হোম / আকিদা-বিশ্বাস / বাংলাদেশের লা-মাযহাবীদের সাথে উলামায়ে হকের মতভেদ কি শুধু নামাযের মাসআলা নিয়ে?
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

বাংলাদেশের লা-মাযহাবীদের সাথে উলামায়ে হকের মতভেদ কি শুধু নামাযের মাসআলা নিয়ে?

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

অনেক ভাই মনে করেন বাংলাদেশে প্রচলিত নতুন মতবাদ “লা-মাযহাবী” বা কথিত আহলে হাদীস ভাইদের সাথে বাংলাদেশের উলামা মাশায়েখের মতভেদ নামাযের কিছু মাসায়েল নিয়ে।

সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রেই লা-মাযহাবীরা যে পদ্ধতিতে নামায পড়ে থাকে, সে পদ্ধতির নামায প্রচলিত। সুতরাং এসব বিষয় নিয়ে বাহাস-মুবাহাসা, বিতর্ক, বক্তব্য দেয়া উচিত নয়।

কিন্তু আসল বিষয় অনেক ভাইয়েরাই অনুধাবন করতে পারেন না।

নামায আদায় পদ্ধতির কিছু শাখাগত মাসায়েলের মতভেদ সাহাবা আমল থেকেই প্রচলিত। সেই স্বর্নযুগ থেকেই এসব মাসআলা নিয়ে মতভেদ ছিল। কিন্তু ঝগড়া ছিল না।

শাখাগত এসব মতভেদের কারণে একদল অপর দলকে ভ্রান্ত বলতো না। একদল আরেক দলকে গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট বলে ফাতওয়া দিতো না। যারা মক্কা মদীনায় গিয়েছেন তারা নিজ চোখেই দেখেছেন যে, কেউ আমীন জোড়ে বলছে, কেউ আস্তে বলছে। এমন কি ইমাম আমীন আস্তে বলছে, কিন্তু মুআজ্জিন আমীন জোরে বলছে। যেমন বাইতুল্লাহ শরীফের প্রথম সারির ইমাম আব্দুর রহমান সুদাইসী সাহেব নামাযে আমীন আস্তে বলেন, কিন্তু তারই পিছনে দাঁড়িয়ে মুআজ্জিন আমীন জোরে বলছেন। কিন্তু এ নিয়ে কোন বিতণ্ডা নেই। ঝগড়া নেই। ফাতওয়াবাজী নেই।

যে যার মত আমল করছে। যেহেতু উভয় আমলই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যাদের কাছে যে আমলটি সূত্র পরম্পরায় আমলীসূত্রে বিশুদ্ধ হিসেবে প্রমাণিত, তিনি সেই আমল করছেন।  ভিন্ন আমলটিকে ভুল বলছেন না। আবার সেই আমলটি নিজেও করছেন না।

এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। শাখাগত মতভেদ থাকা সত্বেও মৌলিক বিষয়ে একতাবদ্ধ।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের বাংলাদেশে প্রচলিত নতুন মতবাদী “লা-মাযহাবী” বন্ধুরা এ শাখাগত মতভেদকে মৌলিক মতভেদ বানিয়ে এলাকায় এলাকায় ঝগড়ার সৃষ্টি করছে। আলাদা মসজিদ তৈরী করছে।

এখানে গভীরভাবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, বাংলাদেশে প্রচলিত কথিত আহলে হাদীস নামধারী লা-মাযহাবী বন্ধুদের সাথে উলামায়ে হকের মতভেদ কি শুধু নামাযের কতিপয় মাসআলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ?

না, কস্মিনকালেও না। সালাফে সালেহীনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, সাহাবা আজমাঈনগণের আমলকে পিছনে ফেলে দিয়ে আমাদের এসব ভাইরা যে নতুন থিউরী উদ্ভাবন করেছেন “কুরআন হাদীস পড়ে নিজে যা বুঝবো তাই শরীয়ত” এ মানসিকতার কারণে অনেক মৌলিক বিষয়ে তাদের ভয়ানক কুফরী প্রকাশ পাচ্ছে।

যা আমাদের অনেক সরলপ্রাণ মুসলিমগণ জানেন না। আমরা আজকের এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লা-মাযহাবী শায়েখদের কয়েকটি ভয়ানক বক্তব্য তাদেরই প্রকাশনী থেকে বের করা বই থেকে তুলে ধরছি।

বিজ্ঞ পাঠকগণ আশা করি উপলব্ধি করবেন যে, লা-মাযহাবী মতবাদ শুধু নামাযের কতিপয় মাসআলা নিয়েই বাড়াবাড়িতে লিপ্ত নয়, বরং পুরো শরীয়তে ইসলামিয়ার চেহারা পাল্টে দেবার ভয়ানক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

কালিমায়ে তাইয়্যিবাহ পাঠ শিরক?

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” উচ্চারণ করলে বা লিখলে শিরকী অর্থ প্রকাশ পায়। [আক্বীদার মানদন্ডে ইসলামের মূলমন্ত্র কালিমাহ তাইয়্যিবাহ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, লেখক-আব্দুল্লাহ আল ফারূক-৬৯]

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” বাক্যটি অশুদ্ধ এবং দারুল ইফতা বাংলাদেশসহ অন্যান্য আলেমগণ কর্তৃক প্রচলিত কালিমার বঙ্গানুবাদও সঠিক নয় বরং আমরা ইতোপূর্বে আরবী ভাষার অলংকরণ শাস্ত্র নাহুর তারকীব বা বিশ্লেষণ দ্বারা প্রমাণ করেছি যে, বাক্যটির সঠিক বঙ্গানুবাদ হবে “কেই কোন উপাস্য আল্লাহ ব্যতীত তিনি আল্লাহর রাসূল”। [প্রাগুক্ত-১৫৭]

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সুন্নাত পরিত্যাগ করা ও অপছন্দ করা। [প্রাগুক্ত-২১৭]

“প্রচলিত কালিমায়ে তাইয়্যিবাহ এর ভুল সংশোধন”। [মাযহাবীদের গুপ্তধন, লেখক, মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, পৃষ্ঠা-৩৩]

হযরত উমর রাঃ কুরআন বিরোধী রায় দিয়েছেন?

“এটি ছিল উমর রাঃ এর ইজতিহাদ মাত্র। তা দ্বারা রাজঈ তালাক এর কুরআনী পদ্ধতিকে বাতিল করা যায় না। ওমর রাঃ এটি করেছিলেন লোকদের ভয় দেখাবার জন্য সাময়িক কঠোরতা হিসাবে। কিন্তু এতে তাঁর উদ্দেশ্য হাছিল হয়নি বিধায় মৃত্যুর পূর্বে তিনি লজ্জিত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। [তালাক ও তাহলীল-৩৫-৩৬, লেখক-ড. আসাদুল্লাহ গালিব]

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঈদ রাঃ স্মৃতিভ্রম ছিলেন?

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঈদ রাঃ এর শেষ বয়সে স্বৃতি ভ্রম ঘটে। [তাওহীদ পাবলিকেশন্স প্রকাশিত সহীহুল বুখারী-১/৩৫৭]

মাযহাব অনুসরণ কুফর ও শিরক?

“ঠিক এই কাফিরদের মতই বর্তমানে যারা মাযহাবের অনুসারী তারা চার মাযহাবের যে কোন একটির অনুসরণ করে তাদের বাপ দাদাদের মাযহাব অনুযায়ী। অর্থাৎ বাবা যদি হানাফী হয় তাহলে ছেলেও হানাফী হয় এবং বাবা যদি শাফেয়ী হয় তাহলে ছেলেও শাফিঈ হয়। যে কারণে এইভাবে মাযহাবের অনুসরণ করা শিরকও কুফর হয়েছে। [আমাদের মাযহাব কি বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত?, পৃষ্ঠা-২২, লেখক-মুহাম্মদ ইকবাল বিন ফাখরুল]

মাযহাব অনুসারীদের হত্যা করতে হবে?

“যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট এক ইমামের তাকলীদকে ওয়াজিব করে নিবে তাকে তাওবাহ করানো হবে, অন্যথায় হত্যা করতে হবে। [অধ্যাপক ডক্টর রঈসুদ্দীন সম্পাদিত ‘চার মাযহাবের নির্দিষ্ট কোন এক মাযহাবের অনুসরণ করতে মুসলিম কি বাধ্য?, পৃষ্ঠা, ৪৩, শায়েখ আকরামুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম সম্পাদিত ‘মুসলিম কি চার মাযহাবের কোন একটির অনুসরণে বাধ্য?, পৃষ্ঠা, ৩২]

মাযহাব চারটি হয়েছে জাল হাদীস মানার কারণে?

“মাযহাবী ভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুর্বল অথবা জাল হাদীসের উপর ভিত্তি করে”। [পর্যালোচনা ও চ্যালেঞ্জ, লেখক-আকরামুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম, পৃষ্ঠা-৮]

হানাফী মাযহাবের অনুসারীরা জাহান্নামী?

হানাফী মাযহাবের আলেম/ওলামাগণের ইজমা [একমত হওয়া] মান্য করা হলে তারা বিদআত হানাফী মাযহাব পালনকারী জনগণ বিদআতী কাজ করে চলেছেন তাদের পরিণাম জাহান্নাম। {ফিক্বহে ইসলাম বনাম দ্বীন ইসলাম-১৭৯, লেখক-ইঞ্জিনিয়ার শামসুদ্দিন আহমাদ}

ইমাম আবূ হানীফা রহঃ কেমন ছিলেন?

‘জন্মগত সূত্রে ইমাম আবূ হানীফাহ ছিলেন শীআ। সকল মুহাদিদসগণ শীআদেরকে ঘৃণা করত। তাই মুহাদ্দিস যারা শীআ নন তাদের হাদীস তারা গ্রহণ করত না। ইমাম আবূ হানীফাহ তাই মুহাদ্দিসগণের হাদীস গ্রহণ করেননি। আর এজন্য তার হাদীসের জ্ঞান ছিল খুবই নগণ্য। [আব্দুর রউফ রচনাবলী-১, পৃষ্ঠা-৯১]

“ইমাম আবু হানীফা ও ফিক্বহের প্রতিষ্ঠাতা আবু হানীফা এক নয় কারণ ফিক্বহের উদ্দেশ্য সৎ ছিল না, ফিক্বহের উদ্দেশ্য হলো মানুষের শয়তানী ইচ্ছাকে পূর্ণ করা এবং সরকারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গের রায়কে বাস্তবাায়িত করা।”[মাওলানা আব্দুর রউফ রচনাবলী-১, পৃষ্ঠা-২২৩, লেখক-মাওলানা আব্দুর রউফ, সাবেক আমীর আহলে হাদীস তাবলীগে ইসলাম]

তাবলীগের ব্যাপারে ধারণা!

তাবলীগ জামাত শিরক জনিত আক্বীদার জালে আবদ্ধ এক ফেরকা, এদের নিসাবী কিতাব কুরআন ও সহীহ হাদীস পরিপন্থী জাল ও জঈফ হাদীসে ভরপুর। তাবলীগী নিসাবের কিতাবে জাল হাদীস ও কিচ্ছা কাহিনী এবং বিভিন্ন শিরকি কথা ছাড়া আর কিছুই নেই। কুরআন ও সহীহ হাদীসের দু’ একটা কথা থাকলেও সেসবের অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। {সহীহ আক্বীদার মানদন্ডে তাবলীগী নিসাব-লেখক মুরাদ বিন আমজাদ}

নামায তরককারীর হুকুম কী?

নামায তরককারী মুরতাদ। [জামাআতে সালাত ত্যাগকারীর পরিণাম-২৭, লেখক-খলীলুর রহমান বিন ফযলুর রহমান, আত-তাওহীদ প্রকাশনী]

তার মালিকানা ক্ষুন্ন হয়। [প্রাগুক্ত-২৭]

সালাত পরিত্যাগকারী আত্মীয় স্বজনের উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। [প্রাগুক্ত-২৮]

বেনামজীর জন্য মক্কা মদীনার সীমানায় প্রবেশ নিষিদ্ধ। [প্রাগুক্ত-২৮]

সালাত পরিত্যাগকারীর যাবহকৃত পশুর গোশত ভক্ষণ হারাম। [প্রাগুক্ত-২৯]

মৃত্যুর পর তারা যানাযা পড়া যাবে না। [প্রাগুক্ত-২৯]

সালাত ত্যাগকারীর জন্য মুসলিম মহিলা বিবাহ করা হারাম। [প্রাগুক্ত-৩০]

রমজানে রাত জেগে কুরআন তিলাওয়াত

‘রমযান মাসে ক্বারীগণের রাত জেগে কুরআন পাঠ করা যা সালফে সালিহীনদের কাজ ছিল না। এটা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর শিক্ষা ছিল না। [মৃত ব্যক্তির নিকট কুরআন পাঠের সওয়াব পৌঁছে কি?, লেখক-খলীলুর রহমান বিন ফযলুর রহমান-৩৯]

এরকম আরো অনেক জঘন্য আক্বীদা ও বিশ্বাস রয়েছে তাদের প্রকাশিত বই এবং ভিডিওতে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের দেশের সরলপ্রাণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের তাদের প্রতারণা ও ধোঁকা থেকে হিফাযত করুন।

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

উত্তম আখলাক ও চারিত্রিক গুণাবলী

আল্লামা মনজূর নূমানী রহঃ মানুষের আত্মশুদ্ধি এবং চারিত্রিক উন্নতি ইসলামী শিক্ষার এক অতিগুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নবীজী …