প্রচ্ছদ / তালাক/ডিভোর্স/হুরমত / প্রবাসীর স্ত্রী শ্বশুর কর্তৃক ধর্ষিতা হলে হুকুম কী?

প্রবাসীর স্ত্রী শ্বশুর কর্তৃক ধর্ষিতা হলে হুকুম কী?

প্রশ্ন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

যাদের স্বামী প্রবাসী বা বিয়ে করেই চলে যান কর্মস্থলে। পরিবারে মহিলা আর কেউ নেই বা থাকলে ও অনেক সময় পুত্র বধুকে পড়তে হয় শাশুড়ের কুদৃষ্টিতে। একসময় স্ত্রীর ইচ্চা ছাড়াই জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন শ্বশুর ।
নতুন বউ সংসার ও স্বামীর মান রক্ষার্থে কাউকে বলতে পারেন না সেই লজ্জার কথা।
তাই চুপ করেই স্বামীর সংসারে থাকেন।।
এখন প্রশ্ন হলো এতে কি স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ঠিক থাকবে?
না থাকলে কি করা উচিৎ তাদের? দালিল সহ জানাবেন!।

উত্তর

بسم الله الرحمن الريحم

 

ধর্ষিত হবার সাথে সাথেই পুত্রবধুর সাথে উক্ত পাপিষ্ট শ্বশুরের ছেলের বিবাহ বাতিল হয়ে যায়। তাই এরপর থেকে উক্ত মহিলার জন্য তার স্বামীর ঘর সংসার করা কোনভাবেই বৈধ নয়।

এসব সমস্যা এড়াতে স্বামীর অবর্তমানে শ্বশুরবাড়ী থাকবে না। বাপের বাড়ি বা অন্য কোন আত্মীয়র বাড়ী চলে যাবে। প্রয়োজনে স্বামীর সাথে অসৎ চরিত্র শ্বশুরটির বিষয় নিয়ে আলোচনা করে সমাধান করার চেষ্টা করবে।

 

কুরআন থেকে

وَلاَ تَنكِحُواْ مَا نَكَحَ آبَاؤُكُم مِّنَ النِّسَاء إِلاَّ مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَمَقْتًا وَسَاء سَبِيلاً

যে নারীকে তোমাদের পিতা-পিতামহ বিবাহ করেছে তোমরা তাদের বিবাহ করো না। কিন্তু যা বিগত হয়ে গেছে। এটা অশ্লীল, গযবের কাজ এবং নিকৃষ্ট আচরণ। {সূরা নিসা-২২}

নিকা তথা বিয়ের অর্থ দু’টি। যথা- ১- আকদ করা। ২- সহবাস করা।

আসলে মৌলিক অর্থ সহবাসই। কিন্তু যেহেতু আকদের মাধ্যমেই সহবাস জায়েজ হয়, তাই নিকাহ বলে আকদকেই সাধারণত বুঝানো হয়ে থাকে।

ইমাম রাজী রহঃ উক্ত আয়াতের অধীনে বিধান লিখতে গিয়ে লিখেন-

قَوْله تَعَالَى وَلا تَنْكِحُوا مَا نَكَحَ آباؤُكُمْ مِنَ النِّساءِ قَدْ أَوْجَبَ تَحْرِيمَ نِكَاحِ امْرَأَةٍ قَدْ وَطِئَهَا أَبُوهُ بِزِنًا أَوْ غَيْرِهِ إذْ كَانَ الِاسْمُ يَتَنَاوَلُهُ حَقِيقَةً فَوَجَبَ حَمْلُهُ عَلَيْهَا

অনুবাদ- আল্লাহ তাআলার বাণী “যে নারীকে তোমাদের পিতা-পিতামহ নিকাহ করেছে তোমরা তাদের নিকাহ করো না” আয়াতটি হারাম হওয়াকে আবশ্যক করছে ঐ মহিলাকে নিকাহ করা, যার সাথে তার পিতা সহবাস করেছে জিনার মাধ্যমে বা অন্যকোনভাবে। যেহেতু নিকাহ শব্দটির আসল অর্থ সহবাস। তাই আসল অর্থে এটিকে নিহিত করাই আবশ্যক। {আহকামুল কুরআন লিররাজী-২/১৩৬, সূরা নিসা-২২}

সাহাবায়ে কেরামের ফাতওয়ার আলোকে

নিচে উদ্ধৃত সাহাবায়ে কেরাম জিনাকে হুরমাতে মুসাহারাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। যেমন-

১-  হযরত ইমরান বিন হুসাইন রাঃ। {আহকামুল কুরআন লিররাজী-২/১৩৭}

২-   হযরত উবাই বিন কা’ব রাঃ। {ইলাউস সুনান-১১/২০}

৩-  হযরত উমর রাঃ।

৪-   হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ।

৫-  হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ। [সহীহ কওল অনুপাতে]

৬-  জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ।

৭-   হযরত আয়শা রাঃ। {ফাতহুল কাদীর লিইবনে হুমাম]

তাবেয়ীগণের ফাতওয়া

নিচে উদ্ধৃত তাবেয়ীগণও একই ফাতওয়া প্রদান করতেন। যেমন-

১-  হযরত হাসান বসরী রহঃ।

২-   হযরত কাতাদা বিন দাআমা রহঃ।

৩-  সাঈদ বিন মুসাইয়িব রহঃ।

৪-   সুলাইমান বিন ইয়াসার রহঃ।

৫-  সালেম বিন আব্দুল্লাহ রহঃ।

৬-  মুজাহিদ রহঃ।

৭-   আতা রহঃ।

৮-  ইবরাহীম নাখয়ী রহঃ।

৯-  আমের রহঃ।

১০-  হাম্মাদ রহঃ।

এছাড়াও রয়েছেন ইমাম মুহাম্মদ রহঃ, ইমাম আবু ইউসুফ রহঃ, ইমাম যুফার রহঃ, ইমাম সুফিয়ান বিন সাঈদ সওরী রহঃ, ইমাম আওযায়ী রহঃ, জাবের বিন জায়েদ রহঃ, তাউস রহঃ, ইমাম ইসহাক রহঃ প্রমূখ মুহাদ্দিস ও ফক্বহগণ। {আহকামুল কুরআন লিলজাসসাস, উমদাতুল কারী, ফাতহুল কাদীর}

যুক্তির নিরিখে

হুরমাতে মুসাহারাতের মূল কারণ হল সহবাসকারীর অংশ হওয়া। যার সাথে সহবাস করা হয়, তার মাঝে সহবাসকারীর একটি অংশ থাকে। পিতা যদি কারো সাথে সহবাস করে, তাহলে উক্ত মহিলার মাঝে পিতার একটি অংশ চলে যায়, আর সন্তানও পিতার একটি অংশ। আর এক অংশ অন্য অংশকে বিবাহ করতে পারে না। এ কারণে পিতা যার সাথে সহবাস করবে, সন্তানের জন্য উক্ত মহিলা হারাম হয়ে যাবে।

তাহলে বুঝা গেল, হুরমাতের মূল কারণ হল অংশ হওয়া তথা বাচ্চা হওয়া। আর যেহেতু বাচ্চা হওয়াটি দেখা যায় না, এটি লুকায়িত বিষয়। তাই হুরমাতে মুসাহারাতের বাহ্যিক কারণ ধরা হয় বিবাহকে। তথা বিয়ের মাধ্যমে হুরমাতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়ে যায়।

আর একথাতো পরিস্কার যে, বাচ্চা হওয়া হুরমতে মুসাহারাতের মূল কারণ হলেও তা লুকায়িত থাকায় বিয়েকে রাখা হয়েছে তার বাহ্যিক কারণ। তাহলে বিবাহ ছাড়াই যদি বাচ্চা হওয়ার কারণ পাওয়া যায়, তাহলে কেন হুরমাতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে না? যেখানে দূরবর্তী কারণ বিবাহকে হুরমাতে মুসাহারাতের কারণ সাব্যস্ত করা হয়েছে, সেখানে নিশ্চিত ও মূল কারণ পাওয়া যাওয়া সত্বেও হুরমাত সাব্যস্ত না করার কি যৌক্তিকতা থাকতে পারে?

এ কারণেই যেহেতু পিতা ছেলের স্ত্রীর সাথে জিনা করেছে, এ কারণে উক্ত স্ত্রী ছেলের জন্য হারাম হয়ে গেছে।

শেষ কথা

আখেরাতের জীবনই অনন্ত জীবন। সেটিই আসল জীবন। তাই ৭০/৮০ বছরের অল্প ক’দিনের জীবনের টানে আখেরাতের অনন্ত জীবন বরবাদ করা কোন বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই যে পরিবারেই এ জঘন্য কাজটি সম্পাদিত হয়েছে উক্ত ছেলে যেন স্বীয় স্ত্রী থেকে পৃথক হয়ে যায়।

আর ইসলামী খেলাফত থাকলে উক্ত পাপিষ্ঠ নির্লজ্জ পিতাকে প্রকাশ্যে প্রস্তারাঘাত করে হত্যা করা হতো। এরকম জঘন্য কর্ম কোন মনুষত্বের কাজ নয়। পাপিষ্ঠ পিতাকে আল্লাহ তাআলার কাছে কায়মানোবাক্যে তওবা করার জন্য বলতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের তার বিধান অনুপাতে জীবন যাপিত করার তৌফিক দান করুন।

والله اعلم بالصواب

উত্তর লিখনে

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

হজ্জ কখন ফরজ হয়? হজ্জের মাসে নাকি হজ্জ নিবন্ধনের সময়?

প্রশ্ন االسابع الوقت اي وجود القدرة فيه وهي اشهر الحج او هو وقت خروج اهل …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস