প্রচ্ছদ / আকিদা-বিশ্বাস / নবীজী সাঃ এর পিতা মাতা জান্নাতী না জাহান্নামী এ বিষয়ে আলোচনা করা উচিত নয়

নবীজী সাঃ এর পিতা মাতা জান্নাতী না জাহান্নামী এ বিষয়ে আলোচনা করা উচিত নয়

প্রশ্ন

 

রাসূল সাঃ এর পিতামাতা কি জাহান্নামী? একদল ব্যক্তি প্রচার করছে যে, রাসূল সাঃ পিতা আব্দুল্লাহ এবং তার মাতা আমিনাহ নাকি জাহান্নামী। এ ব্যাপারে আপনাদের দলীলভিত্তিক মতামত আশা করছি।

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

 

আসলে এ বিষয়টি নিয়ে কথা না বলাই সবচে’ উত্তম হবে। এটি জানা ও না জানা আমাদের ঈমানের পূর্ণতা বা অপূর্ণতার কোন সম্পর্ক নেই। হাশরের ময়দানেও এ ব্যাপারে আমাদের কোন জিজ্ঞাসা করা হবে না। এটি খুবই নাজুক একটি আলোচনা। কি প্রয়োজন এ অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে নাক গলানোর?

সবচে’ উত্তম হল এ বিষয়  চুপ থাকা। আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন তাদের হালাত কি? এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকাই সবচে’ নিরাপদ পদ্ধতি। বিজ্ঞ উলামাগণ এ ব্যাপারে তাই চুপ রয়েছেন। আর চুপ থাকাকেই নিরাপদ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি এ ব্যাপারে কথা বলাকে নাজায়েজও বলেছেন অনেকে। [রাদ্দুল মুহতার-২/১৮৫, কাফেরকে বিবাহ করার অধ্যায়, ফাতাওয়া রহিমীয়া-৩/৫২, আপকি মাসায়েল আওর উনকা হল-১/৭২}

তারপরও যেহেতু কিছু ভাই এ বিষয়ে বারবার বক্তব্য দিচ্ছেন। এটিকে মূল বানিয়ে মানুষের সামনে এ বিষয়টি নিয়ে আসছেন। তাই বাধ্য হয়ে আমরাও দু’কলম লিখতে বাধ্য হলাম। বাকি আল্লাহ তাআলার কাছে অযথা কথন ও লিখনের গোনাহ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। [বিস্তারিত- রদ্দুল মুহতার-৩/১৮৫, ৪/২৩১, হাওয়ী লিলফাতওয়া-২/২০২}

 

মূল মাসআলা

আসলে এ বিষয়ে ৫টি মত রয়েছে। যথা-

জাহান্নামী।

যেহেতু তারা ঈমান আনতে পারেননি। [আল্লাহ তাআলা আমাদের এসব কথা বলা থেকে হিফাযত করুন!]

তারা মাজুর। তাই তাদের উপর জাহান্নামের শাস্তি আসবে না।

مَّنِ اهْتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ ۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۗ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا [١٧:١٥]

যে কেউ সৎপথে চলে,তারা নিজের মঙ্গলের জন্যেই সৎ পথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয়,তারা নিজের অমঙ্গলের জন্যেই পথ ভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কোন রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না। [সূরা ইসরা-১৫]

যেহেতু ঈসা আঃ এর পর রাসূল সাঃ এর আগমনের পূর্ব মুহুর্তে কোন নবী ছিলেন না। তাই এ সময়ে যারা ইন্তেকাল করেছেন তারা জাহান্নামী হবেন না।

৩-

কিয়ামতের ময়দানে তাদের পরীক্ষা করা হবে। সঠিক জবাব দিতে পারলে জান্নাতী হবেন। আর সঠিক জবাব দিতে না পারলে জাহান্নামী হবেন।

৪-

রাসূল সাঃ নবুওয়ত পাবার পর তাদের উভয়কে আবার জিন্দা করা হয়। তখন তারা উভয়ে ঈমান আনয়ন করেন। তারপর আবার ইন্তেকাল করেন।

৫-

ইমাম রাজী রহঃ বলেন, রাসূল সাঃ এর পিতা মাতা মূলত মিল্লাতে ইবরাহীমীর উপর ইন্তেকাল করেছেন। তারা মুর্তিপূজা করেছেন মর্মে কোন প্রমাণ নেই। তাই তারা জান্নাতী হবেন। তাদের নামও প্রমাণ করে তারা মুশরিক ছিলেন না।

যারা জাহান্নামী হবার দাবি করেন। তাদের দলীল হল মুসলিম, আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদের হাদীস। যাতে নবীজী সাঃ এর পিতামাতার জন্য নবীজী সাঃ এর দুআ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এবং রাসূল সাঃ এক সাহাবীর পিতা সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছেন যে, আমারও তোমার পিতা জাহান্নামী।

এ হাদীসের জবাব হল, এটি রাসূল সাঃ বলেছেন তার পিতামাতার আসল হালাত সম্পর্কে তখন তিনি জানতেন না, তাই বলেছেন। আসলে তারা জান্নাতী। {রদ্দুল মুহতার, মুরতাদ অধ্যায়-৪/২৩১]

আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহঃ এ বিষয়ে আলাদা ৪টি পুস্তিকা লিখেছেন। ৯টি প্রবন্ধ লিখেছেন। যাতে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, রাসূল সাঃ এর পিতা মাতা জান্নাতী। জাহান্নামী নয়।

রাসূল সাঃ এর পিতামাতা জান্নাতী জাহান্নামী বিষয়ে কথা বলা জায়েজ নয়!

রাসূল সাঃ কে কষ্ট দেয়া হারাম। এতে কোন সন্দেহ নেই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا [٣٣:٥٧

যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের জন্যে প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি। {সূরা আহযাব-৫৭}

আর রাসূল সাঃ মাতা পিতাকে জাহান্নামী বললে কি রাসূল সাঃ খোশ হবেন? এতে কি রাসূল সাঃ কষ্ট পাবেন না। বরং অসহনীয় কষ্টের বিষয় পিতামাতাকে জাহান্নামী বলায়। তাই একাজটি করা জায়েজ নয়। এ আলোচনা জায়েজ নয়।

না এটি আমাদের ঈমানের অংশ। না এ ব্যাপারে আখেরাতে জিজ্ঞাসিত হবো। তাহলে কেন এ নাজুক বিষয় নিয়ে অহেতুক আলোচনার অবতারণা করা হচ্ছে। যারা করছে তাদের মাকসাদ কি? কিছু নতুন মাসআলা বলতে পারাই কি ক্রেডিট? দুনিয়াতে আর কোন বিষয় নেই? এরকম নাজুক বিষয় নিয়ে কেন অযাচিত আলোচনার সূত্রপাত করছেন আমাদের কথিত আহলে হাদীস ভাইয়েরা?

আল্লাহ তাআলা আমাদের এসব অপ্রয়োজনীয় ও নাজুক বিষয়ে অহেতুক আলোচনা থেকে মুক্ত থেকে তার বন্দেগী করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

এ বিষয়ে আরো জানতে পড়ুন-

 1 التعظيم والمنة في أن أبوي رسول الله في الجنة
2 ومسالك الحنفا في والدي المصطفى
3 والدرج المنيفة في الآباء الشريفة
4 والمقام السندسية في النسبة المصطفوية 

والله اعلم بالصواب

উত্তর লিখনে

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল- ahlehaqmedia2014@gmail.com

lutforfarazi@yahoo.com

আরও জানুন

মান্নত করার পর তা থেকে রুজু করার কোন সুযোগ আছে কি?

প্রশ্ন মুফতী সাহেবের নিকট আমার প্রশ্ন হল, কোন ব্যক্তি মান্নত করল যে, আমার ওমুক কাজটি …

No comments

  1. অত্যন্ত নাজুক বিষয়টি খুবই সতর্কতার সাথে চমকপ্রদভাবে উপস্থাপন করার জন্য হৃদয়ের গহীন থেকে দুয়া রইলো। আল্লাহ তায়ালা আপনার এলেমের মধ্যে বরকত দান করেন। আপনার কন্ঠকে হক্বের জন্য বলিষ্ঠ করেন। আপনার লেখনীকে আরো শাণিত করেন আমিন। সুম্মা আমীন।

  2. আব্দুল হাই ভাইয়ের সাথে একমত।যাজাকাল্লাহ খায়রান ফিদ দারাইন

  3. আল্লাহ আপনাকে হেদায়াত এল্মে লুদান ও জাযায়ে খায়ের দান করুন। আমীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *