হোম / জায়েজ নাজায়েজ / ঈসালে সওয়াবের শরীয়তসিদ্ধ কতিপয় পদ্ধতি
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

ঈসালে সওয়াবের শরীয়তসিদ্ধ কতিপয় পদ্ধতি

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহমান

যে কোনো নেক কাজের ঈসালে সওয়াব করা জায়েয। তবে সকল পদ্ধতির গুরুত্ব ও মর্যাদা এক পর্যায়ের নয়। গত সংখ্যায় দুটি পদ্ধতি (দুআ ও সদকা) আলোচিত হয়েছে। এখানে অন্যান্য পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

এক. হজ্ব

হজ্ব ইসলামের এক প্রোজ্জ্বল শিআর এবং অত্যন্ত গভীর ও হৃদয়গ্রাহী ইবাদত। এর মধ্য দিয়ে বান্দা আর প্রতিপালকের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্কের চর্চা হয় তা অতুলনীয়। সেই সাথে এটা বিরাট পুণ্যময় আমলও বটে।

এক হাদীসে আছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হল, সর্বোত্তম আমল কী? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। জিজ্ঞেস করা হল, তারপর কী? বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। জিজ্ঞেস করা হল, তারপর কী? বললেন, মাবরূর হজ্ব। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৫১৯

অপর এক হাদীসে আছে, যে আল্লাহর জন্য হজ্ব করে এবং তাতে অশালীনতা ও গোনাহ থেকে বিরত থাকে, সে হজ্ব থেকে নবজাতক শিশুর মত (নিষ্পাপ হয়ে) ফিরে আসে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৫২১

হজ্বের ঈসালে সওয়াব করা জায়েয। এটা একাধিক হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। কিছু হাদীস এই-

১. বুরায়দা রা. থেকে বর্ণিত, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত ছিলাম। এক মহিলা এসে জিজ্ঞেস করল, …আমার মা হজ্ব না করে ইন্তেকাল করেছেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারব? তিনি বললেন, (হাঁ), তুমি তার পক্ষ থেকে হজ্ব কর। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৪৯

بينا أنا جالس عند رسول الله صلى الله عليه وسلم، إذ أتته امرأة، فقالت: إني تصدقت على أمي بجارية، وإنها ماتت إنها لم تحج قط، أفأحج عنها؟ قال: حجي عنها.

২. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, জুহায়না গোত্রের এক মহিলা এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, আমার মা হজ্বের মানত করেছিলেন কিন্তু তা পূরণ করার আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারব? তিনি বললেন, হাঁ, তার পক্ষ থেকে হজ্ব কর। আচ্ছা তোমার মা’র উপর ঋণ থাকলে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না? আল্লাহর ঋণ পরিশোধ কর। তাঁর ঋণই অধিকতর পরিশোধযোগ্য। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৮৫২

عن ابن عباس رضي الله عنهما، أن امرأة من جهينة، جاءت إلى النبي صلى الله عليه وسلم، فقالت: إن أمي نذرت أن تحج فلم تحج حتى ماتت، أفأحج عنها؟ قال: نعم، حجي عنها، أرأيت لو كان على أمك دين أكنت قاضيته؟ اقضوا الله، فالله أحق بالوفاء.

৩. ইবনে আব্বাস রা, থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে لبيك عن شبرمة বলতে শুনে জিজ্ঞেস করলেন, শুবরুমা কে? বলল, আমার এক ভাই। অথবা বলেছে, আমার এক নিকটাত্মীয়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি হজ্ব করেছ? বলল, জ্বী না। বললেন, আগে তুমি হজ্ব কর তারপর শুবরুমার পক্ষ থেকে কর। -‘সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৮১১

عن ابن عباس، أن النبي صلى الله عليه وسلم سمع رجلا يقول: لبيك عن شبرمة، قال: من شبرمة؟ قال: أخ لي  أو قريب لي، قال: حججت عن نفسك؟ قال: لا، قال: حج عن نفسك ثم حج عن شبرمة.

আরো দ্রষ্টব্য : সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩৯৮৮

এই হাদীসগুলো থেকে বোঝা যায় যে, হজ্ব মাইয়িতের উপকারে আসবে এবং এর সওয়াব তার কাছে পৌঁছবে। এখানে মাইয়িতের জন্য হজ্ব করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইমাম নববী রাহ. (৬৭৬হি.) লেখেন,

..الدعاء والصدقة والحج فإنها تصل بالإجماع.

দুআ, সদকা ও হজ্বের সওয়াব সর্বসম্মতিক্রমে মাইয়িতের কাছে পৌঁছে। -শরহু সহীহ মুসলিম ১/৯০

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. (৭২৮হি.) বলেন,

وأما الحج فيجزئ عند عامتهم، ليس فيه إلا اختلاف شاذ.

বিচ্ছিন্ন কিছু মতভেদ ছাড়া অধিকাংশ ইমামের মতে হজ্ব মাইয়িতের জন্য যথেষ্ট হবে। -মাজমূউল ফাতাওয়া ২৪/৩১০

আরো দ্রষ্টব্য : আলমুগনী, ইবনে কুদামা ৩/৫১৯-৫২১; কিতাবুর রূহ, ইবনুল কাইয়িম পৃ. ১৩৯-১৪০; শরহু আকীদাতিত তহাবী, ইবনে আবিল ইয্ পৃ. ৬৬৭-৬৬৮; মাজমূআয়ে রাসায়েলে আকীদা, সিদ্দীক হাসান খান ১/৫৮৪; ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েলে মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আলে শায়েখ ৫/১৯৪; মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ইবনে উসায়মীন ১৭/২৫৮-২৬০; ফাতাওয়া শাইখুল হাদীস মুবারকপুরী ১/৪৫৯

দুই. উমরা

উমরা খুবই সওয়াবের কাজ। এক হাদীসে আছে, তোমরা হজ্ব ও উমরা পরপর একত্রে আদায় করো। এ দুটো দারিদ্র ও গোনাহকে এমনভাবে দূর করে দেয় যেমন হাপর লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা দূর করে দেয়। -সুনানে তিরমিযী, হাদীস ৮১০

অন্য এক হাদীসে আছে, এক উমরা থেকে আরেক উমরা মধ্যবর্তী সময়ের জন্য কাফফারা। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩৪৯

উমরা করেও ঈসালে সওয়াব করা জায়েয।

আবু রাযীন উকায়লী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা খুবই বৃদ্ধ। তিনি হজ্ব, উমরা এমনকি সফর করতেও সক্ষম নন। নবীজী বললেন, তুমি তার পক্ষ থেকে হজ্ব ও উমরা করো। -সুনানে তিরমিযী, হাদীস ৯৩০

عن أبي رزين العقيلي أنه أتى النبي صلى الله عليه وسلم، فقال : يا رسول الله، إن أبي شيخ كبير، لا يستطيع الحج والعمرة، ولا الظعن، قال : حج عن أبيك واعتمر.

এ হাদীস থেকে স্পষ্ট যে, মাযূরের পক্ষ থেকে নায়েব হিসেবে উমরা করা জায়েয। সুতরাং নিজে উমরা করে মাইয়িতকে সওয়াব পৌঁছানোও জায়েয হবে। কারণ ‘নিয়াবতে’র চেয়ে ঈসালে সওয়াব হালকা।

শায়েখ মুহাম্মদ ইবনে সালেহ আলউসায়মীন রাহ. (১৪২১হি.) বলেন,

يجوز الاعتمار عن الميت كما يجوز الحج عنه.

মৃতের পক্ষ থেকে হজ্বের মত উমরা করাও জায়েয। -ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম পৃ. ৫০৬

শায়েখ আবদুল্লাহ ইবনে জিবরীন রাহ. (১৪৩০হি.) বলেন,

يجوز أن يهدى للميت شيء من الأعمال فتنفعه، كالحج والعمرة والصدقة والدعاء والجهاد ونحو ذلك.

যে কোনো নেক আমল মাইয়িতকে হাদিয়া দেওয়া জায়েয এবং এ তার উপকারে আসবে। যেমন হজ্ব, উমরা, সদকা, দুআ, জিহাদ ইত্যাদি। -আদদুরারুল মুবতাকারাত ফী শরহি আখসারিল মুখতাসারাত ১/৪৫৪-৪৫৫

তিন. কুরবানী

কুরবানী ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিআর ও ইবাদত এবং আল্লাহর জন্য ত্যাগ ও বিসর্জনের এক অনুপম অনুষঙ্গ।

সামর্থ্যবানের উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। হাদীসে এর প্রতি সবিশেষ উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা-জীবনে প্রতি বছর কুরবানী করেছেন।

বিভিন্ন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, কুরবানীর ঈসালে সওয়াব করা জায়েয। এখানে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করছি।

১. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর জন্য কালো পা, কালো পেট ও কালো ভ্রু বিশিষ্ট দুম্বা আনার নির্দেশ দিলেন। আনা হলে তিনি আয়েশা রা.-কে বললেন, একটি ছুরি এনে পাথরে ঘষে ধারালো কর। তিনি তা-ই করলেন। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুরি হাতে নিয়ে দুম্বাকে শুইয়ে যবাহ করার জন্য প্রস্তুত হলেন এবং বললেন,

باسم الله، اللهم تقبل من محمد وآل محمد، ومن أمة محمد.

‘আল্লাহর নামে যবাহ করছি। হে আল্লাহ! আপনি তা কবুল করুন মুহাম্মদ ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে এবং তার উম্মতের পক্ষ থেকে।’ তারপর কুরবানী করলেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬৭

২. আবু সায়ীদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা কুরবানী করেছেন এবং বলেছেন, এটা আমার পক্ষ থেকে এবং আমার যে সকল উম্মত কুরবানী করতে অক্ষম তাদের পক্ষ থেকে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১১০৫১

عن أبي سعيد الخدري، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم ضحى بكبش أقرن، وقال: هذا عني، وعمن لم يضح من أمتي.

আরো দ্রষ্টব্য : মুসতাদরাকে হাকিম ৪/২২৮

নূরুদ্দীন হায়ছামী রহ. (৮০৭হি.) বলেন, رجاله ثقات ‘এর বর্ণনাকারীগণ ছিকা’। -মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৪/১৯

৩. জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন শিং বিশিষ্ট কালো ও সাদা রঙ মিশ্রিত দুটি দুম্বাকে যবাহের জন্য কেবলামুখী করে শোয়ান এবং এই দুআ করেন-

إني وجهت وجهي للذي فطر السموات والأرض، على ملة إبراهيم حنيفا، وما أنا من المشركين، إن صلاتي ونسكي ومحياي ومماتي لله رب العالمين، لا شريك له، وبذلك أمرت وأنا من المسلمين، اللهم منك ولك، وعن محمد وأمته، باسم الله والله أكبر.

আমি একনিষ্ঠভাবে সেই সত্তার দিকে মুখ ফেরালাম, যিনি আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন। ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মিল্লাত অনুযায়ী, যিনি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে আল্লাহ অভিমুখী করেছিলেন। আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। আমার নামায, আমার কুরবানী ও আমার জীবন-মরণ সবই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। আমাকে এরই আদেশ করা হয়েছে। আমি অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত। ইয়া আল্লাহ! এটা তোমারই পক্ষ থেকে এবং তোমারই জন্য- মু‏হাম্মাদ ও তার উম্মতের তরফ থেকে।

এরপর তিনি বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে যবাহ করেন। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৯৫

আরো দ্রষ্টব্য : সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ২৮৯৯; মুসতাদরাকে হাকিম ১/৪৬৭

এ হাদীসগুলোয় আমরা লক্ষ করেছি যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্য কুরবানী করেছেন এবং এতে নিজ পরিবার ও উম্মতের মধ্যে যারা কুরবানী করতে অক্ষম তাদেরকে অংশীদার করেছেন। বহু ফকীহ ও হাদীস ব্যাখ্যাকার বলেছেন যে, এখানে তাদেরকে সওয়াবের মধ্যে শরীক করা উদ্দেশ্য। অর্থাৎ তাদেরকে কুরবানীর সওয়াব পৌঁছানো হয়েছে।

আমীর সানআনী রাহ. (১১৮২হি.) উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর হাদীসটির ব্যাখ্যায় বলেন,

ودل قوله: >وآل محمد< وفي لفظ >عن محمد وآل محمد<: أنه تجزئ التضحية من الرجل عن أهل بيته ويشركهم في ثوابها، وأنه يصح نيابة المكلف عن غيره في فعل الطاعات، إن لم يكن من الغير أمر ولا وصية، فيصح أن يجعل ثواب عمله لغيره، صلاة كانت أو غيرها.

عن محمد وآل محمد বাক্যটি থেকে বোঝা যায় যে, নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করে তাদেরকে সওয়াবের মধ্যে শরীক করা জায়েয এবং অন্যের পক্ষ থেকে নায়েব হিসেবে নেক কাজ করা যাবে, যদিও তার পক্ষ থেকে নির্দেশ বা অসিয়ত না থাকে। সুতরাং নেক কাজের সওয়াব অন্যকে দান করা বৈধ। তা নামায হোক বা অন্য কিছু। -সুবুলুস সালাম ৪/১২৫

শামসুল হক আযীমাবাদী (১৩০৭হি.) ‘গুনিয়াতুল আলমায়ী’ পুস্তিকায় এ বিষয়ে সবিস্তার আলোচনা করেছেন। পুস্তিকাটি ইমাম তবারানী কৃত ‘আলমুজামুস সাগীর’-এর শেষে ছেপেছে। এটা মূলত একটি ইস্তিফতার জবাব। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, মৃতদের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয কি না এবং এর সওয়াব তাদের কাছে পৌঁছে কি না? উত্তরে তিনি বলেছেন,

إن الأضحية عن الميت سنة ويصل ثوابها إليه بلا مرية.

মাইয়িতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা সুন্নত এবং এর সওয়াব নিঃসন্দেহে তার কাছে পৌঁছে।

এরপর এ বিষয়ক বিভিন্ন হাদীস উল্লেখ করে বলেন,

وهذه الأحاديث كلها تدل دلالة واضحة على أنه يجوز للرجل أن يضحي عنه وعن أتباعه وأهل بيته وعن الأموات ويشركهم معه في الثواب.

এ হাদীসগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, নিজের সঙ্গে পরিবার ও মৃতদের জন্য কুরবানী করে তাদেরকে সওয়াবের মধ্যে অংশীদার করা জায়েয। -আলমুজামুস সাগীর পৃ. ১৭৪

শায়েখ মুহাম্মদ ইবনে সালেহ আলউসায়মীন বলেন,

والأضحية عبادة بدنية قوامها المال، وقد ضحى النبي صلى الله عليه وسلم عن أهل بيته وعن أمته جميعا، وما من شك في أن ذلك ينفع المضحى عنهم، وينالهم ثوابه ولو لم يكن كذلك لم يكن للتضحية عنهم فائدة.

কুরবানী এমন একটি দৈহিক ইবাদত, যার মূল হল সম্পদ। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ পরিবার ও উম্মত সকলের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন।  সন্দেহ নেই যে, এটা তাদের উপকারে আসবে এবং এর সওয়াব তাদের কাছে পৌঁছবে। নতুবা তাদের পক্ষ থেকে কুরবানী করার কোনো অর্থ নেই। -মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল ১৭/২৬০

আরো দ্রষ্টব্য : গায়াতুল বায়ান, আমীর কাতেব ইতকানী (পা-ুলিপি) ২৬৫; বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৬; তাবয়ীনুল হাকায়েক ২/৪২০; শরহু সুনানি আবি দাউদ, ইবনে রাসলান ১২/১৫৮; ফাতাওয়া শাইখুল হাদীস মুবারকপুরী ১/৪৫৯

 

চার. রোযা

রোযা এক মহিমান্বিত ইবাদত, তাকওয়া অর্জনের অনন্য উপায় এবং প্রভূত সওয়াব ও পুণ্যময় কাজ।

এক হাদীসে আছে, মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়- একটি আমলের সওয়াব দশ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ বলেছেন, রোযা ছাড়া। কারণ এ একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য সহবাস ও পানাহার থেকে বিরত থাকে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৫১

রোযার সওয়াবরেসানি করা বৈধ। নিম্নে এ সংক্রান্ত কিছু হাদীস উদ্ধৃত করা হল।

১. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেউ রোযা জিম্মায় রেখে মারা গেলে তার অভিভাবক যেন তার পক্ষ থেকে রোযা রাখে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯৫২

عن عائشة رضي الله عنها، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم، قال: من مات وعليه صيام صام عنه وليه.

২. ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, আমার মা মারা গেছেন কিন্তু তার জিম্মায় এক মাসের রোযা ছিল। আমি কি তার পক্ষ থেকে কাযা করতে পারব? তিনি বললেন, হাঁ। আল্লাহর ঋণই অধিকতর পরিশোধযোগ্য। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৯৫৩

عن ابن عباس رضي الله عنهما، قال: جاء رجل إلى النبي صلى الله عليه وسلم، فقال: يا رسول الله إن أمي ماتت وعليها صوم شهر، أفأقضيه عنها؟ قال: نعم، فدين الله أحق أن يقضى.

৩. বুরায়দা রা. থেকে বর্ণিত, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত ছিলাম, এক মহিলা এসে বলল, …আমার মা ইন্তেকাল করেছেন। তার জিম্মায় এক মাসের রোযা ছিল। আমি কি তার পক্ষ থেকে রোযা রাখতে পারব? তিনি বললেন, (হাঁ), তুমি তার পক্ষ থেকে রোযা রাখো। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৪৯

عن عبد الله بن بريدة، عن أبيه رضي الله عنه، قال: بينا أنا جالس عند رسول الله صلى الله عليه وسلم، إذ أتته امرأة، فقالت: إني تصدقت على أمي بجارية، وإنها ماتت..  إنه كان عليها صوم شهر، أفأصوم عنها؟ قال: صومي عنها.

৪. গত সংখ্যায় ‘ঈসালে সওয়াব : কিছু মাসনূন পদ্ধতি’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখায় আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা.-এর এই হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে যে, আস ইবনে ওয়ায়েল জাহেলীযুগে একশো উট যবাহ করার মানত করেছিল। অতপর (তার ছেলে) হিশাম তার পক্ষ থেকে ৫০টি উট যবাহ করে। (বাকি ৫০টি অন্য ছেলে আমর যবাহ করতে চান।) এ ব্যাপারে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তোমার পিতা যদি তাওহীদ স্বীকার করত আর তুমি তার পক্ষ থেকে রোযা রাখতে বা সদকা করতে, তবে এ তার উপকারে আসত।

উপরোক্ত হাদীসগুলোতে মৃত ব্যক্তির জন্য রোযা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ থেকে বোঝা গেল যে, রোযা তার কাজে আসবে এবং এর সওয়াব তার কাছে পৌঁছবে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কুরআন তিলাওয়াত ও সদকার সওয়াব মাইয়িতের কাছে পৌঁছে কি না? উত্তরে তিনি বলেছেন,

لا نزاع بين علماء السنة والجماعة في وصول ثواب العبادات المالية كالصدقة والعتق، كما يصل إليه أيضا الدعاء والاستغفار والصلاة عليه صلاة الجنازة والدعاء عند قبره. وتنازعوا في وصول الأعمال البدنية: كالصوم والصلاة والقراءة. والصواب أن الجميع يصل إليه. . .وهذا مذهب أحمد وأبي حنيفة وطائفة من أصحاب مالك والشافعي.

ইবাদাতে মালিয়া যথা সদকা ও গোলাম আযাদ করার সওয়াব পৌঁছার ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আলেমদের কোনো মতভেদ নেই। যেমন মতভেদ নেই দুআ, ইস্তিগফার, জানাযার নামায ও কবরের পাশের দুআ পৌঁছার ব্যাপারে। মতভেদ হয়েছে শুধু শারীরিক ইবাদত যেমন রোযা, নামায ও কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছার ক্ষেত্রে। তবে সঠিক হল সবকিছুই তার কাছে পৌঁছে।

এরপর তিনি আয়েশা রা., ইবনে আব্বাস রা. ও আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা.-এর হাদীস তিনটি উল্লেখ করে বলেন, এটা ইমাম আহমদ, আবু হানীফা এবং এক জামাত মালেকী ও শাফেয়ী ফকীহের মত।

সামনে গিয়ে তিনি আরো বলেন,

وهكذا هذا إذا تبرع له الغير بسعيه نفعه الله بذلك، كما ينفعه بدعائه له والصدقة عنه، وهو ينتفع بكل ما يصل إليه من كل مسلم، سواء كان من أقاربه أو غيرهم، كما ينتفع بصلاة المصلين عليه ودعائهم له عند قبره.

এমনিভাবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিজ প্রচেষ্টা কাউকে দান করে, তাহলে আল্লাহর রহমতে এ তার উপকারে আসবে। যেমন উপকারে আসে দুআ ও সদকা। জানাযার নামায ও কবরের পাশের দুআর মত মুসলিম আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলের দান করা যাবতীয় আমল তার কাজে আসে। -মাজমূউ ফাতাওয়া ২৪/৩৬৬-৩৬৭

নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান (১৩০৭হি.) লেখেন,

روزے کے ثواب کا   ذکر صحیحین کی روایت میں ہے،  قریبی رشتے دار کی طرف سے حج کا ثواب بھی میت کو  پہنچتاہے ‏،   ہدیہ، دعا، استغفار، تلاوت اور نماز کا اجر  بھی پہنچتاہے ‏،  جب کہ یہ سارے کام میت کی طرف سے   کۓ جائیں، ان کا   انکار کرنا شریعت کے مقصد کے  خلاف  ہے،  ہاں سوم، چہلم، ششماہی، برسی کرنا بدعت وضلالت ہے، سنت مطہرہ میں جس قدر آچکا ہے اور جس طرح وارد ہوا ہے، اسی پر اقتصار کرنا اتباع سنت کی دلیل اور سعادت دارین کی علامت ہے

রোযার সওয়াব পৌঁছার কথা সহীহাইনের বর্ণনায় উল্লেখিত আছে। নিকট আত্মীয়ের পক্ষ থেকে করা হজ্বের সওয়াবও মাইয়িতের কাছে পৌঁছে। হাদিয়া, দুআ, ইস্তিগফার, তিলাওয়াত ও নামাযের সওয়াবও পৌঁছে- যদি তা মাইয়িতের পক্ষ থেকে করা হয়। এগুলো অস্বীকার করা শরীয়তের মেজায পরিপন্থী। হাঁ, কুলখানী, চল্লিশা, অর্ধ-বার্ষিকী ও বার্ষিকী পালন করা বিদআত ও গোমরাহী। সুন্নাহয় যে পরিমাণ এসেছে এবং যেভাবে এসেছে তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা সুন্নাহ অনুসরণের দলীল এবং দুনিয়া-আখেরাতের সফলতার আলামত। -মাজমূআয়ে রাসায়েলে আকীদা, সিদ্দীক হাসান খান ১/৫৮৪

আরো দ্রষ্টব্য : আলমুগনী ৩/৫১৯-৫২১; কিতাবুর রূহ পৃ. ১৩৮-১৩৯; শরহু আকীদাতিত তহাবী, ইবনে আবিল ইয্ পৃ. ৬৬৭-৬৬৮; মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েলে ইবনে উসায়মীন ১৭/২৫৮

 

পাঁচ. নামায

নামায অতি মহিমময় এক ইবাদত, আল্লাহর কাছে সমর্পণের অতুল্য পন্থা এবং অত্যন্ত ফযীলত ও সওয়াবের বিষয়।

নামায পড়ে মৃত ব্যক্তিকে সওয়াব পৌঁছানো জায়েয। আমরা আগে দেখেছি যে, অর্থ ও দেহের সমন্বিত ইবাদত তো বটেই রোযার মত নিখুঁত ইবাদাতে বাদানিয়ারও ঈসালে সওয়াব জায়েয। এ থেকে বোঝা যায় যে, নামাযের ঈসালে সওয়াব করাও জায়েয।

ইবনে কুদামা রাহ. (৬২০হি.) দুআ, ইস্তিগফার, হজ্ব ও রোযার ঈসালে সওয়াব সংক্রান্ত কিছু হাদীস উল্লেখ করে বলেন,

وهذه أحاديث صحاح، وفيها دلالة على انتفاع الميت بسائر القرب؛ لأن الصوم والحج والدعاء والاستغفار عبادات بدنية، وقد أوصل الله نفعها إلى الميت، فكذلك ما سواها.

এগুলো সহীহ হাদীস এবং এ থেকে বোঝা যায় যে, সকল নেক আমল মাইয়িতের উপকারে আসবে। কারণ রোযা, হজ্ব, দুআ ও ইস্তিগফার ইবাদাতে বাদানিয়া হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ এর কল্যাণ মৃত ব্যক্তিকে পৌঁছান। সুতরাং অন্যান্য নেক আমলের হুকুমও একই হবে। -আলমুগনী ৩/৫২১

শায়েখ উসায়মীন লিখেছেন,

فإذا أراد شخص أن يصلي ويجعل ثوابها لميته، أو يتصدق، أو يحج، أو يقرأ القرآن، أو يصوم، ويجعل ثواب ذلك لميته فلا بأس به.

ৃوسائر العبادات كالصدقة إذ لا فرق بينهما.

والنبي صلى الله عليه وسلم لم يرد عنه نص يمنع مثل ثواب هذه للميت، حتى نقول: إننا نقتصر على ما ورد، فإذا جاءت السنة بجنس العبادات فإنه يكون المسكوت عنه مثل المنطوق به، لاسيما وأن هذا ليس بنطق من الرسول صلى الله عليه وسلم، بل إنه استفتاء في قضايا أعيان، وإفتاء الرسول صلى الله عليه وسلم بأنه يجوز أن يتصدق الإنسان عن أمه لا يدل على أن ما سواه ممنوع.

নামায পড়ে বা সদকা করে বা হজ্ব করে অথবা কুরআন তিলাওয়াত করে কিংবা রোযা রেখে এর সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দান করতে কোনো অসুবিধা নেই।

এরপর তিনি সদকা সংক্রান্ত দুটি হাদীস উল্লেখ করে বলেন, অন্যান্য ইবাদত সদকার মতই, উভয়ের মধ্যে কোনো ফারাক নেই।

আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে এগুলোর ঈসালে সওয়াব অবৈধ হওয়ার সমর্থনে কোনো বক্তব্য নেই। এজন্য এ কথা বলা যাবে না যে, যে বিষয়গুলোর ঈসালে সওয়াবের কথা হাদীসে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। সুন্নাহয় যেহেতু সাধারণ ইবাদতের কথা এসেছে তাই যেগুলো সম্পর্কে তা নীরব, সেগুলোর হুকুমও বর্ণিত বিষয়গুলোর মতই হবে। বিশেষত যখন এগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ থেকে ইরশাদ করেননি। বরং তাঁর কাছে নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার সমাধান জানতে চাওয়া হলে তিনি সমাধান দিয়েছেন। আর নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের সমাধান থেকে এটা কিছুতেই প্রমাণিত হয় না যে, এ ছাড়া অন্যগুলো অবৈধ। -মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েলে ইবনে উসায়মীন ১৭/২৫৮

আরো দেখা যেতে পারে : বাদায়েউস সানায়ে ২/৪৫৩; তাবয়ীনুল হাকায়েক ২/৪২০-৪২১

 

ছয়. কুরআন তিলাওয়াত

কুরআন মাজীদ অমূল্য নিআমত, যা বিশ্ববাসীর হেদায়েতের জন্য নাযিল হয়েছে। এ আদ্যোপান্ত আলো ও হেদায়েত। এতে রয়েছে মানবজাতির পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশনা। এর তিলাওয়াতে হৃদয়-ভুবন আলোকিত হয়। অর্থ-মর্মে মনন-মেধা উদ্ভাসিত হয়। অনুসরণে জীবন-জগৎ জ্যোতির্ময় হয়।

এই হেদায়েতে জীবন পরিচালিত করা এবং এই আলোতে জীবন উদ্ভাসিত করার পক্ষে এক বড় সহায়ক হল তিলাওয়াত। তিলাওয়াত একটি স্বতন্ত্র ইবাদতও বটে। তাই বেশি বেশি তিলাওয়াত করা পরম সৌভাগ্যের বিষয়। হাদীসে এ ব্যাপারে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

আগের আলোচনা থেকেই বোঝা গেছে যে, কুরআন তিলাওয়াতের ঈসালে সওয়াব করা জায়েয। রোযা আর কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দুটোই ইবাদাতে বাদানিয়া এবং নিম্নোক্ত বর্ণনাগুলো থেকেও এর বৈধতা বোঝা যায় :

১. মাকিল ইবনে ইয়াসার রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা তোমাদের মাইয়িতের জন্য সূরা ইয়াসীন পাঠ কর। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩১২১

عن معقل بن يسار، قال: قال النبي صلى الله عليه وسلم: اقرءوا يس على موتاكم.

আরো দ্রষ্টব্য : সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৩০০২; মুসতাদরাকে হাকিম ১/৫৬৫

২. আবদুর রহমান ইবনে আলা ইবনে লাজলাজ থেকে বর্ণিত, তার পিতা সন্তানদেরকে বলেছেন, আমি মৃত্যুবরণ করলে তোমরা আমাকে কবরে রাখবে এবং بسم الله وعلى سنة رسول الله বলে সুন্দরভাবে মাটি বিছিয়ে দিবে। তারপর আমার মাথার কাছে সূরা বাকারার শুরু ও শেষাংশ পাঠ করবে। আমি ইবনে উমর রা.-কে তা পছন্দ করতে দেখেছি। -তারিখে ইবনে মায়ীন, দূরী সংকলিত ২/৩৭৯-৩৮০

عبد الرحمن بن العلاء بن اللجلاج، عن أبيه أنه قال لبنيه: إذا أدخلت القبر فضعوني في اللحد، وقولوا: بسم الله وعلى سنة رسول الله، وسنوا علي التراب سنا، واقرءوا عند رأسي أول البقرة وخاتمتها، فإني رأيت ابن عمر يستحب ذلك.

ইমাম বায়হাকী রাহ. (৪৫৮হি.) বলেন, هذا موقوف حسن

‘এর সনদ হাসান’। ইমাম নববী রাহ.ও এর সনদকে হাসান বলেছেন।

দ্রষ্টব্য : আদদাআওয়াতুল কাবীর ২/২৯৭; নাতাইজুল আফকার ৪/৪২৬

৩. শাবী থেকে বর্ণিত, আনসার (সাহাবীগণ) মাইয়িতের কাছে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১০৯৫৩

حدثنا حفص بن غياث، عن المجالد، عن الشعبي، قال: كانت الأنصار يقرؤون عند الميت بسورة البقرة.

ইবনে হাজার রাহ. বলেন, মুজালিদ যয়ীফ হলেও পরিত্যক্ত নন; বরং ইমাম মুসলিম রাহ. তার হাদীস সমর্থক পর্যায়ে এনেছেন। -নাতাইজুল আফকার ৪/৩০৯

৪. আবু উমায়্যা আযদী থেকে বর্ণিত, জাবির ইবনে যায়েদ রাহ. মাইয়িতের কাছে সূরা রা‘দ তিলাওয়াত করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, বর্ণনা ১০৯৫৭

حدثنا وكيع، عن حسان بن إبراهيم، عن أمية الأزدي، عن جابر بن زيد، أنه كان يقرأ عند الميت سورة الرعد.

ইবনে হাজার রাহ. বলেন, سنده صحيح ‘এর সনদ সহীহ’। -নাতাইজুল আফকার ৪/৩১২

এ বর্ণনাগুলোর মধ্যে প্রথমটিতে কিছু দুর্বলতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে এটা প্রমাণিত হয় যে, কুরআন তিলাওয়াত মাইয়িতের উপকারে আসে।

ইমাম ইবনে কুদামা রাহ. তিলাওয়াতের সওয়াবরেসানির বৈধতার দলীল আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,

وأنه إجماع المسلمين، فإنهم في كل عصر ومصر يجتمعون ويقرؤون القرآن، ويهدون ثوابه إلى موتاهم، من غير نكير.

এতে মুসলমানদের ইজমা আছে। প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক শহরে তারা সমবেত হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াবরেসানি করেছে। এতে কেউ কোনো আপত্তি করেনি। -আলমুগনী ৩/৫২২

শাফেয়ী ফকীহদের মধ্যেও অনেক ফকীহের মত এটাই যে, কুরআন তিলাওয়াতের ঈসালে সওয়াব করা জায়েয। বিশেষত যদি আল্লাহর কাছে এই দুআ করা হয় যে, তিনি যেন এই সওয়াব মাইয়িতের কাছে পৌঁছে দেন। যাদের মধ্যে ইবনে আবী আসরূন রাহ. (৫৮৫হি.), ইবনে আবিদ দাম রাহ. (৬৪২হি.), ইবনুস সালাহ রাহ. (৬৪৩হি.), তাকীউদ্দীন সুবকী রাহ. (৭৫৬হি.), ইবনুল মুলাক্কীন রাহ. (৮০৪হি.), যাকারিয়া আনসারী রাহ. (৯২৬হি.) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ইমাম ইবনুস সালাহ রাহ.-এর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কুরআন পড়ে পিতা-মাতা বা আত্মীয়-স্বজন কিংবা সাধারণ মুসলমানকে সওয়াব পৌঁছানো যাবে কি না? উত্তরে তিনি বলেছেন, এতে ফকীহদের মতভেদ আছে। তবে অধিকাংশ মানুষ তা জায়েয মনে করে।  এক্ষেত্রে এই দুআ করা উচিত যে, হে আল্লাহ, আপনি এর সওয়াব অমুককে পৌঁছে দিন। -ফাতাওয়া ইবনুস সালাহ ১/১৯৩

أما قراءة القرآن ففيه خلاف بين الفقهاء، والذي عليه عمل أكثر الناس تجويز ذلك، وينبغي أن يقول إذا أراد ذلك: اللهم أوصل ثواب ما قرأته لفلان.

আরো দ্রষ্টব্য : উজালাতুল মুহতাজ ইলা তাওজীহিল মিনহাজ ৩/১১০৪; ফাতহুল ওয়াহহাব বি শরহি মানহাজিত তুল্লাব ২/১৯; আসনাল মাতালিব ফী শরহি রাওযিত তালিব ২/৪১২; মুগনিল মুহতাজ ইলা মারিফাতি মাআনি আলফাযিল মিনহাজ ৩/৯১

মালেকী ফকীহদেরও এক জামাত এই মত পোষণ করেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন ইবনে রুশদ রাহ. (৫২০হি.), আবু বকর ইবনে আরাবী রাহ. (৫৪৩হি.), আবু আবদিল্লাহ কুরতুবী রাহ. (৬৭১হি.), আবু আবদিল্লাহ আলহাফফার রাহ. (৮১১হি.), আবুল কাসিম আবদূসী রাহ. (৮৪৯হি.), ইবনে হিলাল রাহ. (৯০৩হি.), আবদুল হাই কাত্তানী রাহ. (১৩৮২হি.) প্রমুখ।

ইমাম ইবনে রুশদ রাহ.-কে কুরআনের সওয়াবরেসানি জায়েয কি না জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,

وإن قرأ الرجل ووهب ثواب قراءته لميت، جاز ذلك، وحصل للميت أجره، ووصل إليه نفعه، إن شاء الله.

কুরআন তিলাওয়াত করে মাইয়িতকে সওয়াবরেসানি করা জায়েয, সে এর সওয়াব পাবে এবং এটা তার উপকারে আসবে ইনশাআল্লাহ। -নাওয়াযিলে ইবনে রুশদ পৃ. ১৪৪৬

আরো দ্রষ্টব্য : আলমিয়ারুল মুরিব ১/৩২১, ৩৩১; সালওয়াতুল আনফাস ১/৩২

আহলে হাদীসদের মধ্যেও একাধিক আলেম একই মত গ্রহণ করেছেন। শায়েখ উবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (১৪১৪হি.) বলেন,

دعا، استغفار، صدقہ، خیرات، حج و قربانی کی طرح تلاوت قرآن پاک کا ثواب بھی میت کو  پہنچتاہے

দুআ, ইস্তিগফার, দান-খায়রাত, হজ্ব ও কুরবানীর মত কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও মাইয়িতের কাছে পৌঁছে। -ফাতাওয়া শাইখুল হাদীস মুবারকপুরী, সংকলন ও বিন্যাস : ফাওয়ায আবদুল আযীয উবায়দুল্লাহ ১/৪৫৯

আরো দেখা যেতে পারে : আলফাতহুর রাব্বানী মিন ফাতাওয়াশ শাওকানী পৃ. ৩১৬৩-৩১৭৮; ফাতাওয়া নাযিরিয়া ১/৫৬২, ৫৬৪; ফাতাওয়া আহলে হাদীস ২/৬৬২

 

সাত. যে কোনো নেক আমল

নেক আমলের জগৎ অনেক বিস্তৃত। এগুলো কোথাও ‘আলআমালুস সালিহ’র শিরোনামে বর্ণিত হয়েছে, কোথাও ‘আলবির’র শিরোনামে, কোথাও ‘আলহাসানা’র শিরোনামে, কোথাও ‘আলখাইর’র শিরোনামে। কখনো বা বিশেষ শিরোনাম ছাড়া বর্ণিত হয়েছে। কুরআন-সুন্নাহয় যেসব নেক কাজ সুস্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর তালিকাও বেশ লম্বা।

আগের আলোচনা থেকে এ-ও জানা গেছে যে, উপরোক্ত নেক কাজগুলোর বাইরে আরো যে কোনো নেক কাজের ঈসালে সওয়াব করা যাবে। পেছনে এ সংক্রান্ত দলীল আলোচিত হয়েছে। এখানে শুধু ইমামদের কিছু উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যেতে পারে।

আবু বকর আলখাল্লাল রাহ. ‘আলউকূফ ওয়াত তারাজ্জুল’ গ্রন্থে (পৃ. ৮৫) মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ইমাম আহমদ রহ.-কে জিজ্ঞেস করেছেন, মানুষ নামায, সদকা ইত্যাদি নেক কাজ করে এর অর্ধেক সওয়াব পিতা বা সন্তানকে দান করে (এ কি তার কাছে পৌঁছবে)? উত্তরে তিনি বলেন, আশা করি। তিনি আরো বলেন, সদকা ইত্যাদি সব মাইয়িতের কাছে পৌঁছে।

أخبرني محمد بن يحيى الكحال أنه قال لأبي عبد الله:

الرجل يعمل الشيء من الخير من صلاة أو صدقة أو غير ذلك، فيجعل نصفه لأبيه أو لابنه؟

قال: أرجو. وقال: الميت يصل إليه كل شيء من صدقة أو غيره.

মালেকী মাযহাবের বিশিষ্ট ইমাম আবু বকর ইবনে আরাবী রাহ. বলেন,

فإن منفعة فعل الحي عن الميت تصل إليه باتفاق من الأمة، وإن كان في تفصيل ذلك اختلاف، والصحيح عندي أنه يصل إليه كل عمل، وبالله التوفيق.

মৃতের নামে করা জীবিত ব্যক্তির আমলের কল্যাণ সর্বসম্মতিক্রমে মাইয়িতের কাছে পৌঁছে। যদিও এর বিস্তারিত ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কিছু মতভেদ আছে। আমার মতে সহীহ হল সব আমলের সওয়াব তার কাছে পৌঁছে। -আলকাবাস ফী শরহি মুআত্তা মালেক ইবনে আনাস পৃ. ৬৪৭

আমীর সানআনী রাহ. যে কোনো আমলের সওয়াব অন্যকে দান করা যায়। তা নামায হোক বা রোযা বা হজ্ব বা সদকা বা কুরআন তিলাওয়াত অথবা যিকির কিংবা অন্য কোনো সৎকর্ম- এই মতটি উল্লেখ করে বলেন,

وهذا هو القول الأرجح دليلا.

‘দলীল-প্রমাণের দিক থেকে এটাই অগ্রগণ্য’। -সুবুলুস সালাম ২/১৬৯

শায়েখ উসায়মীন লেখেন,

أن ما جاءت به السنة ليس على سبيل الحصر، وإنما غالبه قضايا أعيان سئل

عنها النبي صلى الله عليه وسلم فأجاب به .. ويدل على العموم أنه قال: من مات وعليه صيام صام عنه وليه. ثم لم يمنع الحج والصدقة والعتق، فعلم من ذلك أن شأن العبادات واحد والأمر فيها واسع.

হাদীসে বর্ণিত বিষয়গুলোর উদ্দেশ্য এই না যে, এছাড়া অন্য কিছু নাজায়েয। বরং এর অধিকাংশই নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা, যার সমাধান নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সমাধান দেন।

من مات وعليه صيام صام عنه وليه

হাদীসটি থেকেও আলোচিত বিষয়ের ব্যাপকতার প্রমাণ মেলে। উপরন্তু হজ্ব, সদকা ও গোলাম আযাদ করা থেকে নিষেধ করা হয়নি। বোঝা গেল যে, সকল ইবাদতের হুকুম একই এবং এখানে প্রশস্ততা আছে। -মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েলে ইবনে উসায়মীন ১৭/২৬২

আরো দ্রষ্টব্য : কিতাবুর রূহ পৃ. ১৪১; বাদায়েউস সানায়ে ২/৪৫৩; তাবয়ীনুল হাকায়েক ২/৪১৯; ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েলে মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আলে শায়েখ ৩/২৩০, ৫/১৯৪; ফাতাওয়া ইবনে আকীল ২/৫০৯; কাশফুশ শুবুহাত আন ইহদাইল কিরাআত ওয়া সা-ইরিল কুরুবাত লিল আমওয়াত, মাহমূদ হাসান রাবি

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

ডাক্তারের জন্য নির্দিষ্ট কোম্পানীর ওষুধ লিখা বাবদ ওষুধ কোম্পানী থেকে প্রাপ্ত অর্থ গ্রহণের হুকুম কী?

ফাতাওয়া নং-২৩৭০ প্রশ্ন আমি পেশায় একজন চিকিৎসক। রোগীর চিকিৎসার জন্য আমরা ডাক্তাররা বিভিন্ন কম্পানির ঔষধ …