প্রচ্ছদ / আকিদা-বিশ্বাস / ‘আবজাদ’ সংখ্যা মান কী? এর দ্বারা কোন কিছু প্রমাণ করা যাবে কি?

‘আবজাদ’ সংখ্যা মান কী? এর দ্বারা কোন কিছু প্রমাণ করা যাবে কি?

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আমার নাম মামুন হোসেন।

আমার আসলে অনেকগুলো প্রশ্ন আছে। তবুও সংক্ষেপে উপস্থাপন করলাম।

সম্প্রতি ইউটিউবে, আমি পাকিস্তানের শাজলি তরিকার একজন মুফতির বয়ানে আবজাদ সংখ্যা সম্পর্কে জানতে পারি। কিন্তু এটি সুন্নাহ পদ্ধতি কি না তা আমার জানা নেই এবং আমার মনে হয় যে, এই বিষয়টা নিউমেরোলজি বা জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি অংশ।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে-

আবজাদ সংখ্যা দিয়ে কোন কিছুর অনুমান বা ভবিষ্যতের কোন কিছু বলা সুন্নাহভিত্তিক কি না এবং এর জায়েজ হওয়ার প্রমাণ আছে কি?

আবজাদ সংখ্যা দিয়ে তাবিজ দেওয়া কিংবা অংক কষে যোগ বা ভাগ ইত্যাদি করে কোন ছেলে ও মেয়ের বিয়ে-শাদী কেমন হবে তা অনুমান করা, পুত্র বা কন্যা সন্তান হবে কি না, নিজে কোন অসুস্থতায় ভুগছি কিনা বা জ্বীনের আছর আছে কি না ইত্যাদি বিষয় আবজাদ সংখ্যা দিয়ে অনুমান করা কি জাদু বিদ্যার অংশ বলে গন্য হবে?

কুরানের কোন এক বা একাধিক আয়াতের আবজাদ সংখ্যা বের করে, ঐ সংখ্যায় যদি সেই আয়াত বা একাধিক আয়াত পড়া হয়, তাহলে কি উক্ত আমলের বরকত হাসিল হবে? আল্লাহর বিভিন্ন পবিত্র নামের আবজাদ বের করে উক্ত সংখ্যায় পাঠ কি বৈধ হবে?

যদি আবজাদ সংখ্যা বের করা জায়েজ না হয়ে থাকে তাহলে কোন আয়াতকে বা আল্লাহর পবিত্র নামসমুহের যেকোন নামকে অজিফা বানিয়ে কিভাবে পাঠ করবো? অর্থাৎ কোন আয়াত কত বার পাঠ করতে হবে এটা কিভাবে জানবো?

যেহেতু প্রতিটা আয়াতেই মুমিনের জন্য বরকত রয়েছে তবে উক্ত বরকত কিভাবে হাসিল হবে?

কোন দোয়া বা অজিফা পাঠের ক্ষেত্রে সংখ্যা নির্দিষ্ট করা কি সুন্নাহভিত্তিক হবে?

অনুগ্রহ করে একটু জানাবেন, প্লিজ।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

আপনার প্রশ্নটির উত্তর বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে আবজাদী সংখ্যাতত্ত্ব সম্পর্কে বুঝতে হবে।

এটাকে আরবীতে হিছাবুল জুম্মাল বলা হয়। অন্য শব্দে ইলমুল আবজাদীও বলে।

আবজাদী সংখ্যা মান হল, সাধারণত আরবী অক্ষর যেভাবে ধারাবাহিকভাবে লেখা ও পড়া হয়, সেটা থেকে ভিন্ন তরতীবে তা সাজিয়ে প্রতিটি সংখ্যার একটি করে মান সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। যথা-

ابجد

أ= 1 ، ب=2، ج=3، د =4،

هوز

 هـ = 5، و=6، ز=7

حطى

ح=8، ط=9، ى=10

كلمن

ك=20، ل=30، م=40، ن= 50

سعفص

س=60، ع=70، ف= 80، ص=90

قرشت

ق=100، ر= 200، ش=300، ت= 400

ثخذ

ث=500، خ=600، ذ=700،

ضظغ

ض-800، ظ=900، غ=1000،

আবজাদী সংখ্যামান বিদ্যার সাথে দ্বীন ও ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এটা কোন ইসলামী বিদ্যাও নয়। নবীজীর আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই এ সংখ্যাতত্ত্ব মানুষের মাঝে প্রচলিত ছিল। যা মূলত ইহুদী ও খৃষ্টানরা আবিস্কার করেছে।

তারা এসব ব্যবহার করে কুরআনের অপব্যাখ্যা ও ভুল তাফসীরের অপচেষ্টাও করেছে।

যেমন-

সূরা মরিয়ামের كهيعص আয়াতের আবজাদী সংখ্যা মান ১৯৫।

আবার খৃষ্টানদের আকীদা, المسيح الهى তথা ঈসা আলাহিস সালাম  আল্লাহ” এ বাক্যের সংখ্যা মানও ১৯৫।

এ হিসেবে খৃষ্টানরা উক্ত আয়াতের অপব্যাখ্যা করে বলে যে, উক্ত হুরুফে মুকাত্তাআত দ্বারা ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ বলার কথা বর্ণিত হয়েছে। নাউজুবিল্লাহ।

অথচ ১৯৫ আবজাদী সংখ্যা মান শুধু المسيح الهى ই হয় না, বরং আরো অনেক বাক্যও হতে পারে। যেমন-

ক)

أحمد نبي يوحى إليه “আহমাদ নবী তার কাছে অহী পাঠানো হয়” এ বাক্যের সংখ্যা মানও ১৯৫।

খ)

الله بلا ولد أو والد أبدا তথা “আল্লাহর সন্তান বা পিতা ছিল না কখনোই” এ বাক্যের সংখ্যা মানও ১৯৫।

গ) لا ولد أو والد هو لله তথা “সন্তান ও পিতা নেই, তিনিই আল্লাহ” বাক্যটির সংখ্যামানও ১৯৫।

ঘ) الله أحد ولا إله إلا هو তথা “আল্লাহ তাআলা একক তাকে ছাড়া কোন ইলাহ নেই” বাক্যটির সংখ্যা মানও ১৯৫।

তাই খৃষ্টানদের উক্ত আয়াতাংশের সংখ্যা মান দিয়ে ঈসা আলাহিস সালামকে আল্লাহ দাবী করাটা হাস্যকর দাবী ছাড়া কিছু নয়। কারণ, তখন আমাদের উপস্থাপিত বিষয়ও উক্ত সংখ্যা মান দিয়েই প্রমাণিত হয়ে যাবে।

বুঝা গেল, সংখ্যা মান দিয়ে কোন কিছুর ব্যাখ্যা করাটা একটা অন্তসারশূণ্য বিষয় ছাড়া কিছু নয়।

এ কারণে পরিস্কার জেনে রাখতে হবে যে,

আবজাদী সংখ্যামান দিয়ে ইসলামী শরীয়তের কোন বিধান, কোন কোন আকীদা ইত্যাদি প্রমাণ করার কোন সুযোগ নেই।

এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্কও নেই।

তাই এ সংখ্যাতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে কোন কিছু অনুমান করা, বিয়েশাদীর কল্যাণ অকল্যাণ নির্ধারণ করা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েজ।

ভবিষ্যতের কোন কিছু জানার দাবী করা, যাদু করা ইত্যাদি কর্ম এসব সংখ্যামানের মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্পূর্ণরূপে হারাম।

তবে যদি এসব দ্বারা কোন জায়েজ পদ্ধতির জায়েজ কাজ করা হয়। যেমন তারিখ মুখস্ত রাখার জন্য আবজাদী সংখ্যা মান বের করা। বা কুরআনের আয়াতের সংখ্যামান বের করে উপকারার্থে ব্যবহার করা ইত্যাদি যদি কোন গলদ আকীদার সাথে না হয়, তাহলে এমনটি করা জায়েজ আছে।

কিন্তু আয়াতের সংখ্যামান কখনোই মূল আয়াত নয়। সুতরাং সংখ্যামান পাঠ করার দ্বারা আয়াত তেলাওয়াতের সওয়াব হবে না।

আল্লাহর নাম বা আয়াত ওয়াজিফা হিসেবে পাঠ করার জন্য আবজাদী সংখ্যা বের করতে হবে এমন ধারণা অমূলক।

আবজাদী সংখ্যামানের মাধ্যমে অজিফার সংখ্যা নির্ধারণ করা শরীয়ত সিদ্ধ নয়।

সুতরাং এটা একটি অহেতুক ও অমূলক চিন্তা ছাড়া কিছু নয়।

বরং সরাসরি আয়াত তিলাওয়াতের মাধ্যমেই কেবল সওয়াব ও ফযীলত করা সম্ভব। সংখ্যামান পাঠের দ্বারা কোন সওয়াব হবে না।

হাদীসের মাঝে যেসব সংখ্যা উল্লেখ করা আছে, সে অনুপাতে আমল করাটাই সুন্নাহ সম্মত।

এছাড়া নিজের পক্ষ থেকে সংখ্যা নির্ধারণ করে আমল  করে উক্ত সংখ্যাকে সুন্নাত বলা গর্হিত বিদআতের অন্তর্ভূক্ত হবে। তাই তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

روي: «أنه عليه الصلاة والسلام لما أتاه اليهود تلا عليهم الم البقرة. فحسبوه وقالوا: كيف ندخل في دين مدته إحدى وسبعون سنة، فتبسم رسول الله صلّى الله عليه وسلّم فقالوا: فهل غيره، فقال: المص والر والمر، فقالوا: خلطت علينا فلا ندري بأيها نأخذ» (تفسير البيضاوى، سورة البقرة-34، 14، تفسير المظهرى-1/13)

قال شيخ الإسلام ابن تيمية  تعالى: “ فَهَذِهِ الْأُمُورُ الَّتِي تُوجَدُ فِي ضَلَالِ الْيَهُودِ وَالنَّصَارَى وَضَلَالِ الْمُشْرِكِينَ وَالصَّابِئِينَ مِنْ الْمُتَفَلْسِفَةِ وَالْمُنَجِّمِينَ: مُشْتَمِلَةٌ مِنْ هَذَا الْبَاطِلِ عَلَى مَا لَا يَعْلَمُهُ إلَّا اللَّهُ تَعَالَى. وَهَذِهِ الْأُمُورُ وَأَشْبَاهُهَا خَارِجَةٌ عَنْ دِينِ الْإِسْلَامِ مُحَرَّمَةٌ فِيهِ؛ فَيَجِبُ إنْكَارُهَا وَالنَّهْيُ عَنْهَا عَلَى الْمُسْلِمِينَ عَلَى كُلِّ قَادِرٍ: بِالْعِلْمِ وَالْبَيَانِ وَالْيَدِ وَاللِّسَانِ فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ أَعْظَمِ مَا أَوْجَبَهُ اللَّهُ مِنْ الْأَمْرِ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهْيِ عَنْ الْمُنْكَرِ وَهَؤُلَاءِ وَأَشْبَاهُهُمْ أَعْدَاءُ الرُّسُلِ وَسُوسُ الْمِلَلِ. ” (مجموع الفتاوى-35/190)

وهذا الحساب ” باطل مردود؛ لأنه طريق غير مقبول للفهم في كلام العرب، ولا يجوز فهم القرآن بغير طرائق فهمهم، ولما في ذلك من فتح لأبواب الباطل. فإن كتاباً كبيراً لا يخلو من أن تتفق فيه كلمات أو حروف مع رقم ما، فهل نجعل ذلك دليلاً على حقية ما يزعمه أصحاب هذا الرقم ؟ ” (علوم القرآن الكريم، د. نور الدين عتر، ص159)

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক ও প্রধান মুফতী-তা’লীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

আরও জানুন

সেলুনে চুল কাটার পর গোসল ফরজ কি?

প্রশ্নঃ সেলুনে চুল কাটার পর গোসল ফরজ কি? উত্তর بسم الله الرحمن الرحيم চুল কাটার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *