَیۡکُمۡ صَیۡدُ الۡبَرِّ مَا دُمۡتُمۡ حُرُمًا ؕ

এবং তোমাদের এহরামকারীদের জন্যে হারাম করা হয়েছে স্থল শিকার যতক্ষণ এহরাম অবস্থায় থাক। (সূরা মায়িদাহ- ৯৬)

পুরুষের জন্য পায়ের পাতার উপরের উঁচু হাড় ঢেকে যায় এমন জুতা পরিধান করা নিষেধঃ

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ

قَالَ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ يَلْبَسَ الْمُحْرِمُ ثَوْبًا مَصْبُوغًا بِزَعْفَرَانٍ أَوْ وَرْسٍ وَقَالَ ‏ “‏ مَنْ لَمْ يَجِدْ نَعْلَيْنِ فَلْيَلْبَسِ الْخُفَّيْنِ وَلْيَقْطَعْهُمَا أَسْفَلَ مِنَ الْكَعْبَيْنِ ‏”‏

রসূলুল্লাহ ﷺ মুহরিম ব্যক্তিকে জাফরান বা ওয়ারস দ্বারা রঞ্জিত কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, কারও চপ্পল না থাকলে সে মোজা পরিধান করবে এবং পায়ের গোছার নীচ বরাবর এর উপরিভাগ কেটে ফেলবে।(সহীহ মুসলিম,কিতাবুল হজ্ব-২৬৮৩)

বিজ্ঞ পাঠক, এবার আপনিই বলুন,কা’বা তাওয়াফ করা,সাফা-মারওয়া সাঈ করা,সেলাইকরা কাপড় পরিধানে নিষেধাজ্ঞা,সুগন্ধি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি নিয়মকানুন কি কোনো কনফারেন্সের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এছাড়াও হজ্বের আরও বিশেষ কিছু নিয়মকানুন রয়েছে ।এসব নিয়ম থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিয়মাণ হয় যে হজ্ব নিছক কোন কনফারেন্স নয়।হজ্ব একটি ইবাদাত যা নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি পালনের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়।বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে মুসলিমদের বাৎসরিক মিলনমেলা বলার সুযোগ থাকলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হল আল্লহ ﷻ এর বিধান পালনের মাধ্যমে তার সন্তুষ্টি অর্জন।

অথচ হিযবুত তাওহীদ কুরআন হাদীসের কোন দলীল উল্লেখ ব্যতীত যুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে এই বাহ্যিক সাদৃশ্যতাকেই মৌলিক উদ্দেশ্য বলে ইসলামের এই মহান ইবাদাতে বিকৃতি সাধনের অপচেষ্টা করেছে ।

আরও জানুন

বুখারী শরীফে নবীজী নূরের তৈরী হওয়া বিষয়ক হাদীস আছে?

প্রশ্ন From: আবদুল্লাহ আল মামুন বিষয়ঃ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নবীজি (সাঃ) নুরের তৈরি কিনা? প্রশ্নঃ হযরত, …