প্রচ্ছদ / আহলে হাদীস / কুরবানী করা ওয়াজিবঃ একটি দালিলীক বিশ্লেষণ

কুরবানী করা ওয়াজিবঃ একটি দালিলীক বিশ্লেষণ

 মুফতি মীযানুর রহমান সাঈদ

কুরবানি করা ওয়াজিব না-কি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এ ব্যাপারে ফকীহগণের মতবিরোধ অনেক আগ থেকেই। ইমাম আবু হানীফা রহ., ইমাম রাবিয়াতুর রায় রহ., ইমাম আওযাঈ, ইমাম লাইস বিন্ সা’দ মিশারি, ইমাম সুফিয়ান ছাওরী, ইব্রাহিম নাখয়ী এবং ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি সহ বিশ্বের বহু ইমাম-মুজতাহিদগণ কুরবানি করা ওয়াজিব বলে মত ব্যক্ত করেছেন। তাবেয়ীনদের মধ্যে ইমাম মুজাহিদ, ইমাম মাকহুল এবং ইমাম শা‘বী রহ.ও এ মত পোষণ করেছেন।

পক্ষান্তরে ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ রহ. সহ বহু তাবেয়ী ও ফকিহগণ এবং ইমাম মালিকের এক বর্ণনা রয়েছে যে, কুরবানি করা ওয়াজিব নয়; বরং সুন্নাত। (মুগনি, ইবনে কুদামা, মুহাল্লা, ইবনে হাযম)
উভয় পক্ষের ইমামগণ তাঁদের গবেষণা ও ইজতিহাদ অনুযায়ী স্ব-স্ব মতের পক্ষে কুরআন-সুন্নাহ’র দলিল পেশ করেছেন। তাঁরা কেউ-ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধীতা বা কুরআন-সুন্নাহ’র বিপক্ষে গিয়ে কিছু বলেননি। যেহেতু এই বিষয়ের উপর কুরআন-সুন্নাহর মধ্যে যত প্রমাণাদি রয়েছে তাতে উভয় মতের সম্ভাবনা বিদ্যমান ছিলো। এইসব ক্ষেত্রে মুজতাহিদগণের দায়িত্ব নিজ-নিজ যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে সূক্ষ্ম দক্ষতার সাথে বিবেচনা করে আল্লাহ এবং রাসূলের বাণীর সঠিক মর্ম উদ্ঘাটন করে সে মতে ফতোয়া দেয়া। আর তাঁদের (মাযহাব) মতামত অনুসরণ করে ইসলামের উপর আমল করে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হওয়া-ই সাধারণ উম্মতের কর্তব্য।

কিন্তু বর্তমানে একদল আলেম ও স্ব-ঘোষিত প-িত দাবি করেন যে, পূর্ব যুগের মনীষীগণ ইজতিহাদ করে উম্মাহর জন্য যা করেছেন তা যথেষ্ট নয়; বরং নিজেরা সরাসরি কুরআন-হাদিসে নতুন করে গবেষণা করবেন এবং নিজেদের জ্ঞান অনুপাতে যা কিছু বুঝে আসে তা-ই বয়ান করবেন এবং তদানুযায়ী ফতোয়া জারি করবেন। উপরন্তু তারা যা কিছু উদ্ভাবন করে ব্যক্ত করবেন এটাই একমাত্র সঠিক ইসলাম। এর বাহিরে ইসলাম নেই, আছে শুধু ভ্রষ্টতা। নাউজুবিল্লাহ!

অথচ আধুনিককালের এসব প-িতগণের ইলমী যোগ্যতা এতই সীমিত যে, তাদের পক্ষে মুজতাহিদ ইমামগণের গবেষণামূলক বক্তব্যগুলো কয়েক লাইন পড়ে বোঝার সামর্থ্যও নেই; বরং বুঝাতো দূরের কথা, তাদের লিখনীর একাংশ সঠিকভাবে পড়ার যোগ্যতাও তাদের অনেকের নেই। এ ধরনের স্বল্প জ্ঞানীদের গবেষণামূলক উক্তি গুলো নিতান্তই হাস্যকর বলে মনে হয়। এরাই আবার নতুন করে মুসলিম মিল্লাতকে ইসলাম শেখান। মাযহাব অনুসরণ থেকে বের হয়ে উন্মুক্ত চিন্তাভাবনার দাওয়াত দেন। বিভিন্ন মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নতুন কথা, নতুন ফতোয়া জারি করেন। একেক সময় একেক ধরনের কথা মাথায় আসে, যে যেভাবে মন চায় মিডিয়াতে বক্তব্য দিয়ে নতুন নতুন কথা শোনান। কথায় কথায় তারা কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি দেন। অথচ তাদের কথাগুলোই প্রকৃত অর্থে কুরআন-হাদিস পরিপন্থী। কুরবানি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়েও তারা চিরাচরিত আদর্শের ব্যতিক্রম করেননি। অনেক বিভ্রান্তিমূলক ফতোয়া দিচ্ছেন। এখানে আমরা তাদের কিছু মুক্ত চিন্তা ও গবেষণা নিয়ে কথা বলবো এবং তাদের আবিষ্কৃত ফতোয়ার দালিলিক আলোচনা করবো।

উল্লেখ্য, এ আলোচনা কোন মাযহাবের ইমামদের মতামত এর খ-ন নয়। কারণ সেগুলো হাজার বছর পূর্বেই মীমাংসিত। বরং এখানে শুধু বর্তমান গবেষক নামের নব্য মুজতাহিদদের বক্তব্য খ-ন করার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।

আহলে হাদিস ভাইদের দাবি ও আমাদের দলিল:
আহলে হাদিসদের দাবি হলো, কোরবানি ঐচ্ছিক বিষয়, করলে সওয়াব পাবেন, না করলে কোনো গোনাহ নেই। অথচ কুরআন-সুন্নাহর মজবুত দলিল দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, কুরবানি করা ওয়াজিব তথা বাধ্যতামূলক। সামর্থ্যবান ব্যক্তি কুরবানি না করলে গোনাহগার হবে।

কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার দলীল সমূহ:

প্রথম দলিল:

আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ ‎﴿١﴾‏ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‎﴿٢﴾

অর্থ: নিশ্চয় আমি আপনাকে কাওসার দান করেছি। অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন। (সূরা কাউসার:১-২)
এই আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা হলো, হে রাসূল! আপনাকে আমি ‘কাউসার’ নামক নেয়ামত দান করেছি। তাই আপনি ঈদের নামায আদায় করুন একমাত্র আপনার প্রভুর সন্তুষ্টির জন্য। ‘নাহর’ তথা কুরবানি করুন ওই প্রভুর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এবং তাঁরই নামে। আল্লাহর এই নির্দেশের কারণে ঈদের নামায যেমন ওয়াজিব, কুরবানিও ওয়াজিব।
উল্লেখ্য, এ আয়াতের অত্যন্ত দুর্বল কিছু ব্যাখ্যাও রয়েছে যা বিচারের মাপকাঠিতে মোটেই ধর্তব্য নয়। যেমন, হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে দুটি হাদিস ইবনে হাতিম রহ. সংকলন করেছেন যে, فصل لربك وانحر এর অর্থ হচ্ছে, আপনি নামায পড়–ন আপনার রবের জন্য এবং নামায রত অবস্থায় ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপরের অংশ ও গলার নিচে রাখুন।

তাফসীরে কুরতুবীতে এসেছে:

قال علي رضي الله عنه ومحمد ابن كعب : المعنى وضع اليمنى على اليسرى حذاء النحر في الصلاة وروي عن ابن عباس أيضا وروي عن علي أيضا : أن يرفع يديه في التكبير إلى نحره وكذا قال جعفر بن علي : فصل لربك وأنحر قال : يرفع يديه أول ما يكبر للإحرام إلى النحر وعن علي رضي الله عنه قال : لما نزلت فصل لربك وأنحر قال النبي ( صلى الله عليه وسلم ) لجبريل : ) ما هذه النحيرة التي أمرني الله بها ) قال : ) ليست بنحيرة ولكنه يأمرك إذا تحرمت للصلاة أن ترفع يديك إذا كبرت وإذا رفعت رأسك من الركوع وإذا سجدت فإنها صلاتنا وصلاة الملائكة الذين هم في السماوات السبع وإن لكل شيء زينة وإن زينة الصلاة رفع اليدين عند كل تكبيرة)… وقال أنس : كان النبي ( صلى الله عليه وسلم ) ينحر ثم يصلي فأمر أن يصلي ثم ينحر ( الجامع لاحكام القران للقرطبي: ج١٠ ص ٤٤٤)

এ তাফসীরটির আগা-গোড়া কিছুই ঠিক নেই। উপরন্তু হাদিসদ্বয় সম্পর্কে প্রায় সকল তাফসীরকারকগণ অত্যন্ত দুর্বল বলেছেন। আর হাদিস বিশারদগণ হযরত আলী এবং ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আসারগুলোকে মারাত্মক দুর্বল বলেছেন। কেউ কেউ মওজু তথা জালও বলেছেন। প্রমাণস্বরূপ নিচে তাদের মতামত তুলে ধরা হলো।

আল্লামা ইবনুস সাআতি বলেন,

وقال ابن الساعاتي في الفتح الرباني في ترتيب مسند احمد للشيباني: نسبة هذا التفسير الى علي وابن عباس لا تصح.

হযরত আলী ও ইবনে আব্বাস রা. এর দিকে এ জাতীয় হাদিসের নিসবত করা মোটেও ঠিক নয়।

তাফসীর ইবনে কাসীরে রয়েছে-
يروى هذا عن على لا تصح . … وقد رواه ابن ابي حاتم ها هنا حديثا منكر جدا .
অর্থাৎ হযরত আলী রা. থেকে যে বর্ণনা করা হয় তা সঠিক নয়। ইবনে আবী হাতেম বলেন, এ বিষয়ের হাদিসটি অত্যন্ত মুনকার।

ইবনে কাসীর রহ. বলেন, সঠিক তাফসীর হচ্ছে- (و انحر) এর অর্থ: কুরবানি করা। সালাত অর্থ ঈদের নামায। এটাই যুগ যুগ ধরে বহু সালাফের কথা। তাই এসব তাফসীরের কোনো সত্যতা নেই। সঠিক হলো কুরবানি করা।

ইবনে কাসীর রহ. আরো বলেন :

رواه ابن أبي حاتم: وكل هذه الأقوال غريبة جداً, والصحيح القول الأول… فأخلص لربك صلاتك المكتوبة والنافلة ونَحْرَك، فاعبده وحده لا شريك له، وانحر على اسمه وحده لا شريك له… قال به ابن عباس، وعطاء، ومجاهد، وعكرمة، والحسن: … وغير واحد من السلف. (تفسير ابن كثير: ج৪، ص ৬৯১-৬৯২)

আল্লামা আলূসী রহ. তাফসীরে রুহুল মাআনীতে বলেন:

والاكثرون على أن المراد بالنحر نحر الاضاحي واستدل به بعضهم على وجوب للاضحية ( ثم ذكر روايات علي و بن عباس المذكورة ) وقال لعل في صحة الاحاديث عند الاكثرين مقالا والا فما قالوا الذي قالوا ….هذا في المستدرك بسند ضعيف وقال فيه ابن كثير انه حديث منكر جدا بل اخرجه ابن الجوزي في الموضوعات ( روح المعاني ج ١٤ ص ٦٦٥-٦٦٦ )

হযরত আলী রা. ও ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত এ সকল হাদিস এর সত্যতার মধ্যে অধিকাংশ আলেমদের চরম বিতর্ক রয়েছে। এমনকি ইবনুল কায়্যিম জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি এগুলোকে موضوع তথা জাল বলেছেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ মুফাসসিরগণ (انحر) দ্বারা নাহর (কুরবানি) করার অর্থকেই সঠিক বলেছেন। এই আয়াত দ্বারা অনেকে কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার উপর দলিল পেশ করেছেন।

ইমাম ইবনে জারীর তাবারী রহ. বলেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‎﴿٢﴾
এর সঠিক অর্থ হচ্ছেÑ হে রাসুল! আপনি আপনার নামাযকে খালিস আপনার রবের জন্য পড়–ন, মূর্তি-গাইরুল্লাহর জন্য নয় (যেমন মুশফিকরা করে থাকে)। ঠিক তেমনিভাবে আপনার কুরবানি ও খালিস রবের নামে করুন। অন্য কোন প্রতিমা ও মূর্তির নামে নয়। এটাই হবে কাউসার নামক নেয়ামতের প্রকৃত শোকর। অতঃপর তিনি মোহাম্মদ বিন কা‘ব আল-কোরাজি রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক এ আয়াতের তাফসীরও করেন যে, কিছু লোক গাইরুল্লাহর নামে উপাসনা ও কুরবানি করতো, যার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত আয়াতগুলো নাযিল হয়।

আল্লামা তবারীর ভাষায় :

واولى هذه الأقوال عندي بالصواب قول من قال معنى ذلك فاجعل صلاتك كلها له بك خالصا دون ما سواه من الانداد والآلهة، وكذلك نحرك اجعله له دون الاوثان شكرا له على ما اعطاك .حدثني يونس قال اخبرنا ابن وهب قال حدثني ابو صخر عن محمد بن كعب القرظيস্ট انه كان يقول في هذه الاية .. ان اناسا كانوا يصلون لغير الله و ينحرون لغير الله فاذا اعطيناك الكوثر يا محمد فلا تكن صلاتك ونحرك الا له ( جامع البيان في تاويل القران للطبري ج ١٦ ص ٣٦١- ٣٦٢ )

নির্ভরযোগ্য যত তাফসীরের কিতাব দেখার সুযোগ হয়েছে সকল কিতাবেই وانحر অর্থ বুকে হাত রাখা বা রুকু-সেজদায় যেতে উঠতে হাত তোলার ব্যাপারটি জাল, ভিত্তিহীন, শিয়া বর্ণনাকারীর বর্ণনা ও মারাত্মক দুর্বল বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার কারণ, ইবনে আব্বাস রা. এর হাদিসে روح بن المسيب নামক বর্ণনাকারী পরিত্যক্ত। সে জাল হাদীস বর্ণনাকারীও বটে। আর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদিসটিতে (الأصبغ) বর্ণনাকারী শিয়া বলে প্রমাণিত। হাফেজ যাহাবী রহ. বলেন, সে আশ্চর্য কথা নকল করে, তার বর্ণনায় আস্থা রাখার কোন সুযোগ নেই। এসব কারণে মুহাদ্দিসীনে কিরাম বলেন, (انحر) এর তাফসীর হাত বাঁধা বা উঠানো বলে তাফসীর করা হবে সরাসরি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করা।

তাঁদের ভাষায়:

فان اثر بن عباس في سنده روح بن المسيب متروك، قال ابن حبان يروي الموضوعات عن الثقات لا يحل الرواية عنه. وما روي عن علي رضي الله عنه في سنده ومتنه اضطراب جدا وفيه طريق اسماعيل ابن حاتم قال الذهبي صاحب عجائب لا يعتمد عليه، “واصبغ” شيعي متروك . قال ابن حبان: روي اسرائيل عن مقابل الموضوعات والاوابد والطاعات. (اعلاء السنن ج ١٦ ص ٧٩٤٧-٧٩٤٨)
وقال ايضا قلنا هذا هو القول على الله بغير علم. واغرب ابن حزم حيث عدل عن التفسير الصحيح الثابت الى التفسير الذي لا يصح ولم يثبت وهو الى التحريف اقرب الى التفسير (المرجع السابق )

মোদ্দাকথা:
কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার প্রধান দলিল হলো, সুরা কাউসারের উপরোক্ত আয়াত। যার মর্মার্থ অন্য আয়াতে এভাবে এসেছে-
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ‎﴿١٦٢﴾
আপনি বলুনঃ আমার নামায, আমার কুরবানি এবং আমার জীবন ও মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। (সূরা আনআম-১৬২)
উক্ত আয়াতের যদি ভিন্ন কোন দুর্বল ব্যাখ্যাও না থাকতো, তাহলে শরিয়া নীতিমালা অনুযায়ী এই আয়াতের কারণে কুরবানি ফরজ সাব্যস্ত হতো। সম্ভাব্য ভিন্ন অর্থের কারণে আল্লাহর (انحر) নির্দেশমূলক শব্দ দ্বারা ওয়াজিব প্রমাণিত হলো।

দ্বিতীয় দলিল

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস,

حدثنا ابو بكر بن ابي شيبة حدثنا زيد بن حباب حدثنا عبد بن عياش عن عبد الرحمن الاعرج عن ابي هريرة ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: من كان له سعة ولم يضح فلا يقربن مصلانا (رقم الحديث٣١٢٣) قال الامام ابن ماجه: وهذا خرج مخرج الوعيد على ترك الاضحية ولا وعيد الا بترك الواجب ( اخرجه احمد في مسنده ٨٢٧٣ ) والحاكم في المستدرك وصححه ووافق عليه الذهبي بقوله ” صحيح “( رقم الحديث ٧٥٦٥ ) وقال الحافظ في الفتح ورجاله ثقات وذكر العيني في البناية عن التنقيح ان رجاله رجال الصحيح سوي عبد الله بن عياش فانه من افراد مسلم. ورواه الدارقطني رقم ٤٧٤٣ ايضا .

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে অথচ সে কুরবানি করলো না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-৩১২৩)
ইমাম ইবনে মাজাহ রহ. বলেন, হাদীসটি কুরবানি ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তিদের জন্য কঠিন ধমকি। আর এমনটি হয় ওয়াজিব তরককারিদের ক্ষেত্রে। হাদীসটিকে ইমাম হাকিম সহিহ বলেছেন। ইমাম যাহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তালখিসেও সহিহ বলেছেন। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. ফাতহুল বারিতে হাদিসটির সনদকে সহীহ বলেছেন।
আল্লামা আইনি রহ. বলেন, হাদীসটির সনদ বুখারী-মুসলিমের সমতুল্য। আব্দুল্লাহ বিন আইয়াশ মুসলিমের বর্ণনাকারী, তাই এতে আপত্তিকারীদের আপত্তি গৃহীত হবে না ।

কিছু আপত্তি ও তার খণ্ডন:
উপরোক্ত হাদীসটিকে ইমাম যাইলায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি সহ কেউ কেউ “মওকুফ” বলেছেন। অর্থাৎ এটা রাসূল স. এর বাণী নয়; বরং আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর ফতোয়া।
উত্তর- হাদীসটি “মারুফ”। কেননা এটিকে রাসূল স. এর বাণী বলে বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ আল মকরি এবং হায়াত বিন শুরাইহসহ অনেকে।
* আর এরা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য রাবি। তারা যখন রাসূলের বর্ণনা হিসেবে রেওয়ায়েত করেছেন সেটা নিশ্চিত গ্রহণযোগ্য। কেননা, হাদিসের নীতিমালা হলো- ‘ الزيادات من الثقات مقبولة ‘
* এতে কোন সমস্যা নেই। কারণ আবু হুরায়রা রা. একবার مرفوعا বর্ণনা করেছেন, আবার কখনো তিনি ফতোয়া হিসেবেও বক্তব্য দিয়েছেন। তাই এটা “موقوف” হাদিস হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছে। কেউ উভয়টি বর্ণনা করেছেন, আবার কেউ একটি। এতে হাদিসের নীতিমালার দৃষ্টিতে কোন বৈপরিত্য পাওয়া যায় না।
* তাছাড়া যদি এটা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বর্ণনা বা ফতোয়া বলে মেনে নেওয়া যায়, তবে হাদিস শাস্ত্রের মূলনীতি হিসেবে- (مثله لا يقال بالراي فيكون في حكم المرفوع) অর্থাৎ তা মারফু হাদিস হিসেবেই ধর্তব্য হবে।

আল্লামা যফর আহমদ উসমানী রহ. বলেন:

الرفع زيادة و الزيادة من الثقات مقبولة ، ولا تعارض بين الوقف والرفع لانه يمكن ان يكون ابو هريرة رفعه مرة وافتى به اخرى… فلا وجه لرد المرفوع ولو سلم الوقف فمثله لا يقال بالراي فيكون في حكم المرفوع ( اعلاء السنن ج ١٦ ص৭৯৩৯-৭৯৪৩)
وقول ابن حزم”ان عبد الله بن عياش ليس معروفا بالثقة” (قوله) مردود باخراج مسلم حديثه في صحيحه كما في التهذيب قال ابو حاتم ليس بالمتين صدوقا يكتب حديثه وذكره ابن حبان في”الثقات”فهو حسن الحديث صالح للاحتجاج به.(اعلاء السنن ج ١٦ص৭৯৩৯-৭৯৪৩)

উপরোক্ত বিশদ বর্ণনা ও মতামতের আলোকে প্রমাণিত হলো, এই হাদিসটি বহু হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে এবং হাদীসটি সহীহ এবং প্রমাণযোগ্য।
এর দ্বারা প্রমাণ হলো, কুরবানি করা ওয়াজিব। অন্যথায় এমন ধমকি কুরবানি তরককারির উপর হওয়ার কথা নয়।

 

তৃতীয় দলিল:

হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত-

اخبرني ابو الزبير انه سمع جابر بن عبد الله يقول صلى لنا النبي صلى الله عليه وسلم يوم النحر بالمدينه فتقدم رجال فنحروا وظنوا ان النبي قد نحر فامر النبي صلى الله عليه وسلم “من كان نحر قبله ان يعيد بنحر آخر، ولا ينحروا حتى ينحر النبي صلى الله عليه وسلم (رواه مسلم رقم الحديث ١٩٦٤ )

হযরত জাবের রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনাতে ঈদের নামায পড়িয়েছেন। কিছু লোক নামাযের পূর্বেই কুরবানি করে ফেলেছেন এ ধারণায় যে, হয়তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালামও কুরবানি করে ফেলেছেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিলেনÑ যারা নামাযের পূর্বে কুরবানি করেছে তারা অবশ্যই পূনরায় কুরবানি করতে হবে। তোমরা কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পূর্বে কুরবানি করবে না। (সহীহ মুসলিস, হাদিস নং ১৯৬৪)
যদি কুরবানি ওয়াজিব না-ই হতো, তাহলে তো পূনরায় কুরবানির নির্দেশ দিতেন না। এধরনের আরো হাদিস রয়েছে যেমন;

চতুর্থ দলিল:

হযরত জুনদুব আল বাজালি রা. বলেন:

قال شهد رسول الله صلى الله عليه وسلم يوم اضحى ثم خطب فقال من كان ذبح قبل ان يصلي فليعد مكانها…. ومن لم يكن ذبح فليذبح بسم الله )رواه مسلم رقم ١٩٦٠(

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের খুতবাতে ইরশাদ করেন, যারা নামাযের পূর্বে কুরবানি দিয়েছো তারা তার পরিবর্তে অবশ্যই পুনরায় কুরবানি করো। আর যারা তখন কুরবানি করোনি তারা আল্লাহর নামে কুরবানি করো। (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-১৯৬০)
এ হাদিসেও পুনরায় কুরবানি করা এবং যারা আগে করেনি তাদেরকে কুরবানি করার নির্দেশ রাসুল সা. দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এমন নির্দেশমূলক বাণীও কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ বহন করে।

পঞ্চম দলিল:

হযরত বারা ইবনে আযেব রা. হতে বর্ণিত:

عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ أَنَّ خَالَهُ أَبَا بُرْدَةَ بْنَ نِيَارٍ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يَذْبَحَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ هَذَا يَوْمٌ اللَّحْمُ فِيهِ مَكْرُوهٌ وَإِنِّى عَجَّلْتُ نَسِيكَتِى لأُطْعِمَ أَهْلِى وَجِيرَانِى وَأَهْلَ دَارِى. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- ্র أَعِدْ نُسُكًا গ্ধ. فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ عِنْدِى عَنَاقَ لَبَنٍ هِىَ خَيْرٌ مِنْ شَاتَىْ لَحْمٍ. فَقَالَ ্র هِىَ خَيْرُ نَسِيكَتَيْكَ وَلاَ تَجْزِى جَذَعَةٌ عَنْ أَحَدٍ بَعْدَكَ গ্ধ. (صحيح مسلم، رقم: ৫১৮২، الشاملة)

হযরত আবু বুরদা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কুরবানির পূর্বেই সকাল-সকাল কুরবানি করে ফেলেছেন। কারণ, দিনের শেষে গোশতের আগ্রহ থাকে না। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু সালামকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করলে রাসুল সালাম বলেন, অবশ্যই পুনরায় সঠিক সময়ে কুরবানি করতে হবে। তিনি বলেন, এখন আমার কাছে ছোট একটি বকরি অবশিষ্ট আছে মাত্র। তবে তা মোটাতাজা। রাসুল সালাম বললেন সেটা দিয়ে কুরবানি করো। তবে এ সুযোগটা শুধুই তোমার জন্য। অন্য কারো ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়। ছয় মাসের বকরি দিয়ে কুরবানি করা একমাত্র তোমার ক্ষেত্রে অনুমোদিত। (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৯৬১)
এ হাদীসে একবার কুরবানি করার পর তা সঠিক সময়ে না হওয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাম তার সাহাবীদের কুরবানি করার নির্দেশ দিলেন এবং তার কাছে কুরবানির উপযুক্ত বকরি না থাকা সত্ত্বেও কম বয়সের দ্বারা হলেও কুরবানি করার নির্দেশ স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, কুরবানি ওয়াজিব; মুস্তাহাব নয়।

 

ষষ্ট দলিল:

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত:

عن نافع عن عبد الله بن عمر رضي الله عنه : قال ” أقام رسول الله صلى الله عليه وسلم بالمدينة عشر سنين يضحي” اخرجه الترمذي و قال هذا حديث حسن (رقم الحديث ١٥٠٧ ومسند احمد ٤٩٣৫) قال المحقق اسناده صيحح.

হযরত ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা শরীফে দশ বছর অবস্থানকালে কুরবানি করে গেছেন। তিরমিজি ১৫০৭, মুসনাদে আহমদ ৪৯৩৫। ইমাম তিরমিজি রহ. হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।

মুহাক্কিক শুআইব আল-আরনাউত বলেন: হাদিসটির সনদ সহীহ। নিচে মুসনাদে আহমদের টীকা উল্লেখ করা হলো:

قال شعيب الارنؤوط : في هامش مسند احمد .. إسناده ضعيف فيه حجاج بن ارطاة ، مدلس وقد عنعن ولكن و له شاهد عن ابن عمر ان النبي النبي صلى الله عليه وسلم كان ينحر يوم الاضحى بالمدينه، اخرجه النسائي عن على بن عثمان عن سعيد ابن عيسى عن المفضل عن عبد الله بن سليمان عن نافع : وهذا اسناد حسن من اجل عبد الله بن سليمان وباقي الرجال ثقات لذا قال شعيب الارنؤوط :حديث صحيح، (رقم الحديث: ٦٤٠١ من مسند احمد.

শরীয়তের মূলনীতি হচ্ছে- যে কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধারাবাহিকভাবে করেছেন কোনো দিন ছাড়েননি তখন কাজটি ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
যেমনটি তাকমিলায়ে ফাথহুল মুলহিম-এ বলা হয়েছে:

وهذا يدل على المواظبة وان مواظبة النبي صلى الله عليه وسلم من غير ترك دليل للوجوب: تكملة فتح الملهم ٣٠٩

 

সপ্তম দলিল

হযরত জাবালা বিন সুহাইম থেকে বর্ণিত:

عن جبلة بن سحيم ان رجلا سأل ابن عمر عن الاضحية أ واجبة هي؟ فقال: ضحى رسول الله صلى الله عليه وسلم والمسلمون فاعادها عليه، فقال : أتعقل؟ ضحى رسول الله صلى الله عليه وسلم والمسلمون .(اخرجه الترمذي رقم الحديث: ١٥٠٦ و قال” هذا حديث حسن صحيح” وأخرجه ابن ماجه في الأضاحي، رقم الحديث ٣١٢٤(

ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু কে এক লোক জিজ্ঞেস করলো, কুরবানি কি ওয়াজিব? তিনি উত্তরে বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানি করেছেন এবং সকল মুসলমানরাও কুরবানি করেছেন। প্রশ্নকারী বারবার জিজ্ঞেস করলে ইবনে ওমর একই কথা বারবার পুনরাবৃত্তি করলেন। উক্ত হাদিসে হযরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম ও মুসলিম মিল্লাতের ধারাবাহিকভাবে কুরবানির কথা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে এটি ওয়াজিব। একবারের জন্যও তিনি ওয়াজিব নয় বলেননি। অথচ প্রশ্নটি ছিল ওয়াজিব কি-না। হাঁ, তিনি স্পষ্ট “ওয়াজিব” না বলার কারণ হলো, যাতে কুরবানিকে ফরজ সমতুল্য মনে করা না হয়।

উল্লেখ্য, শরয়ী বিধানের স্তর বিন্যাসে ফকীহগণের পরিভাষা উদ্ভাবনের পূর্বে “ওয়াজিব” বলে ফরজ-ওয়াজিব উভয়টিকে বোঝানো হতো ।

শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানি হাফি. তাকমিলাতু ফাতহুল মুলহিমে বলেন:

قال شيخنا في تكملة فتح الملهم : “ظاهر جواب ابن عمر انه اراد الدلالة على الوجوب لان السائل انما سأله عن الوجوب فلو كانت الاضحية غير واجبة لنفي الوجوب صراحة ولكنه ذكر مواظبة النبي صلى الله عليه وسلم والمسلمين وهو مما يدل على الوجوب، ولم يصرح بالوجوب كي لا يظن تحتمه كتحتم الفرائض) . التكملة ج ٣ ص ٣٠٩ (

অর্থ: ইবনে উমর রা. এর জবাবে কুরবানি ওয়াজিব হওয়ারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কেননা, তাঁকে কুরবানি ওয়াজিব কি-না? এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিলো। যদি সত্যিই কুরবানি ওয়াজিব না-ই হতো, তবে তিনি স্পষ্ট ওয়াজিব নয় বলতে পারতেন। তিনি তা না করে রাসূল স. এর আমলের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করেছেন, যা ওয়াজিব হওয়ার উপর প্রমাণ বহন করে। আর স্পষ্ট ওয়াজিব বলেননি যাতে কেউ ফরজ ভেবে না বসে। (তাকমিলাতুল ফাতহুল মুলহিম: ৩/৩০৯)

 

অষ্টম দলিল:

মিখনাফ বিন সুলাইমান রা. হতে বর্ণিত-

أَخْبَرَنَا مِخْنَفُ بْنُ سُلَيْمٍ قَالَ وَنَحْنُ وُقُوفٌ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- بِعَرَفَاتٍ قَالَ ্র يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ عَلَى كُلِّ أَهْلِ بَيْتٍ فِى كُلِّ عَامٍ أُضْحِيَةً وَعَتِيرَةً أَتَدْرُونَ مَا الْعَتِيرَةُ هَذِهِ الَّتِى يَقُولُ النَّاسُ الرَّجَبِيَّةُ গ্ধ. قَالَ أَبُو دَاوُدَ الْعَتِيرَةُ مَنْسُوخَةٌ هَذَا خَبَرٌ مَنْسُوخٌ. (ابو داود ٢٧٨٨ الترمذي ١٥١٨ و النسائي ٤٢٢٤ و ابن ماجه ٣١٣٥ )

মিখনাফ বিন সুলাইম রা. বলেন, আমরা আরাফাতের ময়দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ঊকুফ করছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ইরশাদ করেন, হে মানুষ সকল! প্রত্যেক পরিবারের কর্তার উপর প্রতি বছর কুরবানি করা আবশ্যক এবং আতিরাও।
হাদীসটি সুনানে তিরমিযি, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ ও সুনানে ইবনে মাজাহ সহ সুনানের প্রায় কিতাবে এসেছে। ইবনে হাজার আসকালানি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, হাদিসটি সনদের বিচারে খুব মজবুত। আলবানী সাহেবও হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। (মিশকাত, হাদিস নং-১৪৭৮)
এ হাদীসে উল্লিখিত “আতিরা” সর্বসম্মতিক্রমে রহিত হয়ে গেছে। কুরবানির বিধান বলবৎ। “على” শব্দ এ জাতীয় ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। যার অর্থ দাঁড়ায় কমপক্ষে ওয়াজিব।

 

আসুন হাদীস মানি, কুরবানিকে ওয়াজিব বলি

এখানে মাত্র আটটি হাদিস পেশ করা হলো। যাতে প্রমাণিত হলো, সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব ও বাধ্যতামূলক। যারা বলে বেড়াচ্ছেন যে, কুরবানি না করলে কোনো গোনাহ নেই, এটা শুধু নেকির কাজ, করলে ছাওয়াব না করলে গোনাহ নেই, তাদের কাছে আমার প্রশ্নÑ তারা এই আটটি দলিলের কী জবাব দিবেন। কুরআনে আল্লাহর নির্দেশ, হাদিসে রাসূলের নির্দেশ, অমান্যকারীকে ঈদগাহে না আসার ধমকি, কুরবানি সঠিক সময়ে না করলে পুনরায় কুরবানি করার নির্দেশ। আরাফাতের স্পষ্ট ঘোষণা যে, কুরবানি বাধ্যতামূলক। সারাজীবন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধারাবাহিকভাবে কুরবানি করা, একবারও কুরবানি থেকে বিরত না থাকা, এসব বিষয়গুলো কী প্রমাণ করে? কুরবানি না করলে কোনো গোনাহ নেই??
একটি হাদিস/আয়াত দেখাতে পারবেন যে, সামর্থ্যবানদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানি হতে বিরত থাকার অনুমতি বা ঘোষণা দিয়েছেন? আসুন! চ্যালেঞ্জ কবুল করুন! আপনাকে দেখাতে হবে সামর্থ্যবান কোনো সাহাবীকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না করার অনুমতি দিয়েছেন।

 

(নবম দলিল)
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর অভিমত

আহলে হাদিস ভাইদের সর্বাধিক মান্যবর মহান ব্যক্তিত্ব, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি এর مجموعة الفتاوي এর ১২ নং খন্ডের ৯৩ নং পৃষ্ঠা খুলে দেখা যেতে পারে। তাঁর দলিলভিত্তিক শক্তিশালী মতামত হচ্ছেÑ কুরবানি করা ওয়াজিব। তিনি তাঁর এই বিখ্যাত ফতোয়ায় কুরআনের বহু আয়াতের উপর ভিত্তি করে কুরবানি ওয়াজিব সাব্যস্ত করেছেন।

তাঁর ভাষায় শুনুন :

واما الاضحية ، فالأظهر وجوبها ، فانها من اعظم شعائر الاسلام وهي النسك العام في جميع الامصار، والنسك مقرون بالصلاة في قوله : قُلْ إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (১৬২)
وقد قال تعالى: فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ (২) فامر بالنحر كما امر بالصلاة.
وقد قال الله تعالى: * وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِّيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ ۗ
* والْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُم مِّن شَعَائِرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ ۖ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ ۖ
* لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ ‎﴿٣٧﴾‏

অর্থাৎ কুরবানি যে ওয়াজিব, তা দলিলের বিচারে সর্বাধিক স্পষ্ট মত। তার কারণ-
এক. কুরবানি হচ্ছেÑ ইসলামের সর্ববৃহৎ ও ব্যাপক নিদর্শন। এটা গোটা উম্মতের জন্য ওয়াজিব হওয়ার-ই দাবী রাখে।
দুই. কুরবানিকে আল্লাহ তায়ালা নামাযের সাথে যুক্ত করেই পেশ করেছেন। যেমনÑ সূরা আনআমের ১৬২নং আয়াতে রয়েছে: নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার কুরবানি একমাত্র রাব্বুল আলামীনের জন্য।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে কুরবানি করার নির্দেশ করেছেন। তাঁর নির্দেশ মান্য করা ওয়াজিব। সূরা কাওসার এর দুই নং আয়াতে নামায ও কুরবানি উভয়ের জন্য আদেশ এসেছে। তাই নামায যেমন বাধ্যতামূলক, তেমনি কুরবানিও।
সূরা হজ্জের ৩৪, ৩৬, ৩৭ এ তিনটি আয়াতেও আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট পশু জবাই করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

সুতরাং পাঁচটি আয়াতেই কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

অতঃপর ইবনে তাইমিয়া রহ. আরো বলেন,

وقد جاءت الاحاديث بالامر بها وقد خرج وجوبها قولا في مذهب احمد ، وهو قول ابي حنيفه واحد القولين في مذهب مالك او ظاهر مذهب مالك

অর্থাৎ বহু হাদিস শরীফে কুরবানি করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এটাই ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর একটি মত। এটা ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মাযহাব এবং ইমাম মালেক এর মূল মাযহাব। অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেনÑ যারা কুরবানি ওয়াজিব বলতে চায় না, তাদের পক্ষে কোনো দলিল-প্রমাণ নেই। তারা সবচাইতে বড় দলিল বলে যে হাদীসটি পেশ করেন, সেটা তাদের দলিল বহন করে না।

তিনি আরো বলেন:

ونفاة الوجوب ليس معهم نص فان عمدتهم قوله صلى الله عليه وسلم : من اراد ان يضحي ودخل العشر فلا ياخذ من شعره و من اظفاره. وهذا كلام مجمل فان الواجب لا يوكل الى ارادة العبد… الخ( مجموعه الفتاوى لابن تيميه: ج ١٢ ص ٩٣-٩٤ )

অতএব, নব্য আহলে হাদিস ভাইদের অনুরোধ করবো, আপনাদের মহান গুরু ও মান্যবর ব্যক্তির উপরোক্ত বয়ান ভাল করে পড়–ন! তাহলেই আপনাদের বিভ্রান্তির কারণ বুঝতে পারবেন। ইনশাআল্লাহ।

 

(দশম দলিল)
শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন রহ. এর অভিমত

বর্তমান সময়ের সৌদি আরবের বিখ্যাত মুফতি ও শাইখ, আহলে হাদিস ভাইদের অত্যন্ত মান্যবর ব্যক্তিত্ব, শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন احكام الأضحية والزكاة নামে একটি কিতাব লিখেছেন।
এই কিতাবে তিনি লেখেন:

قال الشيخ ابن عثيمين رحمه الله وعندي ان التفويض الى الاراده لا ينافي الوجوب اذا قام عليه الدليل فقد قال النبي صلى الله عليه و سلم في المواقيت هن لهن اتى عليهن ، من غير اهلهن ممن يريد الحج والعمرة ، ولم يمنع ذلك من وجوب الحج والعمرة بدليل اخر . فصح تقسيم الناس فيها الى مريد و غير مريد لان الاضحيه لا تجب على المعسر. (ثم نقل الشيخ قول شيخ الاسلام ابن تيميه مفصلا وذكر جميع الادله لنفات الوجوب واجاب واحد عن واحد واتي بادلة الوجوب فاجاب عما ورد فيها حديثا عن حديث) ثم قال: هذه آراء العلماء وادلتهم سقناها ليبين شان الاضحيه واهميتها في الدين. والادله فيها متكافية ، و سلوك الاحتياط ان لا يدع مع القدره عليها لما فيها من تعظيم الله وذكره و براءة الذمة بيقين انتهي . (احكام الاضحية والزكاة ص ٤٧ (

শাইখ ইবনে উসাইমিন রহ. উপরোক্ত বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার পক্ষের দলিলসমূহ প্রাধান্য পাবে। তিনি দলিলগুলোর উপর আরোপিত সব অভিযোগের জবাবও দিয়েছেন। পক্ষান্তরে যারা ওয়াজিব বলেন না, তাদের দলিলগুলো একটা একটা করে খ-নও করেছেন এবং বলেছেন, এর অধিকাংশ দলিলই দুর্বল। যেটা সহীহ সেটা কিন্তু ওয়াজিবের পরিপন্থী নয়। পরিশেষে বলেছেন, যথেষ্ট পরিমাণে দলিল উল্লেখ করলাম কুরবানির গুরুত্ব ও ইসলামের নির্দেশনা বোঝানোর জন্য। সব দলিলের বিবেচনায় অতি সাবধানতা হচ্ছেÑ সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কুরবানি না করার কোন সুযোগ নেই। ইসলামের নিদর্শন হিসাবে এটাই দাবি রাখে। (আহকামুল উযহিয়্যাহ ও যাকাত ৪৭)

ওয়াজিব অমান্যকারীদের দলিল ও তার সংক্ষিপ্ত খণ্ডন:

ওয়াজিব অমান্যকারীদের প্রথম দলিল:
তাদের সবচাইতে মজবুত দলিল হচ্ছে- মুসলিম শরীফের হাদিস। হাদিসটি সহীহ। কিন্তু কুরবানি ওয়াজিব না হওয়ার কোন বিষয় হাদিসে নেই।

হযরত উম্মে সালমা রা. সূত্রে বর্ণিত:

عن ام سلمه ان النبي صلى الله عليه وسلم قال : اذا دخلت العشر واراد احدكم اي يضحي فلا يمس من شعره وبشره شيئا قيل لسفيان فان بعضهم لا يرفعه، قال انا ارفعه. (صحيح مسلم، رقم الحديث ١٩٧٧، واخرجه ابو داود والترميذي والنسائي وابن ماجه)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এরশাদ করেন, যখন জিলহজের প্রথম দশদিনের আগমন ঘটবে, তখন তোমাদের মধ্যে যারা কুরবানি করার ইচ্ছা করবে তারা চুল-নখ ইত্যাদি কাটবে না। এ হাদিসে اراد احدكم রয়েছে। অর্থাৎ যারা কুরবানির ইচ্ছা পোষণ করবে। বোঝা গেল, কুরবানি ঐচ্ছিক বা ইচ্ছাধীন ব্যাপার। চাইলে করাও যায়, আবার নাও করা যায়।

খণ্ডন-১:
শাইখ ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, বান্দার ইরাদা বা ইচ্ছার সাথে কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার বিষয়টি যুক্ত হতে পারে না। একটি বিধান ওয়াজিব হওয়ার পর মানুষ যখন তা পালন করার ইচ্ছা করে, সে যেন নখ-চুল ইত্যাদি না কাটে। এই অর্থই গ্রহণযোগ্য।
এর প্রমাণ হাদিসে প্রচুর রয়েছে। যেমনÑ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: من اراد الحج فليتعجل যে হজের ইরাদা করবে, সে যেন তাড়াতাড়ি করে। এই হাদিসের অর্থে কি কেউ বলবে যে, হজ একটি ঐচ্ছিক ব্যাপার? এটি ফরজ নয়? (মাজমুআতুল ফাতাওয়া: খন্ড ১৩ পৃষ্ঠা ৯২)

শাইখ ইবনে তাইমিয়ার ভাষায়:

وهذا كلام مجمل، فان الواجب لا يوكل الى ارادة العبد… بل قد يتعلق الواجب بالشرط لبيان حكم من الاحكام كقوله: “اذا قمتم الى الصلاه فاغسلوا ” (المائدة) وايضا فليس كل احد يجب عليه ان يضحي. وانما تجب علي القادر فهو الذي يريد ان يضحي كما قال : من اراد الحج فليتعجل الى اخره والحج فرض على المستطيع، قوله “من اراد ان يضحي” كقوله:”من اراد الحج فليتعجل” ووجوبها حينئذ مشروط بان يقدر عليها فاضلا عن حوائجه الأصلية كصدقة الفطر . (مجموعة الفتاوي: ج ١٢ ص ٩٤)

খণ্ডন-২
এই হাদিসের ব্যাপারে শাইখ ইবনে উসাইমিন রহ. বলেন: হাদিসটি কুরবানি ওয়াজিব হওয়়ার বিপক্ষে নয়। কারণÑ ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ বিদ্যমান থাকায় এই হাদিসটাকে তার বিরোধী সাব্যস্ত করা যায় না। যেমন, হাদিস শরীফে আসছে, মিকাত সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন;

” هن لهن ولمن اتى عليهن من غير اهلهن ممن يريد الحج والعمرة “

অর্থাৎ শরীয়ত নির্ধারিত মিকাতসমূহ তাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা হজ ও ওমরা করার ইরাদা বা ইচ্ছা করেন। চাই তারা ওই স্থানে বসবাস করেন বা যারা ওই স্থানের বাসিন্দা না হলেও ওই স্থানগুলো অতিক্রম করে থাকেন।
তিনি বলেন, এ হাদিসে হজ্জ-ওমরার ইরাদাকারী বলার দ্বারা কি হজ্জ-ওমরা ওয়াজিব হওয়ার বিপক্ষে হাদিসটিকে দাঁড় করানো যাবে? অথচ দলিল দ্বারা হজ্জ ফরজ হওয়া সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। উপরোক্ত হাদিসে ‘যে কুরবানির ইরাদা করে’ বাক্যটির মর্ম হলো, অক্ষম ও সক্ষম ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য করা। সক্ষম ব্যক্তিরাতো কুরবানি করবেই, কিন্তু যারা অক্ষম তারপরও কুরবানি করার ইরাদা রাখে, তাদের কেউ যেন শরীরের পশম-নখ ইত্যাদি কর্তন না করে। (আহকামুল উযহিয়্যা ও যাকাত: পৃষ্ঠা-৪৭)

শাইখ ইবনে উসাইমিন আরো বলেন:

قال الشيخ ابن عثيمين رحمه الله وعندي ان التفويض الى الإرادة لا ينافي الوجوب اذا قام عليه الدليل. فقد قال النبي صلى الله عليه وسلم في المواقيت( هن لهن و لمن اتي عليهن من غير اهلهن ممن يريد الحج والعمرة) ولم يمنع ذلك من وجوب الحج والعمره بدليل اخر… والاضحيه لا تجب على المعسر فهو غير واجب فصح تقسيم الناس فيها الى مريد وغير مريد باعتبار اليسار و الإعسار . )احكام الاضحيه والزكاة ص ٤٧(

খণ্ডন-৩
মুহাদ্দিসীনে কিরামের অনেকে হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, এই হাদিসে من اراد (যে ইচ্ছা করবে) বাক্যটি কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার বিপক্ষে নয়। কারণ, সকল শরয়ী বিধান পালনের ক্ষেত্রে ইরাদা বা ইচ্ছা বা নিয়ত শর্ত। শুধু কুরবানি করার সাথে ইরাদাটি সীমাবদ্ধ নয়। হাদিসে “ইরাদা” করার বিষয়ে এর সাথে আরেকটা মাসআলা যুক্ত, তা হলো, যাদের কুরবানি করার সামর্থ্য নেই তাদের জন্য চুল, পশম, নখ ইত্যাদি কর্তন নিষেধ নয়। এই ইরাদা বা ইচ্ছা বাক্যটি বহু ক্ষেত্রে ফরয-ওয়াজিব এর জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে।
যেমন, من اراد الحج فليلب যে হজ্জ পালনের ইরাদা করবে সে যেনো তালবিয়া পড়ে। এটা স্বত:সিদ্ধ যে, তালবিয়া পড়া ওয়াজিব।
বহু ক্ষেত্রে সুন্নাত-মুস্তাহাবের জন্যও ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, من اراد الجمعة فاليغتسل যে জুমার নামায আদায় করার ইরাদা করবে সে যেন গোসল করে।
من اراد الحج فليتعجل যে হজ্জ পালনের ইরাদা করে সে যেন ত্বরান্বিত করে। (ইলাউস সুনান খন্ড নাম্বার ১৬ পৃষ্ঠা ৭৯৫১)
সুতরাং বোঝা গেল, এই হাদিস দ্বারা যদি কুরবানি ওয়াজিব না মেনে মুস্তাহাব সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে হজ্জ, জুমাসহ অনেক ফরজ বিধানকেও অস্বীকার করে মুস্তাহাব বা ঐচ্ছিক বলতে হবে। নাউজুবিল্লাহ।

আল্লামা যফর আহমদ উসমানী রহ. লিখেন:

وذكر الارادة في حديث ام سلمة لا ينفي الوجوب لان الارادة شرط لجميع الفراءض وليس كل احد يريد التضحية (وانما يريدها من وجد سعة و كان معسرا فهو قيد للاحتراز عن المعسرين الذين لا يريدون) وقد استعمل ذلك في الواجبات كقولهم من اراد الحج فليلب ، و قوله عليه السلام من اراد الجمعة فليغتسل ، ومن اراد الحج فليتعجل. ( اعلاء السنن ج ١٢ ص ٧٩٥١ نقلا عن” الجوهرالنقي ، و تكملة فتح الملهم ج ٣ ص ٣١٠ )

ওয়াজিব অমান্যকারীদের দ্বিতীয় দলিল:
ইবনে আব্বাস রা. ও আনাস রা. হতে বর্ণিত:

اخبارنا ابو علي، و ابو الحسين بن بشران قالا : اخبرنا اسماعيل بن محمد الصفا حدثنا السعدان بن النصر حدثنا ابو بدر حدثنا ابو جناب الكلبي عن عكرمة عن ابن عباس رضي الله عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ثلاث هن على فرائض وهن لكم تطوع النحر والوتر وركعتي الضحى .(السنن الكبرى للبيهقي رقم الحديث ١٩٠٣٠ وكذا اخرجه احمد في مسنده رقم الحديث ٢٠٥٠)

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন: তিনটি কাজ আমার উপর ফরয আর তোমাদের জন্য নফল। (১) কুরবানি (২) সালাতুল বিতর (৩) সালাতুত দোহা। (বাইহাকি-১৯০৩০, মুসনাদে আহমদ-২০৫০)

খণ্ডন: (এক)
হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল কিংবা জাল। এমন হাদিস শরীয়তের কোনো বিধান প্রমাণের ক্ষেত্রে পেশ করা উলামাদের সর্বসম্মতিক্রমে অবৈধ। শাইখ শুয়াইব আল-আরনাউত সহ সকল মুহাদ্দিসগণ এই হাদিসকে বহুবিধ কারণে জয়ীফ বলেছেন। ইমাম ইবনুল জাওযি রহ. জাল/মাওজু বলেছেন। আর আহলে হাদিসদের হাদিস জগতের একমাত্র কা-ারী শাইখ নাসির উদ্দিন আলবানীও হাদীসটিকে মওজু তথা জাল বলেছেন। তাই এ পর্যায়ের একটি মারাত্মক জয়ীফ বরং মওজু তথা জাল হাদিস দ্বারা ওয়াজিব এর বিরুদ্ধে দলিল দেওয়া হাস্যকর বা বিভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।

মুহাক্কিক উলামাদের ভাষায়:

قال ابن الجوزي في العلل المتناهية في الاحاديث الواهيه : بعد اخراج الحديثين عن عباس وانس: هذان حديثان لا يثبتان، اما الاول ففيه وضاح بن يحيى، وقال ابن حبان كان يروي عن الثقات الاحاديث المقلوبات التي كانها معمولة فلا يحتج به قال احمد: “ومسنده”ضعيف واما الثاني ففيه عبد الله بن محرر. قال ابن حبان كان يكذب( ج ١ ص ٤٥٠ رقم الحديث: ৭৭০-৭১)
قال المحقق شعيب الارنؤوط في هامش مسند احمد: اسناد ضعيف ، أبو جناب الكلبي ضعفه ابن سعد و القطان، ابن معين وابو حاتم وغيره …وقال الذهبي : وهو غريب منكر .
وفي طريق الطبراني والبيهقي : قال المحقق: هذان اسنادان ضعيفان ، حماد بن عبد الرحمن الكلبي ضعيف والمبارك بن ابي حمزة مجهول واسماعيل وشريك القاضي سيئا الحفظ. (هامش مسند احمد ، رقم الحديث ٢٠٥٠ ، ٢٠٦٥ ، ٢٠٨١ )
قال الالباني (موضوع) انظر (سلسلة الاحاديث الضعيفه ٢٩٣٧) وقال الحافظ ابن حجر وهو حديث ضعيف وصححه الحاكم فذهل. ( فتح الباري ج ١٠ ص ٤ )

খণ্ডন: (দুই)
আল্লামা কাসানি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যদি হাদিসটা সহীহ মেনেও নেওয়া যায়, তাহলে তার অর্থ হচ্ছেÑকুরবানি নবীজির উপর ছিলো ফরজ আর উম্মতের উপর ফরয নয়। এখানে ওয়াজিবও নয় এমন কথা তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেননি। তাহলে এটা ওয়াজিব হওয়ার বিপক্ষে কীভাবে দলিল হতে পারে?

قال الكاساني فتقول ان الاضحيه ليست بمكتوبة علينا ( كما جاء في الرواية كتبت علي ولم يكتب عليكم ) ولكنها واجبة ، و فرق ما بين الواجب والفرض كفرق بين السماء والارض على ما عرف في اصول الفقه. (بدائع الصنائع: ج ٦ ص ٢٦٨ )

 

ওয়াজিব অমান্যকারীদের তৃতীয় দলিল:
ওয়াজিব এর বিপক্ষে সেসব হাদিস দিয়ে দলিল দেওয়া হয় যে হাদিসসমূহে কুরবানির ব্যাপারে (سنة المسلمين سنة ابراهيم سنة المعروفه) সুন্নাতে ইব্রাহিম, সুন্নাতুল মুসলিমিন, সুন্নাতে মারুফা ইত্যাদি শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে।
যেমন-
১/ বুখারি শরীফে কুরবানি সংক্রান্ত হাদিসের টীকায় বলা আছে: ইবনে উমর রা. বলেন, এটা (কুরবানি) হলো সুন্নাতে মা’রুফা তথা প্রসিদ্ধ রীতি।

وقال ابن عمر”هي سنة معروفة” (صحيح البخاري، باب سنة الاضاحي: رق الحديث:٥٥٤٥)

২/ বুখারি শরীফে হযরত বারা ইবনে আযেব রা. সূত্রে বর্ণিত হাদীসে এসেছে:

من فعله فقد اصاب سنتنا ومن ذبح قبل فان ما هو لحم قدمه لاهله .(رقم الحديث ٥٥٤٥ )

যারা নামাযের পর কুরবানি করেছে তারা সঠিকভাবে আমাদের সুন্নাতের উপর আমল করলো।

৩/ বুখারি শরীফে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এর হাদীসে এসেছে;

من ذبح بعد الصلاه فقد تم نسكه واصاب سنه المسلمين (رقم الحديث: ٥٥٤٦)

খণ্ডন:
এসব হাদিসগুলো সহীহ এবং জয়ীফ উভয় ধরনের সনদে বর্ণিত আছে। উপরে সহীহ সনদে বর্ণিত বুখারি শরীফের হাদিস উদাহরণস্বরূপ পেশ করা হলো।
এগুলোর জবাবে স্বয়ং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজেই বলেছেন এসব হাদিসে ” سنة ” সুন্নাহ শব্দের অর্থ ফকিহদের পরিভাষার সুন্নাত নয়, যা ওয়াজিবের পরিপন্থী; বরং সুন্নাহ শব্দের অর্থ হাদিসসমূহে “তরিকা” ” الطريقة المسلوكة ” পন্থা, পদ্ধতি, নিয়ম বা তরিকা-ই উদ্দেশ্য। আর এটা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাব সব ধরনের বিধানকে শামিল করে। তাই শব্দগুলোর বাহ্যিক অর্থ নিয়ে ওয়াজিব এর বিপক্ষে দাঁড় করানোর কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন দলিলে যা ওয়াজিব প্রমাণিত সেগুলো ‘সুন্নাহ’। আর যে সব বিধান সুন্নাত বা মুস্তাহাব প্রমাণিত সেগুলোও ‘সুন্নাহ’।

ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন:

المراد بالسنة هذا في الحديثين معا “الطريقة” لا السنة بالاصطلاح التي تقابل الوجوب والطريقة اعم من ان تكون للوجوب او للندب ( فتح الباري ج ١٠ ص ٥ )

আল্লামা থানভী রহ. বলেন:

و ما في حديث البراء عن الشيخين : من ذبح بعد الصلاة فقد تم نسكه واصاب سنة المسلمين ، فلا ينافي الوجوب لان المراد سيرة المسلمين وطريقتهم ، وذلك قدر مشترك بين الواجب والسنة المصطلح عليها ومثله قوله صلى الله عليه وسلم “سنوا بهم سنة اهل الكتاب” وقوله صلى الله عليه وسلم عليكم بسنتي وسنةالخلفاء الراشدين المهديين ، ولم تكن السنة المصطلح عليها معروفة اذ ذاك وقد قال البيهقي في قول ابن عباس : الختان سنة ، أراد سنة النبيদ্ধ الموجبة .(اعلاء السنن ج ١٠ ص ٧٩٤٥ بدائع الصنائع للكاساني: ج ٦ ص ٢٦٧)

সুতরাং সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়ে গেল যে, হাদিসে “সুন্নাহ” শব্দ দিয়ে কুরবানিকে ফিকহের ভাষায় “সুন্নাত” তথা ওয়াজিব নয় বলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ পরবর্তী ‘সুন্নাত তথা ওয়াজিব নয়’ পরিভাষাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে বিদ্যমান ছিলো না; বরং সুন্নাহের অর্থ হলো: তরিকা, পদ্ধতি, সিরাত যা ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নত এবং মুস্তাহাব সবটিকে শামিল করে।

 

ওয়াজিব অমান্যকারীদের চতুর্থ দলিল:
হযরত জাবালা বিন সুহাইম রা. থেকে বর্ণিত:

أن رجلا سأل إبن عمر عن الأضحية أهي واجبة فقال ضحى رسول الله والمسلمون بعده).رواه الترمذي رقم ١٥٠٦ قال حديث حسن صحيح(

হযরত ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, কুরবানি কি ওয়াজিব? জবাবে তিনি نعم শব্দ বলেননি: বরং বলেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানি করতেন, তারপর সাহাবায়ে কিরাম তথা মুসলমানগণও কুরবানি করতেন।
শুধু রাসুলের আমল ও মুসলমানদের আমলের কথা বলার দ্বারা বিষয়টি ওয়াজিব প্রমাণিত হয় না।

খণ্ডন:
সপ্তম হাদিসের আলোচনায় এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধারাবাহিক আমল ও গোটা মুসলিম উম্মাহর নিরবচ্ছিন্ন আমলকে মুহাদ্দিসগণ تعامل ও توارث বলেন। এমন আমল দ্বারা শুধু ওয়াজিব প্রমাণিত হয়, সুন্নাত নয়। বিশেষ করে কুরআনের একাধিক আয়াত ও রাসুলের বহু সহিহ হাদিস দ্বারা কুরবানি ওয়াজিব প্রমাণিত হওয়ায় এটাই প্রমাণ করছে যে, ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর উক্ত বক্তব্য দ্বারা কুরবানি ওয়াজিব প্রমাণিত হচ্ছে।
সুতরাং উক্ত হাদিসে ‘ওয়াজিব নয়’ এমন কোন মর্ম উদঘাটন করা মারাত্মক ভুল। রইল “نعم” “হাঁ ওয়াজিব” এভাবে বললেন না কেন? তার উত্তরে ‘হাঁ’ বললে তা ফরজ হয়ে যেতো। কারণ ওয়াজিব শব্দ দ্বারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তখন ফরজ বোঝানো হতো। (ই’লাউস সুনান:১৬/৭৯৪৬)

আল্লামা যফর আহমদ উসমানী রহ. বলেন:

قال العثماني قلت لا دلالة فيه على عدم الوجوب، فانه نظير قوله وسئل عن الوتر أ واجب هو فقال اوتر رسول الله و اوتر المسلمون . قال العيني في عمدة القاري فيه دلالة على وجوب الوتر إذ كلامه يدل على انه صار سبيلا للمسلمين فمن تركه فقد دخل في قوله تعالى: “ويتبع غير سبيل المؤمنين” وانما لم يصرح بالوجوب كي لا يظن تحتمه كتحتم الفرائض فكذلك هاهنا (اعلاء السنن ج ١٦ ص ٧٩٤٥)

 

ওয়াজিব অমান্যকারীদের পঞ্চম দলিল:
কিছু সাহাবাদের আমলের ব্যাপারে আসার “آثار” বর্ণিত হয়েছে। যেমন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁরা কুরবানি করতেন না। কোনো বর্ণনায় আছে, তাঁরা তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি করতেন না। যাতে অন্যদের জন্য তা আদর্শ না হয়ে বসে। তেমনিভাবে সাহাবী আবু মাসউদ আনসারী রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমি কুরবানি করতাম না, অথচ আমার সামর্থ্য ছিল।
এসব হাদিস ও আসার প্রমাণ করে যে, কুরবানি বাধ্যতামূলক ছিলো না; বরং ঐচ্ছিক ছিলো।
হাদিসগুলো হচ্ছে:

(السنن الكبرى للبيهقي: رقم: ১৯০৩৪، ১৯০৩৫)عَنِ الشَّعْبِىِّ عَنْ أَبِى سَرِيحَةَ الْغِفَارِىِّ قَالَ : أَدْرَكْتُ أَبَا بَكْرٍ أَوْ رَأَيْتُ أَبَا بَكْرٍ وَعُمَرَ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُمَا لاَ يُضَحِّيَانِ فِى بَعْضِ حَدِيثِهِمْ كَرَاهِيَةَ أَنْ يُقْتَدَى بِهِمَا.
* عَنْ أَبِى وَائِلٍ عَنْ أَبِى مَسْعُودٍ الأَنْصَارِىِّ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : إِنِّى لأَدَعُ الأَضْحَى وَإِنِّى لَمُوسِرٌ مَخَافَةَ أَنْ يَرَى جِيرَانِى أَنَّهُ حَتْمٌ عَلَىَّ. (السنن الكبرى للبيهقي: رقم: ১৯০৩৮-১৯০৩৯) قال المحقق في هامش البيهقي: الحديثان الأولان ضعيف والأخير صحيح، هي قول ابي مسعود .

খণ্ডন:
(ক) মুহাদ্দিসীনে কিরাম হুযাইফা বিন উসাইদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত হাদিসগুলো জয়ীফ ও দুর্বল বলে মত দিয়েছেন। যেমনটি সুনানে বাইহাকীতে মুহাক্কিক বলেছেন:

ضعيف لأن إسماعيل بن أبي خالد يدلس عن الشعبي وقد صحح إسناده الألباني في الأرواء و العلم عند الله .

কিন্তু আলবানী সাহেব একটি সনদকে সহীহও বলেছেন। আর সাহাবী আবু মাসউদ রা. এর হাদিসটিকে মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক এর সূত্রে অনেকে সহীহ বলেন।
(খ) কোনো সাহাবী কুরবানি না করার আমল দ্বারা কি তা মুস্তাহাব হয়ে যাবে? অথচ হযরত ইবনে উমর রা. এর হাদিসে এসেছে:

” ضحى رسول الله صلى الله عليه وسلم والمسلمون “

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সকল উম্মতে মুসলিমা কুরবানি ধারাবাহিকভাবে করে আসছেন। রাসূল সা. সহ সকল মুসলিম উম্মাহর ধারাবাহিক আমল আহলে হাদিস ভাইদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো না! শুধু তিনজন সাহাবী এরচে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো? (!)

(গ) কুরবানি কি সকলের উপর ওয়াজিব? না তার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে? উত্তর হলো ঢালাওভাবে ওয়াজিব নয়; বরং শর্ত সাপেক্ষে ওয়াজিব। এক নাম্বার শর্ত হলো, সামর্থ্যবান হওয়া। হযরত আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে যে ওয়াজিফা পেতেন তা দিয়ে কোনোরকম ঘরের প্রয়োজন পূরণ হতো। এর বেশি তাঁরা নিতেন না। তাই তাদের নিকট কুরবানি করার মত প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ ছিল না। সে কারণে কুরবানি করতেন না। এটা হাদিস বিশারদগণের ব্যাখ্যা। নতুবা যে কাজ রাসূল স. কখনো ছাড়েননি। দুই খলীফায়ে রাশেদ এই মুবারক কাজ ছাড়ার প্রশ্নই আসে না।
হাঁ, আবু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করেননি। হতে পারে এটা তাঁর ইজতিহাদ। বিষয়টি যে পূর্ব থেকেই মতবিরোধপূর্ণ তা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু আবু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর আমল কুরআন-হাদিসের উপরোক্ত মজবুত দলিলের বিপক্ষে কীভাবে দাঁড় করানো সম্ভব? অথচ এই সম্ভাবনাও থাকছে যে, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং আবু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি করতেন না।
কানযুল উম্মাল গ্রন্থে এই সম্ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আর আবু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর ব্যাপারে এও সম্ভাবনা রয়েছে যে, তিনি সামর্থ্যবান ছিলেন, তবে ঋণগ্রস্থ থাকায় কুরবানি করতেন না। যাতে শরয়ী মাসআলার ব্যাপারে কেউ ভুল না বুঝে। কিছু হাদিস বিশেষজ্ঞগণ এই সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন।

বিষয়গুলো ইমাম কাসানি রহ. এভাবে উল্লেখ করেন:

أما حديث سيدنا أبي بكر وسيدنا عمر فيحتمل أنهما كانا لا يضحيان السنة و السنتين لعدم غناهما لماّ كان لا يفضل رزقهما الذي كان في بيت المال عن كفايتهما ، والغني شرط الوجوب في هذا النوع .
وقول ابي مسعود رضي الله عنه لا يصلح معارضا للكتاب الكريم و السنة مع ما أنه يحتمل أنه كان عليه دين فخاف على جاره لو ضحى أن يعتقد وجوب الأضحية مع قيام الدين… فلا يكون حجة مع الاحتمال او يحمل على ما قلنا توفيقا بين الدلائل صيانة لها على التناقض” (بدائع الصنائع: ج ٦ ص ٢٩٧)
و ما قال ابن حزم عن ابي سريحة الغفاري لقد رايت ابا بكر وعمر وما يضحيان كراهية اي يقتدي بهما فهو محمول على انهما كانا لا يضحيان عن اهلهما كما في كنز العمال: ج ٣ ص ٤٥ . (راجع اعلاء السنن ج ১٦ ص ٧٩٤٢)

 

সারকথা:

কুরবানি করা বিশুদ্ধ মতে বহু দলিলের ভিত্তিতে ওয়াজিব ও আবশ্যকীয়। তবে তা কেবল সামর্থ্যবান মুকিম ও বালেগ মুসলমানের উপর। ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ রহ. এর এক বর্ণনা অনুযায়ী তা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, ওয়াজিব নয়। তবে ইসলামের বিশাল নিদর্শন। এটাই বিশ্ব মুসলিমের কর্মপন্থা ও আবশ্যিক করনীয়। শরয়ী ওজর ছাড়া কুরবানি ছাড়া যাবে না। অথচ বর্তমান আহলে হাদিসদের অনেকের মতে কুরবানি ঐচ্ছিক বিষয়। না করলে কোনো গোনাহ নেই।

কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার দলিলসমূহের নির্যাস:

এক. সূরা কাউসারে ‘নাহর’ (কুরবানি) করার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‎﴿٢﴾

অর্থ: অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কুরবানি করুন। (সূরা কাউসার-২)
এ নির্দেশ পালন অবশ্যই ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ বহন করে।

দুই. সূরা হজের ৩৪ নং আয়াতে কুরবানিকে আল্লাহ সকল উম্মতের জন্য ধার্য্য করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِّيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ ۗ

অর্থ: আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানি নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ কারার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।… (সূরা হজ্জ-৩৪)
এমন আমল যা সকল উম্মতের জন্য অবধারিত তা অবশ্যই ওয়াজিব হওয়ার-ই প্রমাণ বহন করে।

তিন. কুরআনুল কারিমে একাধিক জায়গায় কুরবানিকে নামাযের সাথে যুক্ত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন:

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ‎﴿١٦٢﴾

অর্থ: আপনি বলুনঃ আমার নামায, আমার কুরবানি এবং আমার জীবন ও মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। (সূরা আনআম-১৬২)
এতে একথা প্রমাণ হয় যে, নামায যেমন আবশ্যকীয়, কুরবানিও তাই। অতএব, কুরবানি ওয়াজিব বলেই সাব্যস্ত হবে।

চার. একাধিক আয়াতে কুরবানির পশুর উপর আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:

لِّيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ ۗ

এবং

وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُم مِّن شَعَائِرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ ۖ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ ۖ

অন্য আয়াতে এসেছে:

كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ ‎﴿٣٧﴾‏

এ আয়াতগুলোতে কুরবানির জন্তুর উপর আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করতে বলা প্রমাণ করে যে, বিষয়টি কমপক্ষে ওয়াজিব পর্যায়ের হবে।

পাঁচ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু হাদিসে “ضحوا” বলে কুরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুলের ব্যাপক আদেশ দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, কুরবানি ওয়াজিব।

ছয়. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা কুরবানি করবে না’ তাদের প্রতি ঈদগাহে না আসার হুশিয়ারি উচ্চারণও প্রমাণ করে কুরবানি ওয়াজিব।

সাত. যারা ঈদের নামাযের পূর্বে কুরবানি দিয়েছে তাদেরকে রাসূল স. পুনরায় কুরবানি আদায় করার নির্দেশ প্রদান করেন। এটা প্রমাণ করে যে, কুরবানি ওয়াজিব ও আবশ্যকীয় আমল।

আট. রাসূল স. মদীনার জীবনে কোনোদিন কুরবানি ছাড়েননি। তাঁর এই ধারাবাহিক আমল (مواظبة النبي) কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ।

নয়. ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কুরবানি ওয়াজিব কি-না? প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, এটা রাসূল স. এবং সমস্ত মুসলিম উম্মাহর ধারাবাহিক আমল। এমন (توارث ও تعامل ) প্রমাণ করে যে, কুরবানি ওয়াজিব।

দশ. وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ.. আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, পুরো উম্মতের আদর্শ ও পথ-পন্থা গ্রহণ না করা মারাত্মক অপরাধ হিসাবে স্বীকৃত। এজাতীয় আমল অবশ্যই ওয়াজিব হওয়ার প্রমাণ বহন করে।

এগার. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ও শাইখ ইবনে উসাইমিন রহ. মাযহাবগত হাম্বলী হওয়া সত্ত্বেও নিজ মাযহাব ছেড়ে দলিলের বিচারে ওয়াজিব হওয়ার ফতোয়া দিয়েছেন এবং ইবনে তাইমিয়া রহ. এটাও বলেছেন যে, কুরবানি ঐক্যবদ্ধভাবে তরক করা হজ্জ বর্জন করার মতো অপরাধ।

পরিশেষে বলতে চাই, আজকে আহলে হাদিস ভাইগণ কুরবানিকে সুন্নাত বলেন, আর কুরবানি না করলে কোন সমস্যা নেই বলে এই পবিত্র ইবাদত থেকে সাধারন মুসলমানকে বিরত রাখার পথ সুগম করে থাকেন! অথচ তাদের দৃষ্টিতে নামাযে আমিন উচ্চস্বরে বলা, রফয়ে ইয়াদাইন করাসহ বহু বিষয়ও সুন্নাত। তা সত্ত্বেও এ সুন্নাতগুলো পালন করার প্রতি খুব জোর দেন। এমনকি কেউ যদি তার মাযহাব অনুসারে আমিন নিম্নস্বরে বলে, হাত উত্তোলন না করে, তাদেরকে বিদআতী-গোমরাহ ইত্যাদি নামে সম্বোধন করে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ান। অথচ কুরবানিকে সুন্নাত মানা সত্ত্বেও এটার ব্যাপারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করেন। এই সাংঘর্ষিক কর্মকা-ের পিছনে কি রহস্য লুকিয়ে আছে? তা উদঘাটন করা আজ মুসলিম উম্মাহর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
আল্লাহ তায়ালা উম্মতে মুসলিমাকে প্রভৃত্তির পুঁজা ও ব্যক্তি স্বার্থ বাদ দিয়ে কুরআন-সুন্নাহর ব্যখ্যায় ইনসাফ প্রদর্শনের তাওফীক দান করুন। ইসলামের অন্যতম শিআর তথা কুরবানিকে যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদার সাথে পালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন ॥

প্রবন্ধকার
মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ
লেখক, গবেষক ও বিশিষ্ট দায়ী
১৭/০৭/২০২১ইং

আরও জানুন

ইমাম মাহদী ও ঈসা আঃ কোন মাযহাবের অনুসারী হবেন?

প্রশ্ন Alamgir Sardar প্রশ্ন: ঈসা (আ:) এবং ইমাম মাহাদী (আ:) কোন মাযহাবের অনুসারী হবেন? নাকি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস