প্রচ্ছদ / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / সাহাবী আবূ বাকরাহ রাঃ এর উপর হদ্দে কযফ লাগানো হয়েছে তাই তার সকল বর্ণনা বাতিল?

সাহাবী আবূ বাকরাহ রাঃ এর উপর হদ্দে কযফ লাগানো হয়েছে তাই তার সকল বর্ণনা বাতিল?

প্রশ্ন

একজন সাহাবীর বাকরা রাঃ। আমাকে এক সেক্যুলার মুসলিম  ভাই অনেকগুলো সোর্স থেকে দেখালেন যে, হযরত উমর রাঃ এর আমলে তার উপর যিনার অপবাদ দেবার কারণে হদ্দে কযফ লাগানো হয়েছে।

তো যার উপর হদ্দে কযফ লাগানো হয়, সেই নাফরমান ব্যক্তির সাক্ষী এবং বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হয় না।

সেই হিসেবে উক্ত সাহাবী বর্ণিত সকল হাদীস বাতিল বলে সাব্যস্ত হয়।

আসলে একথা কতটুকু সত্য। দয়া করে জানাবেন।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

ইমাম নববী লিখেছেন:

আবূ বাকরা রাঃ এর নাম হল, নাফী’ বিন হারেছ।

তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ১৩২ টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আটটি হাদীস বুখারী ও মুসলিমে সমভাবে আসছে। আর এককভাবে বুখারীতে ৫টি এবং মুসলিম ১টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

তিনি মুত্তাকীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত অধিক ইবাদতগুজার ছিলেন। তার সন্তানরাও বসরায় ইলম, সম্পদ এবং আভিজাত্যে অনন্য ছিলেন।

হাসান বসরী রহঃ বলেন, সাহাবীদের মাঝে বসরায় ইমরান বিন হাসীন এবং আবূ বাকরা রাঃ এর চেয়ে উত্তম কেউ ছিল না। আবূ বাকরা রাঃ জামাল যুদ্ধে পিছু হটে যান। তিনি কারো পক্ষেই যুদ্ধ করেননি। তিনি বসরায় ৫১ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। কারো মতে ৫৩ হিজরীতে। [তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত-২/১৯৮]

এমন একজন মহান সাহাবীকে নাফরমান বলা চূড়ান্ত পর্যায়ের ধৃষ্টতা আর কিছু নয়।

আবূ বাকরাহ রাঃ এর আদালত নেই?

যিনার অভিযোগ এনে হদ্দে কযফ লাগলেই তার থেকে আদালত সাকিত হওয়া ও তার বর্ণনা ও হাদীস বাতিল হয়ে যায় না। বরং যিনার অভিযোগে হদ্দে কযফ দুই ধরণের হয়। যথা-

ক)

যদি হদ্দে কযফ লাগানো হয় কেবল মিথ্যা ও অপবাদের কারণে। যার কোন ভিত্তি নেই। অহেতুক কাউকে অপমান ও অসম্মান করার জন্য তার বিরুদ্ধে মিথ্যা যিনার অপবাদ দেয়া হয়, তাহলে এর মাধ্যমে উক্ত হদ্দে কযফকৃত ব্যক্তির আদালত সাকিত হয়ে যায়। তার সাক্ষ্য আর গ্রহণযোগ্য হয় না। তার কোন বর্ণনাও গ্রহণযোগ্য হয় না। মিথ্যুক হবার কারণে।

খ)

আরেকটি হল মিথ্যা বলার কারণে নয়, বরং সাক্ষীর সংখ্যা পূর্ণ না হবার কারণে। এক্ষেত্রে হদ্দে কযফটি মিথ্যুক হবার কারণে লাগানো হচ্ছে না, বরং সাক্ষীর সীমা পরিপূর্ণতা না পাবার কারণে তাদের উপর হদ্দ লাগানো হয়।

কারণ, যিনার হদ্দ কায়েমের জন্য ৪ জন ব্যক্তির সাক্ষী জরুরী। এক্ষেত্রে যদি দুইজন ব্যক্তি দেখে এবং সাক্ষী দেয়। কিন্তু ৪জন পূর্ণ না হবার কারণে তারা সত্যবাদী হবার পরও তাদের উপর হদ্দে কযফ লাগানো হবে। অথচ তারা সত্যবাদী।

শায়েখ মুহাম্মদ আমীন শানকিতী রহঃ বলেন,

أن أبطال الرواية بالحد في القذف تفصيلا فان كان المحدود شاهداً عند الحاكم بأن فلاناً زني وحد لعدم كمال الأربعة فهذا لا ترد به روايته لأنه إنما حد لعدم كمال نصاب الشهادة في الزنى وذلك ليس من فعله وان كان القذف ليس بصيغة الشهادة كقوله لعفيف: يا زاني ويا عاهر ونحو ذلك بطلت روايته حتى يتوب أي ويصلح بدليل قوله تعالى: ((ولا تقبلوا لهم شهادة أبداً وأولئك هو الفاسقون الا الذين تابوا من بعد ذلك وأصلحوا)) الآية…… والحاصل أن القذف بالشتم ترد شهادته وروايته بلا خلاف حتى يتوب ويصلح والمحدود في الشهادة لعدم كمال النصاب تقبل روايته دون شهادته وقيل تقبل شهادته وروايته

হদ্দে কযফের মাধ্যমে কারো বর্ণনা বাতিল হবার ক্ষেত্রে বিস্তারিত কথা হল,

বিচারকের কাছে যিনার সাক্ষ্য দেয় যে, ওমুক ব্যক্তি যিনা করেছে। তখন ঐ সাক্ষীকে নেসাব তথা চারজন সাক্ষী পূর্ণ না হবার কারণে যদি হদ্দ লাগানো হয়, তাহলে এমন ব্যক্তির বর্ণনা বাতিল করা হবে না। কেননা, হদ্দটি লাগানো হয়েছে যিনার সাক্ষ্যর নেসাব পূর্ণ না হবার কারণে। আর এটা তার কোন দোষ নয়।

আর যদি কযফটি সাক্ষ্য এর কারণে নয়। বরং কাউকে বলল, হে যিনাকারীণী, হে পতিতা! ইত্যাদি। তাহলে যতক্ষণ না সে তওবা করবে, এবং ভালো হয়ে যাবে ততক্ষণ তার বর্ণনা গ্রহণ করা হবে না।

وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ [٢٤:٤]

যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অতঃপর স্বপক্ষে চার জন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই না’ফারমান।

إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِن بَعْدِ ذَٰلِكَ وَأَصْلَحُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ [٢٤:٥]

কিন্তু যারা এরপর তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান। [সূরা নূর-৪-৫]

মোটকথা হল, হদ্দে কযফ যদি শুধুমাত্র অপবাদ ও তোহমতের কারণে লাগানো হয়, তাহলে তার সাক্ষ্য এবং রেওয়ায়েত বাতিল। এতে কোন মতভেদ নেই। যতক্ষণ না সে তওবা করে।

আর যদি সাক্ষ্যর কমতির কারণে হদ্দে কযফ লাগানো হয়, তাহলে তার রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য যদিও সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ কেউ বলেন তার রেওয়ায়েত ও সাক্ষ্য দু’টিই গ্রহণযোগ্য। [মুজকিরা ফী উসূলিল ফিক্বহ-১৯৪-১৯৫]

সুতরাং বুঝা গেল যে, আবূ বাকরাহ রাঃ এর উপর যে হদ্দে কযফ লাগানো হয়েছে সেটি অপবাদের কারণে নয়। বরং সাক্ষ্যর নেসাব পূর্ণ না হবার কারণে তাই তার রেওয়ায়েত বাতিল হবার প্রশ্নই আসে না।

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক -তা’লীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

পেশাবের দশ পনের মিনিট পর পেশাবের ফোটা আসার সন্দেহ হলে করণীয় কী?

প্রশ্ন From: আব্দুলাহ আনাস বিষয়ঃ পবিত্রতা প্রশ্নঃ আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন হুজুর? এক ব্যক্তি বড় দীর্ঘ দিন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস