প্রচ্ছদ / আকিদা-বিশ্বাস / ইয়াযিদকে লা’নত করা বিষয়ে উলামায়ে আহলে সুন্নত-উলামায়ে দেওবন্দ

ইয়াযিদকে লা’নত করা বিষয়ে উলামায়ে আহলে সুন্নত-উলামায়ে দেওবন্দ

প্রশ্ন

ইয়াযিদকে লা’নত করা বিষয়ে জমহুর আহলে সুন্নাত ও দেওবন্দী আলেমগণের মতামত কী?

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

ইয়াযিদের বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত মতামত হল,

উম্মতে মুসলিমা এ বিষয়ে একমত যে, ইয়াযিদ ফাসিক ও জালেম ছিল।  ইয়াযিদ হোসাইন রাঃ কে হত্যা করতে সরাসরি নির্দেশ দেবার বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে বিশুদ্ধসূত্রে প্রমাণিত না হলেও এতে সে রাজি থাকার কথা স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয়।

তাই সে আহলে সুন্নাতের কাছে চূড়ান্ত পর্যায়ের ফাসিক এবং ঘৃণ্য ব্যক্তি। এছাড়া হাররার ঘটনায় সাহাবাগণের খুনের নির্দেশদাতা হবার কারণে লা’নত পাবারও যোগ্য।

কিন্তু লা’নত করা হবে কি না? এ বিষয়ে জমহুর আহলে সুন্নাত এবং জমহুর উলামায়ে দেওবন্দ একমত যে, লা’নত করা হবে না।

যদিও সে লা’নতের যোগ্য।

যেহেতু এটা শিয়াদের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তা’ই লা’নত করা থেকে বিরত থাকা হবে।

তার প্রশংসা করাও জায়েজ নেই।

মোল্লা আলী কারী রহঃ লিখেছেনঃ

لم يلعن أحد من السلف يزيد بن معاوية سوى الذين اكثر والقول فى التحريض على لعنه وبالغوا فى أمره وتجاوزوا عن حده كالرافضية والخوارج وبعض المعتزلة… فلا شك ان السكوت أسلم (شرح الأمالى لملا على القارى-27-28)

এজিদের উপর সালাফের কেউ লানত বর্ষণ করেননি। রাফেজী, খারেজী এবং কতিপয় মুতাজিলা ছাড়া। যারা বাচালতার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘণকারী।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে,তার ব্যাপারে চুপ থাকাই নিরাপদ। [শরহুল আমালী, মোল্লা আলী কারীকৃত-২৭-২৮]

ইবনে হাজার মক্কী রহঃ বলেন,

قال ابن حجر المكى: وهو أليق بقواعد المذهب فلا يجوز لعنه وان كان فاسقا خبيثا (شرح احياء علوم الدين-7\488)

যদিও ইয়াযিদ ফাসিক এবং খবীছ ছিল। কিন্তু তার উপর লা’নত করা জায়েজ নয়। [শরহে ইহয়াউ উলুদ্দীন-৭/৪৮৮]

ইউসুফ লুধিয়ানবী রহঃ লিখেন:

আহলে সুন্নাতের নিকট্ ইয়াযিদকে লানত করা জায়েজ নেই। এটা রাফেজীদের প্রতীক। কাসীদায়ে বদউল আমালী। যা আহলে সুন্নাতের আকীদার কিতাব। তাতে আসছে:

ولم يلعن يزيدا بعد موت

سوى المكثار فى الأغراء غال

এজিদের মৃত্যুর পর প্রগলভ সীমালঙ্ঘণকারী কতিপয় উস্কানীদাতা ছাড়া তার উপর কেউ লানত বর্ষণ করেনি। {আপকি মাসায়েল আওর উনকা হল-১/৪০২-৪০৩, জামেউল ফাতওয়া-২/১৭৮}

লুধিয়ানবী রহঃ আরো লিখেন:

মধ্যপন্থী রাস্তা হল এই যে, প্রান্তিকতা থেকে মু্ক্ত হয়ে চলা। সেটা হল এই যে, ইয়াযিদের প্রশংসা করা থেকে বিরত থাকা। এর বিপরীতে হুসাইন রাঃ, হযরত যুবায়ের রাঃ এবং অন্যান্য আকাবির সাহাবা ও তাবেয়ীগণের (যারা ইয়াযিদের সৈন্যদের জুলুমে শহীদ হয়েছেন) অবস্থানকে সঠিক মনে করা।

কিন্তু ইয়াযিদের এই সকল নিকৃষ্ট কাজ সত্বেও যেহেতু তার শেষ পরিণতি কুফরের উপর হওয়ার কোন অকাট্য দলীল প্রমাণিত নয়, এ কারণে তার কাফের হওয়ার বিষয়ে নিরব থাকা, এবং তার নাম নিয়ে লা’নত করা থেকে বিরত থাকা হবে। জমহুর আহলে সুন্নাত এবং আকাবিরে দেওবন্দের এটাই মাসলাক। এটাই নিরাপদ পন্থা। [আপকি মাসায়েল আওর উনকা হল-১/৪০৬]

ইউসুফ বিন্নুরী রহঃ লিখেন:

ويزيد لا ريب فى كونه فاسقا ولعلماء السلف فى يزيد وقتله الإمام الحسين خلاف فى اللعن والتوقف، قال ابن الصلاح: فى يزيد ثلاث فرق: فرقة تحبه، وفرقة تسبه، وفرقة متوسطة لا تتولاه ولا تلعنه، قال وهذه الفرقة هى ا لمصيبة (معارف السنن-6\8)

ইয়াযিদের ফাসিক হওয়ার বিষয়ে তো কোন সন্দেহ নেই। আর উলামায়ে সালাফ এ বিষয়ে এখতেলাফ আছে যে, ইয়াযিদের উপর এবং হুসাইন রাঃ এর হত্যাকারীদের উপর লা’নত করা হবে নাকি চুপ থাকা হবে?

ইবনুস সালাহ বলেন: ইয়াযিদ বিষয়ে তিন দল। একদল তাকে মোহাব্বত করে। একদল তার প্রতি বিদ্বেষ রাখে এবং তাকে গালি দেয়। আরেক দল মধ্যপন্থী। তাকে  ভালোও মনে করে না, তার উপর লা’নতও করে না। ইবনুস সালাহ বলেন, এ শেষ দলটিই সঠিক। [মা’রেফুস সুনান-৬/৮]

হযরত রশীদ আহমাদ গঙ্গুহী রহঃ বলেন,

ইয়াযিদকে লা’নত করা করা জায়েজ ও নাজায়েজ হওয়াটা মূলত ইতিহাসের উপর নির্ভরশীল। আর আমরা মুকাল্লিদদের সতর্কতা নীরব থাকার মাঝেই। কেননা, যদি লা’নত জায়েজ হয়, তাহলে লা’নত না করার মাঝে কোন ক্ষতি নেই। লা’নত করা না ফরজ,না ওয়াজিব না সুন্নাত, না মুস্তাহাব। শুধুমাত্র মুবাহ। আর যদি লা’নতের উপযুক্ত না হয়, তাহলে নিজে নিজে তাতে পতিত হওয়া গোনাহ। এটা ভালো নয়। [ফাতাওয়া রশিদীয়া-৩৪৮-৩৫০]

আশরাফ আলী থানবী রহঃ বলেন,

তাহকীকী কথা হল, যেহেতু লা’নত এর অর্থ হল, আল্লাহর রহমত থেকে দূরে থাকা। আর এটি একটি গায়েবী বিষয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ তাআলা না বলে দিবেন যে, ঐ ধরণের লোক বা ঐ ব্যক্তি রহমত থেকে দূরে। ………………  সুতরাং বিশেষ করে ইয়াযিদের বিষয়ে লা’নত করার কোন নছ নেই। সুতরাং দলীল ছাড়া যদি দাবী করা হয় যে, সে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে তাহলে তাতে ভয়ানক বিপদ আছে। যদি ফেরাউন, হামান, কারুনদের মত নছ থাকতো, তাহলে লানত জায়েজ হতো। যেহেতু নছ নাই, তাই তার উপর লা’নতও করা হবে না। [এমদাদুল ফাতাওয়া-৫/৪২৫-৪২৭]

মুফতী কেফায়েতুল্লাহ দেহলবী রহঃ বলেন,

হুসাইন রাঃ এর হত্যাকারী বিষয়ে এটা বলা জায়েজ যে, এরা সবাই মারাত্মক পাপী। জুলুম করেছে। কিন্তু তাদের গালি দেয়া জায়েজ নয়। এবং লা’নত করাও জায়েজ নয়। [কেফায়াতুল মুফতী-১/২৮৮]

মুফতী আজীজুর রহমান দেওবন্দী রহঃ বলেন,

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নিকট রাজেহ কওল হল, ইয়াযিদকে কাফের না বলা এবং তার উপর লা’নত না করা। যদিও তার জুলুম ও অত্যাচার এবং সীমালঙ্ঘণ ও পাপাচারের ক্ষেত্রে কোন কালাম নেই। [ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ-৮/৭-৮]

আব্দুল হাই লাক্ষ্নৌবী রহঃ বলেন,

সহীহ মাসলাক হল, ইয়াযিদ নামক এ নিকৃষ্টের ব্যাপারে ক্ষমা ও রহমাতের কখনোই আশা করা উচিত নয়। আর লা’নত যেহেতু উরফের মাঝে কাফেরদের সাথে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তাই এটি করে জবানকে নোংরা করা উচিত নয়। [ফাতাওয়া আব্দুল হাই লাক্ষ্ণৌবী-৭২]

১০

মুফতী মাহমুদ হাসান গঙ্গুহী রহঃ লিখেন:

ইয়াযিদ ফাসেক ছিল। সহীহ কথা হল, তার উপর লা’নত করা জায়েজ নয়। [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া-১/২৯৭]

১১

শামসুল হক আফগানী রহঃ লিখেন:

হযরত হুসাইন রাঃ হকের উপর ছিলেন। একথা সত্য। আর ইয়াযিদ অপরাধী ছিল। এটাও সত্য। কিন্তু ইয়াযিদ ইসলামের সীমা থেকে খারিজ ছিল না। আর মাসআলা হল, যার কাফের হওয়া সুনিশ্চিত হয়, তার উপর লা’নত করা যায়। কিন্তু যার কাফের হওয়া নিশ্চিত নয়, তার উপর লা’নত করা যায় না। [নুকাতে আফগানী-২১২]

১২

ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেন,

আমরা তাকে ভালোও বাসি না, আবার তাকে গালাগাল, লা’নতও করি না। [মিনহাজুস সুন্নাহ-১/৩১০]

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

ফজরের নামাযে কুনুতে নাজেলা কি হযরত উমর রাঃ সারা বছর পড়তেন?

প্রশ্ন From: মাহমুদ বিষয়ঃ কুনূতে নাযেলা প্রশ্নঃ উমার রাঃ এর আমল হিসেবে আমাদের মসজিদে ফজর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস