প্রচ্ছদ / আধুনিক মাসায়েল / ‘সারোগেসি’ এর মাধ্যমে সন্তান গ্রহণ ও ‘সারোগেট মাদার’ হবার শরয়ী বিধান!

‘সারোগেসি’ এর মাধ্যমে সন্তান গ্রহণ ও ‘সারোগেট মাদার’ হবার শরয়ী বিধান!

প্রশ্ন

‘সারোগেসি’ এর মাধ্যমে সন্তান লাভ করার হুকুম কী?

‘সারোগেট মাদার’ নিজের গর্ভ ভাড়া দিয়ে অর্থ কামাতে পারবেন?

দয়া করে কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিস্তারিত জানাবেন।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

‘সারোগেসি’ বলা হয়, অর্থের বিনিময়ে কোন মহিলার গর্ভা ভাড়া করে তার গর্ভাশয়ে যে সন্তান লাভের আশা করছে সে নিজের বা অন্য কোন পুরুষের বীর্য বিশেষ পদ্ধতিতে প্রবেশ করানো।

তারপর গর্ভধারণ করে সন্তান প্রসব করা। যে মহিলা এভাবে গর্ভ ভাড়া দেয়, তাকে ‘সারোগেট মাদার’ বলা হয়। আর যে সন্তান এভাবে জন্ম লাভ করে, তাকে সারোগেট সন্তান বলা হয়।

সন্তান লাভের পন্থা আল্লাহ তাআলা শরয়ী পদ্ধতিতে বিবাহ করার মাঝে রেখেছেন। এটাই ঐশী অমোঘ বিধান।

এ কারণেই কুরআনে কারীমে নারীদের শস্যক্ষেত্র বলে অভিহিত করা হয়েছে।

نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَّكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّىٰ شِئْتُمْ ۖ [٢:٢٢٣]

তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্য ক্ষেত্র। তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার কর। [সূরা বাকারা-২২৩]

যেমন অন্যের ক্ষেতে ফসল বুনা জায়েজ নয়, তেমনি নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য মহিলার মাঝে সন্তানের ফসল বপন করা জায়েজ নয়।

عَنْ حَنَشٍ الصَّنْعَانِيِّ، عَنْ رُوَيْفِعِ بْنِ ثَابِتٍ الْأَنْصَارِيِّ، قَالَ: قَامَ فِينَا خَطِيبًا، قَالَ: أَمَا إِنِّي لَا أَقُولُ لَكُمْ إِلَّا مَا سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: يَوْمَ حُنَيْنٍ، قَالَ: «لَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ يَسْقِيَ مَاءَهُ زَرْعَ غَيْرِهِ» – يَعْنِي: إِتْيَانَ الْحَبَالَى

রুয়াইফি‘ ইবনু সাবিত আল-আনসারী (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। হানাশ (রহ.) বলেন, একদা রুয়াইফি‘ আমাদের সাথে দাঁড়িয়ে ভাষণ প্রদানের সময় বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা কিছু শুনেছি তোমাদেরকে শুধু তাই বলবো। তিনি হুনাইনের দিন বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং শেষ দিনের উপর ঈমান রাখে, তার জন্য বৈধ নয় অন্যের ফসলে নিজের পানি সেচন করা। অর্থাৎ গর্ভবতী মহিলার সাথে সঙ্গম করা। [সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং-২১৫৮, ইফাবা-২১৫৫]

উপরোক্ত কুরআনের আয়াত ও হাদীস এছাড়া অন্যান্য নূসূসে শারইয়্যাহ দ্বারা একথাই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী শরীয়তে সন্তান লাভের ঐশী পদ্ধতি হলো বিবাহ করা। নিজের স্ত্রী বা ‘মামলূকাহ’ ছাড়া অন্য কোন মহিলার মাধ্যমে সন্তান লাভের চেষ্টা করা জায়েজ নয়।

‘সারোগেসি’ নাজায়েজ হবার কারণসমূহ

সারোগেট মাদার যাকে বানানো হয়, তিনি পিতা হতে চাওয়া ব্যক্তির স্ত্রী নয়। অথচ স্ত্রী ছাড়া অন্য কারো থেকে সন্তান লাভ করা শরীয়তে নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমেই একজন নারীর লজ্জাস্থান পুরুষের জন্য বৈধ হয়। লজ্জাস্থানের অধীনেই গর্ভাশয় থাকে।

যেখানে শুধুমাত্র নারীর স্বামীর জন্য তার জরায়ুতে বীর্যপাত বৈধতা পায়। সেখানে অন্য কোন পুরুষের বীর্য স্বীয় জরায়ুতে গ্রহণ করা সরাসরি যিনা না হলেও যিনার সাদৃশ্য রাখে।

সন্তান লাভের জন্য কোন মহিলার গর্ভাশয় ভাড়া নেয়া বা ভাড়া দেয়ার পদ্ধতি শরীয়তে ইসলামিয়ার পূতপবিত্র মেজাজ এবং সভ্যতা ও ইসলামী শিক্ষার সম্পূর্ণ খেলাফ।

ইসলামে লজ্জাস্থানের বিনিময়ে উপার্জন করাকে নিষিদ্ধ করেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পদ্ধতির উপার্জনকে হারাম ঘোষণা করেছেন।

অপ্রয়োজনে কারো সামনে সতর খোলা জায়েজ নয়। অথচ ‘সারোগেসি’ পদ্ধতিতে সারোগেট মাদারকে ডাক্তারের সামনে সতর খোলা জরুরী। যা শরয়ী জরুরতের অন্তর্ভূক্ত নয়।

এভাবে সন্তান লাভের মাধ্যমে বংশ মিশ্রিত হয়ে যায়। ইসলামী শরীয়তে বংশ রক্ষা একটি গরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণেই তালাকপ্রাপ্তা বা  স্বামী মৃত মহিলা অন্যত্র বিয়ে করার জন্য ইদ্দতের শর্ত রাখা হয়েছে।

অথচ ‘সারোগেসি’ এর মাধ্যমে সন্তান ধারণ ও লাভের মাধ্যমে বংশীয় অবস্থান সংমিশ্রিত হয়ে যায়।

সন্তান ধারণ ও প্রসব মাতৃত্বের একটি পবিত্র মাধ্যম। এটাকে ভাড়াপ্রদানের মাধ্যমে ব্যবসায়িক পণ্য বানানো মাতৃত্বের চরম অপমান।

বীর্য আল্লাহর দেয়া একটি নিয়ামত। এটাকে পণ্য বানানো সভ্যতার সাথে উপহাস ছাড়া আর কী?

للَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ يَهَبُ لِمَن يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَاءُ الذُّكُورَ. أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا ۖ وَيَجْعَلُ مَن يَشَاءُ عَقِيمًا ۚ  (سورة الشورى-49)

وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ (5) إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ (6) فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ (سورة المؤمنون-5-7)

عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ الأَنْصَارِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: «أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ ثَمَنِ الكَلْبِ، وَمَهْرِ البَغِيِّ، وَحُلْوَانِ الكَاهِنِ (صحيح البخارى، رقم-2282)

منها: معرفة براءة رحمها من ماءه لئلا تختلط الانساب فان النسب احد ما يتشاح به و يطلبه العقلاء وهو من خواص نوع الانسان و مما امتاز به من سائر الحيوان (حجة الله البالغة-2/106)

التلقيح الصناعي: هو استدخال المني لرحم المرأة بدون جماع. فإن كان بماء الرجل لزوجته، جاز شرعاً، إذ لا محذور فيه، بل قد يندب إذا كان هناك ما نع شرعي من الاتصال الجنسي.

وأما إن كان بماء رجل أجنبي عن المرأة، لا زواج بينهما، فهو حرام؛ لأنه بمعنى الزنا الذي هو إلقاء ماء رجل في رحم امرأة، ليس بينهما زوجية. ويعد هذا العمل أيضا منافياً للمستوى الإنساني، ومضارعاً للتلقيح في دائرة النبات والحيوان (الفقه الإسلامى وأدلته-4/269)

وَلَا يُبَاح الْمس وَالنَّظَر إِلَى مَا بَين السُّرَّة وَالركبَة إِلَّا فِي حَالَة الضَّرُورَة بِأَن كَانَت الْمَرْأَة ختانة تختن النِّسَاء أَو كَانَت تنظر إِلَى الْفرج لمعْرِفَة الْبكارَة أَو كَانَ فِي مَوضِع الْعَوْرَة قرح أَو جرح يحْتَاج إِلَى التَّدَاوِي وَإِن كَانَ لَا يعرف ذَلِك إِلَّا الرجل يكْشف ذَلِك الْموضع الَّذِي فِيهِ جرح وقرح فَينْظر إِلَيْهِ ويغض الْبَصَر مَا اسْتَطَاعَ (تحفة الفقهاء، كتاب الاستحسان، دار الكتب العلمية-3/334)

لِأَنَّ الْحَبَلَ قَدْ يَكُونُ بِإِدْخَالِ الْمَاءِ الْفَرْجَ دُونَ جِمَاعٍ فَنَادِرٌ (تبيين الحقائق، باب ثبوت النسب، المطبعة الكبرى الأميرية – بولاق، القاهرة-3/39، فتح القدير-4/315)

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

বিবাহের মাঝে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করার হুকুম কী?

প্রশ্ন From: মোঃ আবুল কাশেম বিষয়ঃ বিয়ের মধ্যে লাইটিং,ডেকোরেটর,গেট,অনেক মানুষ খাওয়ানো এবং সাজ-সজ্জা প্রসেঙ্গ। প্রশ্নঃ …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস