প্রচ্ছদ / আকিদা-বিশ্বাস / করোনা ভাইরাস ও ছোঁয়াচে রোগঃ কী বলে ইসলাম?

করোনা ভাইরাস ও ছোঁয়াচে রোগঃ কী বলে ইসলাম?

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম।

মুফতী সাহেবের কাছে আমার প্রশ্ন হল, পুরো বিশ্বেই করোনা ভাইরাস আতংকে রয়েছে। এটি নাকি সংক্রামক ব্যাধি। একজন থেকে অন্যজনের কাছে স্থানান্তর হয়।

এখন আমার জানার বিষয় হল, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সংক্রামক রোগ বলতে কিছু আছে কি না? এ বিষয়ে আমি একজন মুসলিম হিসেবে কী বিশ্বাস রাখতে পারি?

দয়া করে বিস্তারিত জানালে কৃতার্থ হবো।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

সংক্রামক রোগ বলতে কিছু আছে কি না? এ বিষয়ে দুই ধরণের বর্ণনা হাদীস পাওয়া যায়। যথা-

১- সংক্রামক বলতে কোন রোগ নেই!

২- রোগ সংক্রামক হতে পারে।

সংক্রামক রোগ না থাকার প্রমাণ হল,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ” لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ،

হযরত ইবনে উমর রাঃ থেকে বর্ণিত। নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সংক্রামক রোগ এবং কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৭৫৩]

أَبَا هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لاَ عَدْوَى وَلاَ صَفَرَ وَلاَ هَامَةَ» فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَمَا بَالُ إِبِلِي، تَكُونُ فِي الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظِّبَاءُ، فَيَأْتِي البَعِيرُ الأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ بَيْنَهَا فَيُجْرِبُهَا؟ فَقَالَ: «فَمَنْ أَعْدَى الأَوَّلَ؟»

হযরত আবূ হুরাইরাহ রাঃ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগের কোন সংক্রমণ নেই, সফরের কোন অশুভ আলামত নেই, পেঁচার মধ্যেও কোন অশুভ আলামত নেই। তখন এক বেদুঈন বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমার উটের এ অবস্থা কেন হয়? সেগুলো যখন চারণ ভূমিতে থাকে তখন সেগুলো যেন মুক্ত হরিণের পাল। এমন অবস্থায় চর্মরোগাগ্রস্ত উট এসে সেগুলোর পালে ঢুকে পড়ে এবং এগুলোকেও চর্ম রোগে আক্রান্ত করে ফেলে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহলে প্রথমটিকে চর্ম রোগাক্রান্ত কে করেছে? [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৭১৭]

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَخَذَ بِيَدِ رَجُلٍ مَجْذُومٍ فَأَدْخَلَهَا مَعَهُ فِي الْقَصْعَةِ، ثُمَّ قَالَ: «كُلْ، ثِقَةً بِاللَّهِ وَتَوَكُّلًا عَلَى اللَّهِ»

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত এক ব্যক্তির হাত ধরে তা নিজের আহারের পাত্রের মধ্যে রেখে বলেনঃ আল্লাহর উপর আস্থা রেখে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে খাও। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৩৫৪২, সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং-৩৯২৫, সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১৮১৭]

উপরোক্ত হাদীসগুলো প্রমাণ করে, সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছু নেই। আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছে রোগাক্রান্ত করেন। ‘রোগাক্রান্তের সংস্পর্শে আসলে অন্য কারো হবে’ এর কোন বাস্তবতা নেই।

তবে কিছু বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, রোগ সংক্রামক হতে পারে। যেমন-

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ-

وَفِرَّ مِنَ المَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الأَسَدِ»

কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাক,যেভাবে তুমি বাঘ থেকে দূরে থাক [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৭০৭]

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ ‏ “‏ لاَ تُدِيمُوا النَّظَرَ إِلَى الْمَجْذُومِينَ ‏”‏ ‏.‏

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কুষ্ঠ রোগীদের দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে থেকো না। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৩৫৪৩]

أَبَا سَلَمَةَ بْنَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ، حَدَّثَهُ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا عَدْوَى» وَيُحَدِّثُ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لَا يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ» قَالَ أَبُو سَلَمَةَ: كَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يُحَدِّثُهُمَا كِلْتَيْهِمَا عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ صَمَتَ أَبُو هُرَيْرَةَ بَعْدَ ذَلِكَ عَنْ قَوْلِهِ «لَا عَدْوَى» وَأَقَامَ عَلَى أَنْ «لَا يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ»

আবূ সালামা ইবনু আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে,রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সংক্রমণ (-এর অস্তিত্ব) নেই। তিনি আরও হাদীস বর্ণনা করতেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অসুস্থ উটপালের মালিক (অসুস্থ উটগুলিকে) সুস্থ উটপালের মালিকের (উটের) কাছে আনবে না। আবূ সালামা (রহঃ) বলেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) এ দুংটি হাদীস রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করতেন। পরে আবূ হুরায়রা (রাঃ) তাঁর (প্রথম হাদীসের) ‘সংক্রমণ …… নেই’ বলা থেকে নীরব থাকেন এবং অসুস্থ উটপালের মালিক সুস্থ উটপালের মালিকের কাছে আনবেনা এর বর্ণনায় দৃঢ় থাকেন। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২২২১, ৫৫৯৭]

এই বিপরীতমুখী বর্ণনার কারণে মুহাদ্দিসীনে কেরামের মাঝে এ বিষয়ে মতভেদে হয়ে গেছে। যথা-

একদল উলামাগণের মতে সংক্রমণের ভয়ে পলায়ন করার হুকুম রহিত হয়ে গেছে। তাই সংক্রমণের ভয়ে পালিয়ে থাকা যাবে না। ঈসা বিন দিনার রহঃ এ মতটিকে গ্রহণ করেছেন। [ফাতহুল বারী-১০/১৯৬, উমদাতুল কারী-২১/২৪৭]

অধিকাংশ উলামাগণ উভয় প্রকার হাদীসের মাঝে সমন্বয় সাধন করেছেন। যা নিম্নরূপ-

ক)

যেসব বর্ণনায় সংক্রমণের ভয়ে পালাতে বা দূরে থাকার হুকুম দেয়া হয়েছে, এটা সতর্কতার উপর নির্ভরশীল।

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংক্রামক রোগীর সাথে খানা খেয়ে বুঝিয়েছেন যে, এতে কোন সমস্যা নেই। সংক্রমণের ভয়ে পালিয়ে থাকা কোন জরুরী বিষয় নয়। বরং কেবলি সতর্কতা।

খ)

ইবনুস সালাহ এবং ইমাম বায়হাকী রহঃ প্রমূখগণ সমন্বয় সাধন করে বলেন, যেসব হাদীসে সংক্রমণ বলতে কিছু নেই বলা হয়েছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কোন রোগ ব্যাধিতে মৌলিকভাবে সংক্রমণের কোন ক্ষমতা নেই। যেমনটি জাহেলী যুগের মানুষ বিশ্বাস করতো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই আকীদা প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে, রোগ ব্যাধি নিজস্ব ক্ষমতায় সংক্রমিত হতে পারে না।

আর যেসব হাদীসে সংক্রমণ হতে পারে বুঝা যায়, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কোন রোগের মাঝে আল্লাহ তাআলা সংক্রমণের ক্ষমতা দান করেন, সেই হিসেবে কোন রোগ সংক্রমিত হতে পারে। এটা রোগের ক্ষমতা নয়, বরং আল্লাহর দেয়া ক্ষমতা বলে এমনটি হয়।

সুতরাং বুঝা গেল যে, সংক্রমণ নেই মানে হল, নিজস্ব ক্ষমতা নেই। আর সংক্রমণ হতে পারে,  মানে হল, যদি আল্লাহ তাতে বাহ্যিক এমন ক্ষমতা উক্ত রোগে দেন, তাহলে হতে পারে।

সুতরাং দুই হাদীসে কোন বৈপরীত্ব নেই। [ফাতহুল বারী-১০/১৯৭, উমদাতুল কারী-২১/২৪৭]

জমহুর উলামাগণ এ সমন্বিত ব্যাখ্যাটি পছন্দ করেছেন।

গ)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ শরহে নুখবাতুল ফিকারে উক্ত হাদীসদ্বয়ের সমন্বয় সাধন করে লিখেন যে,

‘সংক্রমণ বলতে কিছু নেই’ একথাটি মৌলিকভাবে সঠিক। বাস্তব কথা এটাই যে, কোন রোগ বা ব্যাধি একজন থেকে অন্যজনের মাঝে সংক্রমিত হয় না।

কিন্তু এরপরও যাদের ঈমান দুর্বল, তাদেরকে কুষ্ঠ ইত্যাদি রোগী থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে, যেন তার মাঝে যদি সংক্রমণের কারণে নয়, বরং এমনিতেই রোগটি হয়ে থাকে, তাহলে তার আকীদা বিগড়ে যাবে। তার মনে হবে যে, উক্ত রোগটি সংক্রমণের কারণেই হয়েছে। এভাবে তার আকীদা নষ্ট হয়ে যাবে।

এ কারণে, তার আকীদার হিফাযতের জন্য এমন রোগী থেকে নিজেকে দূরে রাখার জন্য দুর্বল ঈমানদারদেরকে বলা হয়েছে। [শরহু নুখবাতিল ফিকার, ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ কৃত]

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা আমাদের কাছে প্রতিভাত হল যে, সংক্রমণ হতে পারে। যদি আল্লাহ তাআলা উক্ত রোগে এ ক্ষমতা দান করেন। তবে উক্ত রোগের নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই সংক্রমনের। তাই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কিন্তু এ কারণে আতংক  ছড়িয়ে স্বাভাবিক জীবনকে স্তব্ধ করে দেয়া উচিত নয়।

সকলের মৃত্যুই অবধারিত। মৃত্যু থেকে কেউ পালিয়ে থাকতে পারবে না। অসুস্থতা ছাড়াও মৃত্যু হতে পারে। সুতরাং সংক্রমিত রোগের ভয়ে সব কিছু বন্ধ করে দিয়ে পালিয়ে থাকা কোন ঈমানদারদের জন্য শোভা পায় না। তাই আতংক নয়, সচেতনতা জরুরী।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল প্রকার বিপদ আপদ থেকে হিফাযত করুন। আমীন।

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক ও প্রধান মুফতী –তা’লীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম আমীনবাজার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া ফারূকিয়া দক্ষিণ বনশ্রী ঢাকা।

আরও জানুন

মহিলাদের জন্য পায়ে মেহেদী লাগানোর সুযোগ আছে?

প্রশ্ন: মুহতারাম, মহিলাদের জন্য পায়ে মেহেদী লাগানো জায়েজ হবে কিনা? নিবেদক তাবাসসুম উত্তর بسم الله …

2 comments

  1. উপকৃত হয়েছি ধন্যবাদ

  2. আসলে ভাইরাস সম্পর্কে আমাদের আকীদা কি হওয়া উচিত এটা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। এখন বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেলো। আল্লাহপাক আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *