প্রচ্ছদ / ইলম/জ্ঞান/শব্দার্থ / দ্বীনী ইলমের তালীম কি শুধু মসজিদে হওয়াই কাম্য?

দ্বীনী ইলমের তালীম কি শুধু মসজিদে হওয়াই কাম্য?

প্রশ্ন :

কিছুদিন পূর্বে এক ভাইয়ের সাথে দীর্ঘ সময় কথা হয়েছিল, যিনি হযরত মাওলানা সা‘দ সাহেবের এতাআত করেন। ওই ভাই মাওলানা সা‘দ সাহেবের রেফারেন্সে বললেন, সাহাবাগণ কেবলমাত্র মসজিদে ইলম অর্জন করতেন। এটাই ইলম অর্জনের সুন্নত পদ্ধতি। মসজিদের বাইরে ইলম অর্জনের পদ্ধতি সুন্নত নয়; বরং রেওয়াজি পদ্ধতি। এমনকি মসজিদে নববীর পাশেই সুফ্ফায় যেসকল সাহাবী অবস্থান করতেন, তাদেরকে সুফ্ফায় ইলম শিক্ষা দেওয়া হত না; বরং মসজিদে ইলম শিক্ষা দেওয়া হত। অর্থাৎ মাওলানা সা‘দ সাহেবের দাবি হল, সীরাতের আলোকে ইলম অর্জনের পদ্ধতি হল, কেবলমাত্র মসজিদে ইলমের হালকায় ইলম অর্জন করা। আমার প্রশ্ন হল, সীরাত ও সাহাবায়ে কেরামের কর্মপদ্ধতির আলোকে মাওলানা সা‘দ সাহেবের এই দাবি কতটুকু ঠিক?

বর্তমানে মাদরাসাগুলোতে মসজিদের বাইরে ভিন্ন ভবনে ইলম শিক্ষাদান করা হয়। এটি কি সীরাতের বাইরের রেওয়াজি পদ্ধতি?

আহনাফ বিন আলী আহমদ, পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা।

উত্তর :

بسم الله الرحمن الرحيم

সীরাতের কোনো ঘটনা বা বর্ণনা দ্বারা কোনো বিধান প্রমাণ করতে হলে বেশ কিছু বিষয় লক্ষ্য করা জরুরি। তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দুটি :

এক

সীরাতের সংশ্লিষ্ট ঘটনা বা বর্ণনাটি নির্ভরযোগ্য কি না? তার সনদের মান প্রমাণ হিসেবে পেশ করার মতো কি না। কেননা, সীরাতের যে বর্ণনা সনদের বিচারে প্রমাণিত নয়, সেটা তো সীরাতের অংশই নয়।

দুই

সীরাতের সংশ্লিষ্ট ঘটনা বা বর্ণনা দ্বারা যে বিধানকে প্রমাণ করা হচ্ছে, বাস্তবে কি তা আলোচিত বিধানকে নির্দেশ করে? করলে সেটি কোন্ প্রকার এবং কোন্ পর্যায়ের নির্দেশ? সীরাতের কোনো বর্ণনা দ্বারা বিধান প্রমাণ করার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিষয়টির গুরুত্ব প্রথম বিষয় থেকে কোনো অবস্থাতেই কম নয়। কেননা উসূলে ফিকহের সঠিক জ্ঞানের অভাবে কেউ কেউ মনে করেন, সীরাতের মধ্যে যা কিছু আছে, তা অবশ্যই সুন্নত। অথচ সঠিক কথা হল, সীরাত দ্বারা যা প্রমাণিত, তা অবশ্যই শরীয়তের বিধান। কিন্তু তা কোন্ প্রকারের এবং কোন্ পর্যায়ের বিধান, তা কি সুন্নত-মুস্তাহাব না মুবাহ, সাধারণ বিধান না বিশেষ অবস্থার বিধান, সুন্নত হিসাবে করা হয়েছিল না ওযরের কারণে, শুধু বৈধতা বর্ণনার জন্য করা হয়েছিল, না শুধু অভ্যাসগতভাবে করা হয়েছিল- ইত্যাদি অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম দিক আছে, যেগুলোর গভীরে পৌঁছা এবং সমাধান দেওয়া মুজতাহিদ ও ফকীহগণের কাজ। তাই এসব বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের ফতোয়া এবং আমলকেও সামনে রাখা জরুরি।

যদি কোনো ব্যক্তি উসূলে ফিকহে পারদর্শী না হয় এবং ফিকহ-ফুকাহার সহযোগিতা গ্রহণ না করেই ইজতিহাদ আরম্ভ করে দেয় এবং সীরাত থেকে উসূল ও বিধান উদ্ঘাটন করতে থাকে তবে সে নিজের অজান্তেই সীরাত অনুসরণের শিরোনামে সুন্নাহ বিরোধিতায় লিপ্ত হবে এবং বিদআত আবিষ্কার করতে থাকবে। হয়ত কখনো কোনো একটি মুবাহ বা বৈধ বিষয়কে খেলাফে সীরাত বলে দেবে। আবার অন্য কোনো মুবাহকে সরাসরি সীরাত বানিয়ে দেবে, যা নিঃসন্দেহে বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটেছে। হযরত মাওলানা সা‘দ সাহেবের দাবি হল, সাহাবায়ে কেরাম সর্র্বদা মসজিদেই ইলমের চর্চা করতেন। তিনি দলীল হিসাবে সীরাতের ঐসকল বর্ণনা পেশ করে থাকেন, যেসব বর্ণনায় মসজিদের মধ্যে সাহাবীদের তালীম-তাআল্লুমের কথা বর্ণিত হয়েছে। মসজিদের মধ্যেই সর্বদা ইলম চর্চা হওয়া কাম্য- এমন দাবি করে শুধু এইসকল বর্ণনা দেখেই যদি মনে করা হয়, তার দাবি প্রমাণিত হয়ে গেছে, তাহলে সেটা ভুল হবে। কারণ সীরাতের এসব বর্ণনায় শুধু এতটুকু আছে যে, সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে ইলম চর্চা করতেন, কিন্তু সবসময় মসজিদেই করতেন, এটা তো বলা হয়নি।

তেমনি একথাও বলা হয়নি যে, তারা মসজিদের বাইরে, অন্যত্র দ্বীনী ইলমের চর্চা করতেন না। অনুরূপভাবে, কারো দাবি যদি এই হয় যে, দ্বীনী তালীম-তাআল্লুম মসজিদেই হওয়া সুন্নত এবং মসজিদের বাইরে হওয়া খেলাফে সুন্নত। এরপর দলীল হিসাবে পূর্বোল্লেখিত বর্ণনাসমূহ পেশ করেন তাহলে যদিও তিনি সীরাতের সঠিক বর্ণনাই পেশ করছেন, কিন্তু এসকল বর্ণনা তার দাবি প্রমাণ করে না। কেননা সীরাতের এসব বর্ণনা দ্বারা মসজিদে দ্বীনী ইলমের চর্চার বিষয়টি প্রমাণিত হয়, কিন্তু তা মুবাহ নাকি সুন্নাহ্র বিভিন্নতা। সুন্নত হলে তা মুআক্কাদাহ না মুস্তাহাব এসব বিষয়ে এসকল বর্ণনা নিশ্চুপ।

এসবের জন্য অন্যান্য দলীল ও আলামতের প্রয়োজন হয়, যা ফকিহগণের দৃষ্টিতে থাকে। কিন্তু অদূরদর্শী লোকেরা দাবি ও দলীলের মাঝে সামান্য মিল দেখলেই মনে করে তাদের গোটা দাবি প্রমাণিত হয়ে গেছে। অথচ বাস্তবতা হল, নবী-যুগে এবং সাহাবাযুগে যেমনিভাবে মসজিদে ইলমের চর্চা হত তেমনি মসজিদের বাইরে অন্যত্রও ব্যাপকভাবে ইলমের চর্চা হত। এই মর্মে হাদীস ও সীরাতের কিতাবসমূহে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। সুতরাং এটাকে সীরাত পরিপন্থী বা রেওয়াজি পদ্ধতি আখ্যায়িত করার বৈধতা কারো নেই।

উপরোক্ত বক্তব্য প্রদানকারীরা যদি হযরতজী ইউসুফ ছাহেব রাহ. সংকলিত “حياة الصحابة” (হায়াতুস সাহাবা) কিতাবটিই একটু বুঝে-শুনে পড়তেন তাহলে নিজেরাই এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা পেয়ে যেতেন। নিচে উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরা হল :

হযরত আবু উবায়দা রাহ. বলেন-

أَنّ ابْنَ مَسْعُودٍ كَانَ إِذَا أَصْبَحَ أَتَاهُ النّاسُ إِلَى دَارِهِ، فَيَقُولُ: عَلَى مَكَانِكُمْ ، ثُمّ يَمُرّ بِالذِينَ يُقْرِئُهُمُ الْقُرْآنَ فَيَقُولُ: أَيَا فُلَانٍ بِأَيِّ سُورَةٍ أَنْتَ؟ فَيُخْبِرُهُ، فَيَقُولُ: فِي أَيِّ آيَةٍ؟ فَيُخْبِرُهُ، فَيَفْتَحُ عَلَيْهِ الْآيَةَ الّتِي تَلِيهَا، ثُمّ يَقُولُ: تَعَلّمْهَا فَإِنّهَا خَيْرٌ لَكَ مِمّا بَيْنَ السّمَاءِ وَالْأَرْضِ، قَالَ: فَيَظُنّ الرّجُلُ أَنّهُ لَيْسَ فِي الْقُرْآنِ آيَةٌ خَيْرٌ مِنْهَا، ثُمّ يَمُرّ بِالْآخَرِ فَيَقُولُ لَهُ مِثْلَ ذَلِكَ، حَتّى يَقُولَ ذَلِكَ لِكُلِّهِمْ.

প্রতিদিন সকালে লোকজন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর বাড়িতে আসত। তখন তিনি বলতেন, তোমরা নিজ নিজ জায়গায় বসে যাও। অতঃপর যাদেরকে তিনি কুরআন শিক্ষা দিতেন। তাদের নিকটে এসে বলতেন, হে অমুক! তুমি কোন্ সূরা পর্যন্ত শিখেছ? সে আয়াত উল্লেখ করলে তিনি তাকে পরবর্তী আয়াত বলে দিতেন। তারপর বলতেন, এই আয়াত শিখে নাও। এটা তোমার জন্য আসমান ও যমিনের মধ্যে যা কিছু আছে তার থেকে অধিক উত্তম। এভাবে প্রত্যেক আয়াতের ব্যাপারে মনে হত যে, এর চেয়ে উত্তম কুরআন মাজীদে আর কোনো আয়াত নেই। এভাবে প্রত্যেকের নিকট গিয়ে আয়াত শিক্ষা দিতেন এবং এ কথাগুলো বলতেন। -আল মুজামুল কাবীর, তবারনী, হাদীস ৮৬৬২

নুরুদ্দিন হাইছামী রাহ. বলেন, এই বর্ণনার সকল রাবীগণ নির্ভরযোগ্য। মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৭/১৬৭

এই রেওয়ায়েতের মধ্যে আমরা স্পষ্ট  দেখতে পেলাম যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর ঘরে প্রত্যেক সকালে কুরআনের মজলিস হত এবং তিনি নিজেই লোকদেরকে কুরআনুল কারীম শিক্ষা দিতেন। তারা জানলে হয়ত অবাক হবেন, এই ঘটনাটি হায়াতুস সাহাবায়ও বিদ্যমান। (দেখুন, মুআসসাতুর রিসালা থেকে প্রকাশিত হায়াতুস সাহাবা ৪/৩০১, দারুল কিতাব থেকে প্রকাশিত বাংলা হায়াতুস সাহাবা ৪/৫৯৩-৯৪)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. যখন দ্বীনী উলূমের সকল শাখায় পারদর্শিতা অর্জন করলেন এবং সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হলেন তখন তিনি নিজ বাসস্থানেই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান বিতরণ করতেন এবং সর্বসাধারণের প্রশ্নের জবাব দিতেন। সেই অবস্থা চিত্রায়িত হয়েছে হযরত আবু সালেহ রাহ.-এর বক্তব্যে। তিনি বলেন-

قَالَ: لَقَدْ رَأَيْتُ مِن ابْنِ عَبّاسٍ مَجْلِسًا لَوْ أَنّ جَمِيعَ قُرَيْشٍ فَخَرَتْ بِهِ لَكَانَ لَهَا فَخْرًا، لَقَدْ رَأَيْتُ النّاسَ اجْتَمَعُوا حَتّى ضَاقَ بِهِمُ الطّرِيقُ، فَمَا كَانَ أَحَدٌ يَقْدِرُ عَلَى أَنْ يَجِيءَ وَلَا يَذْهَبَ، قَالَ: فَدَخَلْتُ عَلَيْهِ فَأَخْبَرْتُهُ بأَنّهُمْ عَلَى بَابِهِ، فَقَالَ لِي: ضَعْ لِي وَضُوءًا، قَالَ: فَتَوَضّأَ وَجَلَسَ، وَقَالَ لِي: اخْرُجْ وَقُلْ لَهُمْ: مَنْ كَانَ يُرِيدُ أَنْ يَسْأَلَ عَنِ الْقُرْآنِ وَحُرُوفِهِ وَمَا أَرَادَ مِنْهُ أَنْ يَدْخُلَ، قَالَ: فَخَرَجْتُ فَآذَنْتُهُمْ، فَدَخَلُوا حَتّى مَلَئُوا الْبَيْتَ وَالْحُجْرَةَ، قَالَ: فَمَا سَأَلُوهُ عَنْ شَيْءٍ إِلّا أَخْبَرَهُمْ عَنْهُ وَزَادَهُمْ مِثْلَ مَا سَأَلُوا عَنْهُ أَوْ أَكْثَرَ، ثُمّ قَالَ: إِخْوَانُكُمْ ، قَالَ: فَخَرَجُوا، ثُمّ قَالَ لِي: اخْرُجَ فَقُلْ مَنْ أَرَادَ أَنْ يَسْأَلَ عَنِ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ وَالْفِقْهِ فَلْيَدْخُلْ، فَخَرَجْتُ فَقُلْتُ لَهُمْ، قَالَ: فَدَخَلُوا حَتّى مَلَئُوا الْبَيْتَ وَالْحُجْرَةَ، فَمَا سَأَلُوهُ عَنْ شَيْءٍ إِلّا أَخْبَرَهُمْ بِهِ وَزَادَهُمْ مِثْلَهُ، ثُمّ قَالَ: إِخْوَانُكُمْ ، قَالَ: فَخَرَجُوا، ثُمّ قَالَ لِي: اخْرُجْ فَقُلْ: مَنْ أَرَادَ أَنْ يَسْأَلَ عَنِ الْفَرَائِضِ وَمَا أَشْبَهَهَا فَلْيَدْخُلْ، قَالَ: فَخَرَجْتُ، فَآذَنْتُهُمْ، فَدَخَلُوا حَتّى مَلَئُوا الْبَيْتَ وَالْحُجْرَةَ، فَمَا سَأَلُوهُ عَنْ شَيْءٍ إِلّا أَخْبَرَهُمْ بِهِ وَزَادَهُمْ مِثْلَهُ، ثُمّ قَالَ: إِخْوَانُكُمْ، قَالَ: فَخَرَجُوا، ثُمّ قَالَ لِي: اخْرُجْ فَقُلْ: مَنْ أَرَادَ أَنْ يَسْأَلَ عَنِ الْعَرَبِيّةِ وَالشِّعْرِ وَالْغَرِيبِ مِنَ الْكَلَامِ فَلْيَدْخُلْ قَالَ: فَدَخَلُوا حَتّى مَلَئُوا الْبَيْتَ وَالْحُجْرَةَ، فَمَا سَأَلُوهُ عَنْ شَيْءٍ إِلّا أَخْبَرَهُمْ بِهِ وَزَادَهُمْ مِثْلَهُ، قَالَ أَبُو صَالِحٍ: فَلَوْ أَنّ قُرَيْشًا كُلّهَا فَخَرَتْ بِذَلِكَ لَكَانَ فَخْرًا لَهَا، قَالَ: فَمَا رَأَيْتُ مِثْلَ هَذَا لِأَحَدٍ مِنَ النّاسِ.

আমি ইবনে আব্বাসের মজলিস দেখেছি। সমস্ত কুরাইশগণ যদি ঐ মজলিস নিয়ে গর্ব করে তবে তা অবশ্যই তাদের জন্য গর্বের বিষয়। আমি এত লোক একত্রিত হতে দেখেছি যে, রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। ফলে লোকদের যাতায়াত করতে কষ্ট হচ্ছিল। অতঃপর আমি ইবনে আব্বাস রা.-এর ঘরে প্রবেশ করলাম এবং তাঁর ঘরের দুয়ারে লোকজনের উপস্থিতির কথা জানালাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, আমার জন্য অযুর পানি নিয়ে আসো। অতঃপর তিনি অযু করে নিজ আসনে বসে বললেন, যাও লোকজনকে বল, যে ব্যক্তি কুরআনের বিভিন্ন কেরাত এবং তার ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে চায় সে যেন প্রবেশ করে। তিনি বলেন, আমি বের হয়ে লোকদেরকে সংবাদ দিলাম। তখন এত লোক প্রবেশ করল যে, ঘর এবং হুজরা ভরে গেল। তারা যা কিছু জিজ্ঞাসা করল তিনি তার উত্তর দিলেন। এবং তাদের প্রশ্নের বাইরে আরো অনেক কিছু বললেন। অতঃপর বললেন, তোমাদের পরবর্তী ভাইদের জন্য জায়গা ছেড়ে দাও। এবার বললেন, বাইরে গিয়ে বল, যারা হালাল-হারাম এবং ফিকহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে চায় তারা যেন ভিতরে প্রবেশ করে। আমি বাইরে এসে লোকদেরকে বললাম। তখন এত অধিকসংখ্যক লোক ভিতরে প্রবেশ করল যে, ঘর এবং হুজরা ভরে গেল।…

অতঃপর তিনি বললেন, বাইরে গিয়ে বল, যারা ফারায়েয ও অন্যান্য বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে চায় তারা যেন প্রবেশ করে। তিনি বলেন, আমি বাইরে গিয়ে ঘোষণা দিলাম, ফলে এত অধিক পরিমাণ লোক প্রবেশ করল যে, ঘর এবং হুজরা ভরে  গেল।…

এবার বললেন, বাইরে গিয়ে বল, যারা আরবী ভাষা, কবিতা এবং দুর্বোধ্য শব্দ-বাক্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে চায় তারা যেন ভিতরে প্রবেশ করে। তিনি বললেন, এত লোক ভিতরে প্রবেশ করল যে, ঘর ও হুজরা পরিপূর্ণ হয়ে গেল।…

আবু সালেহ বলেন, সমস্ত কুরাইশগণ যদি ঐ মজলিস নিয়ে গর্ব করে তবে তা অবশ্যই তাদের জন্য গর্বের বিষয়। আমি অন্য কারো এমন মজলিস হতে দেখিনি। -মুসতাদরাকে হাকেম ৩/৫৩৮, হাদীস ৬৪০৩; হিলইয়াতুল আউলিয়া ১/৩২০

এই বর্ণনা হায়াতুস সাহাবা কিতাবেও আছে। (দেখুন, হায়াতুস সাহাবা, খ. ৪, পৃ. ২৭৭। আরো দেখুন, দারুল কিতাব থেকে প্রকাশিত বাংলা হায়াতুস সাহাবা, খ. ৪, পৃ. ৫৬৪-৫৬৪) উপরোক্ত বর্ণনায় আমরা স্পষ্ট দেখতে পেলাম যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর এই শানদার ইলমী মজলিসগুলো কিন্তু মসজিদের পরিবর্তে তার নিজ বাসস্থানেই হয়েছে।

عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَامِتِ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يُشْغَلُ، فَإِذَا قَدِمَ رَجُلٌ مُهَاجِرٌ عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ دَفَعَهُ إِلَى رَجُلٍ مِنّا يُعَلِّمُهُ الْقُرْآنَ، فَدَفَعَ إِلَيّ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ رَجُلًا، فَكَانَ مَعِي فِي الْبَيْتِ أُعَشِّيهِ عَشَاءَ أَهْلِ الْبَيْتِ، فَكُنْتُ أُقْرِئُهُ الْقُرْآنَ.

হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতেন। ফলে যখন কোনো ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হিজরত করে আসত তখন তিনি ঐ ব্যক্তিকে আমাদের কারো নিকট সোপর্দ করতেন। সে তাকে কুরআন শিক্ষা দিত। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এক ব্যক্তিকে সোপর্দ করলেন। সে আমার সাথে একই ঘরে থাকত। আমি তাকে রাতের বেলায় ঘরের খাবার খাওয়াতাম। অতঃপর তাকে কুরআন শিক্ষা দিতাম। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৭৬৬; মুসতাদরাকে হাকেম ৩/৩৫৬)

শায়েখ শুআইব আলআরনাউত মুসনাদে আহমাদের টীকায় এই হাদীসের সনদকে হাসান বলেছেন।

এই বর্ণনার মধ্যেও স্পষ্ট দেখা গেল যে, হযরত উবাদাহ ইবনে সামেত রা. উক্ত ব্যক্তিকে নিজ ঘরেই কুরআন শিক্ষা দিতেন। ঐ বন্ধুদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, এই রেওয়ায়েত হায়াতুস সাহাবা কিতাবেও আছে। (দেখুন, হায়াতুস সাহাবা, খ. ৪, পৃ. ৩০৭, দারুল কিতাব থেকে প্রকাশিত বাংলা হায়াতুস সাহাবা, খ. ৪, পৃ. ৬০০)

عَنِ ابْنِ عَبّاسٍ، قَالَ: لَمّا قُبِضَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ قُلْتُ لِرَجُلٍ مِنَ الْأَنْصَارِ: هَلُمّ فَلْنَسْأَلْ أَصْحَابَ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ فَإِنّهُمُ الْيَوْمَ كَثِيرٌ، فَقَالَ: وَاعَجَبًا لَكَ يَا ابْنَ عَبّاسٍ، أَتَرَى النّاسَ يَفْتَقِرُونَ إِلَيْكَ وَفِي النّاسِ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ مَنْ فِيهِمْ، قَالَ: فَتَرَكْتُ ذَاكَ وَأَقْبَلْتُ أَسْأَلُ أَصْحَابَ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، وَإِنْ كَانَ يَبْلُغُنِي الْحَدِيثُ عَنِ الرّجُلِ فَآتِي بَابَهُ وَهُوَ قَائِلٌ فَأَتَوَسّدُ رِدَائِي عَلَى بَابِهِ يَسْفِي الرِّيحُ عَلَيّ مِنَ التّرَابِ فَيَخْرُجُ فَيَرَانِي فَيَقُولُ: يَا ابْنَ عَمِّ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ مَا جَاءَ بِكَ؟ هَلّا أَرْسَلْتَ إِلَيَّ فَآتِيَكَ؟ فَأَقُولُ: لَا، أَنَا أَحَقّ أَنْ آتِيَكَ، قَالَ: فَأَسْأَلُهُ عَنِ الْحَدِيثِ، فَعَاشَ هَذَا الرّجُلُ الْأَنْصَارِيّ حَتّى رَآنِي وَقَدِ اجْتَمَعَ النّاسُ حَوْلِي يَسْأَلُونِي، فَيَقُولُ: هَذَا الْفَتَى كَانَ أَعْقَلَ مِنِّي.

হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করলেন তখন আমি এক আনসারী ব্যক্তিকে বললাম, এসো আমরা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের জিজ্ঞাসা করে ইলম হাসিল করি। কেননা এখনো তারা অনেকে জীবিত আছেন। তখন সে বলল, হে ইবনে আব্বাস! তোমাকে নিয়ে বড় আশ্চর্যবোধ করি! তুমি কি মনে কর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এত সাহাবী জীবিত থাকতে লোকেরা তোমার মুখাপেক্ষী হবে? তিনি বলেন, আমি তাকে ছেড়ে নিজেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা আরম্ভ করলাম। আমি যদি কারো সম্পর্কে জানতাম যে, তার নিকট কোনো হাদীস আছে তবে তার ঘরের দুয়ারে উপস্থিত হয়ে যেতাম। কখনো এমন হত যে, তিনি দ্বিপ্রহরে তার ঘরে আরাম করছেন তখন আমি তার ঘরের দুয়ারে চাদর মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে পড়তাম। বাতাসে ধুলোবালি উড়ে আমার গায়ে পড়ত। অতঃপর যখন তিনি বের হয়ে আমাকে দেখতেন তখন বলতেন, হে আল্লাহ্র রাসূলের চাচাতো ভাই! কী মনে করে আসলেন? খবর পাঠালে আমিই তো চলে আসতাম। তখন আমি বলতাম, না, আমিই আপনার নিকট উপস্থিত হওয়ার অধিক উপযুক্ত। অতঃপর আমি তাকে হাদীস জিজ্ঞাসা করতাম।

ঐ আনসারী ব্যক্তি অনেকদিন জীবিত ছিলেন। অবশেষে এমন সময় এল যখন সে আমাকে দেখল এমন অবস্থায় যে, আমার চারপাশে অনেক লোক একত্র হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করছে, তখন সে বলল, এই যুবক আমার চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান ছিল। -সুনানে দারেমী, হাদীস ৫৭০; আলমুজামুল কাবীর, তবারানী হাদীস ১০৫৯২; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৩৬৩

ইমাম হাকেমসহ একাধিক মুহাদ্দিস এই রেওয়ায়েতকে সহীহ বলেছেন।

উপরোক্ত ঘটনাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে যে, হযরত ইবনে আব্বাস রা. প্রবীণ সাহাবীদের ঘরে ঘরে উপস্থিত হয়ে হাদীসের ইলম হাসিল করতেন। এভাবেই একসময় তিনি অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। এই বর্ণনাটিও হায়াতুস সাহাবা কিতাবে বিদ্যমান। (দেখুন, হায়াতুস সাহাবা খ. ৪, পৃ. ২২০, দারুল কিতাব থেকে প্রকাশিত বাংলা হায়াতুস সাহাবা, খ. ৪, পৃ. ৪৯৬-৪৯৭)

হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

بَلَغَنِي حَدِيثٌ عَنْ رَجُلٍ سَمِعَهُ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ فَاشْتَرَيْتُ بَعِيرًا، ثُمّ شَدَدْتُ عَلَيْهِ رَحْلِي، فَسِرْتُ إِلَيْهِ شَهْرًا، حَتّى قَدِمْتُ عَلَيْهِ الشّامَ فَإِذَا عَبْدُ اللهِ بْنُ أُنَيْسٍ، فَقُلْتُ لِلْبَوّابِ: قُلْ لَهُ: جَابِرٌ عَلَى الْبَابِ، فَقَالَ ابْنُ عَبْدِ اللَّهِ؟ قُلْتُ: نَعَمْ، فَخَرَجَ يَطَأُ ثَوْبَهُ فَاعْتَنَقَنِي، وَاعْتَنَقْتُهُ، فَقُلْتُ: حَدِيثًا بَلَغَنِي عَنْكَ أَنّكَ سَمِعْتَهُ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ فِي الْقِصَاصِ، فَخَشِيتُ أَنْ تَمُوتَ، أَوْ أَمُوتَ قَبْلَ أَنْ أَسْمَعَهُ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقُولُ: يُحْشَرُ النّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ – أَوْ قَالَ: الْعِبَادُ – عُرَاةً غُرْلًا بُهْمًا  قَالَ: قُلْنَا: وَمَا بُهْمًا؟ قَالَ: لَيْسَ مَعَهُمْ شَيْءٌ.

একবার আমি জানতে পারলাম, এক ব্যক্তির কাছে একটি হাদীস আছে, যা সে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে শুনেছে। আমি একটি উট ক্রয় করে তার উপর হাওদা বাঁধলাম এবং এক মাসের পথ সফর করে শামে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছে জানতে পারলাম, সে ব্যক্তিটি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইস রা.। আমি দ্বাররক্ষীকে বললাম, তাকে গিয়ে বল, জাবের দরজায় অপেক্ষমান। তিনি বললেন, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ! আমি বললাম, হাঁ। তিনি কাপড় জড়াতে জড়াতে বের হয়ে এসে আমার সাথে মুআনাকা করলেন। আমি বললাম, আমি জানতে পেরেছি, কিয়ামতের দিন প্রতিদান সম্পর্কিত বিষয়ে আপনার কাছে একটি হাদীস রয়েছে, যা আপনি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শুনেছেন। তাই আমি আশংকা করলাম, এই হাদীস শোনার পূর্বেই আপনার অথবা আমার মৃত্যু না হয়ে যায়। তিনি বললেন, আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন মানুষকে বস্ত্রহীন, খতনাবিহীন, বুহ্ম অবস্থায় উঠাবেন। আমরা বললাম, বুহ্ম অর্থ কী? তিনি বললেন, তাদের নিকট কিছুই থাকবে না।… -আলআদাবুল মুফরাদ, হাদীস ৯৭০; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৬০৪২; মুসতাদরাকে হাকেম ৪/৫৭৪

শায়েখ শুআইব আলআরনাউত মুসনাদে আহমাদের টীকায় এই হাদীসের সনদকে হাসান বলেছেন।

উপরোক্ত ঘটনাতেও আমরা দেখতে পেলাম, হযরত জাবের রা. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইস রা.-এর ঘরে গিয়ে এই হাদীসের ইলম অর্জন করেছেন। হযরতজী ইউসুফ ছাহেব রাহ. এই ঘটনাটিও তাঁর কিতাব হায়াতুস সাহাবাতে সংকলন করেছেন।

(দেখুন, হায়াতুস সাহাবা ৪/২৬৩, দারুল কিতাব থেকে প্রকাশিত বাংলা হায়াতুস সাহাবা ৪/৫৫০)

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبّاسٍ، عَنْ عُمَرَ، قَالَ: كُنْتُ أَنَا وَجَارٌ لِي مِنَ الأَنْصَارِ فِي بَنِي أُمَيّةَ بْنِ زَيْدٍ وَهِيَ مِنْ عَوَالِي المَدِينَةِ وَكُنّا نَتَنَاوَبُ النّزُولَ عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، يَنْزِلُ يَوْمًا وَأَنْزِلُ يَوْمًا، فَإِذَا نَزَلْتُ جِئْتُهُ بِخَبَرِ ذَلِكَ اليَوْمِ مِنَ الوَحْيِ وَغَيْرِهِ، وَإِذَا نَزَلَ فَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ، فَنَزَلَ صَاحِبِي الأَنْصَارِيّ يَوْمَ نَوْبَتِهِ، فَضَرَبَ بَابِي ضَرْبًا شَدِيدًا، فَقَالَ: أَثَمّ هُوَ؟ فَفَزِعْتُ فَخَرَجْتُ إِلَيْهِ، فَقَالَ: قَدْ حَدَثَ أَمْرٌ عَظِيمٌ…

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হযরত ওমর রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি এবং আমার বনু উমাইয়া ইবনে যায়েদ গোত্রের এক আনসারী প্রতিবেশী, আমরা পর্যায়ক্রমে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হতাম; একদিন সে উপস্থিত হত, আরেকদিন আমি উপস্থিত হতাম। যেদিন আমি উপস্থিত হতাম, সেদিনের ওহী এবং অন্যান্য বিষয় তার নিকট এসে বলতাম। আর যেদিন সে উপস্থিত হত সেদিন সেও একই কাজ করত। একদিন আমার আনসারী প্রতিবেশী তার পালার দিন এসে আমার দরজায় প্রচ- কড়াঘাত করল এবং বলল, ঘরে তিনি আছেন? আমি আতঙ্কিত হয়ে বেরিয়ে এলাম। সে বলল, বড় একটা ঘটনা ঘটেছে।… -সহীহ বুখারী, হাদীস ৮৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৭৯

উপরোক্ত ঘটনায় স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত ওমর রা. এবং তাঁর আনসারী প্রতিবেশী নিজেদের ঘরে ইলমে ওহীর চর্চা করতেন। দ্বিতীয় হযরতজী মাওলানা ইউসুফ রাহ. তাঁর কিতাবেও এই ঘটনা নকল করেছেন। (দেখুন, হায়াতুস সাহাবা, খ. ৪, পৃ. ২৫৩ আর দারুল কিতাব থেকে প্রকাশিত বাংলা হায়াতুস সাহাবা, খ. ৪, পৃ. ৫৩৯)

সাহাবাযুগে শিশুদের জন্য ভিন্ন মক্তবব্যবস্থাও ছিল

সাহাবাযুগে যেমনিভাবে মসজিদের বাইরে অন্যত্রও ব্যাপকভাবে ইলমের হালকা হত ঠিক তেমনি শিশুদেরকে কুরআনুল কারীম এবং দ্বীনী তালীম দেওয়ার জন্য ভিন্ন মক্তব-ব্যবস্থাও ছিল।

১ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন-

كان أبو بكر رضي الله عنه يعلمنا التشهد على المنبر كما يعلم المعلم الغلمان في المكتب.

হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. আমাদেরকে মিম্বারের উপর বসে তাশাহহুদ শিক্ষা দিতেন যেমনিভাবে শিক্ষক শিশুদেরকে মক্তবে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। -ত্বহাবী শরীফ খ. ১, পৃ. ২৬৪ মুসনাদে মুসাদ্দাদ ইবনে মুসারহাদ সূত্রে আল মাত্বালিবুল আলিয়াহ, হাদীস ৫২

এই বর্ণনা হায়াতুস সাহাবাতেও রয়েছে। খ. ৪, পৃ. ২৪২; দারুল কিতাব থেকে প্রকাশিত বাংলা হায়াতুস সাহাবা ৪/৫২২

২. হযরত আনবাসা রাহ. বলেন-

رَأَيْتُ ابْنَ عُمَرَ يُسَلِّمُ عَلَى الصِّبْيَانِ فِي الْكُتّابِ.

আমি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে দেখেছি তিনি মক্তবে শিশুদেরকে সালাম দিতেন। -আলআদাবুল মুফরাদ, হাদীস ১০৪৪

এসব রেওয়ায়েত প্রমাণ করে, প্রচলিত মক্তব-ব্যবস্থার গোড়াপত্তন সাহাবায়ে কেরামের যামানাতেই হয়েছে।

সুফফা কি শুধুই কিয়ামগাহ বা অবস্থানস্থল ছিল?

‘দ্বীনী তালিম সর্বদা মসজিদে হওয়াই কাম্য’- এই বিষয়টিকে জোরালোভাবে প্রমাণ করতে গিয়ে মাওলানা সা‘দ সাহেব আরেকটি কথা প্রায়ই বলে থাকেন, তিনি বলেন, ‘মসজিদে নববী সংলগ্ন সুফফায় যেসকল সাহাবী কিয়াম বা অবস্থান করতেন তাঁদেরকেও সুফফায় দ্বীনী ইলম শিক্ষা দেওয়া হত না; বরং মসজিদের মধ্যেই শিক্ষা দেওয়া হত। সুফফা শুধু তাদের কিয়ামগাহ বা অবস্থানস্থল ছিল। তবে দরসগাহ বা শেখা-শেখানোর জায়গা ছিল না।’

এটা বাস্তবতাবিরোধী কথা। সঠিক কথা হল, আসহাবে সুফফা সাহাবীগণকে মসজিদের পাশাপাশি সুফফাতেও দ্বীনী তালীম দেয়া হত। এমর্মেও হাদীস ও সীরাতের কিতাবে বেশ কিছু বর্ণনা রয়েছে।

হযরত আওস ইবনে আবী আওস রা. বলেন-

إِنّا لَقُعُودٌ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ فِي الصّفّةِ، وَهُوَ يَقُصّ عَلَيْنَا وَيُذَكِّرُنَا إِذْ جَاءَهُ رَجُلٌ فَسَارّهُ، فَقَالَ اذْهَبُوا فَاقْتُلُوهُ قَالَ: فَلَمّا وَلّى الرّجُلُ، دَعَاهُ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ قَالَ: أَيَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ قَالَ الرّجُلُ: نَعَمْ، نَعَمْ يَا رَسُولَ اللهِ، فَقَالَ: اذْهَبُوا فَخَلّوا سَبِيلَهُ، فَإِنّمَا أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النّاسَ حَتّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ حُرِّمَتْ عَلَيّ دِمَاؤُهُمْ، وَأَمْوَالُهُمْ، إِلّا بِحَقِّهَا.

আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সুফফায় বসা ছিলাম, আর তিনি আমাদের সামনে বিভিন্ন বিষয় বর্ণনা করছিলেন এবং উপদেশ দিচ্ছিলেন।…(একপর্যায়ে) বলেন,

নিশ্চয় আমি আদিষ্ট হয়েছি- মানুষের সাথে লড়াই করব, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই। যখন তারা এই কাজ করবে তখন ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া তাদের জান-মাল আমার জন্য হারাম হয়ে যাবে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৬১৬৩

শায়েখ শুআইব আলআরনাউত এই হাদীসের সনদকে সহীহ বলেছেন।

সুতরাং সুফফা যেমনিভাবে সাহাবায়ে কেরামের কিয়ামগাহ বা অবস্থানস্থল ছিল, ঠিক তদ্রƒপ তাদের দরসগাহ বা শিক্ষাঙ্গনও ছিল।

মোটকথা, নবী-যুগ এবং সাহাবা-যুগে মসজিদের পাশাপাশি অন্যত্রও ব্যাপকভাবে ইলমের চর্চা জারি ছিল। এখানে তো শুধু হায়াতুস সাহাবা কিতাব থেকে কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হল। হাদীস ও সীরাতের অন্যান্য কিতাবসমূহের উদ্ধৃতি তো এখানে আনাই হয়নি। বরং হায়াতুস সাহাবারও এ বিষয়ক সকল বর্ণনা এখানে উল্লেখ করা হয়নি।

আমাদের বুঝে আসে না, সীরাতে রাসূল, সীরাতে সাহাবায় অসংখ্য উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তারা বলেন, মসজিদের বাইরে দ্বীনী ইলমের চর্চা করা সীরাতের পরিপন্থী বা রেওয়াজি পদ্ধতি!

আমাদের এতাআতী বন্ধুরা অনেকসময় বলে থাকেন, মাওলানা সা‘দ সাহেব তাবলীগের এই মেহনতকে সীরাতের উপর ওঠাচ্ছেন। অথচ সীরাতের এমন অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত অধ্যয়নের ভিত্তিতে যদি তাবলীগের এই মেহনতে তাজদীদ বা সংস্কার করা হয় তবে নিঃসন্দেহে এই মেহনত সীরাতের উপর ওঠার পরিবর্তে সীরাতের আদর্শ থেকে আরো বিচ্যুত হয়ে পড়বে। আলোচিত বিষয়ে আমরা এমনটি দেখতে পেলাম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক উপলব্ধি দান করুন- আমীন!

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
মাওলানা আবূ হাসসান রাইয়্যান

পরিচালক, মাদরাসাতুর রাইয়্যান, মিরপুর ঢাকা।

আরও জানুন

ইতিকাফকারী কী ওজরের কারণে মসজিদের বাইরে যেতে পারবে?

প্রশ্ন ইতিকাফকারী কী ওজরের কারণে মসজিদের বাইরে যেতে পারবে? বিস্তারিত জানালে কৃতার্থ হবো। উত্তর بسم …

One comment

  1. অসাধারণ আলোচনা। আল্লাহ আপনাদেরকে কবুল করুন। মাওলানা সা’দ সাহেবের সব ভ্রান্তি গুলোর উপরে পর্যায়ক্রমে এরকম ইলমি আলোচনা সামনে আসলে তা উম্মতের জন্য আরও ফায়দাজনক হবে বলে আশা করি। জাযাকুমুল্লাহু খায়রান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস