প্রচ্ছদ / আধুনিক মাসায়েল / না জেনে তালাকনামায় সাইন করলে কি তালাক হয়?

না জেনে তালাকনামায় সাইন করলে কি তালাক হয়?

প্রশ্ন

সম্মানিত মুফতিয়ানে কেরাম,

বিষয়ঃ তালাক সংক্রান্ত ফতোয়া জানার আবেদন

জনাব মুফতী সাহেব!

আমার মামা শ্বশুর মুহাম্মদ আলী পিতা আফসার উদ্দীন, গ্রাম দেলগাঁও, থানা কাপাসিয়া, জেলা গাজিপুর মোসাম্মত রাবেয়া, পিতা আব্দুল হামীদ, গ্রাম রাওনাট, থানা কাপাসিয়া, জেলা গাজিপুর কে আমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করায়।

আব্দুল হামীদ তার কন্যা রাবেয়াকে জোরপূর্বক কন্যার শ্বশুরালয় থেকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে কন্যার চাচা পুনরায় লোক মারফত কন্যাকে শ্বশুরালয়ে ফেরত পাঠালে এক সপ্তাহ পর পিতা আব্দুল হামীদ পুনরায় কন্যাকে একথা বলে যে, “তুই যদি এখন আমার সাথে না যাস শ্বশুরবাড়ি থেকে, তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি”। একথা শুনে কন্যা [রাবেয়া] তার চল্লিশ দিনের সন্তান স্বামী বাড়ি রেখে পিতার সাথে পিত্রালয়ে চলে যায়। তার কিছুদিন পর [০৮/০২/২০০৮ ইং/২৬/১০/১৪১৪ বঙ্গাব্দ] তারিখে কন্যা পক্ষ স্বামী পক্ষকে কন্যার বাড়িতে আহবান করে। সেই সাথে স্বামী পক্ষের রায় জানতে চায়। স্বামী পক্ষ [স্বামীর পিতা] বলে যে, “ছেলেকে বিয়ে করিয়েছি ছাড়ানোর জন্য নয়, বরং রাখার জন্য, তাই আমরা মেয়েকে নিতে এসেছি”। একথা শুনার পর মেয়ের চাচা মেয়েকে প্রশ্ন করে যে, “তুমি কি স্বামীর বাড়ি যাবে?” মেয়ে বলে-“না, যাবো না”।

উল্লেখ্য, উক্ত কথোপথনের শুরুতেই কাজী উপস্থিত আছে কন্যা পক্ষের আহবানে।

তখন কন্যার চাচা বলে যে, “মেয়ে যাবে না, অতএব আপনার ছেলেকে ডাকেন কাজী উপস্থিত আছে। কাগজে কলমে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে”।

একথা শুনে ছেলের বাবা ছেলেকে ফোন করলে ছেলে ঘটনাস্থলে পৌঁছে।

পুনরায় ছেলের মতামত জানতে চাইলে ছেলে বলে-“বিয়ে করেছি ছেড়ে দেয়ার জন্য নয়, রাখার জন্যই বিয়ে করেছি। আর মুরুব্বীদের পাঠিয়েছি স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য”।

তখন মেয়ের চাচা বলেন যে, “মেয়ে যাবে না, তুমি কাগজে স্বাক্ষর কর, নইলে সমস্যা হবে”।

ছেলে তখন বাধ্য হয়ে সরকারি রেজিষ্ট্রি কাগজ না পড়েই স্বাক্ষর করে এবং তাতে কি লেখা ছিল তা তাকে পড়েও শুনানো হয়নি।

উক্ত সরকারি রেজিষ্ট্রি কাগজের ৬নং ধারা হল-“স্ত্রী আপন মুসলমান রেজিষ্ট্রারের সম্মুখে খোলা কবুল করিলেন কি না?”

উক্ত কথার অধীনে এই কথাগুলো লেখা আছে-“ হ্যাঁ, কবুল করিয়াছে। স্ত্রী নিজেই মুসলমান রেজিষ্ট্রারের সম্মুখে হাজির হয়ে তার মহরানার টাকা, ইদ্দতের খোরাকি ও সাকুল্য দাবী মাফ করে দিয়ে খোলা কবুল করেছে। স্বামী তার স্ত্রীকে এক, দুই, তিন তালাক দিয়ে হারাম করে দিয়েছে।”

এমতাবস্থায় আমার প্রশ্ন হল, উক্ত ৬নং ধারার কথাগুলো ছেলের সম্মুখে না পড়ে এবং ছেলেও উক্ত ৬নং ধারায় কাজী কর্তৃক লিখিত কথাগুলো স্বাক্ষর করার দরূন খোলা বা তিন তালাক হয়েছে কি না? জানালে খুশি হবো।

 

নিবেদক

নূরুদ্দীন

গ্রাম-শুভকী

পোঃ কৈজুরী, থানা, দেলদুয়ার, টাঙ্গাইল।

 

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

উপরোক্ত বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহলে এক্ষেত্রে দু’টি হুকুম আরোপ হচ্ছে। যথা-

যদি স্বামী জানেই না এ কাগজের মাঝে কী লেখা আছে? এবং একথাও জানে না যে, এর মাধ্যমে স্ত্রীকে স্বামী থেকে পৃথক করে দেয়া হবে খোলার মাধ্যমে, সেই সাথে মুখে সে কোন তালাকই বলেনি, তাহলে কোন তালাকই পতিত হয়নি। স্বামী স্ত্রীর বন্ধন অটুট রয়েছে।

বিয়ের পর, সন্তান থাকার পর এভাবে অযথা জিদের বশে বিয়ে ভেঙ্গে দেয়ার মানসিকতা খুবই গর্হিত ও অনৈতিক। এরকম নিকৃষ্ট কাজ থেকে স্ত্রী পক্ষের আত্মীয়দের বিরত থাকা উচিত। বিয়ে কোন খেল-তামাশার বস্তু নয়, নিজের জিদ ও রাগকে প্রাধান্য দিয়ে অবুঝ একটি শিশুকে মাতৃহারা করা কোন মানবিক গুণ সম্পন্ন ব্যক্তিই করতে পারে না। তাই এহেন নি¤œমানের কাজ করা থেকে সংশ্লিষ্ট সকলেরই বিরত থাকা উচিত।

كُلُّ كِتَابٍ لَمْ يَكْتُبْهُ بِخَطِّهِ وَلَمْ يُمِلَّهُ بِنَفْسِهِ لَا يَقَعُ بِهِ الطَّلَاقُ إذَا لَمْ يُقِرَّ أَنَّهُ كِتَابُهُ كَذَا فِي الْمُحِيطِ (الفتاوى الهندية، كتاب الطلاق، الفصل السادس فى الطلاق بالكتابة-1/379، المحيط البرهانى، كتاب الطلاق، الفصل السادس فى ايقاع الطلاق بالكتاب-4/486، تاتارخانية، كتاب الطلاق، الفصل السادس فى ايقاع الطلاق بالكتاب-3/380)

 

যদি স্বামী তালাক মুখে বলেনি, তার সামনে উক্ত কাগজটি পড়াও হয়নি, কিন্তু সে এতটুকু জানে যে, এর মাধ্যমে স্ত্রী স্বামী থেকে আলাদা হয়ে যাবে। তিন তালাক পতিত হয়ে যাবে এমন ধারণা বা নিয়ত ছিল না, তাহলে স্ত্রী স্বামী থেকে আলাদা হয়ে যাবে এটি জানার পরও সাইন করায়, স্ত্রী এক তালাকে বায়েনা হয়ে গেছে।

স্বামীকে না জানিয়ে, বা তার ইচ্ছে না থাকা সত্বেও কাজী তিন তালাক লিখে দেয়ায় সেই তিন তালাক স্বামীর পক্ষ থেকে সাব্যস্ত হয়নি। হয়েছে কাজীর পক্ষ থেকে। কাজীর পক্ষ তালাক দেয়া অযথা কাজ ছাড়া কিছু নয়।

যেহেতু এক তালাকে বায়েনা হয়ে গেছে, তাই এখন যদি স্বামী স্ত্রী আবার একসাথে ঘর সংসার করতে চায়, তাহলে নতুন দু’জন শরয়ী সাক্ষ্যর সামনে নতুন মোহর ধার্য করে বিয়ে করিয়ে নিলেই হবে। এরপর স্বামী শুধু দুই তালাকের মালিক থাকবে।

فى رد المحتار- لو استكتب كتابا بطلاقها فاخذه الزوج وختمه وعنونه، وبعث اليها فأتها وقع (رد المحتار4/456)

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ , أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَعَلَ الْخُلْعَ تَطْلِيقَةً بَائِنَةً»

হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ খোলাকে এক তালাকে বাইন সাব্যস্ত করেছেন। {সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-৪০২৫, মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-১৮৪৪৮, মুজামে আবী ইয়ালা, হাদীস নং-২৩০, আসসুনানুল কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-১৪৮৬৫}

فى الفتاوى الهندية-إذا كان الطلاق بائنا دون الثلاث فله أن يتزوجها في العدة وبعد انقضائها وإن كان الطلاق ثلاثا في الحرة وثنتين في الأمة لم تحل له حتى تنكح زوجا غيره نكاحا صحيحا (الفتاوى الهندية-1/472-473)

 

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

পরিচালক: শুকুন্দী ঝালখালী তা’লীমুস সুন্নাহ দারুল উলুম মাদরাসা, মনোহরদী, নরসিংদী।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

‘শরীকানা কুরবানীতে একজনের কুরবানী না হলে বাকিদের কুরবানী হবে না’ কথাটি সঠিক নয়?

প্রশ্ন একজন মাওলানা সাহেব বলেছেন, “শরীক কুরবানীর ক্ষেত্রে একজনের কুরবানী না হলে বাকি শরীকদের কুরবানী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস