হোম / জুমআ ও ঈদের নামায / প্রসঙ্গ ১৪৪০ হিজরী চাঁদ দেখা বিতর্কঃ আল্লামা আব্দুল মালেক সাহেবের সাক্ষাৎকার
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

প্রসঙ্গ ১৪৪০ হিজরী চাঁদ দেখা বিতর্কঃ আল্লামা আব্দুল মালেক সাহেবের সাক্ষাৎকার

[ভূমিকা : গত শাবান মাস এবং শবে বরাত নিয়ে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিলো তা এখন পুরনো হয়ে গিয়েছে। যখন  এ বিষয়ে সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছিল তখন অনেকের বিভিন্ন মন্তব্য বা আপত্তি থেকে মনে হয়েছিল, অনেকের কাছেই আসলে হিলাল ও সুবুতে হিলাল সংক্রান্ত ফিকহী মাসআলাগুলো স্পষ্ট নয়। যার কারণেই যত অহেতুক সংশয় ও অনর্থক আপত্তি। সেজন্য বিষয়টি এখন পুরনো হয়ে গেলেও যেহেতু এ ধরনের পরিস্থিতি যে কোনো সময় ঘটতে পারে তাই বিষয়টির আসল হাকীকত ও সংশ্লিষ্ট মাসআলাগুলো ভালোভাবে বুঝে নেয়া দরকার। এ উদ্দেশ্যেই এ সাক্ষাৎকার।

সাক্ষাৎকারের পূর্বে ঘটনার প্রেক্ষাপটটি পেশ করা হল।

২৯ রজব ১৪৪০ হি. মোতাবেক ৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় শাবানের হেলাল দেখার কোনো সাক্ষী না পাওয়া যাওয়ায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি রজব মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে ৮ এপ্রিল পহেলা শাবান ও ২১ এপ্রিল দিবাগত রাতে শবে বরাত পালনের ঘোষণা দেয়। পরদিন (৭ এপ্রিল) ঢাকাস্থ রাজারবাগ দরবার শরীফের মুখপত্র আল এহসান (অনলাইন)-এ খাগড়াছড়িতে ২৯ রজব সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা গিয়েছে বলে দাবি করা হয় এবং আরো কিছু পত্রিকায় এ খবর ছাপা হয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভাপতি বাংলাদেশ সরকারের ধর্মপ্রতিমন্ত্রী ঢাকার শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরামের সাথে ১৩ এপ্রিল রোজ শনিবার বাইতুল মোকাররমস্থ ইসলামিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে এক বৈঠকে মিলিত হন।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উক্ত বিষয়ে শরয়ী সমাধান পেশ করার জন্য ১১ জন আলেমের একটি সাব কমিটি গঠন করা হয়। সাব কমিটি সাক্ষীদের সাক্ষ্য শুনে শরীয়ত অনুযায়ী তা যাচাই বাছাই করার জন্য ১৬ এপ্রিল রোজ মঙ্গলবার বৈঠকে বসেন। সেমতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তা সাক্ষীদেরকে সাক্ষ্যপ্রদানের জন্য সাব কমিটির মজলিসে হাজির হওয়ার আহ্বান করেন। সাক্ষীপক্ষীয় লোকেরা কিছু অপ্রাসঙ্গিক শর্ত জুড়ে দেয়, শরীয়তের দৃষ্টিতে যেগুলোর কোনো এতেবার নেই। এরপর সাব কমিটির পক্ষ থেকে সাব কমিটির একজন সদস্য সাক্ষীদের কাছে যান। এবারও সাক্ষীপক্ষীয় লোকেরা সেই অপ্রাসঙ্গিক শর্ত জুড়ে দেয় এবং সে শর্ত না মানলে সাক্ষ্য  দিতে অসম্মতি জানায়।

শরীয়তের আলোকে হেলাল দেখা প্রমাণিত না হওয়ায় সাব কমিটি জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৮ এপ্রিল শাবান শুরু হওয়া এবং ২১ এপ্রিল দিবাগত রাতে শবে বরাত পালনের ফয়সালা বহাল রাখে।

সাব কমিটির এ সিদ্ধান্তের পর শাবানের হিলাল নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের অবসান হয় এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে।

তারপরও কিছু লোক এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বিভিন্ন অমূলক কথাবার্তা ছড়াতে থাকে। তাদের সেসব অমূলক প্রশ্ন আর কিছু জরুরি জিজ্ঞাসা নিয়ে সাব কমিটির প্রধান আল্লামা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেবের শরণাপন্ন হয়েছেন মাওলানা সায়ীদুল হক। -সহ সম্পাদক]

প্রশ্ন :

পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি, ২৯ রজব তথা ৬ই এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছেন বলে যারা দাবি করেছেন তারা উলামায়ে কেরামের মজলিসে এসে সাক্ষ্য দেননি। সাক্ষ্য পাওয়া না গেলে পূর্বের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে এটাই তো নিয়ম। তারপরও মনে একটা খটকা কাজ করে যে, বাস্তবেই যদি তারা চাঁদ দেখে থাকে তাহলে আমাদের শবে বরাতের কী হবে?!

উত্তর :

আসলে আমরা শরীয়তের মুকাল্লাফ। শরীয়ত অনুযায়ী যা বিধান সেটাই আমাদের করতে হবে। ২৯ রজব সন্ধ্যায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় আমাদের চাঁদ দেখা কমিটি এ হাদীস-

فَإِنْ غُمّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا العِدّةَ ثَلاَثِينَ.

[হিলাল যদি দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায় তাহলে (মাসের) গণনা ত্রিশ পূর্ণ করো। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯০৭]

অনুযায়ী ফায়সালা করেছেন অর্থাৎ রজব মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে এর পরের দিন শাবান মাস শুরু করার ফয়সালা করেছেন। পরবর্তীতে কিছু লোক ২৯ রজব সন্ধ্যায় হিলাল দেখেছে বলে দাবি করে। কিন্তু শরয়ী তরিকায় শাহাদাত-এর মাধ্যমে তা প্রমাণিত না হওয়ায় চাঁদ দেখা কমিটির আগের সিদ্ধান্ত  বহাল আছে। সে হিসাবে আমাদের শবে বরাত হল, ২১ এপ্রিল রবিবার দিবাগত রাত। এটা তো স্পষ্ট বিষয়। এতে খটকার কী আছে?

অন্যান্য প্রশ্নের আগে এ বিষয়ে শরীয়তের একটি মৌলিক কথা জেনে রাখা দরকার। এটা জানা থাকলে ইনশাআল্লাহ অনেক প্রশ্ন এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে।

তা হল, চান্দ্রমাস শুরু করার ক্ষেত্রে শরীয়ত ভিত্তি রেখেছে রুয়াতে হেলাল এবং সুবুতে রুয়াতে হেলাল-এর উপর। অর্থাৎ এক্ষেত্রে চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়া এবং দৃষ্টিগোচর হওয়ার বিষয়টি শরয়ী তরীকায় প্রমাণিত হওয়া- এটাই হল মূল।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব অনুযায়ী নতুন চাঁদের জন্ম হয়ে যাওয়া বা কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলে পৃথিবী থেকে তা দৃষ্টিগোচর হওয়ার উপযুক্ত হওয়া- এগুলোকে শরীয়ত মূল বানায়নি।

এমনিভাবে ধরে নেয়া যাক, কোথাও চাঁদ দেখা গিয়েছে কিন্তু দেখার খবর বা শাহাদাত (সাক্ষ্য) শরয়ী পদ্ধতিতে প্রমাণিত হল না, তাহলে এর দ্বারাও নতুন চান্দ্রমাস শুরু করা যাবে না। বরং বর্তমান মাসকে ৩০ দিন হিসাব করে এর পরের দিন থেকে নতুন মাস শুরু হবে। ফিকহ-ফতোয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাছে তো এ উসূল স্পষ্ট। এছাড়া হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ.-এর ‘রুয়াতে হেলাল’ নামক পুস্তিকায়ও এ বিষয়ের কিছু আলোচনা রয়েছে। ‘রুয়াতে হেলাল’ পুস্তিকাটির বাংলা অনুবাদও হয়েছে।

প্রশ্ন :

তারপরও, কথা আছে না- শবে বরাত কয়টা হবে?

উত্তর :

শবে বরাত কয়টা হবে এটা তো কোনো প্রশ্ন না। শবে বরাত হল ১৪ শাবান দিবাগত রাত। ১৪ শাবান শরীয়তের বিধান হিসাবে যেভাবে, সেভাবে হবে। পার্থক্য তো হচ্ছেই। মধ্যপ্রাচ্য ও তার পশ্চিমের  দেশগুলোর সাথে আমাদের একদিনের পার্থক্য তো  হয়েই থাকে। দু রাত তো এমনিতেই হয়ে যাচ্ছে। আসল কথা হল, যে-ই মাসআলা মোতাবেক আমল করবে আল্লাহ তাকে শবে বরাতের ফযীলত দান করবেন।

প্রায়োগিকভাবে পুরো বিশ্বের জন্য আল্লাহ এক শবে বরাত নির্ধারণ করেননি। প্রত্যেকেই তাদের হিলাল দেখা হিসেবে করবে। এভাবে তো এমনিতেই দুই রাত হয়ে যাচ্ছে। দুই অঞ্চলের মানুষ দুই রাতে পাচ্ছে। তো মাসআলা হিসাবে আমল করতে গিয়ে যদি কারো দুই দিনের পার্থক্য হয়, তো তারা শবে বরাত থেকে মাহরূম হবে কেন? আসলে দেখতে হবে, আমরা মাসআলা মোতাবেক আমল করছি কি না। মাসআলা মোতাবেক করলে শবে বরাতের যা ফযীলত পাওয়ার তা পাব।

প্রশ্ন :

ভাগ্য লেখার বিষয় আছে না?

উত্তর :

ভাগ্য লেখার বিষয়- এটা তো শবে কদর-এর বিষয়। শবে বরাতে ভাগ্য লেখা হয়- একথাই তো সহীহ নয়। যদি সহীহও ধরে নেওয়া হয় তো জুমাবার দিবাগত রাতে সৌদিতে শবে বরাত হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাতে পাকিস্তানসহ আরো অনেক দেশে। তো ভাগ্য লেখা হয়েছে কোন্ রাতে? এ প্রশ্ন তো থেকেই যাবে!

আসলে ভাগ্য লেখা এটা হল উর্ধ্বজগতের কাজ। ফেরেশতাগণের প্রতি আল্লাহর যেভাবে যখন হুকুম তারা সেভাবে লিখবেন। আর যমীনবাসী রাতটি পালন করবে শরীয়তের মাসআলা অনুযায়ী। এতেই তারা রাতের বরকত পাবে।

প্রশ্ন :

রজব মাস ৩০ দিন ধরলে লাগাতার চার মাস ৩০ দিন হচ্ছে- এমন তো হয় না!

উত্তর :

পরপর চার মাস ৩০ দিন হতে পারে না- এটা কি জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে বলছেন, না শরীয়তের আলোকে? জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে যদি প্রমাণিত হয় যে, লাগাতার চার মাস ৩০ দিন হয় না-  তো সেটার হাওয়ালা কোথায়? জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলোকে যদি তা প্রমাণিত হয়ও, তাহলেও তো হবে না। কারণ, শরীয়ত জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর মাসআলার ভিত্তি রাখেনি। আর শরীয়তের মাসআলা হিসাবে তো এমন কোনো কথা নেই যে, পরপর চার মাস ৩০ দিন হতে পারবে না।

হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, চান্দ্রমাস ২৯ দিনেরও হয়, ৩০ দিনেরও হয়। এরকম বলা হয়নি যে, লাগাতার কয়েক মাস ৩০ দিনের হতে পারে না, লাগাতার কয়েক মাস ২৯ দিনের হতে পারে না। জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে চান্দ্রমাস কত দিনে হয় না হয় সেটা দেখার বিষয় নয়; দেখার বিষয় হল, শরীয়ত যেটাকে চান্দ্রমাসের মাপকাঠি বানিয়েছে, সে হিসেবে চান্দ্রমাস শুরু এবং সমাপ্ত হচ্ছে কি না। সেটা যদি হয়, তাহলে কোথাও কখনো লাগাতার চান্দ্রমাস ২৯ দিন বা ৩০ দিনের হলে এতে সমস্যার কিছু নেই। কুরআন-সুন্নাহ, ফিকহ, হাদীসের কোথাও শরয়ী দৃষ্টিতে এটা সম্ভব নয়- এমন কোনো কথা নেই। কাজেই দেখতে হবে, মাসগুলো যথাযথ তরিকায়,  শরয়ী তরিকায় শুরু হয়েছে কি না? সেটা যদি হয়, তাহলে নিশ্চিন্ত থাকব ইনশাআল্লাহ!

প্রশ্ন :

সৌদির সাথে যে দুই দিনের পার্থক্য হয়ে গেল?

উত্তর :

فَإِنْ غُمّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا العِدّةَ ثَلاَثِينَ.

শরীয়তের এ বিধান হিসাবে কখনো কখনো সৌদির সাথে আমাদের দুই দিনের পার্থক্য হতে পারে। আমাদের আমল যদি শরীয়তের হুকুম অনুযায়ী হয়ে থাকে তাহলে সৌদির দুই দিন পরে হওয়াতে বা লাগাতার চার মাস ৩০ দিন হওয়াতে অসুবিধার কী আছে? আসলে মনকে শরীয়তের বিধানের অনুগামী বানাতে হবে। অন্যথায় বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক খটকা মনে আসতেই থাকবে। দেখার বিষয় হল, আমাদের কাজ শরীয়ত মোতাবেক সঠিক হয়েছে কি না। হয়ে থাকলে আর আপত্তির সুযোগ নেই ।

পিছনেও বিভিন্ন সময়ে এরকম হওয়ার নজীর আছে। তারিখের বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করলে লাগাতার কয়েক মাস ৩০ বা ২৯ হওয়ার নজীর পিছনেও পাওয়া যায়।

فَإِنْ غُمّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا العِدّةَ ثَلاَثِينَ.

-এর উপর আমল করতে গেলে এ ধরনের কিছু হওয়া স্বাভাবিক। এখানে শরীয়তের বিধানই মূল। সৃষ্টিগতভাবে চাঁদের পজিশন বা চন্দ্রকলার জ্যোতির্বিজ্ঞান ভিত্তিক বিশ্লেষণকে শরীয়ত ভিত্তি বানায়নি; এ বিষয়টাকে শরীয়ত এখানে মূল রাখেনি। মূল রেখেছে ‘রুয়াতে হেলাল’ এবং

فَإِنْ غُمّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا العِدّةَ ثَلاَثِينَ

-কে।

ভৌগোলিক দিক থেকে দুই দিনের পার্থক্য হওয়ার কথা না; এক দিনের পার্থক্য হওয়ার কথা। এক দিনের পার্থক্য হওয়া, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়ার কারণে যখন হেলাল দৃষ্টিগোচর হবে না, হেলাল দিগন্তে আছে; কিন্তু দেখা যায়নি আবহাওয়ার কারণে, বা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়ার কারণে, তখন-

فَإِنْ غُمّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا العِدّةَ ثَلاَثِينَ

-এর ওপর আমল করতে গিয়ে আগের মাসকে ত্রিশ পুরো করা হলে এ পার্থক্য দাঁড়াবে। দাঁড়াতেই পারে। পিছনে এমন বহুত হয়েছে। এমনকি ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, রমযানসহ সব গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ ইবাদতের মাসগুলোতেও সেটা দেখা গেছে।

প্রশ্ন :

আচ্ছা কেউ কেউ যে বলছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কৌশলে বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তার পূর্বের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে!

উত্তর :

না, এ কথাটি সঠিক নয়। ১৩ এপ্রিল শনিবারের বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ১১ জন আলেমের একটি সাব কমিটি গঠন করে এ বিষয়ে শরীয়ত অনুযায়ী ফয়সালা করার দায়িত্ব দেন এবং কমিটি পূর্ণ স্বাধীনতার সাথে শরীয়তের আলোকে ফয়সালা প্রদান করেন।

প্রশ্ন :

কেউ বলছে, আপনি নাকি চাপের মুখে এ ফয়সালা দিয়েছেন, নতুবা আপনার নাকি ভিন্ন রায় ছিল?

উত্তর :

এ কথাও ঠিক নয়। চাপ তো দূরের কথা; প্রশাসনের কোনো ব্যক্তি কোনো ফোন করেও কোনো আবদার জানায়নি এবং শনিবারের মজলিসে মন্ত্রী সাহেব স্পষ্টই বলেছেন যে, আলেমদের যে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে, তাঁরা যে ফয়সালা করবেন, সেটাই ফয়সালা। তাঁরা সাক্ষীদের বক্তব্য শুনে যদি গ্রহণ করেন, অর্থাৎ আগের ফয়সালা পরিবর্তন করেন, সেটা হবে। আর বক্তব্য শোনার পর তাঁরা যদি মনে করেন যে, না, মাসআলা হিসাবে আগের ফয়সালা ঠিক আছে, সেটাও হতে পারে। নতুন হলে নতুন। এ কথা তো আগে থেকেই ঘোষণা দেওয়া ছিল। এখানে চাপের কোনো কিছুই ছিল না।

প্রশ্ন :

একটা কথা যে কেউ কেউ বলছে, সাক্ষীরা অনিরাপত্তার কারণে আসতে পারেনি!

উত্তর :

কেন?  সাক্ষীদেরকে তো বারবার আহ্বান করা হয়েছে। এক তো শনিবারের মজলিসে বলে দেওয়া হয়েছে- তাদের যা বলার সাব-কমিটিকে বলবে। কমিটি সাক্ষীদের বক্তব্য শুনে যেভাবে কুরআন-হাদীস বলে, শরীয়ত বলে, সেভাবে সিদ্ধান্ত দেবে । তাছাড়া সোমবারে আবার ফোন করে সাক্ষীদেরকে আসার জন্য আহ্বান করা হয়েছে। তারা তো এসে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে অবস্থান গ্রহণ করেছেন কিন্তু বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তারা আলেমদের সামনে উপস্থিত হননি। তারা মসজিদের প্রাঙ্গণে অবস্থান করছেন, দ্বিতীয় তলায় আলেমদের সামনে যাবেন- এতে অনিরাপত্তার কী আছে?

* তাছাড়া মজলিসের সদস্যের কেউ কেউও তো  গিয়ে তাদেরকে আহ্বান করেছেন।

** হাঁ, মজলিসের একজন সদস্য গিয়েও উনাদেরকে সরাসরি আহ্বান করেছেন আসার জন্য। এজন্য এখানে নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্নই অবান্তর। শরীয়তের মাসআলা হল, যে হেলাল দেখেছে, সে স্বাভাবিকভাবেই তার সাক্ষ্য পেশ করবে। অতিরিক্ত শর্ত যুক্ত করা তো সাক্ষ্যের স্বচ্ছতার ব্যাপারে আরো সন্দেহ সৃষ্টি করে।

প্রশ্ন :

আচ্ছা, এটা তো ব্যাপকভাবেই আলোচিত হয়েছে যে, যারা চাঁদ দেখেছে তাদের সম্পর্ক হল রাজারবাগ দরবার-এর সাথে।

রাজারবাগীরা তো চরম পর্যায়ের গোমরাহ ফেরকাহ। কিছুদিন পূর্বে তাদের চাঁদ দেখা কমিটি ‘মজলিসে রুয়াতে হেলাল’-এর ‘দ্বীন ইসলাম উনার দৃষ্টিতে শামসী ও হিজরী ক্যালেন্ডার উনাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক একটি সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও দেখেছি। তাতে কুরআন তিলাওয়াতের পর বলা হয়েছে-

صدق الله العظيم، وصدق رسوله النبي الحبيب الكريم، وصدق مرشدنا العظيم، وأهل بيته الكريم، عليهم السلام أجمعين.

দেখুন কিভাবে صدق الله-এর মাঝে নিজেদের পীর ও পীরের পরিবারকে যুক্ত করে বলল-

صدق مرشدنا وأهل بيته.

কমিটির সভাপতি তার বক্তব্য শুরু করেছেন এভাবে-

الحمد والشكر لشيخنا ومرشدنا العظيم، وأهل بيته الكريم، عليهم السلام أجمعين، والصلاة والسلام على سيد الأنبياء والمرسلين، و أهل بيته الكريم، عليهم السلام أجمعين، والحمد لله رب العالمين.

اللهم صل على سيدنا ونبينا وحبيبنا وشفيعنا، مولانا وسيلتي إليك، وآله وسلم، وعلى شيخنا مرشدنا ممدوح حضرت مرشد قبله، عليه السلام وعلى أهل بيته الكريم، عليهم السلام أجمعين.

এটা তো আরো মারাত্মক। যেখানে কুরআন বলে الحمد لله সেখানে সে বলছে সকল হামদ নাকি তার পীরের। (الحمد لشيخنا )

কে না জানে, দুরূদ শরীফ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর আহলে বাইতের জন্য হয়ে থাকে আর এরা দুরূদ শরীফ পড়ছে নিজের পীর ও পীরের পরিবারের জন্য।

(وعلى شيخنا مرشدنا ممدوح حضرت مرشد قبله، عليه السلام وعلى أهل بيته )

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে উক্ত সভাপতি সাহেব বলেন,

‘যিনি… নূরে মুজাসসাম… যিনি সবকিছু দেখেন, ওনি কিন্তু সব জানেন…।’

তাদের আল এহসান পত্রিকা (অন লাইন)-এ দেখেছি, তাদের পীরের স্ত্রীর কারামত উল্লেখ করে তারপর লিখেছে- ‘সুবহানা উম্মিল উমাম’।

তারা তাদের পীর সাহেবের ব্যাপারে মারাত্মক আপত্তিকর লকব যুক্ত করে। যেমন, ‘কাইয়ূমুয যামান’। এ ধরনের মারাত্নক আকীদার লোকদের  সাক্ষ্য আর কতটুকু কবুল হবে!

উত্তর :

হাঁ, বেদআতীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে কি না- এ মাসআলা তো ফিকহের কিতাবে আছে এবং কোন্ ধরনের বিদআতের ক্ষেত্রে কী বিধান সেটাও আছে। যদি তারা সাক্ষ্য পেশ করত তাহলে এসব বেদআতী আকীদা তারা পোষণ করে কি না তা যাচাই করা হত এবং শরীয়তে এ ধরনের বেদআতীর সাক্ষ্যের কী বিধান- সে হিসাবে ফয়সালা হত।

প্রশ্ন :

বিজিবির কয়েকজন সদস্যও নাকি চাঁদ দেখেছে?

উত্তর :

তারা কি বিষয়টি ফাউন্ডেশন-এর সামনে এসে পেশ করেছে? সাক্ষ্য দিয়েছে? বিষয়টি নিয়ে এত কিছু হচ্ছে এর পরও কি এসে পেশ করেছে? এরকম উড়ো উড়ো খবর, অনানুষ্ঠানিক খবর যে, অমুক জায়গায় এতজন চাঁদ দেখেছে, অমুক জায়গায় অমুকে দেখেছে, তমুকে দেখেছে- এগুলো কখনো মাসআলার ভিত্তি না।

শরীয়ত ‘রুয়াতে হেলাল’ সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে মূল রেখেছে, যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষের সামনে চাঁদের প্রমাণ উপস্থিত হওয়া। অমুকে দেখেছে, আমাদের কাছে এত সাক্ষী আছে, তমুকের কাছে এত সাক্ষী আছে, অমুক জায়গা থেকে দেখেছে, এসমস্ত সংবাদ যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষের ফয়সালাকে কখনো বাতিল করতে পারে না।

মনে রাখতে হবে, বাস্তবে যদি কোথাও হিলাল দেখা গিয়েও থাকে তথাপি তা শরয়ী তরীকায় যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষের সামনে প্রমাণিত না হওয়ার কারণে আমাদের আমল ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। যার দলীল হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ হাদীস-

 الصّوْمُ يَوْمَ تَصُومُونَ، وَالفِطْرُ يَوْمَ تُفْطِرُونَ، وَالأَضْحَى يَوْمَ تُضَحّونَ

অর্থাৎ, সিয়াম সেদিন, যেদিন তোমরা রোযা রাখ; ‘ফিতর’ সেদিন, যেদিন তোমরা রোযা ছাড়। আর কুরবানী সেদিন, যেদিন তোমরা কুরবানী কর। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৭০৬

এবং আয়েশা রা.-এর এ আছার-

إِنّمَا النّحْرُ إِذَا نَحَرَ الْإِمَامُ، وَعُظْمُ النّاسِ، وَالْفِطْرُ إِذَا أَفْطَرَ الْإِمَامُ، وَعُظْمُ النّاسِ.

অর্থাৎ, কুরবানী(র দিন) তো সেদিন, যেদিন ইমাম (মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান) ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কুরবানী করে এবং ফিতর (ঈদুল ফিতর) তো সেদিন, যেদিন ইমাম ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রোযা ছাড়ে। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ৪/১৫৭, হাদীস ৭৩১০

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন মাসিক আলকাউসার মে ২০১৪ ঈ., পৃ. ১৩-২০ এবং নভেম্বর ২০১৪ ঈ., পৃ. ১৩-১৯

প্রশ্ন :

আচ্ছা ঠিক আছে, সাক্ষ্য দিতে আসল না। শরীয়তের আলোকে তার দেখার এতেবার হয়নি; তাই শরয়ী তরীকায় চাঁদ দেখা প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু সে নিজে কী করবে?

উত্তর :

শবে বরাত তো ব্যক্তিগত এবাদত-বন্দেগির রাত। ব্যক্তিগত  ইবাদত যে কোনো রাতেই যে কেউ করতে পারে। বাস্তবে সে যদি সত্যবাদী হয়ে থাকে তাহলে সে তার দেখা অনুযায়ী যে রাতে ১৪ শাবানের রাত হয় সে রাতেও এবাদত বন্দেগী করুক। কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী যে রাত সে রাতেও করবে। কিন্তু সে অন্য মানুষকে তার দেখা অনুযায়ী আমল করতে উদ্বুদ্ধ করা- এটা শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষের ঘোষণাকেই শরীয়ত এখানে ভিত্তি বানিয়েছে। অন্য কেউ আরেকজনকে দাওয়াত দিবে- এটার অনুমতি নেই।

سُبْحَانَكَ اللّهُمّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَلّا إِلَهَ إِلّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

খানার সময় মাথা ঢেকে রাখা কি সুন্নত?

প্রশ্ন মুফতী সাহেবের কাছে আমার প্রশ্ন হল, আমাদের গ্রামের মুরুব্বীগণ খানা খাওয়ার সময় মাথা ঢেকে …