প্রচ্ছদ / আহলে হাদীস / জঙ্গিবাদের গোড়ায় আহলে হাদীস কেন?

জঙ্গিবাদের গোড়ায় আহলে হাদীস কেন?

মুফতী রফীকুল ইসলাম মাদানী দা.বা.

৭ই আগস্ট সোমবার ২০০৬ খৃস্টাব্দের কথা। দৈনিক পত্রিকা  “যায় যায় দিন” পড়তে ছিলাম। শুরুতেই চোখ পরে হেডলাইনে বড় অক্ষরে লেখা, “জঙ্গিবাদের গোড়ায় আহলে হাদিস। শায়খ, বাংলা ভাই, গালিব সবার উৎস ও মতাদর্শ এক।”(**) পত্রিকার পৃষ্ঠা জুড়ে ছবি দিয়ে দেয় উল্লেখিত তিন জনের। স্টাফ রিপোর্টার হাসানুল কাদির কলামের শুরুতে লেখেন’ “ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে আহলে হাদিস সম্প্রদায়ের আড়ালে। জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত দুই সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জে এম বি) এবং জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জে এম জেবি) এ সম্প্রদায়ের অনুসারীদের নিয়েই গড়ে উঠে। তাদের কর্মকা-ও পরিচালিত হয়েছে আহলে হাদিস অধ্যূষিত বিভিন্ন এলাকায়। এ দু’টি সংগঠনের শীর্ষ দু’নেতা শায়খ আব্দুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই আদর্শিকভাবে আহলে হাদিস মতবাদে বিশ্বাসী। জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আরেক কারাবন্দী নেতা ড. আসাদুল্লাহ আল গালিবও একই মতবাদের অনুসারী। তিনি বাংলাদেশ আহলে হাদিস আন্দোলনের আমির।

(যায় যায় দিন, ৭ই আগস্ট ২০০৬ইং সোমবার, অক্ষরে অক্ষরে পত্রিকা থেকে সংকলন)

শায়খ আব্দুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত জে এম বির পরিচালনায় ১৭ই আগস্ট ২০০৫ইং গোটাদেশে একই দিনে ৬৩টি জেলায় ৩০০স্থানে প্রায় সাড়ে পাঁচ শত বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল। ঘটনাস্থলে বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে তারা স্বীকারোক্তিও দিয়েছিল। এরপর থেকে ৩০শে মার্চ ২০০৭ ইং শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলাভাইকে ফাঁসি দেয়া পর্যন্ত কয়েকটি বছর পত্র-পত্রিকায় এ ধরনের লেখা প্রায় প্রতিদিনই হেড লাইনে স্থান পেতো, যা এদেশের কারো অজানা নেই। এ সব কর্মকা-ের পেছনে তাদের উদ্দেশ্য কী? মতলব কী? কী এর মূল রহস্য? তা আল্লাহ পাকই ভালো জানেন। পরিস্থিতি দেখে জনমনে প্রশ্ন জাগে জঙ্গিবাদের মতো একটি ঘৃণ্য কাজে আহলে হাদীস নেতারা জড়িত থাকবেন কেন? হাদীসের মতো পবিত্র শব্দ ও ইসলামের নামে কলঙ্কময় অধ্যায় তাদের মাধ্যমে কেন রচনা হবে? ইসলামের পবিত্র বিধান জিহাদকে তাদের মনগড়া সূত্রে কেন কলুষিত করবে? কেন তারা ধর্মের নামে অশ্লীলতা, হানাহানি-মারামারিতে লিপ্ত হবে? মহানবীর (সা.) আদর্শের  প্রতিচ্ছবি ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে রচিত হোক অনাবিল শান্তির অধ্যায় তা-ই সর্বস্তরের জনগণের কামনা। আমার ধারণা মতে আহলে হাদীস মতবাদে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষই জঙ্গিবাদের সঙ্গে  জড়িতদের ঘৃণার চোখে দেখে। তাদের মতে এরা বিভ্রান্ত। শান্তির ধর্ম ইসলামের জন্য কলঙ্ক। তারা ইসলাম, দেশ ও জাতির দুশমন। ঐ সব নেতাগণ ইসলামের চরম শত্রুদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেই এ ধরণের কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েছে। হয়ত তারা নিজেরাও জানে না যে, তারা কেমন ভয়ঙ্কর পথে পা বাড়াচ্ছে। আমার বিশ্বাস সত্যিকারার্থে যদি কেউ আহলে হাদীস দাবি করে জঙ্গিবাদের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক হতে পারে না। পারে না সে বাড়াবাড়ি , বে-আদবী ও অশ্লীল আচরণে লিপ্ত হতে। তাই কিছু চিহ্নিত ব্যক্তিবর্গের কারণে আমি বলতে পারি না যে আহলে হাদীস মতবাদ মানেই জঙ্গিবাদ। এভাবে যে কোন সম্প্রদায়ের কেউ ভুল পথে চললে বা জঙ্গিবাদের মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হলে বলা যাবে না যে, গোটা সম্প্রদায়টাই জঙ্গিবাদ। তবে যারা এ ধরণের কর্মকান্ডে লিপ্ত তাদের অবশ্যই ফিরে আসতে হবে। তারা যে ইসলামের অপব্যাখ্যা ও অবমূল্যায়নে আত্মনিয়োগ করেছে তা এদের নিজেরাই বুঝতে হবে। অন্যরাও তাদেরকে বারণ করতে হবে। বলে দিতে হবে ইসলামের সঙ্গে এ সব কর্মকা-ের কোন সর্ম্পক নেই। নেই ধর্মের নামে অশ্লীলতা, গালমন্দ, বেআদবী ও বাড়াবাড়ির কোন উপায়।

ইসলামে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের স্থান নেই

একটি সর্বকালীন ও সার্বজনীন মতাদর্শ, চিরশান্তি ও পরম মানবতার ধর্ম ইসলাম। ঐক্য, সৌহার্দ্য, সাম্য-মৈত্রী, সহিষ্ণুতা, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক এই ধর্ম। হত্যা, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ বোমাবাজি ও অশ্লীলতা ইত্যাদি চরমপন্থী কর্মকা-ের অস্তিত্ব ইসলামে মোটেই নেই। নাশকতামূলক কার্যক্রম ইসলাম আদৌ সমর্থন করে না। অস্থিতিশীল পরিবেশ ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা ইসলামে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আত্মঘাতী হামলা সম্পূর্ণ অবৈধ ও মহাপাপ। জিহাদের নামে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ অশ্লিলতা গর্হিত ও ঘৃণ্য অপকর্মের শামিল।

জিহাদ আর সন্ত্রাস এক নয়। অন্যায়, অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টির নাম হল সন্ত্রাস। শান্তিপূর্ণ অবস্থানে জিহাদ ও ক্বিতালের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি মানেই ফাসাদ। আর এসব নির্মূলে একমাত্র শরীয়ত সম্মত শুভ পদক্ষেপের নামই জিহাদ। ইসলাম কোন প্রকার সন্ত্রাসকে সমর্থন করে না। গায়ের জোরে কাউকে মুসলমান বানানোর একটি মাত্র ঘটনাও ইসলামের ইতিহাসে নেই। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-(لا إکراہ فی الدین) ইসলামে কোন জবরদস্তি নেই ( বাকারা-২৫৬)

ইসলামের নবী (সা.) সহিষ্ণুতার শিক্ষা দিয়েছেন। যারা পাথর ছুঁড়ে মারে তাদের কে ফুলের মালা আর যারা পথে কাঁটা পুঁতে তাদের জন্য ফুল বিছিয়ে দেয়া তাঁর আদর্শ। দীর্ঘ ১৩টি বছর মক্কায় আবু জাহেল গংদের সন্ত্রাস সহ্য করেছেন। সহ্য করেছেন ১০ বছর মদীনায় তাদের আক্রমণ ও অপবাদের ঝড়। এমনকি মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক দিনে যখন রাসূল (সা.) দশ হাজার সাহাবী নিয়ে জন্মভূমি মক্কায় প্রবেশ করলেন, সেদিন চিরশত্রু পৌত্তলিকদের সমুচিত শাস্তি প্রদানের অপূর্ব সুযোগ গ্রহণ করেন নি। ভীতসন্ত্রস্ত শত্রু মক্কাবাসীদেরকে কোন ভর্ৎসনা পর্যন্ত করলেন না।  রাসূল (সা.) অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বরং নিঃশর্ত মুক্তি ঘোষণা করলেন “আজকের দিনে তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই, তোমাদের অনুতাপের কোনো কারণ নেই, যাও তোমরা আজ মুক্ত।” রহমতে আলমের কণ্ঠে ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আনন্দে প্রায় দুই হাজার লোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয়। ক্ষমার মাধ্যমে তিনি মানবতার সেবা করেছেন। তলোয়ারের মাধ্যমে নয়। নয় প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার মাধ্যমে।

ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার কেন?

ইসলাম শান্তির ধর্ম। অশান্ত বিশ্বে শান্তির শ্বেত কপোত ওড়াতেই ইসলামের অভ্যুদয়। ইসলামের অনুসারীরা সর্বত্রই সমাজের কাছে শান্তি, শৃঙ্খলা, মান-মর্যাদা ও সংহতির প্রতীক। মুসলমানরা বিশেষত আলেম-ওলামাগণ সমাজে যে “গুডউইল” সৃষ্টি করেছে একশ্রেনীর হিংসুটে মানুষের কাছে তা গাত্রদাহ সৃষ্টি করেছে। তাই একটি কুচক্রীমহল ইসলামের নামে কালিমা লেপন করতে গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। যার অংশ হিসেবে ইসলামী বেশভূষাধারী কিছু লোক দিয়ে সাম্প্রতিক কালে বোমা হামলা, অশ্লীলতা ও জঙ্গী কর্মকা- চালানো হয়েছে। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে অদ্যাবধি বিজ্ঞ ওলামায়ে কিরাম , পীর মাশায়েখ এ ধরনের কোনো বিধ্বংসী কাজে কখনোই সায় দেয়নি। হঠাৎ করে এ ধরনের বক ধার্মিক ইসলামী চেতনার নামে যা করে যাচ্ছে তা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে কৌতুহল সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতপক্ষে এসব কিছুর পরিকল্পনা এসেছে বিধর্মীদের কাছ থেকে। তারা মীর জাফর শ্রেণীর কিছু দাড়ি টুপি ওয়ালাদের হাতে বোমা ও সন্ত্রাসী কার্মকা- তুলে দিয়ে তাদের ক্রীড়নকের ভূমিকা পালন করিয়েছে। এসব কর্মকা-ের পর নিজেরাই বিজ্ঞাপন বিলি করে স্বীকৃতির মাধ্যমে নাটকীয়ভাবে ধরা দিয়ে আপন উদ্দেশ্যে তারা অনেকটা সফলও হয়েছে। এদেরই ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতিতে আজ আলেম সমাজ ও ইসলামের প্রতি মানুষের একটা চরম বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। বিনা তদন্তেই ইসলাম ধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে। মুসলমানদেরকে উগ্র মৌলবাদী আর সন্ত্রাসী বলে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। পরিকল্পিত ভাবে জিহাদের কথা উচ্চারণ করে কলঙ্কিত করা হচ্ছে জিহাদের পবিত্র বিধানকে। আর এসবই একদিন মুসলমানদেরকে হত্যার ইস্যুতে পরিণত করতে পারে।

অনেক স্থানে সিনেমার টিকেটে ‘বিসমিল্লাহ’ লেখা হয়। কোথাও যাত্রা, মেলার ঘোষণা, ‘বিসমিল্লাহ’ দিয়ে আরম্ভ হয়। কয়েক বছর পূর্বে কুকুরের মাথায় টুপি ও মুখে দাড়ি দিয়ে উপহাসমূলক ছবি ছাপানো হয়েছিল। এ সবই হল ইসলাম ও আলেম ওলামাদেরকে অবমাননা ও হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে। আর একই উদ্দেশ্যে নবাব সিরাজ উদ দৌলার বিশ্বাস ঘাতক সেনাপতি মীর জাফরের উত্তরসূরীরা দাড়িটুপি পরে ইসলাম কে কলুষিত ও ওলামাদের কে ষড়যন্ত্রের বিষোদগার বানানোর চক্রান্ত শুরু করেছে। একটি হাদীস এ পরিসরে উল্লেখ করা জরুরী মনে হচ্ছে, জনৈক ব্যক্তি সা’দ (রা.)কে জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহ তায়ালা কি বলেন নি যে, “ তোমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যতক্ষণ না ফিতনা ফাসাদ দূরীভূত হয় এবং দ্বীন আল্লাহর জন্য হয়।” তখন তিনি বললেন , আমরা লড়াই করেছি যতক্ষণ না ফিতনা ফাসাদ নির্মূল হয়েছে; আর তুমি ও তোমার সাথীগণ লড়াই করতে চাও ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টির জন্য।” (দুররে মনসূর ২/৩১৭, বুখারী শরীফে ইবনে উমর (রা.) থেকেও এমন একটি উক্তি আছে। হা.নং ৪৫৯৩ ও ৪৬৫০)

এতে বুঝা যায় যে, কুরআন-সুন্নাহর সার্বিক নির্দেশনা ও আমীরের আনুগত্য ছাড়া , মনগড়া রাজত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইন হাতে তুলে নেয়া এবং স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানে জিহাদ ও ক্বিতালের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ফাসাদ ও সন্ত্রাসের অন্তর্ভূক্ত, এ সবই জিহাদের নামে জিহাদকে কলুষিত করা ও ইসলামকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র মাত্র। প্রতিটি মুসলমানকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। বোমাবাজ, সন্ত্রাসী, জঙ্গী ও পরস্পর অশ্লীল আচরণকারীদের সমস্ত চক্রান্ত থেকে ইসলাম ও মুসলমানদেরকে রক্ষায় সবাইকে নিবেদিত হতে হবে। আল্লাহ পাক সন্ত্রাসীদেরকে হেদায়েত দিন। তাদেরকে সঠিক বুঝ দিন। ইসলাম ও মুসলমানদেরকে তাদের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত থেকে হেফাজত করুন।

আরও জানুন

রাশদান আল-জুহানী সাহাবীর পরিচয়

প্রশ্নঃ আসসালামু আলাইকুম, রাশদান আল জুহানি ( Rashdan Al juhani)  সাহাবীর জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস