হোম / আহলে হাদীস / পাঁচ ওয়াক্ত ও অন্যান্য নামাযের মাসনূন কিরাত
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

পাঁচ ওয়াক্ত ও অন্যান্য নামাযের মাসনূন কিরাত

মূল : মাওলানা খন্দকার মনসুর আহমদ

সংযোজন : মাওলানা মুহাম্মাদ রাফিদ আমীন

নযরে ছানী ও সম্পাদনা : মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক

নামায  আমাদের  দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, আখেরাতের পরম পাথেয় এবং ইসলামের অন্যতম বুনিয়াদ। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে কেরাত।

নামাযে কুরআনে কারীম থেকে তিলাওয়াত করা জরুরি। প্রথমে সূরা ফাতিহা এরপর আরও কিছু অংশ।

আলহামদু লিল্লাহ, নামাযের কেরাত সংক্রান্ত মাসায়েল সাধারণ পর্যায়ে মুসল্লীদের জানা আছে। কোন্ কোন্ রাকাতে সূরা ফাতিহা এবং আরও কিছু অংশ পড়া ওয়াজিব। কোন্ রাকাতে কেবল সূরা ফাতিহা পড়া সুন্নত, এরচে বেশি পড়ার বিধান নেই। আর কোন্ কোন্ নামাযের প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার সঙ্গে আরও কিছু অংশ পড়া আবশ্যক। এসব মাসআলা প্রায় সবারই জানা। তবে এক্ষেত্রে যে বিষয়টির আলোচনা তুলনামূলক কম হয় তা হল, ফরয নামাযে সুন্নত কেরাতের পরিমাণ কতটুকু এবং কোন্ নামাযে কোন্ সূরা তিলাওয়াত করা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের আমল হিসেবে প্রমাণিত।

আলহামদু লিল্লাহ, উলামায়ে কেরাম তো বিষয়গুলো বলেই থাকেন। তবু মনে হল, হাদীস-আছার ও ফিকহে হানাফীর আলোকে মাসনূন কেরাত সম্পর্কে একটু বিস্তারিত লেখা যায়। এজন্য এই নিবন্ধে আমরা বিষয়টি বিশদভাবে  তুলে ধরার  প্রয়াস পাব- ইনশাআল্লাহ।

এ প্রসঙ্গে প্রথমেই যা জেনে নেয়া প্রয়োজন, তা হল, মুফাসসাল ও তার প্রকারসমূহের পরিচয়।

কুরআন মাজীদের শেষ অংশ, অর্থাৎ সূরা হুজুরাত থেকে সূরা নাস পর্যন্ত সূরাসমূহকে ‘মুফাসসাল’ বলা হয়। -তাফসীরে সাম‘আনী খ. ৫ পৃ. ২১২; জামালুল কুররা ওয়া কামালুল ইক্বরা, আলামুদ্দীন সাখাভী খ. ১ পৃ. ৩৫; বাসাইরু যাওয়িত তাময়ীয, ফায়রুযাবাদী খ. ৪ পৃ. ১৯৪; হাশিয়া ইবনে আবিদীন খ. ৩ পৃ. ৪৫৮

মুফাসসাল তিন প্রকার- তিওয়ালে মুফাসসাল, আওসাতে মুফাসসাল ও  কিসারে মুফাসসাল।

সূরা হুজুরাত থেকে সূরা اِذَا السَّمَآءُ انْشَقَّت পর্যন্ত সূরাগুলি হচ্ছে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’।

সূরা বুরূজ থেকে সূরা ক্বাদ্র পর্যন্ত সূরাগুলি হচ্ছে ‘আওসাতে মুফাসসাল’

এবং  সূরা বায়্যিনাহ থেকে সূরা নাস পর্যন্ত সূরাগুলি হচ্ছে ‘কিসারে মুফাসসাল’। -মানাহিলুল ইরফান ফী উলূমিল কুরআন খ. ১ পৃ. ২৮৭;  আলবাহরুর রায়েক খ. ১ পৃ. ৫৯৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া খ. ১ পৃ. ৭৭; হাশিয়া ইবনে আবিদীন খ. ৩ পৃ. ৪৫৮-৪৬০; সি‘আয়াহ খ. ২ পৃ. ২৮৬

বিষয়টি বোঝার সুবিধার্থে আমরা ছকের মাধ্যমে ‘মুফাসসাল’-এর সূরাগুলোর নাম ও পরিমাণ তুলে ধরব, ইনশাআল্লাহ। উল্লেখ্য, পৃষ্ঠাগত পরিমাণ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমরা বর্তমানে ব্যাপকভাবে পঠিত নূরানী হাফেজী কুরআন শরীফকে অনুসরণ করেছি। যেখানে পনের লাইনে এক পৃষ্ঠা হয়। ছকটি প্রবন্ধের শেষে লক্ষ্য করুন।

এই ভূমিকার পর প্রথমে আমরা মাসনূন  কেরাত বিষয়ক হাদীস ও আছার উল্লেখ করব। এরপর ফিকহে হানাফীর আলোকে উক্ত হাদীস ও আছারগুলো থেকে প্রাপ্ত হেদায়াত ও বিধানাবলি উল্লেখ করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

ফজরের কেরাত

কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-

اَقِمِ الصَّلٰوةَ لِدُلُوْكِ الشَّمْسِ اِلٰی غَسَقِ الَّیْلِ وَ قُرْاٰنَ الْفَجْرِ  اِنَّ قُرْاٰنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُوْدًا، وَ مِنَ الَّیْلِ فَتَهَجَّدْ بِهٖ نَافِلَةً لَّك، عَسٰۤی اَنْ یَّبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُوْدًا.

(হে নবী!) সূর্য হেলার সময় থেকে রাতের অন্ধকার পর্যন্ত নামায কায়েম কর এবং ফজরের সময় কুরআন পাঠে যত্নবান থাক। স্মরণ রেখ, ফজরের তিলাওয়াতে ঘটে থাকে  (ফেরেশতাগণের) সমাবেশ। রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়বে, যা তোমার জন্য এক অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায় তোমার প্রতিপালক তোমাকে  ‘মাকামে মাহমুদ’-এ পৌঁছাবেন। -সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ৭৮-৭৯

হযরত কুতবা ইবনে মালিক রা. বলেন-

سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ فِي الفَجْرِ: وَالنّخْلَ بَاسِقَات فِي الرّكْعَةِ الأُولَى.

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ফজরের প্রথম রাকাতে وَالنّخْلَ بَاسِقَاتٍ তিলাওয়াত করতে শুনেছি। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৩০৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৫৭

হাদীসে উল্লেখিত وَالنّخْلَ بَاسِقَاتٍ- এ আয়াতাংশ সূরা ق -এর প্রথম রুকুতে রয়েছে। হাদীসের সাধারণ অর্থ এটাই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের প্রথম রাকাতে সম্পূর্ণ সূরা ‘ক্বাফ’ তিলাওয়াত করেছেন।

হযরত জাবের ইবনে সামুরাহ রা. বলেন-

إِنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ كَانَ يَقْرَأُ فِي الْفَجْرِ بـ:ق والقرآن المجيد، وزاد في رواية: ونحوها.

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের  নামাযে ق وَالْقُرْآنِ الْمَجِيدِ  (সূরা ‘ক্বাফ’) এবং এর কাছাকাছি পরিমাণের সূরা তিলাওয়াত করতেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৫৮

উল্লেখ্য যে, সূরা ‘ক্বাফ’-এর আয়াত সংখ্যা ৪৫

অন্য হাদীসে হযরত জাবের ইবনে সামুরাহ রা. বলেন-

كَانَ يَقْرَأُ فِي الْفَجْرِ الْوَاقِعَةَ وَنَحْوَهَا مِنَ السّورَةِ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযে সূরা ‘ওয়াক্বিআহ’ এবং এজাতীয় সূরা তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস ২৭২০; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০৯৯৫

হযরত উম্মে সালামা রা. বলেন-

شَكَوْتُ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ أَنِّي أَشْتَكِي، فَقَالَ: طُوفِي مِنْ وَرَاءِ النّاسِ وَأَنْتِ رَاكِبَةٌ، فَطُفْتُ وَرَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يُصَلِّي إِلَى جَنْبِ البَيْتِ، وَهُوَ يَقْرَأُ بِـ الطُّورِ وَكِتَابٍ مَسْطُورٍ.

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার অসুস্থতার বিষয়ে জানালাম। তিনি বললেন, তুমি (সাওয়ারীতে) আরোহণ করে মানুষদের পিছনে গিয়ে তাওয়াফ কর। তো আমি তাওয়াফ করছিলাম আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়ছিলেন। নামাযে তিনি তিলাওয়াত করছিলেন সূরা ‘তূর’। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৬৩৩

অন্য বর্ণনায় হাদীসটির শব্দ এই-

إِذَا أُقِيمَتْ صَلاَةُ الصّبْحِ فَطُوفِي عَلَى بَعِيرِكِ وَالنّاسُ يُصَلّونَ.

যখন ফজরের নামায শুরু হবে তখন তুমি উটে আরোহণ করে তাওয়াফ করবে আর লোকেরা তখন নামাযে থাকবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৬২৬

এ বর্ণনায় স্পষ্টভাবে ফজরের নামাযের কথা এসেছে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযে সূরা ‘তূর’ তিলাওয়াত করেছেন।

হযরত আমর ইবেন হুরাইস রা. বলেন-

سَمِعْتُ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ فِي الْفَجْرِ: إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ.

আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ফজরের নামাযে সূরা إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ (সূরা তাকবীর) তিলাওয়াত করতে শুনেছি। -সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৯৫১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৮৭৩৩

যাহহাক ইবনে উসমান রাহ. শারীক ইবনে আবী নামির রাহ. থেকে বর্ণনা করেন-

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: مَا صَلّيْتُ وَرَاءَ أَحَدٍ أَشْبَهَ صَلَاةً بِرَسُولِ اللهِ صلّى الله عليه وسلم مِنْ هَذَا الْفَتَى، يَعْنِي: عُمَرَ بْنَ عَبْدِالْعَزِيزِ. قَالَ الضّحّاكُ: فَكُنْتُ أُصَلِّي وَرَاءَهُ، فَيُطِيلُ الْأَوّلَتَيْنِ مِنَ الظّهْرِ، وَيُخَفِّفُ الْآخِرَتَيْنِ، وَيُخِفّ الْعَصْرَ، وَيَقْرَأُ فِي الْمَغْرِبِ بِقِصَارِ الْمُفَصّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الْعِشَاءِ بِوَسَطِ الْمُفَصّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الصّبْحِ بِطِوَالِ الْمُفَصّلِ.

হযরত আনাস রা. উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ.-এর ব্যাপারে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সদৃশ নামায আদায় করার ক্ষেত্রে এই যুবক থেকে অগ্রগামী আর কারো পিছনে নামায পড়িনি।

যাহহাক রাহ. বলেন, আমি উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ.-এর পিছনে নামায পড়তাম। তিনি যোহরের প্রথম দুই রাকাত দীর্ঘ করতেন এবং শেষের দুই রাকাত সংক্ষিপ্ত করতেন। আসরের নামায সংক্ষিপ্ত করতেন। মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’ পড়তেন। ইশার নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ পড়তেন। ফজরের নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ পড়তেন। -তাবাকাতে ইবনে সা‘দ খ. ৫ পৃ. ১৬১-১৬২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৮৩৬৬

সুলাইমান ইবনে ইয়াসার রাহ. বলেন-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنّهُ قَالَ: مَا رَأَيْتُ رَجُلًا أَشْبَهَ صَلَاةً بِرَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ مِنْ فُلَانٍ، لِإِمَامٍ كَانَ بِالْمَدِينَةِ، قَالَ سُلَيْمَانُ بْنُ يَسَارٍ: فَصَلّيْتُ خَلْفَهُ، فَكَانَ يُطِيلُ الْأُولَيَيْنِ مِنَ الظّهْرِ، وَيُخَفِّفُ الْأُخْرَيَيْنِ، وَيُخَفِّفُ الْعَصْرَ، وَيَقْرَأُ فِي الْأُولَيَيْنِ مِنَ الْمَغْرِبِ بِقِصَارِ الْمُفَصّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الْأُولَيَيْنِ مِنَ الْعِشَاءِ مِنْ وَسَطِ الْمُفَصّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الْغَدَاةِ بِطِوَالِ الْمُفَصّلِ.

হযরত আবু হুরাইরা রা. মদীনার এক আমীর স¤পর্কে বললেন, আমি তার থেকে অধিক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সদৃশ নামায আদায়কারী আর কাউকে দেখিনি।

সুলাইমান ইবনে ইয়াসার রাহ. বলেন, আমি ঐ আমীরের পিছনে নামায পড়েছি। তিনি যোহরের প্রথম দুই রাকাত দীর্ঘ করতেন এবং শেষের দুই রাকাত সংক্ষিপ্ত করতেন। আসরের নামায সংক্ষিপ্ত করতেন। মাগরিবের প্রথম দুই রাকাতে ‘কিসারে মুফাসসাল’ পড়তেন। ইশার প্রথম দুই রাকাতে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ পড়তেন। ফজরের নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ পড়তেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৮৩৬৬, ৭৯৯১; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৮২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ৫২০; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ১৮৩৭; শারহু মা‘আনিল আসার, হাদীস ১২৭৯, ১২৮০

হযরত আবু বারযা রা. থেকে বর্ণিত-

أَنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ كَانَ يَقْرَأُ فِي صَلَاةِ الْغَدَاةِ مِنَ السِّتِّينَ إِلَى الْمِائَةِ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল¬ম ফজরের  নামাযে ষাট আয়াত থেকে একশত আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করতেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৬১; সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৯

হযরত উমর রা.-এর ফরমান

হাসান বসরী রাহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَتَبَ عُمَرُ إِلَى أَبِي مُوسَى: أَنِ اقْرَأْ فِي الْمَغْرِبِ بِقِصَارِ الْمُفَصّلِ، وَفِي الْعِشَاءِ بِوَسَطِ الْمُفَصّلِ، وَفِي الصّبْحِ بِطِوَالِ الْمُفَصّلِ.

হযরত উমর রা. হযরত আবু মূসা আশআরী রা.-কে লিখে পাঠিয়েছেন যে, মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’ পড়বে, ইশার নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ পড়বে এবং ফজরের নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ পড়বে। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৭২

হযরত উমর রা.-এর আমল

রবী‘আ ইবনে আবদুল্লাহ রাহ. বলেন-

كَانَ عُمَرُ يَقْرَأُ بِالْحَدِيدِ وَأَشْبَاهِهَا.

হযরত উমর রা. (ফজরের নামাযে) সূরা ‘হাদীদ’ ও এ ধরণের সূরা তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭২২ (ফজরের কেরাত অনুচ্ছেদ)

তাবেঈনের আমল

যাহহাক ইবনে উসমান রাহ. বলেন-

رَأَيْتُ عُمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ قَرَأَ فِي الْفَجْرِ بِسُورَتَيْنِ مِنْ طِوَالِ الْمُفَصّلِ.

আমি উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ.-কে ফজরের নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’-এর দুটি সূরা তিলাওয়াত করতে দেখেছি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৮২

কাতাদা রাহ. বলেন-

أَمَرَ عَدِيّ بْنُ أَرْطَاةَ الْحَسَنَ أَنْ يُصَلِّيَ بِالنّاسِ، فَقَرَأَ فِي الْفَجْرِ: يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ،    وَ يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ.

আদী ইবনে আরতাত রাহ. হাসান বসরী রাহ.-কে নামায পড়াতে বললেন। হাসান বসরী রাহ. ফজরের নামাযে يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ (সূরা ত্বালাক) ও وَ يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّم (সূরা তাহরীম) তিলাওয়াত করলেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭২৬

নু‘মান ইবনে কায়স রাহ. আবীদা সালমানী রাহ.-এর ব্যাপারে বলেন-

أَنّهُ كَانَ يَقْرَأ فِي الْفَجْرِ: الرَّحْمَنَ وَنَحْوَهَا.

তিনি ফজরের নামাযে সূরা ‘আররহমান’ এবং এজাতীয় সূরা তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৭৬

ফজরের নামাযে ‘মুফাসসাল’-এর বাইরে থেকে তিলাওয়াত

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযে ‘মুফাসসাল’-এর বাইরে থেকেও দীর্ঘ কেরাত পড়েছেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সা’ইব রা. বলেন-

صَلّى لَنَا النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ الصّبْحَ بِمَكّةَ، فَاسْتَفْتَحَ سُورَةَ الْمُؤْمِنِينَ، حَتّى جَاءَ ذِكْرُ مُوسَى وَهَارُونَ أَوْ ذِكْرُ عِيسَى ـ مُحَمّدُ بْنُ عَبّادٍ يَشُكّ، أَوِ اخْتَلَفُوا عَلَيْهِ ـ أَخَذَتِ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ سَعْلَةٌ فَرَكَعَ.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আমাদের নিয়ে ফজরের নামায আদায় করলেন। নামাযে তিনি সূরা মু’মিনূন শুরু করলেন। যখন হযরত মূসা ও হারূন আ. অথবা হযরত ঈসা আ.-এর আলোচনায় পৌঁছলেন তখন তার কাশি আসল, ফলে তিনি রুকূতে চলে গেলেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৫৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৮২০

সূরা মু’মিনূন-এ হযরত মূসা আ. ও হযরত হারূন আ.-এর আলোচনা শুরু হয়েছে ৪৫ নং আয়াত থেকে এবং হযরত ঈসা আ.-এর আলোচনা শুরু হয়েছে ৫০ নং আয়াত থেকে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন-

إِنْ كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ لَيَؤُمّنَا فِي الْفَجْرِ بِالصّافّاتِ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযে সূরা ‘সাফফাত’ দিয়ে আমাদের ইমামতি করতেন। -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ১৮১৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৪৯৮৯

শাবীব আবু রওহ রাহ. জনৈক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন-

صَلّى رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ الْفَجْرَ، فَقَرَأَ فِيهِمَا بِالرّومِ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামায আদায় করলেন। নামাযে তিনি সূরা ‘রূম’ তিলাওয়াত করলেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৩০৭২, ২৩১২৫; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৪৭

সাহাবায়ে কেরাম রা.-ও ফজরের নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’-এর বাইরে থেকে দীর্ঘ দীর্ঘ সূরা তিলাওয়াত করতেন।

হযরত আনাস রা. বলেন-

صَلّيْتُ خَلْفَ أَبِي بَكْرٍ الْفَجْرَ، فَاسْتَفْتَحَ الْبَقَرَةَ، فَقَرَأَهَا فِي رَكْعَتَيْنِ.

আমি হযরত আবু বকর রা.-এর পিছনে ফজরের নামায পড়েছি। তিনি সূরা ‘বাক্বারা’ শুরু করলেন এবং দুই রাকাতে পূর্ণ সূরাটি তিলাওয়াত করলেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭১১, ২৭১৩; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৬৫

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হারিস রা.-ও হযরত আবু বকর রা. থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন। -শারহু মা‘আনিল আসার, বর্ণনা ১০৮৯

অন্য এক বর্ণনায় হযরত আনাস রা. বলেন-

صَلّى بِنَا أَبُو بَكْرٍ صَلَاةَ الصّبْحِ، فَقَرَأَ بِسُورَةِ آلِ عِمْرَانَ.

হযরত আবু বকর রা. আমাদেরকে ফজরের নামায পড়ালেন। নামাযে তিনি সূরা ‘আলে ইমরান’ তিলাওয়াত করলেন। -শারহু মা‘আনিল আছার, বর্ণনা ১০৮৮; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭১২

আহনাফ ইবনে কায়স রাহ. বলেন-

صَلّيْتُ خَلْفَ عُمَرَ الْغَدَاةَ، فَقَرَأَ بِيُونُسَ وَهُودٍ وَنَحْوِهِمَا.

আমি হযরত উমর রা.-এর পিছনে ফজরের নামায আদায় করেছি। নামাযে তিনি সূরা ‘ইউনুস’ ও সূরা ‘হূদ’ এবং এ ধরনের সূরা তিলাওয়াত করেছেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৬৬

যায়দ ইবনে ওয়াহব রাহ. বলেন-

صَلّى بِنَا عُمَرُ صَلَاةَ الصّبْحِ، فَقَرَأ: بَنِي إِسْرَائِيلَ وَالْكَهْفَ.

হযরত উমর রা. আমাদেরকে ফজরের নামায পড়ালেন। নামাযে তিনি সূরা ‘বানী ইসরাঈল’ ও সূরা ‘কাহ্ফ’ তিলাওয়াত করলেন। -শারহু মা‘আনিল আছার, বর্ণনা ১০৭৯, ১০৮০

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমের ইবনে রবী‘আ রা. বলেন-

مَا حَفِظْتُ سُورَةَ يُوسُفَ وَسُورَةَ الْحَجِّ إِلّا مِنْ عُمَرَ، مِنْ كَثْرَةِ مَا كَانَ يَقْرَؤُهُمَا فِي صَلَاةِ الْفَجْرِ، فَقَالَ: كَانَ يَقْرَؤُهُمَا قِرَاءَةً بَطِيئَةً.

আমি সূরা ‘ইউসুফ’ ও সূরা ‘হজ¦’ হযরত উমর রা. থেকে শুনে শুনেই হিফয করেছি। কারণ তিনি ফজরের নামাযে সূরা দুটি অনেক বেশি তিলাওয়াত করতেন। তিনি তিলাওয়াত করতেন ধীরে ধীরে। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭১৫

আবু রাফে রাহ. বলেন-

كَانَ عُمَرُ يَقْرَأُ فِي صَلَاةِ الصّبْحِ بِمِئَةٍ مِنَ الْبَقَرَةِ، وَيُتْبِعُهَا بِسُورَةٍ مِنَ الْمَثَانِي أَوْ مِنْ صُدُورِ الْمُفَصّلِ، وَيَقْرَأُ بِمِئَةٍ مِنْ آلِ عِمْرَانَ، وَيُتْبِعُهَا بِسُورَةٍ مِنَ الْمَثَانِي أوْ مِنْ صُدُورِ الْمُفَصّلِ.

হযরত উমর রা. ফজরের (প্রথম রাকাতে) সূরা ‘বাক্বারা’ থেকে একশ আয়াত পড়তেন। তারপর (দ্বিতীয় রাকাতে) ‘মাসানী’ থেকে অথবা ‘মুফাসসালের’ শুরু অংশ থেকে পড়তেন। আবার কখনো (প্রথম রাকাতে) সূরা ‘আলে ইমরান’ থেকে একশ আয়াত পড়তেন। তারপর (দ্বিতীয় রাকাতে) ‘মাসানী’ অথবা ‘মুফাসসালের’ শুরু অংশ থেকে পড়তেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৮৩

‘মুফাসসালের’ সূরাসমূহ ব্যতীত অন্য যেসব সূরার আয়াত সংখ্যা একশ থেকে কম, ঐ সূরাগুলোকে ‘মাসানী’ বলা হয়। -আল ইতকান ফী উলূমিল কুরআন খ. ১ পৃ. ২০০

ফুরাফিসা ইবনে উমাইর রাহ. বলেন-

مَا أَخَذْتُ سُورَةَ يُوسُفَ إِلاّ مِنْ قِرَاءَةِ عُثْمَانَ بْنِ عَفّانَ إِيّاهَا فِي الصّبْحِ مِنْ كَثْرَةِ مَا كَانَ يُرَدِّدُهَا لَنَا.

আমি হযরত উসমান রা.-এর ফজরের তিলাওয়াত থেকেই সূরা ‘ইউসুফ’ শিখেছি। কারণ এই সূরাটি তিনি আমাদের সামনে বারবার তিলাওয়াত করতেন। -মুয়াত্তা মালিক, বর্ণনা ২২০; শারহু মা‘আনিল আছার, বর্ণনা ১০৯০

আবু আবদুর রহমান সুলামী রাহ. বলেন-

أَمّنَا عَلِيّ فِي الْفَجْرِ، فَقَرَأَ بِالْأَنْبِيَاءِ.

হযরত আলী রা. ফজরের নামাযে আমাদের ইমামতি করলেন। নামাযে তিনি সূরা ‘আম্বিয়া’ তিলাওয়াত করলেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭০৮; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৮১

আবু আমর শাইবানী রাহ. বলেন-

صَلّى بِنَا عَبْدُ اللهِ الْفَجْرَ، فَقَرَأَ بِسُوْرَتَيْنِ، الْآخِرَةُ مِنْهُمَا بَنُوْ إِسْرَائِيلَ.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামায আদায় করলেন। তিনি দুটি সূরা তিলাওয়াত করলেন। দ্বিতীয় সূরাটি ছিল সূরা ‘বানী ইসরাইল’। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৭০

আমর ইবনে মাইমুন রাহ. বলেন-

أنّ مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ صَلّى الصّبْحَ بِاليَمَنِ، فَقَرَأ بِالنِّسَاءِ.

হযরত মু‘আয ইবনে জাবাল রা. (একদিন) ইয়েমেনে ফজরের নামায আদায় করলেন। নামাযে তিনি সূরা ‘নিসা’ তিলাওয়াত করলেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৭৩

নাফে রাহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর ব্যাপারে বলেন-

كَانَ يَقْرَأ فِي الْفَجْرِ بِالسّوْرَةِ الّتِيْ يُذْكَرُ فِيهَا يُوسفُ، والّتي يُذْكر فِيها الكَهْفُ.

তিনি ফজরের নামাযে হযরত ইউসুফ আ.-এর আলোচনা সম্বলিত সূরা (অর্থাৎ সূরা ‘ইউসুফ’) এবং কাহফের আলোচনা সম্বলিত সূরা (অর্থাৎ সূরা ‘কাহফ’) তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৭৪

সাহাবায়ে কেরামের পরে তাবেঈনও ফজরের নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’-এর বাইরে থেকে লম্বা সূরা তিলাওয়াত করেছেন।

ওয়ালীদ ইবনে জুমাই রাহ. বলেন-

صَلّيْتُ خَلْفَ إِبْرَاهِيمَ، فَكَانَ يَقْرَأ فِي الصّبْحِ بـ يس وَأَشْبَاهِهَا، وَكَانَ سَرِيعَ الْقِرَاءَةِ.

আমি ইবরাহীম নাখাঈ রাহ.-এর পিছনে নামায পড়েছি। তিনি ফজরের নামাযে সূরা ‘ইয়াসীন’ ও এই ধরনের সূরা তিলাওয়াত করতেন। আর তিনি ছিলেন দ্রুত তিলাওয়াতকারী। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৮০

আমর ইবনে ইয়া‘লা রাহ. সাঈদ ইবনে জুবাইর রাহ. স¤পর্কে বলেন-

أَنّهُ أَمّهُمْ فِي الْفَجْرِ، فَقَرَأَ بَنِي إِسْرَائِيلَ فِي رَكْعَتَيْنِ.

তিনি ফজরের নামাযে তাদের ইমামতি করলেন। তিনি সূরা ‘বানী ইসরাঈল’ তিলাওয়াত করলেন দুই রাকাতে। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭১৪; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৭৩৬

আতা ইবনে সা’ইব রাহ. বলেন-

صَلّيْتُ خَلْفَ عَرْفَجَةَ، فَرُبّمَا قَرَأَ بِالْمَائِدَةِ فِي الْفَجْرِ.

আমি আরফাজা রাহ.-এর পিছনে নামায পড়েছি। কখনো তিনি ফজরের নামাযে সূরা ‘মায়িদা’ তিলাওয়াত করেছেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৭৭

ফজরের নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’-এর শুরু থেকে তিলাওয়াত

ইয়াযীদ ইবনে আবদুর রহমান আওদী রাহ. বলেন-

صَلّيْتُ خَلْفَ عَلِيٍّ الصّبْحَ، فَقَرَأَ بِـ سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى.

আমি হযরত আলী রা.-এর পিছনে ফজরের নামায পড়েছি। নামাযে তিনি سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى (সূরা আ‘লা) তিলাওয়াত করেছেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৭৮, ৩৫৭১

আবু সাওয়ার কাযী রাহ. বলেন-

صَلّيْتُ خَلْفَ ابْنِ الزّبَيْرِ الصّبْحَ، فَسَمِعْتُهُ يَقْرَأُ: أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ.

আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা.-এর পিছনে ফজরের নামায পড়েছি। নামাযে আমি তাকে পড়তে শুনেছি أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ (সূরা ফাজ্র : ৬-৭)। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৭৯

উল্লেখিত হাদীস ও আছারসমূহের শিক্ষা

আলহামদু লিল্লাহ, ফজরের কেরাত সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো হাদীস ও আছার উল্লেখ করা হল। এখন প্রয়োজন হল এই হাদীস ও আছারসমূহের দাবি ও উদ্দেশ্য এবং এগুলোর উপর আমল করার তরিকা ও পদ্ধতি সম্পর্কে অবগতি লাভ করা। এজন্য আমাদেরকে শরণাপন্ন হতে হবে ইমাম আবু হানীফা রাহ. ও অন্যান্য ফুকাহায়ে কেরামের প্রতি। কেননা অনিবার্য বাস্তবতা এটাই- যেমনটি ইমাম তিরমিযী রাহ.-ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন- وَكَذَلِكَ قَالَ الفُقَهَاءُ وَهُمْ أَعْلَمُ بِمَعَانِي الحَدِيثِ অর্থাৎ হাদীসের অর্থ ও মর্মের ব্যাপারে অধিক জ্ঞান ও গভীর প্রজ্ঞা রাখেন ফুকাহায়ে কেরাম।

হানাফী মাযহাবের তৃতীয় ইমাম, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শাইবানী রাহ. (১৮৯ হিজরী) ‘কিতাবুল আছল’-এ নামাযে কেরাতের পরিমাণ নিয়ে আলোচনা শুরুই করেছেন ঐ হাদীস দিয়ে যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

من أمّ قَوْمَا فليصَلِّ بِهِمْ صَلَاةَ أَضْعَفِهِمْ، فَإِنّ فِيهِمُ الْمَرِيضَ وَالضّعِيفَ والْكَبِيرَ وَذَا الْحَاجَةِ.

অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোনো জামাতের ইমামতি করবে সে উপস্থিত সবচে দুর্বল মুসল্লীর প্রতি খেয়াল রেখে নামায আদায় করবে। কেননা তাদের কেউ অসুস্থ থাকতে পারে। কোনো শিশু, কোনো বৃদ্ধ, কোনো প্রয়োজনগ্রস্ত ব্যক্তি (অর্থাৎ কোনো তাড়া থাকার দরুন যার জলদি জলদি নামায থেকে ফারেগ হওয়া প্রয়োজন) এমন কেউ সেখানে থাকতে পারে। -কিতাবুল আছল, খ. ১ পৃ. ১৩৭; কিতাবুল আছার, নুসখায়ে ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. পৃষ্ঠা ৩৮; কিতাবুল আছার, নুসখায়ে ইমাম আবূ ইউসুফ রাহ. পৃষ্ঠা ২৭

এই হাদীসটি উল্লেখ করে ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. লিখেন, নামাযে সূরা ফাতিহা তো পড়তেই হবে। সূরা ফাতিহার পর ফজরের দুই রাকাতে চল্লিশ আয়াত পড়বে। যোহরের প্রথম দুই রাকাতে (মোটামুটি) এ পরিমাণ কিংবা এরচে কিছু কম পড়বে।

(فكم يَقْرَأُ فِي الرّكْعَتَيْنِ مِنَ الظّهْرِ؟ قاَلَ : يقرأ بنحو من ذلك أودونه.)

আছর এবং ইশার প্রথম দুই রাকাতে বিশ আয়াত পড়বে। আর মাগরিবের প্রথম দুই রাকাতের প্রতি রাকাতে ছোট কোনো সূরা পড়বে- পাঁচ-ছয় আয়াতের। -কিতাবুল আছল, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শাইবানী, খ. ১ পৃ. ১৩৭

 باب ماجاء في القيام في الفريضة، ناشر : دار ابن حزم بيروت ১৪৩৩هـ

উল্লেখিত মাসআলায় আমাদের তিন ইমামই (ইমাম আবু হানীফা রাহ., ইমাম আবু ইউসুফ রাহ. ও ইমাম মুহাম্মাদ রাহ.) একমত। কেননা কিতাবুল আছলে এক্ষেত্রে কোনো ইখতেলাফ উল্লেখ করা হয়নি।

ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. ‘আল জামিউস সাগীর’-এ ইমাম আবু হানীফা রাহ.-এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন-

وَيقْرَأ فِي الْحَضَر فِي الْفجْر فِي الرّكْعَتَيْنِ بِأَرْبَعِينَ أَو خمسين (أو ستين) آيَة سوى فَاتِحَة الْكتاب، وَكَذَلِكَ فِي الظّهْر، وَالْعصر وَالْعشَاء سَوَاء، وَفِي الْمغرب دون ذَلِك.

অর্থাৎ মুকীম অবস্থায় ফজরের উভয় রাকাতে সূরা ফাতিহা ব্যতীত মোট চল্লিশ অথবা পঞ্চাশ (অথবা ষাট) আয়াত পড়বে। যোহরেও সে পরিমাণ পড়বে। আর আছর ও ইশার কেরাত বরাবর। আর মাগরিবের কেরাত এরচে কম।

(আল জামিউস সাগীর, পৃষ্ঠা ৭২

 باب القراءة في الصلاة، الناشر : دار ابن حزم بيروت ১৪৩২هـ)

বন্ধনীর অংশটুকুর জন্য দ্রষ্টব্য : মাবসূত সারখসী, খ. ১ পৃ. ১৬২

 باب القيام في الفريضة، الناشر: دار المعرفة بيروت ১৪০৬هـ

আলমুহীতুল বুরহানী, খ. ২ পৃ. ৪৪

 كتاب الصلاة، الفصل الثاني، الناشر: إدارة القرآن كراچى ১৪২৪هـ

বাদায়েউস সানায়ে খ. ১ পৃ. ৪৭৮

 كتاب الصلاة، القدر المستحب من القراءة، الناشر : دار إحياء التراث العربي بيروت ১৪১৯هـ

এই তিনও কিতাবে ‘আলজামেউস সগীর’-এর উদ্ধৃতিতে >أو ستين< (অথবা ষাট) অংশটিও রয়েছে।

ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, প্রথম দুই রাকাতে এত এত পরিমাণ তিলাওয়াত করবে। এর অর্থ হল, দুই রাকাতে সর্বমোট এত আয়াত তিলাওয়াত করবে। প্রতি রাকাতেই এ পরিমাণ তিলাওয়াত করবে- এমনটি উদেশ্য নয়। (আলমুহীতুল বুরহানী ৪/৮৮; ফাতহুল কাদীর ১/৩৩৪)

আল্লামা ফখরুদ্দীন যায়লায়ী রাহ. বলেছেন- যেমন, প্রথম রাকাতে পড়বে পঁচিশ আয়াত এবং দ্বিতীয় রাকাতে পড়বে পনের আয়াত। (তাবয়ীনুল হাকায়েক ১/৩৩৪)

মুতাআখখিরীন ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, মুস্তাহাব হল, ফজর ও যোহরে তিওয়ালে মুফাসসাল থেকে পড়া, আছর ও ইশাতে আওসাতে মুফাসসাল থেকে পড়া এবং মাগরিবে কিসারে মুফাসসাল থেকে পড়া। তবে ইমাম কুদূরী রাহ.-সহ অন্যান্য ফুকাহায়ে কেরাম এও বলেছেন যে, যোহরেও আছর ও ইশার মতো আওসাতে মুফাসসালই পড়বে।

মুতাআখখিরীন ফুকাহায়ে কেরাম যে মুফাসসাল থেকে পড়াকে মুস্তাহাব বলেছেন, এ কথায় এবং আমাদের ইমামগণের কথায় কোনো তাআরুয বা বিরোধ নেই।

কেননা ইমামগণের উদ্দেশ্য এই নয় যে, কেরাতের সুন্নত আদায় করার ক্ষেত্রে মুফাসসালের কোনো দখলই নেই। আর মুতাআখখিরীন ফুকাহায়ে কেরামের উদ্দেশ্যও এটা নয় যে, জামাতের নামাযে মুফাসসালের বাইরে থেকে মুস্তাহাব কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণ (যা কিতাবুল আছল ও আলজামেউস সগীর-এর উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে।) পড়লে তা খেলাফে সুন্নত হবে- বিষয়টি কখনোই এমন নয়।

বরং (ছকে উদ্ধৃত) তারতীব অনুযায়ী মুফাসসাল থেকে পড়া হলে তাতেও মাসনূন কেরাত আদায় হয়ে যাবে। আবার (ছকে উদ্ধৃত) পরিমাণ অনুযায়ী মুফাসসালের বাইরে থেকে পড়া হলেও মাসনূন কেরাত আদায় হয়ে যাবে।

অবশ্য মুফাসসালের সূরাগুলো থেকেই ইমামতি করা সহজ। আর সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত একটি সহীহ হাদীস থেকেও এমনটি বুঝে আসে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয নামাযের জামাতে মুফাসসালের সূরাগুলো থেকে বেশি তিলাওয়াত করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৮১৪; ফাতহুল বারী, ইবনে রজব, খ. ৪ পৃ. ৪৩৩)

তেমনিভাবে উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে একথা ভাবাও ভুল যে, মুফাসসালের যে দুই সূরা মিলে মোট চল্লিশ আয়াত হয় না এমনসব সূরা তিলাওয়াত করলে মাসনূন কেরাত আদায় হবে না।

যেমন ফজরের প্রথম রাকাতে সূরা জুমুআ পড়ল এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা মুনাফিকূন পড়ল তাহলে নিঃসন্দেহে মাসনূন কেরাত আদায় হয়ে যাবে। যদিও এ দুই সূরার প্রত্যেকটিতে মাত্র এগারটি করে আয়াত-অর্থাৎ দুই সূরা মিলে সর্বমোট আয়াত হয় বাইশটি।

কেননা এ দুই সূরার আয়াতগুলো বড় বড়। তিওয়ালে মুফাসসালেরই আরেকটি সূরা হল সূরা তাকবীর। এর মোট আয়াত সংখ্যা ২৯টি হলেও পরিমাণে তা সূরা জুমুআ এবং সূরা মুনাফিকূন উভয়টি থেকে ছোট। অথচ সহীহ হাদীসেই রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযে সূরা তাকবীর তিলাওয়াত করেছেন।

কেরাতের মাসনূন পরিমাণ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম বুরহানুদ্দীন মাহমূদ আলবুখারী রাহ. (৫৫১ হি.-৬১৬ হি.) ‘আল মুহীতুল বুরহানীতে’ (খ. ২ পৃ. ৪৪) খুব চমৎকার কথা উল্লেখ করেছেন-

ولما اختلفت الآثار في مقادير القراءة اختلفت مقادير محمد رحمه الله، وباختلاف الآثار يستدل على أن في الأمر سعة.

মোদ্দাকথা হল, মাসনূন কেরাত কোনো এক নির্দিষ্ট পরিমাণে (যেমন শুধু চল্লিশ আয়াত) কিংবা নির্দিষ্ট কোনো সূরায় সীমাবদ্ধ নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খুলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেঈনের আমলের মাঝে এক্ষেত্রে বৈচিত্র্য পাওয়া যায়। অতএব এ থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, মাসনূন কেরাতের ব্যাপারে توسع বা ব্যাপকতা রয়েছে। তাই একে সীমাবদ্ধ করে ফেলা উচিত নয়।

ফুকাহায়ে কেরাম এক্ষেত্রে ঐ বিষয়গুলোও উল্লেখ করেছেন, যেগুলো বিবেচনায় রেখে ইমাম সাহেব সুন্নত কেরাতের বিভিন্ন পদ্ধতির কোনো একটি গ্রহণ করবেন, যাতে মুসল্লীদের জন্য চাপ হয়ে না যায়।

উদাহরণস্বরূপ যে মৌসুমে রাত লম্বা হয়, মানুষের ঘুম পুরা হয়ে যায়, ঐ সময় ফজরের কেরাত কিছুটা দীর্ঘ হলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যে মৌসুমে রাত ছোট থাকে, ঐ সময় ফজরের কেরাত লম্বা করলে মুসল্লীদের জন্য তা কষ্টকর হয়ে যেতে পারে। তেমনিভাবে বেশি গরমের সময় দীর্ঘ কেরাত কষ্টের কারণ হয়। কিন্তু মৌসুম স্বাভাবিক থাকলে এমন হয় না।

তেমনিভাবে যে মসজিদে নির্ধারিত মুসল্লী থাকেন এবং সকলেই ইবাদতে আগ্রহী ও উদ্যমী হন, তাদের জন্য দীর্ঘ কেরাত কষ্টকর কিছু নয়। পক্ষান্তরে যে মসজিদের মুসল্লীগণ ব্যস্ত থাকেন কিংবা ইবাদতে যারা কম উদ্যমী তাদের জন্য দীর্ঘ কেরাত চাপ হয়ে যেতে পারে।

তেমনিভাবে যেই ইমাম সাহেব ঝরঝরে পড়েন এবং যার কেরাতে মুসল্লীগণ আকর্ষণ বোধ করেন, এমন ইমামের দীর্ঘ কেরাতও সংক্ষিপ্ত মনে হয়। অন্যথায় সংক্ষিপ্ত কেরাতও অনেক সময় দীর্ঘ মনে হয়।

হাট-বাজারের মসজিদগুলোতে, রাস্তার পাশের মসজিদগুলোতে (তেমনিভাবে স্টেশন ও তার আশপাশের মসজিদগুলোতে) ব্যস্ত মুসল্লীদের সংখ্যা বেশি থাকে। তাদের বিভিন্ন তাড়া থাকে। জলদি জলদি তারা নামায থেকে ফারেগ হতে চান। তাদের জন্য দীর্ঘ কেরাতে নামায পড়া কষ্টকর হয়ে যায়। আর যে মসজিদ এমন নয় সেখানে অবস্থা ভিন্ন রকম হয়।

তেমনিভাবে ছোট ছোট আয়াতের ত্রিশ আয়াত বিশিষ্ট সূরা বড় বড় আয়াতের পনের আয়াত বিশিষ্ট সূরার সমান হয়ে থাকে।

এধরনের বিভিন্ন হালাত ও অবস্থা বিবেচনায় রেখে ফুকাহায়ে কেরাম যে উসূল বলেছেন, তার খোলাসা হল- ইমাম সাহেবের কর্তব্য হচ্ছে মুসল্লীদের হালতের প্রতি খেয়াল রাখা।

হযরত আবূ মাসউদ আনসারী রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, আমি অমুকের কারণে ফজরের জামাতে শরীক হই না। সে নামায (খুব) দীর্ঘ করে! আবূ মাসউদ বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেদিন যতটা নারাজ হতে দেখেছি, নসীহত করার সময় এমন নারাজ হতে আর কখনও দেখিনি। অতপর নবীজী বললেন-

يَا أَيّهَا النّاسُ إِنّ مِنْكُمْ مُنَفِّرِينَ، فَأَيّكُمْ أَمّ النّاسَ فَلْيُوجِز، فَإِنّ مِنْ وَرَائِهِ الْكَبِيرَ وَالضّعِيفَ وَذَا الْحَاجَةِ.

লোকসকল, তোমাদের কেউ কেউ এমন রয়েছে, যে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। তোমাদের যে কেউই ইমামতি করবে, তার কর্তব্য হচ্ছে, সে নামায সংক্ষিপ্ত করবে। কেননা তার পিছে বৃদ্ধ, দুর্বল ও প্রয়োজনগ্রস্ত ব্যক্তিও থাকে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৬৬; সহীহ বুখারী, হাদীস ৭০২, ৭০৪)

অন্য হাদীসে রয়েছে-

إِذَا أَمّ أَحَدُكُمُ النّاسَ فَلْيُخَفِّفْ، فَإِنّ فِيهِمُ الصّغِيرَ، وَالْكَبِيرَ، وَالضّعِيفَ، وَالْمَرِيضَ، فَإِذَا صَلّى وَحْدَهُ فَلْيُصَلِّ كَيْفَ شَاء.

 যে ব্যক্তি লোকদের ইমামতি করবে সে যেন নামায সংক্ষিপ্ত করে।… আর যখন একাকী নামায পড়বে তখন যত ইচ্ছা নামায দীর্ঘ করুক। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৬৭; সহীহ বুখারী, হাদীস ৭০৩)

হযরত জাবের ইবনে সামুরা রা. যে হাদীসে একথা বলেছেন যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযে সূরা ক্বাফ বা এ ধরনের অন্য কোনো সূরা তিলাওয়াত করতেন, সে হাদীসে তিনি এও বলেছেন যে, (وكانت صلاته بعد تخفيفا) এই বাক্যটির একটি ব্যাখ্যা এও যে- পরবর্তীতে (যখন মুসল্লীদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল তখন) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামায আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৫৮)

এসব হাদীস থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে নামাযে খুব দীর্ঘ কেরাতের যেসকল বিবরণ পাওয়া যায়, সেগুলো সেই প্রেক্ষাপটে ছিল যখন মুসল্লী সীমিত ও নির্ধারিত ছিল এবং এমন দীর্ঘ তিলাওয়াতে কষ্ট হত না।

নতুবা ইমাম সাহেবানের জন্য আম হেদায়েত তো এটাই যে, তারা নামায সংক্ষিপ্ত করবেন। অর্থাৎ মুস্তাহাব কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণ তিলাওয়াত করবেন। চাইলে এর চেয়ে কিছু বেশি পড়তে পারেন। তবে খুব দীর্ঘ করবেন না এবং নামাযের আরকান, তাসবীহ-দুআ ইত্যাদি বিষয়গুলো সুন্নত তরীকায় ধীরস্থিরভাবে আদায় করবেন; বেশি লম্বা করবেন না।

আর বিশেষ জরুরতে কিংবা ওজর বশত তো বহারহাল সূরা কাউসার ও সূরা ইখলাস দিয়েও নামায পড়া জায়েয আছে। কেরাতের উল্লেখিত পরিমাণ তো কেবল মাসনূন ও মুস্তাহাব, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুআক্কাদাহ নয়।১ (এখানের আরবী টীকাটি প্রবন্ধের শেষে দেখুন)

বিশেষ কারণে ফজরসহ অন্যান্য নামাযে কেরাত সংক্ষিপ্ত করা

স্বাভাবিক অবস্থায় তো ফজরের নামায ও অন্যান্য নামাযে মাসনূন কেরাত রয়েছে। তবে বিশেষ কোনো কারণে নাস, ফালাক, ইখলাছ ও কাফিরূনের মত ছোট ছোট সূরা যেকোনো নামাযে তিলাওয়াত করায় অসুবিধা নেই। এমনকি বিশেষ অবস্থায় এমন করা হলে তা সুন্নাহর মধ্যে শামিল হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর অবস্থায় সূরা নাস ও সূরা ফালাক দিয়ে ফজরের  নামায আদায় করেছেন- এমন একটি চমৎকার বর্ণনা হাদীস শরীফে রয়েছে। হাদীসটি নিম্নে তুলে ধরছি-

عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ، قَالَ: كُنْتُ أَقُودُ بِرَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ نَاقَتَهُ فِي السّفَرِ، فَقَالَ لِي: يَا عُقْبَةُ، أَلَا أُعَلِّمُكَ خَيْرَ سُورَتَيْنِ قُرِئَتَا؟ فَعَلّمَنِي قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ، وَ قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النّاسِ، قَالَ: فَلَمْ يَرَنِي سُرِرْتُ بِهِمَا جِدّا، فَلَمّا نَزَلَ لِصَلَاةِ الصّبْحِ صَلّى بِهِمَا صَلَاةَ الصّبْحِ لِلنّاسِ، فَلَمّا فَرَغَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ مِنَ الصّلَاةِ الْتَفَتَ إِلَيّ، فَقَالَ: يَا عُقْبَةُ، كَيْفَ رَأَيْتَ؟

 হযরত উকবা বিন আমের রা. বলেন, আমি সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উট চালাচ্ছিলাম। একসময় তিনি আমাকে বললেন, হে উকবা! লোকেরা যেসকল সূরা তিলাওয়াত করে আমি কি তোমাকে এর মধ্য থেকে সর্বোত্তম দুটি সূরা শিক্ষা দিব না? এরপর তিনি আমাকে قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ  (সূরা ফালাক) এবং قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ (সূরা নাস) শেখালেন। কিন্তু এতে আমি তেমন খুশি হয়েছি বলে তিনি মনে করলেন না। পরবর্তীতে তিনি যখন ফজরের নামাযের জন্য অবতরণ করলেন, তখন এই দুইটি সূরা দ্বারাই নামায পড়ালেন। যখন তিনি নামায শেষ করলেন, আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, কেমন দেখলে, হে উকবা! -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৪৬২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৩৫০; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৫৪৩৬

বর্ণিত হাদীসে প্রথমত- নবী কারীম  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের হালতে ছিলেন এবং দ্বিতীয়ত- সাহাবী হযরত উকবা রা.-কে সূরা ফালাক ও সূরা নাস শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য ছিল। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাযে সূরা দুটি পাঠ করেছেন।

সাহাবায়ে কেরামও সফর বা অন্য কোনো ওজরের কারণে নামাযে সংক্ষিপ্ত কেরাত পড়তেন।

আমর ইবনে মাইমুন রাহ. বলেন-

صَلّى بِنَا عُمَرُ الْفَجْرَ فِي السّفَرِ، فَقَرَأ بِـ: قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُوْنَ، و قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ.

হযরত উমর রা. সফরের সময় আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামায আদায় করলেন। নামাযে তিনি قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُوْنَ (সূরা কাফিরূন) এবং قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ (সূরা ইখলাস) তিলাওয়াত করলেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৭০৩; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭৩৩, ২৭৩৫

অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত উমর রা. সফরের সময় ফজরের নামাযে সূরা ‘ফীল’ ও সূরা ‘কুরাইশ’ তিলাওয়াত করেছেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭৩৪; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৭০২

আবু ওয়া’ইল রাহ. বলেন-

صَلّى بِنَا ابْنُ مَسْعُودٍ الْفَجْرَ فِي السّفَرِ، فَقَرَأ بِآخِرِ بَنِي إِسْرَائِيلَ: الْحَمْدُ لِلهِ الّذي لَمْ يَتّخِذْ وَلَدًا، ثُمّ رَكَعَ.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. সফরে আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামায আদায় করলেন। নামাযে তিনি সূরা ‘বানী ইসরাঈল’-এর শেষ আয়াত  الْحَمْدُ لِلهِ الَّذي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا তিলাওয়াত করলেন। এরপর রুকুতে চলে গেলেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৭০৬

ইবরাহীম নাখাঈ রাহ. বলেন-

كَانَ أصْحَابُ رَسُولِ الله صلى الله عليه وسلم يَقْرَؤُوْنَ فِي السّفَرِ بِالسّوَرِ القِصَارِ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ সফরে ছোট ছোট সূরা তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৭০৪

আমর ইবনে মাইমূন রাহ. বলেন-

أَنّ عُمَرَ بْنَ الْخَطّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ لَمّا طُعِنَ، قَدّمُوا عَبْدَ الرّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ، صَلّى بِهمُ الْفَجْرَ، فَقَرَأَ: إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللهِ، وَ إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ.

হযরত উমর রা. যখন আহত হলেন, তখন তারা হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. কে আগে বাড়িয়ে দিলেন। তিনি ফজরের নামায পড়ালেন। নামাযে তিনি إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللهِ (সূরা নাছ্র) এবং إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ (সূরা কাউসার) তিলাওয়াত করলেন। -সুনানে বাইহাকী খ. ২ পৃ. ৩৯০; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭৪০

এখানে বিশেষ পরিস্থিতির কারণে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. ফজরের  কেরাত সংক্ষিপ্ত করেছেন।

এসব বর্ণনা থেকে একথা প্রমাণিত হল যে, বিশেষ কোনো অবস্থার প্রেক্ষাপটে ফজর ও অন্য যেকোনো নামাযে ছোট ছোট সূরা পড়া হলে কোনো সমস্যা নেই।

যোহর ও আসরের কেরাত

কোনো কোনো হাদীস থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ পড়েছেন বলে জানা যায়। আবার কোনো কোনো হাদীসে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ থেকে পড়ার কথাও পাওয়া যায়।

প্রথমে যোহরের নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’-এর হাদীস ও আছার উল্লেখ করা হল।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন-

كُنّا نَحْزِرُ قِيَامَ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ فِي الظّهْرِ وَالْعَصْرِ، فَحَزَرْنَا قِيَامَهُ فِي الرّكْعَتَيْنِ الْأُولَيَيْنِ مِنَ الظّهْرِ قَدْرَ قِرَاءَةِ الم تَنْزِيلُ السّجْدَةِ.

আমরা যোহর ও আসরের  নামাযে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কিয়াম (দাঁড়িয়ে থাকা) পরিমাপ করতাম। যোহরের প্রথম দুই রাকাতে তাঁর কিয়াম الم تنزيل السجدة (সূরা সাজদাহ) সূরাটি তিলাওয়াত পরিমাণ দীর্ঘ হত। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৫২

হযরত বারা ইবনে আযিব রা. বলেন-

كُنّا نُصَلِّي خَلْفَ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ الظّهْرَ، فَنَسْمَعُ مِنْهُ الْآيَةَ بَعْدَ الْآيَاتِ مِنْ سُورَةِ لُقْمَانَ وَالذّارِيَاتِ.

আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে যোহরের নামায আদায় করতাম। তো আমরা মাঝে মধ্যে তার থেকে সূরা ‘লুকমান’ ও সূরা ‘যারিয়াত’-এর এক-দুই আয়াত শুনতে পেতাম। -সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৭১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৮৩০

উল্লেখ্য, সূরা সিজদার আয়াত সংখ্যা ত্রিশ এবং সূরা লুকমানের আয়াত সংখ্যা চৌত্রিশ। সূরা যারিয়াতের আয়াতগুলো ছোট ছোট এবং এর আয়াত সংখ্যা ষাট।

হযরত বুরাইদা রা. বলেন-

أَنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ كَانَ يَقْرَأُ فِي الظّهْرِ بِـ إِذَا السّمَاءُ انْشَقّتْ وَنَحْوِهَا.

নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের নামাযে إِذَا السَّمَاءُ انْشَقَّتْ (সূরা ইনশিক্বাক্ব) এবং এই ধরনের সূরা তিলাওয়াত করতেন। -সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ৫১১

আবুল মুতাওয়াক্কিল নাজী রাহ. বলেন-

أنّ عُمَرَ قَرَأ فِي صَلَاةِ الظّهْرِ بِـ ق وَالذّارِيَاتِ.

উমর রা. যোহরের নামাযে সূরা ‘ক্বাফ’ ও সূরা ‘যারিয়াত’ তিলাওয়াত করেছেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৯৪

মুওয়াররিক ইজলী রাহ. বলেন-

كَانَ ابْنُ عُمَرَ يُصَلِّيْ، فَيَقْرَأ فِي الظّهْرِ بِقَاف وَاقْتَرَبَتْ.

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. যোহরের নামাযে সূরা ‘ক্বাফ’ ও সূরা ‘ইকতারাবাত’ (অর্থাৎ সূরা ক্বামার) তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৯৭, ২৬৮০

নাফে রাহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর ব্যাপারে বলেন-

أنّه كانَ يَقْرَأ فِي الظّهْرِ الّذِيْنَ كَفَرُوْا.

তিনি যোহরের নামাযে الّذِيْنَ كَفَرُوْا  (সূরা মুহাম্মাদ) তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৮১, ২৬৮২

যোহরের নামাযে ‘মুফাসসাল’-এর বাইরে থেকে তিলাওয়াত

সাহাবায়ে কেরাম কখনো কখনো যোহরের নামাযে ‘মুফাসসাল’-এর বাইরে থেকেও দীর্ঘ কেরাত পড়েছেন।

মুওয়াররিক ইজলী রাহ. বলেন-

صَلّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عُمَرَ الظّهْرَ، فَقَرَأ بِسُوْرَةِ مَرْيَم.

আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর পিছনে যোহরের নামায আদায় করেছি। তিনি নামাযে সূরা ‘মারয়াম’ তিলাওয়াত করেছেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৯৬

মুজাহিদ রাহ. বলেন-

سَمِعْتُ عَبْدَ اللهِ ابْنَ عَمْرٍو يَقْرَأ فِي الظّهْرِ بِـ كهيعص.

আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা.-কে যোহরের নামাযে كهيعص (অর্থাৎ সূরা ‘মারয়াম’) তিলাওয়াত করতে শুনেছি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৯৭

ইবরাহীম নাখাঈ রাহ. বলেন-

إنِّيْ لَأقْرَأ فِي الظّهْرِ بِالصّافّاتِ.

আমি যোহরের নামাযে (কখনো) সূরা ‘সাফফাত’ তিলাওয়াত করি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৯৮

যোহর ও আসরের নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’

হযরত জাবের ইবনে সামুরাহ রা. বলেন-

أَنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ كَانَ يَقْرَأُ فِي الظّهْرِ بِـ سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى، وَفِي الصّبْحِ بِأَطْوَلَ مِنْ ذَلِكَ.

নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের নামাযে سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى (সূরা আ‘লা) তিলাওয়াত করতেন। আর ফজরে আরো দীর্ঘ কেরাত পড়তেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৬০

অন্য হাদীসে হযরত জাবের ইবনে সামুরাহ রা. বলেন-

أنّ رسولَ الله صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ كَانَ يَقْرَأُ فِيْ الظُهْرِ وَالعَصْرِ بِـ والسَمَاءِ ذَاتِ البُرُوْجِ وَ السَمَاءِ وَالطَارِق وَشِبْهِهِمَا.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর এবং আসরে والسماء ذات البروج (সূরা বুরূজ) এবং والسماء و الطارق (সূরা ত্বারিক্ব) এবং এ দুয়ের সমপরিমাণ সূরাসমূহ তিলাওয়াত করতেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৩০৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৮০৫

আরেক হাদীসে হযরত জাবের ইবনে সামুরাহ রা. বলেন-

كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ فِي الظّهْرِ وَالْعَصْرِ بِـ واللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى، وَ الشَّمْسِ وَضُحَاهَا وَنَحْوِهَا، وَيَقْرَأُ فِي الصّبْحِ بِأَطْوَلَ مِنْ ذَلِكَ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর ও আসরের নামাযে وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى (সূরা লাইল) এবং وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا  (সূরা শাম্স) এবং এ পরিমাণ অন্য কোনো সূরা তিলাওয়াত করতেন। আর ফজরের নামযে এর চেয়ে দীর্ঘ সূরা পড়তেন। -সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ৫১০

হযরত আনাস রা. এবং তাবেয়ীগণের আমল

হুমাইদ রাহ. বলেন-

صَلّيْتُ خَلْفَ أنَسٍ الظّهْرَ، فَقَرَأ بِـ سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى، وَجَعَلَ يُسْمِعُنَا الآيَةَ.

আমি আনাস রা. -এর পিছনে যোহরের নামায আদায় করেছি। নামাযে তিনি سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى (সূরা আ‘লা) তিলাওয়াত করেছেন। তিনি একটু অংশ কিছুটা আওয়াজ করে পড়লেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫৯৫, ৩৬৬৩

সাবিত রাহ. বলেন-

كَانَ أَنَسٌ يُصَلِّي بِنَا الظّهْرَ وَالْعَصْرَ، فَرُبّمَا أَسْمَعَنَا مِنْ قِرَاءَتِهِ: إِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ، وَ سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى.

আনাস রা. আমাদেরকে নিয়ে যোহর ও আসরের নামায আদায় করতেন। কখনো তিনি إِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ (সূরা ইনফিত্বার) এবং سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى (সূরা আ‘লা) পড়তেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৮৭

ইবরাহীম নাখাঈ রাহ.  (ওফাত ৯৫ হিজরী) বলেন-

كَانُوْا يَعْدِلُوْنَ الظّهْرَ بِالْعِشَاءِ.

তারা যোহরকে ইশার সমান গণ্য করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬০৫

অর্থাৎ ইশার নামাযে তারা যেমন ‘আওসাতে মুফাসসাল’ পড়তেন, তেমনিভাবে যোহরের নামাযেও তারা ‘আওসাতে মুফাসসাল’ পড়তেন।

সুফিয়ান সাওরী রাহ. বলেন-

وَقْتُ قِرَاءَةِ الْعَصْرِ: وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى، و سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى، وَ التِّينِ وَالزَّيْتُونِ.

আসরের কেরাতের পরিমাণ হল সূরা লাইল, সূরা আ‘লা ও সূরা তীন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৯০

সারকথা এই দাঁড়াল যে, যোহরের নামাযে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ ও ‘আওসাতে মুফাসসাল’ উভয় অংশ থেকেই তিলাওয়াত করেছেন। সাহাবায়ে কেরামও যোহরের নামাযে উভয় অংশ থেকেই তিলাওয়াত করেছেন।

তাই অনেক ফকীহের মতে যোহরের নামাযে আওসাতে মুফাসসাল থেকে পড়লেও সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। ফিকহে হানাফীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিতাব কিতাবুল আছল (আলমাবসূত)-এ ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেছেন- يقرأ بنحو من ذلك أو دونه অর্থাৎ যোহরে ফজরের কেরাতের কাছাকাছি বা এর চেয়ে কম পড়বে। -কিতাবুল আছল, খ. ১ পৃ. ১৩৭

মুনইয়াতুল মুসল্লী গ্রন্থে ইমাম কুদূরী রাহ.-এর উদ্ধৃতিতে যোহরের নামাযে আওসাতে মুফাসসাল পড়ার কথা রয়েছে। আল্লামা হালাবী রাহ. এই বক্তব্যের সমর্থন করে লিখেছেন-

وهذا اختيار من القدوري لرواية الأصل في الظهر، حيث جمعها مع العصر والعشاء، لا مع الفجر.

আল্লামা হালাবী আরো বলেছেন-

فهذا (حديث مسلم عن جابر بن سمرة) يؤيد رواية الأصل، فينبغي أن يكون العمل عليها سيما في زماننا. (غنية المتملي ২৭২-২৭১)

আর আল্লামা শুরুম্বুলালী রাহ. কিতাবুল আছলের বক্তব্যের পক্ষে উমর রা.-এর ফরমানটিকে দলীল হিসাবে পেশ করেছেন। যাতে তিনি আবূ মূসা রা.-কে যোহরে আওসাতে মুফাসসাল থেকে পড়তে বলেছেন। (ইমদাদুল ফাত্তাহ শরহে নূরুল ঈযাহ, পৃ.২৯০)

উক্ত রেওয়ায়েতটি জামে তিরমিযীর باب  القراءة في الصبح-এর পরের বাবে (হাদীস ৩০৪-এর অধীনে) উল্লেখিত হয়েছে। -ফাতহুল কাদীর ১/৩৩৫

আরো বর্ণিত হয়েছে ইবনে শাহীনের কিতাবে। দেখুন, আল বিনায়া, বদরুদ্দীন আইনী রাহ., খ. ২ পৃ.৩০৮ এবং হাশিয়াতুশ শিলবী আলা তাবয়ীনিল হাকায়েক ১/৩৩৩

উল্লেখ্য, এই বিষয়গুলো পেশ করার উদ্দেশ্য যোহরের নামাযে তিওয়ালে মুফাসসাল পড়তে অনুৎসাহিত করা নয়; বরং শুধু এতটুকু বলা যে, যদি যোহরে আওসাতে মুফাসসাল থেকে বা তার সমপরিমাণ পড়া হয় তাহলে এটাকে সুন্নত পরিপন্থী বা সুন্নতের লঙ্ঘন বলা যাবে না। কারণ এটাও  মাসনূন কেরাতের শামিল। দেখুন, ইলাউস সুনান ৪/২১,৩১

(وعبارته في الموضع الأول : وفي >شرح المنية< : وهذا من القدوري اختيار لرواية الأصل في الظهر حيث جمعها مع العصر والعشاء، لا مع الفجر اهـ. قلت : وبكل ورد الأثر، فالأمر واسع، وينبغي للإمام أن يراعي حال أهل زمانه، ولايوقعهم في السآمة والملال).

 

আসরের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’

আবু বকর ইবনে খালেদ ইবনে উরফুতা রাহ. বলেন-

تَعَلّمْتُ إذَا زُلْزِلَتِ الأرْض خَلْفَ خَبّابٍ فِي العَصْرِ.

এ বর্ণনা থেকে বোঝা যাচ্ছে সাহাবী খাব্বাব রা. আসরের নামাযে কখনো সূরা إذَا زُلْزِلَتِ  -ও (সূরা যিলযাল) পড়তেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬৬০

যিয়াদ ইবনে ফাইয়ায রাহ. বলেন-

سَأَلَ تَمِيمُ بْنُ سَلَمَةَ إِبْرَاهِيمَ، وَأَنَا أَسْمَعُ، عَنِ الْقِرَاءَةِ فِي الْعَصْرِ، قَالَ: هِيَ مِثْلُ الْمَغْرِبِ.

তামীম ইবনে সালামা রাহ. ইবরাহীম নাখাঈ রাহ.-কে আসরের কেরাত স¤পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। আর আমি তাদের কথোপকথন শুনছিলাম। তো ইবরাহীম নাখাঈ রাহ. বললেন, আসরের কেরাত হল মাগরিবের কেরাতের মতো। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৯০; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬০৩

ইবরাহীম নাখাঈ রাহ. (৯৫ হিজরী) বলেন-

كَانُوْا يَعْدِلُوْنَ الظّهْرَ بِالْعِشَاءِ، وَالْعَصْرَ بِالمَغْرِبِ.

তারা যোহরকে ইশার সমান গণ্য করতেন এবং আসরকে মাগরিবের সমান গণ্য করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬০৫

সুতরাং বুঝা যাচ্ছে, খাইরুল কুরূনে আছরের নামাযে কখনো কখনো কিসারে মুফাসসালের বড় কোনো সূরাও পড়া হয়েছে। তবে সাধারণ নিয়ম ছিল আওসাতে মুফাসসাল থেকে পড়ার।

মাগরিবের কেরাত

স্বাভাবিকভাবে মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’ সুন্নত- তা আমরা জেনেছি। কিন্তু মাগরিবের নামাযে দীর্ঘ কেরাতও যে জায়েয আছে, তাও জানা থাকা দরকার। নি¤েœর হাদীসগুলো লক্ষ্য করুন :

উম্মুল ফাযল রা. থেকে বর্ণিত-

خَرَجَ إِلَيْنَا رَسُوْلُ الله صلى الله عليه وسلم وَهُوَ عَاصِبٌ رَأسَهُ فِيْ مَرَضِه، فَصَلّى المَغْرِبَ، فَقَرَأَ بِالمُرْسَلاتِ، فَمَا صَلّاهَا بَعْدُ حَتّى لَقِيَ اللهَ عَزّ وجَلّ.

অন্তিম অসুস্থতার সময়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার মাগরিবের নামায পড়ানোর জন্য আগমন করলেন। মাথা ব্যথার কারণে তখন তাঁর মাথা মুবারক পট্টি দিয়ে বাঁধা ছিল। সেদিন তিনি মাগরিবের নামাযে সূরা ‘মুরসালাত’ তিলাওয়াত করলেন। এটিই ছিল তাঁর শেষ মাগরিব নামায। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৩০৮

হযরত জুবাইর ইবনে মুতইম রা. বলেন-

سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ قَرَأَ فِي المَغْرِبِ بِالطّورِ.

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মাগরিবের নামাযে সূরা ‘তূর’ পড়তে শুনেছি। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৬৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৬৩

সাহাবীগণও মাগরিবের নামাযে কখনো কখনো দীর্ঘ কেরাত পড়েছেন।

নাফে রাহ. বলেন-

أنّ ابْنَ عُمَرَ قَرَأ مَرّةً فِي المَغْرِبِ بِـ يس.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একবার মাগরিবের নামাযে সূরা ‘ইয়াসীন’ তিলাওয়াত করেছেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬১৯

আরেক বর্ণনায় নাফে বলেন-

أنّه قَرَأ فِي المَغْرِبِ بِـ يس وَ عَمَّ يَتَسَاءَلُوْن.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. মাগরিবের নামাযে সূরা ‘ইয়াসীন’ ও সূরা ‘নাবা’ তিলাওয়াত করেছেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬২০

আমর ইবনে মুররা রাহ. প্রমুখ বলেন-

سَمِعتُ ابْن عُمَرَ يَقْرَأ بِـ ق فِي المَغْرِبِ.

আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে মাগরিবের নামাযে সূরা ‘ক্বাফ’ তিলাওয়াত করতে শুনেছি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬১৮; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৯৫

তাউস ইবনে কাইসান রাহ. থেকে বর্ণিত-

أنّه سَمِعَ ابْنَ عُمَرَ قَرَأَ فِي الْمَغْرِبِ: إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا.

তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. -কে মাগরিবের নামাযে إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا (সূরা ফাত্হ) তিলাওয়াত করতে শুনেছেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৯৬

আবদুল্লাহ ইবনে হারিস রাহ. বলেন-

أنّ ابْنَ عَبّاس قَرَأ الدّخانَ فِي المَغْرِبِ.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. মাগরিবের নামাযে সূরা ‘দুখান’ তিলাওয়াত করেছেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬১৬

এসব বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, মাগরিবের নামাযে দীর্ঘ কিরাত পড়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো কোনো মসজিদে দেখা যায় ইমাম সাহেব মাগরিবের নামাযে কিসারে মুফাসসালের বাইরে কোনো সূরা পড়লেই কেউ কেউ আপত্তি করে বসে। এমন করা আদৌ ঠিক নয়। তবে সাধারণ নিয়ম হল, মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’ থেকে পড়াই উত্তম। সামনে এ বিষয়ের হাদীস ও আছার উল্লেখ করা হল।

মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’

এক্ষেত্রে প্রথমে সাহাবা ও তাবেঈনের আছার উল্লেখ করা হল।

সাহাবায়ে কেরামের আমল

আবু আবদুল্লাহ সুনাবিহী রাহ. বলেন-

قَدِمْتُ الْمَدِينَةَ فِي خِلاَفَةِ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ، فَصَلّيْتُ وَرَاءَهُ الْمَغْرِبَ، فَقَرَأَ فِي الرّكْعَتَيْنِ الْأُولَيَيْنِ بِأُمِّ الْقُرْآنِ وَسُورَةٍ سُورَةٍ مِنْ قِصَارِ الْمُفَصّلِ.

হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর খেলাফত কালে আমি মদীনায় আসলাম। আমি তাঁর পিছনে মাগরিবের নামায আদায় করলাম। তিনি প্রথম দুই রাকাতে উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) ও কিসারে মুফাসসাল থেকে একটি করে সূরা তিলাওয়াত করলেন। -মুয়াত্তা মালিক, বর্ণনা ২৫৯; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৯৮

হাসান বসরী রাহ. বলেন-

كَتَبَ عُمَرُ إِلَى أَبِي مُوسَى: أَنِ اقْرَأْ فِي الْمَغْرِبِ بِقِصَارِ الْمُفَصّلِ.

হযরত উমর রা. হযরত আবু মূসা আশ‘আরী রা.-কে লিখে পাঠিয়েছেন যে, তুমি মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’ থেকে তিলাওয়াত করবে। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৭২

যুরারা ইবনে আউফা রাহ. বলেন-

أَقْرَأَنِي أَبُو مُوسَى كِتَابَ عُمَرَ: أَنِ اقْرَأْ بِالنّاسِ فِي الْمَغْرِبِ بِآخِرِ الْمُفَصّلِ.

আবু মূসা আশ‘আরী রা. আমাকে উমর রা.-এর চিঠি পড়ে শুনিয়েছেন যে, তুমি লোকদের নিয়ে (অর্থাৎ জামাতে) মাগরিবের নামাযে ‘মুফাসসালের’ শেষ থেকে তিলাওয়াত করবে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১২৮১

‘কিসারে মুফাসসাল’কেই এখানে ‘মুফাসসালের শেষ’ বলে ব্যক্ত করা হয়েছে।

আমর ইবনে মাইমূন রাহ. বলেন-

صَلّى بِنَا عُمَرُ بْنُ الْخَطّابِ صَلَاةَ الْمَغْرِبِ، فَقَرَأَ فِي الرّكْعَةِ الْأُولَى بِـ التِّينِ وَالزَّيْتُونِ وَطُورِ سِينِينَ، وَفِي الرّكْعَةِ الْأَخِيرَةِ: أَلَمْ تَرَ وَ لِاِیْلٰفِ ِ جَمِيعًا.

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. আমাদেরকে মাগরিবের নামায পড়ালেন। প্রথম রাকাতে তিনি সূরা ‘তীন’ তিলাওয়াত করলেন আর দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ‘ফীল’ ও সূরা ‘কুরাইশ’ তিলাওয়াত করলেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৯৭, মুসান্নাফে ইবনে শাইবা, বর্ণনা ৩৬১৩

আবু উসমান নাহদী রাহ. থেকে বর্ণিত-

أنّه صَلّى خَلْفَ ابْنِ مَسْعُوْدٍ المَغْربَ، فَقَرَأ بِـ قُلْ هُوَ اللهُ أَحَد.

তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর পিছনে মাগরিবের নামায আদায় করেছেন। তো নামাযে ইবনে মাসউদ রা. قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ (সূরা ইখলাছ) তিলাওয়াত করেছেন। -সুনানে আবু দাউদ, বর্ণনা ৮১৫; সুনানে বাইহাকী খ. ২ পৃ. ৩৯১

আবু নাওফিল ইবনে আবু আকরাব রাহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. স¤পর্কে বলেন-

سَمِعتُه يَقْرَأ في المَغْرِبِ: إذَا جَاءَ نَصْرُ اللهِ وَالْفَتْحِ.

আমি তাকে মাগরিবের নামাযে إذَا جَاءَ نَصْرُ اللهِ وَالْفَتْحِ (সূরা নাছ্র) তিলাওয়াত করতে শুনেছি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬১৭

হাসান বসরী রাহ. বলেন-

كَانَ عِمْرَانُ ابْنُ حُصَيْنٍ يَقْرَأ في المَغْرِبِ: إذَا زُلْزِلَتْ، وَالعَادِيَات.

হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. মাগরিবের নামাযে সূরা إذَا زُلْزِلَتْ (সূরা যিলযাল) ও সূরা আদিয়াত তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, বর্ণনা ২৬২১

তাবেয়ীনের আমল

যাহহাক ইবনে উসমান রাহ. বলেন-

رَأَيْتُ عُمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ يَقْرَأُ فِي الْمَغْرِبِ بِقِصَارِ الْمُفَصّلِ.

আমি উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ.-কে মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’ তিলাওয়াত করতে দেখেছি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬২৭

হিশাম ইবনে উরওয়া রাহ. থেকে বর্ণিত-

أنّ أبَاه كَانَ يَقْرَأُ فِي صَلَاةِ المَغْرِبِ بِنَحْوِ مَا تَقْرَؤُوْنَ: وَالْعَادِيَاتِ وَنَحْوِهَا مِنَ السّوَرِ.

তার পিতা (উরওয়া ইবনে যুবাইর রাহ.) মাগরিবের নামাযে সূরা ‘আদিয়াত’ ও এজাতীয় সূরা পড়তেন, যেমনটি তোমরা পড়ে থাক। -সুনানে আবু দাউদ, বর্ণনা ৮১৩

রবী ইবনে সবীহ রাহ. বলেন-

كَانَ الحَسَنُ يَقْرَأُ فِي الْمَغْرِبِ: إِذَا زُلْزِلَت، وَالْعَادِيَاتِ، لَا يَدَعُهَا.

হাসান বসরী রাহ. মাগরিবের নামাযে সূরা إِذَا زُلْزِلَت (যিলযাল) ও সূরা ‘আদিয়াত’ তিলাওয়াত করতেন। এই সূরা দুটি (সাধারণত) তিনি ছাড়তেন না। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৫২৪

নুসাইর ইবনে যু‘লূক রাহ. রবী ইবনে খুসাইম রাহ. স¤পর্কে বলেন-

أَنّهُ كَانَ يَقْرَأُ فِي الْمَغْرِبِ بِقِصَارِ الْمُفَصّلِ، قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ، وَ قُلْ هُوَ اللهُ أَحَد.

তিনি মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’, قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُوْن  (সূরা কাফিরূন) ও قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ (সূরা ইখলাস) তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬২৬

মুহিল ইবনে মুহরিয রাহ. বলেন-

سَمِعْتُ إِبْرَاهِيمَ يَقْرَأُ فِي الرّكْعَةِ الْأُولَى مِنَ الْمَغْرِبِ: لِإِيلَافِ قُرَيْشٍ.

আমি ইবরাহীম নাখাঈ রাহ.-কে মাগরিবের প্রথম রাকাতে لِإِيْلَافِ قُرَيْش  (সূরা কুরাইশ) তিলাওয়াত করতে শুনেছি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬২৩

মাগরিবে ‘কিসারে মুফাসসাল’ পড়ার বিষয়ে মারফূ হাদীস

সুলাইমান ইবনে ইয়াসার রাহ. বলেন-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنّهُ قَالَ: مَا رَأَيْتُ رَجُلًا أَشْبَهَ صَلَاةً بِرَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ مِنْ فُلَانٍ، لِإِمَامٍ كَانَ بِالْمَدِينَةِ، قَالَ سُلَيْمَانُ بْنُ يَسَارٍ: فَصَلّيْتُ خَلْفَهُ، فَكَانَ يُطِيلُ الْأُولَيَيْنِ مِنَ الظّهْرِ، وَيُخَفِّفُ الْأُخْرَيَيْنِ، وَيُخَفِّفُ الْعَصْرَ، وَيَقْرَأُ فِي الْأُولَيَيْنِ مِنَ الْمَغْرِبِ بِقِصَارِ الْمُفَصّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الْأُولَيَيْنِ مِنَ الْعِشَاءِ مِنْ وَسَطِ الْمُفَصّلِ، وَيَقْرَأُ فِي الْغَدَاةِ بِطِوَالِ الْمُفَصّلِ.

হযরত আবু হুরাইরা রা. মদীনার এক আমীর স¤পর্কে বললেন, আমি তার থেকে অধিক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদৃশ নামায আদায়কারী আর কাউকে দেখিনি।

সুলাইমান ইবনে ইয়াসার রাহ. বলেন, আমি ঐ আমীরের পিছনে নামায পড়েছি। তিনি যোহরের প্রথম দুই রাকাত দীর্ঘ করতেন এবং শেষের দুই রাকাত সংক্ষিপ্ত করতেন। আসরের নামায সংক্ষিপ্ত করতেন। মাগরিবের প্রথম দুই রাকাতে ‘কিসারে মুফাসসাল’ পড়তেন। ইশার প্রথম দুই রাকাতে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ পড়তেন। ফজরের নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ পড়তেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৮৩৬৬, ৭৯৯১; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৮২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ৫২০; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ১৮৩৭; শারহু মা‘আনিল আসার, হাদীস ১২৭৯, ১২৮০

অনুরূপ হাদীস হযরত আনাস রা.-এর সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। -তাবাকাতে ইবনে সা‘দ খ. ৫ পৃ. ১৬১-১৬২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৮৩৬৬

ইমাম ত্বহাবী রাহ. বলেন-

فهذا أبو هريرة قد أخبر عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه كان يقرأ في صلاة المغرب بقصار المفصل.

এখানে হযরত আবু হুরাইরা রা. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে পরোক্ষভাবে সংবাদ দিলেন যে, তিনি মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’ তিলাওয়াত করতেন। -শারহু মা‘আনিল আসার খ. ১ পৃ. ৩৫১

হাফেয ইবনে রজব রাহ. বলেন-

فهذا حديث صحيح عن أبي هريرة وأنس، ويدل على أن النبي صلى الله عليه وسلم كان يقرأ في المغرب بقصار المفصل.

এটি হযরত আবু হুরাইরা রা. ও হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীস এবং হাদীসটি একথা বুঝাচ্ছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিবের নামাযে ‘কিসারে মুফাসসাল’ তিলাওয়াত করতেন। -ফাতহুল বারী, ইবনে রজব খ. ৪ পৃ. ৪৩৩

হযরত রাফে ইবনে খাদীজ রা. বলেন-

كُنّا نُصَلِّي المَغْرِبَ مَعَ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، فَيَنْصَرِفُ أَحَدُنَا وَإِنّهُ لَيُبْصِرُ مَوَاقِعَ نَبْلِهِ.

আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে মাগরিবের নামায আদায় করতাম। এরপর আমাদের কেউ (তার ঘরে) প্রত্যাবর্তন করত। আর তখনও সে তার নিক্ষিপ্ত তীরের স্থান দেখতে পেত। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৩৭

হাদীসটি হযরত আনাস রা., হযরত জাবের রা. এবং আরো অন্যান্য সাহাবীদের সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪১৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৪২৪৬; শারহু মা‘আনিল আসার, হাদীস ১২৬৫-১২৭১

প্রকাশ থাকে যে, এটা তখনই সম্ভব হবে যখন মাগরিবের নামাযে সংক্ষিপ্ত কেরাত পড়া হবে।

এ সকল বর্ণনার আলোকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, মাগরিবের স্বাভাবিক সুন্নত হল ‘কিসারে মুফাসসাল’। তবে দীর্ঘ কেরাত পড়াও জায়েয আছে।

ইশার কেরাত

পূর্বে আমরা জেনেছি যে, ইশার নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ পড়া মাসনূন। অবশ্য অবস্থা ভেদে বেশ-কম করাতেও কোনো ক্ষতি নেই। এক্ষেত্রে হাদীস শরীফে কখনো কখনো ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ এবং ‘কিসারে মুফাসসাল’ পড়ার বর্ণনাও রয়েছে।

হযরত বুরাইদা রা. বলেন-

كَانَ رَسُوْلُ الله صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ فِيْ العِشَاءِ الآخِرَةِ بِـ الشَمْسِ وَضُحَهَا وَنَحْوِهَا مِنْ السُوَرِ.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশার  নামাযে وَالشَّمْسِ وَضُحهَا (সূরা শাম্স) এবং তার অনুরূপ সূরা পড়তেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৩০৯; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৯৯

হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. বলেন-

بَيْنَا فَتًى مِنَ الْأَنْصَارِ عَلَفَ نَاضِحَهُ، وَأَقَامَ مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ صَلَاةَ الْعِشَاءِ، فَنَزلَ الْفَتَى علفَهُ، فَقَامَ فَتَوَضّأَ وَحَضَرَ الصّلَاةَ، وَافْتَتَحَ مُعَاذٌ بِسُورَةِ الْبَقَرَةِ، فَصَلّى الْفَتَى وَتَرَكَ مُعَاذًا، وَانْصَرَفَ إِلَى نَاضِحِهِ فَعَلَفَهُ ـ أَوْ فَعَلَفَهَا ـ، فَلَمّا انْصَرَفَ مُعَاذٌ جَاءَ الْفَتَى، فَسَبّهُ وَنَقَصَهُ، ثُمّ قَالَ: لَآتِيَنّ نَبِيّ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ فَأُخْبِرَهُ خَبَرَكَ، فَأَصْبَحْنَا، فَاجْتَمَعَا عِنْدَ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، فَذَكَرَ لَهُ مُعَاذٌ شَأْنَهُ، فَقَالَ الْفَتَى: إِنّا أَهْلُ عَمَلٍ وَشُغْلٍ، فَطَوّلَ عَلَيْنَا، اسْتَفْتَحَ بِسُورَةِ الْبَقَرَةِ، فَقَالَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: يَا مُعَاذُ، أَتُرِيدُ أَنْ تَكُونَ فَتّانًا؟ إِذَا أَمَمْتَ النّاسَ فَاقْرَأْ بِـ سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى، وَ اللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى، وَ اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ، وَ الضُّحَى.

এক আনসারী যুবক তার পানি সিঞ্চনের উটকে খাওয়াচ্ছিল। তখন হযরত মু‘আয ইবনে জাবাল রা. ইশার নামায শুরু করলেন। সে তার উটকে খাওয়ানো রেখে উযু করে নামাযে হাযির হল। হযরত মু‘আয রা. সূরা ‘বাক্বারা’ শুরু করলেন। তো ঐ যুবক হযরত মু‘আয রা.-কে ছেড়ে একাকী নামায পড়ে ফেলল এবং গিয়ে তার উটকে খাওয়াল।

মু‘আয রা. নামায শেষ করার পর সে (আবার) আসল। মু‘আয রা. তাকে মন্দ বললেন এবং তিরস্কার করলেন। এরপর বললেন, আমি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে তোমার বিষয়ে জানাব।

পরের দিন তারা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে একত্র হলেন। মু‘আয রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঐ যুবকের বিষয়ে বললেন। তখন যুবক বলল, আমরা কর্ম করে রোজগার করি আর ব্যস্ত জীবন কাটাই। আর তিনি আমাদের নিয়ে দীর্ঘ নামায পড়েছেন। সূরা বাকারা পড়া শুরু করেছেন।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মু‘আয! তুমি কি ফিতনাকারী হতে চাও? যখন তুমি লোকদের ইমামতি করবে, তখন তুমি পড়বে সূরা আ‘লা, সূরা লাইল, সূরা ‘আলাক্ব এবং সূরা দুহা। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ৩৭২৫

এই হাদীসের অন্যান্য বর্ণনায় সূরা ‘শাম্স’-এর উল্লেখ রয়েছে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৭০৫, ৬১০৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৬৫

কোনো কোনো বর্ণনায় সূরা ‘বুরূজ’ ও সূরা ‘ত্বারিক’-এর উল্লেখ রয়েছে। -মুসনাদে হুমাইদী, হাদীস ১২৪৬; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ৫২১

এক বর্ণনায় সূরা ‘ইনফিতার’-এর কথাও এসেছে। -সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৯৭

হাদীসে উল্লিখিত সূরা ইনফিতার ‘তিওয়ালে মুফাসসালের’ অন্তর্ভুক্ত আর বাকি সূরাগুলি ‘আওসাতে মুফাসসালের’ অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এই হাদীস থেকে ইশার নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ এবং ‘তিওয়ালে মুফাসসালের’ সংক্ষিপ্ত সূরাসমূহ তিলাওয়াতের নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে।

হযরত বারা ইবনে আযিব রা. বলেন-

سَمِعْتُ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ وَالتِّينِ وَالزَّيْتُونِ فِي العِشَاءِ.

আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ইশার নামাযে وَالتِّينِ وَالزَّيْتُونِ (সূরা তীন) তিলাওয়াত করতে শুনেছি। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪৬৪; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩১০; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ১০০০

পূর্বে গত হয়েছে যে, হযরত আবু হুরাইরা রা. ও হযরত আনাস রা. যার নামাযের ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সদৃশ হওয়ার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তিনি ইশার নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ থেকে তিলাওয়াত করতেন। -তাবাকাতে ইবনে সা‘দ খ. ৫ পৃ. ১৬১-১৬২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৭৯৯১, ৮৩৬৬; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৮২

হযরত উমর রা.-এর ফরমান

যুরারা ইবনে আওফা রাহ. বলেন-

أَقْرَأَنِي أَبُو مُوسَى كِتَابَ عُمَرَ إِلَيْهِ: أَنِ اقْرَأْ بِالنّاسِ فِي الْعِشَاءِ بِوَسَطِ الْمُفَصّلِ.

আমাকে হযরত আবু মূসা আশ‘আরী রা. তার প্রতি হযরত উমর রা.-এর চিঠি পড়ে শুনিয়েছেন যে, তুমি লোকদের নিয়ে ইশার নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ থেকে তিলাওয়াত করবে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬৩১; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৬৭২

সাহাবায়ে কেরামের আমল

আবু রাফে রাহ. বলেন-

صَلّيْتُ مَعَ عُمَرَ الْعِشَاءَ، فَقَرَأَ: إِذَا السّمَاءُ انْشَقَّتْ.

আমি হযরত উমর রা.-এর পিছনে ইশার নামায পড়েছি। নামাযে তিনি إِذَا السَّمَاءُ انْشَقَّتْ (সূরা ইনশিক্বাক্ব) তিলাওয়াত করেছেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬৩৬, ৪২৬৮

আবু রাফে রাহ. বলেন-

صَلّيْتُ مَعَ أَبِي هُرَيْرَةَ العَتَمَةَ، فَقَرَأَ: إِذَا السَّمَاءُ انْشَقَّتْ.

আমি হযরত আবু হুরাইরা রা.-এর সঙ্গে ইশার নামায পড়েছি। তিনি নামাযে إِذَا  السَّمَاء انْشَقَّتْ (সূরা ইনশিক্বাক্ব) তিলাওয়াত করেছেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৬৬, ৭৬৮; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৪২৬৬

হিলাল ইবনে ইয়াযীদ রাহ. থেকে বর্ণিত-

أَنّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ يَقْرَأُ وَالْعَادِيَاتِ ضَبْحًا فِي الْعِشَاءِ.

তিনি হযরত আবু হুরাইরা রা.-কে ইশার নামাযে وَالْعَادِيَاتِ ضَبْحًا (সূরা ‘আদিয়াত) পড়তে শুনেছেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬৩৩

হযরত আবু হুরাইরা রা. ইশার নামাযে সূরা ‘আদিয়াত’ পড়েছেন, যা ‘কিসারে মুফাসসাল’-এর অন্তর্ভুক্ত। পূর্বের দুটি হাদীসে সূরা ‘দুহা’ ও সূরা ‘তীন’ পড়ার কথা এসেছে। এ দুটি সূরা অবস্থান হিসেবে ‘আওসাতে মুফাসসাল’-এর অন্তর্ভুক্ত হলেও পরিমাণের দিক থেকে ‘কিসারে মুফাসসাল’-এর বড় সূরার সমান।

উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ.-এর আমল

যাহহাক রাহ. বলেন-

رَأَيْتُ عُمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ يَقْرَأُ فِي الْعِشَاءِ بِوَسَطِ الْمُفَصّلِ.

আমি উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ.-কে ইশার নামাযে ‘আওসাতে মুফাসসাল’ তিলাওয়াত করতে দেখেছি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬৩৭

ইশার নামাযে ‘তিওয়ালে মুফাসসাল’ বা তার বাইরে থেকে দীর্ঘ কেরাত

আলক্বামা ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাহ. বলেন-

كَانَ عُمَرُ بْنُ الْخَطّابِ يَقْرَأُ فِي الْعِشَاءِ الْآخِرَةِ سُورَةَ يُوسُفَ. قَالَ: وَأَنَا فِي مُؤَخّرِ الصّفِّ، حَتّى إِذَا ذَكَرَ يُوسُفَ سَمِعْتُ نَشِيجَهُ وَأَنَا فِي مُؤَخّرِ الصّفُوفِ.

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. ইশার নামাযে সূরা ইউসুফ তিলাওয়াত করতেন। ‘আলক্বামা বলেন, আমি ছিলাম কাতারের পিছন দিকে। হযরত উমর রা. যখন হযরত ইউসুফ আ.-এর আলোচনা সম্বলিত আয়াত পড়লেন, আমি পিছনের কাতার থেকেই তার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭০৩

মাসরূক রাহ. বলেন-

أَنّ عُثْمَانَ قَرَأَ فِي الْعِشَاءِ ـ يَعْنِي الْعَتَمَةَ ـ بِالنّجْمِ، ثُمّ سَجَدَ، ثُمّ قَامَ فَقَرَأَ بِـ التِّينِ وَالزَّيْتُونِ.

হযরত উসমান ইবনে আফফান রা. ইশার নামাযে সূরা নাজম তিলাওয়াত করলেন। এরপর তিনি সিজদা দিলেন। এরপর আবার দাঁড়িয়ে وَالتِّينِ وَالزَّيْتُونِ  (সূরা তীন) তিলাওয়াত করলেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬৩২, ৪২৮২, ৪৪২৬

আবদুর রহমান ইবনে ইয়াযীদ রাহ. বলেন-

صَلّى بِنَا ابْنُ مَسْعُودٍ صَلَاةَ الْعِشَاءِ الْآخِرَةِ، فَاسْتَفْتَحَ بِسُورَةِ الْأَنْفَالِ، حَتّى إِذَا بَلَغَ: نِعْمَ الْمَوْلَى وَنِعْمَ النَّصِيرُ، رَكَعَ، ثُمّ قَرَأَ فِي الرّكْعَةِ الثّانِيَةِ بِسُورَةٍ مِنَ الْمُفَصّلِ.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. আমাদেরকে ইশার নামায পড়ালেন। তিনি সূরা আনফাল শুরু করলেন। যখন তিনি نِعْمَ الْمَوْلَى وَنِعْمَ النَّصِيرُ (আনফাল : ৪০) আয়াতে পৌঁছলেন, রুকু করলেন। এরপর দ্বিতীয় রাকাতে ‘মুফাসসালের’ একটি সূরা তিলাওয়াত করলেন। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭০১, ২৭০২; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬২৯, ৩৬৩০

নাফে রাহ. বলেন-

أَنّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ يَقْرَأُ فِي الْعِشَاءِ بِـ الَّذِينَ كَفَرُوا وَالْفَتْحِ.

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ইশার নামাযে الَّذِيْنَ كَفَرُوْا (সূরা মুহাম্মাদ) ও সূরা ফাত্হ তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬৩৪

তাউস রাহ.-এর আমল

আবদুল্লাহ ইবনে তাউস রাহ. বলেন-

أَنّ أَبَاهُ كَانَ لَا يَدَعُ أَنْ يَقْرَأَ فِي الْعِشَاءِ الْآخِرَةِ بِسُورَةِ السّجْدَةِ الصّغْرَى: الم تَنْزِيلُ، وَ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ.

তার পিতা (তাউস ইবনে কায়সান রাহ.) ইশার নামাযে ছোট সূরা সিজদা অর্থাৎ الم تَنْزِيلُ এবং تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ (সূরা মুল্ক) পড়া ছাড়তেন না। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, বর্ণনা ২৭০৪, ২৭০৫; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ৩৬৩৫

খোলাসা কথা হল, ইশার নামাযে মূলত আওসাতে মুফাসসাল থেকে পড়া হবে। তবে কখনো কিসারের কোনো বড় সূরা পড়া হলে তাকে খেলাফে সুন্নত বলা ঠিক নয়।

তেমনিভাবে তিওয়ালে মুফাসসাল থেকে কিংবা কুরআন কারীমের অন্য কোনো স্থান থেকে আওসাত পরিমাণ অংশ তিলাওয়াত করা হলে তাতেও কোনো আপত্তি নেই।

তবে স্মর্তব্য হল, দীর্ঘ কেরাত পড়তে হলে কিংবা বড় কোনো সূরা পড়তে হলে মুসল্লীদের হালত বিবেচনা করা বহারহাল জরুরি। আর আজকালকার হালত যেহেতু জানাই আছে, তাই একথা বলা যেতে পারে যে, ইমাম সাহেবদের জন্য মাসনূন কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণের চেয়ে বেশি লম্বা না করা চাই।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমাম সাহেবগণকে নামায সংক্ষিপ্ত করার ব্যাপারে তাকিদের সাথে যে হুকুম করেছেন- এর প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার।

জুমার দিন ফজর নামাযে মাসনূন কেরাত

জুমার নামাযে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কেরাত প্রসঙ্গে বুখারী ও মুসলিমে নিম্নলিখিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللّهُ عَنْهُ، قَالَ: كَانَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ فِي الجُمُعَةِ فِي صَلاَةِ الفَجْرِ الم تَنْزِيلُ السّجْدَةَ، وَ هَلْ أَتَى عَلَى الإِنْسَانِ حِينٌ مِنَ الدّهْرِ.

হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিন ফজরের  নামাযে প্রথম রাকাতে الم تَنْزِيلُ السَّجْدَةَ (সূরা আলিফ লাম মীম  সাজদাহ) এবং দ্বিতীয় রাকাতে هَلْ أَتَى عَلَى الإِنْسَانِ (সূরা দাহর) পড়তেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৮৯১, ১০৬৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৭৯

উল্লেখ্য যে, সূরা সাজদাহ ত্রিশ আয়াত বিশিষ্ট এবং তিন পৃষ্ঠাব্যাপী আর ‘দাহর’ সূরাটি একত্রিশ আয়াত বিশিষ্ট এবং দুই পৃষ্ঠার সামান্য বেশি।

বিশিষ্ট হানাফী ফকীহ আল্লামা শুরুম্বুলালী রাহ. বলেছেন, এ আমলটি কেউ একেবারেই করে না আর কেউ কখনো ছাড়ে না। তা না করে মাঝেমধ্যে বাদ দিয়ে আমলটি করা উচিত। -মারাকিল ফালাহ, পৃষ্ঠা ২৬৪

তবে মুসল্লীদের প্রতি খেয়াল রাখার যে সাধারণ বিধান তা এক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। আরেকটি কথা হল, এ আমলটি মূলত তারগীবের আওতায় আসে। এ বিষয়ে  কোনো ইমাম সাহেবকে মজবুর করা বা ইছরার করা মুনাসিব মনে হয় না।

দুই ঈদ এবং জুমায় মাসনূন কেরাত

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো জুমার প্রথম রাকাতে সূরা ‘জুমু‘আ’ এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ‘মুনাফিকূন’ তিলাওয়াত করতেন। এ সম্পর্কে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত উবাইদুল্লাহ ইবনে আবী রাফে রাহ. বর্ণনা করেন-

اسْتَخْلَفَ مَرْوَانُ أَبَا هُرَيْرَةَ عَلَى الْمَدِينَةِ، وَخَرَجَ إِلَى مَكّةَ، فَصَلى لَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ الْجُمُعَةَ، فَقَرَأَ بَعْدَ سُورَةِ الْجُمُعَةِ فِي الرّكْعَةِ الْآخِرَةِ: إِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُونَ، قَالَ: فَأَدْرَكْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ حِينَ انْصَرَفَ، فَقُلْتُ لَهُ: إِنكَ قَرَأْتَ بِسُورَتَيْنِ كَانَ عَلِيّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ يَقْرَأُ بِهِمَا بِالْكُوفَةِ، فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ: إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، يَقْرَأُ بِهِمَا يَوْمَ الْجُمُعَةِ.

মারওয়ান হযরত আবু হুরায়রা রা.-কে মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত বানাল এবং সে মক্কার উদ্দেশে বেরিয়ে গেল। তখন আবু হুরায়রা রা. জুমার নামাযে ইমামতি করলেন। তিনি প্রথম রাকাতে সূরা ‘জুমু‘আ’ পড়লেন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ‘মুনাফিকূন’ পড়লেন।

ইবনে আবী রাফি বলেন, আমি হযরত আবু হুরায়রা রা.-কে বললাম, আপনি (জুমার নামাযে) যে সূরা দুটি তিলাওয়াত করলেন, হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রা. কুফায় (জুমার নামাযে) ঐ দুই সূরা তিলাওয়াত করতেন। তখন হযরত আবু হুরায়রা রা. বললেন, আমি জুমার নামাযে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই দুই সূরা পড়তে শুনেছি। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৭৭

কখনো তিনি জুমায় ‘সূরা আ‘লা’ এবং ‘গাশিয়াহ’ও পড়তেন। এ প্রসঙ্গে হযরত নুমান বিন বাশীর রা. থেকে বর্ণিত-

كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ فِي الْعِيدَيْنِ وَفِي الْجُمُعَةِ بِـ سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى، وَ هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ، قَالَ: وَإِذَا اجْتَمَعَ الْعِيدُ وَالْجُمُعَةُ فِي يَوْمٍ وَاحِدٍ، يَقْرَأُ بِهِمَا أَيْضًا فِي الصّلَاتَيْنِ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই ঈদের নামাযে এবং জুমার  নামাযে سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى (সূরা আ‘লা) এবং هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ  (সূরা গাশিয়াহ) পড়তেন। তিনি এও বর্ণনা করেন যে, একই দিনে ঈদ ও জুমা হলে উভয় নামাযেই এই দুই সূরা তিলাওয়াত করতেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৭৮

অবশ্য দুই ঈদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা ক্বাফ এবং সূরা ক্বামার পড়েছেন বলেও বর্ণিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ রাহ. থেকে বর্ণিত-

أَنّ عُمَرَ بْنَ الْخَطّابِ سَأَلَ أَبَا وَاقِدٍ اللّيْثِيّ: مَا كَانَ يَقْرَأُ بِهِ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ فِي الْأَضْحَى وَالْفِطْرِ؟ فَقَالَ: كَانَ يَقْرَأُ فِيهِمَا بِـ ق وَالْقُرْآنِ الْمَجِيدِ، وَ اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ.

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. হযরত আবু ওয়াক্বিদ লাইসী রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম আযহা ও ফিতরের ঈদের নামাযে কী কিরাত পড়তেন? তিনি জবাব দিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই ঈদের নামাযে সূরা ক্বাফ ও সূরা ক্বামার পড়তেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৯১

ফজরের সুন্নতে নবীজীর কেরাত

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সুন্নতে সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাছ পড়তেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

رَمَقْتُ النَبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلّمَ شَهْرًا فَكَانَ يَقْرَأُ فِيْ الرَكْعَتَيْنِ قَبْلَ الفَجْرِ قُلْ يَأ َيّهَا الكَافِرُوْنَ وَ قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ.

আমি এক মাস পর্যন্ত নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে থেকে খেয়াল করে বুঝার চেষ্টা করেছি, তিনি ফজরের সুন্নত নামাযে সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাছ তিলাওয়াত করতেন। -জামে তিরমিযী খ. ২, পৃ. ২৬০, হাদীস ৪১৭

হযরত আবু হুরায়রা রা.-ও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ফজরের সুন্নত নামাযে এই দুই সূরা পড়ার কথা বর্ণনা করেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭২৬

আম্মাজান হযরত আয়েশা রা. থেকেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। -সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ১১১৪, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৬৩৯৫

আবার অনেক সময় সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান থেকে এক এক আয়াত করে তিলাওয়াত করতেন, যার বিবরণ এই হাদীসে রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

أَكْثَرُ مَا كَانَ رَسُولُ اللّهِ صَلّى اللّهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ فِي رَكْعَتَيِ الْفَجْرِ: قُولُوا آمَنَّا بِاللهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ إِلَى آخِرِ الْآيَةِ. وَفِي الْأُخْرَى: قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَاب تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُم إِلَى قَوْلِهِ: اشْهَدُوا بِأَنّا مُسْلِمُونَ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশির ভাগ সময় ফজরের (সুন্নত) দুই রাকাতের (প্রথম রাকাতে) قُولُوا آمَنَّا بِاللهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ আয়াতের শেষ পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় রাকাতে قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ আয়াতটি اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ পর্যন্ত তিলাওয়াত করতেন। -সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ১১১৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭২৭

মাগরিব পরবর্তী দু’রাকাতে মুস্তাহাব কেরাত

মাগরিবের পরবর্তী দু’রাকাত সুন্নতেও সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাছ পড়ার বর্ণনা রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

سَمِعْتُ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ أَكْثَرَ مِنْ عِشْرِينَ مَرّةً يَقْرَأُ فِي الرّكْعَتَيْنِ قَبْلَ الْفَجْرِ، وَالرّكْعَتَيْنِ بَعْدَ الْمَغْرِبِ: قُلْ يَا أَيّهَا الْكَافِرُونَ، وَ قُلْ هُوَ اللهُ أَحَد.

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশের অধিক বার ফজরের পূর্বের দুই রাকাত (সুন্নত) ও মাগরিবের পরের দুই রাকাত (সুন্নত) নামাযে সূরা কাফিরূন ও সূরা ইখলাছ পড়তে শুনেছি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৬৩৯৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৪৭৬৩

বিতরের নামাযের কেরাত

হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবযা রা. বলেন-

أَنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ كَانَ يَقْرَأُ فِي الْوِتْرِ بِـ سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى، وَ قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ، وَ قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের নামাযে  سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى (সূরা আ‘লা),  قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ (সূরা কাফিরূন) এবং  قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ  (সূরা ইখলাছ) তিলাওয়াত করতেন। -সুনানে নাসাঈ, হাদীস ১৭৩১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৩৫৪

জ্ঞাতব্য, যেমনটি আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু কিছু নামাযে বিশেষ বিশেষ সূরা পড়তেন। উদাহরণস্বরূপ তিনি জুমা ও দুই ঈদের নামাযে সূরা আ‘লা এবং সূরা গাশিয়াহ পড়তেন।

আবার কখনো সূরা জুমুআ ও সূরা মুনাফিকূন পড়তেন। বিত্রের নামাযে সূরা আ‘লা ও সূরা কাফিরূন এবং সূরা ইখলাছ পড়তেন। ফজর ও মাগরিবের সুন্নতে قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُون  (সূরা কাফিরূন) ও قُلْ هُوَ اللهُ أَحَد (সূরা ইখলাছ) পড়তেন।

তাই বর্ণিত এসকল সূরা উল্লিখিত নামাযসমূহে পড়া মুস্তাহাব। তবে ওয়াজিব বা সুন্নতে মুআক্কাদাহর মতো নয়। মাঝেমধ্যে অন্য সূরাও পড়া চাই। [আলহাবিল কুদসী ১/১৭৫; ফাতহুল কাদীর, খ. ১ পৃ. ৩৩৭

(تحت : >ويكره أن يوقت …<، ودعوى سنية المواظبة في بعض ذلك لايخلو من نظر، فلينظر،وليبحث عن المعنيين بـ>قالوا< في كلامه هناك، وعن عباراتهم.)

আননাহরুল ফায়েক খ. ১ পৃ. ২৩৪-২৩৫; মারাকিল ফালাহ,পৃ. ২৬৪; তুহফাতুল আলমাঈ, খ. ২, পৃ. ২৬০]

আলহামদু লিল্লাহ প্রবন্ধটি সমাপ্ত হল।  হাদীস ও আছার বেশি পরিমাণে উল্লেখ করাতে যদিও প্রবন্ধটি কিছুটা দীর্ঘ হয়ে গিয়েছে, তবে আশা করি তা উপকারী হবে- ইনশাআল্লাহ।

সবগুলো বর্ণনা নজরে থাকলে বড় ফায়দা হল মাসনূন কেরাতের  বৈচিত্র্যের বিষয়টি মনে থাকবে। এর আরেকটি বড় ফায়দা হল সুন্নতের উপর আমল সহজ হওয়া। আরেকটি ফায়দা হল মাসনূন কেরাতের  কোনো প্রকারকে শুধু না জানার কারণে অস্বীকার করা থেকে বাঁচা যাবে।

প্রবন্ধটি গভীরভাবে পড়ে থাকলে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, মাসনূন কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণ ফজরের নামাযে তিওয়ালে মুফাসসালের ছোট সূরাগুলো (যেমন সূরা তাকবীর যার আয়াত সংখ্যা ২৯। সূরা ইনফিতার যার আয়াত সংখ্যা ১৯ এবং আয়াতগুলো ছোট ছোট।) বা তার সমপরিমাণ।

যোহরের নামাযে তিওয়ালে মুফাসসালের ছোট সূরাগুলো অথবা আওসাতে মুফাসসালের বড় সূরাগুলো বা তার সমপরিমাণ।

আছর এবং ইশায় আওসাতে মুফাসসালের যেকোনো সূরা বা তার সমপরিমাণ।

আর মাগরিবে কিসারে মুফাসসালের ছোট সূরাগুলো বা তার সমপরিমাণ। এই হল মাসনূন কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণ। এরচে বেশি পড়া হলে তাও ভালো।

কিন্তু ইমামের জন্য শর্ত হল এক্ষেত্রে মুসল্লীদের হালাতের প্রতি লক্ষ রাখা।

পরিশিষ্ট

কেরাত সংশ্লিষ্ট আরো কিছু মাসআলা রয়েছে যেগুলোর বেশ প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই সংক্ষিপ্তভাবে সেগুলোর বিবরণ পেশ করা মুনাসিব মনে হচ্ছে।

এক

উত্তম হল, এক রাকাতে পূর্ণ সূরাই তিলাওয়াত করা। তবে এক সূরাকে দুই রাকাতে ভাগ করে পড়া জায়েয, এমন করা মাকরূহ নয়। হাদীস ও আছার থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। (বাদায়েউস সানায়ে ১/৪৮২; আলমুহীতুল বুরহানী ২/৪৭; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/৬৬; ফাতাওয়া আলমগীরী ১/৭৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/২১৭; উমদাতুল ক্বারী ৬/৩৯-৪৫ كتاب الأذان، باب الجمع بين السورتين في الركعة والقراءة بالخواتيم ; ফাতহুল বারী (উক্ত অধ্যায়) ২/২৯৮-৩০৪)

উল্লেখ্য, সূরা যদি এই পরিমাণ ছোট হয় যে, তা দুই রাকাতে ভাগ করে পড়লে মুস্তাহাব কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণের চেয়েও কম হয়ে যাবে, তাহলে এমনটি না করা চাই। আর এরকম পড়ার অভ্যাস করা তো মোটেই সমীচীন নয়।

পক্ষান্তরে ইমাম সাহেব যদি এমন কোনো দীর্ঘ সূরা পড়তে চান, যা মাসনূন কেরাতের ন্যূনতম পরিমাণের চেয়ে এত বেশি, যা মুসল্লীদের জন্য কষ্টের কারণ হতে পারে, সেক্ষেত্রে ঐ সূরাকে দুই রাকাতে ভাগ করে পড়াই উত্তম হবে। ফরয নামাযে দীর্ঘ সূরাকে দু’রাকাতে ভাগ করে পড়ার প্রমাণও হাদীস ও আছারে রয়েছে। (উমদাতুল কারী ৬/৪২, কাতাদা রাহ.-এর বক্তব্য >كل كتاب الله<-এর অধীনে; আলইসতিযকার শরহুল মুআত্তা, ইমাম ইবনু আবদিল বার ৪/১৭৪-১৭৬)

দুই

কোনো বড় সূরার শেষ থেকে যদি মুস্তাহাব পরিমাণ তিলাওয়াত করা হয়, তাহলে তাও ঠিক আছে; মাকরূহ নয়। (ফাতাওয়া খানিয়া ১/১৬১)

তিন

প্রথম রাকাতে এক সূরার শেষ থেকে পড়লে এবং দ্বিতীয় রাকাতে অন্য সূরার শেষ থেকে পড়লে তাও জায়েয আছে। সহীহ বক্তব্য অনুসারে এভাবে পড়া মাকরূহ নয়। (ফাতাওয়া খানিয়া ১/১৬১; ফাতাওয়া আলমগীরী ১/৭৮)

চার

প্রথম রাকাতে কোনো দীর্ঘ সূরার অংশবিশেষ তিলাওয়াত করা আর দ্বিতীয় রাকাতে কোনো পূর্ণ সূরা তিলাওয়াত করা- এটাও বৈধ আছে, মাকরূহ নয়। সাহাবায়ে কেরামের আমলে এর নজির পাওয়া যায়। (ফাতাওয়া আলমগীরী ১/৭৮)

পাঁচ

প্রথম রাকাতে কোনো দীর্ঘ সূরার মাঝখান থেকে অংশবিশেষ তিলাওয়াত করা এবং দ্বিতীয় রাকাতে অন্য কোনো দীর্ঘ সূরার মাঝখান থেকে অথবা শেষ থেকে অংশবিশেষ তিলাওয়াত করাও বৈধ, মাকরূহ নয়। (ফাতাওয়া আলমগীরী ১/৭৮)

হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রাহ.-এর নিকট প্রশ্ন করা হয়েছে যে, কোনো কোনো ইমাম ছাহেব নামাযের প্রথম দুই রাকাতে কোনো একটি সূরাকে দুই ভাগ করে তিলাওয়াত করে থাকেন কিংবা কোনো সূরা থেকে এক/দুই রুকূ পরিমাণ তিলাওয়াত করে থাকেন- এমনটি করা কি সুন্নত, না অনুত্তম, না মাকরূহ?

হযরত থানবী রাহ. এর জবাবে লেখেন- প্রশ্নোক্ত বিবরণের ক্ষেত্রে আছাহ্ তথা অধিক বিশুদ্ধ বক্তব্য অনুযায়ী এমনটি করা মাকরূহ নয়। তবে এভাবে অভ্যাস বানিয়ে নেওয়া অনুত্তম। অবশ্য কখনো কখনো এমন হলে তা এক পর্যায়ে মাসনূনও বটে। কেননা-

عَنِ ابْنِ عَبّاسٍ، قَالَ: كانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ فِي رَكْعَتَيِ الْفَجْرِ: قُولُوا آمَنَّا بِاللهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا، وَالّتِي فِي آلِ عِمْرَانَ: تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের (সুন্নত) দুই রাকাতের (প্রথম রাকাতে) قُولُوا آمَنَّا بِاللهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَاَ এবং (দ্বিতীয় রাকাতে) সূরা আলে ইমরানের (আয়াত)  تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ তিলাওয়াত করতেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭২৭ (ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/২১৭)

আল্লাহ তাআলা প্রবন্ধটি কবুল করুন। দুনিয়া-আখেরাতে আমাদের সবার জন্য ফায়েদা ও নাজাতের যরিয়া বানিয়ে দিন- আমীন।

حاشية :

قال عبد المالك: هاهنا أمور ينبغي أن تكون على ذُكرٍ من طلاب الفقه والفتوى، وهي كما يلي:

الأول:

ما جاء في ‘>البحر< ১: ৫৯৪:   >وأفاد أن القراءة في الصلاة من غير المفصل خلاف السنة<، أجاب عنه الشرنبلالي في ‘>إمداد الفتاح< ص২৯১، فليراجع. وينبغي أن يعلم أن الأصل في القراءة المسنونة هو المقدار، كما يفهم مما ذكره أئمتنا في >كتاب الأصل< و>الجامع الصغير<، وإن كان التحديد بالآيات تقريبي أيضًا، كما يدل عليه كلام  غير واحد من فقهائنا الشارحين لفقه أئمتنا.

والآثار لا تدل على تحديد السنة في المفصل، لثبوت القراءة بكثرة كاثرة من غير المفصل، كما هو ظاهر بين. ولأن الفعل بمجرده ولو كثر، لايدل على سنية التحديد، إلا أن تدل على ذلك قرينة قوية، كما علم في أصول الفقه، وكما أشار إليه صاحب الحاوي القدسي في بحث القراءة.

الثاني:

الثابتُ عن أئمتنا، والمذكورُ في الأصول وظاهر الرواية، بشأن القدر المسنون المستحب: هو التقدير بالآيات، كما رأيناه في ‘>الأصل< و>الجامع الصغير<، وكما صرح في >المحيط البرهاني< ২: ৪৩، و>‘شرح الجامع الصغير< لقاضي خان ১: ২১১-২০৭.

وأما التقدير بالمفصل وأقسامه، فهذا من استحسان المشايخ (المتأخرين)، كما نبه عليه صاحب >المحيط<، إذ قال: >ولا بأس بقراءة القرآن على التأليف، فقد صح أن الصحابة رضي الله تعالى عنهم قد فعلوا ذلك، ومشايخنا استحسنوا قراءة المفصل ليستمع القوم وليتعلموا<. (المحيط البرهاني ২: ৪৮)، وقال قاضي خان رحمه الله تعالى: >والمستحب قراءة المفصل تيسيرًا للأمر عليه، وتخفيفًا على القوم<. (الفتاوى الخانية ১: ১৬১)

ودعوى ابن عابدين الشامي رحمه الله تعالى أن التقدير بعدد والتقدير بالمفصل هما روايتان متخالفتان، اختار أصحاب المتون إحداهما (ردالمحتار ৩ : ৪৬১) فيه نظر، فإنه لا تخالف بينهما، كما سيأتي، على أن التقدير بالمفصل ليس رواية عن الأئمة كما لايخفى، وإنما جَعَل ابنُ عابدين ذلك رواية لذكره في بعض المتون، حيث قال: >كون المقروء من سور المفصل على الوجه الذي ذكره المصنف هو المذكور في المتون كالقدوري، والكنز، والمجمع، والوقاية، والنقاية وغيرها<.

وهذا فيه نظر من وجوه:

أ: لم يذكر ذلك في >مختصر القدوري<.

ب: مجرد ذكر ذلك في جملة من المتون لايدل على كونه رواية عن الأئمة، فإن المتون تشتمل على كثير من الزيادات من كتب الفتاوى والواقعات، دلت على ذلك المشاهدة، ونبه على ذلك غير واحد من أصحاب المتون وغيرهم من المحققين.

ج: لم يُذكر ذلك ـ أعني التحديد بالمفصل ـ في متون المتقدمين، فلا يوجد في مختصر الطحاوي، ومختصر الحاكم، ومختصر المجرد للبيهقي، ومختصر القدوري، ومختصر الكرخي، ومختصر المنهاج للعَقِيلي، ومختصر التجريد، ومختصر خزانة الفقه، وتحفة الملوك، كما لم يذكر في كتب مسائل الأصول من شرح مختصر الطحاوي للجصاص، والمبسوط للسرخسي، والمبسوط للحلوانى، وشرح مختصر الكرخي للقدوري، والشامل للبيهقي، والمحيط الرضوي، والمحيط البرهاني، وبدائع الصنائع، وتحفة الفقهاء ونحوها. بل جعله في >الحاوي القدسي< قول البعض.

الثالث:

قول ابن عابدين رحمه الله تعالى نقلا عن >النهر< : >إن القراءة من المفصل سنة، والمقدار المعين سنة أخرى< كلام صحيح في نفس الأمر، ولكنهما ليستا سنتين متقابلتين، كما تُوهمه العبارة وكما يتوهمه بعض الناس، بل هما سنتان من باب سنن التنوع، فمن جمع بينهما فقد أحسن، ومن أتى بأحد منهما فقد أتى بتمام السنة، ودعوى أن من قرأ المقدار المستحب من غير المفصل، قد فاتته سنة، دعوى خاطئة لادليل عليها، لثبوت القراءة في الصلوات من غير المفصل بكثرة كاثرة، كما سبق.

الرابع:

كأن بعضهم فهموا أن المقدار المذكور (من أربعين وعشرين…) مقدار محدد تكون الزيادة عليه خلاف السنة، وهذا فهم خاطئ كما لا يخفى، نعم قد تكون الزيادة المفرطة على العدد المذكور ممنوعة لعارض، كأن يمنع من ذلك إذا أدى إلى تنفير بعض المصلين أو إيذائهم، والله سبحانه وتعالى أعلم.

الخامس:

المقدار المسنون للقراءة، سواء قدرناه بالمفصل، أو قدرناه بعدد خاص من الآيات، السنية فيه ليست مؤكدة، وإنما هو من السنة المستحبة، فقد عبر المقدار المسنون (المقدر بالعدد أو بالمفصل) بالمستحب في >تحفة الفقهاء< ১: ১৩০، و>بدائع الصنائع< ১: ৪৭৮، و>شرح الجامع الصغير< لقاضي خان ص২০৭، ২০৯،و>الفتاوى الخانية< ১: ১৬১، و>المحيط الرضوي<، و>تكملة القدوري<، و>الحاوي القدسي<، وإليه يؤول كلام ابن أمير الحاج في >الحلبة< ২: ১৩৫-১৩৪، وكلام البخاري في >خلاصة الفتاوى<، فإنه قال: هذا بيان الأولوية والسنة (১: ৯৩)، وصرح بكون التحديد بالمفصل مستحبا: السيدُ البنوري رحمه الله تعالى في >معارف السنن< ১: ১৭১، وإليه يؤول ما ذكره في >كفاية المفتي< ৩: ৪০৭.

وتعبير كثير من الفقهاء هذا المقدار بالسنة أو بالمقدار المسنون لاينافي كونه مستحبا، فإن المستحب من أنواع السنة، ويطلق عليه لفظ السنة، ولكن التصريح بالمستحب أو المستحسن يدل على أنه ليس سنة مؤكدة، فإن السنة المؤكدة لم يشتهر إطلاق المستحب أو المستحسن عليها في كلام فقهاء المذهب.

وعلى ضوء هذا التقرير ينبغي أن يفهم كلام الحلبي رحمه الله تعالى في >غنية المتملي< ص ২৭০ من طبعة دار الكتاب ديوبند عام ২০০২م.

السادس:

ما نقله الشامي رحمه الله تعالى في >منحة الخالق< ১: ৫৯৫ قائلا: >لكن في >السراج< عن >المحيط< ما يدل على أن المقدار المذكور مستحب، فإنه ذكر أن القراءة في الصلاة على خمسة أوجه: فرض، وواجب، وسنة، ومستحب، ومكروه. فالفرض آية، والواجب الفاتحة وسورة، والمسنون طوال المفصل في الفجر والظهر، وأوساطه في العصر والعشاء، وقصاره في المغرب، والمستحب أن يقرأ في الفجر إذا كان مقيما في الركعة الأولى قدر ثلاثين آية أو أربعين سوى الفاتحة، وفي الثانية قدر عشرين إلى ثلاثين سوى الفاتحة، والمكروه…<.

ففيه أن بيان المسنون والمستحب وغيرهما من الأوجه هنا هو مِن قِبَل صاحب >السراج< أبي بكر الحداد، لا مِن قِبَل صاحب >المحيط<، وإنما نقل الحداد عناوين الأوجه الخمسة عن >المحيط<، وأما تفاصيلها فذكرها من عنده، ولكن عرضه كان مبهما وموهما، فظن الشامي رحمه الله تعالى أن الكل كلام >المحيط<، وليس كذلك، و>المحيط الرضوي< مخطوط، وقد راجعته، فرأيته ذكر المقدار المستحب بذكر عدد الآيات بالنسبة لكل صلاة، كما في غيره من كتب المتقدمين، ثم قال ـ أعني صاحب المحيط ـ: >والمسنون أن يقرأ الفاتحة مع سورة قصيرة، قدر ثلاث آيات، أو آية طويلة<.

وأما التحديد بالمفصل فلم يذكره صاحب >المحيط<، لا في المقدار المستحب ولا في المقدار المسنون، نعم جاء ذكر أثر عمر رضي الله تعالى عنه ـ أعني كتابه إلى أبي موسى الأشعري ـ ضمنا، وظاهر صنيعه الاستدلال به على التقدير بالآيات، كما فعله آخرون.

وأما >المحيط البرهاني< فمطبوع، وليس فيه ما ذكره ابن عابدين رحمه الله تعالى عن >السراج< عن >المحيط< مِن جعل التقدير بالمفصل مسنونا، والتقدير بالآيات مستحبا.

والمقصود أن جعل التحديد بالمفصل مسنونا بمعنى >السنة< التي هي فوق المستحب لم يقع من صاحب >المحيط<، وإنما وقع ذلك من أبي بكر الحداد (৭২০هـ ـ ৮০০هـ) رحمه الله تعالى. والحداد صاحب >السراج< و>الجوهرة النيرة< ليس بمنزلة أن يحتج بكلامه على المشايخ المذكورين الذين هم أقدم وأجل وأفقه، والله تعالى أعلم.

السابع:

ما روي من كتاب أمير المؤمنين عمر بن الخطاب رضي الله عنه إلى أبي موسى الأشعري رضي الله تعالى عنه من أنه أمره بقراءة المفصل في الصلوات، فإسناده فيه ضعف، وهو مع ذلك منقطع، ولئن أخذنا بقول صاحب >حلبة المجلي< الذي مشّاه، لاينبغي صرف النظر عن نوعية هذا الأمر، فإن القرائن (ومن جملة تلك القرائن عمل أمير المؤمنين نفسه) تدل على أن هذا الأمر ليس تحديدا، وإنما هو تقريب وتمثيل، وإرشاد إلى أن لايؤم أحد في الجماعات العامة بسور طويلة جدا بتمامها، وإن كانت مأثورة قراءتها في صلوات الجماعة، وعلى هذا فلا يحسن جعل هذا الكتاب دليلا على سنية تحديد المفصل، يدل على ذلك صنيع أئمتنا أصحاب المذهب، بل إن كثيرا من فقهائنا لم يستدلوا بهذا الكتاب على تحديد المفصل، وإنما استدلوا به على استحباب المقدار الذي ذكره أئمتنا، أعني المقدار الذي ذكروه عند التحديد التقريبي بعدد الآيات، والله سبحانه وتعالى أعلم.

وعلى ضوء هذا التقرير ينبغي أن يفهم ما جاء ذكره في >رد المحتار< ৩: ৪৬১، و>إمداد الأحكام< ১৯৬:২، وكأن ابن عابدين رحمه الله تعالى أخذ إشارة من قول >الملتقى<: >استحسنوا< إلى أن هذه المسألة من باب ترجيح الرواية التي يؤيدها الاستحسان، مع أن ذلك بعيد، فإن صاحب >المحيط< وقاضي خان رحمهما الله تعالى قد نبها على وجه الاستحسان، ولا يدل  كلامهما على ما ذكره ابن عابدين رحمه الله تعالى، وأحسن العلامة العثماني رحمه الله تعالى إذ قال في>إعلاء السنن< ২৮:৪ : >فثبت بهذا أن حصر القراءة في المفصل إنما هو مجرد استحسان، والأصل أن يقرأ في المغرب بما يماثل القصار، وكذا في غيرها بما يشبه أختيها<. ومن أسباب التسامح في كلام ابن عابدين في هذا البحث هو ظنه أن التحديد بـ>المفصل< رواية عن أئمة المذهب، مع أن الأمر ليس كذلك، والله تعالى أعلم.

الثامن:

اشتَهَر في كثير مِن كتب الفقه مِن غير إسنادٍ، ومن غير عزوٍ لكتابٍ حديثي: أن المذكور في كتاب عمر رضي الله عنه إلى أبي موسى الأشعري رضي الله عنه: >أن اقرأ في الظهر بطوال المفصل<، وهذا لا يوجد له إسنادٌ، كما نبَّه عليه في >نصب الراية< ২: ৫،و>الدراية< ১: ১৬২، و>فتح القدير< ১: ৩৩৫،و>إعلاء السنن< ৪ : ৩১-৩০، وإنما المذكور في كتب الحديث: >اقرأ في الظهر بوَسَط المفصل<، كما جاء في >جامع الترمذي<، وأيضا في >كتاب أبي حفص ابن شاهين<، كما ذكره في >البناية< للعيني ২: ৩০৮-৩০৭، و >حاشية الشلبي على تبيين الحقائق< ১: ৩৩৩، و >الشرح الكبير< للمقدسي في الفقه الحنبلي ১: ৫৬৯ (مع >المغني<، طبعة دار الفكر).

التاسع:

هناك خلاف بين أهل العلم في تعيين بداية المفصل، وبداية كل قسم منه، فلاينبغي التسرع لا في الاستدلال ولا في الاعتراض عند مطالعة الآثار، إذا وقفنا على أثر ينص مثلا على قراءة سورة في العشاء أو الظهر أو العصر، نعلم أنها من القصار، فإن من الممكن أنها من الأوساط في قول آخر، له حظ من النظر.

العاشر:

الأمر الذي هو أهم من المقدار هو أن تكون القراءة مجودةً ومرتلةً، ولو على أقل مراتب الترتيل، ومِن فوائدِ الترتيلِ التدَبّرُ، ومِن فوائدِ التدَبّرِ التذَكّرُ، قال عز من قائل: كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ اِلَیْكَ مُبٰرَكٌ لِّیَدَّبَّرُوْۤا اٰیٰتِهٖ وَ لِیَتَذَكَّرَ اُولُوا الْاَلْبَابِ. {سورة صٓ (৩৮) : ২৯}

هذا، وصلى الله تعالى وبارك وسلم على سيدنا ومولانا محمد خاتم النبيين لانبي بعده، وعلى آله وصحبه وكل من والاه، والحمد لله رب العالمين

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

ইসলামের ইতিহাস পাঠ (পর্ব- ৬) খারেজীদের ষড়যন্ত্র

আবূ মুয়াবিয়া লুৎফুর রহমান ফরায়েজী আগের লেখাটি পড়ে নিন– একটি ভুল বুঝাবুঝি এবং অবশেষে সন্ধিচুক্তি …