হোম / ভ্রান্ত মতবাদ / হেযবুত তাওহীদের ভ্রান্ত মতবাদ (৮)
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

হেযবুত তাওহীদের ভ্রান্ত মতবাদ (৮)

বর্তমান ইসলামকে বিকৃত প্রমাণে হাদীসের অপব্যক্ষা

হেযবুত তাওহীদের বক্তব্যঃ 

মহানবী ভবিষ্যদ্বাণী কোরেছেন –আমার উম্মাহর আয়ূ ৬০/৭০ বছর (হাদিস –আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে তিরমিযি ও ইবনে মাযাহ, মেশকাত)”

তারপর তিনি এই হাদিসের অর্থ ব্যাখ্যা করেন এভাবে: “অর্থাৎ তাঁর উম্মাহ পৃথিবীতে থাকবে ৬০/৭০ বছর, তারপর যেটা হবে সেটা নামে মাত্র উম্মতে মোহাম্মদী, সেটা প্রকৃত পক্ষে উম্মতে মোহাম্মদী নয়।(এসলামের প্রকৃত রূপরেখা-৪৯)

পর্যালোচনাঃ

পন্নী এই হাদিসটি বুঝতে সাংঘাতিকভাবে ভুল করেছেন। হাদিসটির বিষয় মানুষের বয়সের গড়-সীমা নিয়ে। অর্থাৎ সাধারণভাবে এই উম্মতের লোকদের আয়ুষ্কাল হবে তাদের জীবনের ষাট ও সত্তর দশকের সীমায়: ষাট বলতে ৬০-৭০ আর সত্তর বলতে ৭০-৮০। এই হাদিসটি সেই সুদূরের অতীত থেকে আমাদের একাল পর্যন্ত এই অর্থেই বুঝা হয়েছে।

হাদিসটির বর্ণনা-ই এসেছে ‘উম্মতের লোকদের আয়ুষ্কালের’ পরিচ্ছেদে ।

সুনানে তিরমিযিতে হাদীসটি উল্লেখিত হয়েছে এভাবে-

باب مَا جَاءَ فِي فَنَاءِ أَعْمَارِ هَذِهِ الأُمَّةِ مَا بَيْنَ السِّتِّينَ إِلَى السَّبْعِينَ

পরিচ্ছদঃ এই উম্মতের বয়স ষাট থেকে সত্তরের মধ্যে হওয়া

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِﷺ عُمُرُ أُمَّتِي مِنْ سِتِّينَ سَنَةً إِلَى سَبْعِينَ سَنَةً ‏

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ আমার উম্মতের বয়স হল ষাট থেকে সত্তর বছর পর্যন্ত। (সুনানে তিরমিযি,ইঃফা,হাদীস নং-২৩৩৪)

বিজ্ঞ পাঠক! চলুন এবার আরো কয়েকটি হাদীসের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক

১.

عَنْ ثَوْبَانَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ

সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ আমার উম্মাতের একটি দল সর্বদাই হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তাঁদের সঙ্গ ত্যাগ করে কেউ তাদের কোন অনিষ্ট করতে পারবে না। এমন কি এভাবে আল্লাহর আদেশ অর্থাৎ কিয়ামত এসে পড়বে আর তারা যেমনটি ছিল তেমনটই থাকবে। (সহীহ মুসলিম-ইঃফা,হাদীস নং-৪৭৯৭)

২.
عن عمران بن حصين، قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ لا تزال طائفة من امتي يقاتلون على الحق ظاهرين على من ناواهم حتى يقاتل اخرهم المسيح الدجال ‏”‏ ‏.‏

জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নাবী ﷺ-কে বলতে শুনেছিঃ
কিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মাতের একদল হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বাতিলের বিরুদ্ধে কিতাল করতে থাকবে এবং অবশেষে ঈসা (আলাইহিস সালাম) অবতরণ করবেন। মুসলমানদের আমীর বলবেনঃ আসুন, সালাতে আমাদের ইমামত করুন। তিনি উত্তর দিবেনঃ না, আপনাদেরই একজন অন্যদের জন্য ইমাম নিযুক্ত হবেন। এ হল আল্লাহর প্রদত্ত এ উম্মাতের সম্মান। (সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বরঃ ২৯২)

৩.
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ وَلاَ تَزَالُ عِصَابَةٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ نَاوَأَهُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে দ্বীনের বুৎপত্তি (বুঝ) দিয়ে থাকেন এবং মুসলমানদের একটি দল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে লড়াই করবে। যারা তাদের প্রতি বিরূপ ভাব পোষণ করবে তাদের বিরুদ্ধে থাকবে তারা তাদের উপর বিজয়ী থাকবে। কিয়ামত অবধি এভাবে চলতে থাকবে।(সহীহ মুসলিম-ইঃফা,হাদীস নং-৪৮০৩)

৪.
حَدَّثَنِي إِسْحَاقُ، حَدَّثَنَا النَّضْرُ، أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ، عَنْ أَبِي جَمْرَةَ، سَمِعْتُ زَهْدَمَ بْنَ مُضَرِّبٍ، سَمِعْتُ عِمْرَانَ بْنَ حُصَيْنٍ ـ رضى الله عنهما ـ يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ خَيْرُ أُمَّتِي قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ‏”‏‏.‏ قَالَ عِمْرَانُ فَلاَ أَدْرِي أَذَكَرَ بَعْدَ قَرْنِهِ قَرْنَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا ‏”‏ ثُمَّ إِنَّ بَعْدَكُمْ قَوْمًا يَشْهَدُونَ وَلاَ يُسْتَشْهَدُونَ، وَيَخُونُونَ وَلاَ يُؤْتَمَنُونَ، وَيَنْذُرُونَ وَلاَ يَفُونَ، وَيَظْهَرُ فِيهِمُ السِّمَنُ

ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, আমার উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। ‘ইমরান (রাঃ) বলেন, তিনি তাঁর যুগের পর দু’যুগ অথবা তিন যুগ বলেছেন তা আমার স্মরণ নেই। অতঃপর এমন লোকের আগমন ঘটবে যারা সাক্ষ্য প্রদানে আগ্রহী হবে অথচ তাদের নিকট সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে তাদেরকে কেউ বিশ্বাস করবে না। তারা মানত করবে কিন্তু তা পূরণ করবে না। তারা হবে চর্বিওয়ালা মোটাসোটা। (সহীহ বুখারী,আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩৭৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৩৮৫)

সারসংক্ষেপঃ

১.পন্নী সাহেব যে হাদীস উল্লেখ করে ইসলামকে বিকৃত প্রমাণের চেষ্টা করেছেন ,সে হাদীস থেকে কিছুতেই তার দাবি প্রমাণ হয় না।কারণ হাদীসটি উম্মতের গড় আয়ু সম্পর্কে।

২.উম্মতের একটি দল সকল যুগে অবশ্যই হক্বের উপর থাকবে।সুতরাং ইসলাম কিছু সময় পর বিকৃত হয়ে গিয়েছে- এমন কথা সরাসরি হাদীস বিরোধী।

৩.প্রকৃত উম্মতে মুহাম্মাদীর সময়কাল যদি ৬০-৭০ বছরের মধ্যে হয় তাহলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তিনটি যুগকে সোনালী যুগ বলার যৌক্তিকতা কি?

৪.পন্নী সাহেবের ব্যাখ্যা সঠিক হলে বলতে হয়, পন্নীর প্রতিষ্ঠিত হেযবুত তওহীদও প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মাদী নয়।কারণ তার এই দলের জন্মও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাদীসে বর্ণিত ৬০-৭০ বছরের সময়সীমার পর।

সুতরাং প্রমাণিত হল পন্নী সাহেবের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ হাদীস বিরোধী।

এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় সম্পর্কে আল্লহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেনঃ

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

“রাসূল তোমাদের যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা তোমাদের নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক”। (সূরা হাশর, আয়াত -০৭)

ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺃَﻃِﻴﻌُﻮﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺭَﺳُﻮﻟَﻪُ ﻭَﻻ ﺗَﻮَﻟَّﻮْﺍ ﻋَﻨْﻪُ ﻭَﺃَﻧْﺘُﻢْ ﺗَﺴْﻤَﻌُﻮﻥَ
“হে মুমিনগণ, আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর আর শুনার পর তা থেকে মুখ তোমরা ফিরিয়ে নিও না”। (সূরা আন-আনফাল, আয়াত-২০)

ﻗُﻞْ ﺃَﻃِﻴﻌُﻮﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺍﻟﺮَّﺳُﻮﻝَ ﻓَﺈِﻥْ ﺗَﻮَﻟَّﻮْﺍ ﻓَﺈِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻻ ﻳُﺤِﺐُّ ﺍﻟْﻜَﺎﻓِﺮِﻳﻦَ
“তুমি বল, আল্লাহর ও রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় নিশ্চয় আল্লাহ অবিশ্বাসীদেরকে ভালবাসেন না”।(সূরা আলে-ইমরান,আয়াত-৩২)

ﻭَﻣَﻦْ ﻳُﺸَﺎﻗِﻖِ ﺍﻟﺮَّﺳُﻮﻝَ ﻣِﻦْ ﺑَﻌْﺪِ ﻣَﺎ ﺗَﺒَﻴَّﻦَ ﻟَﻪُ ﺍﻟْﻬُﺪَﻯ ﻭَﻳَﺘَّﺒِﻊْ ﻏَﻴْﺮَ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ ﻧُﻮَﻟِّﻪِ ﻣَﺎ ﺗَﻮَﻟَّﻰ ﻭَﻧُﺼْﻠِﻪِ ﺟَﻬَﻨَّﻢَ ﻭَﺳَﺎﺀَﺕْ ﻣَﺼِﻴﺮًﺍ
“আর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তার জন্য হিদায়াত স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও এবং মুমিনের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফেরাব, যেদিকে সে ফিরে যেতে চায় এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে আর তা খুবই নিকৃষ্টতর আবাসস্থল”। (সূরা আন-নিসা, আয়াত-১১৫)

ﻭَﻳَﻮْﻡَ ﻳَﻌَﺾُّ ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻢُ ﻋَﻠَﻰ ﻳَﺪَﻳْﻪِ ﻳَﻘُﻮﻝُ ﻳَﺎ ﻟَﻴْﺘَﻨِﻲ ﺍﺗَّﺨَﺬْﺕُ ﻣَﻊَ ﺍﻟﺮَّﺳُﻮﻝِ ﺳَﺒِﻴﻼ ﻳَﺎ ﻭَﻳْﻠَﺘَﻰ ﻟَﻴْﺘَﻨِﻲ ﻟَﻢْ ﺃَﺗَّﺨِﺬْ ﻓُﻼﻧًﺎ ﺧَﻠِﻴﻼ ﺃَﺿَﻠَّﻨِﻲ ﻋَﻦِ ﺍﻟﺬِّﻛْﺮِ ﺑَﻌْﺪَ ﺇِﺫْ ﺟَﺎﺀَﻧِﻲ ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ ﻟِﻺﻧْﺴَﺎﻥِ ﺧَﺬُﻭﻻ

“জালেম সেদিন আপন হস্তদ্বয় দংশন করতে করতে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রসূলের সাথে পথ অবলম্বন করতাম।হায় আমার দূর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়”।
(সূরা ফুরকান,আয়াতঃ ২৭-২৯)

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও সাহাবা সমালোচকদের পরিণতি

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাগণের মর্যাদা ও ফযীলত কুরআন ও হাদীসের …