হোম / আহলে হাদীস / এক ইমাম ঈদের একাধিক জামাতের ইমামতী করতে পারবে কী?
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এক ইমাম ঈদের একাধিক জামাতের ইমামতী করতে পারবে কী?

প্রশ্ন

মোহতারাম: আমাদের মসজিদে জালালাবাদে ঈদের দুইটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। দুঃখের বিষয় দুনোটি জামাতের ইমামতি’ই সফিউল্লাহ সাহেব করেন। ঘটনার সার সংক্ষেপ হল । সফিউল্লাহ সাহেবের সাথে আরেক জন হাফেজ মাওলানা এক মাস জাবত মসজিদে ছিলেন । যাকে খতমে তারাবির জন্য আনা হয়েছিল। সফিউল্লাহ সাহেব মাওলানাকে বল্লেন ঈদের দ্বিতিয় জামাতের ইমামতি একজন পাকিস্তানী করবেন।কিন্তু সফিউল্লাহ সাহেব ঈদের প্রথম জামাত পড়ানোর পর দ্বিতিয় জামাত পড়ানোর ও প্রস্তুতি নেন। তখন মাওলানা সাহেব সফিউল্লাহ সাহেব কে ঈদের দ্বিতিয় জামাতের ইমামতি করতে নিষেধ করেন। এবং বলেন যে এক ব্যক্তি একই নামাজের দুইটি জামাতের ইমামতি যায়েয নাই।আপনি প্রথম জামাত পড়াইছেন দ্বিতিয় জামাতঅন্য কাওকে দিয়ে পড়ান। কিন্তু সফিউল্লাহ সাহেব উনার কথার কোন তোয়াক্কা না করে ঈদের দ্বিতিয় জামাতের ইমামতিও নিজেই করেন।পরে উনাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাস করলে তিনি বলেন আমি নফল নামাজ পড়াইছি, অথচ ঈদের খোৎবাও পড়েছেন । এই বিষয় টি কে নিয়ে এলাকার মধ্যে ফেৎনা তৈরী হয়েছে।

মুফতী সাহেব হুজুরের কাছে প্রশ্ন:

সফিউল্লাহ সাহবের পিছনে যারা ঈদের নামাজ পড়েছে তাদের ঈদের নামাজ আদায় হবে কি না ?
এবং সফিউল্লাহ সাহেব কে কোন মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব দেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে যায়েজ হবে কি না ? দলিল সহ জানানোর আবেদন রহিল। সালামান্তে (মাহমুদ ,গ্রীস)

উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

একজন ইমাম এক সালাতের একাধিক জামাতের ইমামতী করতে পারে না। করলে প্রথমটির পরের বাকি জামাত বিশুদ্ধ হবে না। এমন ফিতনাবাজ ব্যক্তিকে ইমাম বানানো কোনভাবেই ঠিক হবে না। তওবা করে ক্ষমা না চাইলে তাকে ইমামতীর পদ থেকে বরখাস্ত করা উচিত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বা খলীফায়ে রাশেদীন থেকে এক নামাযের একাধিক জামাতের ইমামতীর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এক ইমাম যখন প্রথমে একটি ঈদের সালাতের ইমামতী করল, এর মানে তার যিম্মা থেকে ওয়াজিব আদায় হয়ে গেছে। এরপর সে যদি আবার নামায পড়াতে যায়, তাহলে সেটি কী হবে? নিশ্চয় নফল।

আর তার পিছনে দ্বিতীয় জামাতে যারা শরীক হবে, তাদের নিয়ত থাকবে ওয়াজিব আদায় করা, আর ইমাম আদায় করছে নফল। ইমাম ও মুক্তাদীর নামাযই আলাদা। একজনের নফল। আরেকজনের ওয়াজিব। দু’টি ভিন্ন নামাযের মাঝে একজন আরেকজনের ইক্তিদা কিভাবে করতে পারে?

হাদীসের মাঝে এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: ” إِنَّمَا جُعِلَ الإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ، فَلاَ تَخْتَلِفُوا عَلَيْهِ،

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, অনুসরণ করার জন্যই ইমাম নির্ধারণ করা হয়, তাই তার বিরুদ্ধাচরণ করবে না। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৭২২]

হাদীসে ইমামের বিরুদ্ধাচরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে, আর ইমাম যখন নফল নামায পড়ছে, আর মুসল্লিগণ তার পিছনে ওয়াজিব নামাযের নিয়তে দাঁড়ায়, তাতো পরিস্কার তার বিরুদ্ধাচরণ। এভাবে ইক্তিদা কিভাবে সহীহ হতে পারে?

তাই দ্বিতীয় জামাতে যারা উক্তি ইমামের পিছনে নামায আদায় করবে, তাদের কারো ঈদের সালাত আদায় হবে না।

বছরের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ঈদের সালাত নিয়ে যে ইমাম এমন খামখেয়ালী করে মুসল্লিদের নামায নষ্ট করছে, এমন খাহেশাতপূজারী ব্যক্তিকে ইমাম বানানো থেকে বিরত থাকা উচিত।

এ বিষয়ে একটি হাদীস বিষয়ে কিছুটা পর্যালোচনা জেনে রাখা ভাল। সেটি হল, হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে সালাত আদায় করে, আরেক স্থানে গিয়ে নামায পড়াতেন।

উক্ত হাদীসটি পেশ করে কিছু ভাইরা না বুঝে এক ইমামের একাধিক সালাতের ইমাম হবার স্বপক্ষে দলীল পেশ করতে চান। আমরা প্রথমে উক্ত হাদীসটি দেখে নিব। তারপর এ হাদীস দিয়ে দলীল পেশ করা শুদ্ধ হবে কি না? তাও বুঝে নিবো ইনশাআল্লাহ।

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ: «أَنَّ مُعَاذَ بْنَ جَبَلٍ، كَانَ يُصَلِّي مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ يَرْجِعُ، فَيَؤُمُّ قَوْمَهُ»

হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ থেকে বর্ণিত। নিশ্চয় মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সালাত আদায় করতেন, তারপর ফিরে গিয়ে তার কওমের ইমামতী করতেন। [বুখারী, হাদীস নং-৭০০]

বুখারীর হাদীসে মুয়াজ রাঃ যে নামায নবীজীর পিছনে পড়তেন, ঠিক সেই নামাযটির ইমামতীই আবার গিয়ে করতেন কি না? তা পরিস্কার আসেনি।

কিন্তু অন্যান্য কিতাবে তা এসেছে।

এখানে বিষয় হল, এটি মুয়াজ রাঃ এর একটি ব্যক্তিগত আমল ছিল। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন নাকি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন? আরেকটি বিস্তারিত হাদীস দেখলে বিষয়টি পরিস্কার হবে।

عَنْ مُعَاذِ بْنِ رِفَاعَةَ الزُّرَقِيُّ: أَنَّ رَجُلًا، مِنْ بَنِي سَلِمَةَ يُقَالُ لَهُ سَلِيمٌ أَتَى رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , فَقَالَ: إِنَّا نَظَلُّ فِي أَعْمَالِنَا , فَنَأْتِي حِينَ نُمْسِي , فَنُصَلِّي فَيَأْتِي مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ , فَيُنَادَى بِالصَّلَاةِ , فَنَأْتِيهِ فَيُطَوِّلُ عَلَيْنَا. فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا مُعَاذُ لَا تَكُنْ فَتَّانًا , إِمَّا أَنْ تُصَلِّيَ مَعِي , وَإِمَّا أَنْ تُخَفِّفَ عَنْ قَوْمِكَ»

হযরত মুয়াজ বিন রিফাআ যুরকী রাঃ থেকে বর্ণিত। বনী সালামার এক ব্যক্তি যার নাম ছিল সালীম। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলেন। এসে বললেন, আমরা কাজকর্মে ব্যস্ত থাকি। সন্ধ্যায় ফিরে এসে সালাত আদায় করি। তখন মুয়াজ বিন জাবাল আসে। এসে সালাতের জন্য আহবান করে। তখন আমরা নামায পড়তে আসি। তখন মুয়াজ নামায অনেক দীর্ঘায়িত করে। [ফলে আমাদের অনেক কষ্ট হয়, এ অভিযোগ শুনে] তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মুয়াজ! ফিতনা সৃষ্টিকারী হইয়োনা, তুমি হয়তো আমার সাথে নামায পড়ো, অথবা তোমার কওমের সাথে সংক্ষেপে সালাত পড়। [তাহাবী শরীফ, হাদীস নং-২৩৬২, আল-মু’জামুল কাবীর লিততাবরানী, হাদীস নং-৬৩৯১]

এ হাদীসে ঘটনাটির মোটামুটি পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে। যাতে দেখা যাচ্ছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়াজ রাঃ কে বলছেন, তুমি হয়তো আমার সাথে নামায পড়, অথবা কওমের সাথে গিয়ে সংক্ষেপে নামায পড়াও।

যা পরিস্কার বুঝাচ্ছে, এক সালাতের ইমামতী দুইবার করা যায় না। যদি যেত, তাহলে নবীজী বলতেন, আমার পিছনে সালাত পড়ে গিয়ে, কওমের সাথে সংক্ষেপে নামায পড়ো। কিন্তু নবীজী তা না বলে, জানিয়েছেন, হয়তো, আমার সাথে পড়ো, নতুবা তাদের সাথে পড়।

এ হাদীস পরিস্কার প্রমাণ করে, এক সালাত একবার আদায়ের পর, সেটির ইমামতী আবার করা যায় না।

সুতরাং বুঝা গেল, হযরত মুয়াজ রাঃ এর একটি ব্যক্তিগত আমল, যার উপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন, সেটি উপস্থাপন করে এক সালাতের একাধিক জামাতের ইমামতীর বৈধতার পক্ষে দলীল পেশ করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

والله اعلم بالصواب

উত্তর লিখনে

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email
বিস্তারিত জানতে ছবির উপর টাচ করুন

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

চার্জ কার্ড  কাকে বলে? এটি ব্যবহারের বিধান কী?

প্রশ্ন চার্জ কার্ড  কাকে বলে? এটি ব্যবহারের বিধান কী? উত্তর بسم الله الرحمن الرحيم কোম্পানী …