মাদকের ভয়াবহতা ও আমাদের করণীয়

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

ভূমিকা

মাদক বাংলাদেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্র এখন মাদকের করালগ্রাসে যুব সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

মাদকের থাবা বিস্তারের ফলে তরুণদের একাংশের জীবন হচ্ছে নষ্ট। পরিবারে বাড়ছে অশান্তি। মাদকাসক্তরা চুরি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিডনি বিকল, এইডসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মাদকাসক্তি ও রোগের চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। মাদক চোরাচালানে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রচুর টাকা।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে মাদকের কারণে প্রতিবছর পাচার হয়ে যায় ৪৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার (৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা)। আর মাদক কেনাবেচা করে অর্থ পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। [দৈনিক প্রথম আলো-২৬ জুন, ২০২৫ ইং]

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমীক্ষা অনুযায়ী, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ৭৭ লাখ ৬০ হাজার এবং নারী ২ লাখ ৮৫ হাজার। এর বাইরে ২ লাখ ৫৫ হাজার শিশু-কিশোর মাদকে আসক্ত।

মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৬১ লাখ গাঁজায় (প্রায় ৫২ শতাংশ), ২৩ লাখ ইয়াবায় (প্রায় ২০ শতাংশ) ও ২০ লাখ ২৪ হাজার মদ্যপানে (১৭ শতাংশ) আসক্ত। ৩ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ফেনসিডিল ও সমজাতীয় মাদকে এবং ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ হেরোইনে আসক্ত।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, তিন লাখের মতো মানুষ ঘুমের ওষুধ মাদক হিসেবে গ্রহণ করেন। ড্যান্ডির মতো আঠাকে মাদক হিসেবে ব্যবহার করেন ১ লাখ ৬০ হাজারের মতো মানুষ। শিরায় মাদক গ্রহণ করেন প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ।

সব মিলিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১ কোটি ১৭ লাখের মতো। [দৈনিক প্রথম আলো-২৬ জুন, ২০২৫ ইং]

এর মানে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া এ মাদক আমাদের যুব সমাজকে যেমন ধ্বংস করে দিচ্ছে, সেইসাথে দেশের বিপুল সম্পদও পাচার হয়ে যাচ্ছে। তাই সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী মাদকের এ বিস্তার রুখে দেয়া এখন সময়ের দাবী।

মদের পরিচয়

মাদকদ্রব্যের আরবি প্রতিশব্দ ‘খমর’। এর অর্থ- সমাচ্ছন্ন করা, ঢেকে দেয়া। যে বস্তু ব্যবহারে নেশার উদ্রেক হয়, মানুষের মস্তিষ্ক বিকল হয়, স্বাভাবিক জ্ঞান হারিয়ে যায় তাকেই মাদক বলা হয়।

মানবতা সুরক্ষার জন্য ইসলামে মাদক সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ, অপবিত্র ও হারাম।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ: وَلَا أَعْلَمُهُ إِلَّا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ، وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ (صحيح مسلم، رقم-2003، ابن ماجه،  رقم-3390)

হযরত ইবনে উমর রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যা কিছু নেশা তৈরি করে তা-ই মদ। আর যা নেশা উদ্রেক করে তাই নিষিদ্ধ। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০০৩]

কুরআনের ভাষায় মদ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴿المائدة: ٩٠﴾

হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। [সূরা মায়িদা-৯০]

إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ ﴿المائدة: ٩١﴾

শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শুত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন ও কি নিবৃত্ত হবে? [সূরা মায়িদা-৯১]

হাদীসের ভাষায় মাদক

মদ উম্মুল খাবায়েস তথা সব অনিষ্টের মূল

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম ইরশাদ করেন, তোমরা সব অনিষ্টের মূল মদ থেকে নিজেকে নিবৃত রাখো। কারণ বনী ইসরাইলের এক ব্যক্তি নিবিষ্ট মনে ইবাদত করার জন্য লোকদের থেকে আলাদা হয়ে একাকী বসবাস করছিল। তখন এক নারী তার প্রতি আসক্ত হয়ে তার সেবিকাকে পাঠাল। বলল, স্বাক্ষী দেয়ার জন্য আপনাকে আহবান করা হচ্ছে। উক্ত বুযুর্গ স্বাক্ষী দেবার জন্য উক্ত মহিলার বাড়িতে গিয়ে দেখে এক পরম সুন্দরী নারীর সামনে এক যুবক বসা। একটি পাত্রে মদও রাখা। মহিলা সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলে,

إِنَّا لَمْ نَدْعُكَ لِشَهَادَةٍ، وَلَكِنْ دَعَوْتُكَ لِتَقْتُلَ هَذَا الْغُلَامَ، أَوْ تَقَعَ عَلَيَّ، أَوْ تَشْرَبَ كَأْسًا مِنْ هَذَا الْخَمْرِ، فَإِنْ أَبَيْتَ صِحْتُ بِكَ وَفَضَحْتُكَ،

আমি আসলে তোমাকে স্বাক্ষী দেবার জন্য ডাকিনি। বরং আমি তোমাকে ডাকছি এই যুবককে খুন করতে, অথবা আমার সাথে যিনা করতে অথবা এ পাত্র থেকে মদ পান করতে। যদি কোনটা না কর তাহলে চিৎকার করে আমি তোমার  সম্মানহানী করবো। বুযুর্গ ব্যক্তি বাধ্য হয়ে তখন সবচে’ ছোট গোনাহ মনে করে মদ পান করে, তারপর একে একে যিনা ও হত্যা করে বসে। [সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৩৪৮, শুয়াবুল ঈমান লিলবায়হাকী, হাদীস নং-৫১৯৭]

ঠিক এমন আরেকটি ঘটনা আসছে আরেক হাদীসে:

যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর এক মজলিসে হযরত আবূ বকর রাঃ, হযরত উমর রাঃ সহ সাহাবায়ে কেরামের এক বৈঠকে ‘বড় কবীরা গোনাহ কী?’ এ বিষয়ে আলোচনা উঠে। কারো কাছে এ বিষয়ে পরিস্কার জানা না থাকায় “আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস রাঃ কে খবর দেয়া হলে তিনি বলেন, সবচে’ বড় কবীরা গোনাহ হলো মদ পান করা। সবাই আশ্চর্য হলে আব্দুল্লাহ বিন আমর রাঃ বলেন:

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ ‌مَلِكًا ‌مِنْ ‌مُلُوكِ بَنِي إِسْرَائِيلَ أَخَذَ رَجُلًا فَخَيَّرَهُ بَيْنَ أَنْ يَشْرَبَ الْخَمْرَ أَوْ يَقْتُلَ نَفْسًا أَوْ يَزْنِيَ أَوْ يَأْكُلَ لَحْمَ الْخِنْزِيرِ أَوْ يَقْتُلُوهُ إِنْ أَبَى فَاخْتَارَ أَنْ يَشْرَبَ الْخَمْرَ وَأَنَّهُ لَمَّا شَرِبَهَا لَمْ يَمْتَنِعْ مِنْ شَيْءٍ أَرَادُوهُ مِنْهُ وَأَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَنَا مُجِيبًا: «مَا مِنْ أَحَدٍ يَشْرَبُهَا فَيَقْبَلَ اللَّهُ لَهُ صَلَاةً أَرْبَعِينَ لَيْلَةً وَلَا يَمُوتُ وَفِي مَثَانَتِهِ مِنْهَا شَيْءٌ إِلَّا حُرِّمَتْ عَلَيْهِ بِهَا الْجَنَّةُ، فَإِنْ مَاتَ فِي أَرْبَعِينَ لَيْلَةً مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: বনী ইসরাইলের এক বাদশা এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে তাকে নিজের জন্য চারটি বিষয়ের মাঝে একটি বিষয় নির্ধারণ করতে বলে। মদ পান করা, কাউকে হত্যা করা, যিনা করা অথবা শুকরের গোস্ত খাওয়া। এ চারটির কোনটি না করলে তাকে হত্যা করা হবে। তখন লোকটি মদ পান করাকে বেছে নিল। তারপর যখন সে মদ পান করল তখন বাদশা যা চাচ্ছিল কোনটি থেকে সে আর বিরত রইল না। সবই করে বসল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি মদ পান করে চল্লিশদিন পর্যন্ত তার নামায কবুল হয় না। পেটে সামান্য মদ থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য জান্নাত হারাম। চল্লিশ দিনের মাঝে মারা গেলে তার মৃত্যু হবে জাহেলী মৃত্যু। [মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন, হাদীস নং-৭২৩৬]

মদ সংশ্লিষ্ট ১০ ব্যক্তির উপর লা’নত

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي الْخَمْرِ عَشَرَةً عَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا وَشَارِبَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ وَسَاقِيَهَا وَبَائِعَهَا وَآكِلَ ثَمَنِهَا وَالْمُشْتَرِيَ لَهَا وَالْمُشْتَرَاةَ لَهُ

আনাস বিন মালিক রাঃ হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, শারাবের সাথে সম্পৃক্ত দশ শ্রেণীর লোককে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন। এরা হলঃ মদ তৈরিকারী, মদের ফরমায়েশকারী, মদ পানকারী, মদ বহনকারী, যার জন্য মদ বহন করা হয়, মদ পরিবেশনকারী, মদ বিক্রয়কারী, এর মূল্য ভোগকারী, মদ ক্রেতা এবং যার জন্য মদ ক্রয় করা হয়। [সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১২৯৫]

জাহান্নামে ভয়াবহ শাস্তি

أَبِي مُوسَى، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ثَلَاثَةٌ لَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ: مُدْمِنُ خَمْرٍ، وَقَاطِعُ رَحِمٍ، وَمُصَدِّقٌ بِالسِّحْرِ. وَمَنْ مَاتَ مُدْمِنًا لِلْخَمْرِ  سَقَاهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ نَهْرِ الْغُوطَةِ. قِيلَ: وَمَا نَهْرُ الْغُوطَةِ؟ قَالَ: نَهْرٌ يَجْرِي مِنْ فُرُوجِ الْمُومِسَاتِ يُؤْذِي أَهْلَ النَّارِ رِيحُ فُرُوجِهِمْ

হযরত আবূ মূসা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সর্বদা মদ পানকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, জাদুর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী। আর যে ব্যক্তি মদ পান করা অবস্থায় মারা যাবে তাকে আল্লাহ্ তাআলা (জাহান্নামের) নাহুরুল গুত্বাহ হতে পান করবেন। প্রশ্ন করা হলোঃ নাহুরুল গুত্বাহু কী? তিনি বললেনঃ এটি একটি নদী যা যেনাকারী নারীদের গুপ্তাঙ্গ হতে প্রবাহিত হবে। তাদের গুপ্তাঙ্গের দূর্গন্ধ জাহান্নামীদেরকে কষ্ট দিবে। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৯৫৬৯, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-২৮৭৬]

দুনিয়াবী শাস্তি

عَنْ قَبِيصَةَ بْنِ ذُؤَيْبٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فَاجْلِدُوهُ فَإِنْ عَادَ فَاجْلِدُوهُ فَإِنْ عَادَ فَاجْلِدُوهُ فَإِنْ عَادَ فِي الثَّالِثَةِ أَوِ الرَّابِعَةِ فَاقْتُلُوهُ فَأُتِيَ بِرَجُلٍ قَدْ شَرِبَ فَجَلَدَهُ ثُمَّ أُتِيَ بِهِ فَجَلَدَهُ ثُمَّ أُتِيَ بِهِ فَجَلَدَهُ ثُمَّ أُتِيَ بِهِ فَجَلَدَهُ وَرَفَعَ الْقَتْلَ فَكَانَتْ رُخْصَةً (سنن أبى داود، رقم-4485)

কাবিসাহ ইবনু যুওয়াইব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি মদ পান করে তাকে (৮০টি) বেত্রাঘাত করো। আবারো পান করলে তাকে বেত্রাঘাত করো। আবারো পান করলে তাকে বেত্রাঘাত করো। তৃতীয় কিংবা চতুর্থবার যদি সে এরূপ করে তবে তাকে হত্যা করো। অতঃপর মদ পানের অপরাধে জনৈক ব্যক্তিকে ধরে আনা হলে তিনি তাকে বেত্রাঘাত করেন। পুনরায় তাকে এ অপরাধে নিয়ে আসা হলে তিনি তাকে বেত্রাঘাত করেন। অতঃপর একই অপরাধে তাকে নিয়ে আসা হলে তিনি বেত্রাঘাত করেন আর হত্যা পরিহার করেন। তা ছিলো অবকাশ। [সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং-৪৪৮৫]

আইন করে মাদকের বিস্তৃতি

আ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩ নং ধারায় লাইসেন্স ও পাস নিতে পারলেই আ্যালকোহল আমদানী রফতানী, উৎপাদন প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহ, বিপণন ও ক্রয়-বিক্রয় এবং সংরক্ষণ ও পান করা বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

উক্ত বিধিমালার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৭ নং ধারায় এক এলাকায় ১০০ জন ব্যক্তি মদের পারমিটধারী হলে মদ বিক্রির লাইসেন্স দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

৯ নং ধারার ৩ নং উপধারা অনুপাতে ২১ বছর হলেই মদ খাবার পারমিশন নিতে পারবে।

উক্ত বিধিমালার তৃতীয় অধ্যায়ের ১৫ নং ধারা অনুপাতে এক স্থানে ২০০ জন ব্যক্তি মদ পানের পারমিটধারী হলে সেখানে মদের বার প্রতিষ্ঠা করা যাবে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬ ও ৭ নং ধারা অনুপাতে পাস থাকলে রেল, সড়ক, নৌ ও আকাশপথের যে কোন একটি বা একাধিক পথে আ্যালকোহল বহন ও পরিবহন করা যাবে।

আ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৮ নং ধারার ৯ নং উপধারা অনুপাতে লাইসেন্স দেয়া কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে দোকান, বার বা আ্যালকোহল ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত স্থানে বিনোদনমূলক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে।

এ বিধিমালাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা না বলে মাদকদ্রব্য বিস্তার বিধিমালা বললেই সবচে’ যথার্থ হবে।

আ্যালকোল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ এর ফলাফল

সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম দেশে কুরআনে বর্ণিত একটি হারাম বিষয়কে সহজলভ্য ও অনুমোদিত করা হয়েছে।

মাদকনিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ তে মদের ব্যবসার লাইসেন্স গ্রহণের ব্যাপারে কী কী প্রয়োজন তা উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু ২০২২ নীতিমালায় সব উল্লেখ করে দিয়ে মাদক ব্যবসায় লাইসেন্সপ্রাপ্তি সহজলভ্য করে দেয়া হয়েছে।

মদের লাইসেন্সপ্রাপ্তি এবং বিক্রয় অত্যধিক সহজ করে দেয়া হয়েছে। ২১বছরের ঊর্দ্ধে যে কোন যুবক যুবতী সহকারী অধ্যাপক ক্যাটাগরির একজন ডাক্তারের সুপারিশ নিয়ে মদ্যপানের লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে।

দেশী ও বিদেশী মদের উৎপাদনকে সহজ করা হয়েছে। যে কোন রেস্তোরা বা হোটেল মালিকগণ মাত্র ৫ লক্ষ টাকা খরচ করলেই পেয়ে যাচ্ছেন উৎপাদনের অনুমোদন।

মদ্যপান করে কোন ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলে তার শাস্তির ব্যাপারে কোন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ নেই উক্ত নীতিমালায়।

এভাবে আইন করে মাদকের বিস্তার করা হয়েছে।

সুতরাং মাদক বিস্তারে ভূমিকা রাখা এ কালো আইন বাতিল করে শক্ত আইন প্রয়োগ না করলে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার কিছুতেই বন্ধ করা যাবে না।

করণীয়

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ এর তৃতীয় অধ্যায়ের ১১ নং ধারায় এসেছে: “পারমিট ব্যতীত কোন ব্যক্তি আ্যালকোহল পান করিতে পারিবেন না এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে সিভিল সার্জন অথবা সরকারি মেডিক্যাল কলেজের অন্যূন কোন সহযোগী অধ্যাপকের লিখিত ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত কোন মুসলমানকে আ্যালকোহল পান করিবার জন্য পারমিট প্রদান করা যাইবে না”। এ ধারাটির যথাযোগ্য বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ তে মাদকগ্রহণের শাস্তি স্বরূপ যেসব দণ্ড রাখা হয়েছে সেসব আরো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেইসাথে আ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ এর মাদক বিস্তারে সহযোগি ধারাগুলোকে বিলুপ্ত করতে হবে।

মাদকের ভয়াবহতা বিষয়ে আরো বেশি সচেতনতা তৈরীর লক্ষ্যে স্কুল কলেজ ভার্সিটিসহ সারাদেশে সচেতনতা বৃদ্ধিতে দেশের আলেম সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

মাদক উৎপাদন, পরিবেশন ও চোরাচালান রোধে আরো কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে।

সর্বোপরি সন্তানদের ধর্মীয় মূল্যবোধে চরিত্রবান করতে এবং ভালো বন্ধু নির্বাচনে অভিভাবকদের যত্নবান হতে হবে।

0Shares

আরও জানুন

দাড়িতে আতর ব্যবহার করা কি সুন্নত?

প্রশ্ন হুজুর আসসালামু আলাইকুম। কিছুদিন আগে কোনো একটা লেখায় দেখেছিলাম যে, দাড়িতে বেশি বেশি সুগন্ধী …

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস