প্রচ্ছদ / আদব ও আখলাক / মুসলিম উম্মাহের প্রতি রাবেতা আলমে ইসলামীর বার্তা

মুসলিম উম্মাহের প্রতি রাবেতা আলমে ইসলামীর বার্তা

ভূমিকা :

গত শাওয়াল ১৪৪০ হিজরীতে এ বিষয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু কখন কীভাবে যে বছর পার হয়ে যায়! এখন তো শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী অতিবাহিত হয়ে যিলকদ ১৪৪১ হিজরীও শেষ হতে চলেছে!! গত রমাযানুল মুবারক ১৪৪০ হিজরীর শেষে রাবেতা আলমে ইসলামীর পক্ষ থেকে মক্কা মুকাররমায় ‘কিয়ামুল ওয়াসাতিয়্যাহ ওয়াল ইতিদাল ফী নুসূসিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ’ তথা ‘কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধ’ শিরোনামে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে উপস্থিত সদস্যবর্গের পক্ষ থেকে ‘ওয়াছীকাতু মাক্কাতাল মুকাররামা’ বা ‘মক্কা সনদ’ নামে ২৯টি ধারা সম্বলিত একটি প্রজ্ঞাপন জারি হয়। আর এই সনদকে জুড়ে দেওয়া হয়- ‘ওয়াছীকাতুল মাদীনা মুনাওয়ারা’ তথা ‘মদীনা সনদ’-এর সাথে। বলা হয় যে, এটি নাকি সেই ‘মদীনা সনদ’-এর আলোকেই প্রস্তুতকৃত!

১৩৮১ হিজরী মোতাবেক ১৯৬২ ঈসাব্দতে হজে¦র মৌসুমে গোটা বিশ্বের ইসলামী ব্যক্তিত্ববর্গের উপস্থিতিতে মক্কা মুকাররমায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রাবেতা আলমে ইসলামী’ বা ‘ওয়ার্ল্ড মুসলিম লীগ’। এর উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের সামনে দ্বীন-ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেয়া, ইসলামের উপর আরোপিত আপত্তিসমূহের জনসাধারণের বোধগম্য ভাষায় জবাব দেয়া, বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের সংকট নিরসনে এগিয়ে আসা। রাবেতা চায়- উম্মতে মুসলিমা যেন কিতাব ও সুন্নাহ্র পাবন্দ হয়ে যায়। ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সকল স্তরে যেন শরীয়তে ইসলামিয়া যথাযথ বাস্তবায়িত হয়।

রাবেতার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন রয়েছে। তন্মধ্যে ‘আল মাজমাউল ফিকহী’ তথা ‘ফিকহ একাডেমি’ (মাজমা মক্কা) সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৩৮৪ হিজরীতে তা প্রতিষ্ঠা হয়। ইসলামী শরীয়ার বিধি-বিধান এবং নিত্যনতুন বিষয়াবলির ক্ষেত্রে শরীয়তের সমাধান স্পষ্ট করা এবং এর ব্যাখ্যা প্রদান করা একাডেমির একটি উল্লেখযোগ্য প্রশংসনীয় দিক। মাশাআল্লাহ, রাবেতার মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় কাজ সামনে এসেছে।১  কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আজ রাবেতার কুরসী এমন এক ব্যক্তি দখল করে রেখেছে, মনে হয় তিনি পশ্চিমা চিন্তা-চেতনা দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত। তাই দেখা যায়, তিনি ওদের মস্তিষ্কে চিন্তা করেন এবং ওদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলেন। ‘কিয়ামুল ওয়াসাতিয়্যাহ ওয়াল ইতিদাল’ শিরোনামের সম্মেলন এবং ‘মক্কা সনদ’ মূলত এরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

ইসলাম একমাত্র সত্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। এর শিক্ষাসমূহ বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্য এবং সর্ব প্রকার প্রান্তিকতামুক্ত ন্যায়-নিষ্ঠার উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে ইসলামের মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধ তো সেই মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধ, যা মানবের স্রষ্টা শরীয়তদাতা স্বয়ং রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং তাঁর আখেরী নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ব্যাখ্যাকৃত এবং বাস্তবায়িত। এ তো সেই মধ্যপন্থা নয়, ওহীর নূর থেকে বঞ্চিতরা যাকে মধ্যপন্থা বলে। আর ওই মধ্যপন্থাও নয়- পশ্চিমা-চিন্তাধারায় প্রভাবিত প্রাচ্যের চিন্তাবিদরা ওদের সুরে সুর মিলিয়ে যাকে মধ্যপন্থা বলে। ইসলামের মধ্যপন্থার প্রথম কথাই হচ্ছে ‘শাহাদাত বিল হক্ব’- সত্যের সাক্ষ্য প্রদান। যেখানে এই উম্মতকে ‘উম্মতে ওয়াসাত’-মধ্যপন্থী উম্মত বলা হয়েছে সেখানে এই শাহাদাতের বৈশিষ্ট্যের বিবরণও এসেছে। ইরশাদ হয়েছে-

وَ كَذٰلِكَ جَعَلْنٰكُمْ اُمَّةً وَّسَطًا لِّتَكُوْنُوْا شُهَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَ یَكُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْكُمْ شَهِیْدًا.

(হে মুসলিমগণ!) এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা অন্যান্য লোক সম্পর্কে সাক্ষী হও এবং রাসূল হন তোমাদের পক্ষে সাক্ষী। -সূরা বাকারা (২) : ১৪৩

যেখানে ‘উম্মতে ওয়াসাতের’ সমর্থ শব্দে এই উম্মতকে ‘খাইরে উম্মত’ বলা হয়েছে সেখানে তাদের বৈশিষ্ট্য বিবৃত হয়েছে- ‘আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকার’। ইরশাদ হয়েছে-

كُنْتُمْ خَیْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَ تَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَ تُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ.

তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত! মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান কর, অসৎকার্য হতে নিষেধ কর এবং আল্লাহ্র প্রতি ঈমান রাখ। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১১০

ভারি আশ্চর্যের কথা, মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যের নামে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল বটে, তবে সেখানে ঘোষিত প্রস্তাবনায় না শরীয়তে ইসলামিয়ার কথা আছে, যা মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যের একমাত্র সুসংহত ও সুরক্ষিত ইলাহী শরীয়ত, আর না রয়েছে ‘আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকার’-এর বিন্দুমাত্র ইশারা।

ঘোষিত সুপারিশমালায়, যাকে ‘মক্কা সনদ’ নাম দেওয়া হয়েছে এবং ঐতিহাসিক ‘মদীনা সনদ’-এর সাথে মেলানো হয়েছে, তাতে ইসলামের তালীম নেই; রয়েছে পশ্চিমা দর্শনের তরজুমানী। এতে পশ্চিমাদের গলায় গলা মিলিয়ে তো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে খুব বলা হয়েছে, কিন্তু এ ব্যাপারে টু শব্দটিও করা হয়নি, যারা সন্ত্রাস মোকাবেলার নামে দুনিয়াব্যাপী হত্যা লুণ্ঠন ও সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালিয়ে বেড়াচ্ছে- তাদের ও তাদের দোসরদের কী বিধান হবে। তাদেরও বা কী বিধান হবে, যারা অস্পষ্ট শব্দ ও গোঁজামিল দিয়ে ইসলাম ও শরীয়তে ইসলামের উপর ওদের চিন্তা-দর্শন আরোপ করে যাচ্ছে।

কোনো সন্দেহ নেই, এই প্রস্তাবনাকে ‘মক্কা সনদ’ নাম দেওয়া এবং ‘মদীনা সনদ’-এর সাথে তুলনা করা হারামাইন শরীফাইনের আদব পরিপন্থী। ‘মদীনা সনদ’-এ জিহাদ ও কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ্র কথা আছে। ‘মদীনা সনদ’-এ সেক্যুলার রাজত্ব নয়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানের রাজত্বের উল্লেখ আছে। এ সুপারিশ যদি বাস্তবেই মক্কা সনদ হত এবং প্রকৃত অর্থেই মদীনা সনদের প্রতিচ্ছায়া হত তাহলে তাতে এ আহŸান অবশ্যই থাকত- মুসলিম শাসকবর্গ সকলে নিজেদের শাসনকার্য কুরআন-সুন্নাহ এবং ইসলামী শরীয়া মোতাবেক বানিয়ে নিন। আল্লাহ্র যমীনে আল্লাহ্র বিধান কার্যকর করুন। আল্লাহ্র হুকুম মোতাবেক আল্লাহ্র মাখলুকদের পরিচালনা করুন। সুপারিশে একথাও থাকত- বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠার আহŸান এবং বিধান একমাত্র ইসলামের নিকটেই রয়েছে। অতএব সন্ত্রাস দমনের অধিকার রয়েছে একমাত্র ইসলামেরই। তাই সময়ের অনিবার্য দাবি হল, মুসলিম শাসকবর্গ একসাথ হয়ে সন্ত্রাস মোকাবেলার নামে যারা হত্যা লুণ্ঠন ও সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঝাÐা বুলন্দ করা। ইসলামী জিহাদই একমাত্র বিষয়, যা সর্ব প্রকার ত্রাস-ফাসাদ ও জুলুম নিগ্রহ দূর করতে পারে। এই ইলাহী নির্দেশনার সম্বোধিত পাত্র এবং তা কার্যকর করার যিম্মাদার তো মুসলিম শাসকেরাই।

বস্তুত রাবেতা আলমে ইসলামী গোটা উম্মতে মুসলিমা ও মুসলিম শাসকবর্গের প্রতি এ আহ্বান পেশ করেছে যে, সবাই যেন কুরআন-সুন্নাহ ও ইসলামী শরীয়ার অনুশাসন মেনে চলে এবং রাষ্ট্রপ্রধানরা যেন ইসলামী হুকুমত কায়েম করেন। রাবেতা এ আহ্বানও পেশ করেছে যে, জিহাদ ও সন্ত্রাসের মাঝে যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে তা যেন বিশ্ববাসী যথাযথ অনুধাবন করে। আর তা-ই হচ্ছে রাবেতার মনের কথা, প্রকৃত বার্তা। আজকালের এ কথাগুলো রাবেতার উপর চাপিয়ে দেওয়া কথা, রাবেতার নিজের কথা নয়। রাবেতার কথা তো তাই, যা রাবেতার অঙ্গ সংগঠন ‘ফিক্হ একাডেমি’র সুপারিশমালায় ছেপে এসেছে। এ মুহূর্তে পাঠকবর্গের খেদমতে আমরা দুটি লেখা পেশ করছি-

ক. মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি রাবেতার আহ্বান।

খ. মুসলিম বিশ্বের প্রতি কিছু প্রস্তাবনা।

আল্লাহ তাআলা এই সুস্পষ্ট নির্দেশনাগুলোর উপর মুসলিম শাসকবর্গের এবং সকল মুসলমানদের আমল করার তাওফীক দান করুন- আমীন।

-বান্দা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক

মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি রাবেতার আহ্বান

বর্তমানে আরব ভূখРএবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলো এক দুঃসহ মুহূর্ত অতিক্রম করছে। সম্মান ও সাফল্যের উপায় অবলম্বন থেকে তারা আজ বঞ্চিত। তাদের দুর্বিষহ জীবনের যে মর্মন্তুদ চিত্র তা গভীরভাবে উপলব্ধি করছে ফিকহ একাডেমির এ মজলিস। পক্ষান্তরে শরৗয়া আইন বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে তাদের উপেক্ষা ও পশ্চাদগামিতা, দ্বীন-শরীয়ার শিক্ষা ও চর্চার ক্ষেত্রে ঔদাসীন্য; উপরন্তু আমদানিকৃত এমন আইনের সামনে আত্মসমর্পণ, যার ব্যাপারে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কোনো দলীল নেই- তাদের এ আচরণগুলোও মজলিস নিবিড়ভাবে পরখ করেছে। এ নিমিত্তে মজলিস এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, আরব রাষ্ট্রপ্রধান এবং মুসলিম শাসকবর্গ সমীপে পত্র প্রেরণ করবে। তাতে জোর আবেদন থাকবে- আপনারা শরীয়া আইন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসুন। হৃদয়-গভীর থেকে তা গ্রহণ করে নিন। তাহলে এতে আপনাদের পার্থিব সম্মান ও পরকালীন সাফল্য নিশ্চিত হবে। শান্তি ও নিরাপত্তা অর্জিত হবে। এমনকি শরীয়ত থেকে বিমুখ হওয়ার দরুন যে দুর্দশা জেঁকে বসেছে তা থেকে পরিত্রাণ লাভ হবে।

 

মুসলিম নেতৃবৃন্দ, শাসকবর্গ এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতি ইসলামী ফিক্হ একাডেমি-এর আহŸান : ইসলামী শরীয়া আইন বাস্তবায়ন করুন

 

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু

এ মর্মে অবগতি পেশ করা যাচ্ছে যে, গত ২৬, ০৪, ১৩৯৯ হিজরী সনে পবিত্র নগরী মক্কা মুকাররমায় ইসলামী ফিকহ একাডেমি-এর দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে গৃহীত সিদ্ধান্তবলির একটি হল-

আরব রাষ্ট্রপ্রধান এবং মুসলিম শাসকবর্গের নিকট স্মারকলিপি পেশ করা হবে। তাতে এ বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে যে, পার্থিব সম্মান ও সাফল্য এবং পরকালীন মুক্তি ও সৌভাগ্য কেবল আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়তের মাঝেই নিহিত; যা পূর্ণাঙ্গ এবং চিরস্থায়ী। যে তা মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং তার রীতিনীতি অনুযায়ী পরিচালিত হবে ইসলামী শরীয়ত তার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের সাফল্য ও মুক্তির নিশ্চয়তা প্রদান করে।

একথা তো স্বতঃসিদ্ধ যে, আল্লাহ তাআলা এই শরীয়তে ইসলামী নাযিল করেছেন তাঁর নবী হযরত মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর। শাসক হোক কিংবা শাসিত, সকল মুসলমানের জন্য তা মনেপ্রাণে গ্রহণ করা এবং বাস্তব জীবনে তা বাস্তবায়ন করা তিনি আবশ্যক করে দিয়েছেন। এর ভিত্তিতেই তিনি তাদেরকে প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন পার্থিব সাহায্যের এবং পরকালীন সাফল্যের। পক্ষান্তরে শরীয়তে ইসলামীকে মনেপ্রাণে গ্রহণের ব্যাপারে ঔদাসীন্য ও পৃষ্ঠ প্রদর্শন এবং বাস্তবজীবনে এর প্রতিফলনের ব্যাপারে নির্লিপ্ততা যে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে সে বিষয়ে তিনি সাবধান করেছেন। আর এ কারণে দুনিয়া-আখেরাতে যে খেসারত রয়েছে সে ব্যাপারেও হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَفَحُكْمَ الْجَاهِلِیَّةِ یَبْغُوْنَ  وَ مَنْ اَحْسَنُ مِنَ اللهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ یُّوْقِنُوْنَ.

তবে কি তারা জাহিলিয়াতের বিধান চায়? আর বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহ্র চেয়ে উত্তম বিধানদাতা কে আছে? -সূরা মায়েদা (৫) : ৫০

আরো ইরশাদ হয়েছে-

فَلَا وَ رَبِّكَ لَا یُؤْمِنُوْنَ حَتّٰی یُحَكِّمُوْكَ فِیْمَا شَجَرَ بَیْنَهُمْ ثُمَم لَا یَجِدُوْا فِیْۤ اَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَیْتَ وَ یُسَلِّمُوْا تَسْلِیْمًا.

অতএব আপনার রবের কসম, ওরা মুমিন হবে না, যতক্ষণ না ওরা নিজেদের মধ্যে সংঘটিত বিবাদের ক্ষেত্রে আপনাকেই বিচারক বানাবে। অতঃপর আপনার ফয়সালা সম্বন্ধে নিজেদের মনে কোনো সংকীর্ণতা বোধ করবে না এবং (তা) সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেবে। -সূরা নিসা (৪) : ৬৫

আরো ইরশাদ হয়েছে-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ تَنْصُرُوا اللهَ یَنْصُرْكُمْ وَ یُثَبِّتْ اَقْدَامَكُمْ.

হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের কদম দৃঢ় করে দেবেন। -সূরা মুহাম্মাদ (৪৭) : ৬

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন-

وَلَیَنْصُرَنَّ اللهُ مَنْ یَّنْصُرُهٗ،  اِنَّ اللهَ لَقَوِیٌّ عَزِیْزٌ، اَلَّذِیْنَ اِنْ مَّكَّنّٰهُمْ فِی الْاَرْضِ اَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَ اٰتَوُا الزَّكٰوةَ وَ اَمَرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَ نَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ، وَ لِلهِ عَاقِبَةُ الْاُمُوْرِ.

আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করবেন, যে তাঁকে সাহায্য করবে; নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী। (তারা এমন যে) আমি যদি তাদের পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং সৎকর্মের নির্দেশ দেবে ও অসৎকার্য থেকে নিষেধ করবে। আর সবকিছুর পরিণাম আল্লাহ্রই এখতিয়ারে। -সূরা হজ্ব (২২) : ৪০-৪১

আরো ইরশাদ হয়েছে-

وَ مَنْ اَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِیْ فَاِنَّ لَهٗ مَعِیْشَةً ضَنْكًا وَّنَحْشُرُهٗ یَوْمَ الْقِیٰمَةِ اَعْمٰی، قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِیْۤ اَعْمٰی وَ قَدْ كُنْتُ بَصِیْرًا، قَالَ كَذٰلِكَ اَتَتْكَ اٰیٰتُنَا فَنَسِیْتَهَا،  وَ كَذٰلِكَ الْیَوْمَ تُنْسٰی.

আর যে ব্যক্তি আমার ‘যিকির’ (বিধান) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য রয়েছে সংকীর্ণ জীবন। আর কিয়ামতের দিন আমি ওকে ওঠাব অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার রব! তুমি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালে কেন? অথচ আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম! তিনি বলবেন, এভাবেই তোমার নিকট আমার আয়াতসমূহ এসেছিল। কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। আজ সেভাবেই তোমাকেও ভুলে যাওয়া হবে। -সূরা ত্বহা (২০) : ১২৩-১২৬

একথা তো সুস্পষ্ট যে, আল্লাহপ্রদত্ত শরীয়ত আর মানবরচিত আইনের মাঝে পার্থক্য তেমনই, যেমন পার্থক্য ¯্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে। আহকামুল হাকিমীন (মহান শাসক) ও আরহামুর রাহিমীন (মহান দয়াবান) জগদ্বাসীর জন্য হেদায়েত ও রহমতস্বরূপ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যা অবতীর্ণ করেছেন, সেই শরীয়তের সাথে মানব রচিত মতবাদের তুলনা কীভাবে চলতে পারে?!

পবিত্র কা‘বা শরীফের সন্নিকটে মক্কা মুকাররামার পবিত্র অঙ্গনে অনুষ্ঠিত ইসলামী ফিক্হ একাডেমি-এর এ মজলিস আপনাদেরকে আল্লাহ্র দোহাই দিয়ে বলছে- যিনি রাজাধিরাজ, যাকে ইচ্ছা রাজত্ব প্রদান করেন, যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন, যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন, যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন, তাঁর কব্জায় সকল কল্যাণ। তিনি সর্ববিষয়ে শক্তিমান- আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়ত বাস্তবায়নে আপনারা এগিয়ে আসুন। ইসলামী শরীয়তের সুশীতল ছায়ায় আপনারাও শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে থাকবেন এবং আপনাদের প্রজারাও। এ উম্মতের ইতিহাসে পূর্বে  যেমনটি ঘটেছিল। আল্লাহ তাদেরকে শরীয়া বাস্তবায়নের তাওফীক দিয়েছিলেন। ফলে শত্রæর মোকাবেলায় তাদেরকে বিজয়ী করেছেন এবং পার্থিব জীবনে তাদেরকে কীর্তি দান করেছেন। আর পরকালে তিনি তাদের জন্য যা প্রস্তুত রেখেছেন তা তো অনেক উৎকৃষ্ট এবং চিরস্থায়ী।

এ কথা বলতে কোনো সংকোচ নেই, বর্তমানে আরবজাতি এবং মুসলিম সম্প্রদায় শত্রæর সম্মুখে যেভাবে অপদস্থ হচ্ছে তা কেবলই ইসলামী শরীয়া উপেক্ষা করার অনিবার্য ফল।

ইসলামী ফিক্হ একাডেমি-এর এ মজলিস আপনাদের প্রতি জোর আহŸান জানাচ্ছে, আপনারা কল্যাণের পথে ধাবিত হোন এবং সাফল্য ও সৌভাগ্যের উপায়-উপকরণ শক্তভাবে অবলম্বন করুন। আল্লাহ্র তাওফীকে আপনাদের প্রজ্ঞা ও তীক্ষè বুদ্ধিমত্তা প্রবলভাবে এ আশার সঞ্চার করছে যে, এই আহŸানে আপনারা সাড়া দেবেন এবং এই মিনতিকে আপনারা স্বাগত জানাবেন। আল্লাহ তাআলা যেমনটি বলেছেন-

اِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِیْنَ اِذَا دُعُوْۤا اِلَی اللهِ وَ رَسُوْلِهٖ لِیَحْكُمَ بَیْنَهُمْ اَنْ یَّقُوْلُوْا سَمِعْنَا وَ اَطَعْنَا، وَ اُولٰٓىِٕكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ.

ঈমানদারদের যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ডাকা হয়, যাতে রাসূল তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেন, তখন তাদের কথা এই হয় যে, তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। আর তারাই তো সফলকাম। -সূরা নূর (২৪) : ৫১

আল্লাহ তাআলা সকল মুসলমানকে, শাসক শাসিত সবাইকে সে পথে পরিচালিত করুন, যে পথে রয়েছে তাদের সম্মান ও সফলতা এবং শত্রæর মোকাবেলায় রয়েছে বিজয়। তিনি তো বান্দার ডাক শোনেন এবং সে ডাকে সাড়া দেন।

ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

 

-আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন হুমাইদ

চিফ, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, সৌদি আরব

অধিবেশন প্রধান, ইসলামী ফিক্হ একাডেমি

 

 

মুসলিম বিশ্বের প্রতি কিছু প্রস্তাবনা

[রাবেতা আলমে ইসলামী (ওয়ার্ল্ড মুসলিম লীগ)-এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী (ইসলামী ফিক্হ একাডেমি)-এর পক্ষ থেকে মুসলিম বিশ্বের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন ও কিছু প্রস্তাবনা।

১৬তম অধিবেশন।

সময়কাল : ২১-২৬ যিলকদ ১৪২২ হিজরী মোতাবেক ৫-১০ জানুয়ারি ২০০২ ঈসাব্দ

স্থান : মক্কা মুকাররমাহ]

 

আলহামদু লিল্লাহ, ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ।

পৃথিবীর পবিত্রতম স্থান মক্কা মুকাররমায় আয়োজিত আজকের এই মজলিসে রাবেতা আলমে ইসলামীর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইসলামী ফিকহ একাডেমির সদস্যবৃন্দ উপস্থিত রয়েছেন। বর্তমান বিশ্বে ইসলামের উপর যেসকল অবান্তর আপত্তি ও অন্যায় অভিযোগ আরোপ করা হচ্ছে তাতে তারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, শঙ্কিত এবং বিচলিত। এক্ষেত্রে জোটবদ্ধভাবে প্রচারাভিযানে অবতীর্ণ হয়েছে আগ্রাসী মিডিয়াগুলো। যারা ইসলাম ও মুসলমানকে এবং মুসলিম অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকাকে বিশেষত সৌদি আরবকে বিষাক্ত তীরের নিশানা বানিয়েছে।…

একডেমির সদস্যবৃন্দ লক্ষ করেছেন- এসকল মিডিয়া তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। অর্থাৎ ইহুদীবাদী সংবাদসংস্থাগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের প্রচারণায় ইসলামের বিরুদ্ধে উপর্যুুপরি মিথ্যাচার অব্যাহত রেখেছে। উদ্দেশ্য কেবল মুসলমানদের প্রতি দ্বেষ, ঘৃণা ও বিরাগ ছড়িয়ে দেওয়া এবং সর্বশেষ আসমানী ধর্মকে অন্যায় আপত্তি ও অবান্তর অভিযোগে জর্জরিত করা। এই প্রোপাগান্ডার শীর্ষ তালিকায় রয়েছে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের অপবাদ।

একাডেমির সদস্যবৃন্দের নিকট এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, মিডিয়াগুলো একমাত্র ইসলামকে সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত করার যে প্রয়াস তা কেবল মানুষকে ইসলামের প্রতি বিতৃষ্ণ করার অপকৌশল মাত্র। কেননা তারা লক্ষ করেছে, মানুষ ক্রমাগত ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে এবং দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করছে। তাই একাডেমির সদস্যবৃন্দ রাবেতা আলমে ইসলামী এবং অন্যান্য ইসলামী সংস্থাকে এমনকি সকল মুসলমানকে উপযুক্ত মাধ্যম অবলম্বন করে এবং এর গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে ইসলামকে এই আগ্রাসন থেকে হেফাজত করার আহ্বান জানাচ্ছেন।

ইসলামের বিরুদ্ধে অন্যায় অভিযোগ এবং সন্ত্রাসবাদকে ইসলামের সাথে সেঁটে দেওয়ার প্রতিবাদে তারা এ বিষয়টা স্পষ্ট করেছেন যে, বিশ্বব্যাপী যে সন্ত্রাসের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে তা কোনো ধর্ম বা গোষ্ঠীর সাথে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা উগ্রবাদী মানসিকতা থেকে সৃষ্ট আচরণের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বর্তমান পৃথিবীর কোনো সমাজই হয়ত এ থেকে মুক্ত নয়?

তারা আরো দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চান, সকল উগ্রবাদ এক নয়, এর মাঝে শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। কোনোটি রাজনৈতিক উগ্রবাদ, কোনোটি চিন্তাগত উগ্রবাদ আবার কোনোটি ধর্মীয় উগ্রবাদ। আর কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের উপর ঢালাওভাবে ধর্মীয় উগ্রতা ও অতিরঞ্জনের অভিযোগ আরোপ করা আদৌ সমীচীন নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে আহলে কিতাবের ধর্মীয় বাড়াবাড়ির কথা উল্লেখ করেছেন এবং এ থেকে তাদেরকে বারণ করেছেন। তিনি বলেন-

قُلْ یٰۤاَهْلَ الْكِتٰبِ لَا تَغْلُوْا فِیْ دِیْنِكُمْ غَیْرَ الْحَقِّ وَ لَا تَتَّبِعُوْۤا اَهْوَآءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوْا مِنْ قَبْلُ وَ اَضَلُّوْا كَثِیْرًا وَّ ضَلُّوْا عَنْ سَوَآءِ السَّبِیْلِ.

(হে নবী) আপনি বলে দিন, হে কিতাবীরা! তেমরা তোমাদের ধর্মের বিষয়ে অন্যায় বাড়াবাড়ি করো না এবং এমন লোকদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, যারা পূর্বেই পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে এবং অপর বহু লোককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। -সূরা মায়েদা (৫) : ৭৭

২০০১ সনের ৯/১১ -এর পর যেসকল মহল থেকে ইসলামের ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করার অভিযান আরো বেগবান হয়, তাদের প্রতিহতকল্পে একাডেমির সদস্যবৃন্দ এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, এ পরিস্থিতিতে সকল আলেম ও গুণীজন এবং তাদের সভা-সমিতি ও সংগঠনগুলোর কর্তব্য হচ্ছে, ইসলাম ও মুসলমানের সুরক্ষার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং মুসলিম-অমুসলিম সকলকে বাস্তব বিষয় সম্পর্কে সচেতন করা। এ নিমিত্তে একাডেমি সংশ্লিষ্ট কয়েকটি শিরোনাম নির্ধারণ করেছে এবং এক্ষেত্রে শরীয়তে ইসলামীর অবস্থান স্পষ্ট করেছে। আর তা হল :

 

এক. ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তথ্য ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন

ইসলামী ফিকহ একাডেমি ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তথ্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অব্যাহত আগ্রাসন লক্ষ করছে এবং তা মানবসমাজ ও মানবিক নিরাপত্তার জন্য কতটা হুমকি- এ সম্পর্কে সতর্ক করছে। কেননা তারা অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে যা করে যাচ্ছে তা হচ্ছে :

(ক) পশ্চিমা সমাজকে কমিউনিজমের পরিবর্তে ইসলামকে নতুন শত্রæরূপে গ্রহণ করতে প্ররোচিত করা এবং ইসলামের বোধ-বিশ্বাস ও উসূল-আহকাম এবং ঐশী বিধান-নীতি ও নিয়ম-কানুনের উপর চতুর্দিক থেকে সাংস্কৃতিকভাবে হামলে পড়া।

(খ) ক্রুসেডের শ্লোগানে পশ্চিমাদেরকে উস্কে দেওয়া এবং ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমের প্রাধান্য বিস্তারে তাদেরকে ক্ষেপিয়ে তোলা।

(গ) ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত বৈষম্য ও ঘৃণা উস্কে দেওয়া এবং মুসলিম সংখ্যালঘু ও প্রবাসীদেরকে বিভিন্নভাবে কোণঠাসা করে রাখা।

(ঘ) স্যামুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত নীতি ছড়িয়ে দেওয়া।

আর এ ধরনের উন্মত্ত আগ্রাসনের ফলাফল হল- পশ্চিমা দুনিয়ায় মুসলিম জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলা হয়েছে, কতককে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং তাদের মসজিদ ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে হুমকির মুখে নিক্ষেপ করা হয়েছে। এককথায় তাদেরকে এক দুঃসহ ও সঙ্কটপূর্ণ জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

বিনা কারণে মুসলমানদেরকে জ্বালাতন করা এবং তাদের সংস্থাগুলোকে অস্থিতিশীল রাখাকে একাডেমি ঘৃণা করে। আর এর জন্য সে দায়ী করছে ইসলামের উপর নানাবিধ প্রোপাগান্ডা ও অন্যায় মিথ্যাচার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারাভিযানকে।

নিছক ইসলামের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে পশ্চিমে মুসলমানদের সাথে যা ঘটছে তা দেখা সত্তে¡ও একাডেমি একথা স্মরণ করিয়ে দিতে চায়- মুসলিম ও অমুসলিমের পারস্পরিক কল্যাণ ও স্বার্থ রক্ষা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার সৎসাহস যুগিয়ে থাকে ইসলাম। পবিত্র কালামে মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন-

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اِنَّا خَلَقْنٰكُمْ مِّنْ ذَكَرٍ وَّ اُنْثٰی وَ جَعَلْنٰكُمْ شُعُوْبًا وَّ قَبَآىِٕلَ لِتَعَارَفُوْا اِنَّ اَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ اَتْقٰىكُمْ  اِنَّ اللهَ عَلِیْمٌ خَبِیْرٌ.

হে মানবসম্প্রদায়! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্র নিকট তোমাদের সে-ই অধিক মর্যাদাবান, যে সর্বাপেক্ষা অধিক মুত্তাকী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত। -সূরা হুজুরাত (৪৯) : ১৩

একাডেমি গোটা মানবসমাজকে উদ্দেশ্য করে দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা করছে-

ইসলাম গোটা মানবসভ্যতার জন্য সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে পয়গাম। যেমনটি আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

وَ مَاۤ اَرْسَلْنٰكَ اِلَّا كَآفَّةً لِّلنَّاسِ بَشِیْرًا وَّ نَذِیْرًا وَّ لٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا یَعْلَمُوْنَ.

আমি তো আপনাকে গোটা মানব সম্প্রদায়ের জন্যই প্রেরণ করেছি সুসংবাদ প্রদানকারী ও সতর্ককারী হিসাবে। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা বুঝছে না। -সূরা সাবা (৩৪) : ২৮

ইসলাম পূর্ববর্তী সকল আসমানী ধর্মকে স্বীকার করে এবং পূর্ববর্তী সকল নবীদের প্রতি ঈমান স্থাপন করাকে ধর্ম ও বিশ্বাসের মূল অংশ সাব্যস্ত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اٰمَنَ الرَّسُوْلُ بِمَاۤ اُنْزِلَ اِلَیْهِ مِنْ رَّبِّهٖ وَ الْمُؤْمِنُوْنَ كُلٌّ اٰمَنَ بِاللهِ وَ مَلٰٓىِٕكَتِهٖ وَ كُتُبِهٖ وَ رُسُلِهٖ لَا نُفَرِّقُ بَیْنَ اَحَدٍ مِّنْ رُّسُلِهٖ وَ قَالُوْا سَمِعْنَا وَ اَطَعْنَا  غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَ اِلَیْكَ الْمَصِیْرُ.

রাসূল (অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই বিষয়ের প্রতি ঈমান এনেছেন, যা তার উপর তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে এবং (তার সাথে) মুমিনগণও। তারা সকলে আল্লাহ্র প্রতি, তাঁর ফিরিশতাগণের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছে। (তারা বলে,) আমরা তাঁর রাসূলগণের মাঝে কারো ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করি না  (যে- কারো প্রতি ঈমান আনব আর কারো প্রতি ঈমান আনব না।) এবং তারা (আরো) বলে, আমরা (আল্লাহ ও রাসূলের বিধানসমূহ মনোযোগ দিয়ে) শুনেছি এবং তা খুশিমনে মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আমরা আপনার মাগফিরাতের ভিখারী আর আপনার কাছেই তো আমাদের ফিরে যেতে হবে। -সূরা বাকারাহ (২) : ২৮৫

ইসলামের বার্তা তার সৌন্দর্যমÐিত শিক্ষা এবং ব্যাপক ও বিস্তৃত বিধি-বিধানের মাধ্যমে জীবন ও ধর্মের মাঝে নিগূঢ় সম্পর্ক প্রতিস্থাপনের কৃতিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব এককভাবে অর্জন করেছে।

 

দুই. মানবজাতিকে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান

ইসলাম মানবজাতিকে যে সম্মানের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করেছে তা তো আল্লাহ তাআলার বাণী থেকেই স্পষ্ট। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ لَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِیْۤ اٰدَمَ وَ حَمَلْنٰهُمْ فِی الْبَرِّ وَ الْبَحْرِ وَ رَزَقْنٰهُمْ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَ فَضَّلْنٰهُمْ عَلٰی كَثِیْرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِیْلًا.

প্রকৃতপক্ষে আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি এবং স্থলে ও জলে তাদের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করেছি, তাদেরকে উৎকৃষ্ট ও পরিচ্ছন্ন বস্তু থেকে রিযিক দিয়েছি এবং তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি এমন অনেকের উপর, যাদের আমি সৃষ্টি করেছি। -সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ৭০

আর আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য যেসকল বিধি-বিধান ও হুকুম-আহকাম নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেগুলো দুনিয়া ও আখেরাতে তথা ইহকাল ও পরকালে তার সম্মানজনক জীবনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

একাডেমি জগদ্বাসীর সামনে দৃঢ়ভাবে বলতে চায়- মানুষের প্রকৃত সম্মান ইসলাম নির্ধারিত পন্থার মাঝেই নিহিত। এর মাধ্যমে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হয়। আর মানবসভ্যতার উৎকর্ষ, উন্নতি ও অগ্রগতি এবং শান্তি, নিরাপত্তা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য চাই সুসংহত নীতিমালা ও আদর্শের নেতৃত্ব, যার সূচনাতে রয়েছে ইনসাফ এবং একে অপরের প্রতি সম্মানবোধ। আর তা হবে সেই আলোকে, যে আলো দিয়েছে আসমানী কিতাব এবং সেই আদর্শে, যে আদর্শে প্রেরিত হয়েছেন আম্বিয়া কেরাম আলাইহিমুস সালাম। বিশেষ করে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি প্রেরিত হয়েছেন গোটা জগদ্বাসীর জন্যে রহমত হয়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ مَاۤ اَرْسَلْنٰكَ اِلَّا رَحْمَةً لِّلْعٰلَمِیْنَ.

নিশ্চয় আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতরূপে পাঠিয়েছি। -সূরা আম্বিয়া (২১) : ১০৭

একাডেমি একথা ঘোষণা করতে চায়-

ইসলাম মানুষকে প্রকৃত সম্মান প্রদান করেছে। এর দাবি হল, সে তাকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং তার জান-মালের নিরাপত্তা দিয়েছে। মুসলিমসমাজে অমুসলিম ব্যক্তিকে নিরাপদ বলেছে ইসলাম। নবীজীর আদর্শ অনুযায়ী-

له ما لنا وعليه ما علينا.

অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অধিকার আমরা যতটুকু ভোগ করব তারাও ততটুকু ভোগ করবে (এর কম নয়)। এবং সামাজিক স্বার্থে আমরা যতটুকু মূল্য বা খেসারত দিব তারাও ততটুকু দিবে (এর বেশি নয়)। নবীজীর আদর্শ এমনটাই- গোটা উম্মতে মুসলিমা যা মানতে বাধ্য।

 

তিন. ইসলাম ও সন্ত্রাস

ইসলামী ফিক্হ একাডেমি জোরালোভাবে ঘোষণা করছে-

ইসলামে উগ্রতা, সহিংসতা এবং সন্ত্রাসের বিন্দুমাত্র ঠাঁই নেই। এগুলো এতটা জঘন্য কর্ম, যার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। কেননা তাতে রয়েছে মানুষের উপর অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি। যে কেউ ইসলামী শরীয়তের মূল উৎস, কিতাবুল্লাহ এবং সুন্নাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘেঁটে দেখতে পারেন। উগ্রতা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের কোনোকিছু তাতে পাবেন না। অর্থাৎ বিনা কারণে অন্যের উপর চড়াও হওয়াকে ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না।

সঙ্গত কারণে এপর্যায়ে একাডেমির সদস্যবৃন্দ সন্ত্রাসের সংজ্ঞা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছেন। অর্থাৎ সন্ত্রাস বলতে ইসলাম কী বুঝায় এবং এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ্র দর্শন ও ভাবনা কী? এই বাস্তবতা উন্মোচনের জন্য এবং ইসলাম এবং সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের মাঝে যোগসূত্র স্থাপনের ভয়াবহতা প্রকাশের জন্য ইসলামী ফিকহ একাডেমি মুসলিম উম্মাহ এবং গোটা বিশে^র সামনে সন্ত্রাসের উপযুক্ত সংজ্ঞা পেশ করছে এবং এক্ষেত্রে ইসলামের আদর্শ ও অবস্থান স্পষ্ট করছে।

 

সন্ত্রাসবাদ কী?

সন্ত্রাসবাদ হচ্ছে, অন্যায়ভাবে কারো উপর ভীতি সঞ্চার করার প্রচেষ্টা। আর এ প্রচেষ্টায় যেভাবে কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে তেমনি জড়িত থাকতে পারে কোনো দল বা গোষ্ঠী, এমনকি কোনো রাষ্ট্র বা সংঘবদ্ধ রষ্ট্রীয় শক্তি। আর ত্রাস চলতে পারে কারো ধর্ম-দর্শনের উপর, চিন্তা-চেতনার উপর, জান-মালের উপর, নীতি ও আদর্শের উপর এবং সম্পদ ও সম্ভ্রমের উপর। হুমকি-ধমকি, জুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অবিচার এবং হত্যা-লুণ্ঠন, তেমনিভাবে চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাবি, হানাহানি-রাহাজানি ইত্যাদি যত ধরনের ত্রাস রয়েছে সবই সন্ত্রাসবাদের শামিল। তাই ভীতিসঞ্চারক ও নিষ্ঠুরতামূলক যত কর্ম ও আচরণ রয়েছে, যা মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করে অথবা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে কিংবা তাদের জীবন-জীবিকা, স্বাধিকার, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে হুমকির মুখে ফেলে, তেমনিভাবে যা পরিবেশকে বিষিয়ে তোলে অথবা নির্দিষ্ট কোনো ভ‚খРবা এলাকা কিংবা রাষ্ট্রকে সংকটের মুখে ফেলে, অথবা কোনো রাষ্ট্র বা তার নাগরিকদের সুবিধা কেড়ে নেয় এবং রাষ্ট্রীয় বা প্রাকৃতিক সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ করে, কিংবা তাকে ঝুঁকিতে নিপতিত করে- এ সবগুলোই সন্ত্রাস এবং জমিনে ফাসাদ সৃষ্টির বিভিন্ন অবস্থা মাত্র। চাই এ অপরাধ কোনো ব্যক্তিগত স্কিম থেকে সংঘটিত হোক কিংবা সমষ্টিক কোনো প্রকল্প থেকে।  আল্লাহ তাআলা এ থেকে মুসলমানদেরকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ ابْتَغِ فِیْمَاۤ اٰتٰىكَ اللهُ الدَّارَ الْاٰخِرَةَ وَ لَا تَنْسَ نَصِیْبَكَ مِنَ الدُّنْیَا وَ اَحْسِنْ كَمَاۤ اَحْسَنَ اللهُ اِلَیْكَ وَ لَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِی الْاَرْضِ  اِنَّ اللهَ لَا یُحِبُّ الْمُفْسِدِیْنَ.

আর আল্লাহ তোমাকে যা কিছু দান করেছেন তার মাধ্যমে আখেরাতের নিবাস লাভের চেষ্টা কর এবং দুনিয়া হতেও নিজ হিস্সা অগ্রাহ্য করো না। আল্লাহ যেমন তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন তুমিও (অন্যদের) প্রতি সদয় হও। আর যমিনে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টায় থেকো না। নিশ্চিত জেনে রাখ, আল্লাহ ফাসাদ বিস্তারকারীদের পছন্দ করেন না। -সূরা কাসাস (২৮) : ৭৭

অন্যায়-নিপীড়ন, ত্রাস-আতঙ্ক ও ফাসাদ-বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এবং একে খোদ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে বিবেচনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اِنَّمَا جَزٰٓؤُا الَّذِیْنَ یُحَارِبُوْنَ اللهَ وَ رَسُوْلَهٗ وَ یَسْعَوْنَ فِی الْاَرْضِ فَسَادًا اَنْ یُّقَتَّلُوْۤا اَوْ یُصَلَّبُوْۤا اَوْ تُقَطَّعَ اَیْدِیْهِمْ وَ اَرْجُلُهُمْ مِّنْ خِلَافٍ اَوْ یُنْفَوْا مِنَ الْاَرْضِ  ذٰلِكَ لَهُمْ خِزْیٌ فِی الدُّنْیَا وَ لَهُمْ فِی الْاٰخِرَةِ عَذَابٌ عَظِیْمٌ.

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি এটাই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে বা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে দেওয়া হবে অথবা তাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হবে। এটা তো হল তাদের পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। -সূরা মায়েদা (৫) : ৩৩

শরীয়তে ইসলামী ত্রাসকে সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে মোকাবেলা করার নামান্তর বলে বিবেচনা করেছে এবং এর ভয়াবহতাকে যেভাবে মূল্যায়ন করেছে মানবরচিত কোনো আইনে এর নজির মিলবে না।

একাডেমি স্পষ্টভাষায় বলছে-

সন্ত্রাসের একটি প্রকার হল রাষ্ট্রের সন্ত্রাস। আর এর নিকৃষ্ট ও বিভৎস চিত্র হল ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সন্ত্রাস এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং কসোভোতে সার্বীয়দের সন্ত্রাস।

একাডেমি মনে করে, এ ধরনের জঘন্য সন্ত্রাসবাদ বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। তাই এর মোকাবেলা করাকে একাডেমি আত্মরক্ষা এবং জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ মনে করে।

 

চার. উগ্রতা, সহিংসতা এবং সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে ইসলামের প্রতিবিধান

সন্ত্রাসবাদ প্রতিহত করা এবং এর অনিষ্ট থেকে জাতি ও সমাজকে রক্ষা করার বিষয়ে ইসলাম প্রচলিত সকল বিধানের পূর্বে বিধান দিয়েছে। এই বিধি-বিধানের শীর্ষে রয়েছে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং তার দ্বীন-ধর্ম, বোধ-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রæকে শরীয়ত নির্ধারিত সুস্পষ্ট সীমারেখার মধ্য দিয়ে হেফাজত করা, ইসলাম যা অতিক্রম করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ مَنْ یَّتَعَدَّ حُدُوْدَ اللهِ فَاُولٰٓىِٕكَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ .

আর যারা আল্লাহ্র নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে তারা বড়ই জালিম। -সূরা বাকারা (২) : ২২৯

বস্তুত এ বিধান শুধু মুসলিম উম্মাহ নয়, গোটা মানবজাতির জন্য।

ইসলাম এই সম্মানকে সুনিশ্চিত করার জন্য একজন মানুষকে তার ভাইয়ের উপর অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছে এবং সর্ব প্রকার নিপীড়নমূলক কার্যকলাপকে হারাম করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

قُلْ اِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّیَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَ مَا بَطَنَ وَ الْاِثْمَ وَ الْبَغْیَ بِغَیْرِ الْحَقِّ وَ اَنْ تُشْرِكُوْا بِاللهِ مَا لَمْ یُنَزِّلْ بِهٖ سُلْطٰنًا وَّ اَنْ تَقُوْلُوْا عَلَی اللهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ .

(হে নবী আপনি) বলে দিন, আমার প্রতিপালক তো অশ্লীল কাজসমূহ হারাম করেছেন, তা সে অশ্লীলতা প্রকাশ্য হোক বা গোপন। তাছাড়া সর্বপ্রকার গুনাহ, অন্যায়ভাবে কারও প্রতি সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহ যে সম্পর্কে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, এমন জিনিসকে আল্লাহ্র শরীক করাকেও (হারাম করেছেন)। তাছাড়া এ বিষয়কেও (হারাম করেছেন) যে, তোমরা আল্লাহ্র প্রতি আরোপ করবে এমনসব কথা, যা তোমরা জান না। -সূরা আরাফ (৭) : ৩৩

পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক, যারা মানুষকে কষ্ট দেয় ইসলাম তাদের ধিক্কার জানায়। কেবল মুসলিমসমাজে নির্যাতন হলেই তা ধিকৃত- বিষয়টি আদৌ এমন নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ اِذَا تَوَلّٰی سَعٰی فِی الْاَرْضِ لِیُفْسِدَ فِیْهَا وَ یُهْلِكَ الْحَرْثَ وَ النَّسْلَ  وَ اللهُ لَا یُحِبُّ الْفَسَاد وَ اِذَا قِیْلَ لَهُ اتَّقِ اللهَ اَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْاِثْمِ فَحَسْبُهٗ جَهَنَّمُ  وَ لَبِئْسَ الْمِهَادُ.

আর যখন সে উঠে চলে যায় তখন যমীনে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করে তাতে ফাসাদ-বিশৃঙ্খলা করবে বলে এবং ফসল ও জীবজন্তু বিনাশ করবে বলে। আর আল্লাহ ফাসাদ-অশান্তি সৃষ্টি পছন্দ করেন না। আর যখন তাকে বলা হয়, তুমি আল্লাহকে ভয় কর, তখন অহমিকা তাকে গুনাহে আরো প্ররোচিত করে। সুতরাং এমন ব্যক্তির জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। আর নিশ্চয়ই তা অতি নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল। -সূরা বাকারা (২) : ২০৫, ২০৬

মানুষের মাঝে ফেতনা ও বিশৃঙ্খলা উস্কে দেয়- এমন সকল বিষয় থেকে ইসলাম দূরে থাকার নির্দেশ প্রদান করে এবং এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ اتَّقُوْا فِتْنَةً لَّا تُصِیْبَنَّ الَّذِیْنَ ظَلَمُوْا مِنْكُمْ خَآصَّةً  وَ اعْلَمُوْۤا اَنَّ اللهَ شَدِیْدُ الْعِقَابِ .

তোমরা ঐ আযাবকে ভয় কর, যার বিপর্যয় তোমাদের মধ্য থেকে বিশেষ করে কেবল জালিমদের উপরই আপতিত হবে না। আর জেনে রেখ আল্লাহ্র শাস্তি অতি কঠোর। -সূরা আনফাল (৮) : ২৫

ইসলামধর্মে ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ভারসাম্য রক্ষার শিক্ষা রয়েছে। ইসলাম অপরাধ প্রবণতা ও উগ্রতাকে এবং যে বিষয়গুলো এসব দিকে ধাবিত করে- এমন সকল বিষয়কে, মোটকথা ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনের প্রবণতাকে প্রতিহত করে; বরং উপড়ে দেয়। কেননা এর পরিণতি হচ্ছে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ। ইসলামের নবী বলেন-

إياكم والغلو في الدين فإنما أهلك من كان قبلكم الغلو في الدين.

তোমরা ধর্মের বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা থেকে বেঁচে থাক। কেননা ধর্মের বিষয়ে বাড়াবাড়ি তোমাদের পূর্বের লোকদের ধ্বংস করেছে। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩০২৯; সুনানে কুবরা, নাসাঈ, হাদীস ৪০৪৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩৮৭১

ত্রাস আতঙ্ক ভীতিসঞ্চার এবং অন্যায় রক্তপাত মারামারি হানাহানিসহ সকল অনিষ্ট-প্রবণতার নিরাময় করেছে ইসলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لا يحل لمسلم أن يروع مسلما.

কোনো মুসলমানের জন্য হালাল নয় যে, সে কোনো মুসলমানকে ভয় দেখাবে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৩০৬৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫০০৪; শরহু মুশকিলিল আছার, হাদীস ১৬২৫; আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ১৩৫

নবীজী আরো বলেন-

مَنْ أَشَارَ إِلَى أَخِيهِ بِحَدِيدَةٍ، فَإِنّ الْمَلَائِكَةَ تَلْعَنُهُ، حَتّى يَدَعَهُ وَإِنْ كَانَ أَخَاهُ لِأَبِيهِ وَأُمِّهِ.

যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের দিকে (ঠাট্টা বশত অথবা শুধু ভয় দেখাবার জন্য) অস্ত্র তাক করল, ফেরেশতাগণ তার উপর  অভিশম্পাত করতে থাকেন অস্ত্র নামানো পর্যন্ত। যদিও সে তার আপন ভাই হোক না কেন। (অর্থাৎ আপন ভাইকে তো সে সত্যি সত্যি মারবে না। তারপরও শুধু তার দিকে অস্ত্র তাক করার কারণে এ অভিশাপের কথা বলা হয়েছে।) -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬১৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যিম্মীদের (অর্থাৎ মুসলিম শাসিত ইসলামী ভূখÐে যেসকল অমুসলিম নির্ধারিত কর দিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করে তাদের) সাথে ইনসাফ ও ন্যায়ের আচরণ করতে বলেছেন। তাদের জন্য বিভিন্ন হক সাব্যস্ত করেছেন এবং তাদের জন্য বিভিন্ন নীতি ও বিধান দিয়েছেন। মুসলিম রাষ্ট্রে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছেন। তাদের কেউ ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃত নিহত হলে এর জন্য কাফফারা এবং দিয়ত (জরিমানা ও রক্তপণ) ওয়াজিব করেছেন। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ اِنْ كَانَ مِنْ قَوْمٍۭ بَیْنَكُمْ وَ بَیْنَهُمْ مِّیْثَاقٌ فَدِیَةٌ مُّسَلَّمَةٌ اِلٰۤی اَهْلِهٖ وَ تَحْرِیْرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٍ  فَمَنْ لَّمْ یَجِدْ فَصِیَامُ شَهْرَیْنِ مُتَتَابِعَیْنِ ؗ تَوْبَةً مِّنَ اللهِ  وَ كَانَ اللهُ عَلِیْمًا حَكِیْمًا.

নিহত ব্যক্তি যদি এমন সম্প্রদায়ের লোক হয়, (যারা মুসলিম নয় বটে, কিন্তু) যাদের ও তোমাদের মধ্যে কোনো চুক্তি সম্পাদিত রয়েছে, তবে সেক্ষেত্রেও তার ওয়ারিশদেরকে রক্তপণ দেওয়া ও একজন মুসলিম গোলাম আযাদ করা ফরয। অবশ্য কারও কাছে গোলাম না থাকলে সে অনবরত দুই মাস রোযা রাখবে। এটা তাওবার নিয়ম, যা আল্লাহ স্থির করেছেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। -সূরা নিসা (৪) : ৯২

মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী কোনো অমুসলিম যিম্মীকে হত্যা করা হারাম। হাদীস শরীফে এসেছে-

من قتل معاهدا لم يرح رائحة الجنة، وإن ريحها توجد من مسيرة أربعين عاما.

যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ কোনো অমুসলিমকে (বিনা কারণে) হত্যা করবে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। যদিও জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায় (অর্থাৎ সে জান্নাত থেকে এত দূরে থাকবে)। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৩১৬৬, ৬৯১৪

যদি তারা মুসলমানদের সাথে লড়াই না করে এবং তাদেরকে তাদের ভ‚খРথেকে বের করে না দেয়, তাহলে আল্লাহ তাদের সাথে ‘বির ও এহসান’ তথা সদাচার ও অনুগ্রহের সম্পর্ক বজায় রাখতে নিষেধ করেন  না। আল্লাহ তাআলার বাণী লক্ষ করুন-

لَا یَنْهٰىكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِیْنَ لَمْ یُقَاتِلُوْكُمْ فِی الدِّیْنِ وَ لَمْ یُخْرِجُوْكُمْ مِّنْ دِیَارِكُمْ اَنْ تَبَرُّوْهُمْ وَ تُقْسِطُوْۤا اِلَیْهِمْ  اِنَّ اللهَ یُحِبُّ الْمُقْسِطِیْنَ.

যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করতে ও তাদের প্রতি ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালবাসেন। -সূরা মুমতাহিনা (৬০) : ৮

উপরন্তু যিম্মী (মুসলিম শাসিত অঞ্চলে নিরাপত্তার চুক্তিতে আবদ্ধ অমুসলিম নাগরিক) মুসতা’মিন (যে কাফের মুসলিম দেশের প্রশাসন থেকে নিরাপত্তা নিয়ে সে দেশে অবস্থান করছে) এবং অন্যান্য অমুসলিমদের সাথে ইনসাফপূর্ণ আচরণ করাকে আল্লাহ তাআলা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا كُوْنُوْا قَوّٰمِیْنَ لِلهِ شُهَدَآءَ بِالْقِسْطِ، وَ لَا یَجْرِمَنَّكُمْ شَنَاٰنُ قَوْمٍ عَلٰۤی اَلَّا تَعْدِلُوْا اِعْدِلُوْا هُوَ اَقْرَبُ لِلتَّقْوٰی ؗ وَ اتَّقُوا اللهَ  اِنَّ اللهَ خَبِیْرٌۢ بِمَا تَعْمَلُوْنَ.

হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে ন্যায়  সাক্ষ্যদানে তোমারা অবিচল থাকো; কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে, সুবিচার করো, ইহা তাকওয়ার নিকটতর। তোমার আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবগত। -সূরা মায়েদা (৫) : ৮

এইজন্য একাডেমি জগদ্বাসীর সামনে ঘোষণা করছে-

বিনা অপরাধে অন্যায়ভাবে একটি মানবপ্রাণ হত্যার অপরাধ ইসলামের দৃষ্টিতে এতটা ভয়াবহ, যেন তা গোটা মানবজাতি হত্যার সমতুল্য। চাই কোনো মুসলিমের প্রাণ হরণ করা হোক বা অমুসলিমের। বিষয়টি আল্লাহ তাআলার বাণী থেকে স্পষ্টভাবে বুঝে আসে-

مِنْ اَجْلِ ذٰلِكَ  كَتَبْنَا عَلٰی بَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ اَنَّهٗ مَنْ قَتَلَ نَفْسًۢا بِغَیْرِ نَفْسٍ اَوْ فَسَادٍ فِی الْاَرْضِ فَكَاَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِیْعًا وَ مَنْ اَحْیَاهَا فَكَاَنَّمَاۤ اَحْیَا النَّاسَ جَمِیْعًا وَ لَقَدْ جَآءَتْهُمْ رُسُلُنَا بِالْبَیِّنٰتِ ؗ ثُمَّ اِنَّ كَثِیْرًا مِّنْهُمْ بَعْدَ ذٰلِكَ فِی الْاَرْضِ لَمُسْرِفُوْنَ.

এ কারণেই আমি বনী ইসরাঈলের প্রতি ফরমান লিখে দিয়েছিলাম, কেউ যদি কাউকে হত্যা করে এবং তা অন্য কাউকে হত্যা করার কারণে কিংবা পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তারের কারণে না হয় (অর্থাৎ বিনা অপরাধে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে) তবে সে যেন গোটা মানব

সম্প্রদায়কে হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারও প্রাণ রক্ষা করে, সে যেন সমস্ত মানুষের প্রাণ রক্ষা করল। বস্তুত আমার রাসূলগণ তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি নিয়ে এসেছেন, কিন্তু তারপরও তাদের মধ্যে বহু লোক যমীনে সীমালঙ্ঘন অব্যাহত রেখেছে। -সূরা মায়েদা (৫) : ৩২

উল্লেখ্য, হদ-কিসাস প্রভৃতি বিধান কার্যকর করার দায়িত্ব প্রশাসনের; কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের নয়।

 

পাঁচ : জিহাদ সন্ত্রাস নয়

ইসলামে জিহাদের বিধান রাখা হয়েছে সত্যের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য। অন্যায় প্রতিহত করার জন্য। ইনসাফ কায়েমের জন্য। শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এবং ঐ রহমত প্রতিষ্ঠার জন্য যা নিয়ে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জগদ্বাসীর নিকট আবিভর্‚ত হয়েছেন; যাতে তিনি তাদেরকে আঁধার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন। অতএব জিহাদের বিধান এজন্যই যে, সে সর্বপ্রকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। জিহাদ হল দেশকে সা¤্রাজ্যবাদীদের দখল ও লুণ্ঠন থেকে, উপনিবেশীদের কলোনী স্থাপন থেকে, যারা ঘরের লোককে ঘরছাড়া করতে বাধ্য করে- তাদের থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য এবং তাদের থেকে হেফাজত করার জন্য, যারা নিরীহ মানুষকে স্বদেশ ত্যাগে বাধ্য করে এবং এক্ষেত্রে একে অপরের সাথে হাত মেলায়। আর যারা কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য জিহাদ। জিহাদ হল মুসলমানদেরকে ধর্ম পালনে কোণঠাসা অবস্থা থেকে উদ্ধার করার জন্য অথবা ইসলামের শান্তিপূর্ণ দাওয়াতের কেড়ে নেওয়া অধিকার আদায় করার জন্য। আল্লাহ তাআলা বলেন-

لَا یَنْهٰىكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِیْنَ لَمْ یُقَاتِلُوْكُمْ فِی الدِّیْنِ وَ لَمْ یُخْرِجُوْكُمْ مِّنْ دِیَارِكُمْ اَنْ تَبَرُّوْهُمْ وَ تُقْسِطُوْۤا اِلَیْهِمْ  اِنَّ اللهَ یُحِبُّ الْمُقْسِطِیْنَ اِنَّمَا یَنْهٰىكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِیْنَ قٰتَلُوْكُمْ فِی الدِّیْنِ وَ اَخْرَجُوْكُمْ مِّنْ دِیَارِكُمْ وَ ظٰهَرُوْا عَلٰۤی اِخْرَاجِكُمْ اَنْ تَوَلَّوْهُمْ  وَ مَنْ یَّتَوَلَّهُمْ فَاُولٰٓىِٕكَ هُمُ الظّٰلِمُوْنَ.

যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর বাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করতে ও তাদের প্রতি ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালবাসেন।

আল্লাহ তোমাদেরকে কেবল তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে তোমাদের ঘর বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে এবং তোমাদেরকে বের করার কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করেছে। বস্তুত যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে তারা জালেম। -সূরা মুমতাহিনা (৬০) : ৮, ৯

পাশাপাশি এ কথাও জেনে রাখা দরকার যে, ইসলাম জিহাদের এ বিধান কার্যকর করার জন্য সুস্পষ্ট উসূল ও আদাব এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও পদ্ধতি বেঁধে দিয়েছে। যেখানে নিরস্ত্রদের হত্যা করা নিষেধ, যেমনি নিষেধ যুদ্ধে অক্ষম ব্যক্তিদের হত্যা করা। বৃদ্ধ নারী-শিশুদের হত্যা করা নিষেধ। পলায়নকারীদের পশ্চাদ্ধাবন নিষেধ। আত্মসমর্পণকারীদের হত্যা করা নিষেধ। বন্দিদের কষ্ট দেওয়া নিষেধ। নিহতের লাশের মুছলা (অঙ্গবিকৃতি) করা নিষেধ। বিভিন্ন স্থাপনা, ঘর বাড়ি ও প্রতিষ্ঠান, যুদ্ধের সাথে যেগুলোর সম্পৃক্ততা নেই, (বিনা কারণে) সেগুলো ধ্বংস করা নিষেধ।

সুতরাং একদিকে যারা জবর দখল করে সা¤্রাজ্য বিস্তার করে, ধ্বংস তাÐব ঘটায়, লুটতারাজ করে এবং সম্মানিত স্থানসমূহের অসম্মান করে ওসব দোর্দРজালিমদের সন্ত্রাস ও সহিংসতা আর অপরদিকে অসহায় বঞ্চিতদের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং স্বদেশভ‚মিতে ঠাঁই লাভের জন্য জিহাদে অবতীর্ণ হওয়া- এ দুইয়ের মাঝে কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই।

এসব কারণে একাডেমি পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর প্রতি আহŸান জানায়- এখন সময় এসেছে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অন্যায় ও জুলুমের অবসান এবং আধিপত্যবাদ প্রতিহত করার জন্য শরঈ জিহাদ এবং সহিংস আগ্রাসনবাদের মাঝে পার্থক্য তুলে ধরার। যে আধিপত্যবাদ হয়ত অন্যের ভ‚খРজবরদখল করে নিচ্ছে অথবা স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নিচ্ছে কিংবা শান্তিপ্রিয় জনগণকে আতঙ্কিত করছে এবং তাদেরকে ঘরছাড়া করে শরণার্থী বানাচ্ছে।

এক্ষেত্রে একাডেমি আন্তর্জাতিক মহল ও তাদের সংগঠনগুলোকে সহিংস আগ্রাসন নিরসন এবং ফিলিস্তিনে উপনিবেশ কায়েম করার যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলছে তা প্রতিহত করার আহŸান জানাচ্ছে। কেননা ইসরাইল ও তার মিত্রশক্তিগুলো একজোট হয়েছে ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনের জনগণের বিরুদ্ধে এবং সেখানে অবস্থিত ইসলামী পবিত্র স্থান ও স্থাপনার বিরুদ্ধে। তাই একাডেমি ফিলিস্তিনীদের সাহায্যে এগিয়ে আসা এবং আলকুদসকে রাজধানী করে ফিলিস্তিনকে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ঘোষণায় তাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করা এবং তাদেরকে সমর্থন যোগানোর জন্য শান্তিপ্রিয় সকল রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসার আহŸান জানাচ্ছে।

একাডেমি এ মর্মে সতর্ক করছে- মানবিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি ও ইনসাফকে ভুলে থাকা এবং পরস্পর সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে শক্তি ও আধিপত্যের পক্ষ-নীতি অনুসরণ করার প্রবণতা বহু সংঘাত ও বিপর্যয় সৃষ্টি করে থাকে। বিশেষ করে ইনসাফপূর্ণভাবে ফিলিস্তিনীদের সংকট সমাধান না হলে তা সংঘাত ও সহিংসতার অগ্নি আরো প্রজ্জ্বলিত করবে। তাই বর্তমান বিশে^ বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর এবং সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর যে নিপীড়ন চলছে তা প্রতিহত করা এবং স্বাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অব্যাহত কাজ করে যাওয়া খুবই জরুরি।

যেহেতু ইসলাম সন্ত্রাসবাদকে হারাম করেছে, অন্যায়-অবিচার নিষেধ করেছে এবং দয়া-ক্ষমা, উদারতা, উত্তম আচরণ ও সম্প্রীতি-সদ্ভাব বজায় রাখার সুচারু শিক্ষা দিয়েছে, তাই একাডেমি গোটা মানব সভ্যতাকে এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোকে আহŸান জানাচ্ছে ইসলামকে তার মূল উৎস থেকে জানতে। তাহলে জানতে পারবে, ইসলাম মানবীয় সংকটগুলো কীভাবে সমাধান করেছে এবং সকলের জন্য কীভাবে শান্তি ও নিরাপত্তার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে এবং আধিপত্য ও সন্ত্রাসকে কীভাবে প্রতিহত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ .

তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চিত জেনো, আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না। -সূরা বাকারা (২) : ১৯০

 

মুসলিম জাতির উদ্দেশে একাডেমির কিছু সুপারিশ

ইসলামী ফিকহ একাডেমি লক্ষ করছে যে, মুসলিম জাতির সমকালীন সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ভাবছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে মুসলমানদের কী করণীয়- এ বিষয়ে একাডেমি কিছু সুপারিশ পেশ করছে।

এক. কিতাব ও সুন্নাহকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা। এ দুই উৎস থেকে সমাধান গ্রহণ করা এবং নির্ভরযোগ্য আহলে ইলমের শরণাপন্ন হওয়া। কেননা তাঁরা তাকওয়া, খোদাভীতি এবং ন্যায়নিষ্ঠার অধিকারী হয়ে থাকেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اِنَّمَا یَخْشَی اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمٰٓؤُا اِنَّ اللهَ عَزِیْزٌ غَفُوْر .

আল্লাহকে ভয় করে তাঁর বান্দাদের মাঝে কেবল জ্ঞানীরাই। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল -সূরা ফাতির (৩৫) : ২

বস্তুত তারাই জাতির পথপ্রদর্শন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আস্থার পাত্র হওয়ার অধিক হকদার।

দুই. মুসলমানদের সঙ্কট সমাধানের জন্য প্রশাসন, আলেমসমাজ এবং ইসলামী সংগঠনগুলো পারস্পরিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত। আর তা হবে ইসলামী শরীয়া ও তার মূল দুই উৎসের- কিতাবুল্লাহ ও সুন্নতে রাসূলুল্লাহ্র শরণাপন্ন হওয়ার মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা পারস্পরিক সহযোগিতার নির্দেশ দিয়ে বলেন-

وَ تَعَاوَنُوْا عَلَی الْبِرِّ وَ التَّقْوٰی  وَ لَا تَعَاوَنُوْا عَلَی الْاِثْمِ وَ الْعُدْوَانِ وَ اتَّقُوا اللهَ اِنَّ اللهَ شَدِیْدُ الْعِقَابِ .

তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করবে। গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করবে না। আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্র শাস্তি অত্যন্ত কঠিন। -সূরা মায়েদা (৫) : ২

তিন. মধ্যপন্থা ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত করা এবং ইসলামে নিন্দিত বাড়াবাড়ি নিরসন করা। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহ্র যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, চিন্তা-চেতনা, কর্ম-আচরণ ও জীবনধারায় ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি মেনে চলা। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ كَذٰلِكَ جَعَلْنٰكُمْ اُمَّةً وَّسَطًا لِّتَكُوْنُوْا شُهَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَ یَكُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْكُمْ شَهِیْدًا.

(হে মুসলিমগণ!) এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা অন্যান্য লোকদের ব্যাপারে সাক্ষী হও এবং রাসূল হন তোমাদের পক্ষে সাক্ষী। -সূরা বাকারা (২) : ১৪৩

চার. একাডেমি মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রতি জোর আহŸান জানাচ্ছে-

তারা তাদের দ্বীন ধর্মের হেফাজত এবং আদর্শ ও স্বকীয়তার সুরক্ষার জন্য সাধ্য মোতাবেক সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

একাডেমি গুরুত্বের সাথে আরো বলতে চায়-

এসকল সংখ্যালঘুদের জন্য শরীয়তের পক্ষ থেকে করণীয় হল, যে দেশে তারা বসবাস করছে অথবা যেখানের নাগরিকত্ব লাভ করেছে বা করছে, সেখানের নাগরিক নীতিমালা ও নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়গুলোর প্রতি যথাযথ যতœবান থাকবে। যাতে ঐ অঞ্চলের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা বিঘিœত না হয় এবং অন্যান্যদের জানমালের হেফাজত হয়। তাদের কর্তব্য হল, সাধ্য ও সামর্থ্যরে সবটুকু ব্যয় করবে নতুন প্রজন্মকে ইসলামী আদর্শে গড়ে তুলতে। এজন্য তারা বিভিন্ন মাদরাসা ও মারকায প্রতিষ্ঠা করবে। ইসলামী ভ্রাতৃত্বের আওতায় সকলে আল্লাহ্র রজ্জুকে আঁকড়ে ধরবে। অভ্যন্তরীণ বিবদমান বিষয়গুলো শান্তভাবে আলোচনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে মীমাংসা করবে। যেসকল রাষ্ট্রে তারা বসবাস করছে সেসকল রাষ্ট্র কর্তৃক নিজেদের অধিকার ও স্বীকৃতি আদায়ে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। অর্থাৎ ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসাবে যে যে অধিকার রয়েছে, সেগুলো যেন পূর্ণভাবে তারা লাভ করতে পারে, বিশেষ করে পারিবারিক বিষয়াবলিতে। যেমনটি অন্যান্য ধর্মের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভোগ করে থাকে।

বিশে^র বৃহৎ মুসলিম সংগঠন হিসাবে রাবেতা আলমে ইসলামীর পক্ষ থেকে একাডেমি তা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিচ্ছে।

পাঁচ. একাডেমি যে কথাটি গুরুত্ব দিয়ে বলতে চায় তা হল, ইসলামে ফতোয়ার বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর গুরুগম্ভীর এবং সংবেদনশীল একটি বিষয়। সালাফের যামানায় বড় বড় আলেমও এ ব্যাপারে খুব সন্ত্রস্ত থাকতেন এবং পরবর্তীতে দৃঢ়পদ উলামায়ে কেরামও। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ইলমবিহীন কোনো (বানোয়াট) বিষয় সম্বন্ধিত হয়ে যায় কি না- এ ভয়ে। যে অপরাধকে আল্লাহ তাআলা শিরকের মতো ভয়াবহ অপরাধের সাথে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

قُلْ اِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّیَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَ مَا بَطَنَ وَ الْاِثْمَ وَ الْبَغْیَ بِغَیْرِ الْحَقِّ وَ اَنْ تُشْرِكُوْا بِاللهِ مَا لَمْ یُنَزِّلْ بِهٖ سُلْطٰنًا وَّ اَنْ تَقُوْلُوْا عَلَی اللهِ مَا لَا تَعْلَمُوْنَ .

(হে নবী আপনি) বলে দিন, আমার প্রতিপালক তো অশ্লীল কাজসমূহ হারাম করেছেন, তা সে অশ্লীলতা প্রকাশ্য হোক বা গোপন। তাছাড়া সর্বপ্রকার গুনাহ, অন্যায়ভাবে কারও প্রতি সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহ যে সম্পর্কে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, এমন জিনিসকে আল্লাহর শরীক করাকেও (হারাম করেছেন)। তাছাড়া এ বিষয়কেও (হারাম করেছেন) যে, তোমরা আল্লাহ্র প্রতি আরোপ করবে এমনসব কথা, যা তোমরা জান না। -সূরা আ‘রাফ (৭) : ৩৩

ছয়. একাডেমি ফতোয়ার বিষয়ে শৈথিল্য প্রদর্শন থেকে সতর্ক করে। শাসক হোক বা শাসিত প্রত্যেক মুসলমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, তারা যেন ফতোয়া ও আহলে ফতোয়ার বিষয়ে খেয়াল রাখে। যাতে অযোগ্য কেউ এতে দখল না দিয়ে বসে। নির্ভরযোগ্য আহলে ইলম থেকে প্রকাশিত নয় এমন ফতোয়া এবং বিভিন্ন মতবাদ ও মতাদর্শের পেছনে ছুটতে একাডেমি মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়।

সাত. ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে দাওয়াত ও খুতবার মিম্বরগুলোর উপর, ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর, মাদরাসাগুলোর উপর উন্মত্ত আগ্রাসন লক্ষ করছে একাডেমি এবং আরো দেখছে, উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রম, যা ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে দিতে চায় কিংবা সংকুচিত করতে চায়। একাডেমি মুসলমানদেরকে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করছে এবং এসব কিছুর পেছনে ছুটতে বারণ করছে। কেননা এগুলো তার দ্বীনী স্বকীয়তাবোধকে একাকার করে দেবে এবং মুসলমানদেরকে তাদের দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ করে রাখবে।

মুসলিম  ব্যক্তিত্ব গঠন ও আদর্শ সমাজ নির্মাণের জন্য শরঈ শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম; বরং এর বিকল্প নেই। আর তা হতে হবে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নতে রাসূলুল্লাহ নির্দেশিত পন্থায়। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়গুলোর সাথে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করতে একাডেমি রাবেতা আলমে ইসলামীকে জোর আহŸান জানাচ্ছে।

আট. মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্য সাধন এবং তাদেরকে এক কাতারে নিয়ে আসার জন্য ইসলামী ফিকহ একাডেমি রাবেতা আলমে ইসলামীকে কিছু প্রস্তাবনা পেশ করছে :

ক. সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় ও বিভিন্ন  জাতিগোষ্ঠী যেসকল প্রতিকূলতা ও সংকটের সম্মুখীন, সেসকল বিষয়ের সমাধানে মক্কা মুকাররমায় রাবেতার তত্ত¡াবধানে বিশ্বের আলেম সমাজের একটি আন্তর্জাতিক ঐক্য ফোরাম প্রতিষ্ঠা করা।

খ. রাবেতার অধীনে ইসলামী সংগঠনগুলোর মাঝে আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সমন্বয় তৈরির চেষ্টা করা, যাতে সংগঠনগুলোর কার্যক্রম সুবিন্যস্তভাবে পরিচালিত হয় এবং আল্লাহ তাআলা তাকওয়া ও কল্যাণের যে নির্দেশ দিয়েছেন ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থে তাতে পারস্পরিক সহায়তা সুনিশ্চিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ اعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللهِ جَمِیْعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوْا.

আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহ্র রশি মজবুতভাবে আঁকড়ে ধর এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১০৩

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন-

وَ لَا تَنَازَعُوْا فَتَفْشَلُوْا وَ تَذْهَبَ رِیْحُكُمْ وَ اصْبِرُوْا .

তোমরা পরস্পর বিবাদ করবে না। অন্যথায় তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের প্রতাপ নিঃশেষ হয়ে যাবে। -সূরা আনফাল (৮) : ৪৬

গ. বিশ্বব্যাপী মুসলিম দাতব্য সংস্থাগুলো একমত হয়- এমন অঙ্গীকারনামা প্রস্তুত করা। এতে তাদের কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হবে। গুরুত্বপূর্ণ কাজে একে অপরের সহযোগী হবে। এবং তাদের বিরুদ্ধে যে অপবাদ আরোপ করা হয় একজোট হয়ে তা মোকাবেলা করবে।

ঘ. অন্যান্য সংখ্যালঘুরা যেসকল অধিকার ভোগ করে মুসলিম সংখ্যালঘুরাও যেন তা লাভ করতে পারে- এ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি প্রতিটি রাষ্ট্রে এমন ইসলামী সংস্থা তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা করবে, যা মুসলমানদের বিষয়াবলি প্রশাসনের সামনে এভাবে উপস্থাপন করবে, যাতে তাদের জন্য অধিকার লাভ করা এবং অন্যদের মতো তা ভোগ করা সহজ হয়।

ঙ. বিভিন্ন ভাষায় সম্প্রচারিত একটি ইসলামিক চ্যানেল চালু করার জন্য মুসলিম শাসকবর্গ এবং ইসলামী সংগঠনগুলোর নিকট আবেদন করা, যা ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলবে এবং মানবসভ্যতার জন্য ইসলাম ধর্মের প্রয়োজনীয়তা (বরং অপরিহার্যতা) তুলে ধরবে। ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে সর্বনাশী আগ্রাসী মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক তৎপরতার মোকাবেলায় তা অংশগ্রহণ করবে।

চ. মুসলিম স্কলারদের একটি গ্রæপ প্রস্তুত করা, যারা প্রভাবশালী পশ্চিমা প্রশাসন, পার্লামেন্ট, বিভিন্ন সংস্থা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে যোগাযোগ ও সাক্ষাতের মাধ্যমে ঘৃণা ও বৈষম্য-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। ইসলাম মানব সভ্যতাকে যে শান্তি নিরাপত্তা ও কল্যাণ উপহার দিয়েছে তাদের সামনে তা ফুটিয়ে তুলবেন। ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়ার নীতির ব্যাপারে ইসলামের সঠিক অবস্থান তুলে ধরবেন।

 

উপসংহার

সর্বশেষ কথা হল, পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং দুর্যোগ-সংঘাত মোকাবেলা করার জন্য মুসলিম উম্মাহ্র ঐক্যের বিকল্প নেই। মুসলমানদের জেনে রাখা উচিত, তাদের ধর্মের অস্তিত্বের উপর তাদের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। ইসলাম ধর্ম এমন এক নিআমত যা হেফাজত করা তাদের কর্তব্য। আল্লাহ্র তরফ থেকে এটা এমন এক এহসান, যার শুকরিয়া আদায় না করে উপায় নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন-

یَمُنُّوْنَ عَلَیْكَ اَنْ اَسْلَمُوْا قُلْ لَّا تَمُنُّوْا عَلَیَّ اِسْلَامَكُمْ  بَلِ اللهُ یَمُنُّ عَلَیْكُمْ اَنْ هَدٰىكُمْ لِلْاِیْمَانِ اِنْ كُنْتُمْ صٰدِقِیْنَ .

তারা ইসলাম গ্রহণ করে তোমার উপকার করেছে বলে মনে করে। তাদেরকে বলে দাও, তোমরা তোমাদের ইসলাম দ¦ারা আমাকে উপকৃত করেছ বলে মনে করো না; বরং তোমরা যদি বাস্তবিকই (নিজেদের দাবিতে) সত্যবাদী হও, তাহলে (জেনে রেখ) আল্লাহ্ই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তোমাদেরকে ঈমানের পথ দেখিয়েছেন। -সূরা হুজুরাত (৪৯) : ১৭

রাবেতা আলমে ইসলামী আয়োজিত আজকের এই মজলিসে পবিত্র নগরী মক্কা মুকাররমার প্রাঙ্গণে সমবেত উলামায়ে কেরাম গোটা মানবজাতির উদ্দেশে এ প্রতিবেদন পেশ করছে। এবং জেঁকে বসা অভিশাপ থেকে মানব সভ্যতাকে উদ্ধার করতে কী করণীয়- এ বিষয়ে বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোকে চিন্তাভাবনা করার আবেদন জানাচ্ছে।

وصلى الله وبارك على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.

 

ভাষান্তর

মুহাম্মাদ আশিক বিল্লাহ তানভীর

 

১. রাবেতার পরিচয় ও তার কার্যবিবরণী সম্পর্কে জানতে দেখুন রাবেতা থেকে প্রকাশিত কিতাব-

رابطة العالم الإسلامي : حقائق وأرقام

আরও জানুন

আন্তঃধর্মীয় বিবাহ আইনঃ কী বলে ইসলাম?

মাওলানা মুহাম্মদ আনসারুল্লাহ হাসান মানব রচিত আইন ও বিধানে পরিবর্তন তথা পরিবর্ধন-পরিমার্জন ও সংস্কার সাধন হতে পারে এবং হয়েও আসছে। কারণ সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী মানুষের স্বাভাবিকভাবেই ভুল হয়। তারা বিভিন্ন চিন্তা-চেতনা ও মন-মানসিকতায় আক্রান্ত হয়। নানা পথ ও মতের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। স্বার্থ ও আবেগের কারণে বিভ্রান্ত হয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ রাববুল আলামীন সকল মাখলুকের স্রষ্টা ও বিশ্বজগতের পালনকর্তা। তাঁকে কখনো ভুল-ভ্রান্তি স্পর্শ করে না। তাঁর কোনো ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে পারে না। তিনি সকল দোষ ও দুর্বলতা এবং সকল সীমা ও সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে মহান পূত-পবিত্র সত্ত্বা। সুতরাং তার নাযিলকৃত আইন ও বিধানে কোনো ধরনের পরিবর্তন ও সংস্কার হতে পারে না। আল্লাহর বিধানে কোনো ধরনের পরিবর্তন সাধন বা কোনো ধরনের বিরুদ্ধাচরণ চরম অন্যায় ও জঘন্যতম অপরাধ। যারা আল্লাহর বিধানে হাত দেওয়ার দুঃসাহস করে, আল্লাহর আইনে পরিবর্তন ও সংস্কারের চিন্তা-ভাবনা করে তারা চরম দুষ্কৃতিকারী, বড় জালিম এবং আল্লাহর জমিনে ফাসাদ সৃষ্টিকারী। তারা ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত। আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদে বিবাহ ও তালাকের বিধান বর্ণনা করার পর ইরশাদ করেছেন- تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *