হোম / নির্বাচিত / কওমি মাদ্রাসা যাকাত-ফিতরার টাকায় চলে’ বলে নাক সিটকানো কতটা যৌক্তিক?

কওমি মাদ্রাসা যাকাত-ফিতরার টাকায় চলে’ বলে নাক সিটকানো কতটা যৌক্তিক?

‘কওমি মাদ্রাসা যাকাত-ফিতরার টাকায় চলে’ বলে নাক সিটকানো অযৌক্তিক।

‘কওমি মাদ্রাসাগুলো যাকাত-ফিতরার টাকায় চলে’—এমনটা বলে অনেককে নাক সিটকাতে দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যাকাত-ফিতরা কি হালাল না হারাম? যদি হালাল হয়, তাহলে নিশ্চয়ই মাদ্রাসাগুলো হালাল ও বৈধভাবেই পরিচালিত হচ্ছে, তাই না?

এনিওয়ে, যাকাত-ফিতরা গ্রহণ মানে তো ভিক্ষাবৃত্তি নয়। এটি গরিব ও এতিমদের হক। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো যাকাত। ভেবে দেখুন, যারা এই ধরনের অভিযোগ করে থাকেন, তারা নিজেদের অজান্তেই যাকাতের গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন।

মনে রাখা দরকার, দেশের সরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বছর বছর জনগণের টাকায় ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, সেটা নিয়ে অভিযোগ তোলা যেমন মূর্খতার পরিচায়ক হবে, তেমনি কওমি মাদ্রাসার যাকাত-ফিতরা গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলাও সম্যক মূর্খতা।

যাকাত-ফিতরা কিংবা ভর্তুকি—দুটোর উৎসই কিন্তু জনগণ। আবার যাকাত-ফিতরার উপর কওমি মাদ্রাসাগুলো শতভাগ নির্ভরশীল এমনও নয়। কেননা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দাতা ব্যক্তি ও সংস্থা থেকেও প্রচুর পরিমাণে তাদের ফান্ড আসে। দেশের এনজিওগুলো যদি বিদেশি অর্থায়নে চলতে পারে, তাহলে কওমি মাদ্রাসারও বিদেশি ফান্ড গ্রহণের অধিকার রয়েছে।

তাছাড়া তথাকথিত আধুনিক শিক্ষার আলো যখন দেশের বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছতে পারছে না এবং শিক্ষার আলো থেকে প্রান্তিক শিশু-কিশোর ও যুবকরা বঞ্চিত, তখন সেসব জায়গায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কওমি মাদ্রাসাগুলো গড়ে উঠছে। মতলববাজ খ্রিস্টান মিশনারী এনজিও’দের খ্রিস্টান ধর্মান্তরকরণের এজেন্ডার বিরুদ্ধে কওমি মাদ্রাসাগুলো প্রতিরোধ তৈরি করেছে। সেজন্যই কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপর সাম্রাজ্যবাদী খ্রিস্টান বিশ্বের শ্যেনদৃষ্টি পড়েছে! সেজন্যই কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে এত অপপ্রচার।

এছাড়া এতিম-মিসকিনরা ছাড়াও কওমি মাদ্রাসায় উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও পড়ে। কিন্তু সেখানে ছাত্রছাত্রীদের প্রতি ধনী-গরিব কোনো বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নেই। হিন্দু ধর্মের মতো জাতপাতের ভেদাভেদ ও বৈষম্য সেখানে দেখা যায়না। সেখানে মানুষ হিসেবে সবাই সমানভাবে বিবেচিত। এই মহান মানবিক শিক্ষাটা কওমি মাদ্রাসায় পাওয়া যায়।

বিশেষ করে এতিম-মিসকিনদের পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব কওমি মাদ্রাসাগুলো নেয়। এর ফলে দেশে নিরক্ষরতার হার কমছে এবং স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের কয়টি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এতিম-মিসকিনদের জন্য এরকম বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে? আমরা অহংকারী আধুনিক প্রগতিশীল শিক্ষিতরা কি কওমি মাদ্রাসার অবদান ও গুরুত্ব এতটা তলিয়ে দেখেছি কখনো? ইতিবাচকভাবে ভেবেছি আদৌ? কওমি মাদ্রাসার প্রতি শুধুই অবজ্ঞা ও অবহেলার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ কতটা যৌক্তিক?

কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় বিশ্বখ্যাত মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন’র একদল সাংবাদিক এসেছিলেন হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী সাহেবের সাক্ষাতকার নিতে। সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের সাথে সৌভাগ্যক্রমে আমিও ছিলাম। তারা এই মাদ্রাসাটির ১৪ হাজার ছাত্রের থাকা-খাওয়া ফ্রী শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সরেজমিন পরিদর্শনের ফলে তারা কওমি মাদ্রাসা সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে খুবই ইতিবাচক ধারণা পেয়েছিল বলে আমার ধারণা।

এছাড়া কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকরা অতি অল্প বেতনে পরিবার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচিত দেশের একজন জনপ্রিয় বামপন্থী লেখক (তথাকথিত সেকুলার নন) বিস্মিত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকরা সাধকদের মতো জীবনযাপন করছেন। এত অল্প বেতন সত্ত্বেও তাদের সুখী ভাব সত্যিই প্রশংসনীয়। কোনো জাগতিক উচ্চাভিলাষ ও অবাধ ভোগবাদ তাদের মধ্যে লক্ষণীয় নয়। অথচ আমাদের বামপন্থীদের মধ্যে এটা কল্পনাই করা যায়না।

সুতরাং, কওমি মাদ্রাসা সম্পর্কে প্রচলিত প্রপাগান্ডাসমূহ দ্বারা প্ররোচিত ও বিভ্রান্ত না হয়ে সরেজমিনে এর ভালো দিকগুলো যাচাই-বাছাই করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তাতেই সত্যটা জানা সম্ভব। আসুন, আমরা আধুনিক শিক্ষিতরা একটু ইতিবাচকভাবে ভাবি।

-তারেকুল ইসলাম

         

Print Friendly, PDF & Email

এটাও পড়ে দেখতে পারেন!

জেনারেল শিক্ষিতদের আলেম কোর্স “তালীমুল ইসলাম নৈশ মাদরাসা” বিভাগে নতুন মেয়াদে ভর্তি চলছে!

আল্লাহর রহমাতে জেনারেল শিক্ষিতদের জন্য আলেম কোর্স “তালীমুল ইসলাম নৈশ মাদরাসা” বিভাগ তৃতীয় শিক্ষাবর্ষে পদার্পণ …