হোম / আহলে হাদীস / আহলে হাদীস মতাদর্শীরা বাইতুল্লাহ থেকে চার জামাত দূর করেছে একদিন বিশ রাকাত তারাবীও দূর করবে?

আহলে হাদীস মতাদর্শীরা বাইতুল্লাহ থেকে চার জামাত দূর করেছে একদিন বিশ রাকাত তারাবীও দূর করবে?

প্রশ্ন

নামঃ হুমায়ুন কবীর

দেশঃ বাংলাদেশ

আসসালামু আলাইকুম।

আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে।

আমাদের দেশে আহলে হাদিস, লা-মাজহাবীরা বলে বেড়ায় যে, একসময় (প্রায় কয়েকশত বছর ধরে) মসজিদুল হারামে চার মাজহাবের কারনে চার জামাতে নামাজ পড়ানো হতো। এখন নাকি লা-মাজহাবি, সালাফিরাই চার জামাত ভেঙ্গে এক জামাতে নামাজ পড়ার রীতি চালু করেছে। তাদের বিশ্বাস- বর্তমানে যে মসজিদুল হারামে বিশ রাকাআত তারাবীহ এর নামাজ হয়, এটাও নাকি ভবিষ্যতে এক সময় শেষ হয়ে তাদের তথাকথিত সহিহ দাবী মোতাবেক আট রাকাআত চালু হবে (যেটা তাদের প্রকাশিত তাওহীদ পাবলিকেশন্স এর বুখারীতে উল্লেখ আছে)।আমার প্রশ্ন- মসজিদুল হারামে চার মাজহাবের কারনে চার জামাতে নামাজ পড়ানো হতো কেন? এখন এক জামাআতে পড়ানো হয় কেন? আমি এই প্রশ্নের উত্তর জানিনা।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

যখন চার জামাত পড়ানো হতো, তখনো বাইতুল্লাহ শরীফে কুরআন ও হাদীসের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা মাযহাব অনুপাতে নামায আদায় হতো, আবার যেদিন থেকে এক জামাত চলে আসছে, সেদিন থেকে অধ্যবধি কুরআন ও হাদীসের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা মাযহাব অনুপাতেই জামাত চালু আছে।

না তখন লা-মাযহাবী ইমাম ছিল, না এখন আছে।

বাইতুল্লাহ তখনো লা-মাযহাবীদের ছিল না, এখনো লা-মাযহাবীদের নয়।

তখনো মাযহাবীদের আয়ত্বে ছিল, এখনো মাযহাবীদের আয়ত্বেই রয়েছে। আলহমাদুলিল্লাহ।

লা-মাযহাবীরা আগেও বিতাড়িত। এখনো বিতাড়িত। ইনশাআল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত বিতাড়িতই থাকবে।

এক জামাত হয় বলে লা-মাযহাবী বন্ধুদের খুশি হবার কিছুই নেই।

কুরআন ও হাদীসের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা চার মাযহাবের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তৎকালিন রাষ্ট্রনায়ক চার জামাতের ইন্তিজাম করেছিলেন। যা তার বিশাল হৃদয়ের পরিচায়ক ছিল।

যেহেতু বাইতুল্লাহ পুরো বিশ্ব মুসলিমের মিলনমেলা। চার মাযহাবের অনুসারীদের একীভূত হবার স্থান। তাই কুরআন ও সুন্নাহ নিঃসৃত সকলের আমলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চার মাযহাবের চারটি জামাত আদায় করা হতো।

উনিশ শতকের দিকে মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নজদী হাম্বলীর সহযোগিতায় সৌদ সরকার ক্ষমতা দখল করলে উপরোক্ত নিয়ম রদ করে দেয়া হয়।

সৌদ সরকারের প্রধান সহযোগী শায়েখ আব্দুল ওয়াহহাব নজদী লা-মাযহাবী ছিলেন না। তিনি হাম্বলী  মাযহাবের অনুসারী ছিলেন।

দেখুন আব্দুল ওয়াহহাব নজদী স্বীয় কিতাবে তিনি কী লিখেছেন?

ونحن أيضاً في الفروع، على مذهب الإمام أحمد بن حنبل، ولا ننكر على من قلد أحد الأئمة الأربعة، دون غيرهم، لعدم ضبط مذاهب الغير؛ الرافضة، والزيدية، والإمامية، ونحوهم؛ ولا نقرهم ظاهراً على شيء من مذاهبهم الفاسدة، بل نجبرهم على تقليد أحد الأئمة الأربعة .

আমরা ফিকহী বিষয়ে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রাহ.-এর মাযহাবের অনুসারী। যারা চার ইমামের কোনো একজনের তাকলীদ করে আমরা তাদের উপর কোনো আপত্তি করি না। কারণ (চার ইমামের মাযহাব সংকলিতরূপে বিদ্যমান। পক্ষান্তরে) অন্যদের মাযহাব সংকলিত আকারে বিদ্যমান নেই। তবে রাফেযী, যাইদিয়া, ইমামিয়্যাহ ইত্যাদি বাতিল মাযহাব-মতবাদের অনুসরণকে আমরা স্বীকৃতি দিই না। বরং তাদেরকে চার ইমামের কোনো একজনের তাকলীদ করতে বাধ্য করি। [আদ দুরারুস সানিয়্যা ১/২২৭]

যেহেতু সৌদী অভ্যূথানের প্রণোদণাদানকারী শায়েখ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নজদী ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ এর মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। তাই হাম্বলী মাযহাব অনুপাতে বাইতুল্লাহ ও মসজিদে নববীতে এক জামাত চালু করা হয়। বাকি তিন মাযহাবের অনুসৃত পদ্ধতির জামাতকে বন্ধ করে দেয়া হয়।

আমরা এটিকেও খারাপ দৃষ্টিতে দেখি না। কারণ, নামাযের মৌলিক মাসআলা নিয়ে চার মাযহাবে কোন মতভেদ নেই। কিছু শাখাগত মাসআলায় মতভেদ আছে। তাই চার মাযহাব অনুপাতে যখন সালাত হতো সেটিকে আমরা যেমন সাপোর্ট করেছি। এখন এক মাযহাব তথা হাম্বলী মাযহাব অনুপাতে সালাত আদায় হয়, আমরা এটিকেও সাপোর্ট করি।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এতে করে লা-মাযহাবীদের খুশি হবার কী হল?

এক মুসাল্লায় জামাত হয়। তো কী হয়েছে? লা-মাযহাবীদের পদ্ধতিতো সালাত হয় না, বরং হাম্বলী মাযহাব অনুপাতে সালাত হয়?

চার মুসাল্লা লা-মাযহাবীদের নেতৃত্বে বন্ধ হয়েছে দাবী করা একটি জ্বলন্ত মিথ্যাচার।

যার নেতৃত্বে তা বন্ধ হয়েছে সেই মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব নজদী সাহেব পরিস্কার ভাষায় ঘোষণা করছেন, তিনি হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। আর তিনি প্রতিটি মাযহাবকে শ্রদ্ধা করেন। মানুষকে যে কোন এক মাযহাব মানতে বাধ্য করান।

তাহলে লা-মাযহাবী বা কথিত আহলে হাদীসরা চার মুসাল্লা দূরকারী দাবী করা একটি জঘন্য মিথ্যাচার ছাড়া আর কী’ হতে পারে?

বাইল্লাহ শরীফের ইমামগণ হয়তো হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী নতুবা মালেকী মাযহাবের অনুসারী। কিন্তু লা-মাযহাবী কোন ইমামকে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

যেমন বাইতুল্লাহ ও মসজিদে নববীর মাত্র দশজন ইমামের হাম্বলী ও মালেকী মাযহাব অনুসরণের প্রমাণ নিচে প্রদত্ব হলঃ

১-

শায়েখ ইয়াসির বিন রাশেদ হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। [প্রমাণ- https://ar.wikipedia.org/wiki/%D9%8A%D8%A7%D8%B3%D8%B1_%D8%A7%D9%84%D8%AF%D9%88%D8%B3%D8%B1%D9%8A]

২-

শায়খ সৌদ বিন ইবরাহীম শুরাইম হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। [প্রমাণ- https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B8%E0%A7%8C%E0%A6%A6_%E0%A6%86%E0%A6%B2-%E0%A6%B6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%AE]

৩-

শায়েখ আব্দুর রহমান সুদাইস হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। [প্রমাণ- https://en.wikipedia.org/wiki/Abdul_Rahman_Al-Sudais]

৪-

শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। [প্রমাণ- https://ar.wikipedia.org/wiki/%D8%B9%D8%A8%D8%AF_%D8%A7%D9%84%D9%84%D9%87_%D8%A7%D9%84%D8%AE%D9%84%D9%8A%D9%81%D9%8A]

৫-

হাসান বিন মুহাম্মদ বিন আব্বাস মালেকী মাযহাবের অনুসারী। [প্রমাণ- https://ar.wikipedia.org/wiki/%D8%AD%D8%B3%D9%86_%D8%A8%D9%86_%D9%85%D8%AD%D9%85%D8%AF_%D8%A7%D9%84%D9%85%D8%B4%D8%A7%D8%B7]

শায়েখ আব্দুল কাদের আলম বিন আলী মালেকী মাযহাবের অনুসারী। [প্রমাণ দেখুন- https://ar.wikipedia.org/wiki/%D8%B9%D8%A8%D8%AF_%D8%A7%D9%84%D9%82%D8%A7%D8%AF%D8%B1_%D8%A8%D9%86_%D8%B9%D9%84%D9%8A_%D8%A7%D9%84%D9%85%D8%B4%D8%A7%D8%B7_%D8%A7%D9%84%D9%85%D9%86%D8%A7%D9%81%D9%8A]

৭-

শায়েখ সালেহ বিন আব্দুল্লাহ বিন হামীদ। [প্রমাণ- https://ar.wikipedia.org/wiki/%D8%B5%D8%A7%D9%84%D8%AD_%D8%A8%D9%86_%D8%B9%D8%A8%D8%AF_%D8%A7%D9%84%D9%84%D9%87_%D8%A8%D9%86_%D8%AD%D9%85%D9%8A%D8%AF]

৮-

শায়েখ মুহাম্মদ নূর আলকুতবী হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। [প্রমাণ- https://ar.wikipedia.org/wiki/%D9%85%D8%AD%D9%85%D8%AF_%D9%86%D9%88%D8%B1_%D8%A7%D9%84%D9%83%D8%AA%D8%A8%D9%8A]

শায়েখ আলুয়ী বিন আব্বাস মালেকী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। [প্রমাণ- https://ar.wikipedia.org/wiki/%D8%B9%D9%84%D9%88%D9%8A_%D8%A8%D9%86_%D8%B9%D8%A8%D8%A7%D8%B3_%D8%A7%D9%84%D9%85%D8%A7%D9%84%D9%83%D9%8A]

১০

মসজিদে নববীর ইমাম শায়েখ মাহের বিন হামদ হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। [প্রমাণ- https://ur.wikipedia.org/wiki/%D9%85%D8%A7%DB%81%D8%B1_%D8%A7%D9%84%D9%85%D8%B9%DB%8C%D9%82%D9%84%DB%8C]

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা আশা করি পরিস্কার যে, চার মুসাল্লা লা-মাযহাবীদের মাধ্যমে দূর হয়েছে দাবী করা একটি মিথ্যাচার।

দ্বিতীয় বাইতুল্লাহ ও মসজিদে নববী কখনোই লা-মাযহাবীদের অধীনে ছিল না, হবেও না কোনদিন ইনশাআল্লাহ।

তৃতীয়ত নববী যুগ থেকে বাইতুল্লাহ ও মসজিদে নববীতে চলে আসা বিশ রাকাত তারাবীর সুন্নত আজো চালু আছে, কিয়ামত পর্যন্ত চালু থাকবে ইনশাআল্লাহ।

আট রাকাত তারাবী কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না ইনশাআল্লাহ।

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা-জামিয়া ফারুকিয়া দক্ষিণ বনশ্রী ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

         

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

যাকাতের টাকা কাউকে ঋণ হিসেবে প্রদান করা যাবে?

প্রশ্ন শ্রদ্ধেয় মুফতী সাহেবের কাছে আমার প্রশ্ন হল, যাকাতের টাকা ঋণ হিসেবে কাউকে প্রদান করা …