হোম / আকিদা-বিশ্বাস / কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটুকু মানা কি ফরজ?

কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটুকু মানা কি ফরজ?

প্রশ্ন

আসসালামু আলইকুম

1. কোরআন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটুকু মানা কি ফরয?

  1. যদি সবটুকু ফরয না হয় তাহলে কতটুকু ফরয?

জানালে উপকৃত হব।

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

আপনার প্রশ্নটির উদ্দেশ্য অস্পষ্ট। আপনার প্রশ্নটির দু’টি দিক হতে পারে। যথা-

১-পূর্ণ কুরআনকে কুরআন হিসেবে মান্য করা বিশ্বাস করা কি ফরজ?

২-কুরআনে বর্ণিত সকল বিধানের উপর আমল করা কি একই মানের ফরজ?

যদি প্রথমটি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে উত্তর হল, হ্যাঁ, পূর্ণ কুরআন কুরআন হিসেবে মান্য করা ফরজ। আল্লাহর কথা হিসেবে মান্য করা ফরজ।

আর যদি উদ্দেশ্য হয় দ্বিতীয়টি। তথা কুরআনে বর্ণিত সকল বিধান মানা কি একই মানের ফরজ?

এক্ষেত্রে ব্যাখ্যা আছে। কুরআনে বর্ণিত যেসব বিধান রহিত হয়ে গেছে। সেসব বিধানের উপর আমল করা যাবে না। বরং রহিতকারী বিধানের উপর আমল করতে হবে।

এছাড়া বিধানটি কী হিসেবে বলা হয়েছে? সেটির প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য হিসেবে সেটি ফরজ হওয়া, মুস্তাহাব হওয়া, উত্তম হওয়া প্রমাণিত হবে। সব বিধানকে ঢালাও ফরজ যেমন বলা যাবে না। আবার সব বিধানকে ঢালাওভাবে ঐচ্ছিক বলাও যাবে না।

উদাহরণঃ

وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا وَصِيَّةً لِّأَزْوَاجِهِم مَّتَاعًا إِلَى الْحَوْلِ غَيْرَ إِخْرَاجٍ ۚ فَإِنْ خَرَجْنَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِي مَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ مِن مَّعْرُوفٍ ۗوَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ [٢:٢٤٠

আর যখন তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে তখন স্ত্রীদের ঘর থেকে বের না করে এক বছর পর্যন্ত তাদের খরচের ব্যাপারে ওসিয়ত করে যাবে। অতঃপর যদি সে স্ত্রীরা নিজে থেকে বেরিয়ে যায়,তাহলে সে নারী যদি নিজের ব্যাপারে কোন উত্তম ব্যবস্থা করে,তবে তাতে তোমাদের উপর কোন পাপ নেই। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী বিজ্ঞতা সম্পন্ন। {সূরা বাকারা-২৪০}

এ আয়াত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, স্বামী মারা গেলে মহিলারা এক বছর ইদ্দত পালন করে স্বামীর ঘরে থাকবে।

কিন্তু আরেক আয়াতে এসেছেঃ

وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا ۖ فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا فَعَلْنَ فِي أَنفُسِهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ [٢:٢٣٤]

আর তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে এবং নিজেদের স্ত্রীদেরকে ছেড়ে যাবে,তখন সে স্ত্রীদের কর্তব্য হলো নিজেকে চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়ে রাখা। তারপর যখন ইদ্দত পূর্ণ করে নেবে,তখন নিজের ব্যাপারে নীতি সঙ্গত ব্যবস্থা নিলে কোন পাপ নেই। আর তোমাদের যাবতীয় কাজের ব্যাপারেই আল্লাহর অবগতি রয়েছে। {সূরা বাকারা-২৩৪}

এ আয়াত দ্বারা জানা যাচ্ছে যে,মহিলার স্বামী মারা গেলে সে ইদ্দত পালন করবে চার মাস দশ দিন।

প্রথমোক্ত আয়াতটির উপর আমলটি দ্বিতীয় আয়াতটি দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। এখন আমরা উভয় আয়াতকে কুরআন হিসেবে মান্য করবো। কিন্তু আমল করবো দ্বিতীয় আয়াতটির উপর।

যেমন কুরআনের একটি আয়াতে মদ খাওয়াকে সরাসরি হারাম করা হয়নি। বরং এটি পাপকর্ম এবং ক্ষতিকর বলা হয়েছে। আবার এতে উপকার আছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ ۖ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا ۗ وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ [٢:٢١٩]

তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও,এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়। [সূরা বাকারা-২১৯]

এখন উপকার অর্জনের আশায় মদ খাওয়া যাবে কি না?

না, যাবে না। কারণ কুরআনের আরেক আয়াতে পরিস্কার নিষেধাজ্ঞা এসেছেঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ [٥:٩٠]

হে মুমিনগণ,এই যে মদ,জুয়া,প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। [সূরা মায়িদা-৯০]

সূরা বাকারা এবং সূরা মায়েদায় বর্ণিত উভয় আয়াতকে কুরআন হিসেবে মান্য করা আবশ্যক। কিন্তু প্রথম আয়াতের উপর আমল করে উপকার অর্জনের আশায় কিন্তু মদ খাওয়া হালাল হবে না।

কুরআন হিসেবে তা মানা আবশ্যক। কিন্তু পালনীয় হিসেবে শুধু দ্বিতীয় আয়াত মানতে হবে। প্রথমটি নয়।

وَإِذَا حَلَلْتُمْ فَاصْطَادُوا ۚ [٥:٢

যখন তোমরা এহরাম থেকে বের হয়ে আস,তখন শিকার কর। [সূরা মায়িদা-২]

এ আয়াতে হজ্ব শেষে শিকার করতে আদেশ দেয়া হল। এ আদেশটি দ্বারা হজ্ব শেষে শিকার করাকে ফরজ করে না। বরং শিকার করার বৈধতার প্রমাণবাহী।

তো আমরা এ আয়াতকে কুরআন হিসেবে মানি। কিন্তু এ আদেশর উপর সর্বদা আমল করাকে ফরজ মনে করি না। কারণ এটি সম্ভব নয়। আবার আল্লাহর উদ্দেশ্যও নয়। বরং উদ্দেশ্য হল, শিকার করার বৈধতা প্রমাণ করা। শিকার করাকে ফরজ করা নয়।

এরকম অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।

তাহলে বুঝা গেল, পুরো কুরআনকে  কুরআন হিসেবে মান্য করা ফরজ। আর বিধানাবলী পালন বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল, সাহাবাগণের আমল হিসেবে সাব্যস্ত হবে, কোনটি ফরজ, আর কোনটি নফল।

যা ফিক্বহে ইসলামীর কিতাবে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে।

আশা করবো পুরো বিষয়টি ভাল করে অনুধাবন করতে সমর্থ হয়েছেন।

والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

উস্তাজুল ইফতা– জামিয়া কাসিমুল উলুম সালেহপুর, আমীনবাজার ঢাকা।

ইমেইল– ahlehaqmedia2014@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

দুইবার বিয়ে হওয়া স্ত্রী আখেরাতে কোন স্বামীর কাছে থাকবে?

প্রশ্ন আসসালামু আলাইকুম। আপনার কাছে একটা প্রশ্ন হুজুর। আমরা দেখতে পাই যে বিভিন্ন সাহাবায়ে একরাম …