প্রচ্ছদ / আহলে হাদীস / ফী সাবীলিল্লাহ শব্দের তাহকীকঃ তাবলীগী ভাইয়েরা কি এ শব্দটি গলদ ব্যবহার করছে?

ফী সাবীলিল্লাহ শব্দের তাহকীকঃ তাবলীগী ভাইয়েরা কি এ শব্দটি গলদ ব্যবহার করছে?

প্রশ্ন

অনেক ভাই বলে থাকেন যে, তাবলীগী ভাইয়েরা ফী সাবীলিল্লাহ শব্দটির অপপ্রয়োগ করছেন। এর দ্বারা উদ্দেশ্য কেবল জিহাদ ফি সাবীলিল্লাহ। কিন্তু তাবলীগী ভাইয়েরা এটিকে কেবলি তাবলীগী সফরের সাথে খাস করে ফেলছেন। যা সরাসরি কুরআন ও হাদীস বিকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়। এ ব্যাপারে আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত আশা করছি।

প্রশ্নকর্তা- নাম ও ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

আসলে ফী সাবীলিল্লাহ শব্দটির অর্থ একাধিক। এটিকে কোন এক অর্থে আবশ্যক মনে করাটা অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়।

কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত “ফী সাবীলিল্লাহ” শব্দটি শুধু কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ তথা শসস্ত্র জিহাদের ক্ষেত্রেই খাস হিসেবে প্রযোজ্য করা হয়নি। যারা শুধুমাত্র এ শব্দটিকে কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ এর সাথে খাস বলে থাকেন, তাদের বক্তব্যটি দলীল নির্ভর নয়। কেবলি অনুমান নির্ভর। সেই সাথে এ বক্তব্যটি কুরআন ও হাদীস এবং সাড়ে চৌদ্দশ বছরের ইতিহাসও ভুল সাব্যস্ত করে।

ফী সাবীলিল্লাহ শব্দের মূল উদ্দেশ্য

ফী সাবীলিল্লাহ শব্দের মূল উদ্দেশ্য হল, প্রত্যেক ঐ রাস্তা এবং পদ্ধতি যা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য গ্রহণ করা হয়। সুতরাং এতে শসস্ত্র জিহাদ, দাওয়াত, ইলম অর্জন, নামাযের জামাআতে উপস্থিতি, হজ্বের সফর ইত্যাদিও শামিল হয়ে যায়।

যারা ফী সাবীলিল্লাহ শব্দকে শুধু কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ এর এর সাথে খাস করতে চান, সে সকল উলামায়ে কেরামের নিকট মূল বিষয় হল, قصر العام على اهم افراده অর্থাৎ একাধিক অর্থবোধক শব্দের মাঝের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ অর্থটি উদ্দেশ্য নেয়া হিসেবে বলে থাকেন। নতুবা ফী সাবীলিল্লাহ শব্দটি দ্বীন জিন্দা করার সকল শাখাকেই শামিল করে নিয়ে থাকে। কিন্তু যেহেতু কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ দ্বীন জিন্দা করার একটি মহান ও গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি তাই আমভাবে এটিকে উদ্দেশ্য নেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এর দ্বারা অন্য কোন কিছু উদ্দেশ্যই হতে পারবে না। এমনটি ভাবা অজ্ঞতা বৈ কিছু হবে না।

একটি প্রশ্ন ও জবাব

কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, যদি জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ শব্দটি একাধিক অর্থেই ব্যবহৃত হয় তথা একাধিক অর্থবোধকই হয়ে থাকে। তাহলে মুহাদ্দিসীনে কেরাম কেন ফী সাবীলিল্লাহ সংক্রান্ত সকল বর্ণনা শুধুমাত্র “কিতাবুল জিহাদ” এ এনেছেন?

তাহলে এ আচরণ কি প্রমাণ করে না যে, ফী সাবীলিল্লাহ দ্বারা কেবলি শসস্ত্র জিহাদই উদ্দেশ্য অন্য কিছু নয়?

উত্তর

আসলে একথাটি ঠিক নয়। মুহাদ্দিসীনে কেরাম ফী সাবীলিল্লাহ এর বর্ণনা কিতাবুল জিহাদ ছাড়া অন্যত্রও একত্রিত করেছেন। যেমন ইমাম বুখারী রহঃ জুমআর নামাযে গমণের কথা উল্লেখ করতে ফী সাবীলিল্লাহ সম্বলিত হাদীস কিতাবুল জুমআয় এনেছেন। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৯০৭, ৮৬৫}

এমনিভাবে ইমাম বায়হাকী রহঃ সুনানুল কুবরা লিলবায়হাকীতে এবং হযরত মুনজিরী রহঃ স্বীয় সংকলিত গ্রন্থ “আততারগীব ওয়াত তারহীব” এ বুখারীতে বর্ণিত হাদীসটি এনেছেন জুমআর নামাযে গমণের ফযীলত হিসেবে।

ইমাম বুখারী রহঃ, হযরত ইমাম বায়হাকী রহঃ এবং হযরত মুনজিরী রহঃ প্রমুখগণ ফী সাবীলিল্লাহ সম্বলিত হাদীস আল্লাহর পথে শসস্ত্র জিহাদ ছাড়া অন্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করে একথাই প্রকাশ করলেন না যে, ফী সাবীলিল্লাহ শব্দটি শুধুমাত্র কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ এর জন্য খাস নয়। বরং তা অন্যান্য কল্যাণকর দ্বীন জিন্দামূলক কাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

কুরআন থেকে প্রমাণ

কুরআনে কারীমে ফী সাবীলিল্লাহ শব্দটি বেশ কিছু কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট করে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন-

১-   আসসাদ্দু আন সাবীলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তায় যেতে বাঁধা দেয়া। {সূরা বাকারা-২১৭, সূরা আলে ইমরান-৯৯, সূরা নিসা-১৪, সূরা আরাফ-৪৫, সূরা আরাফ-৮৬, সূরা আনফাল-৩৬, সূরা আনফাল-৪৭, সূরা তওবা-৩২, সূরা হুদ-১৯, সূরা ইবরাহীম-৩, সূরা নহল-৮৮, সূরা নহল-৯৪, সূরা হজ্ব-২৫, সূরা মুহাম্মদ-১০, মুহাম্মদ-৩২, সূরা মুহাম্মদ-২৩, সূরা মুজাদালা-১৬, সূরা মুনাফিকুন-২}

২-   আলইদ্বলালু আন সাবীলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তা থেকে পথভ্রষ্ট করা। {সূরা আনআম-১১৬, সূরা হজ্ব-৯, সূরা লুকমান-৬, সূরা সাদ-৬}

৩-   আলইনফাকু ফী সাবীলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা। {সূরা বাকারা-২৬১-২৬২, সূরা মুহাম্মদ-৩৮, সূরা হাদীদ-১০, সূরা তওবা-৩৪, সূরা বাকারা-১৯৫, সূরা আনফাল-৬০}

৪-   আলইহসারু ফী সাবীলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তায় বাঁধাগ্রস্ত হওয়া। {সূরা বাকারা-২৭৩}

৫-   আলহিজরাতু ফী সাবীলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করা। {সূরা নিসা-১০০, সূরা নিসা-৮৯, সূরা হজ্ব-৫৮, সূরা নূর-২২}

৬-   আলজিহাদু ফী সাবীলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ তথা কষ্ট মোজাহাদা করা। {সূরা হুজুরাত-১৫, সূরা আনফাল-৭২, সূরা আনফাল-৭৪, সূরা তওবা-১৯-২০, সূরা তওবা-৪১, সূরা নিসা-৯০, সূরা মায়িদা-৫৪, সূরা তওবা-৮১, সূরা সাফফ-১০-১১}

৭-   আসসাদকাতু ফী সাবীলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তায় সদকা করা। {সূরা তওবা-৬০}

৮-   আজজারবু ফী সাবীলিল্লাহ। তথা আল্লাহ রাস্তায় সফর করা। {সূরা নিসা-৯৪}

৯-   আননাফরু ফী সাবীলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া। {সূরা তওবা-৩৮}

১০-  আলইসাবাতু ফী সাবীলিল্লাহ তথা আল্লাহর রাস্তায় আহত হওয়া। {সূরা আলে ইমরান-১৪৯}

১১-  আলকিতালু ফী সাবীলিল্লাহ তথা আল্লাহর রাস্তায় শসস্ত্র জিহাদ করা। {সূরা বাকারা-১৯০, ২৪৪, ২২৪, আলে ইমরান-১৩, ১৫৭, ১৪৪-১৬৭, ১৬৯, সূরা নিসা-৭৪-৭৬, ৮৪, সূরা মুহাম্মদ-৪, সূরা মুজ্জাম্মিল-২০, সূরা তওবা-১১১-১১২}

ফী সাবীলিল্লাহ বিষয়ক উল্লেখিত আয়াতে কারীমা তাফসীরসহ যে কেউ পড়লেই বুঝতে সক্ষম হবেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফী সাবীলিল্লাহ বলে শুধু কিতাল ফী সাবীলিল্লাহকেই বুঝাননি। বরং সকল প্রকার নেক আমলকেই এর মাঝে অন্তর্ভূক্ত করেছেন।

হাদীস থেকে প্রমাণ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، قَالَ: بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسٌ مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا شَابٌّ مِنَ الثَّنِيَّةِ، فَلَمَّا رَأَيْنَاهُ بِأَبْصَارِنَا قُلْنَا: لَوْ أَنَّ هَذَا الشَّابَّ جَعَلَ شَبَابَهُ وَنَشَاطَهُ وَقُوَّتَهُ فِي سَبِيلِ اللهِ. قَالَ: فَسَمِعَ مَقَالَتَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ” وَمَا سَبِيلُ اللهِ إِلَّا مَنْ قَتَلَ؟ مَنْ سَعَى عَلَى وَالِدَيْهِ فَفِي سَبِيلِ اللهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى عِيَالِهِ فَفِي سَبِيلِ اللهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى نَفْسِهِ لِيُعِفَّهَا فَفِي سَبِيلِ اللهِ، وَمَنْ سَعَى عَلَى التَّكَاثُرِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ الشَّيْطَانِ “

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাঃ এর পাশে বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় সানিয়্যাতুল বিদা থেকে এক যুবক আমাদের কাছে এল। তখন আমরা উক্ত যুবককে দেখে বলতে লাগলাম, কতইনা উত্তম হতো যদি এ যুবক তার যৌবন, শক্তি আর ক্ষমতাকে ফী সাবীলিল্লাহ তথা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতো। রাসূল সাঃ আমাদের কথা শুনে বললেন, শহীদ হওয়াই কি শুধু ফী সাবীলিল্লাহ? শোন! যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে লালনের জন্য মেহনত করে সেও ফী সাবীলিল্লাহে রয়েছে, যে ব্যক্তি পরিবারের ভরণ-পোষণের মেহনত করে সেও ফী সাবীলিল্লাহে রয়েছে। যে ব্যক্তি নিজের মনকে পবিত্র রাখতে চেষ্টা-মেহনত করে বেড়ায় সে ব্যক্তিও ফী সাবীলিল্লাহে রয়েছে। যে ব্যক্তি শুধু সম্পদ বাড়ানোর চিন্তায় মেহনত করে বেড়ায় সে ফী সাবীলিশ শয়তান তথা শয়তানের পথে রয়েছে।

শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৯৮৯২, সুনানুল কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-১৭৮২৪, আততারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস নং-৪৩৯}

আহলে হাদীসদের কাছে মান্যবর শায়েখ নাসীরুদ্দীন আলবানী রহঃ বলেন, হাদীসটির সনদ জায়্যিদ। {সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহাহ-৫/২৭২}

عَنْ كَعْبِ بْنِ عُجْرَة، قَالَ: مَرَّ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلٌ، فَرَأَى أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ جِلْدِهِ وَنَشَاطِهِ، فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ: لَوْ كَانَ هَذَا فِي سَبِيلِ اللهِ؟، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنْ كَانَ خَرَجَ يَسْعَى عَلَى وَلَدِهِ صِغَارًا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَإِنْ كَانَ خَرَجَ يَسْعَى عَلَى أَبَوَيْنِ شَيْخَيْنِ كَبِيرَيْنِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَإِنْ كَانَ يَسْعَى عَلَى نَفْسِهِ يُعِفُّهَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللهِ، وَإِنْ كَانَ خَرَجَ رِيَاءً وَمُفَاخَرَةً فَهُوَ فِي سَبِيلِ الشَّيْطَانِ»

হযরত কাব বিন উজরা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূল সাঃ এর পাশ দিয়ে এক ব্যক্তি অতিক্রান্ত হচ্ছিল। নবীজী সাঃ এর সাহাবাগণ উক্ত ব্যক্তির শারিরীক সক্ষমতা ও উদ্দমতার দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূলঃ যদি এই ব্যক্তি কি ফী সাবীলিল্লাহে থাকতো? তখন রাসূল সাঃ ইরশাদ করলেন, যদি এ ব্যক্তি তার ছোট বাচ্চাদের লালন পালনের জন্য মেহনত করতে বেরিয়ে থাকে, তাহলে সে ফী সাবীলিল্লাহে রয়েছে। আর যদি সে বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের জন্য বেরিয়ে থাকে, তবু সে ফী সাবীলিল্লাহে রয়েছে। আর যদি সে নিজের মনকে পবিত্র রাখতে চেষ্টা-মেহনত করতে থাকে, তবু সে ফী সাবীলিল্লাহে রয়েছে। আর যে ব্যক্তি লৌকিকতা ও দাম্ভিকতা প্রদর্শনের জন্য বের হয়, সে হল ফী সাবীলিশ শয়তান তথা শয়তানের পথে রয়েছে। {আলমুজামুল কাবীর, হাদীস নং-২৮২, আলমুজামুল আওসাত, হাদীস নং-৬৮৩৫, আলমুজামুস সাগীর, হাদীস নং-৯৪০}

হাদীসটির ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসীনদের মন্তব্য

১-   আল্লামা মুনজিরী রহঃ বলেন, এ হাদীসের সকল রাবী সহীহ। {আততারগীব ওয়াত তারহীব-৩/১০৭}

২-   আল্লামা দিময়াতী রহঃ বলেন, এ হাদীসের সকল রাবী সহীহ। {আলমুত্তাজিরুর রাবীহ, বর্ণনা নং-২৫৫}

৩-   আল্লামা হায়তামী মক্কী রহঃ বলেন, এ হাদীসের সকল রাবী সহীহ। {আজযাওয়াজের-২/৬৫}

قال عمر كنا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم على جبل فأشرفنا على واد فرأيت شابا يرعى غنما له، أعجبني شبابه فقلت: يا رسول الله وأي شاب لو كان شبابه في سبيل الله؟ فقال النبي صلى الله عليه وسلم: يا عمر فلعله في بعض سبيل الله وأنت لا تعلم، ثم دعاه النبي صلى الله عليه وسلم فقال: يا شاب هل لك من تعول؟ قال: نعم، قال: من، قال أمي، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: الزمها فإن عند رجليها الجنة، ثم قال النبي صلى الله عليه وسلم: لئن كان الشهيد ليس إلا شهيد السيف فإن شهداء أمتي إذا لقليل، ثم ذكر صاحب الحرق، والشرق، والهدم، والبطن، والغريق، ومن أكل السبع ومن سعى على نفسه ليعزها ويغنيها عن الناس فهو شهيد.

হযরত উমর রাঃ বলেন, একদা আমরা রাসূল সাঃ এর সাথে এক পাহাড়ের উপর ছিলাম। সেখান থেকে আমরা একটি উপত্যাকার দিকে যাচ্ছিলাম। এমন সময় দেখলাম এক যুবক বকরী চড়াচ্ছে। উক্ত যুবকটির যৌবনদীপ্ততা আমাকে আগ্রহী করে তুলল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হায়! যদি এ যুবকের যৌবন ফী সাবীলিল্লাহে তথা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হতো! তখন রাসূল সাঃ আমাকে বললেন, হে উমর! হয়তো সে ফী সাবীলিল্লাহেই আছে, অথচ তুমি জান না। একথা বলার পর রাসূল সাঃ উক্ত যুবকটিকে ডাকলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি কারো ভরণ-পোষণের দায়িত্বেরত? যুবকটি বলল, হ্যাঁ। রাসূল সাঃ বললেন, কার? যুবক বলল, আমার মায়ের। তখন রাসূল সাঃ বললেন, তুমি একাজে রত থাক, কেননা তার পায়ের নিচে তোমার জান্নাত। তারপর রাসূল সাঃ বললেন, যদি শুধু তরবারীর আঘাতে নিহত ব্যক্তিই শহীত হতো, তাহলে আমার উম্মতে শহীদ খুবই কম হয়ে যেত। তারপর বললেন, আগুণে পুড়ে মৃত, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত, ধ্বংসাবশেষের নিচে পড়ে মৃত, সন্তান প্রসবের সময় মৃত, পানিতে নিমজ্জিত এবং যে ব্যক্তিকে হিং¯্র প্রাণী খেয়ে ফেলেছে, এবং যে ব্যক্তি নিজেকে পবিত্র রাখতে মেহনত করে সেও শহীদ। {কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-১১৭৬০}

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ خَرَجَ فِي طَلَبِ العِلْمِ فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللهِ حَتَّى يَرْجِعَ.

হযরত আনাস বিন মালিক রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি দ্বীনী ইলম অন্বেষণ করার জন্য বের হয়, সে ব্যক্তি ফী সাবীলিল্লাহ তথা আল্লাহর রাস্তায় থাকে ফিরে আসা পর্যন্ত। {সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-২৬৪৭, মুসনাদুল বাজ্জার, হাদীস নং-৬৫২০, আলমুজামুস সাগীর, হাদীস নং-৩৮০, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-২৮৮১৯}

এতসব হাদীস থাকা সত্বেও কি কেউ বলতে পারে যে, ফী সাবীলিল্লাহ শব্দ দ্বারা কেবলি শসস্ত্র জিহাদই উদ্দেশ্য? যদি কেউ তারপরও শসস্ত্র জিহাদের সাথেই ফী সাবীলিল্লাহ শব্দকে খাস করে ফেলতে চায়, তাহলে সেটি হবে তার নিজের পক্ষ থেকে। কিন্তু কুরআন ও হাদীসের বক্তব্যের সাথে এর কোন যোগসাজস নেই।

সাহাবা রাঃ এর আসার থেকে প্রমাণ

ফী সাবীলিল্লাহ শব্দটি শুধু কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ এর সাথে খাস নয়, একথা শুধু কুরআন ও হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত নয়। বরং সাহাবা রাঃ ও তাবেয়ীগণ রহঃ এর বক্তব্যের আলোকেও প্রমাণিত।

عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ، أَنَّ أَبَا بَكْرٍ الصِّدِّيقَ بَعَثَ جُيُوشًا إِلَى الشَّامِ. فَخَرَجَ يَمْشِي مَعَ يَزِيدَ بْنِ أَبِي سُفْيَانَ وَكَانَ أَمِيرَ رُبْعٍ مِنْ تِلْكَ الْأَرْبَاعِ. فَزَعَمُوا أَنَّ يَزِيدَ قَالَ لِأَبِي بَكْرٍ: إِمَّا أَنْ تَرْكَبَ، وَإِمَّا أَنْ أَنْزِلَ. فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ «مَا أَنْتَ بِنَازِلٍ،  وَمَا أَنَا بِرَاكِبٍ. إِنِّي أَحْتَسِبُ خُطَايَ هَذِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ».

হযরত ইয়াহইয়া বিন সাঈদ রহঃ বলেন, হযরত আবূ বকর রাঃ সিরিয়ার দিকে একটি বাহিনী প্রেরণ করছিলেন। তখন তিনি পায়ে হেটে সিরিয়ার গভর্ণর ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ানকে এগিয়ে দিতে এলেন। তখন সম্ভবত ইয়াজিদ হযরত আবূ বকর রাঃ কে বলেন, হয়তো আপনি সওয়ার হোন, নতুবা নামি নেমে পড়ি। তখন হযরত আবূ বকর রাঃ বললেন, না তুমি নামবে, আর নামি আমি সওয়ার হবো, বরং আমি আমার এ হাটাকে ফী সাবীলিল্লাহে তথা আল্লাহর রাস্তায় হাটা বলে মনে করছি। {মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-১০, কানযুল উম্মাল, হাদীস নং-১১৪০৬, সুনানুল কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-১৮১৫০}

তাহলে এখানে হযরত আবূ বকর রাঃ অথিতিদের এগিয়ে দিতে আসার হাটাকে ফী সাবীলিল্লাহ বলে উল্লেখ করেছেন।

رُوِيَ عَنْ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا – «أَنَّهُ كَانَ يَمْشِي فِي طَرِيقِ الْحَجِّ وَنَجَائِبُهُ تُقَادُ إلَى جَنْبِهِ. فَقِيلَ لَهُ: أَلَا تَرْكَبُ يَا ابْنَ رَسُولِ اللَّهِ – عَلَيْهِ السَّلَامُ -؟ فَقَالَ: لَا. إنِّي سَمِعْت رَسُولَ اللَّهِ عَلَيْهِ السَّلَامُ يَقُولُ: مَنْ اغْبَرَّتْ قَدَمَاهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَمْ تَمَسَّهُمَا نَارُ جَهَنَّمَ»

হযরত হাসান বিন আলী রাঃ থেকে বর্ণিত। একদা তিনি পায়ে হেটে হজ্বের জন্য চলছিলেন। তার আশেপাশে তখন খান্দানী লোকেরা সওয়ারী অবস্থায় ছিল। তখন তাকে বলা হল, হে রাসূল সাঃ এর বংশধর! আপনি কি সওয়ার হবেন না? তখন তিনি বললেন, না, কারণ আমি রাসূল সাঃ কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তির পদযুগল ফী সাবীলিল্লাহে ধুলায় ধুসরিত হবে, তার জন্য জাহান্নাম হারাম। {শরহে সিয়ারুল কাবীর-৩/৩৩, বর্ণনা নং-৩৫}

عَنْ نَافِعٍ: أَنَّ رَجُلًا جَاءَ إِلَى ابْنِ عُمَرَ فَقَالَ: إِنَّ رَجُلًا أَوْصَى إِلَيَّ وَجَعَلَ نَاقَةً فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَلَيْسَ هَذَا زَمَانًا يُخْرَجُ إِلَى الْغَزْوِ، فَأَحْمِلُ عَلَيْهَا فِي الْحَجِّ؟ فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ: «الْحَجُّ وَالْعُمْرَةُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ»

হযরত নাফে থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, এক ব্যক্তি আমার কাছে এই বলে অসিয়ত করেছে যে, তার উটটি ফী সাবীলিল্লাহে তথা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার জন্য। আর এখনতো জিহাদ চলছে না, আমি কি এটিতে সওয়ার হয়ে হজ্বে যেতে পারি? হযরত ইবনে ওমর রাঃ বললেন, হজ্ব ও উমরাও ফী সাবীলিল্লাহের অন্তর্ভূক্ত। {সুনানে দারেমী, হাদীস নং-৩৩৪৭}

হাদীসটি সহীহ।

ইমাম বুখারী রহঃ এর সংকলিত হাদীস গ্রন্থ আলআদাবুল মুফরাদের এক বর্ণনা এসেছে-

হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাঃ বলেন, قَالَ: ابْنُ عُمَرَ يَا بُنى إِنَّ سَبيل اللَّهِ كُل عَملٍ صَالح، তথা হে বৎস! নিশ্চবয় প্রতিটি নেক কাজই ফী সাবীলিল্লাহ। {আলআদাবুল মুফরাদ, হাদীস নং-৩৬৯}

এই হল আমাদের পথিকৃত সাহাবায়ে কেরামের মতামত ফী সাবীলিল্লাহ শব্দের ক্ষেত্রে। সাহাবায়ে কেরাম রাঃ গণ, ফী সাবীলিল্লাহ শব্দটিকে শুধু কিতাল ফী সাবীলিল্লাহের সাথে খাস করেননি। বরং ইলম অর্জনের সফর, মসজিদে গমণের সফর, হজ্ব ও উমরার সফর, কোন বাহিনী পাঠাতে এগিয়ে দিতে আসাসহ সকল নেক কাজের সফরকেই ফী সাবীলিল্লাহ বলে মন্তব্য করেছেন।

সেখানে “ফী সাবীলিল্লাহ” শব্দটিকে শুধুমাত্র কিতাল ফী সাবীলিল্লাহের সাথে খাস করে ফেলার অধিকার আমাদের কে দিয়েছে?

তাবেয়ীগণের বক্তব্যে আলোকে

عَنْ يَزِيدَ بْنِ أَبِي مَرْيَمَ، قَالَ: لَحِقَنِي عَبَايَةُ بْنُ رِفَاعَةَ بْنِ رَافِعٍ، وَأَنَا مَاشٍ إِلَى الجُمُعَةِ، فَقَالَ: أَبْشِرْ، فَإِنَّ خُطَاكَ هَذِهِ فِي سَبِيلِ اللهِ، سَمِعْتُ أَبَا عَبْسٍ يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ اغْبَرَّتْ قَدَمَاهُ فِي سَبِيلِ اللهِ فَهُمَا حَرَامٌ عَلَى النَّارِ.

হযরত ইয়াযিদ বিন আবী মরিয়ম বলেন, একদা আবায়াহ বনি রাফে বিন খাদীজ রাঃ এর সাথে আমার দেখা হয়। তখন আমি পায়ে হেটে মসজিদে যাচ্ছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, তুমি সুসংবাদ গ্রহণ কর, কেননা, তোমার এ পদব্রজে চলা ফী সাবীলিল্লাহ এর অন্তর্ভূক্ত। আমি আবু আবসকে বলতে শুনেছিরাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তির পদযুগল ফী সাবীলিল্লাহে ধুলায় ধুসরিত হবে, তার জন্য জাহান্নাম হারাম। {সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১৬৩২, সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং-৩১১৬}

এ হাদীসে জুমআর নামাযের জন্য মসজিদে গমণকে ফী সাবীলিল্লাহ বলে মন্তব্য করলেন হযরত আবায়াহ বিন রাফে বিন খাদীজ রহঃ।

عَنْ أَيْمَنَ بْنِ نَابِلٍ، قَالَ: سَأَلَ رَجُلٌ مُجَاهِدًا عَنْ رَجُلٍ قَالَ: كُلُّ شَيْءٍ لِي فِي سَبِيلِ اللَّهِ، قَالَ مُجَاهِدٌ: «لَيْسَ سَبِيلُ اللَّهِ وَاحِدًا، كُلُّ خَيْرٍ عَمِلَهُ فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ»

হযরত আইমান বিন নাবীল থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি হযরত মুজাহিদ রহঃ কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার জন্য কোন কোন বস্তু ফী সাবীলিল্লাহের অন্তর্ভূক্ত? মুজাহিদ বললেন, সাবীলিল্লাহ একটি নয়। বরং প্রতিটি নেক আমলই ফী সাবীলিল্লাহের অন্তর্ভূক্ত। {মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৩০৮৩৯}

উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা আশা করি পরিস্কার হয়ে গেছে যে, ফী সাবীলিল্লাহ বলে কুরআন ও হাদীসে শুধু সশস্ত্র জিহাদকেই খাস করা হয়নি। “সশস্ত্র জিহাদই কেবল উদ্দেশ্য ফী সাবীলিল্লাহ শব্দ দ্বারা দ্বারা” একথা সাহাবাগণ এবং তাবেয়ীগণও নির্ধারণ করেননি। তাই এভাবে উক্ত শব্দটিকে কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ এর সাথে খাস করে ফেলা অজ্ঞতা বৈ কিছু নয়। সকল প্রকার নেক আমলের ক্ষেত্রেই এ শব্দটির ব্যবহার করা জায়েজ আছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সহীহ কথা বুঝার তৌফিক দান করুন। আমীন।

والله اعلم بالصواب

উত্তর লিখনে

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল- ahlehaqmedia2014@gmail.com

lutforfarazi@yahoo.com

আরও জানুন

মুসলমানের জন্য কাফেরের সাথে বিবাহ করার হুকুম কী?

প্রশ্ন From: সারওয়ার বিষয়ঃ অমুসলিম বা কাফের এর সাথে সম্পর্ক করা যাবে কি না?? প্রশ্নঃ …

No comments

  1. Ibrahim Ahmed Choudhury

    সাবিলিল্লাহ‘র ব্যাপারে সবারই বাড়াবড়ি রয়েছে। সবাই নিজের কাজকেই শুধু সাবিলিল্লাহ মনে করে থাকেন আর অন্যরা দ্বীনের যে কাজ করছেন সে কাজকে তুচ্ছ মনে করেন। বর্তমানে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া বলতে সবাই তিন দিন বা চিল্লায় বের হওয়া বোঝেন। এ মানসিকতা পরিহার করাও জরুরী।

  2. মাশাল্লাহ, ,,,,,, খুব সুন্দর, অসাধারণ, ,,,,,

  3. আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিকটা বুঝার তৌফিক দান করুন ৷

  4. জাযাকাল্লাহ, হযরত,, খুব উপকার হলো,,,,,

  5. Jajhakallah Mufti Saheb (D.B). Ato dolil age kothao pai ni

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস