প্রচ্ছদ / আধুনিক মাসায়েল / সৌদী আরবের ভিসা ক্রয় বিক্রয়ের ব্যবসা করার হুকুম কী?

সৌদী আরবের ভিসা ক্রয় বিক্রয়ের ব্যবসা করার হুকুম কী?

প্রশ্ন

মুফতী সাহেব। আসসালামু আলাইকুম। আপনাদের আহলে হক মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক বিষয়ে শরয়ী সমাধান পেয়ে আমরা অনেক উপকৃত হচ্ছি। একটি মাসআলা বিষয়ে অনেক দিন ধরেই খুব চিন্তার মাঝে আছি। দয়া করে যদি শরয়ী সমাধান প্রদান করতেন তাহলে অনেক বড় উপকার হতো।

আমি অনেক দিন যাবত সৌদী আরবে বসবাস করি। এখানে অনেক দিন থাকার সুবাদে অনেককে সৌদীতে এনেছি। আনতে গিয়ে ভিসা ব্যবসার সাথে জড়িত হয়ে গেছি। আমার প্রশ্ন হলো:

সৌদী আরবের ভিসা ক্রয় বিক্রয়ের ব্যবসা করার হুকুম কী? দয়া করে বিস্তারিত জানাবেন।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

বিষয়টি বুঝার জন্য আগে সৌদী আরবের ভিসা ইস্যু পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা জরুরী মনে করছি। তারপর ইনশাআল্লাহ শরয়ী বিধান আলোচনা করা হবে।

সৌদী রাষ্ট্রপক্ষ সৌদীর বিভিন্ন কোম্পানীকে ভিসার কোটা দিয়ে থাকে। কোন কোম্পানীকে একশত কোন কোম্পানীকে পঞ্চাশটি ইত্যাদি কোটা মিলে।

যারা এ কোটা পায়, তাদের পূর্ণাঙ্গ নাম, নাম ঠিকানা ইত্যাদি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টে জমা থাকে।

প্রতিটি ভিসার জন্য একটি ইনভাইটেশন লেটার (Invitation letter) থাকে।

এসব কোম্পানী বিভিন্ন রাষ্ট্র যেমন বাংলাদেশের ট্রাভেল এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করে এসব ইনভাইটেশন লেটার বিক্রি করে। বাংলাদেশী ট্রাভেল এজেন্সি এই লেটারকে নিজের লাভ রেখে অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেয়।

এসব লেটারের ফি বিভিন্ন হয়ে থাকে। ভিসার প্রকৃতি অনুপাতে ফিও কমবেশি হয়ে থাকে। এসব লেটারকে সৌদী কন্সুলেটে জমা দিতে হয়। তারপর লেটারের উপর ভিসা জারি করা হয়।

ইনভাইটেশন লেটারের মতো ভিসার ফিও ভিন্ন ভিন্ন হয়।

ক)

এমনিভাবে যদি সৌদী নাগরিকের ব্যক্তিগত কাজের জন্য এক বা একাধিক লোকের দরকার হয়। তাহলে সে কর্মী পেতে রাষ্ট্রপক্ষের কাছে আবেদন করে থাকে। তারপর সে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে লোক আনার জন্য ইনভাইটেশন লেটার গ্রহণ করে।  তারপর সেই লেটার অনুপাতে কাংখিত বিদেশী ব্যক্তির নামে ভিসা জারী করে সৌদী সরকার। সেই ভিসায় স্পষ্টভাবে বিদেশী কর্মচারীর নাম, ঠিকানা ইত্যাদি লেখা থাকে। তারপর উক্ত ভিসা পাসপোর্ট এর মাঝে সংযুক্ত করে দেয়া হয়।

খ)

যে সৌদী নাগরিক ইনভাইটেশন লেটার জারি করায়, তার নাম ও ঠিকানা, কোন উদ্দেশ্যে তার ভিসা দরকার যেমন, ড্রাইভার, বাবুর্চি ইত্যাদি কাজেরও স্পষ্ট উল্লেখ থাকে ইনভাইটেশন লেটারে।

গ)

যখন কারো নামে কোন ভিসা ইস্যু হয়, তখন উক্ত নাম পরিবর্তন করে অন্য কারো নামে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কারণ, এক ইনভাইটেশন লেটার দিয়ে একজনের নামই ইস্যু করার সুযোগ আছে। একাধিক ব্যক্তির সুযোগ নেই।

ফ্রি ভিসা কোন আলাদা ভিসা নয়। বরং এর একটি সুবিধা হলো, এতে লেখা থাকে যে, এ ভিসাধারী ব্যক্তি সৌদীর যে কোন স্থানে যাবার অনুমতিপ্রাপ্ত। বাকি এ ভিসাতেও নাম ও ঠিকানা সব কিছু লেখা থাকে।

সৌদী লোকেরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ইনভাইটেশন লেটার ক্রয় করে বিভিন্ন মূল্যে তা বিক্রি করে থাকে।

সৌদী আরবে ইনভাইটেশন লেটার ক্রয়-বিক্রয় দুই পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। যথা

(১)

সৌদী নাগরিক সরকারের কাছে আবেদনের মাধ্যমে ভিসার জন্য যে ইনভাইটেশন লেটার পায়, এর দ্বারা বাহির রাষ্ট্রের যে কাউকে সৌদীতে কাজের জন্য আনাতে পারে। এ সুযোগটি নিজের অধীনত কাজের জন্য ব্যবহার করতে বাধ্য। অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেয়া আইনত অপরাধ।

কিন্তু কতিপয় সৌদী নাগরিক সরকার থেকে লেটার নিয়ে তা অন্য কোন সৌদী নাগরিকের কাছে কিছু লাভে বিক্রি করে দেয়।

অথচ সরকারীভাবে উক্ত লেটার বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষেধ। চাই সরকারী মূল্যেই তা বিক্রি করুক বা কমবেশি মূল্যে করুক।

এ কারণেই ইনভাইটেশন লেটার ক্রয় করে নেয়া সৌদী নাগরিকের অধীনে কাজ করতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশী শ্রমিক গ্রেফতারের শিকার হয়ে থাকেন। যদিও তার নামেই ভিসা জারি হয়েছে। কিন্তু যেহেতু লেটারের আবেদনকারী মালিক আসল নয়, বরং ক্রয় করে মালিক হওয়া ব্যক্তি।  লেটার বা ভিসা যে সৌদী নাগরিকের জন্য জারি করা হয়েছে, তাকে ছাড়া এ সুবিধা অন্য কারো জন্য গ্রহণের রাষ্ট্রীয় অনুমতি নেই।

(২)

সৌদী নাগরিক সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত ইনভাইটেশন লেটার বর্হিরাষ্ট্রের কোন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করার অনুমতি আছে। তবে এক্ষেত্রেও সরকারী মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি করা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ।

তাহলে দু’টি সূরত বুঝতে পারলাম। একটি হলো ইনভাইটেশন লেটার সৌদী নাগরিক অন্য নাগরিকের কাছে বিক্রি করে দেয়া।

আরেকটি হলো: অন্য দেশের কোন নাগরিকের কাছে বিক্রি করা।

এই দুই সূরতের শরয়ী বিধান হলো:

(এক)

যদি সৌদী নাগরিক সরকার থেকে ইনভাইটেশন লেটার নিয়ে অন্য কোন সৌদী নাগরিকের কাছে বিক্রি করে দেয়, তাহলে উক্ত লেটারের ক্রয় বিক্রয় জায়েজ নেই। কারণ,

ক) মিথ্যা ও প্রতারণা থাকায়। কারণ, লোকটি সরকারের কাছে ইনভাইটেশন লেটারের আবেদন করেছে তার কাজের লোক দরকার বলে। কিন্তু তা পাবার পর অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেয়ার দ্বারা পরিস্কার যে, আসলে তার এ লেটারের কোন প্রয়োজন ছিল না।

খ) এছাড়া এর দ্বারা রাষ্ট্রের একটি বৈধ আইনের বিরোধীতা করা আবশ্যক হয়।

(দুই)

যদি সৌদী নাগরিক রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ইনভাইটেশন লেটার নিয়ে অন্য দেশের কোন নাগরিকের কাছে বিক্রি করে দেয়। যাতে করে উক্ত ব্যক্তি সৌদীতে এসে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে যেহেতু সৌদী রাষ্ট্রপক্ষ থেকে উক্ত লেটারটি অন্য কারো কাছে বিক্রি করার পারমিট রয়েছে, এ কারণে উক্ত লেটারটি বিক্রি করা মূলত জায়েজ।

তবে যেহেতু সৌদী সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রির অনুমতি নেই, তাই অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রির কারণে রাষ্ট্রের একটি বৈধ আইনের বিরোধীতা হয়।

কিন্তু লেটার ক্রয়কারী উক্ত অতিরিক্ত মূল্য প্রদানে স্বপ্রণোদিত ও স্বতস্ফূর্ত রাজি থাকায় এটা নাজায়েজ হবে না।

ইনভাইটেশন লেটার বিক্রির টাকা কী হারাম?

উপরোক্ত উভয় সূরতে তথা রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত ইনভাইটেশন লেটার সৌদী নাগরিকের কাছে বিক্রি করুক বা বিদেশী নাগরিকের কাছে বিক্রি করুক উভয় অবস্থায় এর থেকে প্রাপ্ত অর্থকে হারাম বলার সুযোগ নেই। কারণ, শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে উক্ত ইনভাইটেশন লেটারে মাল হবার সংজ্ঞা প্রযোজ্য হয়। কেননা, এটা অর্জনের জন্য ব্যক্তির মাল ও মেহনত উভয়ই ব্যয় হয়। এছাড়া আজকাল এটাকে মূল্যবান বস্তু মনে করা হয়।

সুতরাং যার নামে উক্ত লেটার জারি করা হয়, তার জন্য উক্ত লেটার সৌদী আরব বা অন্য দেশের যে কারো কাছেই তা বিক্রি করা হোক, সেটার মূল্য হারাম হবে না। তবে রাষ্ট্রীয় বৈধ আইনের বিরোধীতা করায় গোনাহগার হবে। কিন্তু আমদানী হারাম বলা যাবে না।

والواقع في هذه الرخصة أنها ليست عينا مادية ، ولكنها عبارة عن حق بيع البضاعة في الخارج أو شرائها منه، فيتأتى فيه ماذكرنا في الاسم التجاري من أن هذا الحق ثابت إصالة، فيجوز النزول عنه بمال، وبما أن الحصول على هذه الرخصة من الحكومة يتطلب كلا من الجهد والوقت، والمال، وإن لهذه الرخصة صفة قانونية تمثلها الشهادات المكتوبة ويستحق بها التجار تسهيلات توفرها الحكومة لحامليها، فصارت هذه الرخصة في عرف التجار ذات قيمة كبيرة يسلك بها مسلك الأموال، فلا يبعد أن تلتحق بالأعيان في جواز بيعها وشرائها، ولكن كل ذالك إذا كان القانون يسمح بنقل هذه الرخصة إلى رجل أخر أما إذا كانت الرخصة باسم رجل مخصوص أو شركة مخصوصة ، ولا شبهة في عدم جواز بيعها؛ لأن بيعه حينئذ يؤدي إلى الكذب والخديعة، فإن المشتری یستعملها باسم البائع لا باسم نفسه، فلا يحل ذلك لما فيه من الكذب۔ (فقه البيوع للشيخ محمد تقي العثماني، المبحث الثالث، الترخيص التجاريى، مكتبة معارف القرآن-1/281)

مطلب في تعريف المال والملك والمتقوم قوله ( مالا أو لا ) بالمال ما يميل إليه الطبع ويمكن ادخاره لوقت الحاجة والمالية تثبت بتمول الناس كافة أو بعضهم والتقوم يثبت بها بإباحة الانتفاع به شرعا۔ (حاشية ابن عابدين، دار الفكر للطباعة والنشر-4/501، زكريا-7/10)

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

পরিচালক: শুকুন্দী ঝালখালী তা’লীমুস সুন্নাহ দারুল উলুম মাদরাসা, মনোহরদী নরসিংদী।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

শর্তযুক্ত তালাক দিয়ে শর্ত তুলে নেয়া যাবে কি না?

প্রশ্ন Md Hasan আস্সালামু আলাইকুম মুফতি সাহেব একটা মাসআলা: শর্তের সাথে তালাক দিলে শর্ত ফিরিয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস