হোম / আহলে হাদীস / মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিল না আহলে হাদীস?
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিল না আহলে হাদীস?

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

উপমহাদেশের অধিকাংশ গায়রে মুকাল্লিদ তথা কথিত আহলে হাদীসরা একথা প্রচার করে থাকে যে, মীর্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী হানাফী ছিল। কাদিয়ানী হানাফী হওয়ার কারণে মুজাদ্দিদ, মসীহ, মাহদী এবং অবশেষে নবুুয়তের দাবি করে থাকে।

একথাও বলা হয় যে, কাদিয়ানী তার অনুসারীদের হানাফীদের অনুসরনের কথা বলে গেছে।

হানাফী ফিক্বহ এবং হানাফীদের অনুসরণের ব্যাপারে মীর্যা কাদিয়ানীর উদ্দেশ্য কী? এটি কাদিয়ানীর নিজের বক্তব্যের আলোকে দেখুন-

প্রতিশ্রুত মসীহ কি হানাফী মাযহাবের হবে?

এরপর মৌলবী বাহাউদ্দীন সাহেব আহমদাবাদী [মির্যা কাদিয়ানীকে] জিজ্ঞেস করল যে, মাকতুবাতে ইমামে রাব্বানীতে প্রতিশ্রুত মাসীহের নিসবত লেখা হয়েছে যে, তারা হানাফী মাযহাবী হবে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য কি?

তখন মির্যা কাদিয়ানী বললঃ “এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যেমন ইমামে আজম কুরআনে কারীম থেকেই দলীল পেশ করে থাকেন, ঠিক তেমনি প্রতিশ্রুত মসীহও কুরআনের ইলম ও হাকীকতকে নিয়ে আসবেন।”

কাদিয়ানী তার মাকতুবাদের অন্য স্থানে আরো স্পষ্ট ভাষায় এ কথার হাকীকত প্রকাশ করে লিখেছেঃ “প্রতিশ্রুত মসীহকে কুরআনের হাকীকতের ইলম দেয়া হবে।” {মালফুযাতে কাদিয়ানী-২/৩২৯}

আপনি নিজেই প্রত্যক্ষ্য করুন, মির্যা কাদিয়ানী এবং তাকে মান্যকারীদের হানাফী মাযহাব বা ফিক্বহে হানাফী ফিক্বহের উপর আমল করার দ্বারা উদ্দেশ্য কি?

তাদের বক্তব্য অনুপাতে হানাফী মাযহাব দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যেমনভাবে ইমাম আজম আবূ হানীফা রহঃ কুরআনে কারীম দ্বারা দলীল পেশ করে থাকেন, এমনিভাবে মির্যা কাদিয়ানী এবং কাদিয়ানীরাও করে থাকে।

কাদিয়ানীরা মূলত ফিক্বহে হানাফীর উপর আমল করে না। বরং তাদের ব্যাখ্যা অনুপাতে ফিক্বহে হানাফীর মূলনীতির মত আমল করে থাকে।

যেসব অপপ্রচারকারীরা মির্যা কাদিয়ানীকে হানাফী মাযহাবের অনুসারী বলে প্রচার করে থাকে, তারা একটু চোখ খুলে দেখুন, মির্যা কাদিয়ানী কি কি শব্দে ফিক্বহে হানাফীর বিরোধীতা করেছে-

হানাফী ফিরক্বা

মির্যা কাদিয়ানী লিখেছে “হানাফীদের দুর্ভাগ্যের কারণে তাদের মাঝে পরিত্যাজ্য বক্তব্য আর বিদআত স্থান নিয়েছে। হযরত ইমাম আজম আবূ হানীফা রহঃ তো শ্রেষ্ঠ পর্যায়ের মুত্তাকী-পরহেযগার ছিলেন। কিন্তু তার অনুসারীদের মাঝে যখন রূহানিয়্যাত বাকি রইল না, তখন তারা আরো বিদআতকে ফিক্বহে হানাফীতে প্রবিষ্ট করিয়ে ফেলে। সেই সাথে এমন ব্যক্তিদের তাকলীদের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘণ করে, যাদের নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়টি কুরআন স্বীকার করে না। রাসূল সাঃ এর বক্তব্যের উপরও তাদের বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়ে বসে। আর নিজেদের মাকসাদ আর উদ্দেশ্যকে ঠিক রেখে ইমাম সাহেবের বক্তব্যকে যেভাবে ইচ্ছে ব্যাখ্যা করে চলে। {মালফুযাতে মির্যা কাদিয়ানী-২/৩৫৬}

প্রিয় পাঠকগণ! উপরোক্ত বক্তব্যগুলো কারা দেয়? হানাফীরা? না আহলে হাদীসরা? আপনাদের বিবেকের কাছেই এর জবাবের ভার ন্যাস্ত করা হল।

শুধু তাই নয়, আহলে হাদীসদের মতবাদের সাথে আরো কত নিবিড় একাত্মতা মির্যা কাদিয়ানী প্রকাশ করেছে, তা ভাল করে দেখুন-

হানাফী শাফেয়ী মালেকী নাম সবই বিদআত?!

গোলাম আহমদ কাদিয়ানী লিখেছে “লোকেরা নিজেদের নাম হানাফী শাফেয়ী ইত্যাদি রেখেছে, এ সবই বিদআত। রাসূল সাঃ এর নাম দু’টিই ছিল। একটি হল মুহাম্মদ আরেকটি হল আহমদ সাঃ। রাসূল সাঃ এর ইসমে আজম হল মুহাম্মদ সাঃ। যেমন আল্লাহ তাআলার ইসমে আজম হল আল্লাহ। আল্লাহ নামটি বাকি সমস্ত নাম তথা হাইয়্যুন, কাইয়্যুম, রহমান, রহীম ইত্যাদির মাউসূফ। রাসূল সাঃ এর নাম আহমদ। …….. এভাইে ইসলামী দলগুলো ভুল করেছে। কেউ নিজেদের নাম হানাফী বলছে, কেউ নিজেদের মালেকী বলছে, কেউ নিজেদের শিয়া, কেউবা সুন্নী বলছে। অথচ রাসূল সাঃ এর নাম ছিল দুইটি। মুহাম্মদ ও আহমদ সাঃ। সুতরাং মুসলমানদের দুটি দলই হতে পারে। মুহাম্মদী বা আহমদী। মুহাম্মদী সে সময় যখন তার মাঝে জালাল তথা তেজস্বীতার প্রভাব প্রবল হবে, আর আহমদী তখন যখন জামাল তথা সৌন্দর্যতা প্রবলতা পাবে। {মালফুযাতে মির্যা কাদিয়ানী- ২/২০৮-২০৯}

সম্মানিত পাঠকগণ! আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিন। মির্যা কাদিয়ানী হানাফী না আহলে হাদীস? যে ব্যক্তি হানাফী শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী বলাকে বিদআত বলে থাকে, মুসলমানদের মুহাম্মদী বা আহমদী বলাতে দাওয়াত দেয়, উক্ত ব্যক্তির নাম হানাফী না আহলে হাদীস?

শুধু কি তাই? আহলে হাদীসদের থিউরী অনুসরন করে মির্যা কাদিয়ানী একথা বলছে যে, হানাফী মাযহাব বিদআতী মাযহাব হয়ে গেছে! আসল মাযহাব থেকে বিকৃত হয়ে গেছে! আর ইমাম আবূ হানীফা রহঃ কে হানাফীরা নাকি নবুওয়তের মর্যাদায় বসিয়ে দিয়েছে নাউজুবিল্লাহ!

হানাফীদের উপর এমন জঘন্য মিথ্যাচার হানাফীরা করে না আহলে হাদীসরা করে? তাহলে মির্যা কাদিয়ানী হানাফী থাকে না আহলে হাদীসদের মতবাদ প্রচারক হয়?

তাযকিরাতুল মাহদী

কাদিয়ানী ধর্মে দিক্ষিত কথিত আলেম সীরাজুল হক নুমানী জামালী আহমদীর লেখা তাজকিরাতুল মাহদীতে সীরাজুল হক সাহেব নিজের ঘটনা এভাবে লিখেন যে, “একদিন হযরতকে আরজ করলাম যে, হুজুর! ওহাবী গায়রে মুকাল্লিদ একটি নাপাক ফিরক্বা তাই না? সে সময় আমি খুবই কট্টর হানাফী ছিলাম। যাইহোক, আমি যখন বললাম, হযরত আপনি তাদের ব্যাপারে কী বলেন? তখন আমার কথা শুনে তিনি হাসি দিয়ে চুপ হয়ে রইলেন। কোন উত্তর দিলেন না।

দ্বিতীয়দিন আমি আবার যখন উক্ত বিষয়ে জানতে চাইলাম, তখন তিনি জবাবে বললেন, ‘দেখ এই ফিরক্বাটিও আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই হয়েছে। এরা খারাপ না। যখন লোকেরা তাকলীদ এবং হানাফিয়্যাত এর উপর এত বেশি জোর দিতে লাগল যে, চার ইমামকে নবুওয়তের স্থানে অধিষ্ঠিত করতে লাগল, তখন আল্লাহ তাআলা স্বীয় উপকারার্থে এ ফিরক্বাটিকে সৃষ্টি করলেন। যাতে করে মুকাল্লিদরা সঠিক পথ ও মধ্যপন্থায় থাকে। তবে এতটুকু বিষয় তাদের মাঝে খারাপ যে, তাদের প্রত্যেকেই মুজতাহিদ ও ইমাম সেজে বসে আছে। সেই সাথে চার ইমামকে খারাপ বলতে শুরু করেছে।’

আমি বললাম, এ ফিরক্বার প্রতিষ্ঠাতা ও পথপ্রদর্শক মৌলবী নজীর হুসাইন সাহেবের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি? তিনি বললেন, ‘আমাদের মাওলানা নজীর আহমাদ সাহেবের উপর সুধারণা আছে। তিনি আল্লাহর ওলী।’

আমি বললাম, হুজুর! আমিতো মৌলবী নজীর হুসাইন সাহেবের ব্যাপারে অনেক খারাপ মন্তব্য করেছি। তিনি বললেন, ‘মাফ চাওয়া উচিত। লোকটি খারাপ না। মানুষ যেমন মনে করে তিনি এমন নয়।’

তারপর যখন হযরতে আকদাসের খেদমত থেকে বিদায় নিলাম, তখন দিল্লি গিয়ে মৌলবী নজীর হুসাইন সাহেবের বাড়িতে গেলাম। আওয়াজ দিলাম। মৌলবী সাহেব বাড়ি থেকে এক বাচ্চাকে পাঠালেন ‘কে এসেছে’ জিজ্ঞাসা করতে। আমি বললাম, আমি একজন মুসাফির। আপনি একটু বাইরে আসুন কিছু কাজ আছে।

তখন মৌলবী নজীর সাহেব বাইরে এলেন এবং আমাকে সালাম দিলেন। বললেন, কি কাজ? আমি বললাম, আরামে বসে বলি, মোড়া চেয়ার কিছু আনতে বলুন।

মৌলবী সাহেব মোড়া আনালেন। আমরা উভয়ে বসে গেলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি থাকেন কোথায়? আমি বললাম, আমি থাকিতো সাহারানপুর। কিন্তু এখন এসেছি কাদিয়ান থেকে। তখনি তিনি বললেন, হযরত মীর্যা গোলাম আহমাদ সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ, তার কাছ থেকেইতো আসছি। একথা শুনে তিনি [গায়রে মুকাল্লিদ মিয়া নজীর আহমাদ সাহেব] বললেন, ‘খুবই ভাল হয়েছে যে, আপনি সেখানে গিয়েছেন এবং তার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি পূর্বে অতিক্রান্ত হওয়া শ্রেষ্ঠ লোকদের একজন।’ ……. আমি কাদিয়ানের সমস্ত আলোচনা তার কাছে বর্ণনা করলাম। আর বললাম, হযরতের [মির্যা কাদিয়ানীর] ইরশাদ অনুপাতে আপনার কাছে এলাম। আপনার ব্যাপারে আমি যে বেআদবীসূচক বাক্য বলেছি সেসবের ব্যাপারে ক্ষমা চাইতে।

মৌলবী সাহেব তখন বললেন, “আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাকে মাফ করে দিলাম। আপনি যখনি কাদিয়ানে যাবেন, তখন হযরত মীর্যা সাহেবকে আমার সালাম জানিয়েন।” তারপর আমি চলে এলাম। {তাযকীরাতুল মাহদী-১/২১৩-২১৫}

এই হল মীর্যা কাদিয়ানী ও আহলে হাদীসদের মাঝে দহরম মহরমের একটি খোল্লামখুলা চিত্র। একজন অপরজনকে মুকাদ্দাস বান্দা গণ্য করছে, অপরজন ওলীআল্লাহ হওয়ার সনদ দিচ্ছে।

এর চেয়ে বড় আর কী সনদ দিতে পারে কাদিয়ানী আর আহলে হাদীসরা পরস্পরে? যদি এর চেয়ে বড় কোন সনদ দিতে পারতো, তাহলে হয়তো তাও দিয়ে দিত।

মির্যা কাদিয়ানীর উম্মত তাযকীরাতুল মাহদীর লেখক উক্ত ঘটনা লেখার সময় শুরুতেই বলে দিয়েছে যে, সে প্রথমে কট্টর হানাফী ছিল।

তাহলে কি বুঝা গেল? মির্যা কাদিয়ানীর কাছে আসার পর আহলে হাদীস কাদিয়ানী হয়েছে।

বাহ! চমৎকার মিল, আহলে হাদীস কাদিয়ানী!

মির্যা কাদিয়ানীর বিবাহ হানাফী আলেম পড়িয়েছে না আহলে হাদীস?

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর বিবাহ ১৭ই নভেম্বর ১৮৮৪ ঈসাব্দে আহলে হাদীস মৌলবী নজীর হুসাইন দেহলবী সাহেব পড়িয়েছেন। {তারীখে আহমাদিয়্যাত-২৪}

যদি মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী হানাফী হতো, তাহলে তার বিবাহ হানাফী আলেম ছাড়া আহলে হাদীস আলেম কেন পড়িয়েছে?

কথিত আহলে হাদীসদের প্রশংসা কাদিয়ানীদের কবিতায়

ইংরেজদের আমলে আহলে হাদীসদের প্রথম প্রথম ওহাবী বলা হতো। তখন গায়রে মুকাল্লিদদের বড় আলেম মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবী ইংরেজদের কাছে দরখাস্ত করে নিজেদের নাম ওহাবীর বদলে “আহলে হাদীস” নামে রেজিষ্ট্রেশন করান। আহলে হাদীস ওহাবীদের ব্যাপারে কাদিয়ানীরা কি বলে দেখুন-

بدعتيوں کا زور تھا مکہ میں آخر نجد سے

یادگار دورہ عبد الوہاب آہی گیا

মক্কায় বেদআতিদের শক্তি ছিল প্রবল অবশেষে,

স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব আব্দুল ওয়াহহাব এসেই গেলেন।

একথা নির্ধিদ্ধায় স্বীকার করেছেন, আহলে হাদীস আলেম মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী স্বীয় কিতাব তাহরীকে ওয়াবিয়্যাত পর এক নজর এর ১৬ নং পৃষ্ঠায়।

লুধিয়ানার উলামায়ে কেরাম ১৮৮৪ ঈসাব্দে মির্যা কাদিয়ানীর লিখিত “বারাহীনে আহমদিয়া” নামক বইয়ের ভিত্তিতে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে কাফের ঘোষণা দেন। {ফাতাওয়ায়ে কাদিরিয়া, লেখক মাওলানা মুহাম্মদ লুধিয়ানবী, পৃষ্ঠা নং-৩}

কিন্তু আহলে হাদীস আলেম মাওলানা মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবী সাহেব তার পুস্তিকা “আশাআতুস সুন্নাহ” এ মির্যা কাদিয়ানীর এ অভিশপ্ত বারাহীনে আহমদিয়াকে নজীরবিহীন গ্রন্থ বলে প্রশংসা করে। আজো আহলে হাদীসদের মুহাক্কিক আলেম মৌলবী ইয়াহইয়া গুন্ধলুয়ী সাহেব বলেন, “বারাহীনে আহমদিয়া এমন কোন কিতাব নয়, যার উপর ভিত্তি করে মির্যা কাদিয়ানীকে কাফির ফাতওয়া দেয়া যায়। {মাতরাকাতুল হাদীস-৩৯}

আহলে হাদীস আলেম সানাউল্লাহ অমৃতসরী আদালতে পর্যন্ত সাক্ষী দিয়ে বলেছেন যে, “মির্যায়ী কাদিয়ানীরা মুসলমান। আর আমি মির্যাকে কাফের বলি না। {ফায়সালায়ে মক্কা-৩৬}

সানাউল্লাহ অমৃতসরী আরো বলেন, “মির্যায়ীদের পিছনে নামায শুদ্ধ হবে।” {আখবারে আহলে হাদীস অমৃতসর-১৯১৫ ঈসাব্দ সংখ্যা}

আহলে হাদীস আলেম মৌলবী ইয়াহইয়া গান্ধলুয়ী, মৌলবী নজীর হুসাইন দেহলবীর শাগরেদ শামসুল হক ঢালয়ানুবী এবং আহলে হাদীসদের আকাবীরে উলামা মির্যায়ীদের কাফের বলতো না, শুধুমাত্র গোমরাহ বলে মন্তব্য করতো। {মাতরাকাতুল হাদীস-৮, ফায়সালায়ে মক্কা-৭}

শায়েখ খুরশীদ আহমদ আহমদী কাদিয়ানী সাহেব তার প্রণীত গ্রন্থ “বাচ্চুকে লিয়ে জামাআতে আহমদিয়া কি মুখতাসার তারীখ” এর ১৯ নং পৃষ্ঠায় লিখেনঃ

“১৮৬৮ বা ১৮৬৯ এর কথা। এক ব্যক্তি হুজুরকে [মির্যা কাদিয়ানীকে] মৌলবী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবী [আহলে হাদীস] সাহেবের সাথে বাহাস করার জন্য নিয়ে গেল। মৌলবী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবী মুসলমানদের ঐ ফিরক্বার সাথে সম্পর্ক রাখতো যাদের আহলে হাদীস বলা হয়। তিনি যেন তাদের ভ্রান্ত হওয়া প্রমাণিত করেন, এ কারণে তাকে [মির্যা কাদিয়ানীকে] নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তিনি মৌলবী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবী সাহেবের কাছে তাদের আক্বিদার কথা জিজ্ঞাসা করেন, আর তার আক্বিদাকে ইসলামের মুতাবিক পেলেন, তখন তিনি বাহাস ও মুকাবিলা করার পরিবর্তে ভরপুর মজলিসে ঘোষণা করলেন যে, “এই আকিদা ঠিক আছে। আমি এ নিয়ে বাহাস করতে রাজি নই।”

যে লোকেরা তাকে বাহাসের জন্য নিয়ে গিয়েছিল, তারা খুবই অসন্তুষ্ট হয়। বলতে থাকে, “আপনি আমাদের অপমান করেছেন।” কিন্তু তিনি বলেন, “আমি যা কিছুই করেছি, তা আল্লাহ তাআলার খাতিরেই করেছি। মানুষের বিরোধীতা করা বা তাদের প্রশংসা করার কোন পরওয়া আমার নেই।”

এ ঘটনায় আল্লাহ তাআলা খুশি হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করতে আল্লাহ তাআলা তার উপর ইলহাম নাজিল করে বলেন, “ খোদা তোমার এ কর্মে খুশি, আর আল্লাহ তোমাকে অনেক বরকত দিবেন, এমনকি বাদশাহরা তোমার কাপড় থেকে বরকত তালাশ করবে।” {বারাহীনে আহমদিয়া-৪/৫২০}

গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ছেলে মির্যা বশীর আহমদ লিখেন,

“একবার ঈসা মসীহ দাবি করার পূর্বে লোকেরা হযরত প্রতিশ্রুত মসীহকে [মির্যা কাদিয়ানীকে] মৌলবী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবীর মুকাবিলায় কতিপয় হানাফী ও ওহাবী মাসায়েলের উপর বাহাস করার জন্য আহবান করে। তখন একটি বড় মজলিসে লোকেরা উক্ত বাহাস শুনার জন্য একত্র হয়। সেসময় মৌলবী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবী সাহেব এক বক্তৃতা দিয়ে লোকদের মাঝে একটি জোশ তৈরী করে ফেলেন।

তখন লোকেরা হযরতের [গোলাম আহমদ কাদিয়ানী] কাছ থেকে জবাব শুনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ ছিল। কিন্তু হযরত সাহেব সামনে থেকে শুধু এতটুকু বলেন যে, “এখনের বক্তৃতায় যা কিছু মৌলবী সাহেব বলেছেন, তাতে আমার এমন কোন কথা দৃষ্টিগোচর হয়নি যা আপত্তিকর। এ কারণে আমি তার জবাবে কিছুই বলবো না। কেননা, আমার উদ্দেশ্য খামাখা বাহাস করা নয়। বরং হককে তাহকীক করা।”

সেসময় হযরতের জবাব শুনে লোকদের মাঝে যে হতাশা ও ক্ষোভ জন্ম নেয় তা পরিস্কার। কিন্তু হযরত হকের মুকাবিলায় স্বীয় প্রসিদ্ধি, সুনাম ও সুখ্যাতির পরোয়া করেননি। বরং ভয় পেয়েছে! ভেগে গেছে! লাঞ্ছিত হয়েছে ইত্যাদি গালি শুনে ওখান থেকে উঠে আসেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলার এ বান্দার এ পরাজয় যা আল্লাহর ওয়াস্তে হয়েছে সেটির খাতিরে সমস্ত বিজয়ের চেয়েও বেশি প্রিয় হয়েছে। এ ঘটনার পর এক রাতও অতিক্রান্ত হয়নি, আল্লাহ তাআলা তার এ বান্দার কাছে ইলহাম পাঠালেন এই মর্মে যে, “খোদার কাছে তোমার এ কর্ম খুবই পছন্দ হয়েছে। আর তিনি তোমাকে অনেক ইজ্জত ও বরকত দিবেন। এমনকি বাদশাহরা তোমার কাপড় থেকে বরকত তালাশ করবে। {সীরাতুল মাহদী-২/৯১-৯২}

বাহ! কি চমৎকার মোহাব্বত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর আহলে হাদীসী মতবাদের প্রতি। তার পরও বেশরম আহলে হাদীস নামধারীরা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নাকি হানাফী একথা প্রচার করে বেড়ায়। অথচ গোলাম আহমদ কাদিয়ানী পুরোই আহলে হাদীস ছিল একথা গোপন করাকে বড় দ্বীনের কাজ মনে করে থাকে।

স্বাধীনচেতা আহলে হাদীসী মানসিকতার কারণেই যে, এ অভিশপ্ত মির্যা গোলাম কাদিয়ানী একবার ঈসা মসীহ আবার নবী হবার মত মারাত্মক দাবি করেছে তাও সাধারণ জনগণ থেকে লুকিয়ে বেড়ায়।

মির্যা কাদিয়ানীর দ্বিতীয় বিবাহ ও আহলে হাদীসদের মোহাব্বতের প্রকাশ

আমার কাছে আমার আম্মা বর্ণনা করেনঃ আমার বিয়ের পূর্বে হযরত সাহেব [মীর্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী] জানতে পারেন যে, তার দ্বিতীয় বিবাহ দিল্লীতে হবে। তখন তিনি বিষয়টি (আহলে হাদীস শায়েখ) মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবীকে জানান। কারণ তখন মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবীর কাছে সমস্ত আহলে হাদীস ঘরের মেয়েদের একটি লিষ্ট থাকতো। আর মীর সাহেবও আহলে হাদীস ছিলেন। এবং তার সাথে অনেক মিল মোহাব্বত ও দেখা সাক্ষাৎ ছিল। তাই বাটালবী সাহেব মীর সাহেবের কথা তুললেন। তখন মীর্যা কাদিয়ানী মীর সাহেবকে চিঠি লিখলেন।
প্রথম প্রথম মীর সাহেব মির্যা কাদিয়ানীর বয়স বেশি হওয়ায় বিয়েতে অমত পোষণ করেন। কিন্তু পরে রাজী হয়ে যান। তারপর মীর্যা কাদিয়ানী সাহেব আমাকে দেখতে দিল্লী আসেন। তার সাথে শায়েখ হামেদ ও অন্যরাও ছিলেন।
বিবাহ পড়িয়েছেন [আহলে হাদীস বিশিষ্ট শায়েখ] মীয়া নজীর হুসাইন।
এটি ২৭শে মুহাররম ১৩০২ হিজরীর সোমবারের কথা। সেসময় আমার বয়স আঠার বছর ছিল। হযরত সাহেব [মির্যা কাদিয়ানী] বিয়ের পর মৌলবী নজীর হুসাইন সাহেবকে পাঁচ টাকা এবং একটি জায়নামায হাদিয়া দিয়েছিলেন।
অধম বলছে যে, সে সময় প্রতিশ্রুত মসীহ সাহেবের বয়স ছিল ৫০ বছরের কাছাকাছি ছিল।
আব্বাজী বলতেন যে, তোমার চাচা আমার বিয়ের দেড় দুই বছর আগেই ইন্তেকাল করেছেন। আমি বলছি যে, চাচা ১৮৮৩ ঈসাব্দে ইন্তেকাল করেছেন। যেটি বারাহীন রচনার শেষ সময় ছিল। আর আব্বাজানের বিবাহ ১৮৮৪ ঈসাব্দের নভেম্বরে হয়েছে।
আমি আম্মিজান থেকে জানতে পারলাম যে, প্রথমে বিয়ে ঠিক করা হয়েছিল রোববার দিন, কিন্তু হযরত বলে সোমবারে নির্ধারণ করেছেন। {সীরাতুল মাহদী-১/৫১, লেখক- মীর্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর ছেলে মীর্যা বশীর আহমাদ}

সীরাতুল মাহদীর আরেকটি ইবারত দ্রষ্টব্য

কাদিয়ানীর আহলে হাদীস স্ত্রী বলছেনঃ “মৌলবী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবীর সাথে তোমার নানার অনেক গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনিই কয়েকবার তোমার আব্বার জন্য সুপারিশ করে চিঠি লিখেন। সেই সাথে অনেক চাপাচাপি করে বলেন, মির্যা সাহেব খুবই ভাল ও অভিজাত খান্দানী ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আমার মন মানছিল না। কারণ, একেতো বয়সের অনেক পার্থক্য ছিল। দ্বিতীয়ত আমরা দিল্লি অধিবাসীরা পাঞ্জাবীদের প্রতি খুবই নাখোশ ছিলাম। অবশেষে একদিন মীর সাহেব লুধিয়ানার বাসিন্দা এক ছেলের ব্যাপারে বলল যে, তাদের পক্ষ থেকে অনেক পীড়াপীড়িমূলক আবেদন আছে। সেই সাথে তারা মানুষও অনেক ভাল। তাই এই সম্পর্ক করে নেয়া উচিত। আমি লোকটির পরিচয় জানতে চাইলাম। তখন আমার কাছে বিষয়টি পরিস্কার হল না। এ কারণে আমি অস্বিকৃতি জানিয়ে দিলাম। আমার আচরণে মীর সাহেব খুবই নারাজ হয়ে বললেন, বয়সতো আঠার বছর হয়ে গেছে, সারা জীবন কি তুমি এভাবে বসে থাকবে? আমি তখন জবাবে বললাম, আরে এই লোকের চেয়েতো গোলাম আহমদ হাজার গুণ ভাল।

মীর সাহেব তখন চট করে একটি চিঠি বের করে আমার সামনে রাখলেন। বললেন, নাও গোলাম আহমদের চিঠিও এসেছে। যা কিছুই হোক না কেন, আমাদের চটজলদি ফায়সালা করতে হবে। আমি বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে গোলাম আহমদকেই লিখে দাও।

সেই সময়ই তোমার নানাজান দোয়াত কলম নিয়ে লিখে দিলেন। এর ৮দিন পর তোমাদের আব্বা দিল্লি আসলেন। তার সাথে দুইজন চাকর ছিল। আর কিছু হিন্দু ও মুসলমান সাথি ছিল। {সীরাতে মাহদী-২/১১১}

সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ! এত দহরম মহরম আহলে হাদীসদের সাথে আর আহলে হাদীস নামধারীরা প্রচার করছে যে, গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নাকি হানাফী ছিল।

অল্প বয়স্ক আহলে হাদীস মেয়েকে আহলে হাদীস গুরু মুহাম্মদ হুসাইন বাটালবী মোহাব্বতের দোস্ত গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মত ৫০বছরের বুড়োর কাছে কি স্বার্থে বিয়ে দিয়েছিলেন? শুধুই আহলে হাদীস ভাই ভাই এই কারণে নয়কি? ৫০ বছরের বুড়ো মির্যা কাদিয়ানীর বিয়ে ১৮ বছরের আহলে হাদীস পরিবারের সাথে দিয়ে মোহাব্বতের পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন তৎকালিন আহলে হাদীস গুরুজনেরা।

চলবে ইনশাআল্লাহ

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

শানে উলামায়ে কেরাম এবং আলেমদের সাথে বেআদবীর পরিণাম

ডাউনলোড লিংক