প্রচ্ছদ / দুআ-দরূদ ও অজীফা / ফরজ নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত না করলে নামায হবে না?

ফরজ নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত না করলে নামায হবে না?

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম।

হুজুর আশা করি ভাল আছেন।

আমাদের এলাকা ইটনা, শিবপুর, নরসিংদী।

এই এলাকায় একজন পীর সাহেব আসেন। তিনি দাবী করেন মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহঃ সাহেব থেকে খেলাফতপ্রাপ্ত।

তিনি আম মানুষকে বিভিন্ন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দিচ্ছেন ।

যেমন তিনি গত ২৩/৯/২১ তারিখে বলেন, ফরজ নামাযের পর যারা দুই হাত তুলে সম্মিলিত মুনাজাত না করে তাদের নামায কবুল হবে না।

তিনি দলীল দেন এই হাদীস:

عَنِ الْفَضْلِ بْنِ عَبَّاسٍ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «الصَّلَاةُ مَثْنَى مَثْنَى، وَتَشَهُّدٌ فِي كُلِّ رَكْعَتَيْنِ، وَتَضَرُّعٌ، وَتَخَشُّعٌ، وَتَمَسْكُنٌ، ثُمَّ تُقَنِّعُ يَدَيْكَ، يَقُولُ: تَرْفَعُهُمَا إِلَى رَبِّكَ، مُسْتَقْبِلًا بِبُطُونِهِمَا وَجْهَكَ، وَتَقُولُ: يَا رَبُّ يَا رَبُّ فَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَهُوَ خِدَاجٌ»

তিনি বলেন, যদিও মুফতী ফয়জুল্লাহ রহঃ বলেছেন, ফরজ নামাযের পর দুই হাত তুলে সম্মিলিত মুনাজাতের কোন হাদীস সহীহ নাই এবং মক্কা মদীনায় আমল করে না, তথাপিও তাদের কথা ঠিক নয়।

তিনি বলেছেন, মুনাজাত না করার দরুন যেহেতু নামায হবে না, এজন্য সে নাপাক এবং সে আহলে হদস!

এখন হুজুর জানার বিষয় হল,

হাদীসে বর্ণিত خداج দ্বারা উদ্দেশ্য কী?

ফরজ নামাযের পর দুই হাত তুলে মুনাজাত করার বিধান কী?

নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত করা কি বাধ্যতামূলক?

দয়া করে দলীলসহ জানাবেন।

তিনি আরো বলেছেন যে, শয়ের মাঝে একজন উম্মতে মুহাম্মদী জান্নাতী আর ৯৯ জন উম্মত জাহান্নামী। তার এই কথা কতটুকু সঠিক?

নিবেদক

মুশাররফ হোসাইন

ইটনা, শিবপুর, নরসিংদী।

 উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله بركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

এক নাম্বার বিষয়তো হল, উক্ত হাদীসটির বিশুদ্ধতা নিয়েই মুহাদ্দিসীনে কেরামের নিকট ভিন্নমত রয়েছে।

কারণ, উক্ত বর্ণনায় একজন রাবী আছেন, আব্দুল্লাহ বিন নাফে নামে। যার ব্যাপারে ইমাম বুখারী রহঃ বলেছেন তার বর্ণিত হাদীস সহীহ নয়।

আলী বিন মাদীনী রহঃ বলেছেন, তিনি মাজহুল রাবী।  [মিরকাতুল মাফাতীহ-৬/৬৬৭, মুসনাদে আহমাদ, আহমাদ শাকেরের তাহকীককৃত-২/৪০১, টিকা নং-১৭৯৯]

 

خداج শব্দের অর্থ মোল্লা আলী কারী রহঃ করেছেন:

فَهُوَ خِدَاجٌ : بِكَسْرِ الْمُعْجَمَةِ، أَيْ: نَاقِصٌ فِي الْأَجْرِ وَالْفَضِيلَةِ

অর্থাৎ সওয়াব ও ফযীলত কম হবে। [মিরকাতুল মাফাতীহ-২/৬৬৭, হাদীস নং-৮০৫]

সুতরাং উক্ত বর্ণনা দিয়ে ‘সম্মিলিত মুনাজাত না করলে নামায হবে না’ বলা চরম বাড়াবাড়ি ও ভ্রান্তিতা ছাড়া কিছু নয়।

কথিত পীর সাহেব দাবী করেছেন তিনি মুফতী মাহমুদ হাসান গঙ্গুহী রহঃ এর খেলাফতপ্রাপ্ত। এখন প্রশ্ন হল, মুফতী মাহমুদ হাসান গঙ্গুহী রহঃ উক্ত মাসআলায় কী বলেছেন? সেটি জানা হলেই আশা করি তার জবাব হয়ে যাবে।

মুফতী মাহমুদ হাসান গঙ্গুহী রহঃ এর প্রসিদ্ধ ফাতওয়া গ্রন্থ “ফাতাওয়া মাহমুদিয়া” এর ১২ নং খণ্ডের ১১৫-১১৬ নং পৃষ্ঠায় সম্মিলিত মুনাজাত সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে লিখেন:

‘ফরজ নামাযের পর হাত উঠিয়ে দুআ করা প্রমাণিত। কিন্তু এটা শুধুমাত্র মুস্তাহাব পর্যায়ের। এটাকে ওয়াজিব পর্যায়ের গুরুত্বারোপ করা প্রমাণিত নয়। যেমনটি কিছু স্থানে করা হয়ে থাকে। এ কারণেই কিছু আলেম এটাকে বিদআত বলে থাকেন। নতুবা মূল দুআ গ্রহণযোগ্য হাদীস দ্বারা হাত উঠিয়ে এবং হাত না উঠিয়ে উভয়ভাবেই প্রমাণিত আছে।

নামাযের পর হাত উঠিয়ে দুআ করা শরীয়তে প্রমাণিত। এটি মুস্তাহাব। কিন্তু যদি কেউ কোন কারণে তা ছেড়ে দেয়, তাহলে তার উপর কোন আপত্তি করা উচিত নয়। [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া-১২/১১৫-১১৬]

এমন পরিস্কার কথা বলার পরও যিনি মুফতী মাহমুদ হাসান গঙ্গুরী রহঃ এর খলীফা দাবী করে উল্টো কথা প্রচার করছেন, তিনি একজন ফিতনাবাজ ছাড়া কিছু নয়।

ফরজ নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত করা জায়েজ আছে। সর্বোচ্চ মুস্তাহাব পর্যায়ের। যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহঃ এর ফাতওয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি।

সুতরাং এটাকে বাধ্যতামূলক বলা, কিংবা এটা ছাড়া নামায হবে না বলা উক্ত জায়েজ আমলকে বিদআতে পর্যবশিত করে।

কারণ, কোন জায়েজ বা মুস্তাহাব আমলকে বাধ্যতামূলক মনে করা, এটা ছাড়া নামায হয় না মনে করা বিদআত। সেই সাথে উক্ত আমল তখন জায়েজের পর্যায় থেকে বাড়াবাড়ির কারণে মাকরূহের পর্যায়ভূক্ত হয়ে যায়।

সুতরাং যারা উপরোক্ত বিশ্বাসে ফরজ নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত করে থাকে, তাদের আমলটা বিদআত হিসেবে গোনাহের কারণ হয়ে যাবে।

তাই তাদের আগে আকীদা ঠিক করতে হবে। নতুবা এ আমর বর্জন করতে হবে।

আর আকীদা ঠিক রেখে ফরজ নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাত করাতে কোন সমস্যা নেই।

من أصر على أمر مندوب وجعله عزما ولم يعمل بالرخصة، فقد أصاب منه الشيطان من الإضلال (شرح الطيبى، كتاب الصلاة، باب الدعاء فى التشهد-3/374، رقم-942، مرقاة المفاتيح، كتاب الصلاة، باب الدعاء فى التشهد-2/353)

وكل مباح يؤدى إليه فمكروه

الظاهر أنها تحريمة، لأنه يدخل فى الدين ما ليس منه (رد المحتار، كتاب الصلاة، قبيل باب صلاة المسافر-2/598)

وأما إذا سجد بغير سبب، فليس بقربة، ولا مكروه، وما يفعل عقيب الصلاة، مكروه، لأن الجهال يعتقدونها سنة، أو واجبة، وكل مباح يؤدى اليه فمكروه (الفتاوى الهندية، كتاب الصلاة، قبيل الباب الرابع عشر فى صلاة المريض-1/137، جديد-1/196)

    একশত জনের মাঝে ৯৯জন জাহান্নামী এবং একজন জান্নাতী হবার হাদীস বিশুদ্ধ। তবে উম্মতে মুহাম্মদীর সাথে উক্ত হাদীস খাস নয়। বরং এটি সকল উম্মত হিসেবে ধরা হয়েছে।

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

পেশাবের দশ পনের মিনিট পর পেশাবের ফোটা আসার সন্দেহ হলে করণীয় কী?

প্রশ্ন From: আব্দুলাহ আনাস বিষয়ঃ পবিত্রতা প্রশ্নঃ আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন হুজুর? এক ব্যক্তি বড় দীর্ঘ দিন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস