প্রচ্ছদ / ইলমে হাদীস / মদীনার আলেম শ্রেষ্ট হওয়া এবং ঈমান মদীনায় আশ্রয় নেয়া সংক্রান্ত হাদীসের ব্যাখ্যা কী?

মদীনার আলেম শ্রেষ্ট হওয়া এবং ঈমান মদীনায় আশ্রয় নেয়া সংক্রান্ত হাদীসের ব্যাখ্যা কী?

প্রশ্ন

শ্রদ্ধেয় মুফতী সাহেব,

নিন্মোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা জানতে চাই….

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, «إِنَّ الإِيمَانَ لَيَأْرِزُ إِلَى الْمَدِينَةِ كَمَا تَأْرِزُ الْحَيَّةُ إِلَىجُحْرِهَا.

“ঈমান মদীনার দিকে ফিরে আসবে, যেভাবে সাপ তার গর্তের দিকে ফিরে আসে’’। [সহীহ বুখারী – ১৮৭৬ ও মুসলিম – ৩৭২]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «يَضْرِبُونَ أَكْبَادَ الإِبِلِ يَطْلُبُونَ الْعِلْمَ فَلاَ يَجِدُونَ عَالِمًا أَعْلَمَ مِنْعَالِمِ الْمَدِينَة ‘‘মানুষ হন্যে হয়ে ইলম অনুসন্ধান করবে, তবে মদীনার আলেমের চেয়ে অধিক বিজ্ঞ কোন আলেম তারা খুঁজে পাবে না।’’ [ নাসায়ী: ৪২৭৭ ও হাকেম: ৩০৭ সহীহ]

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

দু’টি পার্টে দু’টি হাদীসের তাহকীক ও ব্যাখ্যা নিচে উদ্ধৃত করা হল।

১ম হাদীসটির ব্যাখ্যা

এ সংক্রান্ত বর্ণিত আগের হাদীসটিও প্রণীধানযোগ্য-

যথা মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে-

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ الْإِسْلَامَ بَدَأَ غَرِيبًا وَسَيَعُودُ غَرِيبًا كَمَا بَدَأَ، وَهُوَ يَأْرِزُ بَيْنَ الْمَسْجِدَيْنِ، كَمَا تَأْرِزُ الْحَيَّةُ فِي جُحْرِهَا»

হযরত ইবনে ওমর রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় ইসলাম নিঃসঙ্গ অসহায় অবস্থায় আবির্ভূত হয়েছিল, আর অচিরেই সে নিঃসঙ্গ হবে আবির্ভূত অবস্থার মত। আর তা দুই মসজিদের মাঝে এসে আশ্রয় নিবে যেমনিভাবে সাপ তার গর্তে আশ্রয় নেয়। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৬, ফাতহুল মুলহিম, হাদীস নং-৩৭১}

এরপরের হাদীস হল-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ الْإِيمَانَ لَيَأْرِزُ إِلَى الْمَدِينَةِ، كَمَا تَأْرِزُ الْحَيَّةُ إِلَى جُحْرِهَا»

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় ঈমান মদীনায় আশ্রয় নিবে যেমনিভাবে সাপ তার গর্তে আশ্রয় নেয়। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৭, ফাতহুল মুলহিম, হাদীস নং-৩৭২}

এর মানে কী?

দুই মসজিদের মাঝে বা শুধু মদীনায় এসে ঈমান আশ্রয় নিবে একথার মানে কি? আল্লামা শাব্বীর আহমাদ উসমানী রহঃ তার সহীহ মুসলিমের সুবিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ “ফাতহুল মুলহিমে লিখেছেন-

والظاهر عندى-والله أعلم-أن هذا وقت خروج الدجال، كما جاء فى الصحيح عن أنس بن مالك رضى الله عنه مرفوعا: ليس من بلد إلا سيطؤه الدجال إلا مكة والمدينة، ليس له من نقابها نقب إلا عليه الملائكة صافين يحرسونها… الحديث، فالمراد-والله أعلم- الإسلام يكون موقرا مأمونا من فتنة المسيح الدجال ورعبه فى هذين المسجدين المكرمين، نبه عليه الدميرى فى حياة الحيوان احتمالا، وقال شيخنا المحمود رحمه الله: أنه هو المراد، والله تعالى أعلم، (فتح الملهم، كتاب الإيمان، باب بيان أن الإسلام بدأ غريبا وسيعود غريبا وأنه يأزر بين المسجدين-2/176-177

আমার কাছে এটিই প্রতিভাত হয় যে [আল্লাহ তাআলাই আসল অবস্থা সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত]। এ সময়টি দাজ্জাল আবির্ভাবের সময়ে হবে। যেমন আনাস বিন মালিক রাঃ থেকে সহীহ গ্রন্থে মারফূ সূত্রে এসেছে যে, “সকল শহরেই দাজ্জাল প্রবেশ করবে মক্কা ও মদীনা ছাড়া। কারণ এর প্রতিটি স্থানেই ফেরেস্তাগণ কাতার ধরে তা প্রহরায় রত রয়েছে। [আলহাদীস]

সুতরাং বুঝা গেল, [আল্লাহ তাআলাই আসল অবস্থা সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত] নিশ্চয় ইসলাম নিরাপদ থাকবে দাজ্জালের ফিতনা থেকে। আর দাজ্জালের জন্য ভীতিকর স্থান হল বাইতুল্লাহ ও মসজিদে নববী। একথাই সম্ভাবনাস্বরূপ উদ্ধৃত করেছেন আল্লামা দিময়ারী রহঃ তার “হায়াতুল হাইওয়ান” গ্রন্থে। আর শায়েখ মাহমুদ রহঃ বলেছেন এটিই মূলত উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা সঠিক বিষয় অবগত। {ফাতহুল মুলহিম-২/১৭৬-১৭৭}

রাসূল সাঃ এর মোহাব্বতে স্বাভাবিকভাবেই দ্বীনদার মানুষেরা মদীনা অভিমূখী হবে।

রাসূল সাঃ এর জীবদ্দাশায় হয়েছিল তাতো পরিস্কার। তারপর সাহাবায়ে কেরামের জমানায় নবীর শিক্ষা পেতে লোকজন সেখানে ভীর করতো। সেই সাথে রাসূল সাঃ এর বলা শ্রেষ্ঠ যুগেও এর দাবি অক্ষুন্ন থাকে।

তাবেয়ী ও তাবেয় তাবেয়ীদের জমানা শেষ হবার পর মানুষ কবর যিয়ারতের জন্য, মসজিদে নববী, নবীজী সাঃ ও সাহাবীদের ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যেও গমণ করবে মদীনায়।

এভাবে ঈমানদারের সর্বযুগেই মদীনায় ফিরে আসবেই। এটাই হল হাদীসের মর্মার্থ। {ফাতহুল মুলহিম দ্রষ্টব্য]

তাহলে কি বুঝা গেল। আমরা দু’টি পয়েন্ট বুঝতে পারলাম। যথা-

১-এটি দাজ্জাল প্রকাশের সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হাদীস। তথা যখন দাজ্জাল প্রকাশিত হবে তখন মদীনাতে সকল ঈমানদারেরা চলে আসবে। এটাই হবে একমাত্র ইলম ও ঈমানের মার্কায।

২-নবীজী সাঃ ও সাহাবী ও তাবেয়ী এবং তাবেয়ীগণের সময়ে হাকীকীভাবে মদীনা ছিল ঈমান ও আমলের মার্কায, তার পরবর্তীতে যিয়ারত, ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন, বরকত হাসীলের উদ্দেশ্যে ঈমানদের সফরের কারণেও মদীনা ঈমান ও আমলের মার্কায হয়ে থাকে।

২ নং হাদীসের ব্যাখ্যা

প্রথমে হাদীসটি দেখে নেই-

عَن أبي هُرَيْرَة رِوَايَةً: «يُوشِكُ أَنْ يَضْرِبَ النَّاسُ أَكْبَادَ الْإِبِلِ يَطْلُبُونَ الْعِلْمَ فَلَا يَجِدُونَ أَحَدًا أَعْلَمَ مِنْ عَالم الْمَدِينَة»

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। ইলমের সন্ধানে মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াবে। তখন তারা মদীনার আলেমের তুলনায় বড় কোন আলেম তারা দেখতে পাবে না। {মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং-২৪৬}

 

এর মানে কি?

মোল্লা আলী কারী রহঃ মিশকাতুল মাসাবীহের প্রখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ “মিরকাতুল মাফাতীহ” এ উপরোক্ত সময়কালটা কখন? এ সম্পর্কে লিখেন-

অনেকেই বলেছেন এটি সাহাবীগণ ও তাবেয়ীগণের জমানা। এরপর মদীনায় থাকা উলামায়ে কেরাম অধিকাংশ ইসলামী সম্রাজ্যের প্রতিটি শহরে শহরে ছড়িয়ে পড়েছেন।[তাই ইযাফতটি জিনসী]

কেউ কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল রাসূল সাঃ। [তাই ইযাফতটি আ’হদী]

দেখুন-মিরকাতুল মাফাতীহ, হাদীস নং-২৪৬}

والله اعلم بالصواب

উত্তর লিখনে

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল- ahlehaqmedia2014@gmail.com

lutforfarazi@yahoo.com

আরও জানুন

মরণোত্তর চক্ষুদান করার হুকুম কী?

প্রশ্ন মুফতী সাহেবের কাছে আমার প্রশ্ন হল, মরণোত্তর চক্ষুদান করার হুকুম কী? দয়া করে জানালে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *