হোম / আকিদা-বিশ্বাস / জান্নাত ও জাহান্নাম
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

জান্নাত ও জাহান্নাম

আল্লামা মনজূর নূমানী রহঃ

পৃথিবীতে ঈমানের সঙ্গে সঙ্গে যাদের আমলও ভালো ছিলো, হাশরের মাঠে তারা আল্লাহ পাকের আরশের ছায়াতলে স্থান পাবে। বরযখ ও কেয়ামতের সময়টা তাদের আরামে কাটবে এবং তারা দ্রুত জান্নাতে চলে যাবে। আর গুনাহগার মুমিনরা ক্ষমা প্রাপ্ত না হলে বরযখ ও কেয়ামতের আযাব এবং পাপ অনুপাতে জাহান্নামের শাস্তিও ভোগ করবে। এক সময় ঈমানের বরকতে তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। কিন্তু যারা কুফর ও শিরক অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে, তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।

মোটকথা ঈমান-একীন ও নেক-আমলের পুরস্কার হলো জান্নাত। আর কুফর শিরক ও বদ আমলের বদলা হলো জাহান্নাম। জান্নাতের সুখ-শান্তি আর জাহান্নামের দুঃখ-কষ্টের আলোচনায় কোরআন-হাদীস ভরপুর। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَأَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللَّهِ
তাকওয়াবানদের জন্য তাদের রবের নিকট থাকবে এমন সব জান্নাত, যার তলদেশে নহরমালা প্রবহমান। অনন্তকাল তারা সেখানে অবস্থান করবে। তাদের পূতপবিত্র সহধর্মিনীগণ থাকবে। আর থাকবে আল্লাহ পাকের বিশেষ সন্তুষ্টি। সূরা আলে ইমরান ৩/১৫

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ أَصْحَابَ الْجَنَّةِ الْيَوْمَ فِي شُغُلٍ فَاكِهُونَ. هُمْ وَأَزْوَاجُهُمْ فِي ظِلَالٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِئُونَ. لَهُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ وَلَهُمْ مَا يَدَّعُونَ. سَلَامٌ قَوْلًا مِنْ رَبٍّ رَحِيمٍ
নিশ্চই জান্নাতীরা সেদিন সানন্দে আয়েশী কাজে মশগুল থাকবে। নিবিড় ছায়ায় তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে বসবে। তাদের জন্য থাকবে নানা রকম ফলমূল, আর যা ফরমায়েশ করবে তার সব। দয়াময় আল্লাহর পক্ষ হতে আসবে সশব্দ সালাম। সূরা ইয়সীন ৩৬/৫৫-৫৮

একটি আয়াতে এসেছে,

يُطَافُ عَلَيْهِمْ بِصِحَافٍ مِنْ ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنْفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنْتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
সোনার পেয়ালা ও পান-পাত্র নিয়ে তাদের আশপাশে ঘোরা-ঘুরি হবে। কল্পনার সবকিছু এবং দৃষ্টিনন্দন যা কিছু সবই সেখানে থাকবে তোমার চিরকাল সেখানে অবস্থান করবে। সূরা যুখরুফ ৪৩/৭১

আরেক আয়াতে এসেছে,

مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ فِيهَا أَنْهَارٌ مِنْ مَاءٍ غَيْرِ آسِنٍ وَأَنْهَارٌ مِنْ لَبَنٍ لَمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ وَأَنْهَارٌ مِنْ خَمْرٍ لَذَّةٍ لِلشَّارِبِينَ وَأَنْهَارٌ مِنْ عَسَلٍ مُصَفًّى وَلَهُمْ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِنْ رَبِّهِمْ كَمَنْ هُوَ خَالِدٌ فِي النَّارِ وَسُقُوا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءَهُمْ
মুত্তাকীদের প্রতিশ্রুত জান্নাত এমন হবে যে, সেখানে থাকবে নহরমালা, যার পানি কখনো নষ্ট হবে না। থাকবে দুধের নদীনালা, যা কখনো বিস্বাদ হবে না। আরও কিছু শরাব-নদী, পানপিয়াসীদের জন্য তা হবে বড় সুপেয়। থাকবে মধুর স্রোতস্বিনী, যা হবে খুবই স্বচ্ছ ও পরিশেধিত। তাদের জন্য আরও থাকবে সর্র্ব রকম ফলফলাদি ও তাদের পালনকর্তার পক্ষ হতে অশেষ ক্ষমা। এই চিরসুখীদের সাথে চিরদুঃখী জাহান্নামীদের কোনো তুলনা হতে পারে? উত্তপ্ত পানি গেলানোর কারণে যাদের নাড়িভূড়ি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে! সূরা মুহাম্মদ ৪৭/১৫

একটি আয়াতে জান্নাতের এ-বৈশিষ্ট বর্ণিত হয়েছে যে,

لَا يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ
কোনো কষ্ট সেখানে তাদেরকে স্পর্শই করবে না। সূরা হিজর ১৫/৪৮)

অথাৎ জান্নাতে সকল সময় সবকিছুতে শুধু শান্তি আর শান্তি, কোনো ব্যথা-বেদনার অস্তিত্ব সেখানে নেই।

এ-তো গেলো জান্নাতের মনোরম চিত্র। কোরআন শরীফে জাহান্নামের ভয়ংকার চিত্রও অংকিত হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন,

وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ فِي جَهَنَّمَ خَالِدُونَ. تَلْفَحُ وُجُوهَهُمُ النَّارُ وَهُمْ فِيهَا كَالِحُونَ
আর কিছু লোকের নেকীর পাল্লা হালকা হয়ে যাবে। এরা ঐ সকল লোক, যারা বদআমল করে নিজেদের সর্বনাশ ডেকে এনেছে, সূতরাং চিরকাল তারা জাহান্নামের আযাব ভোগ করবে। লেলিহান শিখা তাদের চেহারাকে ঝলসে দেবে এবং সেখানে তাদের পুরোটা দেহ বিদঘুটে হয়ে যাবে। সূরা মুমিনূন ২৩/১০৩-১০৪

অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন,

إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّالِمِينَ نَارًا أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا وَإِنْ يَسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاءٍ كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوهَ بِئْسَ الشَّرَابُ وَسَاءَتْ مُرْتَفَقًا
জালেমদের জন্য আমি মহা অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছি। যার শিখা চুতুর্দিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলবে। যখন পানির জন্য ছাতি ফাটিয়ে চিৎকার করবে, তখন তেলের গাদের মতো এমন গরম পানি তাদের খেতে দেওয়া হবে, যা তাদের মুখগুলি পুড়িয়ে কয়লা করে ফেলবে। হায়, কত নিকৃষ্ট সে পানি, কত নিকৃষ্ট সেই আবাসস্থল। সূরা কাহাফ ১৮/২৯

এক আয়াতে এসেছে,

فَالَّذِينَ كَفَرُوا قُطِّعَتْ لَهُمْ ثِيَابٌ مِنْ نَارٍ يُصَبُّ مِنْ فَوْقِ رُءُوسِهِمُ الْحَمِيمُ. يُصْهَرُ بِهِ مَا فِي بُطُونِهِمْ وَالْجُلُودُ. وَلَهُمْ مَقَامِعُ مِنْ حَدِيدٍ. كُلَّمَا أَرَادُوا أَنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا مِنْ غَمٍّ أُعِيدُوا فِيهَا وَذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ
কাফেরদের জন্য আগুনের পোশাক তৈরি করা হবে। টগবগে ফুটন্ত পানি তাদের মাথায় ঢেলে দেওয়া হবে। তখন পেটের নাড়ি-ভুড়িসহ শরীরের চামড়াগুলি খসেখসে পড়বে। লোহার বড় বড় মুগুর থাকবে। যন্ত্রণা-কাতর হয়ে যখনই তারা সেখানে থেকে বের হবার চেষ্টা করবে, তখনি জাহান্নামে ফিরিয়ে দেয়া হবে আর বলা হবে, জ্বলন্ত আগুনের স্বাদ চাখতে থাকো। সূরা হজ্ব ২২/১৯-২২

অন্য একটি আয়াতে এসেছে,

إِنَّ شَجَرَتَ الزَّقُّومِ. طَعَامُ الْأَثِيمِ. كَالْمُهْلِ يَغْلِي فِي الْبُطُونِ. كَغَلْيِ الْحَمِيمِ. خُذُوهُ فَاعْتِلُوهُ إِلَى سَوَاءِ الْجَحِيمِ. ثُمَّ صُبُّوا فَوْقَ رَأْسِهِ مِنْ عَذَابِ الْحَمِيمِ
নিশ্চই যাক্কুম-গাছ বড় পাপীদের খাবার হবে। এই খাবার হবে তেলের তলানির মতো। আর পেটে গিয়ে উথলাতে থাকবে গরম পানির মতো। ফেরেশতাদেরকে বলা হবে, একে পাকড়াও করে জাহান্নামের মধ্যখানে হেঁচড়ে নিয়ে যাও। তারপর এর মাথায় গরম পানির শাস্তি ঢেলে দাও। সূরা দুখান ৪৪/৪৩-৪৮

অন্য আয়াতে এসেছে,

وَيُسْقَى مِنْ مَاءٍ صَدِيدٍ. يَتَجَرَّعُهُ وَلَا يَكَادُ يُسِيغُهُ وَيَأْتِيهِ الْمَوْتُ مِنْ كُلِّ مَكَانٍ وَمَا هُوَ بِمَيِّتٍ وَمِنْ وَرَائِهِ عَذَابٌ غَلِيظٌ
পুঁজ-গলা পানি তাদেরকে পান করতে দেয়া হবে। সে পানি তাদের গলা দিয়ে নামতে চাবে না, তবু তারা গিলেগিলে পান করবে। আর সব দিক থেকে মৃত্যুর বিভীষিকা তাদের সামনে আসতে থাকবে। কিন্তু তারা মরবে না, বরং ক্রমেই কঠিনতর আযাব আসতে থাকবে। সূরা ইবরাহীম ১৪/১৬-১৭

একটি আয়াতে এসেছ,

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ
যারা আমার হুকুম অমান্য করছে, শীঘ্রই আমি তাদেরকে জাহান্নামের আগুনে পুরবো। যখনি তাদের চামড়া সিদ্ধ হয়ে যাবে, তখনি নতুন চামড়া বদলে দিবো। যাতে নতুন করে শাস্তি ভোগ করতে পারে। সূরা নিসা ৪/৫৬

হাদীস শরীফেও জান্নাত ও জাহান্নামের বহু বিবরণ এসেছে। এক হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেন, আল্লাহ পাক বলেন,

أَعْدَدْتُ لِعِبَادِيَ الصَّالِحِينَ مَا لَا عَيْنٌ رَأَتْ، وَلَا أُذُنٌ سَمِعَتْ، وَلَا خَطَرَ عَلَى قَلْبِ بَشَرٍ
নেককারদের জন্য জান্নাতে আমি এমন সব জিনিস সাজিয়ে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি, এবং কারো হৃদয়ে তার কল্পনাও আসেনি। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮২৪

জান্নাতীদের জন্য যত যত সুস্বাদু খাবার, মনোহরী ফুল আর ফল, সুপেয় কোমল পানীয়, দৃষ্টিনন্দন পোশাকআশাক, আলীশান ঘরবাড়ি, সবুজ-শ্যামল বাগবাগিচা এবং সুন্দর সুন্দর প্রিয়তমাসহ আরও যত সুখ-সম্ভোগ আর হাসি-আনন্দের নেয়ামত থাকবে, তার প্রকৃত অবস্থা তো আল্লাহ পাকই ভালো জানেন। আমরা শুধু বিশ্বাস করি। হাদীসে এসেছে, যখন জান্নাতীরা সকলে জান্নাতে প্রবেশ করে সারবে, তখন আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ঘোষণা হবে,

إِنَّ لَكُمْ أَنْ تَصِحُّوا فَلَا تَسْقَمُوا أَبَدًا، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَحْيَوْا فَلَا تَمُوتُوا أَبَدًا، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَشِبُّوا فَلَا تَهْرَمُوا أَبَدًا، وَإِنَّ لَكُمْ أَنْ تَنْعَمُوا فَلَا تَبْأَسُوا أَبَدًا
এখন থেকে চিরকাল তোমরা সুস্থ থাকো, কোনো অসুখবিসুখ আর হবে না। আজ থেকে তোমরা চিরঞ্জীব হয়েগেলে, মৃত্যু তোমাদের কাছে আসবে না। অদ্য হতে তোমরা চির যুবক, বার্ধক্য তোমাদের পাশে ভিড়বে না। এবার তোমরা চির সুখ আর শান্তিতে বসবাস করতে থাকো, কোনো দুঃখ-কষ্ট কখনো তোমাদের ছুঁবে না। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২/৩৮০

জান্নাতের সবচে বড় নেয়ামত হলো আল্লাহ পাকের দীদার ও দর্শন। হাদীস শরীফে এসেছে,

إِذَا دَخَلَ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، نُودُوا: يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ، إِنَّ لَكُمْ عِنْدَ اللهِ مَوْعِدًا لَمْ تَرَوْهُ، فَقَالُوا: وَمَا هُوَ أَلَمْ يُبَيِّضْ وُجُوهَنَا، وَيُزَحْزِحْنَا عَنِ النَّارِ، وَيُدْخِلْنَا الْجَنَّةَ؟ قَالَ: فَيُكْشَفُ الْحِجَابُ، قَالَ: فَيَنْظُرُونَ إِلَيْهِ، فَوَاللهِ مَا أَعْطَاهُمُ اللهُ شَيْئًا أَحَبَّ إِلَيْهِمْ مِنْهُ
জান্নাতীরা যখন জান্নাতে পৌঁছে যাবে, তখন আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ডেকে বলা হবে, আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য আরও এক নেয়ামতের ওয়াদা রয়েছে, তোমরা কি তা চাও না? জান্নাতীরা বলবে, আল্লাহ কি আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেননি, জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে জান্নাত দান করেননি? তাহলে এর বেশি আর কী চাইতে পারি? তখন পর্দা সরিয়ে দেয়া হবে। সকল জান্নাতী আল্লাহ পাককে সরাসরি দেখতে পাবে। জান্নাতীদের নিকট আল্লাহ পাকের দীদারের নেয়ামতই সকল নেয়ামতের চে প্রিয় এবং শ্রেষ্ঠ মনে হবে। মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৩৯২৪

আল্লাহ পাক আপন অনুগ্রহে আমাদের সকলকে এই নেয়ামতগুলি দান করুন, আমীন।

এক হাদীসে এসেছে,

يُؤْتَى بِأَنْعَمِ أَهْلِ الدُّنْيَا مِنْ أَهْلِ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَيُصْبَغُ فِي النَّارِ صَبْغَةً، ثُمَّ يُقَالُ: يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ خَيْرًا قَطُّ؟ هَلْ مَرَّ بِكَ نَعِيمٌ قَطُّ؟ فَيَقُولُ: لَا، وَاللهِ يَا رَبِّ وَيُؤْتَى بِأَشَدِّ النَّاسِ بُؤْسًا فِي الدُّنْيَا، مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، فَيُصْبَغُ صَبْغَةً فِي الْجَنَّةِ، فَيُقَالُ لَهُ: يَا ابْنَ آدَمَ هَلْ رَأَيْتَ بُؤْسًا قَطُّ؟ هَلْ مَرَّ بِكَ شِدَّةٌ قَطُّ؟ فَيَقُولُ: لَا، وَاللهِ يَا رَبِّ مَا مَرَّ بِي بُؤْسٌ قَطُّ، وَلَا رَأَيْتُ شِدَّةً قَطُّ
দুনিয়াতে যে ব্যক্তি সবচে বেশি আরামে ছিলো, সবচে বেশি জাঁকজমকের সাথে যে চলতো, দুর্ভাগ্যবশত এমন এক ব্যক্তি কেয়ামতের দিন জাহান্নামী সাব্যস্ত হবে। তাকে জাহান্নামের আগুনে একটি চুবানি দিয়ে তৎক্ষণাৎ বের করে আনা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি কখনো সুখে ছিলে? সে বলবে, আয় আল্লাহ! তোমার কসম, আমি কখনো সুখের মুখ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তাকেই আবার জান্নাতের বারান্দা দিয়ে একটু ঘুরিয়ে এনে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি কখনো দুঃখ-দুর্দশায় ভুগেছো? সে বলে উঠবে, আয় আমার আল্লাহ! তোমার কসম, জীবনে সামান্য দুঃখ-কষ্টের শিকার কখনো হয়েছি বলে মনে পড়ে না। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৮০৭

বস্তুত জান্নাতে যে বিস্ময়কর আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা আল্লাহ পাক করে রেখেছেন, যত বড় জনমদুঃখীই হোক, যদি সে একটি মুহূর্ত জান্নাত থেকে ঘুরে আসতে পারে, তবে তার সারা জীবনের সমস্ত কষ্টক্লেশ নিমিষেই উড়ে যাবে। আর জাহান্নাম এত কঠিন আযাব-ঘর যে, এর দুর্গন্ধ ও তাপদাহ নাকেমুখে লাগা-মাত্রই একজন চির সুখী মানুষ সারা জনমের সমস্ত সুখের কথা বেমালুম ভুলে যাবে।

একটি হাদীসে এসেছে,

إِنَّ أَهْوَنَ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا يَوْمَ القِيَامَةِ لَرَجُلٌ تُوضَعُ فِي أَخْمَصِ قَدَمَيْهِ جَمْرَةٌ، يَغْلِي مِنْهَا دِمَاغُهُ
জাহান্নামে সবচে লঘু শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তির অবস্থা এই হবে যে, তার পদতলে পাদুকার মতো অঙ্গার ফিট করে দেয়া হবে। ফলে চুলার উপর পানি যেমন টগবগ করতে থাকে, তেমনি তার মাথার মগজ টগবগ করতে থাকবে। সহীহ বোখারী, হাদীস নং ১৪৪

অন্য হাদীসে এসেছে,

وَلَوْ أَنَّ دَلْوًا مِنْ غَسَّاقٍ يُهَرَاقُ فِي الدُّنْيَا، لَأَنْتَنَ أَهْلُ الدُّنْيَا
জাহান্নামীদেরকে যে দুর্গন্ধযুক্ত গলিত পুঁজ পান করতে দেয়া হবে, তার মাত্র এক বালতি যদি পৃথিবীতে ঢেলে দেয়া হয়, তবে সমগ্র পৃথিবী দুর্গন্ধে ভরে যাবে। মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১১৭৮৬

এক হাদীসে দোযখীদের যাক্কুম নামক খাদ্যের বর্ণনায় এসেছে,

وَلَوْ أَنَّ قَطْرَةً مِنَ الزَّقُّومِ قُطِرَتْ، لَأَمَرَّتْ عَلَى أَهْلِ الْأَرْضِ عَيْشَهُمْ، فَكَيْفَ مَنْ لَيْسَ لَهُمْ طَعَامٌ إِلَّا الزَّقُّومُ
যাক্কুম ফলের এক বিন্দু রস যদি দুনিয়াতে টপকে পড়তো, তাহলে পৃথিবীর সমস্ত খাদ্য তিক্ত-বিনষ্ট হয়ে যেতো। এবার তবে ভেবে দেখো, যাদের খাবারই হবে এই চীজ, তাদের দশা কী হবে? মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২৭৩৫

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে এবং সমস্ত ঈমানদারকে জাহান্নামের ছোট-বড় সকল আযাব থেকে রক্ষা করো, আমীন।

আমার প্রিয় ভাই ও বোন!

বরযখ, কেয়ামত ও দোযখ সম্পর্কে কোরআন ও হাদীস থেকে যা কিছু বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। আল্লাহ পাকের কসম! এগুলি হুবহু সত্য। মৃত্যুর পর সবকিছু আপন চোখে দেখতে পাবেন। কোরআন ও হাদীসে এ-বিষয়গুলো এতবার এতভাবে এজন্য আলোচনা করা হয়েছে, যেন আমরা সতর্ক হই, দোযখ থেকে বাঁচি এবং জান্নাত লাভে সচেষ্ট হই। দুনিয়ার এই দিনগুলো আজ না কাল শেষ হয়ে যাবে, সবাইকে মরতে হবে। কেয়ামত একদিন আসবে, হিসাব দিতে হবে। এখনো সময় আছে! আসুন আমরা তওবা করি। আগামী জীবন সঠিক পথে পরিচালনার শপথ নিই এবং জান্নাত লাভের চিন্তা-ফিকির করি। আল্লাহ না করুন, যদি উদাসীনতার ভিতর দিয়ে জীবন ফুরিয়ে যায়, তাহলে জাহান্নাম ছাড়া কোনো গতি থাকবে না।

হে আল্লাহ! আমরা তোমার কাছে জান্নাত ভিক্ষা চাই। যে সকল কথা ও কাজ আমাদেরকে জান্নাতমুখী করবে, সেগুলি করার তাওফীক চাই। আর তোমার কাছে পানাহ চাই জাহান্নাম থেকে এবং যা কিছু আমাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে তা থেকে।

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

তওবা ও ইস্তিগফার

আল্লামা মনজূর নূমানী রহঃ আল্লাহ তাআলা নবী পাঠিয়েছেন এবং কিতাব দান করেছেন যেন মানুষ যেন …