হোম / জায়েজ নাজায়েজ / শরীয়তের দৃষ্টিতে বাসা বাড়ি ভাড়া নেয়ার নিয়মনীতি
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

শরীয়তের দৃষ্টিতে বাসা বাড়ি ভাড়া নেয়ার নিয়মনীতি

মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া

বাসস্থান মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। জীবিকা উপার্জনের তাগিদে বহু মানুষ আজ শহরমুখী। তাই প্রয়োজন হয়েছে বিপুল পরিমাণ বাসস্থানের। জীবনের এই অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণের তাগিদে শহরগুলোতে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন ও বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট। তৈরী হচ্ছে বড় বড় কমার্শিয়াল স্পেস এবং শপিং মল।

বসবাস বা ব্যবসার প্রয়োজনে বাড়ি বা দোকান ভাড়া নেওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। এটি যুগ যুগ ধরে চলমান একটি ব্যবস্থা। ভাড়া বাসাতেই সারাটি জীবন পার করে দিচ্ছে এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক। আজকের নাগরিক সভ্যতায় এটি খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা এবং বিধি-বিধান। ভাড়া দেওয়া-নেওয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই শরীয়তে যেমন ভাড়াপ্রক্রিয়ার স্বীকৃতি রয়েছে তেমনি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এর বিধিবিধানসমূহ।

কুরআন মাজীদ এবং হাদীস শরীফে ভাড়া তথা ইজারার বৈধতা এবং এর বিধান সম্পর্কে আলোচনা এসেছে। ফিকাহবিদগণ সেগুলোর আলোকে ইজারার বৈধ ও অবৈধ পন্থা, বৈধতার শর্তাবলী এবং অবৈধতার ক্ষেত্রসমূহ ও এক্ষেত্রে করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেগুলো মেনে চললে ভাড়া চুক্তিটি শরীয়তসম্মত হবে এবং উভয় পক্ষ ইহকাল ও পরকালে এর সুফল ভোগ করবে।

অবশ্য দুঃখজনক ব্যাপার হল, অনেক ক্ষেত্রেই শরীয়তের ঐসব বিধানের বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না। ফলে কোনো ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা কর্তৃক ভাড়াটিয়া নিগৃহীত হয়, আবার কোনো ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ার দ্বারা বাড়িওয়ালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকের ক্ষেত্রে হয়ত এর কারণ এটাই যে, তারা এ সংক্রান্ত শরয়ী আহকাম জানে না। আবার কেউ হয়ত এটাকে শরীয়ত সংশ্লিষ্ট বিষয়ই মনে করে না; বরং আগাগোড়াই জাগতিক বিষয় মনে করে থাকে। তাই এ বিষয়ে শরীয়তের বিধান জানার চেষ্টা করে না। আর কেবল নিজের স্বার্থই সামনে রাখে। অন্যের ক্ষতি হল কি না বা তার প্রতি জুলুম হল কি না তা ভেবেও দেখে না।

তাই ভাড়া দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের করণীয় ও সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী সংক্ষিপ্তভাবে পেশ করা হল।

প্রথমেই মৌলিক কয়েকটি বিষয় :

১. ভাড়ার পরিমাণ অবশ্যই নির্দিষ্ট হতে হবে।

২. যে বাড়ি বা ফ্ল্যাট ভাড়া হবে এর সকল সুবিধা-অসুবিধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী ভাড়াটিয়াকে সুস্পষ্টভাবে অবগত করতে হবে।

 

বাড়িওয়ালার কর্তব্য

১. বাড়ি ভাড়া কত তা নির্ধারিত করে জানানো। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ বিল কি ভাড়ার অন্তর্ভুক্ত, না এর বাইরে তাও জানানো। তাছাড়া নাইট গার্ড ও বাড়ির দারোয়ানের বেতন, ময়লা ফেলার বিল কিংবা অ্যাপার্টমেন্টগুলোর সার্ভিস ফি ইত্যাদি মিলে প্রতি মাসে সাধারণত কত টাকা হয় তা চুক্তির সময়ই বলে দেওয়া আবশ্যক।

২. প্রতি মাসের ভাড়া কত তারিখের মধ্যে দিতে হবে তা চুক্তির সময়ই জানিয়ে দিতে হবে।

৩. বাড়ির সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে ভাড়াটিয়াকে পূর্বেই অবহিত করা আবশ্যক। বিশেষত এমন ত্রæটি, যা জানতে পারলে সে হয়ত ভাড়াই নিবে না বা যেটির কারণে ভাড়া আরো কম হবে। যেমন পানি নিয়মিত বা সার্বক্ষণিক না থাকা বা নিয়ম করে পানি দেওয়া। গ্যাসের সমস্যা থাকা বা দারোয়ান না থাকার কারণে গেট নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ইত্যাদি। কোনো কোনো বাসার লাইনে এক-দুই বার পানি ছাড়া হয় আর সকলে তখন নিজ নিজ পাত্রে জমা করে রাখে। এমন হলে ভাড়া চুক্তির সময়ই বলে দিতে হবে।

৪. বাড়ির মূল ফটক রাত কয়টায় বন্ধ করা হবে তা নির্ধারিত থাকলে চুক্তির সময়ই বলে দিতে হবে। যেন এ নিয়ে পরবর্তীতে দ্ব›দ্ব না হয়।

৫. প্রত্যেক ফ্ল্যাটে পৃথক পৃথক বিদ্যুৎ মিটার লাগানো উচিত, যেন প্রত্যেক পরিবার নিজ খরচ অনুযায়ী বিল পরিশোধ করতে পারে। কোনো কোনো বাড়িতে সকল ফ্ল্যাটের জন্য একটি মাত্র মিটার থাকে। ফলে সব ফ্ল্যাটের হিসাব একত্রে হয় এবং এক মিটারে অতিরিক্ত খরচ হওয়ার কারণে ইউনিট প্রতি খরচ অনেক বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে আরেকটি ত্রুটি হল, মিটার একটি হওয়ার কারণে সকলের উপর সমহারে বিল চাপানো হয়। এতে করে বিদ্যুতের স্বল্প ব্যবহারের কারণে যাদের বাস্তব খরচ কম হয় তাদের উপর জুলুম হয়ে যায়। এজন্য প্রত্যেক ফ্ল্যাটে ভিন্ন ভিন্ন মিটার লাগানো দরকার।

তদ্রূপ পানির মিটারও ভিন্ন হওয়া উচিত ছিল। যেন যার যার খরচ অনুযায়ী বিল নেওয়া যায়। শোনা গেছে যে, ওয়াসা এভাবে প্রতি ইউনিটের জন্য আলাদা মিটার দেয় না। তাই এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত দু’টি পদ্ধতির কোনো একটি অবলম্বন করা যেতে পারে।

১. প্রত্যেক মাসের পানির বিল সকল ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়াদের মাঝে বণ্টন করে দিবে।

২. বাড়িওয়ালা পানির বিল বাসা ভাড়ার অন্তর্ভুক্ত করে নিবে। পানির নামে ভিন্ন বিল নেবে না। এক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা পূর্ণ ভাড়ার মালিক হবে। আর পানির বিল সেই আদায় করবে।

দ্বিতীয় পদ্ধতিটি প্রথমটির চেয়ে নিরাপদ ও উত্তম। কিন্তু বর্তমানে কোনো কোনো বাসায় প্রত্যেক ফ্ল্যাটের জন্য তিনশ বা চারশ করে পানির বিল নেওয়া হয়। কোনো কোনো এলাকায় এর চেয়েও বেশি নেওয়া হয়। ফলে কখনো কখনো এ টাকা দ্বারা মোট পানির বিল দিয়েও আরো উদ্বৃত্ত থেকে যায়। বাড়িওয়ালাকে নিজের ফ্লাটে ব্যবহৃত পানির বিল দিতে হয় না। কখনো তো আরো অতিরিক্ত থেকে যায়। অথচ বাড়িওয়ালার জন্য পানির বিলের ক্ষেত্রে ব্যবসা করা বা অতিরিক্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে ওয়াসার পানি দ্বারা ব্যবসা করার অনুমতি নেই। আর এটা ভাড়াটিয়াকে জানিয়েও করা হয় না। বরং  কেউ কেউ তো খরচ অনুযায়ী নেওয়ার  দাবি করে খরচের চেয়ে বেশি নিয়ে থাকে। তাই এভাবে অতিরিক্ত নেওয়া বৈধ হবে না।

৬. বাড়ি ছেড়ে দিতে হলে কত দিন আগে জানাতে হবে তাও চুক্তির সময় জানিয়ে দিতে হবে। কেউ কেউ দুই মাস পূর্বে জানানোর শর্ত করে। চলতি মাসে বা পূর্বের মাসে জানানোর শর্ত করা দূষণীয় নয়। সুতরাং বাড়ি ছাড়ার সময় চূড়ান্ত করা হলে ভাড়াটিয়া এবং বাড়িওয়ালা উভয়ের জন্যই তা পালনীয় হবে।

লক্ষণীয় হল, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় চলতি মাসের পাঁচ তারিখের মধ্যে জানানোর শর্ত থাকে। তবে ভাড়াটিয়া যদি এর এক বা দুই দিন পরে জানায় তাহলেও পরবর্তী মাসের ভাড়া আদায় করা হয়। কখনো দুই মাস আগে জানানোর কথা থাকে। কিন্তু ভাড়াটিয়া হয়ত সময়মত জানাতে পারেনি। তখন সে বাসা ছেড়ে দেয়ার পরও তার থেকে দুই মাসের ভাড়া কেটে রাখা হয়। এক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা বাস্তবেই অন্যত্র ভাড়া দিতে না পারলে পূর্ব শর্ত অনুযায়ী ভাড়াটিয়া থেকে নির্ধারিত টাকা নেয়া বৈধ হতে পারে।

তবে বাড়ির মালিকের কর্তব্য অন্যত্র ভাড়া দেওয়ার চেষ্টা করা। বাসাটি ভাড়া হয়ে গেলে পূর্বের ভাড়াটিয়া থেকে অতিরিক্ত যা নেওয়া হয়েছে তা তাকে ফেরত দেওয়া জরুরি। নতুন ভাড়াটিয়া পেয়ে গেলে পূর্বের ভাড়াটিয়া থেকে এ সময়ের ভাড়া রেখে দেওয়া জায়েয হবে না।

 

ভাড়াটিয়ার দায়িত্ব

শরীয়তের দৃষ্টিতে ভাড়াকৃত ভবন/ফ্ল্যাট ভাড়াটিয়ার হাতে আমানত। এর যথাযথ ব্যবহার না করলে বা এক্ষেত্রে অবহেলা করলে সেটি খেয়ানত হবে। তাই বাড়ির সবকিছু যতœ সহকারে ব্যবহার করতে হবে। সজাগ থাকতে হবে যেন ব্যবহারের ত্রæটির কারণে কোনো জিনিস নষ্ট না হয়। অধিক ময়লা জমে ফ্লোর যেন নষ্ট না হয়। এমনকি বাড়িওয়ালার অনুমতি ছাড়া দেয়ালে অধিক পেরেক ইত্যাদি মারা থেকেও বিরত থাকা উচিত।

ব্যবহারকারীর সীমালংঘনের কারণে কোনো জিনিস নষ্ট হলে এর ক্ষতিপূরণ ভাড়াটিয়াকেই দিতে হবে। অবশ্য সীমালংঘন ছাড়া সাধারণ ব্যবহারের কারণে কোনো কিছু নষ্ট হয়ে গেলে নতুন পার্টস কিনে দেওয়া বা মেরামত করে দেওয়ার দায়িত্ব বাড়িওয়ালার। যেমন পানির কল নষ্ট হয়ে গেলে, বাথরুমের লোডাউন বা কোনো ফিটিংস নষ্ট হয়ে গেলে। তেমনি দরজা-জানালা, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইনে কোনো সমস্যা হলে এগুলো ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্বও বাড়িওয়ালার। এগুলো ভাড়াটিয়ার উপর চাপানো যাবে না।

এ কথাও বুঝা দরকার যে, একটি জিনিস যে ভাড়াটিয়ার কাছে নষ্ট হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে এ ভাড়াটিয়ার একক ব্যবহারের কারণেই নষ্ট হয় না; বরং আগের ভাড়াটিয়ার দীর্ঘদিনের ব্যবহারও এর কারণ হয়ে থাকে। তাই কল এবং ফিটিংস ইত্যাদি লাগিয়ে দেওয়া এবং ব্যবহার উপযোগী করে দেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে বাড়িওয়ালারই দায়িত্ব। এগুলো নষ্ট হয়ে গেলে ভাড়াটিয়া থেকে তা আদায় করা অন্যায়। মনে রাখা দরকার, ভাড়া বস্তুর কোনো কিছু সাধারণ ব্যবহারে নষ্ট হলে তার মেরামত করা মালিকেরই দায়িত্বে।

সিকিউরিটি মানি প্রসঙ্গ

বাড়ির মালিকগণ ভাড়াটিয়া থেকে অগ্রীম কিছু টাকা সিকিউরিটির জন্য নিয়ে থাকে। এই অগ্রীম টাকা আদায়ের বিভিন্ন নিয়ম থাকে। নিয়মের ভিন্নতার কারণে এর হুকুম ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন-

১. কারো এমন নিয়ম থাকে যে, এক বা দুই মাসের ভাড়া অগ্রীম দিতে হবে। যা বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার সময় শেষ দুই মাসের ভাড়া হিসেবে ধরা হবে। এক্ষেত্রে তা ফিকহে ইসলামীর দৃষ্টিতে অগ্রীম ভাড়া হিসেবে ধর্তব্য হবে। সিকিউরিটি মানি তথা বন্ধক হিসেবে গণ্য হবে না।

২. দোকান বা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার জন্য দুই-তিন লাখ বা আরো বেশি টাকা অগ্রীম নেয়া হয়। এরপর মাসে মাসে কিছু কিছু করে সকল টাকা ভাড়ার সাথে কেটে নেয়। পরবর্তীতে ফেরতযোগ্য হিসেবে কিছুই রাখা হয় না। এমনটি হলে এটাও অগ্রীম ভাড়া হিসেবে গণ্য হবে।

এই দুই ক্ষেত্রে অগ্রীম হিসাবে যা নেওয়া হয় সে টাকার মালিক বাড়িওয়ালাই হবে। সুতরাং এ টাকা সে নিজ প্রয়োজনে খরচ করতে পারবে এবং এটি তার যাকাতযোগ্য সম্পদ বলে গণ্য হবে। তাই যাকাতবর্ষ শেষে এ টাকা থেকে কিছু অবশিষ্ট থাকলে তাকেই এর যাকাত দিতে হবে। ভাড়াটিয়াকে এর যাকাত দিতে হবে না।

৩. আর যদি অগ্রীম নেওয়া এই টাকা থেকে ভাড়া হিসাবে কোনো কিছু কাটা না হয় এবং চুক্তি শেষ হওয়ার আগের মাসগুলোর ভাড়া হিসাবেও গণ্য করা না হয়, বরং ভাড়াটিয়া বাড়ি ছাড়ার সময় তাকে এ টাকা ফেরত দেওয়ার শর্ত করা হয় তাহলে এই টাকা সিকিউরিটি মানি বলে গণ্য হবে।

ফিক্বহী দৃষ্টিকোণ থেকে সিকিউরিটি মানি রাহান তথা বন্ধকী সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। আর বন্ধকগ্রহিতার জন্য বন্ধকী বস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েয নেই। সে হিসেবে বাড়ির মালিকের জন্য এই অগ্রীম টাকা খরচ করা জায়েয নয়। সাধারণ নিয়মে টাকাগুলো নিজের কাছে বা ব্যাংকে রেখে দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু আজকাল অনেক বাড়িওয়ালা বন্ধকের উক্ত নিয়ম মেনে চলে না। বরং প্রায় সবাই এ টাকা খরচ করে ফেলে। জমা রাখে না। তাই কোনো কোনো ফকীহ এই খরচকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এই টাকাকে বন্ধক না ধরে ঋণ বলতে চান। আর এটাকে ভাড়ার সাথে শর্ত না করে ভিন্নভাবে লেনদেন করতে বলেন। তাদের ভাষ্যমতে এভাবে করলে বাড়িওয়ালার জন্য তা ব্যবহার করা বৈধ হবে। অবশ্য অন্য অনেক ফহীহ এটাকে সিকিউরিটি তথা বন্ধকই বলেন। দলীলের দিক থেকে এ মতটিই শক্তিশালী।

প্রকাশ থাকে যে, এ টাকাকে বন্ধক ধরা হলে সমস্যা হল বাড়িওয়ালার জন্য তা ব্যবহার করা জায়েয নয়। আর ঋণ ধরা হলে সমস্যা হল, ভাড়ার সাথে ঋণ প্রদানের শর্ত করার কারণে ভাড়া-চুক্তি ফাসেদ হয়ে যায়। এ কারণে সিকিউরিটি মানির ক্ষেত্রে নি¤েœর যে কোনো একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা নিরাপদ।

১. একে অগ্রীম ভাড়া ধরা। অর্থাৎ বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার সময় শেষের দিকের মাসের ভাড়া ধরা হবে এবং সে অনুযায়ী আমল করা হবে। আর অগ্রীমের পরিমাণ বেশি হলে প্রতি মাসেই নগদ ভাড়ার সাথে একটা অংশ ভাড়া হিসাবে কর্তন করা হবে। এ টাকা পরবর্তীতে ফেরতযোগ্য হিসেবে ধরা হবে না। এভাবে অগ্রীম ভাড়া ধরা হলে এর মালিক বাড়িওয়ালাই হবে। এক্ষেত্রে সে তা ব্যবহার করতে পারবে এবং যাকাতও সেই আদায় করবে।

২. কোনো কোনো সময় বাড়িওয়ালা সিকিউরিটির টাকা দিয়ে বাড়ির সজ্জায়ন করে বা ফিটিংস ইত্যাদি লাগায়।

এক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ার সাথে নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে চুক্তি করা যেতে পারে। ভাড়াটিয়া এসব কাজ নিজ দায়িত্বে বা বাড়িওয়ালার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নিজের টাকা দিয়ে করে নিবে এবং তা ভাড়াটিয়ার মালিকানা হিসেবে গণ্য হবে। এরপর যখন বাসা ছেড়ে দেবে তখন বাড়িওয়ালার নিকট একটি দাম ধরে জিনিসগুলো বিক্রি করে দেবে। এ পন্থা অবলম্বন করলে বন্ধক নিয়ে তা খরচ করার জটিলতাও থাকে না। আবার যাকাত কে দেবে এই প্রশ্নও আসে না। কেননা ভাড়াটিয়া যেহেতু ঐ টাকা খরচ করে ফেলেছে তাই তার উপর এর যাকাত আসবে না। আর বাড়িওয়ালাও এ টাকার মালিক হয়নি বিধায় তাকেও এর যাকাত দিতে হবে না।

 

ভাড়াটিয়ার জন্য অন্যকে ভাড়া দেওয়া

নিজের জন্য ভাড়া নিয়ে মালিকের অনুমতি ব্যতীত অন্যকে ভাড়া দেওয়া ভাড়াটিয়ার জন্য জায়েয নেই। সুতরাং মালিকের অনুমতি ব্যতীত সাবলেট নেওয়া বা অন্যকে ভাড়া দেওয়া ভাড়াটিয়ার জন্য বৈধ নয়। তবে মালিক অনুমতি দিলে অসুবিধা নেই।

আর নিজে ভাড়া নিয়ে পুরোটাই অন্যকে বেশি দামে ভাড়া দেওয়ার জন্য দু’টি শর্ত আছে।

১. এজন্য বাড়িওয়ালার অনুমতি নিতে হবে।

২. বেশি ভাড়া নিতে চাইলে ঐ বাড়িতে উন্নয়নমূলক কোনো কাজ করতে হবে। যেমন ডেকোরেশন করা, দরজা বা টাইলস লাগানো ইত্যাদি। আর সংস্কারমূলক কাজ বাড়ির মালিকের অনুমতি নিয়েই করতে হবে। নিজে ভাড়া নেওয়ার পর সংস্কারমূলক কোনো কাজ না করে বেশি টাকায় ভাড়া দেওয়া জায়েয হবে না।

 

বাড়ি মর্টগেজ বা বন্ধক পদ্ধতি

কোনো কোনো বাড়ির মালিকের একত্রে পাঁচ-দশ লাখ টাকা দরকার হলে কারো থেকে এ শর্তে নেয় যে, পাঁচ বছরের জন্য আপনি আমাকে দশ লাখ টাকা দেন। আপনার টাকা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ পাঁচ বছর পর্যন্ত আপনি আমার বাড়িতে ফ্রী বসবাস করবেন। অথবা অন্যের কাছে ভাড়া দিয়ে আপনি লাভবান হবেন। অনেকটা গ্রাম দেশের জমি বন্ধক দেয়ার মতই।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে সময় নির্ধারিত থাকে না; বরং বলা হয় যত দিন আপনার টাকা না দিব তত দিন আমার বাড়ি বা ফ্ল্যাট ভোগ করবেন। এই লেনদেন সম্পূর্ণ নাজায়েয। কারণ এক্ষেত্রে বাসাটি বন্ধকী বস্তু। আর বন্ধকী বস্তু থেকে উপকার গ্রহণ করা ঋণ দিয়ে লাভ ভোগ করার মত, যা সুদী চুক্তির অন্তর্ভুক্ত।

عَنِ ابْنِ سِيرِينَ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى ابْنِ مَسْعُودٍ فَقَالَ: إِنّ رَجُلًا رَهَنَنِي فَرَسًا، فَرَكِبْتُهَا. قَالَ مَا أَصَبْتَ مِنْ ظَهْرِهَا فَهُوَ رِبًا.

মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রহ. বলেন, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর নিকট এসে বলল, এক ব্যক্তি আমার কাছে একটি ঘোড়া বন্ধক রেখেছে। আমি তার পিঠে আরোহন করেছি। তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন, ঘোড়ার পিঠে চড়ে যে উপকার ভোগ করেছ তা সুদ। -মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক, বর্ণনা ১৮০৭১

عَنْ فَضَالَةَ بْنِ عُبَيْدٍ صَاحِبِ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ أَنّهُ قَالَ كُلّ قَرْضٍ جَرّ مَنْفَعَةً فَهُوَ وَجْهٌ مِنْ وُجُوهِ الرِّبَا.

ফাযালা বিন উবাইদ রা. বলেন, যেই ঋণ কোনো লাভ নিয়ে আসে তা রিবার প্রকারসমূহের মধ্যে একটি। -সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ১০৯৩৩

 

সিকিউরিটি বাড়িয়ে দিলে ভাড়া কমিয়ে দেওয়া

পূর্বোক্ত পদ্ধতির কাছাকাছি আরেকটি পদ্ধতি চালু হয়েছে। তা সচরাচর সিকিউরিটির মত নয়; বরং কোনো এলাকায় সচরাচর সিকিউরিটি যদি পঞ্চাশ হাজার হয় এক্ষেত্রে এর চে’ অনেক বেশি যেমন চার/পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়। এই অতিরিক্ত সিকিউরিটি দেওয়ার কারণে ভাড়া একেবারে কমিয়ে দেওয়া হয়। যেমন সাধারণ অবস্থায় ভাড়া যদি দশ হাজার টাকা হয়ে থাকে এক্ষেত্রে তার থেকে এক-দুই হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। যত দিন সিকিউরিটির টাকা ফেরত না দিবে তত দিন ভাড়া এ রকম কম থাকবে।

এই পদ্ধতিও সম্পূর্ণ নাজায়েয। মর্টগেজ পদ্ধতির মত এটিও ঋণ দিয়ে মুনাফা ভোগ করারই আরেক প্রকার। তাই এ পদ্ধতিও সম্পূর্ণ বর্জনীয়। বেশি পরিমাণ সিকিউরিটি জমা নিলেও ভাড়া সাধারণত অন্যান্য বাসাবাড়িতে যেমন নেওয়া হয় তেমনই নেওয়া উচিত। অস্বাভাবিক ভাড়া কমালে তা বন্ধকী সম্পত্তি থেকে উপকৃত হওয়া বা ঋণের কারণে লাভবান হওয়ার আওতায় পড়ে নাজায়েয হবে।

 

ভাড়া বৃদ্ধি প্রসঙ্গ

বাড়িওয়ালারা বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে ভাড়া বৃদ্ধি করে থাকে। যেমন অনেক মালিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে, সরকারী বেতন বাড়লে কিংবা নতুন বছর শুরু হলে অথবা কোনো উপলক্ষ ছাড়াই ভাড়া বৃদ্ধি করে দেয়। এসব ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা নিজ ইচ্ছা অনুযায়ীই ভাড়া বৃদ্ধি করে থাকে। অথচ অযথা কিংবা যৌক্তিক কারণ ছাড়া ভাড়া বৃদ্ধি করা একটি অন্যায় কাজ। এছাড়া একসাথে অস্বাভাবিক পরিমাণ ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়াও জুলুম এবং অন্যায়। ভাড়া বৃদ্ধি করতে হলে ভাড়াটিয়ার সাথে আলোচনা করে তা করবে। শরীয়তের দৃষ্টিতে ভাড়া চুক্তিটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, এটি একতরফা চুক্তি নয়। এ নিয়ম না মানা হলে ভাড়াটিয়ার জন্য অন্যত্র চলে যাওয়ারও সুযোগ থাকবে।

আর মালিকের উচিত, চুক্তির সময়ই ভাড়াটিয়ার সাথে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে কথা বলে নেওয়া যে কখন থেকে ভাড়া বৃদ্ধি করা হবে এবং কী পরিমাণ বৃদ্ধি করা হতে পারে। যেন পরবর্তীতে পরষ্পরে মনোমালিন্যের পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।

 

ভাড়াটিয়াকে বিনা কারণে নিষেধ করে দেওয়া

আগেই বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়ার সাথে বাড়িওয়ালার যে চুক্তি হয় তা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়া চুক্তির সময় শেষ হওয়ার পূর্বে কারো জন্যই তা ভেঙ্গে দেওয়া জায়েয নয়। অবশ্য যৌক্তিক কোনো কারণ  দেখা দিলে ভাড়াটিয়া এবং বাড়িওয়ালা উভয়ের জন্যই চুক্তি শেষ করে দেওয়ার সুযোগ আছে। সেক্ষেত্রে ভাড়াটিয়াও অবশিষ্ট ভাড়া পরিশোধ করে দোকান বা বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারবে এবং বাড়িওয়ালাও তাকে দোকান বা বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে পারবে।

এখানে বাড়ী, দোকান ইত্যাদি ভাড়া সংক্রান্ত বহুলপ্রচলিত কিছু মাসআলা উল্লেখ করা হল। এছাড়াও এ বিষয়ের আরো বহু মাসআলা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে গিয়ে তা জেনে নেওয়া আবশ্যক।

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

খরচ কম করে বেশি খরচের ভাউচার দিয়ে টাকা গ্রহণের হুকুম কী?

প্রশ্ন বরাবর তালিমুল ইসলাম ইনিস্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার (মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী হুজুর) প্রশ্ন:-   সরকারী …