প্রচ্ছদ / কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা / যাকাতের সপ্তম খাত “ফী সাবীলিল্লাহ” দ্বারা উদ্দেশ্য কী? একটি পর্যালোচনা

যাকাতের সপ্তম খাত “ফী সাবীলিল্লাহ” দ্বারা উদ্দেশ্য কী? একটি পর্যালোচনা

মাওলানা মুহাম্মাদ আনওয়ার হুসাইন

যাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি। ঈমান ও সালাতের পরেই ইসলামের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ ফরয ইবাদত হল যাকাত। যাকাতের বিধি-বিধান সম্পর্কে কুরাআন-সুন্নাহ্য় সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মাসারিফে যাকাত তথা যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহ কুরআন-হাদীস দ্বারা এবং সাহাবা-তাবেয়ীনের বক্তব্য দ্বারা সুনির্ধারিত ও সুস্পষ্ট একটি বিষয়।

যাকাত ব্যক্তির হক। দরিদ্র ও অভাবী ব্যক্তিরাই যাকাত গ্রহণ করতে পারে। জনকল্যাণমূলক কোনো কাজ যাকাত ব্যয়ের খাত নয়। যাকাতের যে আটটি খাতের কথা কুরআন মাজীদে বর্ণিত হয়েছে সবক’টি খাতই ব্যক্তি কেন্দ্রিক। জনকল্যাণমূলক কোনো কাজ, তা যতই গুরুত্বপূর্ণ বা ফযীলতপূর্ণ হোক, সেটা যাকাতের খাত নয়। কিন্তু সম্প্রতি যাকাতের সপ্তম খাত ‘ফী সাবীলিল্লাহ’কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল থেকে ‘শায’ ও বিচ্ছিন্ন কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে কুরআন-সুন্নাহর স্বীকৃত ও নির্ধারিত খাতের বাইরেও জনকল্যাণমূলক কাজে যাকাত ব্যয় করা যাবে। এমনকি কোনো কোনো গোষ্ঠী থেকে এ কথাও শোনা যায় যে, যাকাতের অর্থ দ্বারা দ্বীন প্রচারের নিয়তে টিভি চ্যানেলও খোলা যাবে।

তাই বক্ষমাণ লেখায় যাকাতের সপ্তম খাত ‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর সঠিক অর্থ ও উদ্দেশ্য কীÑ তা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের ব্যাখ্যার আলোকে তুলে ধরা হল। আল্লাহ তাআলাই তাওফীকদাতা।

যাকাত সঠিক খাতে আদায় করা ফরয দায়িত্ব

যাকাতের গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে বহু আয়াত ও হাদীস রয়েছে। যাকাত কার উপর ফরয, কোন্ ধরনের সম্পদের যাকাত আদায় করা ফরয, কাকে যাকাত দেওয়া যাবে, কাকে দেওয়া যাবে না

এর বিস্তারিত বিবরণ কুরআন মাজীদ ও হাদীস শরীফে আছে।

মুমিনের কর্তব্য হল, এসকল বিধি-বিধান জেনে সে অনুযায়ী যাকাত আদায় করা। যেন সম্পদের যাকাত কুরআন-সুন্নাহ্য় বর্ণিত যথাযোগ্য খাতে যথাযোগ্যভাবে ব্যয়িত হয় এবং ফরয দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া যায়। যাকাত সাধারণ দান-খয়রাত নয় যে, কোনো ধরনের বাছবিচার না করে যাকে ইচ্ছা, যা ইচ্ছা এবং যে পরিমাণ ইচ্ছা দিয়ে দেয়া হল।

সাধারণ দান যে কোনো বৈধ খাতে, যে কোনো ব্যক্তিকে করা যায়।

এমনকি ধনী ব্যক্তিকেও দেওয়া যায়। সাধারণ দানের জন্য কোনো নেসাব ও বর্ষপূর্তির দরকার হয় না এবং যে কোনো সম্পদই দান করা যায়। কিন্তু যাকাতের বিষয়টি তেমন নয়। যাকাত সব ধরনের সম্পদের উপর ফরয নয়।

বরং বিশেষ বিশেষ সম্পদের উপর শর্তসাপেক্ষে যাকাত ফরয হয়। হাদীস ও আসারে যার বিস্তারিত উল্লেখ আছে এবং সে অনুযায়ী ফিকহ-ফতোয়ার কিতাবেও যাবতীয় মাসআলা লিপিবদ্ধ রয়েছে।

তদ্রুপ যাকাত যে কোনো খাতে ব্যয় করা যায় না। যে কোনো ব্যক্তিকে দেওয়া যায় না। যাকাতের খাত সুনির্ধারিত। নির্ধারিত খাতেই কেবল যাকাত আদায় করা যায়।

এর বাইরে অন্যত্র যাকাতের সম্পদ ব্যয় করা হলে ফরয দায় থেকে মুক্ত হওয়া যায় না। ইমাম শাফেয়ী রাহ.-এর ভাষায়:

فأحكم الله عز وجل فرض الصدقات في كتابه ثم أكدها فقال فريضة من الله (قال) : وليس لأحد أن يقسمها على غير ما قسمها الله عز وجل عليه ذلك.

আল্লাহ তাআলা যাকাতের ফরযকে তাঁর কিতাবে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। অতএব আল্লাহ তাআলার বণ্টনের বাইরে ভিন্ন খাতে বণ্টন করার অধিকার কারো নেই। [কিতাবুল উম্ম ২/৭৭]

যাকাত যথাযথ খাতে প্রদত্ত হওয়া এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে শুধু যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَ الْمَسٰكِیْنِ وَ الْعٰمِلِیْنَ عَلَیْهَا وَ الْمُؤَلَّفَةِ قُلُوْبُهُمْ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الْغٰرِمِیْنَ وَ فِیْ سَبِیْلِ اللهِ وَ ابْنِ السَّبِیْلِ فَرِیْضَةً مِّنَ اللهِ وَ اللهُ عَلِیْمٌ حَكِیْمٌ.

যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত উসূলকারী ও যাদের চিত্তাকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (জিহাদকারীদের জন্য) এবং মুসাফিরদের জন্যে। এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। [সূরা তাওবা (৯) : ৬০]

এই আয়াতে যাকাতের আটটি খাত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তা হল:

১. ফকীর।

২. মিসকীন।

৩. আমিলীন (ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক যাকাত উসুলের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ)।

৪. আলমুআল্লাফা কুলূবুহুম।

৫. আলগারিমীন (ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি)।

৬. রিকাব (দাস মুক্তকরণ)।

৭. ফী সাবীলিল্লাহ (আল্লাহর পথে জিহাদকারী)।

৮.  ইবনুস সাবীল (নিঃস্ব মুসাফির)।

এই আট খাতের প্রত্যেকটির পরিচয় হাদীস-আসারের মজবুত দলীল দ্বারা সুুপ্রমাণিত। সাহাবা-তাবেয়ীন ও সালাফের নিকট এ খাতগুলোর পরিচয় সুস্পষ্ট ছিল।

এজন্য যাকাত প্রদানকারীর কর্তব্য হল, যাকাতের খাতগুলো সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা।

এ নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় যেহেতু সপ্তম খাত ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ তাই এখানে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর পরিচয় এবং কোন শ্রেণীর লোক এর আওতাভুক্ত তা দলীলসহ উল্লেখ করা হল।

ফী সাবীলিল্লাহ

যেমনটি বলা হল যাকাতের সপ্তম খাত হচ্ছে, ‘ফী সাবীলিল্লাহ’। এর শাব্দিক অর্থ হল আল্লাহর পথে। আর শরয়ী ও পারিভাষিক অর্থে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর রাস্তায় সশস্ত্র জিহাদকারীগণ।

‘ফী সাবীলিল্লাহ’র পারিভাষিক এ অর্থটি সালাফ তথা সাহাবা-তাবেয়ীন এবং মুজতাহিদ ইমামগণের নিকট স্বীকৃত ছিল। অর্থাৎ ফী সাবীলিল্লাহ ‘মুতলাক’ (ব্যাখ্যামুক্ত)ভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা উক্ত অর্থটিই বুঝতেন। ইবনুল আসীর রাহ. বলেন:

قد تكرر في الحديث ذكر “سبيل الله وابن السبيل” …وسبيل الله عام يقع على كل عمل خالص سلك به طريق التقرب إلى الله تعالى بأداء الفرائض والنوافل وأنواع التطوعات، وإذا أطلق فهو في الغالب واقع على الجهاد، حتى صار لكثرة الاستعمال كأنه مقصور عليه.

হাদীসে ‘সাবীলুল্লাহ’ ও ‘ইবনুস সাবীল’- এর কথা বারংবার এসেছে। ‘সাবীলুল্লাহ’ শব্দটি আম (ব্যাপক)। ফরয, ওয়াজিব, নফল ও বিভিন্ন প্রকারের পুণ্যের কাজের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের পথে সব ধরনের খালেস আমল এর অন্তর্ভুক্ত। আর ‘সাবীলুল্লাহ’কে যখন ‘মুতলাক’ (ব্যাখ্যামুক্ত)ভাবে বলা হয় তখন তা সাধারণত জিহাদের অর্থে ব্যবহার হয়। এমনকি এই অর্থে সাবীলুল্লাহ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার হওয়ার কারণে ‘সাবীলুল্লাহ’ যেন ঐ মর্মের মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। [আননিহায়া ফী গারীবিল হাদীস ২/৩৩৮]

উপরোক্ত বক্তব্যের সমর্থনে নিম্নে দুয়েকটি হাদীস ও আসার উল্লেখ করা হল।

সহীহ মুসলিমে এসেছে:

أَنّ عُمَرَ بْنَ الْخَطّابِ وَهُوَ يَقُولُ: حَمَلْتُ عَلَى فَرَسٍ عَتِيقٍ فِي سَبِيلِ اللهِ.

উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন, আমি একটি উৎকৃষ্টমানের ঘোড়া ‘সাবীলুল্লাহ’-এ সদকা করলাম। [সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬২০]

ইমাম নববী রাহ. এর ব্যাখ্যায় বলেন:

“حملت على فرس عتيق في سبيل الله” معناه تصدقت به ووهبته لمن يقاتل عليه في سبيل الله.

এর অর্থ হল, আমি এটিকে সদকা করলাম এবং তা এমন ব্যক্তিকে দান করলাম, যে এর দ্বারা ‘সাবীলুল্লাহ’-এ (আল্লাহর রাস্তায়) জিহাদ করবে।  [শরহুন নববী ১১/৬২]

সহীহ বুখারীতে এসেছে:

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، عَنِ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ أَنّهُ قَالَ: لَغَدْوَةٌ فِي سَبِيلِ اللهِ، أَوْ رَوْحَةٌ خَيْرٌ مِنَ الدّنْيَا وَمَا فِيهَا.

আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘সাবীলুল্লাহ’-এ (আল্লাহর রাস্তায়) অতিবাহিত এক সকাল বা এক বিকাল দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা আছে তা হতে উত্তম। [সহীহ বুখারী, হাদীস ২৭৯২]

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন:

قوله في سبيل الله أي الجهاد.

‘ফী সাবীলিল্লাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে জিহাদ। [ফাতহুল বারী ৬/১৭]

সহীহ বুখারীর আরেক বর্ণনায় এসেছে:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ: أَنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ قَالَ: الخَيْلُ لِرَجُلٍ أَجْرٌ، وَلِرَجُلٍ سِتْرٌ، وَعَلَى رَجُلٍ وِزْرٌ، فَأَمّا الّذِي لَهُ أَجْرٌ: فَرَجُلٌ رَبَطَهَا فِي سَبِيلِ اللهِ.

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ঘোড়া তিন ব্যক্তির জন্য। কারো জন্য সাওয়াবের। কারো জন্য (দরিদ্রতা ও পরনির্ভরতা থেকে) আত্মরক্ষা। আর কারো জন্য গুনাহের কারণ। ঐ ব্যক্তির জন্য তা সওয়াবের, যে তা ‘সাবীলুল্লাহ’-এ (আল্লাহর রাস্তায়) আবদ্ধ করেছে। [সহীহ বুখারী, হাদীস ২৮৬০]

ইমাম নববী রাহ. বলেন:

(ربطها في سبيل الله) أي أعدها للجهاد.

‘সাবীলুল্লাহ’-এ (আল্লাহর রাস্তায়) আবদ্ধ করেছে’ এর অর্থ হল, জিহাদের জন্য প্রস্তুত করেছে। [শরহুন নববী ৭/৬৬]

যাকাতের খাতসমূহ বর্ণনাকারী [সূরা তাওবার (৯) : ৬০নং] আয়াতে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ দ্বারা যে কাফেরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদকারী মুজাহিদ উদ্দেশ্য, নিম্নের হাদীস দ্বারা তা আরো সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়।

সুনানে ইবনে মাজাহ্য় আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লম ইরশাদ করেছেন:

لَا تَحِلّ الصّدَقَةُ لِغَنِيٍّ إِلّا لِخَمْسَةٍ: لِعَامِلٍ عَلَيْهَا، أَوْ لِغَازٍ فِي سَبِيلِ اللهِ، أَوْ لِغَنِيٍّ اشْتَرَاهَا بِمَالِهِ، أَوْ فَقِيرٍ تُصُدِّقَ عَلَيْهِ فَأَهْدَاهَا لِغَنِيٍّ، أَوْ غَارِمٍ.

ধনীর জন্য যাকাত হালাল নয়, তবে এদের মধ্যে পাঁচ শ্রেণির জন্য তা হালাল-। ১. সদকা উসূলের আমিলের জন্য। ২. ‘সাবীলুল্লাহ’-এ (আল্লাহর রাস্তায়) জিহাদকারীর জন্য। ৩. ঐ ধনীর জন্য, যে নিজ অর্থ দ্বারা যাকাতের মাল ক্রয় করেছে। ৪. ফকীর তার প্রাপ্ত যাকাত থেকে কোনো ধনীকে হাদিয়া দিয়েছে (সে ধনীর জন্য)। ৫. ঋণগ্রস্তের জন্য। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৮৪১]

ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম রাহ. (মৃত্যু : ২২৪ হি.) কিতাবুল আমওয়ালে এই হাদীসটি উদ্ধৃত করে বলেনÑ

فأرخص صلى الله عليه وسلم للغازي أن يأخذ من الصدقة وإن كان غنيا. ونراها تأويل هذه الآية قوله: وفي سبيل الله.

এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশস্ত্র লড়াইকারী মুজাহিদের জন্য সদকা গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন, যদিও সে ধনী হয়। আর আমরা মনে করি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই অনুমতি প্রদান কুরআন মাজীদের আয়াত وفي سبيل الله-এরই ব্যাখ্যা। [কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. ৭২৬]

ইমাম খাত্তাবী রাহ. উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন:

فيه بيان أن للغازي وإن كان غنيا أن يأخذ الصدقة ويستعين بها في غزوه وهو من سهم سبيل الله… وقد جاء في هذا الحديث ما بينه ووكد أمره، فلا وجه للذهاب عنه.

অর্থাৎ উক্ত হাদীসে মুজাহিদের জন্য সদকা গ্রহণের অনুমতি আছে, যদিও সে ধনী হয়। সে এর দ্বারা যুদ্ধে শক্তি অর্জন করবে। আর এটা যাকাতের কুরআন নির্ধারিত খাতসমূহের মধ্যে সাবীলুল্লাহ-খাতের জন্য বরাদ্দকৃত অংশ। … এ হাদীসটি ঐ খাতের ব্যাখ্যা সুস্পষ্ট করে দিয়েছে এবং বিষয়টিকে জোরালো করে দিয়েছে। অতএব এ উদ্দেশ্যের বাইরে অন্য দিকে যাওয়ার যৌক্তিকতা নেই। [মাআলিমুস সুনান, খাত্তাবী ২/২৩৪]

ইবনে হাযম রাহ. ‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর ব্যাখ্যায় বলেন:

وأما سبيل الله فهو الجهاد بحق.

‘সাবীলুল্লাহ’ হল, হকের পথে জিহাদ করা।

এরপর তিনি এর স্বপক্ষে উপরোক্ত হাদীসকে প্রমাণস্বরূপ পেশ করেন। অতঃপর বলেন:

وكل فعل خير فهو من سبيل الله تعالى، إلا أنه لا خلاف في أنه تعالى لم يرد كل وجه من وجوه البر في قسمة الصدقات، فلم يجز أن توضع إلا حيث بين النص، وهو الذي ذكرنا، وبالله تعالى التوفيق.

সকল পুণ্যের কাজই ‘সাবীলুল্লাহ’। তবে এতে কোনো দ্বি-মত নেই যে, আল্লাহ তাআলা যাকাতের খাত সংক্রান্ত আয়াতে সকল পুণ্যের কাজকে উদ্দেশ্য করেননি। তাই যাকাতের ক্ষেত্রে ‘সাবীলুল্লাহ’ -এর যে অর্থ হাদীসে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে এ ছাড়া অন্য কোনো অর্থ গ্রহণ করা বৈধ নয়। আর তা সেটিই, যা আমরা বর্ণনা করেছি। Ñআলমুহাল্লা বিল আসার ৪/২৭৫

কাযী ইবনুল আরাবী রাহ. ইমাম মালেক রাহ.-এর বক্তব্য এভাবে উল্লেখ করেছেনÑ

قال مالك: سبل الله كثيرة، ولكني لا أعلم خلافا في أن المراد بسبيل الله هاهنا الغزو.

ইমাম মালেক রাহ. বলেন, ‘সাবীলুল্লাহ’ তথা আল্লাহর পথ অগণিত। কিন্তু এখানে যে সাবীলুল্লাহ দ্বারা উদ্দেশ্য জিহাদÑ এ ব্যাপারে কোনো ভিন্ন মতের কথা আমার জানা নেই। [আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবী ২/৯৬৯]

ইমাম ইবনে জারীর তাবারী রাহ. ‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর ব্যাখ্যায় বলেন:

وأما قوله: (وفي سبيل الله) فإنه يعني: وفي النفقة في نصرة دين الله وطريقه وشريعته التي شرعها لعباده، بقتال أعدائه، وذلك هو غزو الكفار،وبالذي قلنا في ذلك قال أهل التأويل.

আর আল্লাহ তাআলার বাণী ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ এর অর্থ হল, আল্লাহ তাআলার দ্বীন ও পথ এবং তাঁর শরীয়া, যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য মনোনীত করেছেন তাঁর সাহায্যার্থে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অর্থ ব্যয় করা। আর ‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর যে অর্থ আমরা করেছি মুফাসসিরগণও তা-ই বলেছেন।

এরপর তিনি তাবেয়ী আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম রাহ.-এর বক্তব্য উল্লেখ করেন:

قال ابن زيد في قوله: (وفي سبيل الله) قال: الغازي في سبيل الله.

ইবনে যায়েদ রাহ. ‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর ব্যাখ্যায় বলেন, তা হলÑ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী। Ñতাফসীরে তাবারী ৬/৪০২

পাশাপাশি তিনি আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর মারফু রেওয়ায়েতটিও উল্লেখ করেছেন, যা আমরা ইতিপূর্বে সুনানে ইবনে মাজাহর বরাতে প্রমাণস্বরূপ উল্লেখ করেছি। যাতে সুস্পষ্টভাবেই ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ অর্থ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী গাযীর কথা বলা হয়েছে।

উল্লিখিত আলোচনায় হাদীস-আসারের বরাতে এবং মুজতাহিদ ইমামগণের উদ্ধৃতিতে যে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হল তা এই যে, ‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর শাব্দিক অর্থ যতই ব্যাপক হোক’ যাকাতের খাত সংক্রান্ত আয়াতে ফী সাবীলিল্লাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হল আল্লাহর পথে জিহাদকারী মুজাহিদ। সে যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত।

উপরিউক্ত বক্তব্যের পাশাপাশি এখানে আমরা চার মাযহাবের মুজতাহিদ ইমামগণের মত ও ফতোয়া কীÑ তা উল্লেখ করছি, যেন এ বিষয়ে কোনো ধরনের সংশয় না থাকে।

চার মাযহাব

মালেকী মাযহাব 

ফকীহ আবুল ওয়ালীদ ইবনে রুশদ আলকুরতুবী রাহ. (মৃত্যু ৫২০হি.) বলেনÑ

وأما قوله: وفي سبيل الله إنه الغازي في سبيل الله، فهو صحيح لا اختلاف فيه، وإنما يختلف هل يعطى منها الغني في الغزو؟ فقال في المدونة: إنه يعطى منها وإن كان غنيا.

‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী। এটিই সহীহ কথা। এতে কোনো মতভিন্নতা নেই। মতভিন্নতা এ নিয়ে যে, ধনী ব্যক্তিকে জিহাদে যাকাত থেকে দেওয়া হবে কি না। আর ইমাম মালেক রাহ. হতে আলমুদাওয়ানা গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে যে, মুজাহিদকে দেওয়া হবে, যদিও সে ধনী হয়। [আলবায়ান ওয়াত্তাহসীল ১৮/৫১৭; আলমুদাওয়ানাতুল কুবরা ১/৩৪৬]

আরো দেখুন : বিদায়াতুল মুজতাহিদ ২/৪৩; মাওয়াহিবুল জালীল ৩/২৩৩; আত্তাজ ওয়াল ইকলীল ৩/২৩৩

শাফেয়ী মাযহাব

ইমাম নববী রাহ. ‘আলমাজমু শরহুল মুহাযযাব’ গ্রন্থে বলেন:

ومذهبنا أن سهم سبيل الله المذكور في الآية الكريمة يصرف إلى الغزاة الذين لا حق لهم في الديوان بل يغزون متطوعين، وبه قال أبو حنيفة ومالك رحمهما الله تعالى.

আমাদের (শাফেয়ী) মাযহাব হল, আয়াতে কারীমার মধ্যে উল্লিখিত ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ খাতে বরাদ্দকৃত যাকাতের অর্থ ঐ সকল লড়াইকারীর পেছনে ব্যয় করা হবে, সরকারি রেজিস্টারে যাদের কোনো ভাতা চালু নেই; যারা স্বেচ্ছায় নিজ উদ্যোগে জিহাদে যোগদান করেছে। ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম মালেক রাহ.-ও অনুরূপ বলেছেন। [শরহুল মুহাযযাব ৬/১৯৮]

আরো দেখুন : আলহাবিল কাবীর ৮/৫১১; রওযাতুত তালিবীন ২/৩২১

হাম্বলী মাযহাব

শামসুদ্দীন ইবনে কুদামা আলমাকদিসী রাহ. (৬৮২ হি.) ‘আশশারহুল কাবীর’ গ্রন্থে বলেন:

(السابع في سبيل الله وهم الغزاة الذين لا ديوان لهم) هذا الصنف السابع من أصناف الزكاة ولا خلاف في استحقاقهم وبقاء حكمهم، ولا خلاف في أنهم الغزاة، لأن سبيل الله عند الإطلاق هو الغزو.

সপ্তম নম্বর হল ‘ফী সাবীলিল্লাহ’। আর তারা হল, ঐসকল মুজাহিদ, যারা সরকারি রেজিস্টারভুক্ত নয়। এটি যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহের মধ্যে সপ্তম। আর তারা যাকাতের অধিকারী হওয়ার ক্ষেত্রে এবং তাদের সম্পর্কে এ হুকুম বলবৎ থাকার ক্ষেত্রে কোনো দ্বিমত নেই। আর এতেও কোনো মতভিন্নতা নেই যে, এখানে উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর পথে জিহাদকারী সৈনিকের দল। কেননা ‘সাবীলুল্লাহ’ শব্দ কোনো ব্যাখ্যামুক্তভাবে (مطلق) ব্যবহার হলে তার দ্বারা উদ্দেশ্য জিহাদই হয়ে থাকে।

অবশ্য ইমাম আহমাদ রাহ. থেকে ‘সাবীলুল্লাহ’-এর আওতায় হজ্বে গমনকারীকে যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে কি না’ এ ব্যাপারে দুটি মত পাওয়া যায়। একটি মত হল, তাকে যাকাত দেওয়া যাবে না। ইবনে কুদামা রাহ. বলেন:

اختلف الرواية عن أحمد رحمه الله في ذلك، فروي عنه أنه لا يصرف منها في الحج، وبه قال مالك وأبو حنيفة والثوري والشافعي وأبو ثور وابن المنذر، وهي أصح؛ لأن سبيل الله عند الإطلاق إنما ينصرف إلى الجهاد، فإن كل ما في القرآن من ذكر سبيل الله إنما أريد به الجهاد إلا اليسير، فيجب أن يحمل ما في آية الزكاة على ذلك؛ لأن الظاهر إرادته به… وروي عنه أن الفقير يعطى قدر ما يحج به الفرض أو يستعين به فيه.

ইমাম আহমাদ রাহ. থেকে এ ব্যাপারে দুটি বক্তব্য পাওয়া যায়। একটি বক্তব্য হল, যাকাতের অর্থ থেকে হজে¦ ব্যয় করা যাবে না। ইমাম মালেক, আবু হানীফা, ছাওরী, শাফেয়ী, আবু ছাওর ও ইবনুল মুনযির রাহ.-ও অনুরূপ বলেছেন। এটি সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত। কেননা সাবীলুল্লাহ ‘মুতলাক’ ক্ষেত্রে কেবলমাত্র জিহাদের অর্থেই ব্যবহার হয়। কুরআন মাজীদে যেখানেই ‘সাবীলুল্লাহ’-এর আলোচনা এসেছে সবখানেই জিহাদের অর্থে এসেছে; অল্প কয়েকটি জায়গা ছাড়া। অতএব আবশ্যক হল, যাকাতের আয়াতেও ঐ অর্থই গ্রহণ করা। কেননা এ অর্থ উদ্দেশ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। …ইমাম আহমাদ রাহ. থেকে আরেকটি মত হল, দরিদ্র ব্যক্তিকে ঐ পরিমাণ যাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে, যার দ্বারা সে ফরয হজ¦ আদায় করতে পারে অথবা এর দ্বারা হজ আদায়ে সহযোগিতা নিতে পারে। [আশশারহুল কাবীর ১/৭১৪]

আরো দেখুন : আলইনসাফ, মারদাবী ৩/২৩৫।

হানাফী মাযহাব

‘সাবীলুল্লাহ’ দ্বারা যে আল্লাহর রাস্তায় লড়াইকারী মুজাহিদ উদ্দেশ্য তা ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর অন্যতম প্রধান শাগরিদ ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. (মৃত্যু ১৮৯ হি.)-এর নিচের বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট।

হাদীসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ মুআত্তা ইমাম মুহাম্মাদ-এ আছে:

أخبرنا مالك، حدثنا زيد بن أسلم، عن عطاء بن يسار، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: لا تحل الصدقة لغني إلا لخمسة: لغاز في سبيل الله، أو لعامل عليها، أو لغارم، أو لرجل اشتراها بماله، أو لرجل له جار مسكين تصدق على المسكين فأهدى إلى الغني.

এই হাদীসটি উল্লেখ করার পর ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. বলেন:

قال محمد: وبهذا نأخذ، والغازي في سبيل الله إذا كان له عنها غنى يقدر بغناه على الغزو لم يستحب له أن يأخذ منها شيئا، وكذلك الغارم إن كان عنده وفاء بدينه وفضل تجب فيه الزكاة لم يستحب له أن يأخذ منها شيئا، وهو قول أبي حنيفة رحمه الله.

এই হাদীস অনুযায়ী আমাদেরও ফতোয়া। আল্লাহর পথে লড়াইকারীর যদি এ পরিমাণ সম্পদ থাকে, যা দ্বারা সে যুদ্ধে যেতে সক্ষম, তার জন্য শোভনীয় নয় যে,  সে যাকাত থেকে গ্রহণ করবে। …আর এটা আবু হানীফা রাহ.-এরও অভিমত। [মুআত্তা ইমাম মুহাম্মাদ, হাদীস ৩৪৩]

ইমাম মুহাম্মাদ কিতাবুল আছলে বলেন:

ولا بأس بأن يعين حاجاً منقطعاً مقيماً، وغازياً منقطعاً به، ولا بأس بأن يعين مكاتباً. وبهذا يأخذ أبو حنيفة وأبو يوسف ومحمد.

এতে কোনো অসুবিধা নেই যে, পাথেয় নেই এমন হজ্জে গমনেচ্ছু ব্যক্তিকে যাকাতের সম্পদ থেকে সহায়তা করা এবং সম্বলহীন মুজাহিদকে সহায়তা করা।… আবু হানীফা ও আবু ইউসুফ এবং মুহাম্মাদও এ মত গ্রহণ করেছেন। [কিতাবুল আছল ২/১০৩]

ইমাম আবু বকর জাসসাস রাহ. (মৃত্যু ৩৭০ হি.) শরহু মুখতাসারিত তহাবীতে বলেন:

“وفي سبيل الله” هم أهل الجهاد من الفقراء.

‘ফী সাবীলিল্লাহ’ তারা হলেন অসচ্ছল মুজাহিদগণ। [শরহু মুখতাসারিত তহাবী ২/৩৭৩]

আবু ইয়াকুব আলজুরজানী রাহ. (মৃত্যু ৫২২ হি.) খিযানাতুল আকমাল কিতাবে বলেন:

و”سبيل الله” فقراء الغزاة عندنا، وعن محمد : الحاج أيضا.

‘সাবীলুল্লাহ’ হচ্ছে আমাদের নিকট দরিদ্র মুজাহিদ। আর ইমাম মুহাম্মাদ রাহ.-এর একটি মত এটাও যে, দরিদ্র হাজ্বী। [খিযানাতুল আকমল ১/২৯১]

আলবিনায়া শরহুল হিদায়া গ্রন্থে আছে:

وقال ابن المنذر رحمه الله: قول أبي حنيفة رحمه الله وأبي يوسف ومحمد: “في سبيل الله” هو الغازي غير الغني وحكى أبو ثور عن أبي حنيفة أنه الغازي دون الحاج.

ইবনুল মুনযির রাহ. বলেন, ইমাম আবু হানীফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রাহ. বলেন, ‘সাবীলুল্লাহ’ হল দরিদ্র গাজী। আর ইমাম আবু সাওর রাহ. ইমাম আবু হানীফা রাহ. থেকে বর্ণনা করেন, ‘সাবীলুল্লাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল যুদ্ধরত মুজাহিদ; হজে¦ গমনেচ্ছু ব্যক্তি নয়। [আলবিনায়া ৪/১৮৫]

উল্লিখিত হাদীস-আসার এবং মুজতাহিদ ইমাম ও ফিক্হবিদগণের বক্তব্য থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে জানা গেল যে, কুরআন মাজীদে যাকাতের খাত সংক্রান্ত আয়াতে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর রাস্তায় কাফেরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নিয়োজিত মুজাহিদগণ। এটি সর্বসম্মত মত। দু-একজনের মতে দরিদ্র হাজ্বীগণও এ খাতের হকদার।

আরো দ্রষ্টব্য : মুখতাসারু ইখতিলাফিল উলামা ১/৪৮১; আলমাবসূত, সারাখসী ৩/৮; আততাজরীদ, ইমাম কুদুরী, মাসআলা নং ১০১৯

যাকাত ব্যক্তির হকদল বা প্রাতিষ্ঠানের নয়

এখানে আরেকটি বিষয়ও স্পষ্টভাবে বোঝা গেল যে, যাকাত ব্যক্তির হক। যাকাত কেবলমাত্র ব্যক্তিকেই দেওয়া যায়।

যাকাতের হকদার আটটি খাতের দিকে আবার নজর দেওয়া যাক।

১. ফকীর।

২. মিসকীন।

৩. আমিলীন। অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান আমীরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে যাকাত, উশর ইত্যাদি উসূলের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত (ব্যক্তি)।

৪. আলমুআল্লাফা কুলূবুহুম। অর্থাৎ দুর্বল ঈমানওয়ালা কোনো নওমুসলিম, যার মনোরঞ্জন উদ্দেশ্য।

৫. আররিক্বাব। অর্থাৎ মুকাতাব (গোলাম) বা (কারো মতে) পূর্ণ দাস (ব্যক্তি)।

৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।

৭. আল্লাহর রাস্তায় কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদকারী। কারো মতে পাথেয়শূন্য হজ¦যাত্রীও এর অন্তর্ভুক্ত।

৮. মুসাফির ব্যক্তি।

উপরের আটটি খাতের কোনোটিই প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক নয়। সুতরাং কোনো প্রতিষ্ঠান বা জনকল্যাণমুখী কাজ যাকাতের খাত নয়। সেখানে যাকাত দেওয়া যাবে না। ঐ কাজগুলো হয়ত রাষ্ট্র আঞ্জাম দেবে, নতুবা মুসলমানদের স্বতঃস্ফূর্ত অনুদান থেকে তার ব্যবস্থা করা হবে।

যাকাতের একটি বড় উদ্দেশ্য হল, সমাজের দারিদ্র্র্য বিমোচন। আর সমাজের দরিদ্র গোষ্ঠীর অভাব মোচন তখনই সম্ভব হবে, যদি তাদেরকে সম্পদের মালিক বানিয়ে দেয়া হয়।

রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, হাসপাতাল-স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা, পানির কূপ, জলাধার খনন ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক কাজ দ্বারা ধনি-দরিদ্র সব শ্রেণির মানুষ উপকার লাভ করে বটে, কিন্তু তা দরিদ্র শ্রেণির মালিকানাধীন সম্পদ নয়।

তাই যাকাতের অর্থ এসব জনকল্যাণমুখী কাজে ব্যয় করার কোনোও সুযোগ নেই। হাদীস শরীফে যাকাত ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে দিতে বলা হয়েছে।

সহীহ বুখারীতে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

…أَنّ اللهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ.

…আল্লাহ তাআলা তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করা হবে অতঃপর তাদের গরীবদের তা দেওয়া হবে। [সহীহ বুখারী, হাদীস ১৪৯৬]

পক্ষান্তরে এই আট খাতের বাইরে কোনো খাতে যাকাতের নিয়তে সমুদয় সম্পদ দিয়ে দিলেও যাকাত আদায় হবে না। আবু বকর রা. ওমর রা.-এর প্রতি ওসিয়তে বলেন:

مَنْ أَدّى الزَّكَاةَ إلَى غَيْرِ أَهْلِهَا لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ زَكَاةٌ، وَلَوْ تَصَدَّقَ بِالدُّنْيَا جَمِيعِهَا.

যে ব্যক্তি যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত নয় এমন কাউকে যাকাত প্রদান করল তা গ্রহণযোগ্য হবে না; যদিও সে দুনিয়ার সকল সম্পদ দান করে দেয়। Ñআলমুহাল্লা বিল আসার, ইবনে হাযাম ৪/২৭৬, বর্ণনা ৭২১; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, বর্ণনা ৬৯৩৪

ফী সাবীলিল্লাহর স্বীকৃত অর্থ বাদ দিয়ে শাব্দিক অর্থ গ্রহণ জায়েয নয়

ইতিপূর্বে বলা  হয়েছে যে, সূরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কাফেরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নিয়োজিত মুজাহিদ; যা হাদীস-আসার দ্বারা, সাহাবা-তাবেয়ীনের বক্তব্য ও কর্মপন্থা দ্বারা; এবং হাদীস, ফিকহ ও তাফসীরবিশারদ ও মুজতাহিদ ইমামগণের সুস্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা সুপ্রমাণিত।

নির্ভরযোগ্য বরাতসহ যার কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কোনো কোনো ফকীহের মতে পাথেয়শূন্য হজে¦ গমনেচ্ছু ব্যক্তিও এতে শামিল আছে। ‘ফী সাবীলিল্লাহ’র পারিভাষিক ও স্বীকৃত অর্থ বাদ দিয়ে শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করা এবং সে অনুযায়ী নির্ধারিত খাতের ব্যক্তিকে যাকাত না দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বা জনকল্যাণমূলক কাজে যাকাত আদায় করা কিছুতেই জায়েয হবে না।

‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর শাব্দিক অর্থ যে এখানে উদ্দেশ্য নয় তা তো আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

‘সাবীলুল্লাহ’কে ব্যাপক অর্থ ধরে যে কোনো দ্বীনী কর্মকাণ্ডকেই যদি ‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর আওতাভুক্ত ধরা যেত তাহলে এর স্বপক্ষে কোনো না কোনো হাদীস-আসার পাওয়া যেত এবং সাহাবা-তাবেয়ীন থেকে নির্ভরযোগ্য দলীল পাওয়া যেত।

অথচ এর স্বপক্ষে একটি সহীহ হাদীসও নেই।

দ্বিতীয়ত, ‘ফী সাবীলিল্লাহ’র যদি শাব্দিক অর্থই উদ্দেশ্য হত তাহলে যাকাতের ৮টি খাতকে ভিন্ন ভিন্ন করে উল্লেখ করার প্রয়োজন ছিল না।

কেননা আট খাতের প্রত্যেকটিই শাব্দিক অর্থে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত। ফকীর মিসকীনকে দান করা আক্ষরিক অর্থেই ‘ফী সাবীলিল্লাহ’র অন্তর্ভুক্ত। ‘আমিলীন’কে সহযোগিতা করা শাব্দিক অর্থের বিচারে ‘ফী সাবীলিল্লহ’-এর অন্তর্ভুক্ত।

‘মুআল্লাফা কুলূব’, ঋণগ্রস্ত ও নিঃস্ব মুসাফিরকে দান করা সবই শাব্দিক অর্থের বিবেচনায় ‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর অন্তর্ভুক্ত।

তাহলে এক কথায় إنما الصدقات في سبيل الله বলে দেওয়াই যথেষ্ট ছিল। ভিন্ন ভিন্ন করে আটটি খাত উল্লেখ করার দরকার ছিল না।

তৃতীয়ত, ‘ফী সাবীলিল্লাহ’কে যদি শাব্দিক অর্থে গ্রহণ করা হয় তাহলে আয়াতের বাকি যে খাতগুলো রয়েছে সবগুলোরইও তো শাব্দিক অর্থ রয়েছে। ঐগুলোর শাব্দিক অর্থ কেন ধরা হবে না? যেমন, ‘ইবনুস সাবীল’। এর অর্থ হল, পথিক। শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করা হলে যে কোনো পথিককেই যাকাত দেওয়া যাবে।

অথচ এটা যে অগ্রহণযোগ্য এবং বাতিল কথা তা তো বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।

কেননা ‘ইবনুস সাবীল’ শরীয়ত তথা কুরআন-সুুন্নাহর একটি পরিভাষা। এটা শরীয়ত কতৃর্ক স্বীকৃত এবং এর গণ্ডি শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত। ঐ আওতার বাইরে গেলে কুরআন-সুন্নাহর পরিভাষা ও অর্থের বিকৃতি অনিবার্য। যা কোনোক্রমেই জায়েয নয়।

অনুরূপ ‘আলগারিমীন’-এর শাব্দিক অর্থ ঋণগ্রস্ত। এ অর্থে সকল ঋণগ্রস্তই যাকাতের অধিকারী হয়ে যায়। কোটিপতি ঋণখেলাপি ব্যক্তিও তখন এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

তদ্রুপ যার কাছে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু পাওনা পরিশোধ করছে না সেও যাকাত গ্রহণ করতে পারবে।

কেননা সেও তো ঋণগ্রস্ত; তার কাছেও লোকজন ঋণের টাকা পাবে। এভাবে প্রতিটি খাতের শাব্দিক অর্থ ধরা হলে অধিকাংশ মানুষ যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত বিবেচিত হবে।

অথচ এটা যে সম্পূর্ণ বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য কথা তা ‘ফী সাবীলিল্লাহ’র শাব্দিক অর্থের প্রবক্তারাও স্বীকার করেন।

তদ্রুপ إنما الصدقات -এর মধ্যে ‘সাদাকাত’ শব্দটিই ধরুন। এর শাব্দিক অর্থ দান-খয়রাত।

এখানে শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করা হলে নফল-ফরয সব ধরনের দান-খয়রাত অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে নফল দান-খয়রাতের খাতও আটটির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। এটা যে বাতিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বরং এখানে সাদাকাতের পারিভাষিক অর্থই উদ্দেশ্য। তা হল, যাকাত ও ফরয সদকা। পারিভাষিক ও সালাফের নিকট স্বীকৃত অর্থ বর্জন করে শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করা হলে কুরআন মাজীদের অর্থ ও মর্ম বিকৃত হয়ে যাবে, যা সম্পূর্ণ নাজায়েয।

সংক্ষিপ্তভাবে  এখানে তিনটি উদাহরণ দেখানো হয়েছে। অন্যথায় আটটি খাতের প্রত্যেকটিতেই শাব্দিক অর্থ ও পারিভাষিক অর্থের এই পার্থক্য বিদ্যমান।

এটি একটি স্বতঃসিদ্ধ ও স্বীকৃত কথা যে, কুরআন মাজিদের কোনো আয়াতের অর্থ ও মর্ম যা নবীযুগ, ছাহাবা যুগ তথা খাইরুল কুরূনে সালাফের নিকট স্বীকৃত ও নির্ধারিত ছিল তার অনুসরণ জরুরি।

এক্ষেত্রে হাদীস-আসারের বর্ণনা এবং সাহাবা-তাবেয়ীন ও মুজতাহিদ ইমামগণের কুরআন-সুন্নাহসম্মত ফাহ্ম ও বুঝের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ করলে তা প্রত্যাখ্যাত ও অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. চমৎকার বলেছেন:

وفي الجملة من عدل عن مذاهب الصحابة والتابعين وتفسيرهم إلى ما يخالف ذلك كان مخطئا في ذلك، بل مبتدعا، وإن كان مجتهدا مغفورا له خطؤه. ونحن نعلم أن القرآن قرأه الصحابة والتابعون وتابعوهم، وأنهم كانوا أعلم بتفسيره ومعانيه، كما أنهم أعلم بالحق الذي بعث الله به رسوله صلى الله عليه وسلم، فمن خالف قولهم وفسر القرآن بخلاف تفسيرهم فقد أخطأ في الدليل والمدلول جميعا.

মোটকথা, যে ব্যক্তি সাহাবা-তাবেয়ীনের মত ও পথ এবং তাদের তাফসীর ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে সরে ভিন্ন কিছু গ্রহণ করে সে এক্ষেত্রে ভুলের উপর আছে; বরং সে মুবতাদি‘ অর্থাৎ বিদআতের শিকার।  …আর আমরা জানি যে, সাহাবা-তাবেয়ীন এবং তাবে তাবেয়ীন কুরআন পড়েছেন। তাঁরা কুরআনের তাফসীর, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও অর্থ সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞাত ছিলেন। যেমনি তারা ঐ সত্য সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞান রাখতেন, যে সত্য দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন। অতএব যে ব্যক্তি তাদের মতের বিরোধিতা করল এবং তাদের তাফসীরের বিপরীত তাফসীর করল সে নিঃসন্দেহে দলীল ও মর্ম উভয় ক্ষেত্রেই ভুলের শিকার হল। (আলমুকাদ্দিমা ফী উসূলিত তাফসীর, পৃ. ২৪)

মনে রাখতে হবে, দ্বীনী কাজে আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও ফযীলতের কাজ। কিন্তু তা হতে হবে শরীয়তবর্ণিত পন্থায়। আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতার সবকিছুই ফরয সদকা তথা যাকাত দিয়ে করা যাবে না।

যাকাত কেবলমাত্র এর নির্ধারিত খাতেই ব্যয় করা যাবে। যে খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যায় না সেখানে কোনো বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা সঠিক কাজ নয়।

আবু বকর রা. ওমর রা.-এর প্রতি ওসিয়তে বলেন:

مَنْ أَدَّى الزَّكَاةَ إلَى غَيْرِ أَهْلِهَا لَمْ تُقْبَلْ مِنْهُ زَكَاةٌ، وَلَوْ تَصَدَّقَ بِالدُّنْيَا جَمِيعِهَا.

যে ব্যক্তি যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত নয় এমন কাউকে যাকাত প্রদান করল তা গ্রহণযোগ্য হবে না; যদিও সে দুনিয়ার সকল সম্পদ দান করে দেয়। [আলমুহাল্লা বিল আসার, ইবনে হাযাম ৪/২৭৬, বর্ণনা ৭২১; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, বর্ণনা ৬৯৩৪]

দ্বীনী প্রয়োজন পূরণের জন্য এসব ক্ষেত্রে সাধারণ দান-সদকার পথ তো খোলাই আছে। সে পথই অবলম্বন করতে হবে। এটিই ছিল সালাফের যুগের কর্মপন্থা, যার অনুসরণ আমাদের কর্তব্য।

যাকাতের অর্থ দিয়ে মসজিদমাদরাসা নির্মাণস্কুলকলেজহাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও জলাধারকূপ ইত্যাদি খনন জায়েয নয়

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জনসাধারণের জন্য রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, মসজিদ নির্মাণ, সুপেয় পানি বা জলাধারের ব্যবস্থা করা অনেক বড় সওয়াবের কাজ এবং সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এ কাজ ফরয সদকা তথা যাকাতের অর্থ দিয়ে করার সুযোগ নেই।

এ ধরনের জনকল্যাণধর্মী কাজে যাকাতের অর্থ ব্যয় করলে যাকাত যে আদায় হবে না এবিষয়ে মুজতাহিদ ইমাম ও ফিকহবিশারদদের মতামত উল্লেখ করা হল।

দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীর মুজতাহিদ ইমাম আবু উবাইদ কাসেম ইবনে সাল্লাম রাহ. (জন্ম : ১৫৭ হি.-মৃত্যু : ২২৪ হি.) বলেনÑ

فأما قضاء الدين عن الميت، والعطية في كفنه، وبنيان المساجد، واحتفار الأنهار، وما أشبه ذلك من أنواع البر، فإن سفيان وأهل العراق وغيرهم من العلماء يجمعون على أن ذلك لا يجزئ من الزكاة؛ لأنه ليس من الأصناف الثمانية.

মৃতের পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ, মাইয়েতের কাফনের খরচ, মসজিদ নির্মাণ ও খাল খননÑ এজাতীয় পুণ্যের কাজে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা হলে যাকাত আদায় হবে না। এ বিষয়ে সুফিয়ান রাহ. এবং ইরাক ও অন্যান্য অঞ্চলের ফকীহগণ একমত। কেননা এসকল খাত যাকাতের ৮টি খাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। [কিতাবুল আমওয়াল, বর্ণনা ১৯৮০]

ইমাম কাসানী রাহ. বলেন:

صرف الزكاة إلى وجوه البر من بناء المساجد، والرباطات، والسقايات، وإصلاح القناطر، وتكفين الموتى ودفنهم أنه لايجوز.

যাকাতের অর্থে জনকল্যাণমূলক কাজ করা, যেমন মসজিদ নির্মাণ, সরাইখানা ও জলাধার নির্মাণ এবং পোল মেরামত ও মৃতের কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা জায়েয নয়। [বাদায়েউস সানায়ে ২/১৪২]

ইবনে কুদামা রাহ. বলেন:

ولا يجوز صرف الزكاة إلى غير من ذكر الله تعالى، من بناء المساجد، والقناطر، والسقايات، وإصلاح الطرقات وسد البثوق، وتكفين الموتى، …وأشباه ذلك من القرب التي لم يذكرهاالله تعالى.

আর আল্লাহ তাআলা যেসব খাতের কথা উল্লেখ করেননি সেসব খাতে যাকাত দেওয়া জায়েয নয়। যেমন মসজিদ নির্মাণ, পুল নির্মাণ, জলাধার তৈরি করা, রাস্তা মেরামত ও বাঁধ নির্মাণ কিংবা মৃতের কাফনের ব্যবস্থা করা …এ জাতীয় সওয়াবের কাজ, যাকাতের খাতের আলোচনায় আল্লাহ তাআলা যার উল্লেখ করেননি। [আলমুগনী, ইবনে কুদামা ৪/১২৫]

জনকল্যাণমূলক কাজে যাকাত আদায় না হওয়ার কারণ হল, যাকাত ব্যক্তির হক। সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:

تؤخذ من أغنيائهم فترد على فقرائهم

‘মুসলমানদের সম্পদশালীদের থেকে যাকাত গ্রহণ করা হবে। অতঃপর তাদের গরীবদের তা দেওয়া হবে।’ Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ১৪৯৬

সুতরাং যাকাত আদায়ের জন্য ব্যক্তিকে যাকাতের অর্থের সম্পূর্ণ মালিক বানিয়ে দিতে হবে। যেন যাকাতের সম্পদে তার একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে যে, সে চাইলে তা নিজে ভোগ করতে পারে, চাইলে সে বিক্রিও করে দিতে পারে, আবার কাউকে দানও করে দিতে পারে। এভাবে মালিক বানিয়ে দিলে যাকাত আদায় হবে।

পক্ষান্তরে মালিকানা নিজের কাছে রেখে বা যাকাতের অর্থ দ্বারা জনকল্যাণমূলক কাজ করে, যেমন জলাধার বানিয়ে বা রাস্তা মেরামত করে বা প্রতিষ্ঠান করে দিয়ে তা থেকে উপকার ভোগ করার অনুমতি দিয়ে দিলেও যাকাত আদায় হবে না। কেননা এর দ্বারা যাকাতের সম্পদে ব্যক্তির মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

সমকালীন আরব শায়েখদের ফতোয়া

মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আলে শায়েখ (মৃত্যু : ১৩৮৯ হি.) এর ফতোয়া

যাকাত সম্পর্কে তৎকালীন সৌদী বাদশাহর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেনÑ

إن صرف الزكاة للمساجد والأعمال الخيرية مما لا ينطوي تحت الأصناف الثمانية التي ذكرها الله تعالى وحصر صرف الزكاة فيها لا يجوز.

মসজিদ এবং জনকল্যাণমূলক কাজÑ যা কিনা আল্লাহ নির্ধারিত সেই আটটি খাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। যাকাত প্রদানকে তিনি যার মাঝে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন এসব ক্ষেত্রে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা জায়েয হবে না। [ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল, মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আলে শায়েখ, ফতোয়া নং ১০৭০]

শায়েখ বিন বায রাহ.এর ফতোয়া

এক প্রশ্নের উত্তরে শায়েখ বিন বায রাহ. বলেন:

الصحيح أن المراد بقوله سبحانه: وفي سبيل الله عند أهل العلم هم الغزاة والجهاد في سبيل الله، فلا تصرف في المساجد ولا المدارس عند جمهور أهل العلم. وذهب بعض المتأخرين إلى جواز صرفها في المشاريع الخيرية، ولكنه قول مرجوح؛ لأنه يخالف ما دلت عليه الأدلة، ويخالف ما مضى عليه أهل العلم.

আলেমগণের নিকট সঠিক কথা হল, ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীগণ। অতএব জুমহুর উলামায়ে কেরামের মতানুযায়ী যাকাত মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণে ব্যয় করা যাবে না। পরবতীর্দের কেউ কেউ জনকল্যাণমূলক কাজে যাকাত ব্যয় করাকে জায়েয বলেছেন। কিন্তু এটি একটি অগ্রহণযোগ্য কথা। কেননা এ কথা দলীল-পরিপন্থী এবং পূর্ববতীর্ আহলে ইলমের মতের বিপরীত। [মাজমূউ ফাতাওয়া বিন বায ১৪/২৯৭]

তিনি আরেক ফতোয়ায় বলেছেন:

“وفي سبيل الله” تختص بالجهاد، هذا هو المعروف عند أهل العلم وليس من ذلك صرفه في تعمير المساجد، ولا في تعمير المدارس، ولا الطرق ولا نحو ذلك. والله ولي التوفيق.

‘আর ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ জিহাদের সাথে খাস। এটা আহলে ইলমের নিকট স্বীকৃত কথা। মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণ ও রাস্তা ঘাট ইত্যাদি নিমার্ণে যাকাতের অর্থ খরচ করা জায়েয নয়’। আল্লাহই তাওফীকদাতা। Ñমাজমূউ ফাতাওয়া বিন বায ১৪/২৯৪

শায়েখ উসাইমীন রাহ.এর ফতোয়া

শায়েখ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আলউসাইমীন রাহ. বলেছেন:

السابع: في سبيل الله، و”سبيل الله” هنا المراد به الجهاد في سبيل الله لا غير، ولا يصح أن يراد به جميع سبل الخير؛ لأنه لو كان المراد به جميع سبل الخير لم يكن للحصر فائدة في قوله تعالى: اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَ الْمَسٰكِیْنِ وَ الْعٰمِلِیْنَ عَلَیْهَا وَ الْمُؤَلَّفَةِ قُلُوْبُهُمْ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الْغٰرِمِیْنَ وَ فِیْ سَبِیْلِ اللهِ وَ ابْنِ السَّبِیْلِ فَرِیْضَةً مِّنَ اللهِ وَ اللهُ عَلِیْمٌ حَكِیْمٌ.

সপ্তম নাম্বার হল, ‘ফী সাবীলিল্লাহ’। আর এখানে ‘সাবীলুল্লাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা, অন্য কিছু নয়। এর দ্বারা সকল কল্যাণমূলক কাজ উদ্দেশ্য নেওয়া সহীহ নয়। কেননা এর দ্বারা যদি সকল কল্যাণমূলক কাজ উদ্দেশ্য হয় তাহলে

اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَ الْمَسٰكِیْنِ …

এই আয়াতে যাকাতের খাতকে আটটিতে সীমাবদ্ধ করার কোনো অর্থ থাকে না। [মাজমূউ ফাতাওয়া উসাইমীন ১৮/৩৩৬]

 

সৌদিআরবের রাষ্ট্রীয় মুফতীবোর্ড (আললাজনাতুদ দায়িমা)-এর সিদ্ধান্ত

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মুফতীবোর্ড (আললাজনাতুদ দায়িমা) থেকে একটি প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে:

لا يجوز صرف الزكاة في بناء المساجد والمستشفيات والمؤسسات الخيرية، وقد صدر قرار من هيئة كبار العلماء في المملكة العربية السعودية في هذا الموضوع،… رأى أكثر أعضاء الهيئة الأخذ بقول جمهور العلماء من مفسرين ومحدثين وفقهاء: أن المراد بقوله تعالى {وَفِي سَبِيلِ اللهِ} في آية مصارف الزكاة: الغزاة المتطوعون بغزوهم.

মসজিদ নির্মাণ, হাসপাতাল নির্মাণ ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে যাকাত দেওয়া জায়েয নয়। এ বিষয়ে সৌদিআরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়েছে।… পরিষদের অধিকাংশের মতামত হল, উক্ত আয়াতে ‘সাবীলুল্লাহ’ দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ যে মত গ্রহণ করেছেন সেটা গ্রহণ করা অর্থাৎ মুজাহিদগণ, যারা স্বেচ্ছায় জিহাদে গমনকারী, তারাই ‘সাবীলুল্লাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য। [ফাতাওয়াল লাজনাতিদ দায়িমা ১০/৩৯]

শায়েখ নাসীরুদ্দীন আলবানী রাহ.এর বক্তব্য

যারা ‘সাবীলুল্লাহ‘কে ব্যাপক অর্থবোধক ধরে যে কোনো কল্যাণমূলক কাজ যেমন, ইসলামের জন্য দাওয়াতী প্রোগ্রাম, মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা এবং অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজকে এর অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন প্রসিদ্ধ সালাফী আলেম শায়েখ নাসীরুদ্দীন আলবানী রাহ. তাদের খণ্ডনে বলেন:

وهذا التفسير تفسير محدث لا يعرفه السلف الصالح أولا ثم ينافي صريح الآية التي حصرت المصارف للزكاة في الأنواع الثمانية المذكورة فيها.

এই তাফসীরটি নবআবিষ্কৃত তাফসীর। সালাফ তথা পূর্বসূরীগণ এ তাফসীর জানতেনই না। এছাড়া এ ব্যাখ্যা যাকাতের আয়াতের সুস্পষ্ট বিরোধী, যেখানে যাকাতের খাতকে আট প্রকারের মাঝে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। [জামেউ তুরাসিল আল্লামা আলবানী ১০/৫৩০]

কূপ/জলাধার সম্পর্কে সৌদিআরবের রাষ্ট্রীয় মুফতীবোর্ডের ফতোয়া

ওয়াক্ফকৃত একটি কূপ সংষ্কার করার কাজে যাকাতের অর্থ ব্যবহার করা সম্পর্কে সৌদিআরবের রাষ্ট্রীয় মুফতীবোর্ড আললাজনাতুদ দায়িমার নিকট প্রশ্ন করা হলে এই ফতোয়া দেওয়া হয়:

بين الله جل وعلا مصارف الزكاة بقوله تعالى: اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَ الْمَسٰكِیْنِ وَ الْعٰمِلِیْنَ عَلَیْهَا وَ الْمُؤَلَّفَةِ قُلُوْبُهُمْ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الْغٰرِمِیْنَ وَ فِیْ سَبِیْلِ اللهِ .

فلا يجوز صرفها في غير المصارف التي ذكرها الله تبارك وتعالى، وبناء على ذلك فما جمعته من الزكاة ووجب عليك مستقبلا يجب عليك أن تصرفه في مصارفه الشرعية المبينة في هذه الآية، وليس البئر المذكورة من مصارف الزكاة.

আল্লাহ তাআলা

اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَ الْمَسٰكِیْنِ …

এ আয়াতে [সূরা তাওবা (০৯) : ৬০] যাকাতের খাতসমূহ বলে দিয়েছেন। অতএব আল্লাহ তাআলার বর্ণিত খাতের বাইরে অন্যত্র যাকাতের অর্থ ব্যয় করা জায়েয নয়। সুতরাং আপনি যাকাতের যে অর্থ জমা করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরো যা জমা হবে, আপনার জন্য আবশ্যক হল, এ আয়াতে যে খাতের কথা বর্ণিত আছে সেখানেই তা খরচ করা। আর ঐ কূপ যাকাতের খাতসমূহের মধ্যে পড়ে না। [ফাতাওয়াল লাজনাতিদ দায়িমা ১০/৪৩]

কূপজলাধার খনন এবং সরাইখানা ও মসজিদ ইত্যাদি নির্মাণে সালাফের কর্মপন্থা

সাহাবা-তাবেয়ীন তথা আমাদের মহান পূর্বসূরী সালাফে সালেহীন এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ নফল দান-সদকা, ওয়াক্ফ, হেবা, অসিয়ত ইত্যাদির মাধ্যমে করতেন।

ইসলামের ইতিহাসে নবীযুগে এবং খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগে অসংখ্য কূপ/জলাধার তৈরি, মসজিদ নির্মাণ, খেজুর বাগান দান ইত্যাদির ঘটনা পাওয়া যায়।

কিন্তু হাদীস-আসারে এমন একটি বর্ণনাও পাওয়া যায় না যে, তারা যাকাতের অর্থ দিয়ে, মসজিদ-মাদরাসা-সরাইখানা নির্মাণ করেছেন। বরং সহীহসূত্রে যা পাওয়া যায় তা হল, এসব তারা আল্লাহর রাস্তায় ওয়াক্ফ করে দিয়েছেন। সদকায়ে জারিয়ার উদ্দেশ্যে নফল দান হিসেবে করেছেন।

অথচ ‘ফী সাবীলিল্লাহ’র অর্থ নিঃসন্দেহে আমাদের চেয়ে তাঁরাই ভালো বুঝতেন। কুরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্পর্কে পরবর্তীদের অপেক্ষা তারা অধিক জ্ঞাত।

শেষকথা হল, কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফের বক্তব্য ও মুজতাহিদ ইমামগণের উক্তির আলোকে এটি সুপ্রমাণিত যে, ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর পথে জিহাদকারী মুজাহিদ।

যাকাতের সপ্তম খাত দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে তারাই উদ্দেশ্য। একটি মতানুযায়ী দরিদ্র হাজ্বীও এর অন্তর্ভুক্ত। এবং এও প্রমাণিত যে, যাকাত ব্যক্তির হক; কোনো প্রতিষ্ঠান নির্মাণ কিংবা জনকল্যাণমূলক কোনো কাজ যাকাতের খাত নয়। এসব কাজে যাকাত আদায় করলে কিছুতেই যাকাত আদায় হবে না।

আর টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠার জন্য যারা যাকাত গ্রহণ জায়েয হওয়ার কথা বলেন তাদের কথা যে সম্পূর্ণ বাতিল, তা আর ভিন্ন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। যাকাতদাতাদের লক্ষ করা জরুরি যে, যাকাত একটি ইবাদত। এ ইবাদত থেকে দায়মুক্তি তখনই সম্ভব হবে, যদি তা যথাযথভাবে সঠিক খাতে ব্যয় করা হয়। অন্যথায় যাকাতের দায় থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

আরও জানুন

ইসলামী শরীয়ত বিষয়ে কবি হাসান মাহমুদের অজ্ঞতা ও ধৃষ্টতা (পর্ব-৪) প্রসঙ্গ তালাক

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী আগের লেখাটি পড়তে ক্লিক করুন হাসান মাহমুদ লিখেন: সূত্র ১।  অর্থাৎ শারিয়া …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস