প্রচ্ছদ / তালাক/ডিভোর্স/হুরমত / রাগের বশে স্ত্রীকে পর্যায়ক্রমে তিন তালাক দিলে করণীয় কী?

রাগের বশে স্ত্রীকে পর্যায়ক্রমে তিন তালাক দিলে করণীয় কী?

প্রশ্ন

From: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
বিষয়ঃ রাগের বশে ইস্তিরি কে পর্যায়ক্রমে ১ তালাক,২ তালাক ও ৩ তালাক বলে ফেললে

প্রশ্নঃ
আসসালামু আলাইকুম।আশা করি ভাল আছেন হুজুর।বেশ কিছুদিন আগে আমার পারিবারিক কলহের কারনে না বুঝে রাগের বশে আমার ইস্তিরি কে পর্যায়ক্রমে ১ তালাক ২ তালাক ও ৩ তালাক বলে ফেলেছি।এবং আমার একটি ছেলে আছে এবং আমার বউ আমার বাড়িতেই থাকে।এর কিছুদিন পরে আমার বউ অন্তসত্বা হয় (বর্তমানে ৫ মাস)। আমি নিজের ভুল বুঝতে পারি , এবং মহান আল্লাহর কাছে তওবা করতেছি। বিয়টি আমি আমার এক কলিগ ভাইকে শেয়ার করলে তিনি আমাকে আহলে হক মিডিয়ার মাধ্যমে আপনার পরামর্শ নিতে বলেন। হুজুর, আমি ভুল করে ফেলেছি,আমি আমার বউকে ছাড়তে চাই না।  এই মূহুর্তে আমি বিদেশে আছি  দুঃচিন্তায় অসুস্হ হয়ে পড়ছি। এখন আমি কি করব?এজন্য হিল্লা বিয়ের দরকার আছে কি? বা এটা ছাড়া কোন উপায় থাকলে আমাকে দয়া করে তাড়াতাড়ি জানাবেন হুজুর। আমার টেনশনে নাওয়া খাওয়া সব বন্ধ হয়ে গেছে হুজুর।ইয়া আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। তালাক বাক্যটি যে এত ভয়ংকর আগে আমার জানা ছিল না হুজুর। জি আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ্।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

এসব মাসআলার সমাধান লিখতে আমাদের কতটা কষ্ট হয়, তা বুঝাতে পারবো না ভাই। আমাদেরও আল্লাহর রহমাতে স্ত্রী সন্তান আছে। রাগ হলেই তালাক বলতে হবে এটা কি কোন কথা?

কারো গলা কেটে ফেলে ক্ষমা চাইলে ও আফসোস করলে যেমন কোন ফায়দা নেই। তেমনি স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেবার পর আফসোস করে কোন ফায়দা নেই।

তিন তালাক দেবার পর উক্ত মহিলা আর নিজের স্ত্রী থাকে না। পর মানুষ হয়ে যায়। এটিই অমোঘ বিধান। তাই তালাক দেবার আগে চিন্তা করতে হয়। রাগ হলেই তালাক দিতে হবে, এ মানসিকতা পরিহার করতে হবে।

এক্ষেত্রে সূরত একটিই বাকি আছে। তা হল, আপনার সাবেক স্ত্রীর অন্যত্র বিবাহ হতে হবে।তারপর সেই স্বামীর সাথে স্বাভাবিক ঘর সংসার করতে হবে। এমনকি শারিরীক সম্পর্ক হতে হবে। তারপর উক্ত স্বামী যদি আপনার সাবেক স্ত্রীকে তালাক দেয়, তারপর ইদ্দত শেষ হয়, তাহলেই কেবল আপনি আবার উক্ত মহিলাকে বিবাহ করতে পারবেন। এবং আবার ঘর সংসার করতে পারবেন। এছাড়া দ্বিতীয় কোন রাস্তা খোলা নেই।

হুট করে নিজের দীর্ঘ দিনের স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেবার পাগলামির এটাই শাস্তি। নিজের স্ত্রীকে আরেক জনের ঘরে পাঠাতে হয়। তারপর সেই পুরুষ কোন কারণে তালাক দিলেই কেবল আবার উক্ত স্ত্রীকে আবার দ্বিতীয় বিবাহ করে ঘরে তোলা যায়।

এছাড়া কোন পথ নেই।

আমরা আপনার সুন্দর ও শান্তিময় এবং ধর্মীয় জীবন কামনা করি।

দুনিয়া একেবারেই ক্ষণস্থায়ী। দুনিয়ার মোহ মায়ায় আমরা যেন অনন্ত আখেরাতকে বরবাদ না করি। আল্লাহর বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন না করি। প্রতিটি বিধানকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করি।

আল্লাহ তাআলা আপনার জীবনকে সহজ করে দিন। ধৈর্য ধারণ করুন। আমীন।

فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ [٢:٢٣٠]

তারপর যদি সে স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়া হয়, তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অপর কোন স্বামীর সাথে বিয়ে করে না নেবে,তার জন্য হালাল নয়। অতঃপর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়,তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেই। যদি আল্লাহর হুকুম বজায় রাখার ইচ্ছা থাকে। আর এই হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা;যারা উপলব্ধি করে তাদের জন্য এসব বর্ণনা করা হয়। [সূরা বাকারা-২৩০]

وقال الليث عن نافع كان ابن عمر إذا سئل عمن طلق ثلاثا قال لو طلقت مرة أو مرتين فأن النبي صلى الله عليه و سلم أمرني بهذا فإن طلقتها ثلاثا حرمت حتى تنكح زوجا غيرك

হযরত নাফে রহ. বলেন,যখন হযরত ইবনে উমর রাঃ এর কাছে ‘এক সাথে তিন তালাক দিলে ‎তিন তালাক পতিত হওয়া না হওয়া’ (রুজু‘করা যাবে কিনা) বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো,‎তখন তিনি বলেন-“যদি তুমি এক বা দুই তালাক দিয়ে থাকো তাহলে ‘রুজু’ [তথা স্ত্রীকে বিবাহ করা ছাড়াই ফিরিয়ে আনা] করতে পার। ‎কারণ,রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরকম অবস্থায় ‘রুজু’ করার আদেশ দিয়েছিলেন। ‎যদি তিন তালাক দিয়ে দাও তাহলে স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে, সে তোমাকে ছাড়া অন্য স্বামী গ্রহণ করা পর্যন্ত। {সহীহ বুখারী-২/৭৯২, ২/৮০৩}

عن مجاهد قال كنت عند ابن عباس فجاء رجل فقال إنه طلق امرأته ثلاثا. قال فسكت حتى ظننت أنه رادها إليه ثم قال ينطلق أحدكم فيركب الحموقة ثم يقول يا ابن عباس يا ابن عباس وإن الله قال (وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا) وإنك لم تتق الله فلم أجد لك مخرجا عصيت ربك وبانت منك امرأتك

অর্থ: হযরত মুজাহিদ রহঃ. বলেন,আমি ইবনে আব্বাস রাঃ-এর পাশে ছিলাম। সে সময় এক ব্যক্তি ‎এসে বলেন-‘সে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ চুপ করে রইলেন। আমি ‎মনে মনে ভাবছিলাম-হয়ত তিনি তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার কথা বলবেন (রুজু করার হুকুম দিবেন)। কিছুক্ষণ ‎পর ইবনে আব্বাস রা. বলেন,তোমাদের অনেকে নির্বোধের মত কাজ কর;[তিন তালাক দিয়ে দাও!] তারপর ‘ইবনে ‎আব্বাস! ইবনে আব্বাস! বলে চিৎকার করতে থাক। শুনে রাখ আল্লাহ তা‘য়ালা বাণী-“যে ‎ব্যক্তি আল্লাহ তা‘য়ালাকে ভয় করে আল্লাহ তা‘য়ালা তার জন্য পথকে খুলে দেন। তুমিতো স্বীয় রবের নাফরমানী করেছো [তিন তালাক দিয়ে]। এ কারণে তোমার স্ত্রী তোমার থেকে পৃথক হয়ে গেছে। {সুনানে আবু দাউদ-১/২৯৯, হাদীস নং-২১৯৯, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-১৪৭২০, সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-১৪৩}

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল- [email protected]

0Shares

আরও জানুন

ইমামের সামনের সুতরা কি মাসবূক মুসল্লিদের জন্য যথেষ্ট?

প্রশ্ন ইমামের সুতরা মুসল্লিদের জন্য যথেষ্ট কি না? এবং ইমামের সুতরা মসবুক ব্যাক্তির জন্য যথেষ্ট …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *