প্রচ্ছদ / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / রাসূল সাঃ এর জানাযা ও হযরত ফাতিমা রাঃ এর মৃত্যু প্রসঙ্গে

রাসূল সাঃ এর জানাযা ও হযরত ফাতিমা রাঃ এর মৃত্যু প্রসঙ্গে

প্রশ্ন

আসসালামুয়ালাইকুম ও রহমাতুল্লাহি ওবারাকাতুহু।

নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমতে আপনারা অনেক ভালো আছেন। আপনাদের এ ওয়েবসাইট টা অনেকের আমলে পরিবর্তন এনেছে। এখানে অনেক সুন্দর প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যাই। নিজেও প্রশ্ন করতে পারে। আমি চেষ্টা আপনাদের এ ওয়েবসাইট টি আরও জনপ্রিয় করে তুলতে। যাতে সবাই সঠিক ইসলামের সন্ধান পাই। তাই দো’আ করি আল্লাহ আপনাদের ইসলামের কাজে সাহায্য করুন আর আপনাদেরকে কবুল করুক। আমিন।

আমার নাম মোঃ আমির হামজা, যশোর

আজ আমার এক ভাইয়ের সাথে অনেক আলাপ হল (তিনি অবশ্য শিয়া আকিদাই ছিলেন)।

আমি তাকে ইন্টারনেট এ ইসলামের প্রচার সম্পর্কে কিছু কথা বললাম এবং বলেছিলাম যে আমার ফেসবুক, ইসলামিক সাইট, এবং মুফতিদের কাছে আমার যত কঠিন প্রশ্ন আছে আমি সেই প্রশ্নগুলো তাদের কাছে করলে তার উত্তর খুব সুন্দর ভাবে পেয়ে যাই । তখন সে একটু ভাবল আর আমাকে বলল যে আচ্ছা তুমি যে ভাবে ইন্টারনেট এর কথা বললে তাহলে… আমার মনের ভিতর যে কঠিন প্রশ্ন গুলো আছে তা আমি তোমাকে করবো আর তুমি তোমার ইন্টারনেট এ সেই প্রশ্ন গুলো করবে দেখি উনারা কেমন সুন্দর উত্তর দিতে পারেন? আশা করি তুমি উনাদের কাছ থেকে খুব সুন্দর উত্তর পেয়ে আমাকে দিবে। তাই আমি মনে করলাম যে তাহলে তো ভালই হবে তার প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমার নিজের ও জানা হবে আর তাকেও ভালো পথে আনার চেষ্টা করা যাবে।

তাই আশাকরি আমার এ কাজে আপনাদের সহযোগিতা পাব।

****তার প্রথম কয়েকটি প্রশ্ন****

প্রশ্নঃ১- রাসুল (সঃ)  এর ওফাতের পর তিনার জানাজার নামাজ প্রথমে কোন সাহাবী পড়িয়েছিল?

প্রশ্নঃ২- এভাবে কতজন সাহাবী তার জানাজা পড়িয়েছিল?

প্রশ্ন-৩-জানাজা পড়ানো সাহাবিদের নাম?

প্রশ্ন-৪- ওফাতের ৩২ ঘণ্টার মধ্যে কতবার তার জানাজার নামাজ হয়েছিল?

প্রস্নঃ৫- মা ফাতেমা (রাঃ)  কিভাবে মারা যান? বা মৃত্যুর ঘটনা কি??

বিঃ দ্রষ্টব্যঃ তিনি শিয়া থেকে ভালো হওয়ার জন্য গত ৩দিন তাবলীগ জামাতে গিয়েছিলেন। তবুও তার মনে অনেক প্রশ্ন। যেহেতু তিনি এতদিন অন্য আকিদাই ছিলেন। হয়তোবা তিনি সামনে আরও প্রশ্ন করবেন। আপনাদের সহযোগিতা পেলে আমি হইতবা লোকটিকে ইসলামের সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারব ইনশাআল্লাহ।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

আমাদের জামিয়ার প্রতি আপনার ইখলাসপূর্ণ মোহাব্বত দেখে আমরা আনন্দিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের খিদমাতকে কবুল করুন। আর শিয়া মতাবলম্বী ভাইকে আল্লাহ তাআলা নাজাতপ্রাপ্ত জামাত আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের অনুসারী হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

উক্ত ভাইয়ের প্রশ্নগুলোর জবাব নিচে উদ্ধৃত হল-

রাসূল সাঃ এর জানাযা কিভাবে পড়া হয়েছিল?

এ বিষয়টি বুঝার জন্য আমরা প্রথমে কয়েকটি হাদীসের দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নেই। তাহলে বিষয়টি পরিস্কার ভাষায় বুঝতে সহজ হবে ইনশাআল্লাহ।

ইমাম তিরমিজী রহঃ সাহাবী হযরত সালেম বিন উবায়েদ রাঃ থেকে নি¤œবর্ণিত বর্ণনা উল্লেখ করেন। যাতে হযরত সালেম বিন উবায়েদ রাঃ হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাঃ কে যখন রাসূল সাঃ এর ওফাতের খবর দিলেন, তখন-

فقال لي: انطلق فانطلقت معه فجاء والناس قد دخلوا على رسول الله (صلى الله عليه وسلم) فقال أيها الناس أفرجوا لي فأفرجوا له فجاء حتى أكبّ ومسّه فقال إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ «9» ، ثم قالوا: يا صاحب رسول الله صلى الله عليه وسلمأقبض رسول الله (صلى الله عليه وسلم) ، قال نعم، فعلموا أن قد صدق قالوا يا صاحب رسول الله: أيصلّي على رسول الله؟ قال: نعم، قالوا: وكيف؟ قال: يدخل قوم فيكبرون ويصلون ويدعون ثم يخرجون ثم يدخل قوم فيكبرون ويصلون ويدعون ثم يخرجون حتى يدخل الناس، قالوا: يا صاحب رسول الله أيدفن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال نعم، قالوا: أين؟ قال في المكان الذي قبض الله فيه روحه فإنّ الله لم يقبض روحه إلّا في مكان طيب فعلموا أن قد صدق، ثم أمرهم أن يغسّله بنو أبيه

আবু বকর সিদ্দিক রাঃ আমাকে বললেন, তুমি আমার সাথে আস। তিনি যখন আসলেন তখন লোকেরা রাসূল সাঃ এর চারপাশে ভীড় করেছিল। তিনি লোকদেরকে বললেন, তোমরা আমাকে একটু রাস্তা দাও। লোকেরা রাস্তা দিল। তিনি ভেতরে গেলেন, নত হয়ে দেখলেন এবং রাসূল সাঃ এর কপালে চুমু খেলেন। তারপর আয়াত পড়লেন, إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَতথা “নিশ্চয় তুমিও ইন্তেকাল করবে, এবং তারাও ইন্তেকাল করবে”।

লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূলের সাথী! রাসূল সাঃ কি ইন্তেকাল করেছেন? তিনি জবাবে বললেন, হ্যাঁ। তখন লোকদের বিশ্বাস হল। তারপর সাহাবায়ে কেরাম আবু বকর রাঃ কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূলের বন্ধু! রাসূল সাঃ এর জানাযার নামায কি পড়া হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। জিজ্ঞাসা করা হল, কিভাবে? তিনি বললেন, এভাবে যে, এক এক জামাত প্রবেশ করবে এবং জানাযা পড়ে বেরিয়ে আসবে। তারপর অন্য জামাত প্রবেশ করবে। {এভাবে পৃথক পৃথকভাবে প্রত্যেকেই রাসূল সাঃ এর উপর আলাদা আলাদাভাবে জানাযা নামায পড়ে নিবে]। সাহাবাগাণ আবু বকর রাঃ কে জিজ্ঞাসা করলেন, তাঁকে কি দাফন করা হবে? তিনি বললেন, অবশ্যই। জিজ্ঞাসা করা হল, কোথায়? তিনি বললেন, যেখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর রূহ কবজ করেছেন সেখানেই। কেননা, আল্লাহ পাক নিশ্চয় তাঁকে এমন স্থানে মৃত্যু দান করেছেন যে স্থানটি পবিত্র। লোকদের বিশ্বাস হয়ে গেল যে, তিনি যা কিছু বলছেন তা সবই ঠিক। তারপর রাসূল সাঃ এর পরিবার ও বংশীয় লোকদেরকে আবু বকর রাঃ গোসল করানোর নির্দেশ দিলেন।

{শামায়েলে তিরমিজী, হাদীস নং-৩৭৯, ৩৯৭, শরফুল মুস্তাফা, বর্ণনা নং-৮৫০, আলআনওয়ার ফী শামায়িলিন নাবিয়্যিল মুখতার, বর্ণনা নং-১২০৯}

একই বর্ণনা প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস নুরুদ্দীন হায়সামী ইবনে মাজাহ ও তাবারানীর বরাতে বর্ণনা করেছেন। {মাযমাউজ যাওয়ায়েদ- কিতাবুল খিলাফাহ-৫/১৮২-১৮৩}

আরো এসেছে-

১-সুনানে কুবরা লিলবায়হাকী- ৩/৩৯৫ بَابُ مَنْ يَكُونُ أَوْلَى بِغُسْلِ الْمَيِّتِ হাদীস নং-৬৬৫৬।

২-সুনানে বায়হাকী কুবরা- بَابُ الْجَمَاعَةِ يُصَلُّونَ عَلَى الْجِنَازَةِ أَفْذَاذًا৪/৩০, হাদীস নং-৬৯০৬।

৩- সুনানে বায়হাকী কুবরা- بَابُ لَا يَصْلُحُ إِمَامَانِ فِي عَصْرٍ وَاحِدٍ৮/১৪৫, হাদীস নং-১৬৫৪৯।

ইসলামী রাষ্ট্রে জানাযার নামায, ঈদের নামায ও জুমআর নামাযসহ ধর্মীয় বড় বড় অনুষ্ঠানের পরিচালক হয়ে থাকেন রাষ্ট্র প্রধান। যেহেতু রাসূল সাঃ এর ইন্তেকালের পর কোন রাষ্ট্র প্রধান বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়নি। তাই রাসূল সাঃ এর জানাযার নামায বড় জামাতের সাথে পড়ানো সম্ভব হয়নি। তাই হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাঃ এর নির্দেশ অনুযায়ী সকল সাহাবায়ে কেরাম এক দল এক দল করে রাসূল সাঃ এর গৃহে প্রবেশ করে আলাদা আলাদাভাবে জানাযা পড়েছিলেন।

জানাযার নামায পড়ার সুরত হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ এর বর্ণনা দ্বারা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। বর্ণনাটি মুহাদ্দিস আবী ইয়ালা রহঃ নকল করেছেন-

ثُمَّ دَعِيَ النَّاسُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلُّونَ عَلَيْهِ إِرْسَالًا: الرِّجَالُ، حَتَّى إِذَا فُرِغَ مِنْهُمْ، أُدْخِلَ النِّسَاءُ، حَتَّى إِذَا فُرِغَ مِنَ النِّسَاءِ أُدْخِلَ الصِّبْيَانُ، وَلَمْ يَؤُمَّ النَّاسَ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحَدٌ. فَدُفِنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ أَوْسَطِ اللَّيْلِ لَيْلَةَ الْأَرْبِعَاءِ

তারপর লোকদেরকে রাসূল সাঃ এর উপর দলে দলে জানাযার নামায পড়ার জন্য বলা হল। প্রথমে পুরুষরা নামায পড়ল। যখন পুরুষরা ফারিগ হল, তখন মহিলারা প্রবেশ করল। যখন মহিলারা ফারিগ হল, তখন শিশুরা প্রবেশ করল। আলাদাভাবে রাসূল সাঃ এর কেউ ইমামতী করেনি। তারপর রাসূল সাঃ কে বুধবার মধ্যরাতে দাফন করা হয়। {মুসনাদে আবী ইয়ালা, হাদীস নং-২২}

রাসূল সাঃ এর মৃত্যুর পর দাফন হবে কি না? জানাযা পড়া হবে কিনা? কোথায় দাফন করা হবে? ইত্যাদি প্রশ্নের সঠিক জবাব দিয়েছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাঃ। তারপর হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাঃ এর নির্দেশ অনুযায়ী গোসল দেন আহলে বাইতের সাহাবাগণ। তারপর কাফন পড়ানো হয় তাঁরই নির্দেশ অনুপাতে। তারপর জানাযা পড়ানো হয় হযরত আবু বকর রাঃ এর বলা ফর্মূলা অনুযায়ী। তারপর হযরত আবু বকর রাঃ এর বাতলানো সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাসূল সাঃ যেখানে ইন্তেকাল করেছিলেন সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। আর জামাত হয় একদল একদল প্রবেশ করে। প্রথমে পুরুষ। তারপর মহিলা। তারপর শিশুরা। আলাদাভাবে বড় কোন জামাত হয়নি।

একই বর্ণনা এসেছে আরো অনেক হাদীসের কিতাবে। যেমন-

মুয়াত্তা মালিক-২১২, করাচি প্রকাশনী।

হাদীসের কিতাবে যেসব বর্ণনা এসেছে। ঠিক একই বর্ণনা পাওয়া যায় সীরাত ও তারীখের কিতাবেও। যেমন-

১-সীরাতে ইবনে হিশাম-২/৬৬৩।

২-তারীখে ইবনে জারীর তাবারী-৩/২০৫।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাঃ এবং হযরত উমর রাঃ একসাতে প্রবেশ করে জানাযা পড়লেন। সেই সাথে অনেক সাহাবী প্রবেশ করে নামাযে জানাযা পড়লেন। তারপর তারা বেরিয়ে আসার পর আরেক দল প্রবেশ করে জানাযা নামায পড়লেন। এভাবে চলতে লাগল। তারপর মহিলা, তারপর শিশু। তারপর দাফন। এ বর্ণনা এসেছে অসংখ্য তারীখের কিতাবে। যেমন-

১-তাবাকাতুল কাবীর লিমুহাম্মদ বিন সাদ-২/৫৯, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

২-কিতাবু আনসাবুল আশরাফ-১/৫৭৪, ২/৭১।

৩-আলবিদায়া ওয়াননিহায়া লিইবনে কাসীর-৫/২৬৫।

৪-সীরাতে হুলিয়া লিআলী ইবনে ইবরাহীম-৩/৩৯৪।

এবার আপনার ১ থেকে ৪ নং প্রশ্নগুলো আবার দেখে নিন-

প্রশ্নঃ নং-১- রাসুল (সঃ)  এর ওফাতের পর তিনার জানাজার নামাজ প্রথমে কোন সাহাবী পড়িয়েছিল?

প্রশ্নঃ নং-২- এভাবে কতজন সাহাবী তার জানাজা পড়িয়েছিল?

প্রশ্ন নং-৩-জানাজা পড়ানো সাহাবিদের নাম?

প্রশ্ন নং-৪- ওফাতের ৩২ ঘণ্টার মধ্যে কতবার তার জানাজার নামাজ হয়েছিল?

আশা করি আপনি নিজেই এসবের উত্তর বের নিতে পারবেন। উপরোক্ত হাদীস ও ইতিহাসগ্রন্থ থেকে একথাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, যেহেতু ইসরামী রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ রাষ্ট্র প্রধানই আঞ্জাম দিয়ে থাকে। আর রাসূল সাঃ এর ইন্তেকালের পর কেউ রাষ্ট্রপ্রধান তৎক্ষণাত নিযুক্ত হয়নি। তাই সাহাবীদের মাঝে দ্বিধাবিভক্তি সৃষ্টি হলে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাঃ এর পরামর্শে আলাদা আলাদাভাবে একদল একদল করে জানাযা নামায পড়ে নেন। প্রথমে পুরুষেরা, তারপর মহিলারা, তারপর শিশুরা। এখানে আলাদাভাবে কোন জামাত হয়নি।

সুতরাং সুনির্দিষ্টভাবে কারা প্রথমে জানাযা পড়েছিলেন তা বলা যাচ্ছে না। তবে আলবিদায়া ওয়াননিহায়া ও অন্যান্য তারীখের কিতাবের দ্বারা এতটুকু অনুমান করা যায় যে, যেহেতু হযরত আবু বকর রাঃ ও হযরত উমর রাঃ এক সাথে একদল সাহাবী নিয়ে রাসূল সাঃ এর সামনে গিয়ে নামায পড়েছিলেন। তারপর অন্যদল প্রবেশ করেছেন। তাই সম্ভবত হযরত আবু বকর রাঃ ও হযরত উমর রাঃ ই সর্বপ্রথম জানাযার নামায পড়েন। তবে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। পুরোটাই অনুমান নির্ভর।

তবে সকল সাহাবাগণ, এমনকি মহিলা সাহাবী এবং শিশুরাও জানাযার নামায পড়েছেন এতে কোন সন্দেহ নেই।

তাই আপনার চার প্রশ্নের জবাব দাঁড়াচ্ছে যে,

প্রথমে কে জানাযা পড়িয়েছিল? তা স্পষ্টভাবে বলা মুস্কিল। হাদীস ও ইতিহাস গ্রন্থে এ ব্যাপারে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়নি।

সকল সাহাবীগণই জানাযা পড়েছিলেন একে একে। এমন কি মহিলা সাহাবী ও শিশুরাও জানাযা পড়েছিলেন।

সকল সাহাবীগণই জানাযা পড়েছেন। কেউ জানাযা নামাযে ইমামতী করেননি।

কতবার হয়েছিল তা সুনিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। হাদীস ও ইতিহাসগ্রন্থে এ ব্যাপারে সুষ্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়নি।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর ওফাত

রাসূল সাঃ এর সবচে’আদরের মেয়ের নাম হযরত ফাতেমাতুজ জাহরা রাঃ। যখন হুনাইন যুদ্ধের পর রাসূল সাঃ এর উপর সূরা নসর নাজিল হয়-

إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ [١١٠:١]وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا [١١٠:٢]فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ ۚ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا [١١٠:٣

যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়। এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাকারী। {সূরা নাসর-১-৩}

এ সূরা শুনেই হযরত ফাতিমা রাঃ বুঝে গেলেন যে, রাসূল সাঃ এর দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। এ আয়াতে এদিকে স্পষ্ট ইংগিত করছে। এ সূরা শুনার পর থেকেই হযরত ফাতিমা রাঃ কান্নাকাটি শুরু করে দেন। হযরত ফাতিমা রাঃ এর এ অবস্থা দেখে রাসূল সাঃ সান্ত¦না দিয়ে বলেন,

তুমিই প্রথম আহলে বাইত, যার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হবে। {তাফসীরে দুররে মানসূর-৮/৬০২, সূরা নসর}

হাদীসে এসেছে-

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: دَعَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاطِمَةَ عَلَيْهَا السَّلاَمُ فِي شَكْوَاهُ الَّذِي قُبِضَ فِيهِ، فَسَارَّهَا بِشَيْءٍ فَبَكَتْ، ثُمَّ دَعَاهَا فَسَارَّهَا بِشَيْءٍ فَضَحِكَتْ، فَسَأَلْنَا عَنْ ذَلِكَ فَقَالَتْ: «سَارَّنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ يُقْبَضُ فِي وَجَعِهِ الَّذِي تُوُفِّيَ فِيهِ فَبَكَيْتُ، ثُمَّ سَارَّنِي فَأَخْبَرَنِي أَنِّي أَوَّلُ أَهْلِهِ يَتْبَعُهُ فَضَحِكْتُ»

হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ মৃত্যু-রোগকালে হযরত ফাতিমা রাঃ কে ডেকে আনলেন এবং চুপে চুপে কিছু বললেন, তখন ফাতিমা রাঃ কেঁদে ফেললেনক; এরপর রাসূল সাঃ পুনারায় তাঁকে ডেকে চুপে চুপে কিছু বললেন, তখন তিনি হাসলেন। পরে আমরা এ সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বললেন, রাসূল সাঃ যে রোগে আক্রান্ত আছেন এ রোগেই তিনি ইন্তেকাল করবেন। এ কথাটিই তিনি আমাকে গোপনে বলেছেন। তখন আমি কাঁদলাম। আবার তিনি আমাকে চুপে চুপে বললেন, তাঁর পরিবার-পরিজনের মাঝে সর্বপ্রথম আমিই তাঁর সাথে মিলিত হব, তখন আমি হাসলাম। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৪৩৩, ৪১৭০}

রাসূল সাঃ এর ইন্তেকালের সময় হযরত ফাতিমা রাঃ এর উপর যেন মুসিবত ভেঙ্গে পরে। তিনি পেরেশান হয়ে বিভিন্ন কথা বলতে থাকেন। এর বর্ণনা হাদীসে এভাবে এসেছে-

عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: لَمَّا ثَقُلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَعَلَ يَتَغَشَّاهُ، فَقَالَتْ فَاطِمَةُ عَلَيْهَا السَّلاَمُ: وَا كَرْبَ أَبَاهُ، فَقَالَ لَهَا: «لَيْسَ عَلَى أَبِيكِ كَرْبٌ بَعْدَ اليَوْمِ»، فَلَمَّا مَاتَ قَالَتْ: يَا أَبَتَاهُ، أَجَابَ رَبًّا دَعَاهُ، يَا أَبَتَاهْ، مَنْ جَنَّةُ الفِرْدَوْسِ، مَأْوَاهْ يَا أَبَتَاهْ إِلَى جِبْرِيلَ نَنْعَاهْ، فَلَمَّا دُفِنَ، قَالَتْ فَاطِمَةُ عَلَيْهَا السَّلاَمُ: يَا أَنَسُ أَطَابَتْ أَنْفُسُكُمْ أَنْ تَحْثُوا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ التُّرَابَ

হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত। যখন রাসূল সাঃ এর উপর রোগ প্রকটরূপ ধারণ করে তখন তিনি বেহুশ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় হযরত ফাতিমা রাঃ বললেন, উহ! আমার পিতার উপর কত কষ্ট! তখন রাসূল সাঃ তাঁকে বললেন, আজকের পরে তোমার পিতার উপর আর কোন কষ্ট নেই। যখন তিনি ইন্তেকাল করলেন, তখন ফাতিমা রাঃ বললেন, হায়! আমার পিতা! রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হায় আমার পিতা! জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর বাসস্থান। হায় পিতা! জিবরাঈল আঃ কে তাঁর ইন্তেকালের খবর পরিবেশন করছি। যখন রাসূল  সাঃ কে সমাহিত করা হল, তখন ফাতিমা রাঃ বললেন, হে আনাস! রাসূল সাঃ কে মাটি চাপা দিতে কি করে তোমাদের মন সায় দিল? {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৪৪৬২, ৪১৯৩}

রাসূল সাঃ এর ইন্তেকালের পর হযরত সাইয়্যেদা ফাতিমা রাঃ একেবারে ভেঙ্গে পরেন। সব সময় পেরেশান থাকতেন। সর্বক্ষণ অপেক্ষায় ছিলেন, কখন রাসূল সাঃ সেই ভবিষ্যৎবাণী তথা সর্বপ্রথম রাসূল সাঃ এর সাথে হযরত ফাতিমাই মিলিত হবেন বাস্তবায়িত হবে। কাজকর্মে একদম মন বসতো না।

ছেলে-মেয়ে ছিল সবই ছোট ছোট। কিন্তু তাদের দেখাশোনা করতে হয়ে পড়েছিলেন অক্ষম। তখন হযরত আসমা বিনতে উমাইস জান্নাতী মহিলাদের সর্দর হযরত ফাতিমা রাঃ এর পরিবারের দেখাশোনার মহান সৌভাগ্য লাভ করেন। তিনি নিষ্ঠার সাথে ফাতিমা রাঃ এর পরিবারের দেখভাল করতে থাকেন।

আসমা বিনতে উমাইস ছিলেন রাসূল সাঃ এর আপন চাচাত ভাই হযরত যাফর তাইয়্যার রাঃ এর স্ত্রী। হযরত যাফর রাঃ যখন মুতার যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। তখন আসমা বিনতে উমাইসকে প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রাঃ বিবাহ করেন।

তিনিই হযরত ফাতিমা রাঃ এর পরিবারের পূর্ণ দেখভাল করতে থাকেন।

যেহেতু হযরত ফাতিমা রাঃ খুবই লজ্জাবতী ছিলেন। তাই তিনি হযরত আসমা বিনতে উমাইস রাঃ কে বলে রাখলেন যে, যেহেতু খোলাভাবে জানাযা পড়ালে পর্দার মাঝে কমতি আসে। যা আমি খুবই অপছন্দ করি। তাই আমি চাই আমার জানাযা নিয়ে যাওয়ার সময় এবং দাফন করার সময় পূর্ণ পর্দা রক্ষা করা হবে। এ কারণে তুমি এবং আমার স্বামী ছাড়া আমার গোসল করানোর সময় আর কারো সহযোগিতা নিও না। আর রাতের বেলায়ই যেন জানাযা নিয়ে যাওয়া হয়।

হযরত আসমা রাঃ বললেন, হে আল্লাহর রাসূলের বেটি! আমি হাবশায় দেখেছি যে, জানাযার উপর গাছের শাখা বেঁধে উপরে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এর দ্বারা ঢুলির মত একটি আকৃতি বানানো হয়ে থাকে। এটা বলে হযরত আসমা রাঃ খেজুরের কিছু ঢাল বলে আনালেন। তারপর এগুলোকে একত্র করে এর উপর কাপড় টাঙ্গিয়ে হযরত ফাতিমা রাঃ কে দেখালেন। এ দৃশ্য দেখে হযরত ফাতিমা রাঃ খুবই খুশি হয়ে বললেন, আরে! এতো খুবই সুন্দর পদ্ধতি! এভাবে ঢাল দিয়ে তার উপর কাপড় টাঙ্গিয়ে রাতের বেলাই দাফন কাফন সম্পন্ন করা হয় হযরত ফাতিমা রাঃ এর। {আসাদুল গাবা-৫/৫২৪, তবকাতে ইবনে সাদ-৮/২৫৭, তারীখে আহলে বাইতে আতহার-৬৭৭-৬৭৯}

জানাযা কে পড়িয়েছিল?

হযরত ফাতিমাতুজ জাহরা রাঃ এর জানাযার নামায কে পড়িয়েছিল? এ ব্যাপারে হাদীস, তারীখ ও আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত ও শিয়াদের কিতাবে তিনটি নাম পাওয়া যায়। যথা-

১-হযরত আলী রাঃ। ২-হযরত আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব রাঃ। ৩-হযরত আবু বকর রাঃ। {তাবাকাতে ইবনে সাদ-৮/২৫, আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৬/৩৩৩}

عن جعفر بن محمد عن أبيه قال: ماتت فاطمة بنت النبي صلى الله عليه وسلم فجاء أبو بكر وعمر ليصلوا فقال أبو بكر لعلي بن أبي طالب: تقدم، فقال: ما كنت لأتقدم وأنت خليفة رسول الله صلى الله عليه وسلم، فتقدم أبو بكر فصلى عليها. “

ইমাম যাফর সাদেক রহঃ তার পিতা ইমাম মুহাম্মদ বাকের রহঃ থেকে বর্ণনা করেন-

হযরত ফাতিমা রাঃ ইন্তেকাল করলে হযরত আবু বকর রাঃ জানাযার নামায পড়তে আগমন করেন। তখন হযরত আবু বকর রাঃ হযরত আলী রাঃ কে বললেন, আপনি জানাযার নামায পড়ান। তখন হযরত আলী রাঃ বললেন, আপনি আল্লাহর রাসূলের খলীফা! আপনার আগে যেতে পারবো না। তাই হযরত আবু বকর রাঃ সামনে এগিয়ে নামায পড়ালেন। {কানযুল উম্মাল-১২/৫১৫, হাদীস নং-৩৫৬৭৭}

عن مالك عن جعفر بن محمد عن أبيه عن جده علي بن الحسينقال: ماتت فاطمة بين المغرب والعشاء, فحضرها أبو بكر وعمر وعثمان والزبير وعبد الرحمن بن عوف, فلما وضعت ليصلى عليها قال علي -رضي الله عنه: تقدم يا أبا بكر قال: وأنت شاهد يا أبا الحسن؟ قال: نعم تقدم فوالله لا يصلي عليها غيرك, فصلى عليها أبو بكر -رضي الله عنهم أجمعين- ودفنت ليلًا. خرجه البصري وخرجه ابن السمان في الموافقة.

অনুবাদ- হযরত জাফর সাদেক রহঃ তার পিতা মুহাম্মদ বাকের থেকে, আর তিনি তার পিতা যাইনুল আবেদীন থেকে বর্ণনা করেন যে, খাতুনে জান্নাত ফতিমা রাঃ এর ইন্তেকাল মাগরিব ও ইশার মাঝামাঝি সময়ে হয়। তখন হযরত আবু বকর রাঃ, হযরত উসমান রাঃ, হযরত যুবায়ের এবং হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ রাঃ জানাযার নামাযের জন্য উপস্থিত হন। হযরত আলী রাঃ জানাযার নামায পড়ানোর জন্য আমীরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাঃ কে বললেন। হযরত আবু বকর রাঃ বললেন, হে আবুল হাসান! আপনার উপস্থিতিতে আমি কিভাবে জানাযা পড়াই? হযরত আলী বললেন, আপনি এগিয়ে আসুন! আল্লাহর কসম! আপনি ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি হযরত ফাতিমা রাঃ এর জানাযা পড়াবে না। অতএব হযরত আবু বকর রাঃ ই হযরত ফাতিমা রাঃ এর জানাযার নামায পড়ান। আর সেই রাতেই তাকে দাফন করা হয়। {আররিয়াজুন নাজরাহ ফী মানাকিবিল আশারাহ লিমুহিব তাবারী-১/১৫৬}

দাফন

এ ব্যাপারে সকল ঐতিহাসিকগণ একমত যে, হযরত ফাতিমা রাঃ এর দাফন রাতের বেলাই হয়েছিল। জানাযার খুবই চুপিসারে সম্পন্ন হয় পর্দা লঙ্ঘণের আশংকায়। বনু হাশেম ছাড়া খুব কম সংখ্যক সাহাবীগণই এ জানাযায় শরীক হতে পেরেছেন। হযরত আলী রাঃ, হযরত আব্বাস রাঃ, হযরত ফজল বিন আব্বাস রাঃ হযরত ফাতিমা রাঃ কে কবরে রাখেন।

খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা রাঃ এর কবর কোথায়? এ নিয়ে কয়েকটি বক্তব্য পাওয়া যায়। যেমন-

১- দারে আকীলের এক স্থানে। {তাবাকাতে ইবনে সাদ-৮/২৫৮}

২-জান্নাতুল বাকীতে। {খুলাসাতুল ওয়াফা-২১৭, আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৬/৩৩৪, আলইসাবাহ-৪/৩৮০}

৩-স্বীয় ঘরেই তাকে দাফন করা হয়, যা রাসূল সাঃ এর ঘরের সাথে ছিল। {খুলাসাতুল ওয়াফা-৩/৯০১}

আরও জানুন

মুসলমানের জন্য কাফেরের সাথে বিবাহ করার হুকুম কী?

প্রশ্ন From: সারওয়ার বিষয়ঃ অমুসলিম বা কাফের এর সাথে সম্পর্ক করা যাবে কি না?? প্রশ্নঃ …

3 comments

  1. জাজাকাল্লাহ খাইরান আমার প্রিয় মুফতি ভাই…….

  2. Jazakallah…

  3. মোঃ মামুনুর রশিদ

    অত্যন্ত চমৎকার আলোচনা দলিল সহকারে মাশাআল্লাহ।,খুবই ভালো লাগলো, অনেক উপকৃত হলাম আলহামদুলিল্লাহ।
    যাযাকাল্লাহু তায়ালা

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস