প্রচ্ছদ / পরিবার ও সামাজিকতা / অশান্তিময় পরিবারে শান্তি আসবে যেভাবে

অশান্তিময় পরিবারে শান্তি আসবে যেভাবে

প্রশ্নঃ

আসসালামু আলাইকুম।
হুজুর আমার স্বামী আমাকে অনেক সন্দেহ করে। ছোট ছোট বিষয়ে আমাদের মাঝে অনেক ঝগড়া হয়। শান্তি একদম নেই। এটার জন্য কোন আমল করতে পারি?

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
حامدا ومصليا ومسلما

উত্তরঃ

বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর ছেলে ও মেয়ে পরস্পর স্বামী–স্ত্রী হয়ে যায়। আর শরী‘আতে স্বামী–স্ত্রীর একে অপরের ওপর বহু অধিকার নির্ধারিত রয়েছে, যেগুলোর আদায় উভয়ের জন্যই আবশ্যক। স্বামী যদি তুচ্ছ ও সামান্য বিষয়ে রাগান্বিত হয়ে পড়ে, তবে তার উচিত ছোটখাটো বিষয়কে কেন্দ্র করে অসন্তুষ্ট না হওয়া। স্বামী–স্ত্রী উভয়েরই উচিত নামায ও অন্যান্য শরী‘আতসম্মত বিধান যথাযথভাবে পালন করা। পারস্পরিক ঐক্য ও সৌহার্দ্য বজায় রাখার মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া ও আল্লাহভীতি। একে অপরের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকতে হবে এবং পারিবারিক ও পারস্পরিক লেনদেনে ধৈর্য ও সহনশীলতার পথ অবলম্বন করতে হবে।

কুরআনুল কারীমের এই বরকতময় আয়াতটি,
﴿وَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ لَوْ أَنفَقْتَ مَا فِي الأَرْضِ جَمِيعاً مَّا أَلَّفَتْ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ أَلَّفَ بَيْنَهُمْ إِنَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ﴾
প্রতিটি ফরয নামাযের পর ১১ বার পাঠ করে খাঁটি অন্তর থেকে দো‘আ করা উচিত। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহ ও করুণায় হৃদয়সমূহকে একত্র করে দেবেন।

এছাড়াও স্বামীকে ইসলামে বর্ণিত স্ত্রীর অধিকারসমূহ সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেছেন,
﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا﴾
(সূরা নিসা: ১৯)
“আর তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে সদাচরণ ও উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে জীবনযাপন করো। যদি তারা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয় হয়, তবে (স্মরণ রেখো) সম্ভবত তোমরা এমন একটি বিষয় অপছন্দ করছ, যার মধ্যেই আল্লাহ তাআলা প্রচুর কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।”
(বয়ানুল কুরআন)

হাদীসে এসেছে,
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তি ঈমানে সবচেয়ে পরিপূর্ণ, যে চরিত্রে সর্বাধিক উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীদের প্রতি উত্তম আচরণকারী।”
(তিরমিযী; মিশকাতুল মাসাবীহ)

অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের জন্য তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।”
(মিশকাতুল মাসাবীহ)

আরেক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে,
“কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করে। যদি তার কোনো একটি স্বভাব তার কাছে অপছন্দনীয় হয়, তবে অবশ্যই তার মধ্যে অন্য কোনো স্বভাব এমন থাকবে, যা তার পছন্দনীয়।”
(সহীহ মুসলিম)

ঠিক তেমনিভাবে স্ত্রীরও উচিত সামান্য বিষয়কে পারস্পরিক বিরোধের কারণ না বানানো, ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এবং ক্ষমাশীলতার অভ্যাস গড়ে তোলা। এভাবেই পরিবারে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। যে নারী স্বামীর অবাধ্যতা করে, তার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে; আর যে নারী স্বামীর আনুগত্য ও অনুগমন করে, তার জন্য এসেছে মহা ফযীলতের সুসংবাদ।
হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
“আমি যদি কাউকে (আল্লাহ ছাড়া) কারো প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতে পারতাম, তবে অবশ্যই নারীকে তার স্বামীর প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম।”
(তিরমিযী; মিশকাতুল মাসাবীহ)

আরেক হাদীসে এসেছে,
“যে নারী তার পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করে, রমযানের রোযা রাখে, নিজের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে—সে যে কোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।”
(আবু নু‘আইম; মিশকাতুল মাসাবীহ)

সারকথা হলো:
স্ত্রীর উচিত তার স্বামীকে নিজের ওপর প্রাধান্য দেওয়া, তার প্রতি বিশ্বস্ত ও অনুগত থাকা, তার কল্যাণকামিতা ও সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট থাকা, এবং নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণকে স্বামীর সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত মনে করা। আর স্বামীর উচিত তার স্ত্রীকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক মহান নিয়ামত হিসেবে গণ্য করা, তার কদর করা, তাকে ভালোবাসা, তার কোনো ভুল হলে উদারতার সঙ্গে ক্ষমা করে দেওয়া, ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে তার সংশোধনের চেষ্টা করা, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তার প্রয়োজনসমূহ যথাযথভাবে পূরণ করা এবং তার আরাম ও হৃদয় সন্তুষ্টির জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা।

والله أعلم بالصواب
উত্তর লিখনে,
মুহা. শাহাদাত হুসাইন , ছাগলনাইয়া, ফেনী।

সাবেক শিক্ষার্থী: ইফতা বিভাগ
তা’লীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

সত্যায়নে
মুফতী লুৎফুর রহমান ফরায়েজী দা.বা.
পরিচালক– তা’লীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া ইসলামিয়া দারুল হক লালবাগ ঢাকা।
উস্তাজুল ইফতা: জামিয়াতুস সুন্নাহ কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা।
উস্তাজুল ইফতা: কাসিমুল উলুম আলইসলামিয়া, সালেহপুর আমীনবাজার ঢাকা।
পরিচালক: শুকুন্দী ঝালখালী তা’লীমুস সুন্নাহ দারুল উলুম মাদরাসা, মনোহরদী নরসিংদী।
শাইখুল হাদীস: জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া, সনমানিয়া, কাপাসিয়া, গাজীপুর।

0Shares

আরও জানুন

লাল রং এর জামা পরিধান করার হুকুম কী?

প্রশ্ন আসসালামু আলাইকুম। আমার ভাই আমার জন্য কিনেছে, উনার খুব পছন্দ হয়েছে। মানা ও করতে …

আহলে হক্ব বাংলা মিডিয়া সার্ভিস