প্রচ্ছদ / ইলম/জ্ঞান/শব্দার্থ / কোন আলেম আবেদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ?

কোন আলেম আবেদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ?

প্রশ্ন

সম্মানিত মুফতী সাহেব। আমি আপনার কাছে একটি হাদীসের ব্যাখ্যা জানতে চাচ্ছি। অনেক আলেমকেই বলতে শুনি যে, একজন আলেম আবেদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। আমার প্রশ্ন হল, আলেম হলেই কি ব্যক্তি আবেদ তথা ইবাদতকারী থেকে শ্রেষ্ঠ হয়ে যায়? বিষয়টি পরিস্কার করার অনুরোধ করছি।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রথমে এ সংক্রান্ত হাদীসটি দেখে নেই।

রাসূল সা: হাদিসে নববীতে বলেছেন-

عَنْ أَبِي أُمَامَةَ البَاهِلِيِّ، قَالَ: ذُكِرَ لِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلاَنِ أَحَدُهُمَا عَابِدٌ وَالآخَرُ عَالِمٌ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فَضْلُ العَالِمِ عَلَى العَابِدِ كَفَضْلِي عَلَى أَدْنَاكُمْ.

অনুবাদ-আবু ওমামা বাহিলি রা: বলেন-নবীজি সা: এর কাছে দু’জন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হল, যাদের একজন আবেদ(অধিক ইবাদাতকারী) ও অন্যজন  আলেম। তখন নবীজী সা: বললেন-একজন আলেমের মর্যাদা একজন আবেদের উপর তেমন যেমন আমার মর্যাদা তোমরাদের মাঝের সবচে’ নিম্ন ব্যক্তির উপর। (তিরমিজী, হাদীস নং-২৬৮৫)

এ হাদীসটি কতিপয় উলামায়ে কিরামের জন্য আমল না করার বাহানা হয়ে গেছে। হাদিসের বাহ্যিক অর্থ দেখে তারা বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছেন যে, নবী বলেছেন “আলেমতো আবেদ থেকে শ্রেষ্ঠ নবী যেমন সাহাবাদের উপর শ্রেষ্ঠ।” কিন্তু এই হাদিসের ব্যখ্যার দিকে কেউ যদি খেয়াল করে তবে এই ধারণাটি কতটা ভুল তা সহজেই অনুমেয় হবে।

আল্লাহর নবী হাদিসে বলেছেন-العالم শব্দটি ا ও ل যুক্ত করে معرفة তথা নির্দিষ্ট আলেমের কথা বলেছেন, نكرة করে অনির্দিষ্ট আলেম বলেননি। সুতরাং এখন আমাদের দেখতে হবে সেই নির্দিষ্ট আলেম কে? আম আলেমের কথা নবীজি বলেননি, বলেছেন নির্দিষ্ট আলেমের কথা। আর ঐ নির্দিষ্ট আলেম হচ্ছেন আমলকারী আলেম, আমলহীন আলেম নয়। সুতরাং আমলকারী আলেমই শুধু আবেদের উপর শ্রেষ্ঠত্বের দাবী রাখে আমলহীন আলেম নয়।

আর এই জন্যই আল্লামা ইবনে খালদুন রাহ: তার মুকাদ্দাতু ইবনে খালদুন কিতাবে লিখেন-

والسلف رضوان الله عليهم وأهل الدين والورع من المسلمين حملوا الشريعة اتصافاً بها وتحققاً بمذاهبها. فمن حملها اتصافاً وتحققاً دون نقل فهو من الوارثين،

ومن اجتمع له الأمران فهو العالم وهو الوارث على الحقيقة، مثل فقهاء التابعين والسلف والأئمة الأربعه ومن اقتفى طريقهم، وجاء على آثرهم. وإذا انفرد واحد من الأئمة بأحد الأمرين فالعابد أحق بالوراثة من الفقيه الذي ليس بعابد، لأن العابد ورث بصفة والفقيه الذي ليس بعابد لم يرث شيئاً، إنما هو صاحب أقوال ينصها علينا في كيفيات العمل، وهؤلاء أكثر فقهاء عصرنا، ” إلا الذين آمنوا وعملوا الصالحات وقليل ما هم ” (مقدمة ابن خلدون-باب الحسبة والسكة-1/117).

অনুবাদ-পূর্বসুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিরা এবং মুসলমানদের মাঝে যারা দ্বীনদার ও আলেম ছিলেন তারা শরীয়তকে বহন করেছেন সে গুনে গুনান্বিত হয়ে এবং ধর্ম হিসেবে আঁকড়ে নিয়েছেন। সুতরাং যারা তা বহন করেছেন শুধু বর্ণনা না করে বরং শরয়ী বিধানের গুনে গুনান্বিত হয়ে ও তা বিশ্লেষণ করে তারাই প্রকৃত ওয়ারিস বা উত্তারাধিকারী (ইলমের)।

যারা দু’টিকেই একত্র করতে পেরেছেন তারাই আলেম। তিনিই প্রকৃত ওয়ারিস। যেমন ফুকাহায়ে তাবেয়ীন সালাফে সালেহীন, চার ইমাম ও যারা তাদের পথ অবলম্বন করেছেন ও সে মতে চলেছেন। আর যে ইমাম দু’টির একটি গ্রহণ করেছেন,তাহলে আবেদ অধিক হকদার ওয়ারীস হবার ক্ষেত্রে ঐ ইবাদতহীন ফকীহ থেকে। কেননা আবেদ মিরাছ পেয়েছে গুনকে, আর ফক্বীহ/আলেম যে আবেদ নয় সে কিছুই মিরাছ পায়নি, সে কেবল কিছু ইবারতের ধারক যা আমাদের আমল করার পদ্ধতিকে বুঝায়। আর বর্তমানে আমাদের অধিকাংশ ফক্বীহ/আলেম এমনি। তবে যারা ঈমানদার ও নেক কাজ করে, তারা খুবই নগণ্য সংখ্যক। (মুকাদ্দামাতু ইবনে খালদুন-১/১১৭)

সুতরাং বুঝা গেল প্রকৃত ওয়ারিসে নবী সেই যে আমলের সাথে ইলমকে বহন করে, আর যে শুধু ইলম নিয়েই থাকে আমলের ধার ধারেনা সে প্রকৃত অর্থে ওয়ারিসে নবী নয়, আর সে সাধারণ আবেদের উপর তার কোন শ্রেষ্ঠত্বও নেই।

ইলম ও আমল একটি অন্যটির পরিপূরক

علم শব্দটি আর عمل শব্দ, এ দু’টি শব্দের অক্ষর একই। শুধু আগপিছুর পার্থক্য। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অক্ষর স্থানান্তরিত হয়েছে কেবল। যাকে আরবীতে বলে-قلب مكانى তথা স্থান পরিবর্তন। আর স্থান পরিবর্তন হলেও তার অর্থ ঠিকই থাকে, অর্থাৎ ইলম তা’ই যা আমলময়, আর আমল তা’ই হবে যা ইলম অনুযায়ী হবে। একটিকে ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ। যেমন- تصوف শব্দটি এসেছে صفو থেকে যার অর্থ হল পরিচ্ছন্নতা, তো এ শব্দে قلب مكانى হয়ে و অক্ষরটি ف স্থলে আনা হয়েছে। কিন্তু অর্থ পূর্বেরই রয়ে গেছে, অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতা, সুতরাং এ শব্দটি باب تفعيل গিয়ে সে বাবের খাসিয়াত অনুযায়ী হয়ে গেছে تصوف তথা অধিক পরিচ্ছন্নতা।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা আশা করি এ বিষয়টি পরিস্কার হয়ে গেছে যে, শুধুমাত্র আলেম হলেই উক্ত ব্যক্তি আবেদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ হয়ে যায় না। বরং ইলমের সাথে যার আমল আছে উক্ত আলেম আবেদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন, এটিকে পুজি করে আলেম উলামাদের দোষত্রুটি খুঁজতে শুরু করে দেয়া না হয়।বরং নিজের আমলের দিকে অধিক মনোযুগী হওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের তৌফিক দান করুন। আমীন।

والله اعلم بالصواب

উত্তর লিখনে

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল- ahlehaqmedia2014@gmail.com

lutforfarazi@yahoo.com

আরও জানুন

মরণোত্তর চক্ষুদান করার হুকুম কী?

প্রশ্ন মুফতী সাহেবের কাছে আমার প্রশ্ন হল, মরণোত্তর চক্ষুদান করার হুকুম কী? দয়া করে জানালে …

No comments

  1. Sarid Ahmed Choudhury.

    আসসালামু আলাইকুম
    PDF ফাইল খুজে পাইতেছি না। দয়াকরে বলবেন কি ভাবে PDF ফাইল ডাউনলোড করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *