প্রচ্ছদ / আকিদা-বিশ্বাস / নবীজীর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনা সফরের হুকুম কি?

নবীজীর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনা সফরের হুকুম কি?

প্রশ্ন

নাম: আহমাদ আলী

বিষয়: যিয়ারতের উদ্দেশ্য মদীনা সফর

বক্তব্যঃ

রাসূল সাঃ এর রওজা যয়িারতরে উদ্দশ্যে মদীনায় সফর করা কি জায়েজ

 

জবাব

بسم الله الرحمن الرحيم

 

রাসূল সাঃ এর রওযা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা অবশ্যই জায়েজ। কথিত আহলে হাদীস এবং কাজী ইয়াজ রহঃ এবং শায়েখ ইবনে তাইমিয়া রহঃ ছাড়া রওযা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা না জায়েজ ওলামায়ে উম্মতের মাঝে কোন মতবিরোধ নেই। সর্বসম্মত মতে তা জায়েজ।

 

কথিত আহলে হাদীসরা প্রচার করে যে, রাসূল সাঃ এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্য সফর করা শিরক। জায়েজ নেই। একথাটি নবীজী সাঃ এর প্রতি বিদ্বেষী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি ছাড়া কেউ বলতে পারে না।

 

সর্ব প্রথম এ মত ব্যক্ত করেন কাজী ইয়াজ মালিকী রহঃ। তিনি বলেন-কোন কবর যিয়ারত করার জন্যই সফর করা জায়েজ নয়। তিনি তার মতের পক্ষে নিম্নোক্ত হাদীস দ্বারা দলির পেশ করেন-

عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه و سلم قال : ( لا تشد الرحال إلا إلى ثلاثة مساجد المسجد الحرام ومسجد الرسول صلى الله عليه و سلم ومسجد الأقصى

 

অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদে আকসা এ তিন মসজিদ ব্যতীত সফর করা যাবে না। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১১৩২, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৩৪৫০}

গায়রে মুকাল্লিদ তথা কথিত আহলে হাদীসরাও এ হাদীস দ্বারা নিজেদের মতের পক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করে থাকে।

 

জমহুরদের ব্যাখ্যা

 

জমহুর ওলামায়ে কিরাম উক্ত হাদীসটির ক্ষেত্রে বলেন-এখানে বলা হয়েছে মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদে আকসা এ তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। কেননা এ তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করার মাঝে অতিরিক্ত কোন ফায়দা নেই। কিন্তু এ তিন মসজিদে সওয়াব বেশি হওয়ায় এ মসজিদের উদ্দেশ্যে সফরের কথা বলা হয়েছে।

এর অর্থ এ নয় যে, রাসূল সাঃ এর রওযা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। রাসূল সাঃ এর রওযা যিয়ারতের ক্ষেত্রে এ হাদীসে কিছুই বলা নেই।

শায়েখ ইবনে তাইমিয়া রহঃ এ বিষয়ে অতিরঞ্জন করেছেন। তিনি বলেছেন যে, উক্ত হাদীসের আলোকে নবীজী সাঃ এর রওযায়ে আহতার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েজ নয়।

শায়েখ ইবনে তাইমিয়া রহঃ যে অর্থ করেছেন সে অর্থ মেনে নিলে বলতে হবে-কোন আলেমের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে সফর করা, ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফর করা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। অথচ এসব কি নিষিদ্ধ?

সারকথা হল-এ হাদীসে উহ্য مستثنى منهটি الى شيئনয়, বরং الى مسجد।

এ বক্তব্যটির অনুকূলে মুসনাদে আহমাদে নিম্নোক্ত বর্ণাটি সমর্থন হিসেবে পাওয়া যায়।

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا ينبغي للمطي أن تشد رحاله إلى مسجد يبتغى فيه الصلاة غير المسجد الحرام والمسجد الأقصى ومسجدي هذا

 

অনুবাদ-হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-মসজিদে হারাম, মসজিদে আকসা ও মসজিদে নববী ব্যতীত অন্য কোন মসজিদে নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে সফর করা কোন মুসাফিরের জন্য সঙ্গত নয়। {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১১৬০৯}

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহঃ তার প্রণীত বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্ত উমদাতুল কারীর ৩ নং খন্ডে এবং ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ তার প্রণীত ফাতহুল বারীর ৩ নং খন্ডে এ হাদীস দ্বারা জমহুরের মতের পক্ষে দলীল পেশ করেছেন।

 

এ হাদীসের বর্ণনাকারীদের মাঝে একজন হলেন-শাহর বিন হাওশাব। তার ব্যাপারে কিছুটা দুর্বলতার অভিযোগ রয়েছে। তবে আল্লামা আইনী রহঃ তার সম্পর্কে বলেন-

وشهر بن حوشب وثقه جماعة من الأئمة (عمدة القارى شرح صحيح البخارى، كتاب التطوع،  باب فضل الصلاة في مسجد مكة والمدينة، رقم الحديث-212)

অনুবাদ-শাহর বিন হাওশাব নির্ভরযোগ্য রাবী বলে মত ব্যক্ত করেছেন ইমামদের এক জামাআত। {উমদাতুল কারী}

ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ শাহর বিন হাওশাব এর ব্যাপারে মন্তব্য করেন-

وشهر حسن الحديث وأن كان فيه بعض الضعف (فتح البارى لابن حجر،  قوله باب فضل الصلاة في مسجد مكة والمدينة، رقم الحديث-1132)

অনুবাদ-শাহর বিন হাওশাব এ মাঝে কিছুটা দূর্বলতা থাকলেও তিনি হাসান পর্যায়ের রাবী। {ফাতহুল বারী, তুহফাতুল আহওয়াজী}

 

জমহুরের পক্ষে দলিল

 

عن أبي الدرداء قال ثم إن بلالا رأى في منامه النبي صلى الله عليه و سلم وهو يقول له ما هذه الجفوة يا بلال ؟ أما آن لك أن تزورني يا بلال ؟ فانتبه حزينا وجلا خائفا فركب راحلته وقصد المدينة فأتى قبر النبي صلى الله عليه و سلم فجعل يبكي عنده ويمرغ وجهه عليه (اثار السنن لنووى-279، وقال رواه ابن عساكر، وقال التقى السبكى اسناده جيد

অনুবাদ-হযরত আবু দারদা রাঃ থেকে বর্ণিত। একদা হযরত বেলাল রাঃ রাসূল সাঃ কে স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি বেলালকে বলছেন-হে বেলাল! একি অবিচার! এখনো কি সময় হয়নি যে, তুমি আমার যিয়ারতে আসবে? তারপর বেলার রাঃ চিন্তিত ও ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় জাগ্রত হলেন। তিনি সওয়ারী নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। অবশেষে নবীজী সাঃ এর কবরে এসে রোদন করতে থাকলেন এবং চেহারায় ধুলি মারতে লাগলেন। {আসারুস সুনান-২৭৯}

 

এখানে পরিস্কারভাবে পরিস্ফুটিত যে, হযরত বেলাল রাঃ এর সফর ছিল রাসূল সাঃ এর রওযা যিয়ারত। অন্য কিছু নয়।

আরেক বর্ণনায় এসেছে-

عن بن عمر قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : من زار قبري وجبت له شفاعتي

অনুবাদ-হযরত ইবনে ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করল, তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেল। {সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-১৯৪, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-১০০৫৩, মুসনাদে তায়ালিসী, হাদীস নং-৬৫, সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস নং-৩১১২, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৪১৫৩}

অন্য বর্ণনায় এসেছে-

من حج ولم يزرني فقد جفاني

অনুবাদ-যে ব্যক্তি হজ্ব করেছে, অথচ আমার যিয়ারত করেনি, সে আমার উপর জুলুম করল। {হাশিয়ায়ে মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-৯৪৭}

অন্য বর্ণনায় এসেছে-

عن عمر رضي الله عنه قال سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول : من زار قبري أو قال من زارني كنت له شفيعا أو شهيدا

অনুবাদ-হযরত ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করল, আমি তার সুপারিশকারী হবো। {সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হাদীস নং-১০০৫৩, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৪১৫৩, মুসনাদে তায়ালিসী, হাদীস নং-৬৫}

 

এ সকল হাদীস দ্বারা সুষ্পষ্টভাবে একথা প্রমাণিত যে, রাসূল সাঃ এর রওযায়ে আতহার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা সম্পূর্ণ জায়েজ। শুধু জায়েজই নয়, উত্তমও।

 

কথিত আহলে হাদীসরা নিজেদের মুহাম্মদী বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। অথচ কথিত আহলে হাদীসদের যদি বলা হয় যে, মদীনায় চাকরী বা ব্যবসা করার জন্য সফর করা জায়েজ?

বলবে-বিলকুল জায়েজ।

যদি প্রশ্ন করা হয়-রাসূল সাঃ এর রওজা যিয়ারতের নিয়তে মদীনায় সফর করা জায়েজ?

সাথে সাথে বলবে-না, না জায়েজ নেই। নবীর রওযা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদীনায় যাওয়া শিরক।

কি আশ্চর্য মাসলাক এ কথিত আহলে হাদীসদের! মদীনায় টাকা কামানোর জন্য সফর জায়েজ। আর সায়্যিদুল আম্বিয়া, রাসূলে আরাবী সাঃ এর রওযা যিয়ারতের জন্য মদীনা সফর জায়েজ নয়! এরাও নিজেদের দাবী করে মুহাম্মদী! এরকম নবী বিদ্বেষী মুহাম্মদী হলে দুশমনে মুহাম্মদী কে?


والله اعلم بالصواب

উত্তর লিখনে

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল- ahlehaqmedia2014@gmail.com

lutforfarazi@yahoo.com

আরও জানুন

মুসলমানের জন্য কাফেরের সাথে বিবাহ করার হুকুম কী?

প্রশ্ন From: সারওয়ার বিষয়ঃ অমুসলিম বা কাফের এর সাথে সম্পর্ক করা যাবে কি না?? প্রশ্নঃ …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস