প্রচ্ছদ / অপরাধ ও গোনাহ / আমাদের গোনাহের কাজও যদি তাকদীরে লেখা থাকে তাহলে গোনাহের জন্য দায়ী কে?

আমাদের গোনাহের কাজও যদি তাকদীরে লেখা থাকে তাহলে গোনাহের জন্য দায়ী কে?

প্রশ্ন

আস্সালামু আলাইকুম।

আমার নাম মোঃ মিজানুর রহমান।

আমি আলিয়া মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে পড়ি

বাড়ি ময়মনসিংহ

হুজুর  আমার একটা প্রশ্ন ছিল যে আমরা রিতিমত  যাই করি সবকিছু আমাদের তাকদীরে লিখা থাকে তা হলে আমরা যে গুনাহের কাজ গুলো করে থাকি তাও কি তাকদীরে লিখা থাকে?

আর যদি লিখাই থাকে তাহলে এর জন্য দায়ি কে?

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

বান্দা যে গোনাহের কাজ করে এর জন্য দায়ী বান্দা নিজে। আল্লাহ তাআলা নন। কারণ, গোনাহের কাজ করতে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে বাধ্য করেন না। বরং তাকে স্বাধীন করে রাখা হয়েছে। সে ইচ্ছে করলে পূণ্যের কাজ করতে পারে, ইচ্ছে করলেই গোনাহের কাজ করতে পারে।

বাকি আল্লাহ যেহেতু সর্ববিষয়ে জ্ঞাত, তাই বান্দা কী করবে? তা আল্লাহ তাআলা জানেন। এ কারণে আগেই তা তাক্বদীরে লিখে রাখা হয়েছে।

তাক্বদীরে লিখে রাখাটা বান্দার কাজের ক্ষেত্রে কোন প্রভাব সৃষ্টি করে না। এ কারণে বান্দার কাজের পুরস্কার ও শাস্তি তার নিজেরই কর্মের ফল।

যেমন ধরেন, একজন বাবার দুইজন সন্তান। বাবা দুই সন্তানকে একটি কাজ করতে আদেশ করলেন। বাবা জানেন একজন সন্তান কাজটি করবে। অন্যজন করবে না। কারণ, তিনি সন্তানদের স্বভাব ও প্রকৃতি সম্পর্কে জানেন। তাই নির্দেশটি দেবার পরই আরেকজনকে বলে দিলেন যে, আমার এ সন্তান কাজটি সুন্দর করে করবে, আর অপর সন্তান কাজটি করবে না।

পরে দেখা গেল বাস্তবেই তা’ই হয়েছে।

তো বাবার আগের মন্তব্যটি সন্তানদের কাজ করা ও না করার উপর কোন প্রভাব সৃষ্টি করেনি। কারণ, তিনি একজনকে কাজ করতে বাধ্য ও অন্যজনকে না করতে বাধ্য করেননি। বরং তিনি সন্তানদের প্রকৃতি ও স্বভাব সম্পর্কে জ্ঞাত হবার কারণে আগেই অনুধাবন করে মন্তব্যটি করেছিলেন। তাই কাজ করা ও না করার যিম্মাদার সন্তান হবে। বাবার আগের করা মন্তব্যটি নয়।

আরেকটি উদাহরণ দেয়া যায়।

একজন শিক্ষক দুইজন ছাত্রকে দু’টি প্রশ্ন করলেন। প্রশ্ন করার পর আরেকজন শিক্ষককে বললেন যে, এ ছাত্রটি উত্তর দিতে পারবে, অন্যজন পারবে না।

পরবর্তীতে বাস্তবেই দেখা গেল, এমনি হলো। এখানেও শিক্ষকের মন্তব্যটি ছাত্রদের উত্তর দিতে পারা ও না পারার মাঝে কোন প্রভাব সৃষ্টি করেনি। তাই এর দায়ভার ছাত্রদের উপরই বর্তাবে।

শিক্ষক শুধু নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে এমনটি মন্তব্য আগেই করে রেখেছিলেন।

তেমনি আল্লাহ তাআলা আমাদের স্বভাব প্রকৃতি এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ওয়াকিফহাল। এ কারণেই তিনি আগেই আমাদের তাক্বদীর লিখে রেখেছেন।

সেই লিখে রাখাটা আমাদের কর্মের কোন দায়ভার বহন করে না। কারণ, তিনি আমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছেন। আমাদের দ্বারা জোরপূর্বক তিনি ভালো কাজ যেমন করান না। তেমনি কাউকে দিয়ে জোরপূর্বক আমাদের গোনাহ করতে বাধ্য করেন না।

বরং আমরা ভালো ও মন্দ কাজ করতে স্বাধীন। তাই মন্দ ও গোনাহের কাজের যিম্মাদার আমরা নিজেই। এর দায়ভারও আমাদের উপরই বর্তাবে। আল্লাহ তাআলাকে বা তাক্বদীরকে এ কারণে দোষারোপ করার কোন সুযোগ নেই।

আশা করি বুঝতে পেরেছেন।

আরেকটি বিষয়। তাক্বদীর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা ও এ বিষয়ে অতিরিক্ত গবেষণা ও চিন্তা করা নিষিদ্ধ। তাই এহেন চিন্তা ও প্রশ্ন করা থেকে নিজেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

 


حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي مُلَيْكَةَ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّهُ دَخَلَ عَلَى عَائِشَةَ، فَذَكَرَ لَهَا شَيْئًا مِنَ الْقَدَرِ، فَقَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «مَنْ تَكَلَّمَ فِي شَيْءٍ مِنَ الْقَدَرِ سُئِلَ عَنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَمَنْ لَمْ يَتَكَلَّمْ فِيهِ لَمْ يُسْأَلْ عَنْهُ»

হযরত ইয়াহইয়া বনি আব্দুল্লাহ বিন আবী মুলাইকা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি একদা হযরত আয়শা রাঃ এর নিকট গেলেন। তখন তিনি তাকদীর বিষয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেন, তখন হযরত আয়শা রাঃ বলেন, আমি রাসুল সাঃ কে বলতে শুনেছি যে, যে ব্যক্তি তাকদীর বিষয়ে কথা বলে, কিয়ামতের ময়দানে এ কারণে সে জিজ্ঞাসিত হবে। আর যে এ বিষয়ে আলোচনা না করবে, তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে না। {সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৮৪}

আরেক হাদীসে এসেছে-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَحْنُ نَتَنَازَعُ فِي القَدَرِ فَغَضِبَ حَتَّى احْمَرَّ وَجْهُهُ، حَتَّى كَأَنَّمَا فُقِئَ فِي وَجْنَتَيْهِ الرُّمَّانُ، فَقَالَ: أَبِهَذَا أُمِرْتُمْ أَمْ بِهَذَا أُرْسِلْتُ إِلَيْكُمْ؟ إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حِينَ تَنَازَعُوا فِي هَذَا الأَمْرِ، عَزَمْتُ عَلَيْكُمْ أَلاَّ تَتَنَازَعُوا فِيهِ.

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। একদা রাসূল সাঃ আমাদের কাছে আসলেন এমতাবস্থায় যে, আমরা তাকদীর বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। তখন রাসূল সাঃ প্রচন্ড রেগে গেলেন।রাগে চেহারা আনারের মত রক্তিম বর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেন, তোমরা এ এসব করতে আদিষ্ট হয়েছো? নাকি আমি এসবের জন্য আবির্ভূত হয়েছি? ইতোপূর্বের লোকজন এ বিষয়ে আলোচনা করে ধ্বংস হয়েছে, আমি তোমাদের দৃঢ়তার সাথে বলছি, তোমরা এ বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। {তিরমিজী, হাদীস নং-২১৩৩}

والقدر سر من أسرار الله تعالى، لم يطلع عليه ملكا مقربا ولا نبيا مرسلا، ولا يجوز الخوض فيه، والبحث عنه بطريق العقل، (مرقاة المفاتيح، كتاب الإيمان، باب الإيمان بالقدر-1/256)

واصل القدر سر فى خلقه لم يطلع على ذلك ملك مقرب ولا نبى مرسل، والتعمق والنظر فى ذلك ذريعة الخذلان وسلم الحرمان، ودرجة الطغيان، فاحذر كل الحذر من ذلك، نظرا وفكرا ووسوسة، فإن الله تعالى طوى علم القدر عن أنامه، ونهاهم عن مرامه كما قال فى كتابه: لا يسئل عما يفعل وهم يسئلون (الانبياء-23) فمن سأل: لم فعل؟ فقد رد حكم كتاب الله، ومن رد حكم كتاب الله تعالى كان من الكافرين….. وقال على رضى الله عنه “القدر سر الله فلا تكشفه، (العقيدة الطحاوية-180)

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

পরিচালক: শুকুন্দী ঝালখালী তা’লীমুস সুন্নাহ দারুল উলুম মাদরাসা, মনোহরদী নরসিংদী।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com 

আরও জানুন

ঈদের খুতবায় ইমাম ও মুসল্লিদের জন্য তাকবীরে তাশরীক পড়ার হুকুম কী?

প্রশ্ন জনাব মুফতি সাহেব আমাদের এলাকায় ঈদের খুতবা হয় এমন। ইমাম সাহেব খুতবার শুরুতে মাঝে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস