হোম / আহলে হাদীস / ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর উদ্ভাবনকৃত মাসায়েল সম্পর্কে কেমন ধারণা রাখা উচিত?
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর উদ্ভাবনকৃত মাসায়েল সম্পর্কে কেমন ধারণা রাখা উচিত?

প্রশ্ন

মুফতী সাহেবের কাছে আমার জানার বিষয় হল, আমাদের দেশের কতিপয় সালাফী আলেম, যারা মক্কা বা মদীনা ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা করে এসেছেন। তারা বলতে চান যে, ইমাম আবু হানীফা রহঃ এর উদ্ভাবনকৃত মাসায়েল এর তীব্র বিরোধীতা করে থাকে। আরো সহজ করে বললে তারা হানাফী মাযহাবের তীব্র বিরোধী। হানাফী মাযহাবের মাসায়েলকে কুরআন ও হাদীস বিরোধী মতামত বলে প্রচার করে থাকে।

আমার জানার বিষয় হল, ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর ব্যক্তিত্ব ও তার উদ্ভাবনকৃত মাসায়েলে শরইয়্যাহ সম্পর্কে আমাদের কেমন ধারণা রাখা উচিত? দয়া করে যদি দলীলসহ জানাতেন, তাহলে বড়ই উপকার হতো।

আল্লাহ তাআলা আপনার ইলম ও আমলের মাঝে বরকত দান করুন।

প্রশ্নকর্তা- আমীরুল ইসলাম। ঢাকা। বাংলাদেশ।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

ইমাম আবূ হানীফা এমন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। যার ব্যাপারে পুরো দুনিয়ার মুসলমানগণ ওয়াকিফহাল। সারা দুনিয়ার মুসলমানদের আদমশুমারী অনুপাতে দুই তৃতীয়াংশ মুসলমান ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর মুকাল্লিদ।

বর্তমানে আরব বিশ্বে গায়রে মুকাল্লিদরা প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে। গায়রে মুকাল্লিদরা নিজেদের সালাফী বলে প্রচারণা করছে। এটা নিছক একটি প্রতারণা বৈ কিছু নয়। মুখে বলছে সালাফের অনুসরণের কথা। কিন্তু কাজে কর্মে তারা পুরোপুরি সালাফের বিরোধীতা করে থাকে। তারা চার মুজতাহিদ ইমামগণের বিরোধীতা করে থাকে। অথচ চার ইমামই ছিলেন সালাফ।

সালাফী নামধারী গায়রে মুকাল্লিদ ভাইরা চার ইমামের মাঝে এ উপমহাদেশে সবচে’ বেশি ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর বিরোধীতা করে থাকে। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ মুসলমানদের ইমাম আবূ হানীফা ও তার মাযহাব সম্পর্কে বদ ধারণা তৈরী করে থাকে।

অথচ ইমাম আবূ হানীফা রহঃ তাবেয়ী ছিলেন! আর সাহাবীর পর তাবেয়ীর চেয়ে সালাফ আর কে হতে পারে?

সাহাবী ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যিনি ঈমানের সাথে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সোহবত পেয়েছেন, চাই অল্প থেকে অল্প সময়ের জন্যই হোক না কেন, এবং ঈমানের সাথেই মৃত্যুবরণ করেছেন।

আর তাবেয়ী ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন একজন সাহাবীর সোহবত পেয়েছেন ঈমানের হালাতে।

আর ইমাম আবূ হানীফা রহঃ সাতজন সাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তাদের সোহবাত পেয়েছেন। সুতরাং তিনি অবশ্যই তাবেয়ীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন।

১)  হযরত আনাস বিন মালিক রাঃ। মৃত্যু ৯৩ হিজরী।

২)  হযরত আব্দুল্লাহ বিন হারিছ রাঃ।

৩)  হযরত আবুত তুফাইল আমর বির ওয়াছিলা রাঃ। মৃত্যু ১০২ হিজরী। তার সাথে মক্কায় সাক্ষাৎ হয়।

৪)  হযরত সাহল বিন সা’দ রাঃ। মৃত্যু ৮৮ হিজরী।

৫)  হযরত আব্দুল্লাহ বিন বুছর রাঃ। মৃত্যু ৯৬ হিজরী।

৬)  হযরত সায়েব বিন ইয়াযিদ খাল্লাদ রাঃ। মৃত্যু ৯১ হিজরী।

৭)  হযরত মাহমূদ বিন রবী রাঃ। মৃত্যু ৯৬ হিজরী।

তাদের  সকলের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা আওযাজুল মাসালেক এর ১ম খণ্ডের ১৮২ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত হয়েছে।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন বুছর রাঃ এর সাথে ইমাম আবূ হানীফা রহঃ বালেগ হবার পর ১৭ বছর বয়সে সাক্ষাৎ করেন। তার কাছ থেকে তিনি নিম্নোক্ত হাদীসটি শুনেনঃ

من تفقه فى دين الله كفاه همه (شرح مسند امام ابى حنيفة-585، مقدمة فتاوى تاتارخانية-39)

হযরত আবুত তুফাইল আমর বিন ওয়াছিলা রাঃ এর মৃত্যুর সময় ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর বয়স ছিল ২২ বছর।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন বুছর এবং হযরত মাহমূদ বিন রাবী রাঃ এর মৃত্যুর সময় ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর বয়স ছিল ১৬ বছর।

হযরত সায়েব বিন ইয়াযিদ খাল্লাদ রাঃ এর মৃত্যুর সময় ইমাম আবূ হানীফার বয়স ছিল এগার বছর।

হযরত সাহাল বিন সা’দ রাঃ এর মৃত্যুর সময় ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর বয়স ছিল ৮ বছর। হযরত আনাস বিন মালিক রাঃ এর মৃত্যু রাজেহ কওল মতে হয়েছিল ৯৩ হিজরীতে। [উসদুল গাবাহ-১/১৫২]

সেই হিসেবে হযরত আনাস বিন মালিক রাঃ এর মৃত্যুর সময় ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর বয়স হয়েছিল ১৩ বছর। তবে আরেকটি বক্তব্য অনুপাতে হযরত আনাস রাঃ এর মৃত্যু হয়েছিল ১০০ হিজরীতে। [উসদুল গাবাহ-১/১৫২]

হিজরতের সময় হযরত আনাস রাঃ বয়স ছিল ১০। তো সেই হিসেবে আনাস রাঃ এর মৃত্যুর সময় ইমাম আবূ হানীফার বয়স ছিল ২০ বছর। কারণ, ইমাম আবূ হানীফা রহঃ জন্মগ্রহণ করেছেন ৮০ হিজরীতে।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, ইমাম আবূ হানীফা রহঃ সুনিশ্চিতভাবেই তাবেয়ী ছিলেন। আর তাবেয়ীর বক্তব্যকেও হাদীস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কতিপয় মুহাদ্দিসগণ। দেখুন-

وَقَالَ الطِّيبِيُّ: الْحَدِيثُ أَعَمُّ مِنْ أَنْ يَكُونَ قَوْلَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالصَّحَابِيِّ وَالتَّابِعِيِّ وَفِعْلَهُمْ وَتَقْرِيرَهُمْ.

আল্লামা তীবী রহঃ বলেন, হাদীস আম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবাগণ এবং তাবেয়ীগণের কথা, কাজ ও মৌন সমর্থনকে হাদীস বলা হয়। [তাদরীবুর রাবী,  জালালুদ্দীন সুয়ূতীকৃত-১/২১]

وَكَذَلِكَ يُطلق على قَول الصَّحَابِيّ وَفعله وَتَقْرِيره وعَلى قَول التَّابِعِيّ وَفعله وَتَقْرِيره (الحطة فى ذكر الصحاح الستة-98)

এমনিভাবে সাহাবাগণের বক্তব্য, কর্ম, মৌন সমর্থন এবং তাবেয়ীর বক্তব্য, কর্ম ও মৌন সমর্থনকেও হাদীস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কেউ কেউ। [আলহিত্তাহ ফী জিকরিস সিহাহ সিত্তাহ, নবাব সিদ্দীক হাসান খান-৯৮]

সুতরাং তাবেয়ী ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর উদ্ভাবনকৃত মাসআলা শুধু ইজতিহাদী মাসআলার পর্যায়ে থাকেনি, পারিভাষিক শব্দে তা হাদীসের মর্যাদায়ও উন্নীত হয়।

সুতরাং শুধুমাত্র বিরোধীতার জন্য এভাবে ফিক্বহে হানাফীর মাসায়েলের বিরোধীতা করা পারিভাষিক হাদীসের বিরোধীতারই নামান্তর।

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক ও প্রধান মুফতী – মা’হাদুত তালীম ওয়াল  বুহুসিল ইসলামী ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম আমীনবাজার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া ফারূকিয়া দক্ষিণ বনশ্রী ঢাকা।

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

মা বাবাকে না জানিয়ে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করলে তা কি শুদ্ধ হয়?

প্রশ্ন আমি আমার অভিভাবককে না জানিয়ে দুই প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমান সাক্ষীর উপস্থিতিতে কাজি অফিসে গিয়ে …