হোম / চিকিৎসা/তদবীর / তাবীজ-তামীমা ও ঝাড়ফুঁকঃ কী বলে শরীয়ত? (২য় পর্ব)
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

তাবীজ-তামীমা ও ঝাড়ফুঁকঃ কী বলে শরীয়ত? (২য় পর্ব)

মাওলানা এমদাদুল হক

১ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন

তাবীয কি শিরক?

তাবীয ব্যবহারকারীদের মধ্যে যেমন সীমালঙ্ঘন দেখা যায়; নির্দ্বিধায় ‘মুনকার’ ও শিরকী তাবীয আদান-প্রদান ও ব্যবহার করতে দেখা যায় তেমনিভাবে কাউকে কাউকে দেখা যায়, আল্লাহর নামের যিকির, কুরআনের আয়াত বা দুআ সম্বলিত বৈধ তাবীযকে শিরক বলে বেড়াতে। শত শত তাওহীদী মুসলমানকে শিরকের দোষে দোষী সাব্যস্ত করতে।

আমরা একটু ভাবি, যারা আল্লাহর নাম-সিফাত, যিকির-আয়াত ও অন্যান্য দুআ সম্বলিত তাবীযকে শরীয়তস্বীকৃত একটি ‘মুবাহ মাধ্যম ও ওসিলা’ হিসেবে ব্যবহার করে এবং তাবীয ব্যবহারের শরয়ী শর্তাবলি যথাযথ রক্ষা করে- যেমন, একমাত্র আল্লাহ তাআলাকেই মুক্তিদাতা ও আরোগ্যদাতা মনে করে, তাবীয  বা তাবীযদাতার ব্যাপারে কোনো ধরনের অতিরঞ্জনের শিকার হয় না, তাকে মুক্তিদাতা বা আরোগ্যদাতা মনে করে না বা তার তাবীয বা তার ঝাড়ফুঁককে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রভৃতি ‘মুনকার’ বিশ্বাস রাখে না, (এবং তাবীয ব্যবহারের পাশাপাশি মাসনূন দুআ-দরূদ ও মাসনূন ঝাড়ফুঁকের প্রতিও যত্নবান থাকে) তারা কি আল্লাহর সত্তায় বা তাঁর গুণাবলীতে কাউকে শরীক করছে? স্পষ্ট যে, তারা এ ধরনের তাবীয ব্যবহার করে আল্লাহর সাথে বা তাঁর গুণাবলিতে কাউকে শরীক করছে না; বরং তাঁর দিকেই ধাবিত হচ্ছে এবং তাকেই রোগবালাই, বিপদ-মুসিবতে একমাত্র মুক্তিদাতা মনে করেই তার নাম-কালাম ব্যবহার করছে, যেমনটি ঝাড়ফুঁকের সময় করা হয়। তো  এটা একদিক থেকে তার ঈমান ও তাওহীদেরই বহিঃপ্রকাশ।

শিরকের পরিচয়, এর হাকীকত ও ভয়াবহতা সবচে বেশি বুঝতেন সাহাবায়ে কেরাম। তারপর তাঁদের অনুসারী তাবেয়ীগণ। তাঁরা নিজেরা কোনো প্রকার শিরকে লিপ্ত হবেন, কাউকে তা করতে বলবেন বা বাতলে দিবেন- তা কল্পনা করাও অসম্ভব। তাহলে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর  ইবনুল আস কীভাবে তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চাদের গায়ে তাবীয ঝুলিয়ে দিলেন! আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. কীভাবে তাবীয লিখে রোগীকে তা ধুইয়ে খাওয়াতে বললেন? তখন কি অন্য সাহাবীরা ছিলেন না? কেন তাঁরা এদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন না এবং প্রতিবাদও করলেন না; বিষয়টি যদি ঈমান-কুফরের, তাওহীদ-শিরকের ইখতিলাফ হত?

বিশিষ্ট তাবেয়ী মুজাহিদ রাহ., সাইদ ইবনুল মুসায়্যিব রাহ., সাইদ ইবনে জুবাইর রাহ. এঁরা বড় বড় বিদ্বান। বড় বড় সাহাবীগণের শিষ্য। এঁরাই সাহাবীগণের পরে সে যুগের এবং পরবর্তী যুগের বড় বড় হাদীসবিশারদ ও ফিকাহবিদ। তাওহীদ ও তাকওয়া, ইখলাস ও যুহদ, ইবাদত ও আখলাক তথা দ্বীনী ইলম ও আমলের ধারক-বাহক। তাঁরা তাবীয লিখতেন এবং তাঁদের মাঝে এর প্রচলন ছিল।

তেমনিভাবে আতা ইবনে আবি রাবাহ রাহ., দাহহাক রাহ., আবু জাফর আলবাকের রাহ., ইবনে সীরীন রাহ.-এর মত বড় বড় তাবেয়ী তাবীয লিখতেন ও ঝুলানোর অনুমতি দিতেন। দ্বীনী জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সাহাবীদের পরেই তাঁদের স্থান। এটা যদি শিরকই হত তাহলে এর প্রতিরোধে তাঁরাই হতেন উম্মাহর অগ্রজ। সাথে সাথে সাহাবা-তাবেয়ীনের ফতোয়ায় এর বৈধতা তো দূরের কথা বরং এর প্রতিরোধে তাঁরা কঠোর পদক্ষেপ নিতেন।

উপরোল্লেখিত শর্তসাপেক্ষে তাবীয যে জায়েয এবং তা যে শিরক নয় একথা প্রমাণের জন্য এসকল সাহাবা-তাবেয়ীনের আমলই যথেষ্ট। আল্লাহ আমাদের সুমতি দিন, রহম করুন। সকল বিষয়কে শরীয়তের নির্ধারিত সীমার ভেতর থেকে গ্রহণ-বর্জন করার তাওফীক দান করুন।

হাদীসে বর্ণিত তামীমা শব্দের অর্থ  তাবীয নয়

মূল প্রসঙ্গের শুরুতে আমরা একটি হাদীস উদ্ধৃত করেছি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنّ الرّقَى، وَالتّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ.

নিশ্চয় রুকইয়া, তামীমা ও তিওয়ালা শিরক। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৮৮৬

রুকইয়া হল ঝাড়ফুঁক, কিছু পড়ে কারো গায়ে দম করা, ফুঁ দেওয়া। প্রবন্ধের শুরুতে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোন ধরনের রুকইয়া (ঝাড়ফুঁক) শিরক, কোনটা মাসনূন আর কোনটা মুবাহ।

তিওয়ালা হল স্বামীকে বসে আনার মন্ত্র, জাহেলী যুগে যা শিরকে ভরপুর ছিল, ফলে তা শিরক।

আর রইল তামীমা, সেটির অর্থ কী?

আরেক হাদীসে আছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَعَلّقَ تَمِيمَةً، فَلَا أَتَمّ اللهُ لَهُ.

যে ‘তামীমা’ ঝুলায় আল্লাহ যেন তার উদ্দেশ্য পূর্ণ না করেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৪০৪

এভাবে আরো বেশ কয়েকটি হাদীসে ‘তামীমা’কে শিরক বলা হয়েছে ও এর কঠোর নিন্দা এসেছে। এই ‘তামীমা’ অর্থ কী?

যারা শরীয়তস্বীকৃত তাবীযকে শিরক বলে ফেলেন, তারা ‘তামীমা’র অর্থ মনে করেন তাবীয। আর হাদীসে তামীমাকে শিরক বলা হয়েছে সুতরাং তাবীয শিরক। গলতটা মূলত এখানেই। তাই ‘তামীমা’ শব্দের অর্থ পরিষ্কার হওয়া আবশ্যক। নি¤েœ আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ্ই তাওফীকদাতা।

‘তামায়েম’ ‘তামীমাহ’ শব্দের বহুবচন। এটি আরবী ভাষার বহু প্রাচীন শব্দ। ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়্যাতের যুগ থেকেই আরবী সাহিত্যে গদ্যে-পদ্যে বহুভাবে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামের পূর্বের প্রসিদ্ধ আরব কবি ইমরুউল কায়স তার এক কবিতায় বলেন-

فألهيتها عن ذي تمائم محول.

তেমনিভাবে পরবর্তী কবি-সাহিত্যিকদের কথায় ও কবিতায়ও তার অনেক ব্যবহার রয়েছে। এ ‘তামীমা’ হল কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর বিশেষ, যা ছিদ্র করে সুতায় বা চামড়ায় গেঁথে গলায় বা গায়ে পরা হত। তাদের জাহেলী বিশ্বাস ছিল, এ পাথরগুলো বিপদ-আপদ রোধ করে, অসুস্থতা দূর করে। বিশেষভাবে বদনযর প্রতিহত করে। তাই তাদের যেকোনো শিশুকে জন্মের পরই তারা তামীমা পরাত এবং একটি বয়স হলে তা খুলে ফেলত। তাদের ধারণা, এখন সে নিজেই শক্তিমান, বীর বাহাদুর; এখন তামীমা ঝুলানো থাকা এক ধরনের কাপুরুষতা। তাই সে বয়সে পৌঁছলে মাতা-পিতা তা খুলে নিত।

আরবী সাহিত্যের প্রসিদ্ধ পণ্ডিত আবু মুহাম্মাদ কাসিম ইবনে আলী আলহারীরী তার ‘মাকামাত’ গ্রন্থের দ্বিতীয় ‘মাকামা’র শুরু এভাবে করেন-

حكى الحارث بن همام قال : كلفت مذ ميطت عني التمائم، ونيطت بي العمائم.

যখন থেকে আমার ‘তামীমা’ খোলা হয় এবং আমাকে শিরস্ত্রাণ পরিয়ে দেয়া হয় তখন থেকে আমি সাহিত্য সভার প্রতি আসক্ত হই। -মাকামাতে হারীরী পৃ. ২৫

আরেক কবি এক স্থান সম্পর্কে বলেন-

بلاد بها نيطت علي تمائمي + وأول أرض مس جلدي ترابها.

এটি এমন জায়গা, যেখানে আমাকে ‘তামীমা’ পরানো হয় এবং আমার শরীর সর্বপ্রথম ভূমি স্পর্শ করে। অর্থাৎ আমি জন্ম নিই। -আল ইবানা ২/৩৩১

আরবী ভাষার প্রাচীন কিতাব কিতাবুল জীম-এর লেখক আবু আমর আশশায়বানী (মৃত্যু : ২০৬ হিজরী) তার এ অনবদ্য গ্রন্থে লেখেন-

قال الأكوعي : التمائم الخرز الذي يعلق على الإنسان أو الدابة مخافة العين.

আকওয়ায়ী বলেন, ‘তামীমা’ হচ্ছে ক্ষুদ্র পাথরমালা, যা মানুষ বা প্রাণীর গায়ে ঝুলানো হয় বদ নযরের আশংকায়। -কিতাবুল জীম ১/৩২

একই সময়ের আরেক আরবী ভাষাবিদ ইমাম আবু যায়দ (মৃত্যু ২১৫ হিজরী) বলেন-

التميمة خرزة رقطاء تنظم في السير ثم يعقد في العنق.

তামীমা হল কালো ছিট বিশিষ্ট সাদা ক্ষুদ্র পাথর, যা চামড়ায় গাঁথা হয় অতপর গলায় ঝুলানো হয়। -গরীবুল হাদীস ১/১৮৩

প্রখ্যাত ফকীহ ও আরবী ভাষাবিদ আবু উবাইদ কাসিম ইবনে সাল্লাম রাহ. যে হাদীসে ঝাড়ফুঁক ও তামীমাকে শিরক বলা হয়েছে তা সম্পর্কে বলেন-

إنما أراد بالرقى والتمائم عندي ما كان بغير لسان العربية مما لا يدرى ما هو.

এ হাদীসে ঝাড়ফুঁক ও তামীমা দ্বারা ঐ সব ঝাড়ফুঁক ও তামীমা উদ্দেশ্য, যেগুলো অনারবী ভাষায় হয় এবং তার অর্থ বোঝা যায় না।     -গরীবুল হাদীস ২/১৯০

আবু উবায়দ-এর কথা থেকে বোঝা যায় যে তামীমা দু ধরনের। এক. যা আল্লাহর নাম, কুরআনের আয়াত বা যিকির দিয়ে হয়, দুই. যা কুফরি কালাম বা অন্য কিছু দিয়ে বা বোঝা যায় না এমন কোনো  ভাষায় হয়।

আবু উবায়দ রাহ. এ কিতাবটি রচনা করেন হাদীসের দুর্বোধ্য শব্দাবলির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে। এতে কিছু ভুল-বিচ্যুতিও হয়ে যায়;  এগুলো নিয়ে আবার কিতাব লেখেন তৎকালীন আরেক আরবী ভাষাবিদ ইবনে কুতাইবা রাহ.। তিনি স্বতন্ত্র একটি কিতাব রচনা করে তার নাম দেন إصلاح الغلط । সে রচনায় আবু উবায়দের উক্ত বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন-

و هذا يدل أن التمائم عند أبي عبيد المعوذات التي يكتب فيها وتعلق. قال أبو محمد : و ليست التمائم إلا الخرز وكان أهل الجاهلية يسترقون بها ويظنون بضروب منها أنها تدفع عنهم الآفات.  … قال الشاعر : إذا مات لم تفلح مزينة بعده + فنوطي عليه يا مزين التمائما. أي علقي عليه هذا الخَرَز ليقيه أسباب المنايا. أخبرنا أبو حاتم قال أخبرنا أبو زيد أن التميمة خرزة رقطاء .

অর্থাৎ, আবু উবায়দের এ কথা থেকে বুঝা যায়, তামীমা হল সেসব তাবীয, যা লেখা হয় এবং ঝুলানো হয়। অথচ ‘তামীমা’ হল শুধু ক্ষুদ্র পাথর; জাহেলীযুগের মানুষেরা যেগুলোকে রোগ প্রতিরোধ বা বিপদ-আপদ দূর করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত এবং তাদের বিশ্বাস ছিল এগুলো বিপদ-আপদ প্রতিহত করে।…

এক কবি বলেন, যদি সে মারা যায় তাহলে মুযায়না গোত্র তারপর আর সফল হতে পারবে না, তাই হে মুযায়না! তোমরা তার গায়ে তামীমা পরিয়ে দাও। অর্থাৎ এসব পাথর তাকে মৃত্যুর কারণসমূহ থেকে রক্ষা করবে।

আমাকে আবু হাতেম বলেছেন, তাকে (আরবী ভাষাবিদ) আবু যায়দ বলেছেন, তামীমা হল কালো ছিটযুক্ত সাদা পাথর। -ইসলাহুল গালাত পৃ. ৫৪

আবু যায়দের এ অভিমত আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি।

ইমাম আবু উবায়দের ন্যায় ইমাম ইবনে কুতায়বাও হাদীসের দুর্বোধ্য শব্দাবলি নিয়ে কিতাব রচনা করেন, সে কিতাবেও এ প্রসঙ্গটি আনেন। তিনি বলেন-

التميمة خرزة كانت الجاهلية تعلقها في العنق وفي العضد فتوقى بها، وتظن أنها تدفع عن المرء العاهات، وكان بعضهم يظن أنها تدفع المنية حينا، ويدلك على ذلك قول الشاعر: إذا مات لم تفلح مزينة بعده + فنوطي عليه يا مزين التمائما.‘

قال أبو زيد: التميمة خرزة رقطاء، روى عقبة بن عامر أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: من تعلق تميمة فقد أشرك.

وبعض الناس يتوهم أن المعاذات هي التمائم، ويقول في قول عبد الله بن مسعود إن التمائم والرقى والتولة من الشرك. والرقى المكروهة ما كان بغير لسان العربية، وليس كذلك، إنما التميمة الخرز، ولا بأس بالمعاذات إذا كتب فيها القرآن وأسماء الله عز وجل.‘

তামীমা হল ক্ষুদ্র পাথর, যেগুলো জাহেলী যুগে লোকেরা গলায় ও বাহুতে ঝুলাতো। তাদের বিশ্বাস ছিল এগুলো মানুষের বিপদ আপদ রোধ করে। তাদের কেউ কেউ মনে করে, এগুলো কখনো মৃত্যুও প্রতিহত করে। তাদের এ বিশ্বাসের দলীল হল, কবির এ পঙক্তি-

: إذا مات لم تفلح مزينة بعده + فنوطي عليه يا مزين التمائما.

সে মারা গেলে মুযায়না গোত্র আর কখনো সফল হতে পারবে না। তাই হে মুযায়না! তোমরা তার গায়ে তামীমা ঝুলাও।

আবু যায়দ বলেন, তামীমা হল কালো ছিটবিশিষ্ট সাদা ক্ষুদ্র পাথর। উকবা ইবনে আমের রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, যে তামীমা ঝুলাল সে শিরক করল। কেউ কেউ মনে করেন যে, তাবীযই হল তামীমা। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ-এর হাদীস- ‘নিশ্চই তামীমা ঝাড়ফুঁক ও তিওয়ালা শিরক’। অনেকে মনে করেন, এ হাদীসের ‘তামীমা’ অর্থ তাবীয। তাদের এ ধারণা ঠিক নয়। তামীমা হল ক্ষুদ্র পাথর। আর তাবীয; তাতে যদি কুরআন ও আল্লাহর নাম লিখা হয়, তাহলে  কোনো অসুবিধা নেই। -গরীবুল হাদীস ১/১৮৩

তামীমার অর্থ বুঝতে ইমাম আবু উবায়দ-এর যেমন স্খলন হয় তেমনিভাবে আরেক আরবী ভাষাবিদ লায়ছ ইবনে মুযাফ্ফর-এরও স্খলন হয়। তবে তার স্খলনটি আরেকভাবে। তিনি মনে করতেন তামীমা পাথর নয়। বরং তা চামড়া বা ফিতা, যাতে পাথরগুলো গাঁথা হয়।

আরবী সাহিত্যের অবিসংবাদিত ইমাম আযহারী তার এ মতের উপর কলম ধরেন এবং বিভিন্ন দলীল-প্রমাণ দিয়ে তা খ-ন করে বলেন, তামীমা ফিতা বা চামড়া নয়। বরং সেই পাথরগুলোকেই তামীমা বলা হয়, যা চামড়ায় গাঁথা হয়। তিনি লেখেন-

قال الليث: …والتميمة قلادة من سيور، وربما جعلت العوذة التي تعلق في أعناق الصبيان.

وفي حديث ابن مسعود: إن التمائم والرقى والتولة من الشرك.

قلت: التمائم واحدتها تميمة وهي خرزات كانت الأعراب يعلقونها على أولادهم يتقون بها النفس والعين بزعمهم، وهو باطل، وإياها أراد أبو ذؤيب الهذلي بقوله:

وإذا المنية أنشبت أظفارها

ألفيت كل تميمة لا تنفع

وقال آخر:

إذا مات لم تفلح مزينة بعده

فنوطي عليه يا مزين التمائما

وجعلها ابن مسعود من الشرك، لأنهم جعلوها واقية من المقادير والموت، فكأنهم جعلوا لله شريكا فيما قدر وكتب من آجال العباد والأعراض التي تصيبهم، ولا دافع لما قضى، ولا شريك له عز وجل فيما قدر، قلت: ومن جعل التمائم سيورا فغير مصيب، وأما قول الفرزدق:

وكيف يضل العنبري ببلدة

بها قطعت عنه سيور التمائم

فإنه أضاف السيور إلى التمائم لأن التمائم خرز يثقب ويجعل فيها سيور وخيوط تعلق بها، ولم أر بين الأعراب خلافا، أن التميمة هي الخرزة نفسها، وعلى هذا قول الأئمة. ‘

লাইছ বলেন, …তামীমা হল চামড়ার হার, আবার কখনো কখনো তাতে শিশুদের গলায় ঝুলানো কবজও গেঁথে দেয়া হয়। ইবনে মাসউদ রা.-এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নিশ্চয় তামীমা ঝাড়ফুঁক ও তিওয়ালা শিরক, (আযহারী বলেন,) সহীহ কথা হল, তামায়েম -তার এক বচন হল তামীমা- কিছু পাথর, যা জাহেলী যুগের লোকেরা তাদের সন্তানদের গলায় ঝুলিয়ে দিত। তাদের ধারণা অনুযায়ী বদনযর থেকে বাঁচার জন্য। কবি আবু যায়দ হুযালী তাঁর এ কবিতায় এটাই উদ্দেশ্য নিয়েছেন-

যখন মৃত্যু তার নখ বসিয়ে দিবে তখন তুমি সকল তামীমা অকার্যকর পাবে।

আরেক কবি বলেন, যদি এ মারা যায় তাহলে মুযায়না গোত্র আর কখনো সফল হতে পারবে না, সুতরাং হে মুযায়না গোত্র! তোমরা তার গায়ে তামীমা লাগিয়ে দাও।

আর এ পাথরকে ইবনে মাসউদ রা. শিরক বলেছেন, কেননা তারা (জাহেলী যুগের লোকেরা) এ তামীমাকে বিপদ-আপদ ও মৃত্যু থেকে নিজ শক্তিবলে রক্ষাকারী মনে করত। যেন আল্লাহ যে ভাগ্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, বান্দাদের যে জীবন-সীমা নির্ধারণ করে রেখেছেন এবং যেসব অসুস্থতা তাদের আক্রান্ত করবে সেসবের ক্ষেত্রে এগুলোকে আল্লাহর শরীক স্থির করে নিল। অথচ আল্লাহ যা ফায়সালা করে রেখেছেন তা প্রতিহত করার কেউ নেই। যা নির্ধারণ ও লিপিবদ্ধ করেছেন তাতে তাঁর কোনো শরীক নেই।

সুতরাং যারা বলে, তামীমা অর্থ চামড়ার হার- তাদের কথা ঠিক নয়। আর বিখ্যাত কবি ফারাযদাকের এ পংক্তিটি-

وكيف يضل العنبري ببلدة

بها قطعت عنه سيور التمائم

(কিভাবে আম্বরী এ শহরে হারিয়ে যাবে, অথচ এ শহরেই তার শরীর থেকে তামীমার সুতো কাটা হয়েছে । অর্থাৎ এ শহরেই সে বড় হয়েছে আর বড় হলে তামীমা খুলে শিরস্ত্রাণ পরিয়ে দেওয়া হয়, যেমন উপরে উল্লেখিত হয়েছে) তো ফারাযদাক এখানে سيور التمائم বলেছে অর্থাৎ ‘তামীমার ফিতা’ বলা হয়েছে سيور  -কে تمائم -এর দিকে এযাফত করেছে। তাহলে ফিতা এক জিনিস তামীমা আরেক জিনিস। তামীমা তো হল শুধুমাত্র পাথর, যার মধ্যে ছিদ্র করে সুতোয় বা ফিতায় গাঁথা হয়। অতপর তা ঝুলানো হয়। তামীমা অর্থ ছোট ছোট পাথর, ফিতা নয়; এ অর্থের ক্ষেত্রে আমি আরব বেদুঈনদের মাঝে কোনো দ্বিমত দেখিনি (আর আরব বেদুঈনরাই আরবী শব্দের মূল অর্থের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত)। আর এটাই আরবী ভাষাবিদ সকল ইমামের সিন্ধান্ত। -তাহযীবুল লুগাহ ১৪/১৮৪

অর্থাৎ আরবী ভাষাবিদ লাইছ তামীমা অর্থ করেছেন, চামড়ার মালা, যাতে কখনো কখনো সেসব কবয লাগানো হয়, যা বদনযর প্রতিহত করে বলে তাদের বিশ্বাস ছিল। লাইছ যে অর্থ বলেছেন তা আরেক ভাষাবিদ ইমাম খলীল ইবনে আহমাদ (মৃত্যু ১৭০হি.)ও বলেছেন। তিনি তার প্রসিদ্ধ কিতাব কিতাবুল আইন-এ বলেছেন-

التميمة قلادة من سيور. وربما جعلت العوذة التي تعلق في عناق الصبيان.

অর্থ তামীমা হল চামড়া বা ফিতা, যা গলায় পরা হয় কখনো কখনো তাতে কবয গাঁথা হয়। -কিতাবুল আইন ২/১৩৫

ইমাম আযহারী এ মতকে খ-ন  করেন এবং এটা প্রমাণ করেন যে, তামীমা হল পাথর অন্য কিছু নয়। আরবী শব্দের আসল অর্থ সম্পর্কে  আরব বেদুঈনেরা বেশি জানেন। তাই তিনি শেষে বলেন যে, তামীমা অর্থ-পাথর এক্ষেত্রে আরব বেদুঈনদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই । ইমাম আযহারী বহু সময় আরব বেদুঈনদের মাঝে কাটান। (দেখুন, সিয়ারু আলামিন নুবালা)

আল্লামা আযহারীর কথা পরবর্তী সাহিত্যিক মুহাক্কিকগণ গ্রহণ করেন। আল্লামা আযহারী একই রচনায় অন্যত্র বলেন-

والأصل في ذلك أن الصبي ما دام طفلا تعلق عليه أمه التمائم، وهي الخرز تعوذه بها العين، فإَذا كبر قطعت عنه .

শিশু যতদিন ছোট থাকে তার মা তার গায়ে তামীমা ঝুলিয়ে রাখে। তামীমা হল পাথর, যা দিয়ে বদনযর থেকে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হয়। যখন সে বড় হয় তখন তা খুলে ফেলা হয়।

হাদীসে বর্ণিত দুর্বোধ্য শব্দ-বিশ্লেষণ বিষয়ে যারা কিতাব লিখেছেন তাদের অন্যতম ব্যক্তি হলেন আল্লামা ইবনুল আসীর আলজাযারী। হাদীসের শব্দাবলীর বিশ্লেষণে তার গবেষণা সবার নিকট স্বীকৃত; তিনি তামীমার অর্থ লিখেছেন-

(هـ) التمائم جمع تميمة، وهي خرزات كانت العرب تعلقها على أولادهم يتقون بها العين في زعمهم، فأبطلها الإسلام.

ومنه حديث ابن عمر  وما أبالي ما أتيت إن تعلقت تميمة. والحديث الآخر من علق تميمة فلا أتم الله له كأنهم كانوا يعتقدون أنها تمام الدواء والشفاء، وإنما جعلها شركا لأنهم أرادوا بها دفع المقادير المكتوبة عليهم، فطلبوا دفع الأذى من غير الله الذي هو دافعه.

তামীমা হল পাথর, যা আরবরা তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের সন্তানদের গলায় ঝুলাতো বদনযর থেকে বাঁচার জন্য। ইসলাম এসে তা বাতিল করে দেয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত হাদীস-

وما أبالي إن تعلقت تميمة

আরেক হাদীস-

من علق تميمة فلا أتم الله له

এ দুই হাদীসে তামীমা শব্দ এই অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। যেন তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এসব পাথর সুস্থতা আনয়নে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর এ তামীমাকে শিরক বলা হয়েছে, যেহেতু তারা এ পাথর দ্বারা তাকদীর প্রতিহত করতে চাইত। আর এতে গায়রুল্লাহ্র মাধ্যমে বিপদ-আপদ দূর করতে চাওয়া হয়। অথচ একমাত্র আল্লাহই বিপদ দূরকারী। -আন নিহায়াহ  ১/১৯৮

আল্লামা মুরতাযা যাবীদী রাহ. বলেন-

و التميم : جمع تميمة، كالتمائم اسم لخرزة رقطاء تنظم في السير ثم يعقد في العنق، قال سلمة بن خرشب: تعوذ بالرقى من غير خبل … ويعقد في قلائدها التميم.

وقال رقاع بن قيس الأسدي: بلاد بها نيطت علي تمائمي … وأول أرض مس جلدي ترابها

وقال أبو ذؤيب: وإذا المنية أنشبت أظفارها … ألفيت كل تميمة لا تنفع

قال الأزهري: ومن جعل التمائم سيورا فغير مصيب، وأما قول الفرزدق: وكيف يضل العنبري ببلدة … بها قطعت عنه سيور التمائم، فإنه أضاف السيور إلى التمائم، لأن التمائم خرز يثقب ويجعل فيها سيور وخيوط تعلق بها. قال ولم أر بين الأعراب خلافا أن التميمة هي الخرزة نفسها.

তামীমা হল কালো ছিটবিশিষ্ট সাদা পাথর, যা চামড়ায় গাঁথা হয় অতপর গলায় পরা  হয়। (এরপর তিনি তিনজন আরবী ভাষাবিদদের বক্তব্য দ্বারা প্রমাণ দেন) সালামা ইবনুল খুরশুব বলেন, কোনো অসুস্থতা ছাড়াই তাকে ঝাড়ফুঁক করা হচ্ছে এবং তার গলার হারে তামীমা (পাথর) বাঁধা হচ্ছে। রিফা ইবনে কায়স বলেন, এটি এমন জায়গা, যেখানে আমাকে তামীমা পরানো হয়। এবং আমার শরীর সর্বপ্রথম ভূমি স্পর্শ করে। (অর্থাৎ আমি জন্ম গ্রহণ করি) আবু যুয়াইব বলেন, যখন মৃত্যু থাবা দিবে তখন সকল তামীমা অকার্যকর হয়ে যাবে। আযহারী বলেন, সুতরাং যারা বলে, তামীমা অর্থ চামড়ার হার তাদের কথা ঠিক নয়। এর আরো প্রমাণ হল বিখ্যাত কবি ফারাযদাকের এ পংক্তিটি-

وكيف يضل العنبري ببلدة

بها قطعت عنه سيور التمائم

কীভাবে আম্বরী এ শহরে হারিয়ে যাবে, অথচ এ শহরেই তার শরীর থেকে তামীমার সুতো কাটা হয়েছে। (অর্থাৎ এ শহরেই সে বড় হয়েছে আর বড় হলে তামীমা খুলে শিরস্ত্রাণ পরিয়ে দেওয়া হয়, যেমন উপরে উল্লেখিত হয়েছে)

তো ফারাযদাক এখানে سيور التمائم বলেছে অর্থাৎ তামীমার ফিতা বলা হয়েছে; سيور -কে تمائم -এর দিকে এযাফত করেছে। তাহলে ফিতা এক জিনিস তামীমা আরেক জিনিস। তামীমা তো হল কেবলমাত্র পাথর, যার মধ্যে ছিদ্র করে সুতোয় বা ফিতায় গাঁথা হয়। অতপর তা ঝুলানো হয়। তামীমা অর্থ ছোট ছোট পাথর, ফিতা নয়; এ অর্থের ক্ষেত্রে আমি আরব বেদুঈনদের মাঝে কোনো দ্বিমত দেখিনি। আর এটাই আরবী ভাষাবিদ সকল ইমামের সিন্ধান্ত। -তাজুল আরুস ৬/৭৬

ইমাম মুনযিরী বলেন-

التميمة: يقال:إنها خرزة كانوا يعلقونها، يرون أنها تدفع عنهم الآفات، واعتقاد هذا الرأي جهل وضلالة، إذ لا مانع إلا الله ولا دافع غيره، ذكره الخطابي رحمه الله.

তামীমা হল এক ধরনের ক্ষুদ্র পাথর, যা আরবরা গায়ে ঝুলাতো, তাদের বিশ্বাস ছিল, এগুলো বিপদ-আপদ প্রতিহত করে। এটি নিতান্তই মূর্খতা ও গোমরাহী। কেননা আল্লাহ্ই একমাত্র প্রতিহতকারী। -আত-তারগীব ৪/২৫০

আবুল ফাতাহ আলমুতাররিযী বলেন-

وفي حديث ابن مسعود إن التمائم والرقى والتولة من الشرك.

قال الأزهري : التمائم واحدها تميمة، وهي الخرزات كانت الأعراب يعلقونها على أولادهم ينفون بها النفس أي العين بزعمهم، وهو باطل.

ولهذا قال عليه السلام: من تعلق تميمة فقد أشرك، وإياها أراد أبو ذؤيب بقوله: وإذا المنية أنشبت أظفارها … ألفيت كل تميمة لا تنفع

قال ابن قتيبة : وبعضهم يتوهم أن المعاذات هي التمائم، وليس كذلك، إنما التميمة الخرزة، ولا بأس بالمعاذات إذا كتب فيها القرآن وأسماء الله تعالى .

আযহারী বলেন, তামীমা একধরনের ক্ষুদ্র পাথর, যা আরবরা তাদের বাচ্চাদের গায়ে ঝুলাতো। তাদের ধারণা ছিল, এটি বদনযর প্রতিহত করে। আর এটি বাতিল বিশ্বাস। এজন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে তামীমা ঝুলাল  সে শিরক করল। ইবনে কুতাইবা বলেন, কারো কারো ধারণা, তাবীযই তামীমা এটি ভুল। তামীমা হল শুধু পাথর আর কুরআন ও আল্লাহর নাম লিখে তাবীয পরিধানে কোন অসুবিধা নেই। -আলমুগরিব ১/১৭০

আল্লামা মাজদুদ্দীন ফায়রোযাবাদী, আল্লামা ইবনুল জাওযী ও আল্লামা তাফতাযানী  অনুরূপ লিখেছেন। (দেখুন আলকামুসুল মুহীত ৪/১৮; মুখতাসারুল মাআনী পৃ. ৪০৬)

এ তো গেল আরবী ভাষাবিদ সাহিত্যিক এবং হাদীস ব্যাখ্যাতাদের বক্তব্য । এসব বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, তামীমা হল পাথর। কুরআন বা দুআ সম্বলিত তাবীয তামীমা নয়- এটা ভাষাবিদদের নিকট যেমন স্বীকৃত কথা তেমনি আমাদের গায়রে মুকাল্লিদ বন্ধুদের (যাদের অনেকে কুরআন-আল্লাহর নাম-সিফাত বা দুআ সম্বলিত তাবীযকেও তামীমা এবং শিরক বলে প্রচার করেন) অনুকরণীয় বরেণ্য ব্যক্তিরাও বলে গিয়েছেন যে, তামীমা হল পাথর, তাবীয নয়। তাদের প্রামাণ্য ব্যক্তি শাওকানী রাহ. লেখেন-

والتمائم جمع تميمة، وهي خرزات كان العرب تعلقها على أولادهم يمنعون بها العين في زعمهم فأبطله الإسلام.

তামীমা হল ছোট ছোট পাথর, আরবরা তাদের সন্তানদের গায়ে ঝুলাতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, এগুলোা বদনযর প্রতিহত করে। ইসলাম এসে তা বাতিল করে দেয়। -নায়লুল আওতার ৮/২২১

নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহ. বলেন-

التميمة خرزات كانت العرب تعلقها على أولادهم يتقون بها العين في زعمهم فأبطلها الإسلام كما في النهاية.

তামীমা হল ছোট ছোট পাথরমালা, যা আরবের লোকেরা তাদের সন্তানদের গলায় ঝুলিয়ে দিত বদনযর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। ইসলাম এসে তা বাতিল করে দেয়। যেমন ইবনুল আসীর আননিহায়া গ্রন্থে বলেছেন।

শায়েখ জাযূলী কর্তৃক রচিত দালায়েলুল খায়রাতের ব্যাখ্যাতার একটি বক্তব্য খ-ন করতে গিয়ে শায়েখ আলবানী রাহ. বলেন-

وتأويل الشارح د “الدلائل” بأن التمائم جمع تميمة وهي الورقة التي يكتب فيها شيء من الأسماء والآيات وتعلق على الرأس مثلا للتبرك، فمما لايصح، لأن التمائم عند الإطلاق إنما هي الخرزات كما سبق عن ابن الأثير.

আর ব্যাখ্যাতার কথা যে, ‘তামীমা’র অর্থ হল ঐ কাগজ, যাতে আল্লাহর নাম ও আয়াত লিখা হয় অতপর তা মাথায় (বা অন্য কোথাও) ঝুলিয়ে দেয়া হয় তা ঠিক নয়। কেননা তামীমা বলতে পাথরকেই বুঝানো হয়। -সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, বর্ণনা ৪৯২ ১/২/৮৯১

এখানে এ কয়েকটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেই ইতি টানছি। আরবী অভিধান ও সাহিত্যের কিতাবে এ ধরনের বহু বক্তব্য বিদ্যমান, যা উল্লেখে আলোচনা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। এসব বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, হাদীসে বর্ণিত ‘তামীমা’ হল, ছোট ছোট পাথর, যা সুতোয় গেঁথে গলায় বা শরীরে লাগানো হত, প্রচলিত তাবীয নয়।

প্রসঙ্গত এখানে আরো একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাওয়া দরকার যে, ‘তামীমা’ অর্থ পাথরের মালা হলেও পরবর্তীতে কেউ কেউ এতে বড় ব্যাপকতার অনুপ্রবেশ ঘটায়। অর্থাৎ তারা পাথরের মালাসহ কুরআন-আল্লাহর নাম-সিফাত দ্বারা লিখিত তাবীযকেও তামীমা বলতে থাকে। তাই অভিধান বা ফিকহ ও অন্যান্য বিষয়ের কোনো কোনো কিতাবে ‘তামীমা’ শব্দের ব্যবহার এমন ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে এটা স্পষ্ট যে হাদীসে বর্ণিত তামীমা অর্থ পাথর, তাবীয নয়। আল্লামা তূরবিশতী বলেন-

وأما التميمة فإنها في الأصل خرزات كانت العرب تعلقها على أولادهم ينفون بها العين بزعمهم، وقد اتسعوا فيها حتى سموا بها كل عوذة؛ وفي الحديث: التمائم والرقى من الشرك، فعلمنا أن المراد به منها ما كان من الجاهلية و رقاها على ما بين في غير موضع.

فأما القسم الذي يختص بأسماء الله  وكلماته فإنه غير داخل في جملته بل هو مستحب مرجو البركة عرف ذلك من أصل السنة، لا ينكر فضله و فائدته.

আর তামীমা হল, মূলত পাথর, যা আরবরা তাদের সন্তানের গায়ে ঝুলাতো; তাদের ধারণা অনুযায়ী বদনযর প্রতিহত করার জন্য। অবশ্য পরবর্তীতে লোকেরা এতে ব্যাপকতা নিয়ে আসে এবং পাথর, তাবীয সবকিছুকে তামীমা বলে। আর হাদীসে যে এসেছে, ‘তামীমা শিরক’- এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল জাহেলী যুগের তামীমা। তাই যেগুলো আল্লাহর নাম-কালাম দিয়ে হয় তা এ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং তা মুস্তাহাব, বরকতপূর্ণ, সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। এর উপকারিতা অনস্বীকার্য। -আলমুয়াস্সার  ৩/১০০৮

আল্লামা মুনাভী বলেন-

والتمائم جمع تميمة و أصلها خرزات تعلقها العرب على رأس الولد لدفع العين فتوسعوا فيها فسموا بها كل عوذة.

তামীমা মূলত ছোট ছোট পাথর, যা আরবরা তাদের সন্তানের গায়ে ঝুলাতো বদনযর প্রতিহত করার  জন্য। অতপর তাতে ব্যাপকতা আসে এবং নিরাপত্তার জন্য যা কিছুই ঝুলানো হয় সবকিছুকে তামীমা বলে । -ফয়যুল কাদীর ২/৪৪৩

আল্লামা মোল্লা আলী কারী মুনাবীর বক্তব্য সম্পর্কে বলেন-

هو كلام حسن وتحقيق مستحسن.

এটি সুন্দর উক্তি, উত্তম বিশ্লেষণ। -মিরকাত   ৮/৩৭১

তো যাই হোক একথা সকলের কাছে স্বীকৃত ও সকলে এক্ষেত্রে একমত যে, হাদীসে যে ‘তামীমা’কে শিরক বলা হয়েছে সেই ‘তামীমা’ হল ঐ পাথরমালা, যা জাহেলী যুগে একটি শিরকী বিশ্বাসের ভিত্তিতে বাচ্চাদের গায়ে ঝুলানো হত।

এ পর্যন্ত আমরা আরবী ভাষাবিদ সাহিত্যিক এবং হাদীস ব্যখ্যাতাদের উক্তি ও বক্তব্য দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছি যে, হাদীসে বর্ণিত ‘তামীমা’ অর্থ, ছোট ছোট পাথর বিশেষ, যা তারা একটি শিরকী বিশ্বাসের ভিত্তিতে বদনযর ইত্যাদি প্রতিহত করার জন্য শিশুর গলায় ঝুলাতো। কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত ইত্যাদি সম্বলিত তাবীয তামীমা নয়। এখন সাহাবা তাবেয়ীনের কিছু বক্তব্য ও আমল উদ্ধৃত করছি, যেগুলো দ্বারাও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তামীমা হল ছোট ছোট পাথর, তাবীয নয়।

সাহাবী আবু কিলাবা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

قطع رسول الله صلى الله عليه وسلم التميمة من قلادة الصبي يعني الفضل بن العباس. قال وهي التي تخرز في عنق الصبي من العين.

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফযল ইবনে আব্বাস-এর গলার হার থেকে তামীমা ছিড়ে ফেলেন।

আবু কিলাবা বলেন, আর তামীমা হল, যা শিশুর গলায় গাঁথা হয় (অর্থাৎ চামড়া বা সুতোয় গেঁথে পরানো হয়)। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক, হাদীস ২০৩৪২

আবু উবায়দা তার পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ-এর ঘটনা বর্ণনা করেন, তিনি একদা তার স্ত্রীর ঘাড়ে পাথর পরিহিত দেখেন, যা তার স্ত্রী ফোড়া জাতীয় এক রোগবিশেষ-এর জন্য পরিধান করেন। তখন ইবনে মাসউদ তা ছিড়ে ফেলেন এবং বলেন-

إن آل عبد الله بن مسعود لأغنياء من الشرك.

নিশ্চয় আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের পরিবার শিরক থেকে মুক্ত । -প্রাগুক্ত (২০৩৪৩)

আব্দুর রাযযাক রাহ. এ অধ্যায়ের শিরোনাম দেন- الأخذة والتمائم।

তো ইবনে মাসউদ রা.-এর হাদীসে আমরা দেখলাম যে, তাঁর স্ত্রীর ঘাড়ে ছিল পাথর। এ হল সে যুগের ‘তামীমা’। ইমাম আবদুর রাযযাক রাহ. এ অধ্যায়ের শিরোনাম দেন الأخذة و التمائم ‘উখযা ও তামীমা অধ্যায়’। ‘উখযা’ও এক ধরনের পাথরবিশেষ। তো আবদুর রাযযাকের শিরোনাম দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, ঐ যুগের তামীমা হল পাথর।

কুয়েত ধর্মমন্ত্রণালয়ের ফিকহী সেমিনারে একবারের বিষয়বস্তু ছিল তাবীয, তখন সেখানে অনেক প্রবন্ধ পঠিত হয়। সেসব প্রবন্ধের যেগুলো সেমিনারের পক্ষ থেকে স্বীকৃত হয় এমন একটি প্রবন্ধে বলা হয়-

اتفق العلماء على عدم جواز تعليق التميمة بالمعنى الجاهلي، وهي الخرز التي تعلق على الأولاد، يتقون بها العين في زعمهم. وعلى هذا المعنى يحمل أحاديث النهي عن تعليق التمائم، واختلفوا في جواز تعليق التميمة بالمعنى الآخر،  وهي ورقة يكتب فيها شيء من القرآن أو غيره، وعلق على الرأس مثلا للتبرك.

-আত তাশাফী বিল কুরআন ১/১০৩

এ বক্তব্যে পরিষ্কার যে, তাদের কাছে হাদীসে বর্ণিত তামীমার অর্থ তাবীয নয়, বরং চামড়ায় গাঁথা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর বিশেষ।

জাহেলী যুগে বদনযর থেকে রক্ষার্থে যেমন তারা তামীমা পরত ঠিক তেমনিভাবে অন্যান্য রোগের জন্য আরো বিভিন্ন ধরনের ধাতব বা অন্যান্য পাথর পরত। নবীজী যার গায়েই এ ধরনের যা কিছু দেখতেন তা শিরক বলে তা পরিধান করতে নিষেধ করতেন। এগুলোর একটি হল ودعة । ‘ওয়াদাআ’ হল কড়ি। নবীজী বলেন-

ومن تعلق ودعة فلا ودع الله له.

যে কড়ি ঝুলালো আল্লাহ যেন তাকে শান্তি ও স্থিরতায় না রাখেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৪০৪

আরেকটি হল, তামার বালা, যা বিশেষ  এক রোগের জন্য ব্যবহার করা হত। একবার নবীজীর কাছে দশজন ব্যক্তি বাইআত হতে আসেন। নবীজী নয়জনকে বাইআত করেন, দশম জনের হাতে এমন বালা ছিল বলে তাকে বাইআত করেননি। পরে সে তা খুলে ফেলে, তারপর বাইআত করেন।

সে যুগে এ ধরনের আরো বিভিন্ন জিনিস ব্যবহারের প্রচলন ছিল, যেগুলোর কথা হাদীসে বা সাহাবীদের বাণী-বর্ণনায় এসেছে, সেগুলোর কোনোটিই এমন নেই যে, যা লিখা হত, অতপর ঝুলানো হত।

মূলত আরব জাহেলী যুগে পাথরের প্রতি তাদের বেশ আসক্তি ছিল। পাথর নিয়ে তাদের বিভিন্ন অলীক ভ্রান্ত বিশ্বাস ছিল। তারা মনে করত এ পাথর বিভিন্ন রোগ-বালাই, আপদ-বিপদ থেকে মুক্তি দেয়। তাই তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন পাথর ব্যবহার করত এবং প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা নাম ছিল। একটি পাথর ছিল “خرزة العقرة”, যা নারীরা সন্তান গর্ভে না আসার জন্য কোমরে ধারণ করত। আরেকটি ছিল الينجلب, যা পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তি ফিরে আসার জন্য এবং তার মন পাওয়ার জন্য ব্যবহার করত। আরেকটির নাম الخصمة, যা কোনো প্রতাপশালী বাদশাহ্র দরবারে যাওয়ার সময় কাপড়ের নীচে অথবা তরবারির খাপের ভিতর রাখা হত ।

আরেকটি ছিল الدردبليس যা স্ত্রী স্বামীকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য/বশে আনার জন্য ব্যবহার করত। আরেকটি ছিল الهرةযা নারীরা পুরুষকে আকৃষ্ট করার জন্য পরত। এভাবে তারা আরো বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের পাথর ব্যবহার করত। এগুলোর মধ্যেই একটি হল এখানে আলোচ্য ‘তামীমা’। এটি সে পাথর, যা বদনযর বা বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার মানসে পরা হত। (দেখুন, আলমুফাস্সাল ফী তারীখিল আরব কাবলাল ইসলাম ১৩/ ১৬১)

তো যাই হোক এখানে অনেক আরবী ভাষাবিদ হাদীস ব্যখ্যাতার বক্তব্য উদ্ধৃত করা হল। ইলম, ভাষা ও শরীয়তের জ্ঞানের জগতে এরাই প্রামাণ্য। এঁদের সকলে বলে গিয়েছেন যে, তামীমা হল এক ধরনের পাথর। তাই এটা স্পষ্ট যে, তামীমা অর্থ তাবীয বলা ঠিক নয়।

তামীমা ও তাবীয নামের দিক থেকেও ভিন্ন

তামীমা শব্দটি تم ধাতু থেকে নির্গত হয়েছে। تم অর্থ পূর্ণ ও শক্তিশালী। প্রসিদ্ধ ভাষাবিদ ইবনে ফারিস লেখেন, এ পাথরকে তামীমা নাম দিয়েছে এজন্য যে, তারা এ পাথরকে পরিপূর্ণ সুস্থতা দানকারী মনে করত।

…كأنهم يريدون أنها تمام الدواء والشفاء المطلوب.

 -মুজামু মাকাঈসিল লুগাহ, পৃষ্ঠা ১৫২

তো এ পাথরকে তারা আল্লাহর পরিবর্তে সুস্থতা দানকারী মনে করত বলেই নামও দিয়েছে এমন যে, শুধু নাম থেকেই শিরক স্পষ্ট। এবং এই শিরকী বিশ্বাসের কারণেই এটির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

পক্ষান্তরে ‘তাবীয’-এর অর্থ হল আশ্রয় দেয়া। অর্থাৎ এ লিখিত কাগজ গায়ে ঝুলিয়ে তাকে আল্লাহর আশ্রয়ে সোপর্দ করা হচ্ছে। সে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছে, তার জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে, লিখিত দুআ ও আল্লাহর নামের বরকতে তার শেফার আশা করা হচ্ছে। তাই এ নামে কোনো শিরক নেই । এতেই বুঝা যায় তামীমা জাহেলী নাম, তাবীয ইসলামী যুগে সৃষ্ট নাম।

তাবীয নামটি সাহাবা-তাবেয়ীনের অনেকের থেকে বর্ণিত। তাঁরা দুআ ও কুরআন দ্বারা লিখিতগুলোকে তাবীয নাম দিয়েছেন। পূর্বে আমরা তাবীযের প্রচলন সংক্রান্ত যেসব বাণী ও আমল উল্লেখ করেছি সেগুলোতে এ নামটির ব্যবহার বেশ এসেছে। এ থেকে স্পষ্ট যে, তামীমা আর তাবীয দুই জিনিস; তামীমা শিরকী নাম, পক্ষান্তরে তাবীয শব্দে শিরকী কিছু নেই। বরং তাতে আল্লাহর আশ্রয় কামনার কথা রয়েছে।

তামীমা ও তাবীয সত্তাগতভাবেও ভিন্ন

এ তো গেল নামগত পার্থক্য। উভয়টির প্রতি সামান্য দৃষ্টি দিলে যে কারোর কাছে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠবে যে, উভয়টি সত্তাগতভাবেও ভিন্ন। তামিমা হল পাথর, তাদের আকীদা-বিশ্বাস ছিল যে, এ পাথরগুলো তাদেরকে সুস্থ করে, রক্ষা করে। এসব মূর্তি-পাথর-তারকা ইত্যাদি তাদের ভ্রান্ত ধারণা মতে একেক ক্ষেত্রে তাদের হাজত পূর্ণকারী। স্পষ্টতই এগুলো সম্পূর্ণ শিরকী ধ্যান-ধারণা। এই শিরকী বিশ্বাসের কারণেই তামীমা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম।

পক্ষান্তরে তাবীয হল কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত বা দুআ সম্বলিত কাগজ। কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত বা  দুআর বরকত গ্রহণ শিরক তো নয়ই বরং একদিক থেকে তাওহীদ ও তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ্-এর নিদর্শন। তো তামীমা হল পুরোটাই শিরক। কারণ এর সাথে একটি শিরকী বিশ্বাস জড়িত আছে। জড়পাথরকে মুক্তিদাতা ও আরোগ্যদাতা মনে করা হচ্ছে; যা সম্পূর্ণ শিরকী বিশ্বাস। কিন্তু তাবীযের বিষয়টি ভিন্ন।

তাবীয যদি কুরআন-হাদীস ও আল্লাহর নাম-সিফাত দিয়ে লেখা হয় এবং তাবীয প্রদানকারী ও গ্রহণকারীর আকীদা-বিশ্বাস স্বচ্ছ হয় অর্থাৎ তারা উভয়ে একমাত্র আল্লাহ তাআলাকেই মুক্তিদাতা ও আরোগ্যদাতা মনে করে এবং তাবীয কেবলই বরকত লাভের উদ্দেশ্যে একটি ‘জায়েয ওসিলা’ হিসেবে ব্যবহার করে তাহলে তা শিরক হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না বরং নিয়ত খালেস হলে তা তাওহীদের বহিঃপ্রকাশ বলে গণ্য হবে। কেনান কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাতের মাধ্যমে শফা তলব করা মূলত আল্লাহ তাআলার দিকে রুজু করা।

যারা কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত-দুআর তাবীযকে শিরক বলে ফেলে মূলত এখানেই তাদের গলতটি হয়ে যায়। তারা হাদীসে বর্ণিত তামীমাকে তাবীয অর্থে ধরে নেয়। এবং তাবীযকেও তাতে অন্তর্ভুক্ত করে। তাকেও জাহেলী তামীমা বা পাথরের ন্যায় শিরক বলে দেয়। অথচ নবীজী জাহেলী তামীমা (যা পাথর)-কে শিরক বলেছেন, অন্যটিকে নয়।

কারণ অন্যটি শিরক হওয়ার কোনো কারণ তাতে বিদ্যমান নেই। শিরক হল, আল্লাহর যাত এবং সিফাতে কাউকে শরীক করা। তো যে ব্যক্তি স্বচ্ছ বিশ্বাস নিয়ে এবং শরয়ী নীতিমালা রক্ষা করে কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত বা দুআ সম্বলিত কোনো তাবীয পরিধান করল সে তো আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেনি; বরং আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করেছে। আর এ তাবীযকে যে সুস্থতার কারণ বা মাধ্যম মনে করে তা তো আল্লাহর নাম বা তাঁর কালামের কারণেই।

যাইহোক উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিষ্কার যে, হাদীসে বর্ণিত তামীমা অর্থ তাবীয নয়, বরং তা হল পাথরমালা। যাকে ঘিরে তাদের মাঝে একটি শিরকী বিশ্বাস ছিল। বিষয়টি বড় বড় বিদ্বান, ভাষাবিদ ও হাদীসের ব্যাখ্যাকারীগণ স্পষ্টভাবে বলে গিয়েছেন। তাই ‘তামীমা’র শিরক তাবীযে আসবে না।

আর আমাদের আলোচ্য তাবীযের মধ্যে শিরক হওয়ার কোনো কারণও নেই, তাই তাকে শিরক বলা যাবে না। অবশ্য তাবীযের মধ্যে যদি কোনো ‘মুনকার’ ও শিরকী কথাবার্তা থাকে, কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত ব্যতীত অন্য কোনো কুফরী কালাম থাকে তাহলে তা ভিন্ন এবং নিঃসন্দেহে তা শিরক।

এমনিভাবে তাবীয বা তাবীয প্রদানকারী সম্পর্কেও কোনো বাতিল আকীদা, আপত্তিকর বিশ্বাস যদি থাকে; যেমন তাকে মুক্তিদাতা বা আরোগ্যদাতা মনে করল বা তাকে বিশেষ কোনো ক্ষমতার অধিকারী মনে করল- এ ধরনের বিশ্বাসও কুফরি বিশ্বাস। বরং এই বিশ্বাস রাখতে হবে, আরোগ্য দানকারী একমাত্র আল্লাহ, মুক্তিদাতা একমাত্র আল্লাহ।

পূর্বে আমরা কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত সম্বলিত তাবীযের বৈধতা ও প্রচলনের ক্ষেত্রে সাহাবা-তাবেয়ীনের বক্তব্য ও বর্ণনা উল্লেখ করেছি। আগামীতে আমরা তৎপরবর্তী উলামায়ে কেরামের বক্তব্য উল্লেখ করব ইন্শাআল্লাহ।

শেষ পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

চেয়ার টেবিলে খানা খাওয়ার হুকুম কী?

প্রশ্ন চেয়ার টেবিলে খানা খাওয়ার হুকুম কী? দয়া করে জানালে হুকুম কী? উত্তর بسم الله …